ডিজিটাল প্যানোপটিকন এবং UDHR দ্বাদশ ধারার সংকট

বাংলাদেশ রাজনীতি ও অর্থনীতি

অভূতপূর্ব বিকাশ আমাদের যোগাযোগের পথকে উন্মুক্ত করে নাগরিক জীবনে অসামান্য গতিশীলতা আনলেও এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব যে মুক্ত ও গণতান্ত্রিক বিশ্ব গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা আজ এক সর্বব্যাপী ডেটা সংগ্রহ ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির এক জটিল নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে ।

সমকালীন বিশ্বের এই মোড় পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে মানব মর্যাদার অন্যতম পূর্বশর্ত; ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের (Universal Declaration of Human Rights – UDHR) দ্বাদশ ধারায় অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছিল, “No one shall be subjected to arbitrary interference with his privacy, family, home or correspondence.” কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর উত্তর-আধুনিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও অনিয়ন্ত্রিত করপোরেট পুঁজির এক যৌথ আঁতাতে গড়ে উঠেছে এক সর্বগ্রাসী ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’ (Digital Panopticon)।
আমাদের ব্যবহৃত স্মার্টফোন, বায়োমেট্রিক সেন্সর, এআই অ্যালগরিদম এবং বিগ ডেটার এই অদৃশ্য চোখগুলো কেবল আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সুরক্ষা প্রাচীরকেই ভাঙছে না, বরং মানুষের চিন্তার স্বায়ত্তশাসন ও মুক্ত সত্তাকে প্রতিনিয়ত পুঁজিবাদি বাজারের পণ্যে পরিণত করছে।
বর্তমান এই ডিজিটাল শৃঙ্খলের গঠন বোঝা যায় ১৮শ শতকের ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী জেরেমি বেনথামের বিখ্যাত প্রাতিষ্ঠানিক কারাগারের নকশা ‘প্যানোপটিকন’-এর তাত্ত্বিক ভিত্তির মাধ্যমে। বেনথামের সেই স্থাপত্যে একটি কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে মাত্র একজন প্রহরী বৃত্তাকারে সাজানো বন্দিশালার প্রতিটি কয়েদিকে সারাক্ষণ দেখতে পেতেন। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো এই কাঠামোর দার্শনিক বিশ্লেষণ করে দেখান যে, কীভাবে বন্দিরা প্রহরীর সেই সম্ভাব্য নজরদারিকে নিজেদের মনস্তত্ত্বের গভীরে ‘অভ্যন্তরীণকরণ’ (Internalization of the gaze) করে নেয়। বন্দি যেহেতু কখনোই নিশ্চিত হতে পারত না যে প্রহরী ঠিক এই মুহূর্তে তাকে লক্ষ্য করছে কি না, তাই সে ধরে নিত যে সে সারাক্ষণই দৃশ্যমান। ফলে সে নিজের অজান্তেই স্ব-নিয়ন্ত্রণ (Self-censorship) শুরু করে এক অনুগত বন্দীতে রূপান্তরিত হতো।

একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল যুগে এসে ইটের তৈরি সেই শারীরিক প্যানোপটিকন প্রতিস্থাপিত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অদৃশ্য অ্যালগরিদমের জালে।

