প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস আর ঐতিহ্যে যে নামটি আভিজাত্য আর নিজস্ব মহিমা নিয়ে এখনও জ্বলজ্বল করছে, তা হলো মসলিন। ঢাকাই মসলিন। একসময়ে শুধু বাংলা বা মোঘল রাজদরবারই নয়; বরং পৃথিবীজুড়েই অতি সূক্ষ্ম, মিহি, মোলায়েম আর উজ্জ্বল এই বস্ত্র ছিল চাহিদার শীর্ষে। মসলিন বাংলাদেশের ঐতিহ্যিক বাহনের আরেক নাম।
একদা ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত এসেছিলেন তৎকালীন বঙ্গদেশ ভ্রমণে। ফেরার সময় রানীর জন্য নিয়ে গেলেন এক আজব উপহার। একটি মাত্র দেশলাইয়ের বক্স নিয়ে রানীর সামনে উপস্হিত হলেন রাষ্ট্রদূত! সভাসদ সবাই অবাক। রানীর হাতে এই উপহার তুলে দিতেই রানী ভীষণ অপমান বোধ করলেন। কিন্তু দেশলাইয়ের বক্স খুলতেই রানীর সমস্ত রাগ, অপমান কর্পূরের মতো নিমেষেই উড়ে গেলো। এ যে মসলিন! এত স্বচ্ছ, মিহি আর নজরকাড়া কাপড় তিনি কখনোই দেখেননি। মসলিন পেয়ে রানীর ভরলো মন আর রাষ্ট্রদূতের পকেট ভরলো বকশিশে। মসলিনের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি আর জনপ্রিয়তা নিয়ে এমন আরো বহু ঘটনা রয়েছে। আসুন এবারে একটু জেনে নেয়া যাক বাংলায় মসলিন-ইতিহাস।
মসলিন শব্দটি ফারসি, আরবি, সংস্কৃত কিংবা বাংলাও নয়। তাহলে এই শব্দের উৎস কী-এ নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা থাকলেও প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আব্দুল করিম তাঁর গ্রন্থ ঢাকাই মসলিন গ্রন্থে হেনরি উইল ও এ সি বার্নেলের উদ্ধৃতি টেনে তাদের মতকে সমর্থন দেন এবং এই মতকে উপেক্ষা করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। হেনরি ইউল ও এ সি বার্নেল মনে করেন, ‘মসলিন’ শব্দটি ‘মসুল‘ নাম থেকে উদ্ভূত। আর এই মসুল হচ্ছে ইরাকের একটি ব্যবসা কেন্দ্রের নাম যেটি ছিল বস্ত্রশিল্পের জন্য বিখ্যাত। এখানে নানা জাতের বস্ত্র উৎপাদনের পাশাপশি একপ্রকার সূক্ষ্ম বস্ত্র উৎপাদিত হতো, যাকে ইউরোপীয়রা মসুলি < মসুলিন <মসলিন নামে অবহিত করত। ইউরোপীয়রা পৃথিবীর যে প্রান্তেই তাদের উপনিবেশের মধ্যে (যেমন: গুজরাট, গেলকুণ্ডা ইত্যাদি) এই মানের সূক্ষ্ম বস্ত্র দেখেছে, তাকেই তারা মসলিন নাম দিয়েছে।
সেই সূত্রে ‘মসলিন’ নামটি মূলত আমাদের দেশজ নাম নয়। কারণ, বাংলায় মুসলিম শাসনামলে মসলিন নামে কোনো সূক্ষ্ম বস্ত্রের উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। এখানকার উৎপাদিত সূক্ষ্ম বস্ত্রগুলো তাদের রং, আকার এবং বুনন প্রণালির ভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রসিদ্ধি লাভকরে। যেমন: আব-ই-রওয়ান, শবনম, জামদানিসহ মোট ২৮টি সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্রের নাম মুসলিম শাসনামলের তৎকালীন ইতিহাসে পাওয়া যায়।
মসলিন তুলার আঁশ থেকে প্রস্তুত করা এক প্রকারের অতি সূক্ষ্ম কাপড়। এটি প্রস্তুত করা হতো পূর্ব বাংলার সোনারগাঁও অঞ্চলে। মসলিনে তৈরী করা পোশাকসমূহ এতই সূক্ষ্ম ছিলো যে ৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিনের কাপড়কে একটি দেশলাই বাক্সে ভরে রাখা যেতো। অ্যা স্কেচ অফ দ্য টপোগ্রাফি এন্ড স্ট্যাটিস্টিকস অফ ঢাকা বইয়ে মসলিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে জেমস টেলর লেখেন,
