মুহসিনা বিনতি মুসলিম
_____________________________
আজ সমগ্র মানবতা এক ভয়াবহ সমস্যার মুখোমুখি, যা আখলাকী সমস্যার সৃষ্টি করছে। যেসব মূল্যবোধ আচার-আচরণকে আখলাকে পরিণত করে সেসব মূল্যবোধও হারিয়ে যাচ্ছে। মুসলমান হিসেবে আখলাকে হামিদাকে ধারণ করে আল্লাহর একজন সম্মানিত খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়। আমাদের সামনে আখলাক-এর পরিধিকেও ছোট করে শুধুমাত্র ‘নৈতিকতা’ এর স্থলাভিষিক্ত করা হয়। বর্তমানে মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা এতটাই বেড়েছে যে, যেকোনো ধরনের সম্পর্কে মানুষ আগে নিজের স্বার্থ চিন্তা করে ফলে ‘মারহামাত’ বিহীন প্রজন্ম তৈরী হচ্ছে। অথচ আমাদের পয়গম্বর (সাঃ) ‘রহমাতুল্লিল আলামীন’ তথা সমগ্র মানবতার জন্য রহমত স্বরূপ। তাঁর উম্মত হিসেবে আমাদের উচিত সমগ্র মানবতার জন্য রহমত হিসেবে নিজেকে গড়া।
আখলাক ও মারহামাতের ভিত্তি কুরআনেই নিহিত আছে। কুরআনের মূল বিষয় চারটি—ঈমান, ইবাদত, আখলাক ও আইন। এই চারটি বিষয়কে একটি পরিভাষায় আত-তাওহীদ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। এ চারটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং আখলাক ছাড়া কোনোটিই পূর্ণতা লাভ করে না। তাই ইসলামকে সঠিকভাবে বুঝতে ও বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে আখলাক অপরিহার্য।
বর্তমানে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনের নৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ হলো ইসলামকে আখলাক থেকে বিচ্ছিন্ন করে পালন করার প্রবণতা। মুখে আখলাকের কথা বলা হলেও বাস্তব জীবনে তার যথাযথ চর্চা না থাকায় সমাজে নানা ধরনের অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেক বিষয়ের আখলাক রয়েছে। প্রত্যেক সম্পর্কের মধ্যে আখলাক রয়েছে এবং এর পরিসীমাও রয়েছে। আখলাক কে উপেক্ষা করলেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
কুরআনে মানুষকে তার আখলাকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। যারা আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে, বিবেকের সঠিক ব্যবহার করে এবং আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে, তারাই আশরাফুল মাখলুকাত। পক্ষান্তরে, যারা সত্য উপলব্ধি করেও তা গ্রহণ করে না এবং অন্যায়-অবিচারে লিপ্ত হয়, তারা পশুর সমান; বরং অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও নিকৃষ্ট।
মানুষকে পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সমগ্র সৃষ্টি তার কাছে আমানত হিসেবে অর্পণ করা হয়েছে। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ, পরিবেশ, বিশুদ্ধ বাতাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ—সবকিছুর যথাযথ সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবহার এই আমানতদারিতার অন্তর্ভুক্ত। আখলাকের বাস্তব চর্চার মাধ্যমেই এ আমানতের হক আদায় করা সম্ভব।
কুরআনের বিভিন্ন ঘটনা, নবী-রাসূলদের কাহিনি ও অতীত জাতির ঘটনার বিবরণ নিছক কাহিনি নয়, বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো, এগুলোর মাধ্যমে মানুষের জন্য শিক্ষা ও নৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা। একইভাবে কুরআন শুধু আইনের গ্রন্থ নয়; বরং ঈমান, ইবাদত, আখলাক ও আইনের সমন্বয়ে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা।
কুরআনের বিভিন্ন সূরায় আখলাকের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। সূরা লাহাবে আল্লাহ তাআলা বলেন,
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبّ
“ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।” (সূরা আল-লাহাব: ১)
এই সূরায় অহংকার, ক্ষমতার গর্ব ও সম্পদের দম্ভের পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে।
এছাড়া সূরা আল-মাউনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَرَأَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ فَذَٰلِكَ الَّذِي يَدُعُّ الْيَتِيمَ وَلَا يَحُضّ عَلَىٰ طَعَامِ الْمِسْكِينِ
“তুমি কি তাকে দেখেছ, যে প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করে? সে-ই এতিমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং মিসকিনকে খাদ্যদানে উৎসাহিত করে না।” (সূরা আল-মাউন: ১–৩)
এখানে এতিম, মিসকিন ও অসহায় মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন এবং তাদের অধিকার আদায়ের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
সূরা আল-হুমাযায় আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ الَّذِي جَمَعَ مَالًا وَعَدَّدَهُ يَحْسَبُ أَنَّ مَالَه أَخْلَدَهُ
“দুর্ভোগ প্রত্যেক নিন্দাকারী ও পরনিন্দাকারীর জন্য, যে সম্পদ জমা করে এবং বারবার গণনা করে; সে মনে করে তার সম্পদ তাকে চিরস্থায়ী করে রাখবে।” (সূরা আল-হুমাযাহ: ১–৩)
এই সূরায় গিবত, অপবাদ, কটূক্তি, কৃপণতা এবং সম্পদের অহংকারের নিন্দা করা হয়েছে।
সূরা আত-তাকাসুরে আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِر
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে গাফেল করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থানে পৌঁছে যাও।” (সূরা আত-তাকাসুর: ১–২)
এখানে ধন-সম্পদ, বংশমর্যাদা ও প্রাচুর্যের অহংকার থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সূরা আল-বালাদে আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَةَ وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْعَقَبَةُ فَكُّ رَقَبَةٍ أَوْ إِطْعَامٌ فِي يَوْمٍ ذِي مَسْغَبَةٍ يَتِيمًا ذَا مَقْرَبَةٍ أَوْ مِسْكِينًا ذَا مَتْرَبَةٍ) “কিন্তু সে দুর্গম পথ অতিক্রম করল না। তুমি কি জানো, সেই দুর্গম পথ কী? তা হলো একজন দাসকে মুক্ত করা, অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে খাদ্যদান করা—নিকটাত্মীয় এতিমকে কিংবা মাটিতে লুটিয়ে থাকা অভাবগ্রস্ত মিসকিনকে।” (সূরা আল-বালাদ: ১১–১৬)
এই আয়াতগুলো মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করা, এতিম ও দরিদ্রদের সাহায্য করা এবং মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগের শিক্ষা দেয়। এভাবেই কুরআন আখলাক ও মারহামাতকে একটি সুসংহত সমাজ গঠনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য কেবল কিছু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন নয়; বরং মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَر
“নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আল-আনকাবূত: ৪৫)
তাই প্রকৃত ইবাদতের প্রভাব মানুষের কথা, আচরণ ও চরিত্রে প্রকাশ পাওয়া উচিত। যে ইবাদত মানুষের আখলাক উন্নত করে না, সে ইবাদতের উদ্দেশ্য পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয় না।
আখলাকের অন্যতম দিক হলো সুন্দরভাবে কথা বলা। এমন কোনো কথা বলা উচিত নয়, যা অন্যের অন্তরে কষ্ট দেয় বা অপমানিত করে। গিবত, অপবাদ, কটূক্তি ও মানুষের সম্মানহানি ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। একইভাবে কৃপণতা, অহংকার ও মানুষের হক নষ্ট করাও আখলাক বিরোধী আচরণ।
বর্তমান সমাজে দুর্নীতি, ঘুষ, ভেজাল, মাদক, ধর্ষণ, সহিংসতা, পরিবেশ দূষণ ও নানাবিধ অন্যায় ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব সংকটের অন্যতম কারণ আখলাক ও মারহামাতের অভাব। মানুষের অন্তর থেকে যখন দয়া, সততা, আমানতদারিতা ও আল্লাহভীতি হারিয়ে যায়, তখন সে নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের অধিকার নষ্ট করতেও দ্বিধা করে না। এর ফলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে অবিচার, শোষণ, অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ আল্লাহর খলিফা হিসেবে পৃথিবীর সবকিছুর আমানতদার। তাই বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ পানি, গাছপালা, প্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণ প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব। পরিবেশ দূষণ, খাদ্যে ভেজাল, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার এবং অপচয় এটিও আখলাকের অবক্ষয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও আখলাকের গুরুত্ব অপরিসীম। ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, খাদ্যে ভেজাল এবং মানুষের হক নষ্ট করার প্রবণতা সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও আমানতদারিতা প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। মাদকের বিস্তার ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করছে। যারা মাদক উৎপাদন, পাচার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত, তারা জেনেশুনে একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে। একইভাবে ঘুষ, দুর্নীতি ও ভেজালের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাও আখলাক ও মারহামাতের শিক্ষা থেকে বিচ্যুত।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মুসলমানদের প্রকৃত বিজয় ছিল আখলাকের বিজয়। বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানরা শত শত বছর ধরে আখলাকে হাসানাহ(উত্তম চরিত্র) , মানবসেবা, শিক্ষা, ওয়াকফ ও খানকাহভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। রাজনৈতিক বিজয়ের পূর্বেই তারা আখলাক ও মানবিকতার বিজয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।একটি আদর্শ সমাজ গড়তে হলে শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই হবে না; মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও নৈতিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজে আখলাক ও মারহামাতের চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে। কুরআনের শিক্ষা, ভ্রাতৃত্ব, মানবিকতা ও উত্তম চরিত্র ব্যক্তি এবং সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠিত হলেই একটি সুসংহত, শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন সম্ভব।
ইসলামের বিস্তারে সর্বপ্রথম ভূমিকা রেখেছে উত্তম আখলাক। ইসলামের ইতিহাসে মুসলমানদের প্রকৃত সাফল্যের মূল ছিল আখলাক ও মারহামাত। মদিনা রাষ্ট্রে মহানবী (সা.) যে ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও দয়ার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা-ই পরবর্তীতে সাহাবি, তাবেয়ি ও ইসলামী শাসকদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। মক্কা বিজয়ের দিন প্রতিশোধের পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই মহান চরিত্রই ইসলামের দাওয়াতকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছিল।
একজন মানুষের প্রকৃত দ্বীনদার হওয়ার পরিচয় শুধু বাহ্যিক পোশাক বা ইবাদতের মাধ্যমে নয়; বরং স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যে ব্যক্তি মানুষের হক আদায় করে, প্রতিবেশীকে নিরাপদ রাখে এবং সবার প্রতি দয়া প্রদর্শন করে, সে-ই প্রকৃত অর্থে আখলাকসম্পন্ন ব্যক্তি।
সমাজে চলমান দুর্নীতি, ঘুষ, খাদ্যে ভেজাল, মাদক, সহিংসতা, পরিবেশ দূষণ ও নানা সামাজিক অবক্ষয়ের মূল কারণ আখলাক ও মারহামাতের অভাব। যখন মানুষ নিজের স্বার্থকে অন্যের অধিকার ও কল্যাণের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, তখন সমাজে অশান্তি ও অবিচার বৃদ্ধি পায়। তাই ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি স্তরে আখলাক ও মারহামাতের চর্চা গড়ে তুলতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বপ্রথম নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। কুরআনের শিক্ষা বুঝে তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে এবং আখলাক ও মারহামাতকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করতে হবে। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রে যদি আখলাক ও মারহামাতের চর্চা প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ ও সুসংহত সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ।
