কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি, সাম্য, প্রেম , বিদ্রোহের কবি। নজরুল তাঁর লেখনী সত্ত্বার মধ্যদিয়ে বাঙালি, বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতির অপর নাম হয়ে উঠেছেন। তিনি মূলত কবি, তবে তিনি বাংলা সাহিত্যের বেশ কয়েকটি শাখাতে তাঁর অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন। গল্প, উপন্যাস , নাটক, প্রবন্ধ প্রভৃতি শাখাতে তিনি কলম চালিয়েছেন। কিন্তু গীতিকার এবং সুরকার হিসেবে তিনি সম্রাট তুল্য ভূমিকা পালন করেছেন। সাহিত্য নির্মানের মাধ্যম যেটাই হোক, নজরুলের নিজস্ব কয়েকটি ভিত্তি ছিল: সাম্য, প্রেম এবং বিদ্রোহ। তবে এগুলো তাঁর সাহিত্যের উপলক্ষ; লক্ষ্য ছিল, বিনির্মান। নতুন সমাজের উত্থান, নবযুগের প্রতিষ্ঠা। এই নবযুগের প্রয়োজনেই , সাম্য, প্রেম এবং বিদ্রোহকে তুলে ধরেছেন। মজার বিষয় হলো, এই তিনটি ভিত্তির সাথে নারী কোন না কোনভাবে সম্পৃক্ত। নারী সুতার ভূমিকায় নজরুলের এই তিন দিককে এক করে গেঁথেছে। তাঁর প্রত্যেকটি সাহিত্য কর্মের সাথে নারীর সম্পৃক্ততা আবিষ্কার সম্ভব। কারণ তিনি নারীর দ্বারা অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছেন। নজরুলের মতো প্রতিভাবান সাহিত্যিকের ব্যক্তিজীবন এবং সাহিত্যকর্মকে আলাদা করার সুযোগ খুব একটা থাকে না। দুই-ই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তবু, আলোচনার স্বার্থে ব্যক্তিগত জীবন আলাদাভাবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। ব্যক্তি জীবনে নারীর সাথে সম্পর্কের ধরণ ও মাত্রা কেমন ছিল তার খোঁজ করার পাশাপাশি এরসাথে সাহিত্য কীভাবে জুড়ে আছে সেটাও তালাশ করা জরুরি।
নজরুলের জীবনে নারীর কী ভূমিকা এবং তিনি কীভাবে নারীর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন- এ জাবাব দিতে হলে মাথায় রাখতে হবে, মানুষ সাধারণত নারীর সাথে জননীর সন্তান, বোনের ভাই, স্ত্রী বা প্রেমিকার সঙ্গী এবং কন্যার পিতা ইত্যাদি সূত্রে আবদ্ধ থাকে।
কাজী নজরুল ইসলাম অভিজাত বংশের উত্তরাধিকারী ছিলেন। তাদের কাজী বংশের সাথে মুঘল শাসনামলের ঐতিহ্যের ধারাও প্রবাহিত হয়ে এসেছে। পিতা কাজী ফকির আহমদ। মাতা জাহেদা খাতুন। অভিজাত বংশের পরম্পরা নিয়েও দারিদ্র্যের রোষানলে পড়ার একটা কারণ হিসেবে অনেকে কাজী ফকির আহমেদের অমিতব্যয়ী স্বভাবকে দায়ী করেছেন। শোনা যায়, তিনি পাশা খেলার পেছনে বহু অর্থ উড়িয়েছেন। অন্যদিকে মা জাহেদা খাতুন , পূর্বের ন্যায় সম্পদ না থাকলেও পূর্বের প্রাচুর্য মাফিক দান সদকা করতে অভ্যস্ত ছিলেন। সবমিলিয়ে অল্পদিনেই অভব তাদের উপর খড়গহস্ত হয়। নজরুলের