মসলিন তৈরি হতো মূলত ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে। মসলিন তৈরির জন্য শীতলক্ষ্যার পাড়ের আবহাওয়া ছিলো সবচেয়ে উপযুক্ত। মসলিনে সুতা এতই সূক্ষ্ম ছিলো যে সকাল কিংবা সন্ধ্যাবেলার শীতল আর স্নিগ্ধ পরিবেশ ছাড়া এই সুতা কাটাই যেতো না। মূলত ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় উৎপন্ন তুলা থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সুতা তৈরি করে তা দিয়েই বোনা হতো মসলিন। আর কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে সূক্ষ্মতা আর দক্ষতা ফুটিয়ে তোলার যে জ্ঞান সেটা তাঁতিরা অর্জন করতেন অনেকটা বংশানুক্রমেই। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ঢাকায় পা রাখা একাধিক পর্যটকের হাত ধরে মসলিন এর খ্যাতি পৌঁছে যায় চীন থেকে রোম অবধি। সেখানকার সম্রাট আর রাজা-বাদশাদের উপঢৌকন হিসেবে সীমিত আকারে রপ্তানি হতে থাকে ঢাকাই মসলিন। একই ভাবে মসলিন এর উন্নত ও অনুন্নত কিছু সংস্করণ সে সময় ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে স্থানীয় অধিবাসীদের কাছেও। তবে ঢাকাই মসলিন তার খ্যাতি এবং মনোযোগের শীর্ষে পৌঁছায় মূলত মোঘল শাসনামলেই।
প্রাচীনকালে এই মহামূল্যবান কাপড় ভারতীয় উপমহাদেশে মলমল নামে পরিচিত ছিলো। আর বিদেশীরা এর নাম দিয়েছিলো মসলিন। চীনের পরিব্রাজক মা হুয়ান তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে ১৭ ধরনের ঢাকাই মসলিনের কথা লিখে গেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো খাসসা (ঘন বুননের মসলিন), আল্লাবালী (অতি সূক্ষ্ম মসলিন), শরবতী (শরবতের মতো স্বচ্ছ), নয়ন সুখ (মোটা মসলিন), দোরিয়া (ডোরাকাটা মসলিন), তেরিন ডাম (সাধারণ মসলিন), সিরবন্দ (পাগড়ি বাঁধার কাজে ব্যবহৃত হতো), বদন খাস (মিহি মসলিন) ইত্যাদি। মূলত সূক্ষ্মতা আর বুননের ভিত্তিতেই এসব নামকরণ।
এছাড়াও ছিলো ঝুনা, শবনম আর জামদানি মসলিন। ঝুনা মসলিন এতটাই সূক্ষ্ম ছিলো যে এটি পরলে মনেই হতো না যে কাপড় পরা হয়েছে। দেশীয় ধনীদের অন্তঃপুরের নারীরা ঝুনা মসলিন ব্যবহার করতেন। তাছাড়াও আমির, ওমরাহ ও স্থানীয় গণ্যমান্য লোকেরা গরমের দিনে ঝুনা মসলিন দিয়ে তৈরি জামা পরতেন। শবনম মসলিনও নিপুণতায় ঝুনা মসলিন থেকে কোনো অংশে কম ছিলো না। শবনম তৈরি করে সকালবেলায় ঘাসে শুকাতে দিলে শিশিরের থেকে আলাদা করে চেনা খুব কষ্টকর ছিলো।
দৈর্ঘ্যে বিশ গজ আর প্রস্থে এক গজ এক টুকরো শবনমের ওজন ছিলো বড়জোড় বিশ কি বাইশ তোলা! অন্যদিকে তাঁতেই যেসব মসলিনের নকশা করা হতো, তার নাম ছিলো জামদানি। দক্ষ কারিগরের হাতের নিপুণ শৈল্পিকতায় তৈরি এসব জামদানি মসলিনের চাহিদার আর দাম দুই-ই ছিলো চড়া। ধারণা করা হয়, এই জামদানি মসলিন থেকেই উত্তরাধুনিককালে জন্ম নিয়েছে ঢাকাই জামদানি।
মোঘল বংশীয় নবাব আর জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় মসলিন যেমন আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে, তেমনি ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেও বাড়তে থাকে এর গুরুত্ব। মলমল, ঝুনা, রঙ, খাসা, শবনম, আলাবালি, তানজিব, নয়নসুখ, কুমিস, ডুরি, চারকোনা, জামদানী প্রভৃতি হরেক মান আর হরেক নামে মসলিনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজোড়া। আর এই খ্যাতির টানেই বহু ইংরেজ বণিক ছুটে আসেন ঢাকাই মসলিনের কাছে। গবেষক বার্ড উড প্রমুখ পণ্ডিত গবেষণা করেছেন যে, ঢাকাই মসলিন প্রাচীন এশিরীয় ও ব্যাবিলনে বিশেষ খ্যাতিলাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। উইলফোর্ড মন্তব্য করেছেন—একটি ব্যাবিলিয়ন বস্ত্র ফিরিস্তিতে ঢাকাই মসলিনের উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার বিলাস-ব্যসনেও ঢাকাই মসলিন ব্যবহূত হতো। মিশরের প্রাচীন কবরে বাংলাদেশের নীলে রঞ্জিত ও মসলিনে জড়ানো মমির সন্ধান পাওয়া গেছে। ইয়েট বলেন—খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে ঢাকাই মসলিন গ্রিসে বিক্রি হতো।
ঢাকা, সোনারগাঁও, ধামরাই, জঙ্গলবাড়ি এবং বাজিতপুর এলাকার যেসব তাঁতিরা মসলিন কাপড় বুনতেন তারা টিকে থাকার স্বার্থে তাদের কাজের ধরণ পাল্টে ফেলেন। ফলে যুগ যুগ ধরে যে বংশানুক্রমিক ঐতিহ্য আর অভিজ্ঞতা মসলিনকে দিয়েছিল আকাশছোঁয়া খ্যাতি, সেই মসলিন বুননের জ্ঞানও হারিয়ে যায় কালের গর্ভে। মানের অবনমনের পাশাপাশি সুক্ষ তন্তুজাত এই শাড়ি সংরণের অভাবে হারিয়ে যায় ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকেও।