আমাদের প্রতিটি ক্লিক, স্ক্রল, লাইক বা সার্চ কুয়েরি প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করছে এই অলক্ষ্য ডিজিটাল প্রহরীরা। ঐতিহ্যবাহী প্যানোপটিকনের তুলনায় এই নব্য-ডিজিটাল ব্যবস্থার সূক্ষ্ম ফাঁদটি হলো, মানুষ এখানে কোনো বাহ্যিক বলপ্রয়োগের কারণে বন্দি নয়, বরং সে অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং আনন্দের সাথে এই ডিজিটাল স্পেসে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু সেই অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে গঠিত ইচ্ছা ও পছন্দকে অদৃশ্য হাতে ব্যাকএন্ড থেকে পরিচালনা করা হচ্ছে। সামাজিক স্পেসে ‘লাইক’ বা সামাজিক অনুমোদনের (Social validation) মনস্তাত্ত্বিক তাড়না মানুষকে তার ভার্চুয়াল পরিচয়কে কৃত্রিমভাবে সাজাতে প্ররোচিত করছে, যা অবচেতনভাবেই তাকে নিজ জেলখানার এক অনুগত বন্দী হিসেবে তৈরী করছে।
বর্তমান সময়ে এসে UDHR-এর ১২ নম্বর ধারায় উল্লেখিত “যথেচ্ছ হস্তক্ষেপ” (Arbitrary interference) কথাটির আইনি ও নৈতিক অর্থ পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রথাগতভাবে এই ধারাটি কেবল মানুষের বাসগৃহে বা শারীরিক সীমায় রাষ্ট্রের বেআইনি অনুপ্রবেশ ঠেকানোর কথা ভাবতো। তবে সমকালীন আইনি তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রাইভেসির আধুনিক অর্থ হলো ব্যক্তির ‘তথ্যগত স্বাতন্ত্র্য নির্ধারণের অধিকার’ (Informational self-determination), অর্থাৎ নিজের ব্যক্তিগত ডেটা কে সংগ্রহ করবে, কতটুকু ব্যবহার করবে এবং কীভাবে তা বাণিজ্যিকীকরণ করবে, তার ওপর নাগরিকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা। রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নির্দিষ্ট কোনো অপরাধের প্রমাণ বা সুনির্দিষ্ট সন্দেহ ছাড়াই (Individualized suspicion) একটি পুরো দেশের সমস্ত নাগরিকের ডেটা নির্বিচারে সংগ্রহ করতে থাকে, তখন তা মানবাধিকার সনদের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদের মৌলিক চেতনার ওপর এক সর্বাত্মক আঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়।
‘নজরদারি পুঁজিবাদ’-এর (Surveillance Capitalism) অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির সাথে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার এই বৈশ্বিক আইনি সংকট কাঠামোগতভাবে যুক্ত হয়ে আছে । হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শশানা জুবফ প্রবর্তিত এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সমকালীন বাজারব্যবস্থা মানুষের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় অভিজ্ঞতাকে ফ্রিতে পাওয়া ‘আচরণগত কাঁচামাল’ (Behavioral Raw Material) হিসেবে দাবি করে। এই সংগৃহীত ডেটাকে এআই ও মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে Prediction products এ পরিণত করা হয় এবং সেগুলোকে করপোরেট বাজারের Behavioral Futures Markets এ চড়া দামে বিক্রি করা হয়।
এই পুরো অর্থনৈতিক লজিকটি কাজ করে একটি ‘একমুখী আয়না’র (One-way mirror) ন্যায়। সাধারণ ব্যবহারকারীগন জানতেও পারেন না যে তার ব্যবহৃত অ্যাপ কীভাবে তার ব্যক্তিগত আচরণের ইতিহাস সংরক্ষন বা ব্যবহার করছে কিন্তু তারা টেক জায়ান্টদের হাতে মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার অসীম ক্ষমতা তুলে দিচ্ছেন। নজরদারি পুঁজিবাদ আজ কেবল প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করে শান্ত থাকছে না; বরং তারা ‘আচরণগত হস্তক্ষেপ’ (Actuation)-এর মাধ্যমে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সক্রিয়ভাবে প্রভাবিত করছে। সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক সংকেত, অ্যালগরিদমিক নাজিং (Predictive Nudging), এবং রিওয়ার্ড বা শাস্তির ফাঁদ পেতে তারা এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলছে, যা মানুষকে তাদের বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক লাভের উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করে মাত্র। এর সরাসরি পরিণতি হলো মানুষের নিজের “ভবিষ্যৎ কাল ব্যবহারের অধিকার” (Right to the future tense) হারিয়ে যাওয়া, যা মূলত তার Free will এবং স্বায়ত্তশাসনের (Autonomy) মূল শক্তিকে ধূলিসাৎ করে দেয়।
