নারী ও নববী সভ্যতার অনুপম সৌন্দর্য

চিন্তা ও দর্শন

তোমাদের দুনিয়া থেকে আমার কাছে প্রিয় করে দেওয়া হয়েছে নারী ও সুগন্ধি, আর আমার চোখের শীতলতা রাখা হয়েছে সালাতে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর এই বাণী থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যে ইসলামের নবী নারীকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রিয় করে দেওয়া এক ধরণের নিয়ামত হিসেবে দেখেছেন, সেই ইসলামই কীভাবে পরবর্তী কালে নারীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের ধর্ম হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠল?
ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায়, বিশেষ করে অতিরিক্ত কঠোরতার প্রভাবে, মুসলিম সমাজে নারীর অবস্থান অনেক সময় এমন এক পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল, যা রাসুলুল্লাহ ﷺ ও তার নিকটবর্তী যুগে নারীরা যে মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন, তার থেকে অনেক দূরে।
এই প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর প্রথম স্ত্রী হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ভূমিকা যতই বলা হোক, তা যেন কমই বলা হয়। ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অবস্থান বুঝতে তার জীবন এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন বিধবা ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নারী। রাসুলুল্লাহ ﷺ তখন তার তুলনায় যথেষ্ট তরুণ। খাদিজা (রা.) নিজেই তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। পূর্ববর্তী সংসার থেকে তার সন্তানও ছিল। পরে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ঘরেও তিনি সন্তানের জননী হন।

কিন্তু তার মাহাত্ম্য শুধু নবীজির স্ত্রী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নবুওয়াতের সূচনালগ্নে যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রথম ওহির অভিজ্ঞতা লাভ করে গভীরভাবে আলোড়িত হয়ে পড়েন, তখন খাদিজা (রা.) ছিলেন তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। হেরা গুহায় যা ঘটেছিল তা কোনো অশুভ বা শয়তানি ঘটনা নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সত্য ওহি, এই বিশ্বাস তিনিই সর্বপ্রথম নবীজির অন্তরে দৃঢ় করে দিয়েছিলেন। তাই তাকে উম্মুল মুমিনীন, মুমিনদের জননী, এবং খাইরুন নিসা, নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা, প্রভৃতি সম্মানিত উপাধিতে স্মরণ করা হয়েছে। খাইরুন নিসা নামটি আজও মুসলিম সমাজে নারীদের একটি অত্যন্ত প্রিয় নাম।

আধুনিক যুগের মুসলমানরা, বিশেষ করে মুসলিম নারীরা, ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে খাদিজা (রা.) এর অপরিসীম অবদানের কথা বারবার স্মরণ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল দীর্ঘ, বিশ্বস্ততা ও হৃদ্যতায় পূর্ণ।