নানা জাতের নানা মানের মসলিন: মসলিনের পার্থক্য করা হতো সূক্ষ্মতা, বুননশৈলী আর নকশার ওপর ভিত্তি করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র বিভিন্ন প্রকার নামে পরিচিতি লাভ করে। যেমন:
মলবুস খাস: ‘মলবুস খাস’ মানে হলো খাস বস্ত্র বা আসল কাপড়। এ জাতীয় মসলিন সবচেয়ে সেরা আর এগুলো তৈরি হতো সম্রাটদের জন্য। আঠারো শতকের শেষদিকে মলবুস খাসের মতো আরেক প্রকারের উঁচুমানের মসলিন তৈরি হতো, যার নাম ‘মলমল খাস‘। এগুলো লম্বায় ১০ গজ, প্রস্থে ১ গজ, আর ওজন হতো ৬-৭ তোলা। ছোট্ট একটা আংটির মধ্যে দিয়ে এ কাপড় নাড়াচাড়া করা যেত। এগুলো সাধারণত রপ্তানি করা হতো। ১৮৫১ সালে বিলাতের বিখ্যাত প্রদর্শনীতে এ জাতীয় যে মসলিনখানি প্রদর্শন করা হয়েছিল তার ওজন ছিল মাত্র আট তোলা। আঠারো শতকে মোঘল বাদশার জন্য তৈরি মলবুস খাস ছাড়াও অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম ও কম মিহি নানা রকমের মলমল খাস তৈরি হতো। সেগুলো দামেও অনেক সস্তা ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক মলমল খাস, ফাইন, সুপার ফাইন, সুপার ফাইন লঙ্গ ইত্যাদি নামে বিভক্ত ছিল। সবচেয়ে সেরা মসলিন ছিলো মলবুল খাস। মলবুল খাসের আভিজাত্য আর নিপুণতা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো অন্যসব মসলিনকে। মোঘল সুলতান ও তাঁর পরিবার থেকে শুরু করে সরকার-ই-আলা, বাংলার নবাব সুবেদারদের মতো উচ্চপর্যায়ের মানুষদেরই কেবল এই মলবুল খাস ব্যবহারের অধিকার ছিলো।
সরকার-ই-আলা: এ মসলিনও মলবুল খাসের মতোই উঁচুমানের ছিল। বাংলার নবাব বা সুবাদারদের জন্য তৈরি হতো এই মসলিন। সরকার-ই-আলা নামের জায়গা থেকে পাওয়া খাজনা দিয়ে এর দাম শোধ করা হতে বলে এর এ রকম নামকরণ করা হয়। এগুলো লম্বায় হতো ১০ গজ চওড়ায় ১ গজ আর ওজন হতো প্রায় ১০ তোলা।
ঝুনা: জেমস টেইলরের মতে, ‘ঝুনা’ শব্দটি এসেছে হিন্দি ‘ঝিনা’ থেকে, যার অর্থ হলো সূক্ষ্ম। ঝুনা মসলিন এত সুক্ষ্ম ছিল যে, এ কাপড় পরিধান করলেও দেহ নগ্নপ্রায় থাকত এবং কমসংখ্যক সুতা ব্যবহার হওয়ায় একে একটি সূক্ষ্ম জালের মতো দেখাত। একেক টুকরা ঝুনা মসলিন লম্বায় ২০ গজ, প্রস্থে ১ গজ হতো। ওজন হতো মাত্র ২০ তোলা। এই মসলিন বিদেশে রপ্তানি করা হতো না, বরং পাঠানো হতো মোঘল রাজদরবারে। সেখানে দরবার বা হারেমের মহিলারা গরমকালে এ মসলিনের তৈরি জামা গায়ে দিতেন।
আব-ই-রওয়ান: আব-ই-রওয়ান ফারসি শব্দ, অর্থ প্রবাহিত পানি। এইমসলিনের সূক্ষ্মতা বোঝাতে প্রবাহিত পানির মতো টলটলে উপমা থেকে এর এই নাম দেওয়া হয়। এগুলো লম্বায় হতো ২০ গজ, চওড়ায় ১ গজ, আর ওজন হতো ২০ তোলা। আব-ই-রওয়ান সম্পর্কে প্রচলিত গল্পগুলোর সত্যতা নিরূপণ করা না গেলেও উদাহরণ হিসেবে বেশ চমৎকার। যেমন: একবার সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে তাঁর মেয়ে উপস্থিত হলে তিনি মেয়ের প্রতি রাগান্বিত হয়ে বললেন, ‘তোমার কি কাপড়ের অভাব নাকি?’ তখন মেয়ে আশ্চর্য হয়ে জানায় যে, সে আব-ই-রওয়ানের তৈরি সাতটি জামা গায়ে দিয়ে আছে। অন্য আরেকটি গল্পে জানা যায়, নবাব আলীবর্দী খান বাংলার সুবাদার থাকাকালে তাঁর জন্য তৈরি এক টুকরো আব-ই-রওয়ান ঘাসের ওপর শুকোতে দিলে একটি গরু ঘাস আর কাপড়ের পার্থক্য করতে না পেরে কাপড়টা খেয়ে ফেলে। এর খেসারতস্বরূপ আলীবর্দী খান ঐ চাষিকে ঢাকা থেকে বের করে দেন।
খা’সসা: খা’সসা ফারসি শব্দ। এই মসলিন ছিল মিহি আর সূক্ষ্ম, অবশ্য বুনন ছিল ঘন। এর প্রথম পরিচয় পাওয়া যায় আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরীতে। ঐ সময় সোনারগাঁও খা’সসার জন্য বিখ্যাত ছিল। ১৮-১৯ শতকে আবার জঙ্গলবাড়ি বিখ্যাত ছিল এ মসলিনের জন্য। তখন একে ‘জঙ্গল খা’সসা‘ বলা হতো। অবশ্য ইংরেজরা একে বিকৃত করে ‘কুষা’ বলে ডাকত।
শবনম: ‘শবনম’ শব্দের অর্থ হলো ভোরের শিশির। ভোরে শবনম মসলিন শিশির ভেজা ঘাসে শুকাতে দেওয়া হলে শবনম দেখাই যেত না, এতটাই মিহি আর সূক্ষ্ম ছিল এই মসলিন। ২০ গজ লম্বা আর ১ গজ প্রস্থের শবনমের ওজন হতো ২০ থেকে ২২ তোলা।
নয়ন-সুখ: মসলিনের একমাত্র এই নামটিই বাংলায়। সাধারণত গলাবন্ধ রুমাল হিসেবে এর ব্যবহার হতো। এ জাতীয় মসলিনও ২০ গজ লম্বা আর ১ গজ চওড়া হতো।
বদন-খাস: এ জাতীয় মসলিনের নাম থেকে ধারণা করা হয় সম্ভবত শুধু জামা তৈরিতে এ মসলিন ব্যবহৃত হতো। কারণ, ‘বদন’ মানে শরীর। এর বুনন ঘন হতো না। এগুলো ২৪ গজ লম্বা আর দেড় গজ চওড়া হতো, ওজন হতো ৩০ তোলা।
সরবন্ধ: ফারসি শব্দ সরবন্ধ মানে হলো মাথা বাঁধা। প্রাচীন বাংলার উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা মাথায় পাগড়ি বাঁধতেন, যাতে ব্যবহৃত হতো সরবন্ধ। লম্বায় ২০-২৪ গজ আর চওড়ায় আধা থেকে এক গজ হতো; ওজন হতো ৩০ তোলা। ইংরেজ কোম্পানি সরবন্ধ মসলিন বহুল পরিমাণে ইংল্যান্ডে রপ্তানি করত এবং ইংল্যান্ডের মেয়েরা সরবন্ধ দ্বারা জামা, রুমাল বা স্কার্ফ তৈরি করে ব্যবহার করত।
ডোরিয়া: ডোরা কাটা মসলিন ‘ডোরিয়া’ বলে পরিচিত ছিল। লম্বায় ১০-১২ গজ আর চওড়ায় ১ গজ হতো। শিশুদের জামা তৈরি করে দেওয়া হতো ডোরিয়া দিয়ে।
জামদানি: বর্তমানে বাংলাদেশে জামদানি নামে একপ্রকার পাতলা কাপড়ের শাড়ি পাওয়া যায়। তবে আগেকার যুগে ‘জামদানি’ বলতে বোঝানো হতো নকশা করা মসলিনকে। এ ছাড়াও আরো বিভিন্ন প্রকারের মসলিন ছিল।যেমন, ‘রঙ্গ’, ‘আলিবালি’, ‘তরাদ্দাম’, ‘তনজেব’, ‘সরবুটি’, ‘চারকোনা’ ইত্যাদি। ওপরে নানা প্রকার মসলিনের যে বর্ণনা দেওয়া হলো তা জেমস টেইলরের রচনা অবলম্বনে ইতিহাসবিদ আব্দুল করিম তাঁর ঢাকাই মসলিন গ্রন্থে উদ্ধৃত করেন। এ ছাড়াও তিনি উল্লেখ করেন যে, সমসাময়িক লেখকদের (যেমন: জেমস টেলর, বোল্ট, জন টেলর প্রমুখ) বিবরণের অভাবে প্রকৃতপক্ষে মোঘল আমলে মসলিন কত সুক্ষ্ম ও মিহি ছিল তার কোনো সঠিক ও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। ইংরেজ ইতিহাসবিদদের লেখাতে এ বিষয়ে কিছু মতামত পাওয়া গেলেও সেগুলো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য। নয়। কারণ, তাদের কেউই মোঘল আমলের স্বর্ণযুগ দেখেনি। এ ছাড়াও তাদের মাঝে পরস্পরবিরোধী অসংখ্য মতানৈক্যের ছড়াছড়ি লক্ষণীয়। তারা এমন সময় বাংলায় আসেন যখন বাংলায় মসলিন শিল্প বিলুপ্তির পথে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তৈরি অর্ধ টুকরা (১০ গজ × ০১ গজ) একখানি মসলিন ১৮৫১ সালে বিলেতের প্রদর্শনীতে প্রদর্শন করা হয়েছিল। এর ওজন ছিল আট তোলা। পাশাপাশি, ঢাকা জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত মসলিনখানির দৈর্ঘ্যও ১০ গজ এবং চওড়া ১ গজ, এর ওজন মাত্র ৭ তোলা। তাহলে ঢাকার মসলিন মোঘল শিল্পের স্বর্ণযুগে যে আরো সূক্ষ্মভাবে তৈরি করা যেত, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়।
রাজধানী ঢাকার ইতিহাস চারশত বছরের বেশি পুরনো নয়। ১৬১০ সালে সুলতান জাহাঙ্গীরের সময় ইসলাম খান চিশতী রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করলে ঢাকা ইতিহাসের প্রসিদ্ধি লাভ করে। কিন্তু, ঢাকার ইতিহাস বেশি পুরনো না হলেও মসলিনের ইতিহাস অনেকটা পুরনো ও দীর্ঘ। স্মরণাতীত বাংলায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়।প্রথম খ্রিষ্টাব্দের প্রথম শতকেই রোম সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে অভিজাত রোমান নারীরা ঢাকার মসলিন পরে দেহসৌষ্ঠব প্রদর্শন করতে ভালোবাসতেন।
একই শতকে রচিত পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সি শীর্ষক গ্রন্থে মসলিন সম্পর্কে বিশেষ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। এতে মোটা ধরনের মসলিনকে মলোচিনা, প্রশস্ত ও মসৃণ মসলিনকে মোনাচি এবং সর্বোৎকৃষ্ট মসলিনকে গেনজেটিক বা গঙ্গাজলী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নবম শতকে রচিত আরব ভৌগোলিক সোলাইমানের সিলসিলাত উত তাওয়ারীখ-এ ‘রুমি’ নামক একটি রাজ্যের বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে এমন সূক্ষ্ম ও মিহি সুতি বস্ত্র পাওয়া যেত যা, ৪০ হাত লম্বা ও ২ হাত চাওড়া। এক টুকরো কাপড় আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে নাড়াচড়া করা যেত। তৎকালীন এই বস্ত্র তিনি সেখানে ব্যতীত আর কোথাও দেখেননি। আর এই রুমি রাজ্যকে বাংলাদেশের সাথে অভিন্ন ধরা হয়। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলায় আগত মরক্কো দেশীয় পর্যটক ইবনে বতুতা তার কিতাবুর রেহালায় সোনারগাঁওয়ে তৈরি সুতি বস্ত্রের বিশেষ প্রশংসা করেন। পঞ্চদশ শতকে বাংলাদেশে আসা চীনা লেখকরাও এখানকার সুতি বস্ত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেন। মোঘল সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল ফজলও সোনারগাঁওয়ে প্রস্তুতকৃত এই সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্রের প্রশংসা করতে ভোলেনন।
সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে ঢাকাকে বাংলার রাজধানী ঘোষণার পর হতেই ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা বাংলায় আসা শুরু করেন। এ সকল বণিক কোম্পানিগুলোর তৎকালীন দলিল-দস্তাবেজ এবং ঐ সমকালীন ইউরোপীয় লেখকদের বিবরণে মসলিন সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজরা উপমহাদেশের ক্ষমতাকে তাদের হাতে কুক্ষিগত করে ফেললে আস্তে আস্তে মসলিন বাংলার বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া শুরু করে এবং একসময় হারিয়ে যায়।
তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় তৎকালীন বস্ত্রশিল্প ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে ব্যাপক উন্নতি সাধন করে। ফলে শুধু দেশেই নয়, বরং বিদেশের বাজারেও ঢাকাই মসলিন একচেটিয়া অধিকার বিস্তার করতে সমর্থ হয়। পরবর্তীতে ১৭৭২ সালের এক হিসাব থেকে দেখা যায় যে, ওই বছর সম্রাটকে পাঠানো হয় এক লক্ষ টাকার ‘মলবুস খাস’ আর বাংলার নবাবকে পাঠানো হয় তিন লক্ষ টাকার ‘সরকার-ই-আলা’। ওলন্দাজ ব্যবসায়ীরা ইউরোপে রপ্তানির জন্য ১৭৮৭ সালে এক লক্ষ টাকার মসলিন রপ্তানি করে। ইংরেজ কোম্পানি ওই বছর সংগ্রহ করে তিন লাখ টাকার মসলিন।
১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধের পর ইংরেজরা যখন বাংলার কর্তা হয়ে ওঠে, তখন তারা বছরে আট লাখ টাকার মসলিন রপ্তানি করত। সেই সময়ে ফরাসিরা কিনেছিল প্রায় তিন লাখ টাকার মসলিন। এরা ছাড়াও ইরানি, তুরানি, মুর, মোঘল, পাঠান, আর্মেনীয়দের পাশাপাশি দেশি ব্যবসায়ীরাও এ নিয়ে ব্যবসা করতেন। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, সে আমলে ঢাকা আর বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির জন্য কেনা হয়েছিল প্রায় উনত্রিশ কোটি টাকার মসলিন। এ কারণেই ইতিহাসবিদ আব্দুল করিম মসলিনকে তার সময়কালের অন্যতম ‘শ্রেষ্ঠ অত্যাশ্চর্য পণ্য’ হিসেবে গণ্য করেছেন। আর এক্ষেত্রে তিনি যে অতিরঞ্জিত করে বলেননি, সেটাও তিনি ঢাকাই মসলিন গ্রন্থে দেখিয়েছেন। ১৭৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সের লেখক Abbe de Guyon-ও এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন যে, ফ্রান্সে যেসব চিকন কাজ করা মসলিন দেখা যায়, তা সবই ঢাকা থেকে আমদানিকৃত। মসলিনের প্রশংসায় জেমস টেলর বলেন, যদিও শত শত বছর ধরে পাক-ভারতীয় তাঁতিরা কাপড় প্রস্তুত করে দেশ-বিদেশে প্রসিদ্ধি লাভকরেছে, তবে ঢাকার মসলিনের মতো এরূপ সূক্ষ্ম ও মিহি সুতি বস্ত্র পৃথিবীর অন্য কোথাও তৈরি হয়নি।
মসলিনভুক্ত অঞ্চলসমূহ: যুগে যুগে ঢাকার মানচিত্রে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ১৬ শতকের মানচিত্র আর এখনকার মানচিত্রে রয়েছে আকাশপাতাল তফাত। সর্বপ্রথম ‘ঢাকা’ নামের উল্লেখ পাওয়া যায় ১৫৫০ সালে অঙ্কিত দ্যা ব্যারস (Joao de Barros)-এর মানচিত্রে। এর পর উল্লেখ পাওয়া যায় আবুল ফজলের আইনি আকবরীতে। তৎকালীন সুবা বাংলার ১৯টি সরকার এবং প্রত্যেকটি সরকারের কয়েকটি মহল বা পরগনার কথা আমরা এই আইনে আকবরীর মাধ্যমেই জানতে পারি। পরবর্তীতে মুর্শিদ কুলি খান ১৭২২ সালে ১৯টি সরকারের বদলে নতুন করে সুবা বাংলাকে ১৩টি চাকলায় বিভক্ত করেন। এই ১৩টি চাকলার মধ্যে অন্যতম ছিল জাহাঙ্গীরনগর। যেটি ঢাকার আশেপাশে ময়মনসিংহসহ অনেকগুলো অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল। যেটাকে এখনকার সময়ের ঢাকা বিভাগ বলা যেতে পারে। আর ইংরেজ আমলে এসে এই চাকলা জাহাঙ্গীরনগরই ঢাকা প্রদেশ নামে সকলের কাছে পরিচিত লাভ করে। তৎকালীন বাংলাদেশের সব জেলাতে কম বেশি তাঁতশিল্পের উপস্থিতি থাকলেও ঢাকাকেন্দ্রিক ভূভাগই ছিল তাঁতশিল্পের জন্য বিখ্যাত।
ঊনবিংশ শতকের ঢাকা জেলার তাঁতশিল্প জেমস টেলর নিজের চোখে দেখেছেন। তার মতে,
‘ঢাকার প্রত্যেক গ্রামেই কম বেশি তাঁতের কাজ চলত। কিন্তু উৎকৃষ্ট ধরনের মসলিনের জন্য কয়েকটি স্থান বিশেষ করে প্রসিদ্ধ ছিল। এইগুলো হচ্ছে ঢাকা, সোনারগাঁও, ধামরাই, তিতাকাদি, জঙ্গলবাড়ী, বাজিতপুর ইত্যাদি। ‘
এদের মধ্যে প্রথম চারটি স্থানই বর্তমান ঢাকা জেলার মধ্যেই অবস্থিত। আর বাকি দুটির অবস্থান ময়মনসিংহ জেলায়। এই অঞ্চলগুলো মসলিনের জন্য প্রসিদ্ধ হওয়ার পেছনে ছিল দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, এই অঞ্চলগুলোর ভৌগোলিক উৎকর্ষতা, অঞ্চলগুলো ছিল অনেকটা নদীবিধৌত। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন অঞ্চলগুলো ছিল শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক পরিচর্যাকৃত আর। তাই মাটির উৎকর্ষতা, সাথে শাসকদের নেকদৃষ্টি, দুটোই এই অঞ্চলগুলোকে তাঁতশিল্পের জন্য উপযোগী করে তুলেছিল। এসব অঞ্চলে এক বিশেষ শ্রেণির তুলা উৎপন্ন হতো (যাকে কার্পাস বলা হতো)। সেই তুলা দিয়ে তৈরি হতো সূক্ষ্ম মসলিন। কিন্তু, দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকার তুলা উৎপন্ন হলেও সূক্ষ্ম মসলিনের তুলা আর কোথাও উৎপন্ন হতো না। এই তুলাকে বলা হতো ভোগা তুলা। যা দিয়ে মোটা বস্ত্র তৈরি হতো। তাঁতিদের থেকে মসলিন সংগ্রহ করার জন্য মোঘল সম্রাটের পক্ষ থেকে ঢাকাতে দারোগা-ই-মলবুস খাস নিযুক্ত থাকতেন।
এছাড়া, বাংলার নওয়াব কিংবা জগৎশেঠদের পক্ষ থেকেও কার্মচারী নিযুক্ত থাকত। এ সকল কর্মচারীরা মসলিন সংগ্রহ করে নিজ নিজ লক্ষ্যস্থানে পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু, মসলিন হাত বদল করে যখন ইউরোপিয়দের হাতে এসে পড়ল, তখন আর তার নিস্তার থাকল না। ঢাকার মসলিন নামক বৃক্ষটি এখানেই মুখ থুবড়ে পড়ে। ঔপনিবেশিক গোলামির প্রভাব ও তাদের চিন্তাধারা আজ আমাদের মন-মানসে প্রবেশ করার কারণে একসময়ের বিখ্যাত মসলিন আমাদের কাছে অনেকটা রূপকথার মতোই মনে হয়। মসলিনের আলোচনার ইতিহাসকে রুদ্ধ করে দিয়ে আমরা নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছি। অথচ,
মসলিন তৈরির ফর্মুলা: মসলিন তৈরির জন্য প্রয়োজন হতো বিশেষ প্রকারের সূক্ষ্ম সুতা। যা অন্য কোথাও থেকে আমদানি করা হতো না বরং, বাংলাদেশের মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীতীরবর্তী এলাকায় বয়রাতি ও ফুটি কার্পাসের আবাদ করা হতো। সেই গাছের তুলা থেকে পাওয়া যেত একধরনের বিশেষ সুতা। সেই সুতাকে আবার মিহি আর মসলিন তৈরির উপযুক্ত করে তোলার জন্য বোয়াল মাছের দাঁত আর বাঁশের ধনু দিয়ে পরিষ্কার করার পর চরকায় কাটা হতো। কারিগরেরা ধাপে ধাপে মসলিন বোনার প্রক্রিয়া মনে রাখার জন্য বিভিন্ন শ্লোক বা ছন্দ মনে রাখতেন।