আজকের এই সর্বগ্রাসী নজরদারি ব্যবস্থা কিন্তু হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো প্রযুক্তি নয়; এর ঐতিহাসিক শিকড় গেঁথে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী Military-Industrial Complex-এর কাঠামোতে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ড্রাইট ডি. আইজেনহাওয়ার যে সামরিক, শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিপজ্জনক আঁতাতের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন, সেই কাঠামোর ভেতরেই মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রকল্প ‘ARPANET‘-এর মাধ্যমে আজকের ইন্টারনেটের জন্ম হয়েছিল। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই প্রাতিষ্ঠানিক মেলবন্ধন এক ভীতিকর Military-Financial-Digital Complexএ রূপ নিয়েছে। একচেটিয়া টেক মনোপলিগুলো আজ রাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও দমনপীড়নকারী অঙ্গগুলোর সাথে প্রত্যক্ষ আঁতাতে আবদ্ধ।
উইকিলিকস এবং এডওয়ার্ড স্নোডেনের প্রকাশিত নথি বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির (NSA) গোপন ‘PRISM’ প্রোগ্রামের কথা উন্মোচন করেছিল । এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাইক্রোসফট, অ্যাপল, গুগল কিংবা ইয়াহুর মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তিদানবদের মূল সার্ভারে সরাসরি প্রবেশাধিকার লাভ করেছিল। তৎকালীন এনএসএ ডিরেক্টর কিথ আলেকজান্ডারের নীতিবাক্য “Collect It All”, ডিজিটাল যুগে মানুষের গোপনীয়তার আইনি প্রতিরক্ষাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। ইউডিএইচআর-এর ১২ নম্বর ধারায় ব্যক্তির ‘চিঠিপত্র’ বা যোগাযোগ (Correspondence) সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আধুনিককালের ইমেইল, মেসেজিং অ্যাপ এবং ডিজিটাল মেটাডেটার (Metadata) যুগে তা চরম ঝুঁকির মুখে। মানুষের প্রতিটি ডিজিটাল পদক্ষেপ আজ এমন এক স্থায়ী ইলেকট্রনিক ফুটপ্রিন্ট রেখে যায়, যা দিয়ে ব্যক্তির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ নজরদারি ফাইল বা “Dossier” তৈরি করা সম্ভব। মার্কিন আইনি ব্যবস্থার ‘থার্ড-পার্টি ডকট্রিন’ এর মতো বিতর্কিত নীতির কারণে রাষ্ট্র ধরে নেয় যে, নাগরিক কোনো থার্ড-পার্টি অ্যাপের কাছে তার তথ্য হস্তান্তরিত করামাত্রই তা আর ‘ব্যক্তিগত’ থাকে না এবং তার জন্য কোনো সার্চ ওয়ারেন্টের প্রয়োজন নেই। এটি মূলত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের মূল আত্মাকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে তোলে।
একই সাথে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রয়োগে আরেকটি বড় বৈশ্বিক প্রতিবন্ধকতা হলো রাষ্ট্রগুলোর সুবিধাবাদী ‘ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার অজুহাত’ (Extraterritoriality)। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই যুক্তি দেয় যে মানবাধিকার রক্ষার আইনি দায়বদ্ধতা কেবল তাদের নিজ ভূখণ্ডের নাগরিকদের জন্যই প্রযোজ্য; আন্তর্জাতিক ভূখণ্ডে থাকা বা বিদেশি নাগরিকদের গোপনীয়তা ভঙ্গের ব্যাপারে তাদের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞগণ (যেমন মার্কো মিলানোভিচ) এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে প্রখ্যাত ‘আউশভিৎস নিয়ম’ (Auschwitz rule) উপস্থাপন করেন। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির ব্যাখ্যার কারণে যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, একটি রাষ্ট্র নিজ দেশের ভেতরে যে অপরাধ বা নজরদারিকে বেআইনি মনে করে, ঠিক একই অপরাধ অন্য দেশের মাটিতে গিয়ে অবাধে করতে পারে, তবে সেই আইনি ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য, যুক্তিহীন ও বাতিলযোগ্য। মানবাধিকার মানুষের নাগরিকত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি, বরং তা মানুষের “অন্তর্নিহিত মর্যাদার” (Inherent dignity) ওপর প্রতিষ্ঠিত। ফলে প্রাইভেসির অধিকারের কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকতে পারে না।
ডিজিটাল প্যানোপটিকনের সাম্প্রতিকতম এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টি আজ কেবল মানুষের বাহ্যিক আচরণ বা ডিজিটাল যোগাযোগ পর্যবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বায়োমেডিকেল এবং তথ্যপ্রযুক্তির সংমিশ্রণে এটি এখন মানুষের দেহের অভ্যন্তরীণ জৈবিক জগতে প্রবেশ করেছে। ফরাসি দার্শনিক পল ভিরিলিওর তত্ত্ব অনুসরণ করে একে বলা যায় এক প্রকার ‘এন্ডো-কলোনাইজেশন’ (Endo-colonization) বা অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতা। এর অর্থ হলো,

ভৌগোলিক সীমানা বা বাইরের সমাজ দখলের পর পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রের নজরদারি এবার মানুষের শরীরের রক্ত-মাংস আর অভ্যন্তরীণ বায়োলজিক্যাল অঙ্গের দখল নিতে শুরু করেছে। মানবদেহের ভেতরে বা চামড়ায় বসানো সেন্সর, স্মার্ট ফিটনেস ট্র্যাকার এবং বায়োমেট্রিক মনিটরিং সিস্টেম রিয়েল-টাইমে মানুষের হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ বা পাকস্থলীর ক্রিয়ার মতো একদম অভ্যন্তরীণ শারীরবৃত্তীয় ডেটা ট্র্যাকিং করছে, যার ফলে মানুষের জীবনের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ, গোপন ও বায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়াগুলো রাষ্ট্রীয় ও করপোরেট ডেটা-মাইনিংয়ের কাঁচামালে পরিণত হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়া মানুষের ওপর এক অভূতপূর্ব ও অমানবিক ‘মেডিকেল গেজ’ (Medical gaze) চাপিয়ে দেয়। বায়ো-ডেটার সাহায্যে মানুষের শরীর যখন অ্যালগরিদমের কাছে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ পাত্রের ন্যায়, অর্থাৎ তার ভেতরে কী ঘটছে, তা নিখুঁতভাবে পড়া (Data-mining) সম্ভব হয়ে ওঠে তখন ব্যক্তিমানুষের ওপর এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়; যা তাকে অ্যালগরিদম যা-কিছুকে ‘আদর্শ, সুস্থ ও স্বাভাবিক শরীর’ (Normative body) বলে সংজ্ঞায়িত করে, ঠিক সেই মানদণ্ডে জীবন যাপনের জন্য প্ররোচিত করতে থাকে। ফলে ইউডিএইচআর-এর ১২ নম্বর ধারার পরিধিকে এখন কেবল ‘গৃহ’ বা ‘চিঠিপত্র’ সুরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, একে মানুষের জৈবিক ও অভ্যন্তরীণ শারীরবৃত্তীয় প্রাইভেসির সুরক্ষার ঢাল হিসেবেও পুনর্গঠন করতে হবে।
ডিজিটাল প্যানোপটিকন, নজরদারি পুঁজিবাদ এবং ইউডিএইচআর-এর ১২ নম্বর ধারার এই বহুমাত্রিক ধ্বংসাত্মক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়সমূহ প্রযুক্তি বর্জন বা অতীতে ফিরে যাওয়ার মধ্যে লুকিয়ে নেই। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত, সুদূরপ্রসারী এবং বহুমাত্রিক প্রতিরোধ কৌশল, যা আইনি সংস্কার, প্রযুক্তিগত নীতিশাস্ত্র, প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি এবং ব্যক্তিমানুষের সচেতনতাকে এক সূত্রে একত্র করবে। যেহেতু এই প্যানোপটিকন মানুষকে মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্কের মাধ্যমে ভেতর থেকে শৃঙ্খলিত করে, তাই প্রতিরোধের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো এই অদৃশ্য অ্যালগরিদমিক নজরদারিকে দৃশ্যমান করা এবং মানুষের নিজস্ব স্বাধীন সংকল্পকে (Human agency) সর্বাগ্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
এই পুনর্গঠনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি (Human Rights-Based Approach – HRBA) বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। ডিজিটাল শাসনব্যবস্থাকে নিরাপত্তা বা মুনাফার হাতিয়ার না বানিয়ে একে মানুষের মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এই কাঠামোর অধীনে নাগরিকগণ হবেন ‘অধিকার-ভোগকারী’ (Rights-holders) এবং রাষ্ট্র ও প্রাইভেট প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো হবে সরাসরি আইনি ‘দায়বদ্ধ সত্তা’ (Duty-bearers)। এই লক্ষ্যে বিশ্বের প্রতিটি দেশের সংবিধানে ডিজিটাল প্রাইভেসির স্পষ্ট অনুচ্ছেদ যুক্ত করতে হবে এবং ‘ডেটা হ্যাভেন’ (Data Havens) বা আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করার জন্য বাধ্যবাধকতাপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়ন করা জরুরি।