সাথে , মা জাহেদার সম্পর্ক এক দুর্ভেদ্য রহস্যে ঘেরা। বরাবর রহস্যময় ছিল না। শুরুর দিকে যে সাধারণ ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। নজরুল যখন শেয়ারসোল স্কুলে পড়তেন তখন পড়ার খরচ বাবদ কোন ব্যয় তাকে নিজের ঘর থেকে দিতে হতো না উল্টো সাত টাকা পেতেন। সেই সাত টাকা নজরুলের মতো মানুষের খরচ করতে খুব একটা বেগ পেতে হতো না। তিনি চা বিস্কুট খেয়ে এবং খাইয়ে উড়িয়ে দিতেন। একবার তার ছোট ভাই , কাজী আলী হোসেন তাঁর কাছে যান। আলী হোসেনের চেহারা দেখেই নজরুল ঘরের অবস্থা , মায়ের দুর্দশা বুঝে যান এবং নিজের সাতটি টাকা ভাইকে দিয়ে মায়ের হাতে পৌঁছে দিতে বলেন। এরপর ১৯১৭ সালের আগষ্ট বা সেপ্টেম্বর মাসো নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাককালে যোগ দেন। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে তার পরীক্ষা নিরীক্ষা হয় এবং পরে ট্রেনে চড়ে লাহর হয়ে করাচি যান। এখানে অবস্থানকালে নজরুল বিভিধ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা পান। ১৯২০ সালে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টন ভাঙার আগেই কাজী নজরুল একবার বাড়ি এসে ছুটি কাটান। ভেঙে যাওয়ার পর আরো কিছুদিন বাড়িতে থেকে কলকাতা যান, বন্ধু শৈলজানন্দের কাছে। শৈলজানন্দ রামাকান্ত বোস স্ট্রিটের একটা বোডিং এ থাকতেন। এখানেই নজরুল ওঠেন। এখান থেকেই নজরুল সাম্প্রতিক মানসিকতার রোষে পড়ন। একে মুসলমান তাতে প্রাণখোলা নজরুলের হৈ-হুল্লোড়, যতরত্র গান গাওয়া- হিন্দু প্রতিবেশীদের গায়ে ফোসকা পড়িয়ে দিচ্ছোল। শৈলজানন্দ তাঁর ‘আমার বন্ধু নজরুল’ গ্রন্থে লেখেন, নজরুল মুসলমান বলে কাজের লোক তার এটো বাসন ধুয়ে দিতো না শৈলজাই বন্ধুর বাসন ধুতেন। এক পর্যায়ে নজরুল এখান থেকে চলে যান এবং ৩২ নং স্ট্রিটের বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে কমরেড মুজাফফর আহমদের সাথে থাকতে শুরু করেন।
নজরুল সাহিত্যে কান পাতলেই যে সাম্য এবং হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের কথা শোনা যায় তার কারণ তার জীবনাভিজ্ঞতার এসব কদর্য দিক। তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সরল বা মিহি কণ্ঠে গান গাননি। ক্ষোভে রাঙা হয়ে , বজ্র কণ্ঠে প্রতিবাদ করেছেন। কারণ সাম্প্রদায়িকতা আখেরে জাতীয় স্বার্থের টুটি চেপে ধরে। দেশকে ক্ষতবিক্ষত করে। নজরুল দেশের স্বাধীনতার জন্য এভাবে প্রাণ পণ রেখেছেন কারণ তিনি দেশকে মা বলে জানতেন , মা বলে সম্বোধন করতেন। ফলে, কেউ তার মায়ের পায়ে শিকল পরাবে, মায়ের বুক চিরে ঐশ্বর্য লুট করবে, ইতিহাসের সমৃদ্ধ ধারা থেকে সুতো কেটে দেবে – এ তিনি কোনভাবেই বরদাস্ত করতে পারেননি। তাই তিনি যথার্থ রূপে এবং যথেষ্ট পরিমাণে প্রতিবাদ করেছেন।
মুজাফফর আহমদের সাথে থাকার সময় তিনি এক সপ্তাহের জন্য বাড়ি যান এবং ঐ সময়েই তাঁর মায়ের সাথে কোন মনোমালিন্য ঘটে।কী বিষয়ে তা স্পষ্ট না কিন্তু এরপর নজরুল আর কখনো নিজের মায়ের দিকে ফিরে তাকাননি। নজরুলের জীবনীকাররা একেকজন একেকভাবে এর কারণ উদঘাটন করেছেন। কিন্তু প্রকৃত কারণ কী, সে ধুয়াসা থেকেই যায়। নজরুল যখন হুগলি জেলে অনসন করছিলেন তখন তার মা , জাহেদা খাতুন জেলে তার অনসন ভাঙাতে যান কিন্তু নজরুল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ পর্যন্ত করেনি। অথচ পাতানো মা, বিরোজা সুন্দরী দেবীর হাতে কমলার জুস খেয়ে অনসন ভাঙেন। পরের দিন পত্রিকাতে এই ফলাও করে প্রচার করা হয়। পত্রিকায় ছেলের অনসন ভাঙার খবর পড়ে জাহেদা খাতুন নিশ্চয় অপমানিত বোধ করেছিলেন। সে সময় যহেতু তিনি অসুস্থ ছিলেন, এই ঘটনায় তাঁর অসুস্থতা আরো বেড়ে যায়। পাবনার কবি বন্দেআলী মিয়া তাঁর ‘জীবন শিল্পী নজরুল’ গ্রন্থে নজরুল জননীর ভগ্ন হৃদয়ের কথা লিখেছেন। পরবর্তী সময়, জাহেদা খাতুন একেবারে শয্যাশায়ী হন, অসুস্থতার মাত্রা এত বেশি ছিল, বুঝায় যাচ্ছিল, জীবন মৃত্যুর একেবারে দারপ্রান্তে হাজির হয়েছে। ছোট ভাই, কাজী আলী হোসেন নজরুলকে নিতে আসেন, মায়ের অবস্থার বিষদ বর্ণনা দেন- কিন্তু নজরুল মায়ের সাথে শেষ দেখাটাও করেন না। এ খবর শুনে কবি কুমুদ রঞ্জন নজরুলকে ভৎসনা করেন এবং বলেন, এখনো যদি রাগ ধরে রাখে, মায়ের অন্তিম শয্যায় পাশে না দাঁড়ায় তবে নজরুলের অবস্থা, কবি রজনীকান্তের মতো হবে। রজনীকান্ত জীবনের শেষ কয়েকটি বছর বাকরুদ্ধ ছিলেন। নজরুলের নিয়তিতেও তাই দেখা যায়। ১৯৪৩ থেকে ১৯৭৬ তিনি পিক্স-ডিজিজে ভোগেন। স্মৃতিভ্রষ্ট , বাকরুদ্ধ কবি অসহনীয় জীবন তাপে দগ্ধ হন। কিন্তু ঐ এক সপ্তাহে মায়ের সাথে কী এমন হয়? কোন পাথর চেপেছিল নজরুলের বুকে? যা আর কোনদিন গললো না! কেউ কেউ বলেন, নজরুল তাঁর মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে পারেননি কিন্তু মা যাকে বিয়ে করেছিল সেই চাচা বজলে করীমের সাথে কখনই তাঁর সম্পর্কের ভাটা পড়েনি। বজলে করীমের মৃত্যুকে তিনি শোকগাথা রচনা করেছিলেন। প্রকৃত কারণ রহস্যময়ই থেকে যায়। নজরুল আরো একজন নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনে অবিচল ছিলেন , তিনি হলেন নার্গিস।
তবে, নজরুল নিজের মায়ের সাথে দূরত্ব বজায় রাখলেও তাঁর হৃদয়ের মাতৃতৃষ্ণা কখনোই মেটেনি। তিনি অনেককে মা ডেকেছেন, স্নেহ মেগেছের। একজনের নাম পূর্বেই উল্লেখ করেছি; বিরজাসুন্দরী। নজরুল পত্মী প্রমিলা দেবীর চাচী। সমাজকর্মী মিসেম মাসুদা রহমানকে নজরুল মা সম্বোধন করেছেন এবং তাঁকে ‘ বিষের বাঁশি’ কাব্য উৎসর্গ করেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের স্ত্রী, বাসন্তী দেবীকেও মা ডেকেছেন। চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুশোকে রচিত, ‘চিত্তনামা’ কাব্যটিও তাকে উৎসর্গ করেন। নজরুলের বিখ্যাত কবিতা, “ভাঙার গান” যে গানে আজো জালিমের বুক কাঁপে সেই, “কারার ঐ লৌহ-কবাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট” গানটিও তিনি বাসন্তী দেবীর অনুরোধ দেশবন্ধুর পত্রিকার জন্য লেখেন।
নজরুলের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নারীচরিত্র হলেন, নার্গিস। যার সাথে তাঁর প্রণয় এবং পরিণয় ঘটেছে কিন্তু বসবাস হয়নি। তবু এই নারী নজরুল সাহিত্যের এক বিশেষ গতিপথ ছিলেন। এ কথা স্বয়ং নজরুলই উল্লেখ করেছেন। নার্গিস-নজরুল প্রসঙ্গে প্রবেশের পূর্বে কয়েকটি কথা বললে ঘটনা বুঝতে সুবিধা হয় সে কথা হলো: নজরুল অত্যন্ত খামখেয়ালী একজন মানুষ ছিলেন। মুহূর্তের খেয়ালে খুব বেশি চালিত হতেন, পেছনে কী রেখে এলেন? তার গুরুত্ব কতটা বা সামনে কী ,কেন? এসব নজরুলকে খুব বেশি ছুঁতে পারতো না।
নজরুল প্রথম বার কুমিল্লা আসেন, আলী আকবর খানের সাথে। আলী আকবরের সাথে হয়তো পূর্বেই পরিচয় হয়ে থাকবে। পরিচয় নিয়ে মতভেদ আছে। যাইহোক নজরুল প্রথমবার কুমিল্লা আসেন ১৯২১ সালে। মোট পাঁচ বার আসেন এবং ১১ মাস অবস্থান করেন। নজরুল এবং বাংলাদেশ একে অপরকে আন্তরিকভাবে লালন করেছে। নজরুলের বাংলাদেশের সাথে যে সম্পর্ক তার সেতুও নারী। নার্গিস , প্রমিলা, ফজিলাতুন্নেছা প্রমুখ। বাংলাদেশের সাথে নজরুলের যে টান তা নাড়ির নয় নারীর টান।
নার্গিসের প্রকৃত নাম, সৈয়দা খতুন। নজরুল তাঁর প্রেয়সীর নাম দেন, নার্গিস। করাচিতে থাকা কালে নজরুল একজন ওস্তাদের সহবত পান যিনি ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শী। ফার্সি সাহিত্যে নার্গিস ফুলের কদরের কথদ তিনিই নজরুলকে বলেন।
নজরুল এবং নার্গিসের প্রথম সাক্ষাৎ হয়, নার্গিসের ভাইয়ের বিয়েতে। এখানেই তাদের হৃদয়ের লেনদেন। পরে বিয়ে! যেহেতু তাদের মিলিত হওয়ার মুহূর্ত অতি স্বল্প। ফলে অনেক মতভেদের অবকাশ রয়েছে। কেউ বলেন, নজরুল বিয়ের আসর থেকেই উঠে গেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যেহেতু সম্পর্ক ছিন্ন করতে তালাকের প্রয়োজন পড়ে, সেহেতু মানতেই হবে তাদের বিয়ে হয়েছিল। আকবর আলীর অন্যায় শর্ত নজরুল মানতে পারেননি। শর্ত ছিল, নজরুল ঘরজামাই থাকবে, কোন প্রয়োজন পড়লে নজরুল যেতে পারবে কিন্তু নার্গিস যেতে পারবে না। ফলে নজরুল শর্ত ছিন্ন করে প্রস্থান করেন। বিশিষ্ট নজরুল গবেষক, কবি আব্দুল হাই শিকদার বলেন, নজরুল-নার্গিসের বাসর হয়। শেষ রাতে নজরুল নার্সিসকে ব্যাগপত্র গুছিয়ে তার সাথে যেতে বলেন কিন্তু নার্গিস এভাবে যেতে কিছুতেই রাজি হন না। অগত্যা নার্গিসকে রেখেই নজরুল চলে যান কিন্তু কথা দিয়ে যান পরিবার নিয়ে আসবেন। কখনই আসেননি আর। নার্গিস ১৬ বছর অপেক্ষা করেছেন। তার অপেক্ষায় নজরুল ফেরেননি কেবল একটি চিঠি এসেছে। ১৯৩৭ সালে পাঠানো চিঠিতে নজরুল লিখেন, তিনি বেদনার আগুনে পুড়ছেন। নার্গিস তাকে বেদনার আগুনের যে পরশমণি দিয়েছেন , সেই আগুনেই তিনি ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্য রচনা করেছেন। ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পেরেছেন।
কিন্তু তিনি নার্গিসের কাছে ফিরলেন না কেন? নজরুলের মতো প্রতিভাবান কবিকে সাধারণ পাল্লায় পরিমাপ করা চলে না। হয়তো বিরহের আগুন জ্বালিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। বিরহের করুণ রসেই কবি রচনা করেছেন অজস্র গীতি। বিরোহের আগুনে ক্ষুব্ধ হয়েই রচনা করেছেন ‘বিদ্রোহী’ আর সমৃদ্ধ করেছেন বিদ্রোহী সত্তার অমর ভাণ্ডার।
১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাসে নজরুল-নার্গিসের সাক্ষাৎ হয়। শিয়ালদহের একটা হোটেলে তারা একান্তে সাক্ষাৎ করেন। প্রায় সারারাত কথপোকথনের পর নজরুল বলেন, তিনি শীঘ্রই ঢাকা আসবেন। নার্গিস ফিরে আবার অপেক্ষা করেন কিন্তু নজরুল এলেন না। অবশেষে , এ সম্পর্ক যে আর টেকার না তা বুঝতে পেরে ১৯৩৮ সালের ৩০ এপ্রিল নার্গিস তালাক নেন। এ বছরই ১২ ডিসেম্বর ঢাকার কবি, আজিজুল হকিমকে বিয়ে করেন। নজরুল শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা গান লিখে পাঠান:
“পথ চলিতে যদি চকিতে কভু দেখা হয়, পরান-প্রিয়!
চাহিতে যেমন আগের দিনে তেমনই মদির-চোখে চাহিয়ো ॥
যদি গো সেদিন চোখে আসে জল, লুকাতে সে-জল করিয়ো না ছল, যে প্রিয়-নামে ডাকিতে মোরে সে-নাম ধরে বারেক ডাকিয়ো ॥
তোমার বঁধু পাশে যদি রয়,
মোর-ও প্রিয় সে, করিয়ো না ভয়,
কহিব তারে, ‘আমার প্রিয়ারে আমারও অধিক ভালোবাসিয়ো’।
বিরহ-বিধুর মোরে হেরিয়া ব্যথা যদি পাও,
যাব সরিয়া, রব না হয়ে পথের কাঁটা,”
সাথে চিরকুটও পাঠান। যেখানে তিনি নার্গিসকে প্রেমের ভূবনে বিজয়ী বলে অভিহিত করেন এবং জানান নার্গিসকে না পাওয়ার বেদনা নিয়েই তিনি বাঁচবেন এবং পরকালে নার্গিসকে পাবেন- এই আশা রাখেন।
১৯৩৯ সালে নজরুল ঢাকা এলে, নার্গিস নিজের স্বামীর গাড়ি পাঠিয়ে নজরুলকে তাদের বাসায় নেন এবং নজরুলের পছন্দের খাবার রান্না করে খাওয়ান।
নার্গিসহীন জীবনে বিরহের যে তাৎপর্য ছিল তা নজরুলের অমর সৃষ্টিগুলো দেখলেই বোঝা যায়।
আজো মধুর বাঁশরি বাজে
গোধূলি লগনে বুকের মাঝে॥
আজো মনে হয় সহসা কখন
জলে ভরা দু’টি ডাগর নয়ন
ক্ষণিকের ভুলে সেই চাঁপা ফুলে
ফেলে ছুটে যাওয়া লাজে॥
হারানো দিন বুঝি আসিবে না ফিরে,
মন কাঁদে তাই স্মৃতির তীরে।
তবু মাঝে মাঝে আশা জাগে কেন
আমি ভুলিয়াছি ভোলেনি সে যেন,
গোমতীর তীরে পাতার কুটিরে
সে আজো পথ চাহে সাঁঝে॥
প্রমীলার সাথেও কুমিল্লাতেই সাক্ষাৎ হয়। নজরুলের জীবনে কুমিল্লা খুবই গুরুত্বপূ স্থান। নজরুল তার জীবনের প্রথম মিছিল হিসেবে কুমিল্লার মিছিলে যোগ দেন। হারমনিয়াম বাজিয়ে মিছিল করেন। কবি আব্দুল হাই শিকদার বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই মিছিলেই প্রথম নারীরা যোগ দেয়। নারীদের মিছিলে আনার কৃতিত্ব নজরুলের।
নজরুল-প্রমীলার প্রণয় কীভাবে হলো? নজরুল যখন তাঁর প্রেয়সী নার্গিসকে পেয়েও হারালেন, ক্ষোভে ছুটতে ছুটতে এসে শারীরিকভাবেও বিদ্ধস্ত ও অসুস্থ হয়ে যান। শারীরিক মানসিকভাবে আহত কবিকে এই প্রমিলাই পরম যত্মে সেবা দেন। সেখান থেকেই যাত্রা শুরু। তবে তাদের বিয়েটা সহজ ছিল না। মিসেস এম.রহমানের উপস্থিতিতে একেবারে ঘরোয়াভাবে বিয়ে সম্পন্ন। নজরুলের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘দোলনচাঁপা’র দোলন বা দুলির সাথে নজরুল সমস্ত জীবন পার করেছেন।
প্রেমিক নজরুলের আরো কয়েকজন প্রণয়িনীর কথা জানা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী , ফজিলাতুন্নেছার প্রেমে পড়েছিলেন নজরুল কিন্তু ফজিলার তরফ থেকে কোন প্রশ্রয় ছিল না। নজরুলের প্রেম গ্রহণ করেননি তিনি। এ প্রেম নিতান্তই একতরফা। তবু নজরুল একে অন্যায় মনে করেননি।
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়,
সেকি মোর অপরাধ?
চাঁদেরে হেরি’ কাঁদে চকোরিণী বলে না তো কিছু চাঁদ।।
চেয়ে’ চেয়ে’ দেখি ফোটে যবে ফুল
ফুল বলে না তো সে আমার ভুল
মেঘ হেরি’ ঝুরে’ চাতকিনী
মেঘ করে না তো প্রতিবাদ।।
জানে সূর্যেরে পাবে না
তবু অবুঝ সূর্যমুখী
চেয়ে’ চেয়ে’ দেখে তার দেবতারে
দেখিয়াই সে যে সুখী।।
হেরিতে তোমার রূপ-মনোহর
পেয়েছি এ আঁখি, ওগো সুন্দর
মিটিতে দাও হে প্রিয়তম মোর
নয়নের সেই সাধ।।
নজরুল তাকে, কবিতার সংকলন ‘সঞ্চিতা’ উৎসর্গ করতে চাইলে তাতেও সম্মতি দেননি ফজিলাতুন্নেছা। শেষে রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন। ফজিলাতুন্নেছা এক বর্ষায় দেশের বাইরে পাড়ি জমালে নজরুল রচনা করেন, ‘বর্ষা বিদায়’।
ওগো বাদলের পরী!
যাবে কোন্ দূরে, ঘাটে বাঁধা তব কেতকী পাতার তরী!
ওগো ও ক্ষণিকা, পুব-অভিসার ফুরাল কি আজি তব?
আরেকজন নজরুলের প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছিলেন , তিনি উমা মৈত্র। নজরুল তাকে গান শেখাতেন। ‘চক্রবাক’ কাব্যে বিরহী কবির যে বেদনা প্রকাশ পেয়েছে তা উমা মৈত্রের স্মরণে। মজার বিষয় হলো , নজরুল কাব্যটি উমা মৈত্রের বাবাকে উৎসর্গ করেছেন।
রানু সোম নামের একজন নারীকে নজরুল তাঁর ভগ্নির আসন দেন। এই রানু সোম নজরুলের বেশ কিছু অলৌকিক পারদর্শীতার খবর আমাদেরকে দিয়েছেন। যেমন , নজরুল একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকারেও কাগজে কবিতা লিখে ফেলতে পারতেন। একবার , নজরুল তাদের বাসায় ছিলেন। যে কক্ষে নজরুলকে থাকতে দেওয়া হয় সেখানে বাতি জ্বালাবার কোন উপকরণ ছিল না, নজরুলের কাছেও ছিল না। কিন্তু সকালে টেবিলের উপর সদ্য লেখা কবিতা পাওয়া যায়।
আরেক জনকে নজরুল কন্যার আসন দিয়েছিলেন। কাজী মোতাহার হোসেনের কন্যা যোবাইদা মির্জা। নজরুল তাকে স্নেহ করে খুকী ডাকতেন। মঞ্চে উঠে তাকে কোলে নিয়ে গান গাওয়াতেন।যোবাইদা মির্জা তার এবং তার পরিবারের সাথে সখ্যতা প্রসঙ্গে উল্লেখ করন।
নজরুলের জীবন নির্বাক হওয়ার আগে নদীর মতো বহমান ছিল। নজরুল সময়ের তালে নিজেকে চালিয়ে নিয়েছেন। ভরপুর জীবনাভিজ্ঞতা। নারী প্রসঙ্গে কেবল প্রেম নয়, সামগ্রিক সমাজচেতনার সঠিক দিশাও তিনি লাভ করেছেন। তিনি সাম্যের জন্য এত সরব হয়েছেন কারণ সব বঞ্চনাতেই তিনি নারীদের সর্বাগ্রে পেয়েছেন। সকল শোষণ নারীকে বেশি নিঙড়ে নিতে পারে- এই সমাজবীক্ষণ নজরুল লাভ করেছিলেন। ধর্মের নামে নারীকে কোণঠাসা করার প্রবণতাতে নজরুল খুব আহত হয়েছেন। ব্যথিত কণ্ঠে বলেছেন , যে নারী সবার প্রথম ইসলাম গ্রহণ করলো, তাকেই তোমরা আজ ধর্মের নামে আটকে রাখতে চাও!
সর্বপরি নবযুগের স্বপ্নদ্রষ্টা নজরুল নবযুগের প্রয়োজনে নারীদের আহ্বান করেছেন। তিনি বিনির্মানের জন্য নারীকে শুধু অংশীজন হতে বলেননি, অগ্রদূত হতে বলেছেন। কারণ গড়ার কাজটা নারীই করতে জানে। এজন্য তিনি, আনন্দময়ীর আগমনের কথা বলেছেন , নারীকে রক্তাম্বর ধারণ করতে বলেছেন। সমাজ শোষিত হতে হতে এমন ভোতা হয়ে গেছে , পুরুষদের পুরুষ নারায়ণও নিদ্রারত। এজন্য নজরুল নারীদের ডেকেছেন। নারীকে আগে জাগতে বলেছেন , তারপর জাগাতে বলেছেন। নিজের সন্তানকে বিনির্মানের জন্য কোরবানি দিতে বলেছেন কিন্তু শোক করার অবসর দেননি বরং ছিন্নমস্তক কোলে নিয়ে অন্যদের আহ্বান করতে বলেছেন। নজরুলের কাছে নারী কাণ্ডারী , নবযুগের মুয়াজ্জিন।