খাদিজা (রা.) ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তিকাল করেন। এর আগে তাঁরা একসঙ্গে পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় কাটিয়েছিলেন। তার ইন্তিকালের পরই ধীরে ধীরে রাসুলুল্লাহ ﷺ অন্য নারীদের বিবাহ করেন।
তার পরবর্তী স্ত্রীদের মধ্যে ছিলেন অল্পবয়সী হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা, যিনি নবীজির ঘনিষ্ঠ সাহাবি হযরত আবু বকর (রা.) এর কন্যা। অন্য স্ত্রীদের অধিকাংশই ছিলেন বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা নারী। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পূর্বে দাসত্বের জীবনও অতিক্রম করেছিলেন।
পরবর্তী যুগে বিশেষ করে ভারতীয় মুসলিম সমাজের সংস্কারপন্থীরা এই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। উনিশ ও বিশ শতকে বিধবা বিবাহের পক্ষে তাঁরা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর জীবনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেন। কারণ হিন্দু সামাজিক রীতিনীতির প্রভাবে ভারতীয় মুসলমানদের একাংশের মধ্যেও দীর্ঘকাল বিধবা নারীর পুনর্বিবাহকে ভালো চোখে দেখা হতো না। অথচ তা নবীজির নিজস্ব আমলের সুস্পষ্ট দৃষ্টান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীগণও পরবর্তীকালে উম্মাহাতুল মুমিনীন অর্থাৎ মুমিনদের জননীগণ, উপাধিতে সম্মানিত হন। কুরআনে তাদের এবং মুসলিম নারীদের শালীনতা ও সৌন্দর্য প্রদর্শনের বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই বিধানের একটি সামাজিক তাৎপর্যও ছিল। তা শালীন ও মর্যাদাবান নারীদের এমন নারীদের থেকে পৃথক করত, যাদের পোশাক ও সামাজিক উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি উন্মুক্ত। অর্থাৎ নিজেকে সংযত ও শালীনভাবে উপস্থাপন করাকে তখন সংকীর্ণতার প্রতীক হিসেবে নয়, বরং সম্মান ও মর্যাদার প্রকাশ হিসেবেও দেখা হতো।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নারীর পর্দা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বিধান অনেক অঞ্চলে অনেক কঠোর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যেসব নারী রাসুলুল্লাহ ﷺ ও হযরত ফাতিমা (রা.) এর বংশধর হিসেবে সাইয়্যিদ পরিবারভুক্ত ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এসব বিধিনিষেধ কখনো কখনো অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হতো। ভারতীয় মুসলিম সমাজে তাদের ঘিরে আরও নানা সামাজিক নিষেধও গড়ে ওঠে। কিন্তু ইসলামের একেবারে প্রারম্ভিক যুগের চিত্র ছিল অনেক বেশি প্রাণবন্ত।
নারীরা সামাজিক ও সামষ্টিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। হযরত আয়িশা (রা.) হাদিস ও সুন্নাহ সম্পর্কিত জটিল বিষয় নিয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবিদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। শুধু তাই নয়, নবীজির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের বহু সূক্ষ্ম বিষয় সম্পর্কে তার অসাধারণ জ্ঞানের জন্য সাহাবিরা তার কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন। ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এমনকি নিজে যুদ্ধক্ষেত্রেও উপস্থিত হন এবং হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত রাজনৈতিক সংঘর্ষে অংশ নেন।
সুন্নি ঐতিহ্যে হযরত আয়িশা (রা.) এর জ্ঞান, তৎপরতা ও ব্যক্তিত্ব বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পক্ষ থেকে তার প্রতি স্নেহময় সম্বোধনের কথাও বহুবার উদ্ধৃত হয়েছে।
কাল্লিমিনি ইয়া হুমাইরা অর্থাৎ, হে হুমাইরা, আমার সঙ্গে কথা বলো।
স্নেহভরা এই সম্বোধন থেকে বোঝা যায়, হযরত আয়িশা (রা.) নবীজির হৃদয়কে প্রফুল্ল করতে পারতেন। পরবর্তী যুগের কিছু সুফি সাধক এই স্নেহের ভাষার মধ্যেও আধ্যাত্মিক প্রতীক খুঁজেছেন। তাদের কাছে প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলার এই আকুলতা কখনো কখনো মানুষের রূহের সঙ্গে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে শিয়া ঐতিহ্যে হযরত আয়িশা (রা.) কে একইভাবে দেখা হয় না। কারণ তিনি হযরত আলী (রা.) এর রাজনৈতিক বিরোধিতা করেছিলেন। শিয়া বিশ্বাসে হযরত আলী (রা.) হলেন প্রথম ইমাম এবং মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত নেতৃত্বের অধিকারী। শিয়া ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তিকালের পর নেতৃত্বের অধিকার হযরত আলী (রা.) এরই ছিল। তাদের মতে হযরত আবু বকর (রা.) এর খিলাফত গ্রহণ সেই অধিকারের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
হযরত আয়িশা (রা.) ও হযরত আলী (রা.) এর সম্পর্ককে ঘিরে আরও একটি ঘটনা ইতিহাসে আলোচিত হয়েছে। এক সফরে হযরত আয়িশা (রা.) এর হার হারিয়ে গেলে তিনি কাফেলা থেকে পিছিয়ে পড়েন এবং পরে একজন যুবক সাহাবির সহায়তায় কাফেলায় ফিরে আসেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার চরিত্র সম্পর্কে কুৎসা রটানো হয়েছিল। পরবর্তীতে কুরআনের সূরা নূরের ২৪:১১ নম্বর আয়াতসহ পরবর্তী আয়াতসমূহে সেই অপবাদ নাকচ করে তার পবিত্রতার ঘোষণা আসে।
তবু ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দের সংঘর্ষে হযরত আলী (রা.) এর মুখোমুখি হওয়া শিয়া সমাজে তার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব আরও গভীর করে। ফলে সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে আয়িশা অত্যন্ত জনপ্রিয় নারীনাম হলেও শিয়া সমাজে নামটি সাধারণত ব্যবহৃত হয় না। কিছু অতিরঞ্জিত প্রান্তিক শিয়া সাহিত্যে তাকে অত্যন্ত কঠোর ও অসম্মানজনক তুলনার মাধ্যমেও উপস্থাপন করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর চার কন্যা ছিলেন। ইসলামের আগমনের ফলে কন্যাসন্তানকে ঘিরে আরব সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক গভীর পরিবর্তন আসে।
জাহেলি আরবের কোনো কোনো গোত্রে কন্যাসন্তানকে বোঝা বা লজ্জার কারণ মনে করা হতো। এমনকি জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর প্রথাও ছিল। কুরআন এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় প্রশ্ন তুলেছে। কুরআনে সেই জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাশিশুর কথা বলা হয়েছে, যাকে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। ইসলামের পর কন্যাসন্তানকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে যে পরিবর্তন এল, তা মানুষের নামকরণের রীতিতেও প্রতিফলিত হতে শুরু করে।
আরব সমাজে একজন পুরুষের কুনিয়া, অর্থাৎ সম্মানসূচক পারিবারিক পরিচয়, সাধারণত পুত্রের নামে হতো। যেমন, আবু তালহা, অর্থাৎ তালহার পিতা। কিন্তু পরে কন্যার নামেও মানুষ কুনিয়া গ্রহণ করতে লাগল। কেউ হলেন আবু লায়লা, লায়লার পিতা; কেউ আবু রাইহানা, রাইহানার পিতা। এর মাধ্যমে যেন বলা হচ্ছিল, কন্যার পিতা হওয়ার মধ্যে কোনো লজ্জা নেই। এমনকি একটি প্রবাদধর্মী বর্ণনায় কন্যার পিতাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলা হয়েছে, কন্যাসন্তানও একদিন বহু পুত্রের জননী হতে পারে। অর্থাৎ বংশ, সম্মান ও কল্যাণ কেবল পুত্রের মাধ্যমেই আসে, এমন ধারণাকে ধীরে ধীরে ভেঙে দেওয়া হচ্ছিল।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর চার কন্যার মধ্যে তিনজন তার জীবদ্দশাতেই ইন্তিকাল করেন। তাঁরা হলেন হযরত যায়নাব (রা.), হযরত রুকাইয়া (রা.) এবং হযরত উম্মে কুলসুম (রা.)। হযরত রুকাইয়া (রা.) ও উম্মে কুলসুম (রা.) প্রথমে আবু লাহাবের দুই পুত্রের সঙ্গে বিবাহিত ছিলেন। পরে আবু লাহাব যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ এর চরম শত্রুতে পরিণত হয়, তখন সেই বিবাহ ভেঙে যায়। কুরআনের সূরা লাহাবে আবু লাহাবের বিরুদ্ধেই কঠোর ঘোষণা এসেছে।
পরবর্তীতে হযরত উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু, যিনি ৬৪৪ থেকে ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তৃতীয় খলিফা ছিলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর এই দুই কন্যাকেই পর্যায়ক্রমে বিবাহ করেন। একসঙ্গে দুই বোনকে বিবাহ করা শরিয়তে নিষিদ্ধ। তাই একজনের ইন্তিকালের পর তিনি অন্যজনকে বিবাহ করেন। এই কারণেই হযরত উসমান (রা.) যুন নূরাইন, অর্থাৎ দুই নূরের অধিকারী উপাধিতে প্রসিদ্ধ হন। তুরস্কসহ মুসলিম বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চলে উসমান নূরী নামটির জনপ্রিয়তার পেছনেও এই ঐতিহ্যের প্রভাব রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সর্বকনিষ্ঠ কন্যা হযরত ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার পিতার ইন্তিকালের পর মাত্র কয়েক মাস জীবিত ছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর চাচাতো ভাই হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) এর স্ত্রী ছিলেন। তাদের দুই পুত্র হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ছিলেন নবীজির অত্যন্ত প্রিয় নাতি।
ইতিহাস বলে, কাব্য ও মুসলিম স্মৃতিতে নবীজির সঙ্গে তার এই দুই নাতির স্নেহময় সম্পর্কের অসংখ্য ছবি সংরক্ষিত আছে। বলা হয়, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদের সঙ্গে খেলতেন, আদর করতেন, বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিতেন। হযরত হাসান (রা.) আনুমানিক ৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তিকাল করেন। ঐতিহাসিক সূত্রে তার বিষপ্রয়োগে মৃত্যুর কথাও বলা হয়েছে। আর হযরত হুসাইন (রা.) ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে কারবালার ময়দানে উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেন। ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আলী (রা.) এর শাহাদাতের পর উমাইয়ারা খিলাফতের ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। ইয়াজিদ যখন দ্বিতীয় উমাইয়া শাসক হিসেবে ক্ষমতায় আসে, তখন হযরত হুসাইন (রা.) আহলে বাইতের নেতৃত্ব ও ন্যায়সঙ্গত অধিকারের প্রশ্নে তার কর্তৃত্ব মেনে নেননি।
কারবালার সেই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল ১০ মহররমে। বিশেষ করে শিয়া মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি, স্মৃতি ও আধ্যাত্মিক জীবনে এই ঘটনা গভীর ও স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। মুসলিম বিশ্বের কবিতা ও শোকগাঁথায় নবীজির এই দৌহিত্রদের মহিমান্বিত বীর এবং শহীদদের অগ্রপুরুষ হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে। এর ফলে হযরত ফাতিমা (রা.) এর ব্যক্তিত্বও এক বিশেষ আবেগময় মর্যাদা লাভ করে। যদিও হযরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেই তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন, শিয়া ভক্তি ও আধ্যাত্মিক কল্পনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ ও হযরত আলী (রা.) এর পর তার স্থান অত্যন্ত উচ্চ।
তার বহু সম্মানসূচক উপাধি রয়েছে। যেমন যাহরা, দীপ্তিময়ী; বাতুল, পবিত্রা; মাসুমা, পাপ থেকে সুরক্ষিতা। এসব উপাধি আজও শিয়া মুসলিম সমাজে মেয়েদের নাম হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
হযরত হুসাইন (রা.) এর জন্য যারা অশ্রু ঝরায়, তাদের জন্য হযরত ফাতিমা (রা.) শাফাআতের মাধ্যম হবেন, এমন ভক্তিমূলক ধারণাও শিয়া ঐতিহ্যে পাওয়া যায়। মরমি ব্যাখ্যায় তাকে কখনো উম্মু আবিহা, অর্থাৎ নিজ পিতার মা বলা হয়েছে। এই উপাধির মধ্যে রয়েছে তার প্রতি নবীজির গভীর স্নেহ এবং পিতার প্রতি কন্যার অসীম মমতার ইঙ্গিত। হযরত ফাতিমা (রা.) এর দারিদ্র্য, ধৈর্য, ত্যাগ ও সরল জীবনকে ঘিরে মুসলিম ঐতিহ্যে অসংখ্য কাহিনি গড়ে উঠেছে। যিনি প্রকৃত অর্থে মুসলিম জগতের এক মহিমান্বিত নারী, তাঁকেই কাহিনিগুলোতে দেখা যায় অতি সাধারণ কয়েকটি গৃহস্থালি সামগ্রী নিয়ে সংসার শুরু করতে। ফাতিমার যৌতুক বা জিহাজনামা ই ফাতিমা নামে পরিচিত একধরনের সাহিত্যেও তার সামান্য গৃহস্থালি সামগ্রীর বিবরণ পাওয়া যায়। তার পিতার পক্ষে যা দেওয়া সম্ভব হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত সাধারণ।
তার দরিদ্রের প্রতি উদারতা, এমনকি নিজের পরিবার ক্ষুধার্ত থাকা সত্ত্বেও অন্যকে দেওয়া, তার সন্তানদের পোশাকের অভাব, এসব ঘটনা যুগে যুগে নানা ভাষায় ও নানা রূপে বলা হয়েছে। ফলে মুসলিম কন্যাদের সামনে তিনি হয়ে উঠেছেন ধৈর্য, দানশীলতা, লজ্জাশীলতা ও আত্মত্যাগের এক অনুপম আদর্শ।
মধ্যযুগে এমন একটি মুসলিম গোষ্ঠীর কথাও জানা যায়, যারা হযরত ফাতিমা (রা.) এর সম্মানে নিজেদের সম্পত্তি কন্যাদের উত্তরাধিকার হিসেবে দিয়ে দিত।
তার প্রতি এই গভীর শ্রদ্ধা শুধু শিয়া সমাজে সীমাবদ্ধ নয়। সুন্নি মুসলিম জগতেও হযরত ফাতিমা (রা.) এর মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু।
মুহাম্মদ ইকবাল ১৯১৭ সালে প্রকাশিত তার ফারসি মহাকাব্য রুমূযে বেখুদি বা আত্মবিসর্জনের রহস্য গ্রন্থে হযরত ফাতিমা (রা.) এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। আবার ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সময় আলী শরিয়তির বহুল আলোচিত Fatima is Fatima গ্রন্থেও তাকে মুসলিম নারীর মর্যাদা, আত্মসম্মান ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর দুই দৌহিত্র, হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন (রা.) এর বংশধারার মাধ্যমেই সাইয়্যিদ পরিচয়ের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হযরত আলী (রা.) এর অন্য স্ত্রীদের ঘরের সন্তানদের বংশধরদের ক্ষেত্রে এই পরিচয় প্রযোজ্য নয়।
প্রখ্যাত সুফি কবি সানাঈ, যিনি ১১৩১ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান আফগানিস্তানের গজনিতে ইন্তিকাল করেন, হযরত ফাতিমা (রা.) সম্পর্কে আবেগভরে লিখেছেন,

পৃথিবী নারীতে পরিপূর্ণ,
তবু ফাতিমার মতো নারী কোথায়?
নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা তিনি।
খাইরুন নিসা, অর্থাৎ নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা

এই সম্মানসূচক উপাধি যেমন হযরত খাদিজা (রা.) এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তেমনি হযরত ফাতিমা (রা.) এর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। কিছু সুফি সাধক আবার ফাতিমা নামটির সঙ্গে আল্লাহর গুণবাচক নাম ফাতির, অর্থাৎ সৃষ্টির সূচনাকারী, এর ধ্বনিগত ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক খুঁজেছেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকটবর্তী পরিবেশে আরও বহু নারীর কথা ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে তাদের কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গে হাবশায় হিজরত করেছিলেন। আবার উম্মে আতিয়্যা (রা.) এর মতো কোনো কোনো সাহাবিয়া রাসুলুল্লাহ ﷺ ও মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন অভিযানে গিয়ে আহতদের সেবা করতেন। নারীরা মসজিদে জামাতে সালাতেও অংশ নিতেন।
একটি হাদিসে এসেছে,
আল্লাহর বান্দীদের আল্লাহর ইবাদতের স্থানসমূহে যেতে বাধা দিয়ো না।
দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কেও এই প্রচলিত সুন্নাহ মেনে নিতে হয়েছিল, যদিও ব্যক্তিগতভাবে নারীদের বাইরে যাওয়া সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট সতর্ক ছিলেন। হযরত উমর (রা.) কঠোরতা ও ন্যায়বিচারের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। অথচ তার নিজের ইসলাম গ্রহণের ঘটনাতেই এক নারীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি তখনও রাসুলুল্লাহ ﷺ এর প্রবল বিরোধী। কিন্তু তার বোন ইতিমধ্যেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। একদিন বোনের ঘরে কুরআন তিলাওয়াত শুনে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। অথচ সেই কুরআনের বাণীই শেষ পর্যন্ত তার হৃদয়কে এমনভাবে স্পর্শ করে যে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ইসলামের সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষকদের একজন হয়ে ওঠেন। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি তার ফিহি মা ফিহি গ্রন্থেও হযরত উমর (রা.) এর এই হৃদয় পরিবর্তনের ঘটনা আলোচনা করেছেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নারী বংশধরদের মধ্যেও অসংখ্য আল্লাহওয়ালা ও পরহেজগার নারীর কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সাইয়্যিদা নাফিসা রহ.। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ ﷺ এর একজন প্রপৌত্রী। ষষ্ঠ ইমাম জাফর আস সাদিক রহ. এর এক পুত্রের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। পরে তিনি তার আত্মীয়া সাকিনার সঙ্গে কায়রোতে যান। সেখানে অল্প সময়ের মধ্যেই তার ইবাদত, যুহদ ও তাকওয়ার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসবিদ ইবনে খাল্লিকান তার জীবনীতে উল্লেখ করেছেন, চার সুন্নি মাযহাবের অন্যতম ইমাম, ইমাম শাফেয়ী রহ. পর্যন্ত তার সঙ্গে ইবাদতে অংশ নিতেন এবং তাকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন।
তাকে ঘিরে বহু কারামাতের কাহিনিও প্রচলিত ছিল। একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, তার ওযুর ব্যবহৃত পানির বরকতে এক পঙ্গু ইহুদি নারী আরোগ্য লাভ করেছিলেন।
২০৮ হিজরি, ৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে সাইয়্যিদা নাফিসা রহ. ইন্তিকাল করলে তার স্মৃতিতে একটি মাজার নির্মিত হয়। সেটি আজও কায়রোর একটি সুপরিচিত জিয়ারতের স্থান। মধ্যযুগে মামলুক সুলতানদের আমলেও তার জন্মদিন বিশেষ মর্যাদায় পালিত হতো।
তবে, প্রবন্ধের প্রারম্ভে উদ্ধৃত রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সেই বাণী এবং তার একাধিক বিবাহ, খ্রিষ্টীয় ধর্মতাত্ত্বিকদের মধ্যে বহু যুগ ধরেই বিস্ময় ও আপত্তির জন্ম দিয়েছে।
তাদের প্রশ্ন ছিল, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবি করেন, তিনি কীভাবে নারী ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের সৌন্দর্যের প্রতি এত স্বাভাবিক ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন? কারণ, প্রাচীন খ্রিষ্টীয় আধ্যাত্মিকতায় কৌমার্য, যৌন সংযম এবং অবিবাহিত ধর্মজীবনকে একটি উচ্চতর আদর্শ হিসেবে দেখা হতো।