প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করতে ‘প্রাইভেসি-বাই-ডিজাইন’ (Privacy-by-Design) নীতিকে তাদের মূল নকশায় অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এই নীতি অনুযায়ী, যেকোনো অ্যাপ বা ডিজিটাল সেবা তৈরির একদম প্রাথমিক ধাপেই এনক্রিপশন (Encryption), ডেটা মিনিমাইজেশন (Bulk collection এর বদলে কেবল যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ডেটা নেওয়া) এবং ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসির (Differential Privacy) মতো সুরক্ষাকবচযুক্ত প্রযুক্তিগত কোডিং ব্যবহার করা আবশ্যক। একই সাথে, প্রযুক্তির অ্যালগরিদমিক অস্পষ্টতা বা ‘ব্ল্যাক-বক্স সিস্টেম’ (Black-Box Systems) বাতিল করে প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করছে তা দৃশ্যমান ও স্বচ্ছ করতে হবে।
এছাড়াও, প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির জন্য স্বাধীন ও ক্ষমতাসম্পন্ন Data Protection Authorities এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামাজিক ও বর্ণবাদী পক্ষপাত বা বৈষম্য পরীক্ষা করার জন্য Algorithmic Oversight Boards গঠন করতে হবে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাধ্যতামূলক রিপোর্ট প্রদানের বাধ্যবাধকতা এনে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় আইনি নজরদারির আওতায় আনতে হবে, যাতে তারা মানুষের আচরণকে কাঁচামাল বানিয়ে বিক্রি করা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
সবশেষে, ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের স্তর থেকে এই ‘নজরদারির চোখ’ (the gaze)কে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার (Reclaiming the gaze) সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা (Digital literacy) বা সচেতনতা বাড়িয়ে নিজের তথ্য ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। মনস্তাত্ত্বিক কন্ডিশনিং বা এআই-চালিত প্রেডিক্টিভ নাজিংকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের আচরণের অনুমানযোগ্যতাকে কমাতে হবে, যাতে অ্যালগরিদম মানুষকে সহজে ছকে বাঁধতে না পারে। ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা বাদ দিয়ে বাস্তব জীবনে মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগ ও সংহতি বাড়াতে হবে, যা নজরদারি-ভিত্তিক বাণিজ্যিক শৃঙ্খলের ওপর মানুষের শারীরিক ও মানসিক নির্ভরতা কমিয়ে আনবে। ডিজিটাল প্যানোপটিকনের কাচের দেয়াল ভেঙে নাগরিকের প্রাইভেসির অধিকার উদ্ধার করা কেবল কোনো আইনি লড়াই নয়;

এটি একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের মুক্ত চিন্তা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং স্বায়ত্তশাসিত সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার এক চূড়ান্ত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

শাহাদা নুর তামিমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। তিনি শিউলিমালা একাডেমির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ইন্টার্ন হিসেবে আছেন এপ্লাইড ডেমোক্র্যাসি ল্যাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

References:
Surveillance, panopticism, and self-discipline in the digital age – ORA – Oxford University Research Archive
Lessons from the Digital Panopticon
https://legacy.arisuchan.jp/cyb/src/1499548672983-0.pdf
Harvard professor says surveillance capitalism is undermining democracy
Michel Foucault’s Digital Panopticon: How AI & Social Media Became Our Prison
The Panopticon reaches within: how digital technology turns us inside out by Ann Light
HUMAN RIGHTS TREATIES AND FOREIGN SURVEILLANCE: PRIVACY IN THE DIGITAL AGE by Marko Milanovic
Digital Privacy as a Human Rights in the era of Mass Surveillance by Novera Bhatti
Surveillance Capitalism, Monopoly-Finance Capital, the Military-Industrial Complex, and the Digital Age by JOHN BELLAMY FOSTER and ROBERT W. M cCHESNEY

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *