ইতিহাসের বহু সভ্যতায় বাগান ছিল স্বর্গের কল্পরূপ, আর সেই বাগানের ফুল শিল্পীর তুলিতে পেয়েছে এক অনন্ত জীবন। মুঘল ভারতেও ফুলের এই সৌন্দর্য শুধু রাজপ্রাসাদের বাগানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা ছড়িয়ে পড়েছিল পাণ্ডুলিপির পাতায়, অ্যালবামের অলংকরণে, স্থাপত্যের পাথরে এবং সুলতানদের নান্দনিক কল্পনায়।
পারস্যের বাগান-সংস্কৃতি, মাওয়ারাউন নাহারের ঐতিহ্য এবং ইউরোপীয় উদ্ভিদচিত্রের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, এই তিন ধারার মিলনে সপ্তদশ শতকের মুঘল দরবারে জন্ম নেয় ফুলচিত্রের এক স্বতন্ত্র ভাষা। জাহাঙ্গীরের প্রকৃতিপ্রেম, উস্তাদ মনসুরের অসাধারণ পর্যবেক্ষণক্ষমতা কিংবা শাহজাহানের যুগের নিখুঁত সামঞ্জস্যবোধ; সব মিলিয়ে ফুল সেখানে আর নিছক একটি উদ্ভিদ নয় বরং হয়ে ওঠে শিল্প, বিজ্ঞান, কবিতা ও রাজকীয় সংস্কৃতির মিলিত প্রতীক। সেই ফুলগুলোর জন্ম, বিবর্তন এবং শিল্প-ইতিহাসের দীর্ঘ যাত্রাই এই আলোচনার বিষয়।

চিত্র:১ টিউলিপ, দিল্লি, আনুমানিক ১১৮১/১৭৬৭–৬৮। শাহ আলম দ্বিতীয় অ্যালবাম (ইসলামি শিল্প জাদুঘর, বার্লিন)
‘Bagh-e Hind’ প্রদর্শনী যদি কোনো একটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরে থাকে, তা হলো ভারতীয় সংস্কৃতিতে ফুলের কেন্দ্রীয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা। উত্তর ভারতের প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ উদ্ভিদজগৎ এবং তার সঙ্গে গভীর সাহিত্যিক, কাব্যিক ও শিল্প ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ, সবকিছু মিলিয়ে মুঘল সুলতান দের মধ্যে ফুলের চিত্রায়ণের প্রতি আগ্রহ জন্ম নেওয়া ছিল কেবল সময়েরই অপেক্ষা মাত্র।
মুঘল বংশের চতুর্থ সুলতান জাহাঙ্গীরের (শাসনকাল: ১৬০৫–১৬২৭) আমলে চিত্রকলার এক নতুন ধারা উন্মোচিত হয়। এই ধারায় অলংকৃত প্রান্তসজ্জায় বেষ্টিত পূর্ণপাতাজুড়ে একক ফুলের প্রাকৃতিক রূপ অঙ্কিত হতে থাকে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও শিল্পধারার পারস্পরিক প্রভাব এবং মুঘল শিল্পীদের অসাধারণ দক্ষতার সংমিশ্রণে এই নতুন শিল্পরীতির বিকাশ ঘটে। সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।পরবর্তীতে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে আবারও এর পুনরুত্থান ঘটে। তবে ঊনবিংশ শতকের সূচনালগ্নে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পৃষ্ঠপোষকতায় চিত্রকলার ধারা আমূল পরিবর্তিত হলে এই শিল্পরীতিরও অবসান ঘটতে শুরু করে। এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে ভারত, পারস্য ও ইউরোপের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে মুঘল পুষ্পচিত্রকলার উন্মেষ ও বিকাশের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
‘প্যাচওয়ার্ক’ অ্যালবাম, উদ্যান এবং পারস্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য:
মুঘল পুষ্পচিত্রকলা বোঝার জন্য প্রথমে ধারণা নেওয়া প্রয়োজন এর বিন্যাস ও মাধ্যম সম্পর্কে। যেহেতু এই তিনটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ সম্পুর্ণ পুষ্প (ফুল) শূন্য পটে আঁকা হতো। ছবিটি একটি কাগজে এঁকে তা শক্ত কাগজের পাতার ওপর সাঁটা হতো এবং চারদিকে রঙিন অলংকৃত বর্ডার ও মার্জিন দিয়ে সাজানো হতো।
এ ধরনের পাতাগুলো সাধারণত চিত্রকর্ম ও ক্যালিগ্রাফি একত্র করে তৈরি বিশেষ অ্যালবামে সংকলিত হতো, যেগুলো ভাঁজযুক্ত মলাটে সেলাই করে বাঁধানো থাকত। এই ধরনের সংকলন, যা ‘মুরাক্কা’ নামে পরিচিত সর্বপ্রথম জনপ্রিয়তা লাভ করে বিজেতা তৈমুরের বংশধর তৈমুরীয় রাজবংশের (১৩৭০–১৫০৭) পৃষ্ঠপোষকতায়। মুরাক্কা শব্দটির উৎপত্তি হয় সুফিদের পরিধেয় জোড়াতালি দেওয়া পোশাক থেকে। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘প্যাচওয়ার্ক’ বা ‘জোড়াতালি’। এর মাধ্যমে এমন এক শিল্পভাবনার প্রকাশ ঘটে, যেখানে বিচিত্র উপাদানকে একটি সুশৃঙ্খল অথচ নমনীয় বিন্যাসে একত্রিত করা হয়, যেটি প্রয়োজনে সহজেই সম্প্রসারিত বা সংক্ষিপ্ত করা যায়।
১৫০১ থেকে ১৭২২ সাল পর্যন্ত পারস্য শাসনকারী সাফাভি রাজবংশের আমলে এই ধরনের অ্যালবামের জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিল অ্যালবামের সূচনায় একটি মুখবন্ধ, যেখানে অ্যালবামটি কীভাবে নির্মিত হয়েছে তা বর্ণনার পাশাপাশি পারস্য চিত্রকলার ঐতিহাসিক ধারার মধ্যেও তাকে স্থান দেওয়া হতো। দৈর্ঘ্যে ভিন্ন হলেও বিষয়বস্তুর দিক থেকে এই মুখবন্ধগুলো ছিল প্রায় একই ধরনের। সমৃদ্ধ কাব্যিক রূপকের মাধ্যমে এই মুখবন্দগুলো অ্যালবামের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও নান্দনিক ধারণা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করত।
১৫৬০ সালে মালিক দাইলামি আমির হুসাইন বেগের অ্যালবামের মুখবন্ধে প্রতিটি পাতাকে পারস্যের ঐতিহ্যবাহী চাহার বাগ অর্থাৎ চারবাগ উদ্যানের একটি অংশের সঙ্গে তুলনা করে লিখেছিলেন,
“অ্যালবামের প্রতিটি পাতা যেন একেকটি সুসজ্জিত উদ্যান। সেখানে সবুজের পরিবর্তে রয়েছে অ্যাম্বারগ্রিস রঙের অঙ্কন, আর আনন্দবর্ধক ফুলের স্থানে রয়েছে নকশা ও অলংকরণ। চারপাশের রেখাগুলো যেন প্রবাহমান ঝরনা ও খাল, যেখানে সবুজ আর ফুলের প্রতিবিম্বে সোনা, রক্তিম ও সবুজাভ রঙের রঙ্ধনু ফুটে উঠেছে। প্রান্তসজ্জায় অঙ্কিত পাখি ও বৃক্ষ যেন সুমধুর কণ্ঠের বুলবুলি ও গর্বিত তিতির, আর মনোমুগ্ধকর ছবিগুলো যেন সেই উদ্যানে বিচরণরত রূপবান তরুণ ও আনন্দদায়ী সঙ্গী।”
কৃষিবিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী, চাহার বাগ ছিল চারদিকে প্রাচীরঘেরা এক ধরণের উদ্যান, যা সাধারণত চারটি জলধারার মাধ্যমে বিভিন্ন সোপানে বিভক্ত থাকত। সেখানে ফুল ও ফলের গাছ লাগানো হতো এমনভাবে যাতে বছরের বিভিন্ন সময়ে একটির পর একটি ফুল ফোটে এবং উদ্যানটি সবসময় প্রস্ফুটিত থাকে।
ঐতিহ্যবাহী পারস্য উদ্যানের প্রধান ফুলগুলোর মধ্যে ছিল আইরিস, গোলাপ, পট মেরিগোল্ড, টিউলিপ, জুঁই এবং বেগুনি ফুল। এই প্রতিটি ফুল পারস্যের কবিতায়, অ্যালবামের মুখবন্ধে এবং পরবর্তীকালে সপ্তদশ শতাব্দীতে পারস্য ও মুঘল চিত্রকলায়, এমনকি অ্যালবামের অলংকৃত প্রান্তসজ্জাতেও ব্যাপকভাবে স্থান পেতে শুরু করে।

চিত্র:২ মুঘল চাহারবাগ বাবুরনামা ১৫৯০ খ্রি: (আনুমানিক) জাতীয় জাদুঘর,দিল্লি।
মুখবন্ধের বাইরেও পুরো অ্যালবামটিকে একটি বদ্ধ উদ্যানের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে রাজকীয় উৎসব ও প্রণয়ঘন সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হতো। অ্যালবামের বাঁধানো মলাট তার ভেতরের বিষয়বস্তুকে বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখত এবং কবিতা ও ধ্যানমগ্নতার একান্ত এক জগৎ উন্মোচিত করত। পাতার কেন্দ্রে থাকা নাম পরিচয়হীন প্রতিকৃতি, পানপাত্র বহনকারী যুবক এবং তরুণীরা মালিক দাইলামির বর্ণিত সেই রূপবান তরুণ ও আনন্দদায়ী সঙ্গীদের কথাই চোখের সামনে স্মরণ করিয়ে দিত। আর ফুলেল প্রান্তসজ্জাগুলো হয়ে উঠত এসব উদ্যানের পুষ্পশোভিত পথের প্রতিরূপ, যেখানে ফুটে থাকা ফুলের প্রতিটি প্রজাতিই কবিতায় বিকশিত নিজস্ব প্রতীকী অর্থ বহন করত।

চিত্র ৩ : উদ্যানে তরুণেরা, বুখারা, সপ্তদশ শতাব্দী। দারা শিকোহ অ্যালবাম।
(ব্রিটিশ লাইব্রেরি)
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে এর সঙ্গে মুঘল সুলতান দের সম্পর্ক কোথায়? সম্পর্কটি দ্বিমুখী,সাংস্কৃতিক ও বস্তুগত।
সাংস্কৃতিক দিক থেকে দেখলে, মুঘল রাজবংশের সদস্যরা ছিলেন তৈমুরের বংশধর, আর এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাবর ছিলেন সেই বিজেতার প্রপৌত্র। মুঘল সুলতানদের সঙ্গে মাওয়ারাউন নাহারের আদি উৎসের এই সম্পর্ক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অটুট ছিল। এর একটি উদাহরণ হলো, দাপ্তরিক চিত্র ও প্রতিকৃতিতে তাদের বংশপরিচয়ের উল্লেখ করা।

চিত্র ৪ : তৈমুরকে ঘিরে তার মুঘল উত্তরসূরিরা।
(ব্রিটিশ লাইব্রেরি)
মুঘল রাজবংশের পারস্য প্রভাবিত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ ঘটে ১৫৩০ সালে। সে সময় দ্বিতীয় মুঘল সুলতান হুমায়ূন তার পিতা বাবরের বিজিত অঞ্চলগুলো শের শাহ সূরির কাছে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন এবং শেষ পর্যন্ত সাফাভি সুলতান শাহ তামাস্পের দরবারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
১৫৪৫ থেকে ১৫৫৫ সাল পর্যন্ত হুমায়ূন সাফাভি পারস্যে নির্বাসিত অবস্থায় ছিলেন। এই সময় তিনি তার তৈমুরীয় পূর্বপুরুষদের তৈরি অসংখ্য পাণ্ডুলিপি ও অ্যালবাম দেখার সুযোগ পান। অবশেষে যখন তিনি হারানো অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী একটি সেনাবাহিনী নিয়ে কাবুল থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন, তখন তার সঙ্গে ছিল বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি ও অ্যালবাম। সেই সঙ্গে তিনি নিয়ে আসেন পারস্যের চিত্রশিল্পী, ক্যালিগ্রাফার ও পুস্তক নির্মাতাদেরও। তাঁরা ১৫৫৫ সালে আগ্রায় রাজকীয় কর্মশালায় যোগ দেন এবং মুঘলদের স্বতন্ত্র দৃশ্যশিল্পের পরিচয় গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ।
এরই ধারাবাহিকতায় তৈমুরীয় আদর্শ থেকে বিকশিত হয়ে অ্যালবাম তৈরির একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক শিল্পধারা গড়ে ওঠে। আর এই ধারাই চিত্রকলার এক সম্পূর্ণ নতুন ধারা ‘পুষ্পচিত্রকলার’ বিকাশে সহায়তা করে।
মুঘল ভারতে আদ্রিয়ান কোলার্ট: ইউরোপীয় উদ্ভিদবিষয়ক খোদাইচিত্রের অনুকরণ,রুপান্তর ও আত্মীকরণ
পুষ্পচিত্রকলার বিকাশ অ্যালবামের সঙ্গে যেমন সম্পর্কিত, তেমনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ইউরোপীয় উদ্ভিদবিষয়ক মুদ্রিত চিত্রও। ষোড়শ শতকের শেষভাগ কিংবা সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে ভারতীয় চিত্রশিল্পীরা এই ইউরোপীয় উদ্ভিদচিত্রের সঙ্গে পরিচিত হন, যা তাদের জন্য ছিল বাইরে থেকে আসা নতুন অনুপ্রেরণার উৎস।

চিত্র ৫ : লিলি ফুল, Florilegium ab Hadriaeno Collaert coelatum et a Philip Galleo editum, অ্যান্টওয়ার্প, ১৫৮৭, প্লেট ৬।
(নিউ ইয়র্ক বোটানিক্যাল গার্ডেন)
বিভিন্ন প্রজাতির লিলি ফুলের এই খোদাইচিত্রটি ১৫৮৭ সালে অ্যান্টওয়ার্পে প্লাঁতাঁ কর্তৃক প্রকাশিত Florilehium ab Hadriaeno Collaert at a phillip Galleo editum গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে । ২৪টি প্লেটের এই ছোট গ্রন্থটিতে থাকা লিলিসহ অন্যান্য ফুলের চিত্রগুলো সাফাভি পারস্য এবং মুঘল ভারতে অভূতপূর্ব প্রভাব ফেলেছিল। সেখানকার চিত্রশিল্পী ও কারুশিল্পীরা এসব চিত্রকে নিজেদের শিল্পকর্মের আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন।

চিত্র ৬ : লিলি ফুল, স্বাক্ষর: মনসুর, আনুমানিক ১৬১০।
সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে চিত্রশিল্পী মনসুর এই রঙিন অনুকৃতিটি তৈরি করেন। কোলার্টের Florilegium প্রকাশিত হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এটি আঁকা হয়েছিল। চিত্রটি ইউরোপীয় কোনো মুদ্রিত চিত্রের আদলে তৈরি ভারতীয় পুষ্পচিত্রগুলোর মধ্যে টিকে থাকা প্রাচীনতম নিদর্শনগুলোর একটি।
মনসুরের কর্মজীবন সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। সুলতান আকবরের (শাসনকাল: ১৫৫৬–১৬০৫) জন্য আনুমানিক ১৫৯০ এর দশকের শেষদিকে তৈরি একটি বাবুরনামা তে প্রথম তার নামের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং এরপর আরও কয়েকটি রাজকীয় পাণ্ডুলিপিতেও তার নাম দেখা যায়। ১৬১৯ সালের পূর্বে এক সময় জাহাঙ্গীর তার অসাধারণ প্রতিভার স্বীকৃতি এবং নিজের বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন হিসেবে তাঁকে “যুগের বিস্ময়” (নাদির আল আসর) উপাধি দেন। প্রাণী ও উদ্ভিদের চিত্রায়ণে মনসুর বিশেষ দক্ষ ছিলেন। জাহাঙ্গীর একাধিকবার তাঁকে নিজের পশুপাখির সংগ্রহশালার বিরল পাখি ও বিচিত্র প্রাণীদের চিত্র এঁকে চিরস্থায়ী করে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কোলার্টের লিলি ফুলের এই অনুকৃতিচিত্রটি আনুমানিক ১৬১০ সালের বলে ধারণা করা হয় এবং ইউরোপীয় আদর্শের ভিত্তিতে ফুলের প্রকৃতিনিষ্ঠ চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে মনসুরের প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। তারিখটি সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় না তবে সম্ভবত তিনি এই খোদাইচিত্রটি ব্যবহার করেছিলেন তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন এক চিত্রশৈলীর অনুশীলন করার জন্য। পুরোনো শিল্পীদের সৃষ্টিকর্ম অনুকরণ করা তরুণ শিল্পীদের শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথা ছিল। তবে তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হতো, অনুকরণের মধ্যেও নিজেদের সৃজনশীলতার ছাপ যুক্ত করবেন। ফলে এমন এক শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতো, যা দর্শকের কাছে পরিচিত মনে হলেও মূলত ছিল সম্পূর্ণ নতুন।
কোলার্টের নকশায় নিজের কল্পিত রং যোগ করে মনসুর প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি মূল চিত্রের আদল যথাযথভাবে পুনর্নির্মাণ করার পাশাপাশি তাতে নিজের সৃজনশীল ও অভিনব বৈশিষ্ট্যও যুক্ত করতে সক্ষম ছিলেন।
১৬২১ সালের বসন্তে জাহাঙ্গীর তার দরবারসহ কাশ্মীরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন,
“কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন তৃণভূমিতে দেখা ফুলের কোনো হিসাব নেই। চিত্রশিল্পী উস্তাদ নাদিরুল আসর মনসুর যেসব ফুল এঁকেছেন, সেগুলোর সংখ্যাই একশোরও বেশি।”
এই একশোরও বেশি ফুলের কোনোটিকেই নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়বস্তু ও উৎকর্ষের কারণে একটি চিত্রকে সাধারণত এই বিপুলসংখ্যক ফুলের চিত্রায়ণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

চিত্র ৭ : টিউলিপ, স্বাক্ষর: মনসুর, আনুমানিক ১৬২১।
(আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়)
এই টিউলিপটি শিল্প-ইতিহাসবিদ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয়বস্তু। মূল প্রশ্ন হলো, এখানে কোন প্রজাতির টিউলিপ অঙ্কিত হয়েছে এবং এটি কাশ্মীরের স্থানীয় উদ্ভিদ কি না। কারণ এটি যদি কাশ্মীরের স্থানীয় প্রজাতি হয়ে থাকে, তাহলে প্রমাণিত হবে যে চিত্রটি সত্যিই জাহাঙ্গীরের কাশ্মীর ভ্রমণের সময় আঁকা হয়েছিল।
টিউলিপটি কাশ্মীরের স্থানীয় হোক বা না হোক, মনসুর যে গাছটি সরাসরি প্রকৃতি থেকে দেখে এঁকেছিলেন, তা মনে হয় না। প্রকৃতপক্ষে, এই ফুলটি ইউরোপীয় উদ্ভিদবিষয়ক চিত্রায়ণের রীতি অনুসরণ করে অঙ্কিত হয়েছে বিশেষ করে ফুল ফোটার পর্যায়টি। বিভিন্ন আকারের তিনটি ফুল এবং একটি কুঁড়ি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়েছে। এর ফলে ফুলের গঠনকারী প্রতিটি উপাদান এবং বিকাশের প্রতিটি পর্যায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এই টিউলিপ আঁকার সময় মনসুর ইউরোপীয় উদ্ভিদচিত্রের রীতিটি ভালোভাবেই বুঝেছিলেন এবং সেই ধারার বেশ কিছু প্রচলিত বৈশিষ্ট্য নিজের চিত্রকর্মে যুক্ত করেছিলেন।
তবে এ কথা নিশ্চিত যে, মনসুর কোনো এক সময় এই ফুলটি স্বচক্ষে দেখেছিলেন। কারণ ফুলটির প্রস্ফুটিত অবস্থার যে সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত বিবরণ তিনি তুলে ধরেছেন, তা কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ না করলে অর্জন করা সম্ভব নয়।
মনসুর ছাড়া জাহাঙ্গীরের রাজকীয় চিত্রশালার খুব অল্পসংখ্যক নামজানা চিত্রশিল্পীর সঙ্গে পুষ্পচিত্রের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়। এতটাই কম যে, পুষ্পচিত্রকলার বিকাশ কোন সময়ে কীভাবে ঘটেছিল, তার ধারাবাহিকতা নির্ধারণের জন্য আমাদের হাতে খুব অল্প কিছু সূত্রই রয়েছে। জাহাঙ্গীরের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, সুলতান প্রাকৃতিক বিজ্ঞান সম্পর্কে গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন। তার দরবারের মনসুর ও অন্যান্য শিল্পীর স্বাক্ষরযুক্ত ফুল, পাখি ও প্রাণীর চিত্রগুলো সেই আগ্রহেরই প্রতিফলন।
তবে এসব চিত্রের অধিকাংশই এখন তাদের মূল অ্যালবাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে অথবা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন অ্যালবামে নতুন করে বাঁধানো হয়েছে। ফলে জাহাঙ্গীরের শাসনামলে প্রকৃতিনিষ্ঠ ফুলচিত্রকলার প্রকৃত ভূমিকা ও প্রভাব সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করা এখন প্রায় অসম্ভব।
জাহাঙ্গীরের উত্তরসূরি শাহজাহানের (শাসনকাল: ১৬২৬–১৬৫৭) আমলের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেকটাই সহজ। তার শাসনামলেই ফুলেল নকশা মুঘলদের স্বতন্ত্র দৃশ্যশিল্পের পরিচয়ের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে।

চিত্র ৮ : জেরানিয়াম, মুঘল, আনুমানিক ১৬৩০।
(মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম)
৩. মুঘল অ্যালবামে পুষ্পচিত্র : দারা শিকোহ অ্যালবাম
সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধে তৈরি হওয়া অ্যালবামগুলোর মধ্যে দারা শিকোহ অ্যালবামই একমাত্র যেটি এখনো টিকে রয়েছে, সেখানে পুষ্পচিত্র সংযোজিত হয়েছে। ধারণা করা হয়, এই অ্যালবামের জন্যই বিশেষভাবে এসব পুষ্পচিত্র তৈরি করা হয়েছিল।
দারা শিকোহ ছিলেন শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং ময়ূর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে সুলতান ের প্রথম পছন্দের ব্যক্তি। ১৬৩৩ সালে দারা, নাদিরা বানু বেগম এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। একটি শিলালিপি থেকে জানা যায়, অ্যালবামটি তাঁকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।

চিত্র ৯ : বিবাহের সময় দারা শিকোহকে সম্মান জানাচ্ছেন শাহজাহান (১২ ফেব্রুয়ারি ১৬৩৩), আনুমানিক ১৬৩৫–১৬৫০। স্বাক্ষর: বুলাকি। বাদশাহনামা।
বর্তমানে ৭৪টি পাতার এই মুরাক্কায় শুরুতে আরও পাঁচটি পাতা ছিল, যা অজ্ঞাত কোনো এক সময় সরিয়ে ফেলা হয় এবং কালক্রমে হারিয়ে যায়। অ্যালবামের অভ্যন্তরীণ বিন্যাসে জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের জন্য তৈরি অন্যান্য মুঘল অ্যালবামেরই অনুসরণ দেখা যায়। সেখানে একের পর এক বিন্যাসে রয়েছে ক্যালিগ্রাফিযুক্ত দ্বিপৃষ্ঠার পর চিত্রাঙ্কিত দ্বিপৃষ্ঠার সংযোজন।
অ্যালবামের মাত্র একটি চিত্রে স্বাক্ষর রয়েছে। স্বাক্ষরটি মুহাম্মদ খান নামের এক অজ্ঞাতপরিচয় চিত্রশিল্পীর, এবং চিত্রটির তারিখ ১৬৩৩ সনের, যেটি ছিল দারা ও নাদিরার বিবাহের বছর। দরবারের কয়েকজন সদস্যকে শনাক্ত করা গেলেও অ্যালবামের অধিকাংশ প্রতিকৃতিই সাধারণ ধরনের সেখানে তরুণ, পানপাত্র বহনকারী যুবক, দরবেশ এবং ধর্মীয় ব্যক্তিদের চিত্রিত করা হয়েছে। শিল্প বা ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান না থাকলেও এসব অবয়বের নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। অ্যালবামে ছড়িয়ে থাকা পাখি ও অলংকারধর্মী পুষ্পরচনার সঙ্গে এসব চিত্রের সমন্বয়ও বেশ আকর্ষণীয়।
অ্যালবামটিতে সমকালীন কয়েকজন ক্যালিগ্রাফারের কাজও রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মদ হুসাইন আলকাশ্মীরি জারিনকলম এবং আবদ আল রহিম আম্বরিনকলম। সবশেষে, ইউরোপীয় খোদাইচিত্রের সংযোজন অ্যালবামটির আভিজাত্য আরও বৃদ্ধি করেছে। খ্রিস্টীয় বিষয়বস্তু ও ইউরোপীয় চিত্ররীতির ব্যবহারে এতে এক ধরনের বিদেশি বৈচিত্র্যও যুক্ত হয়েছে।
অ্যালবামজুড়ে আঠারোটি পুষ্পচিত্র ছড়িয়ে রয়েছে। এ ছাড়াও ফুলের উপস্থিতি প্রায় সর্বত্র কখনো একক বিষয় হিসেবে, কখনো গৌণ উপাদান হিসেবে এবং অ্যালবামের প্রায় সব প্রান্তসজ্জাতেই। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশিষ্ট কয়েকজন গবেষক অ্যালবামটির সঙ্গে এর মালিকের লিঙ্গপরিচয়ের একটি সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। তাদের ধারণা ছিল, যেহেতু মুরাক্কাটি একজন নববধূর জন্য তৈরি হয়েছিল, তাই এর সমগ্র বিষয়বস্তু ছিল শান্ত ও নারীত্বপূর্ণ যেমন তরুণ-তরুণীর কথোপকথন, পাখির জোড়া, ফুল কিন্তু যুদ্ধ বা শিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো দৃশ্য নেই, এমনকি ঘোড়ায় আরোহী কোনো ব্যক্তির চিত্রও নেই ।
তবে অ্যালবামটির বিষয়বস্তুকে “নারীত্বপূর্ণ” বলে চিহ্নিত করা সমস্যাজনক। কারণ পারস্য প্রভাবিত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ফুলকে কখনোই নির্দিষ্ট কোনো লিঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করা হতো না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ফুল হাতে পুরুষের প্রতিকৃতি কিংবা ফুলের নকশায় সূচিকর্ম করা পোশাক পরিহিত পুরুষের অসংখ্য চিত্র পাওয়া যায়, যার মধ্যে মুঘল দরবারের চিত্রও রয়েছে। অ্যালবামের একটি পাতায় স্বয়ং দারা শিকোহকেও হাতে ফুল ধরে থাকতে দেখা যায়।
একইভাবে, যুদ্ধ যদি সত্যিই দরবারের নারীদের জন্য প্রচলিত কোনো কার্যকলাপ না হয়ে থাকে, তবুও অশ্বারোহণ ও শিকার ছিল তাদের আয়ত্ত করার প্রত্যাশিত দক্ষতাগুলোর অন্তর্ভুক্ত। অতএব, অ্যালবামে ফুলের উপস্থিতি কিংবা শিকারের দৃশ্যের অনুপস্থিতি কোনোটিকেই এর প্রাপকের লিঙ্গপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা যায় না।

চিত্র ১০ : স্নোবেল, লিলি ও জবা; নার্সিসাস ও আইরিস, মুঘল, আনুমানিক ১৬৩৩। দারা শিকোহ অ্যালবাম।
(ব্রিটিশ লাইব্রেরি)
এর পরিবর্তে আমাদের এই অ্যালবামের মধ্যে ষোড়শ শতকের অ্যালবামের মুখবন্ধগুলোতে বিকশিত উদ্যানের রূপকটিকে দেখতে হবে। পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রতিকৃতিগুলো এমন ফুলেল পরিবেশে স্থাপন করা হয়েছে, যেন উদ্যানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এর উদাহরণ হিসেবে ওপরে পুনর্মুদ্রিত মুখোমুখি থাকা দুটি পারস্যের চিত্রের কথা বলা যায়, যেখানে একটি বদ্ধ উদ্যানে প্রণয়ঘন সাক্ষাতের দৃশ্য ফুটে উঠেছে (চিত্র ৩) চিত্রের অবয়বগুলোর পেছনে উদ্যানের দেয়ালও দৃশ্যমান।
অ্যালবামের ফুলেল প্রান্তসজ্জা এবং পূর্ণপাতাজুড়ে অঙ্কিত পুষ্পচিত্রগুলো (চিত্র ১০) এসব প্রতিকৃতির সঙ্গে মিলিত হয়ে উদ্যানের সেই আবহকে আরও জোরালো করে তোলে। পারস্য ও ভারতীয় চাহার বাগের চিত্রেও পাখি, হাঁস, বক ও কবুতর প্রায়ই অঙ্কিত হতো (চিত্র ২)। অ্যালবামটি তাই একটি বদ্ধ উদ্যানের ধারণাকেই ধারণ করে, যেখানে পূর্ণপাতাজুড়ে অঙ্কিত পুষ্পচিত্রগুলো তাদের পূর্ণ তাৎপর্য লাভ করেছে।
শাহজাহানের শাসনামলে শুধু অ্যালবামেই পুষ্পনকশার ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল না বরং প্রায় সব ধরনের শিল্পমাধ্যমেই এর ব্যবহার দেখা যেত। সুলতান ের জাঁকজমকপূর্ণ শিল্পপৃষ্ঠপোষকতার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ তাজমহল। এই স্মৃতিসৌধে উদ্যানের রূপক ও পুষ্পচিত্রকল্পের এক নিখুঁত সমন্বয় ঘটেছে। ১৬৩১ সালে তার স্ত্রী মমতাজ মহলের মৃত্যুর পরপরই এর নির্মাণ শুরু হয় এবং ১৬৪৮ সালে তা সম্পন্ন হয়। সমাধিসৌধ ও এর সংলগ্ন দুটি স্থাপনা প্রাঙ্গণের উত্তর প্রান্তে যমুনা নদীর দিকে মুখ করে নির্মিত হয়েছিল। এর সামনে ছিল একটি চাহার বাগ, যাকে সমকালীন বিবরণে স্বর্গের উদ্যানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
তাজমহলের প্রাঙ্গণে চাহার বাগের উপস্থিতি শুধু শতাব্দীপ্রাচীন একটি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাই নয় ভবনটির সমাধি হিসেবে ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত একটি গভীর প্রতীকী অর্থও এর মধ্যে নিহিত রয়েছে। স্মৃতিসৌধটি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন শিল্প-ইতিহাসবিদ এব্বা কখ। তিনি স্বর্গীয় উদ্যানের রূপকের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং ভবনগুলোর গায়ে বিস্তৃত সমৃদ্ধ পুষ্পসজ্জার সঙ্গে এর সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। কেন্দ্রীয় সমাধিসৌধের বাইরের অংশে মার্বেলের ওপর, ভেতরে পিয়েত্রা দুরা পদ্ধতিতে এবং সংলগ্ন ভবনগুলোর লাল বেলেপাথরের ওপর পুষ্পনকশা নির্মিত হয়েছে।
এসব ফুলের নকশায় সাধারণত কঠোর অক্ষীয় প্রতিসাম্য অনুসরণ করা হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ত্রিপত্রবিশিষ্ট মধ্যবর্তী কাণ্ডের দুই পাশে দুটি পার্শ্বীয় উপাদান অবস্থান করছে। শাহজাহানের আমলের শিল্পে প্রতিসাম্য ছিল অন্যতম প্রধান নান্দনিক নীতি। এর সঙ্গে ‘কারিনা’ ধারণারও সম্পর্ক রয়েছে। ‘কারিনা’ এমন এক ধারণাকে প্রকাশ করে যেখানে জোড়া ও সমরূপ উপাদানের পাশাপাশি তাদের পারস্পরিক সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এটি শাহজাহানের সাম্রাজ্যিক আদর্শে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বিশ্বজনীন সামঞ্জস্যের ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি আদর্শ শাহজাহানি ‘কারিনা’ বিন্যাসে দুটি প্রতিসম উপাদান একটি প্রাধান্যশীল কেন্দ্রীয় উপাদানকে দুই পাশ থেকে ঘিরে রাখে।
এই ধারণাটি স্মৃতিসৌধটির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অলংকরণেও প্রয়োগ করা হয়েছে। সেখানে একটি ফুল যেন সমগ্র স্থাপত্য এবং তার বহুমাত্রিক প্রতীকের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ হয়ে উঠেছে।

চিত্র ১১ : সমাধিসৌধের অভ্যন্তরে সমাধিগুলোর জালি, আগ্রা, উনবিংশ শতাব্দী।
(ব্রিটিশ মিউজিয়াম, লন্ডন: ১৯৪৫)
ভাই আওরঙ্গজেবের হাতে দারা শিকোহের হত্যাকাণ্ড এবং তাদের পিতা শাহজাহানের ক্ষমতাচ্যুতির পর ফুলচিত্র ও পুষ্পনকশা প্রায় এক শতাব্দীর জন্য জনপ্রিয়তা হারায়। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এগুলো আবারও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আওধ ও বাংলার দরবারগুলোতে এর পুনরুত্থান ঘটে। ভারতে বসবাসকারী ইউরোপীয় সংগ্রাহকদের দৃষ্টি এসব শিল্পকর্মের দিকে আকৃষ্ট হতে থাকেথা। তাঁরা এগুলো অ্যালবামে সংকলন করে নিজেদের দেশে নিয়ে যান। এসব অ্যালবাম ছিল তৈমুরীয় ও মুঘল যুগের প্রাথমিক মুরাক্কার সরাসরি উত্তরসূরি, তবে সেগুলো তাদের পৃষ্ঠপোষকদের রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী নতুনভাবে রূপ পেয়েছিল।
তবে মুঘল পুষ্পচিত্রের গল্প এখানেই শেষ হয়নি। বিংশ শতকের শুরুর দিকের অলংকরণবিষয়ক গ্রন্থের মাধ্যমে প্রকৃতিনিষ্ঠ পুষ্পনকশা আবার ইউরোপে ফিরে আসে। সে গল্প অন্য আরেক সময়ে…!

চিত্র ১২ : গোল-এ কোচনার, গুজরাট, আওধ, অষ্টাদশ শতাব্দী(আনুমানিক)।
এই চিত্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, একটি ফুল কখনও হয়ে ওঠে স্বর্গীয় বাগানের প্রতীক, কখনও রাজকীয় রুচির পরিচয়, আবার কখনও শিল্পীর গভীর পর্যবেক্ষণ ও কল্পনার সাক্ষ্য। অ্যালবামের পাতায়, মার্বেলের গায়ে কিংবা পিয়েত্রা দুরার অলংকরণে ফুটে থাকা এসব ফুল তাই সময়কে অতিক্রম করে আজও আমাদের সামনে এক হারিয়ে যাওয়া জগতের সৌন্দর্য উন্মোচন করে।
সময়ের সঙ্গে মুঘল সালতানাতের রাজনৈতিক জৌলুস ক্ষীণ হয়েছে, শিল্পরুচিও বদলেছে; কিন্তু সেই ফুলগুলো মুছে যায়নি। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে তারা এখনও রয়ে গেছে। যেন ইতিহাসের বাগানে একবার ফুটে ওঠা সেই ফুল আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাম্রাজ্য বিলীন হতে পারে, কিন্তু সৌন্দর্যের ভাষা দীর্ঘকাল বেঁচে থাকে।
অনুবাদ : হোমায়রা আনজুম তারুণ্য