জন টেলরের মতে, এই ভূভাগে উৎপাদিত ফুটি কার্পাস পৃথিবীর যেকোনো দেশে উৎপাদিত কার্পাস থেকে শ্রেয় ছিল। কার্পাস বীজ বছরে দুবার বপন করা হতো। প্রথমবার ফসল চয়ন করা হতো বসন্তকালে এবং দ্বিতীয়বার শরৎকালে। বসন্তকালে চয়ন করা ফসলই ছিল সর্বোৎকৃষ্ট। তাই, এ সময় ফসল অত্যধিক পরিমাণে চাষ করা হতো। যে জমিতে কার্পাসের চাষ করা হতো সেই একই জমিতে বর্ষাকালে ধানের চাষ করা হতো। ধান তোলার পরই কার্পাসের চাষ শুরু হতো। কোনো কোনো সময় একই জমিতে ২/৩ বছর কার্পাস উৎপাদনের পর এক বছর জমি ফেলে রাখা হতো, কিন্তু সাধারণত পালাক্রমে এসব জমিতে বিভিন্ন রকমের সবজির চাষ করা হতো যাতে জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস না পায়। ঢাকার ফুটি কার্পাস শুধু সূক্ষ্মতম মসলিনের জন্যই নির্ধারিত ছিল, তাই ক্রমবর্ধমান বস্ত্রশিল্পের উন্নতির ফলে মাঝে মাঝে পাক-ভারতের অন্যান্য এলাকা থেকেও কার্পাস আমদানি করতে হতো। তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হতো গুজরাট থেকে।
শুকনো বাতাস বইতে থাকলে সুতা কাটা সম্ভব নয়, সূক্ষ্ম সুতা কাটার জন্য বাতাসে আর্দ্রতা দরকার। তাই খুব ভোর থেকে শুরু করে সকালের রোদ উঠার আগে এবং বিকালে সূর্যাস্তের আগের সময়ে সুতা কাটার কাজটি করা হতো, এমন জনশ্রুতিও আছে আর্দ্র বাতাসের জন্য নদীতে ভাসমান নৌকায় সুতা কাটার কাজ করা হতো। সুতা কাটায় সূক্ষ্মতার জন্য দুটি গুণের দরকার ছিল, একটি প্রখর দৃষ্টিশক্তি, অন্যটি হাতের আঙ্গুলের প্রখর চেতনা শক্তি।
সুতা কাটার কাজ এতটাই কঠিন ছিল যে, সব বয়সী মেয়েরা এই কাজে পারদর্শী হতো না। শুধু প্রখর দৃষ্টিশক্তি ও শক্ত হাতের আঙুলের চেতনাশক্তিসম্পন্ন আধা-মাঝবয়সী মেয়েরাই এই কাজের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হতো। সাধারণত, ২০-৩০ বছরের মেয়েরাই এই সুতা কাটার কাটার কাজ করত। ১৮০০ সালে জন টেলর বলেছেন যে, ঐ রকম নিপুণ কাটুনির সংখ্যা খুব বেশি ছিল না; ঢাকায় মাত্র তিনজন, সোনারগাঁওয়ে ৬/৭ জন এবং জঙ্গলবাড়ি ও বাজিতপুরে প্রায় ২০ জন সূক্ষ্ম মসলিনের সুতা কাটার উপযুক্ত নিপুণ সুতা কাটুনি ছিল। কিন্তু, যেহেতু পরিবারের মেয়েরা পারিবারিক অন্যান্য কাজেও ব্যস্ত থাকত তাই সাধারণত, ঐ পরিমাণ সুতা কাটাও খুব কম মেয়েলোকের পক্ষে সম্ভব ছিল। এ থেকেই বোঝা যায় মসলিনের সুতা কত সূক্ষ্ম ছিল এবং তা কাটার জন্য কতখানি পরিশ্রমের প্রয়োজন ছিল।
এছাড়াও, সুতা মিহি করার ব্যাপারটা আসলে তিন আঙুলের জাদু। তিন আঙুলে কীভাবে তুলা ছাড়তে হবে, সেটাই আবিষ্কার করতে হয়েছে। আর নারীদের আঙুলেই এই সুতা সবচেয়ে মিহি হয়। তিনটি আঙুলকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় নরম করে রাখতে হয়। যদিও ঢাকাই মসলিনরে উৎকর্ষতা নির্ভর করত দেশজ কার্পাস সুতার কাটুনিদের ওপর, তবু তাঁতিদের অবদান কোনো অংশে কম ছিল না। উৎকৃষ্ট সুতা সংগ্রহ করে তাঁত থেকে কাপড় বের হওয়া পর্যন্ত আরও কয়েকটি স্তর আছে; এসব স্তরে কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করার পেছনে তাঁতিদের অপরিসীম দক্ষতার প্রয়োজন ছিল। এসব স্তর হচ্ছে,
১. সুতা নাটান,
২. টানা হোতান,
৩. সানা বাঁধা,
৪. নারদ বাঁধা,
৫. বু-বাঁধা এবং
৬. কাপড় বোনা।
এ স্তরগুলোর কাজ সম্পন্ন করা তাঁতিদের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। এক টুকরা মসলিন তৈরি করতে একজন তাঁতির সাথে আরো দুজন সহকারী মিলে ছয় মাসেরও বেশি সময় ব্যয় করতেন। পুরো বিষয়টাই আশ্চর্যজনক!
সাধারণত, মসলিনের বুনন কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর আরো বেশ কিছু পর্যায় অতিক্রমের পরেই মসলিন বাজারজাতকরণ হতো। যার মধ্যে ছিল, কাপড় ধোয়া, সুতা সুবিন্যস্ত করা ও রিপু করা এবং ইস্ত্রি, রং ও সুচের কাজ করা। সবশেষে আসত কাপড়ের গাইট বাঁধার পালা। একদল লোক কাপড়গুলো নিয়ে দুটো তক্তার মাঝখানে রেখে তক্তা দুখানি ভালো করে এঁটে বেঁধে কাপড়ের গাইট তৈরি করে দিত। এভাবে সকল প্রক্রিয়া শেষ করে তারা কাপড়গুলো কলকাতায় চালান দিত এবং সেখান থেকে ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা হতো।
প্রকৃতপক্ষে, মসলিন উৎপাদন ও বিপণনের জন্য প্রতিটি ধাপে আলাদা আলাদা পেশাজীবী ছিলেন। প্রতিটি পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি বা পেশাজীবী কাজগুলো সম্পন্ন করতেন। তাই মসলিন তৈরি ও বিপণন ছিল মূলত একধরনের সামাজিক পেশাজীবী কর্ম, যার প্রতিটি স্তরে দক্ষতার সুষম বিন্যাস ছিল।
ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে উনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয় ভাবে প্রস্তুত করা বস্ত্রের উপরে ৭০ হতে ৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, যেখানে ব্রিটেনে প্রস্তুত করা আমদানীকৃত কাপড়ের উপরে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ কর ছিলো। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁতশিল্পে ধ্বস নামে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা মসলিন উৎপাদন বন্ধ করার জন্য মসলিন বয়নকারী তাঁতীদের হাতের বুড়ো আঙুল কেটে নেয় বলে কথিত আছে।
এটা সবাই প্রায় এক বাক্যেই স্বীকার করেন যে সে আমলে ঢাকাই মসলিন এর মতো এতোটা খ্যাতি আর মান আর কোথাও ছিল না।
এই বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কথা বললে, ইতিহাসের কথা বললে মসলিনকে বাদ দেওয়ার কোনো উপায়ই যে নেই। তাই তো মসলিনের পুনর্জন্ম ঘটাতে ছয় বছর ধরে লেগে ছিলেন একদল গবেষক। অবশেষে তাঁরা সফলও হয়েছেন। কী বিচিত্র উপায়ে সংগ্রহ করা হলো মিহি মসলিনের উপাদানগুলো, তা একেকটা গল্পই বটে।
ঢাকাই মসলিনের শেষ প্রদর্শনী হয়েছিল লন্ডনে ১৮৫০ সালে। এর ১৭০ বছর পরে বাংলাদেশে আবার বোনা হলো সেই ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন কাপড়ের শাড়ি। ঠিক সে রকমই, যেমনটি বলা হতো—আংটির ভেতর দিয়ে গলে যায় আস্ত একটি শাড়ি। ইতিমধ্যেই ঢাকাই মসলিনের জিআই স্বত্বের অনুমোদন পাওয়া গেছে। ২৮ ডিসেম্বর এ–সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। তাই, ঢাকাই মসলিন তৈরির জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন একদল গবেষক। তাঁদেরই ছয় বছরের চেষ্টা আর গবেষণা ফল দিয়েছে। তৈরি করা হয়েছে মসলিনের ছয়টি শাড়ি। মসলিন বোনার সুতা যেই ফুটি কার্পাস তুলার গাছ থেকে তৈরি হয়, সেই গাছ খুঁজে বের করা হয়েছে বিচিত্র সব পন্থা অবলম্বন করে। যান্ত্রিক সভ্যতার এ যুগে এসেও এই শাড়ি তৈরিতে তাঁতিদের হাতে কাটা ৫০০ কাউন্টের সুতাই ব্যবহার করতে হয়েছে। কাপড়ও বোনা হয়েছে হস্তচালিত তাঁতেই। এই গাছ পূর্ব ভারত তথা বাংলাদেশে চাষ হতো একসময়। ইতোমধ্যে ১৭১০ সালে বোনা মসলিন শাড়ির নকশা দেখে হুবহু একটি শাড়ি আমাদের দেশের তাঁতিরা বুনেছেন। প্রথম শাড়িটি তৈরি করতে খরচ হয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
তথ্যসূত্র :
বাঙলানামা ১ম সংখ্যা – মসলিন: একটি হৃত শিল্পের সুলুকসন্ধান
https://bn.wikipedia.org/wiki/
https://archive.roar.media/bangla/main/history/moslin-of-dhaka-a-piece-of-nobility-and-tradition