কিন্তু মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গি এর মধ্যে কোনো আধ্যাত্মিক অবনতি দেখে না। বরং আল্লাহর সৃষ্টি করা জগতের সৌন্দর্য, সুগন্ধ, ভালোবাসা ও মানবিক সম্পর্কের মধ্যে যে আনন্দ রয়েছে, তা অনুভব করাও সৃষ্টিকর্তার নিয়ামত উপলব্ধির অংশ।

ভারতীয় মুসলিম সুফি ঐতিহ্যে এই হাদিসের একটি অভিনব ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। দিল্লির মহান সুফি হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহ. এর নামে প্রচলিত একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, হাদিসের নারী শব্দটি বিশেষভাবে হযরত আয়িশা (রা.) এর দিকে ইঙ্গিত করে, আর আমার চোখের শীতলতা বলতে হযরত ফাতিমা (রা.) কে বোঝানো হয়েছে, যিনি তখন সালাতে নিমগ্ন ছিলেন।
ইবনুল আরাবি রহ.-এর ব্যাখ্যাটি বরং আরও গভীর ও তাৎপর্যময়। তার মতে, রাসুলুল্লাহ ﷺ নারীকে শুধু স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তির কারণে ভালোবাসেননি। বরং তিনি নারীকে ভালোবেসেছেন, কারণ আল্লাহ তাদের ভালোবাসার যোগ্য করে সৃষ্টি করেছেন। এই হাদিসে সুগন্ধি শব্দটির অবস্থানও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

সুগন্ধ একদিকে নারীত্ব, কোমলতা ও সৌন্দর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যদিকে পবিত্রতা ও রূহানিয়াতের সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক আছে। আরবি ভাষার ব্যাকরণগত দিক থেকেও লেখক এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষ করেছেন। হাদিসের বাক্যে নারী ও সালাত দুটি স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দের মাঝখানে সুগন্ধি নামের একটি পুংলিঙ্গবাচক শব্দ এসেছে।
এই ভাষাগত বিন্যাসও সুফি সাধকদের কল্পনা ও ধ্যানের জন্য এক অন্তহীন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল।

একদিকে মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসা, অন্যদিকে সৌন্দর্যের সুবাস, আর সবশেষে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয়ের পূর্ণ প্রশান্তি; যেন মানুষের জীবনের পার্থিব ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক ভালোবাসা পরস্পরের শত্রু নয়। বরং সঠিক দৃষ্টিতে দেখলে উভয়ই মানুষকে সেই এক মহাসৌন্দর্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যার কাছ থেকেই সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত সৌন্দর্য এবং সমস্ত প্রশান্তির জন্ম।

এনিমেরি শিমেল
অনুবাদ: সাবিহা সূচি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *