আন্দালুসে রানি ইসাবেলার শাসনামলে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে যারা পালিয়ে মরক্কোতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন এক তরুণী; সাইয়্যিদা আল-হুররা। শৈশবেই তিনি দেখেছিলেন নিজের প্রিয় জন্মভূমিকে ধ্বংস হতে। যে মাটিকে তিনি নিজের ঘর বলে জানতেন, সেই ভূমিতেই আগুন জ্বলতে দেখেছেন। দেখেছেন মানুষের ওপর নির্যাতন, পরিবারের অসহায়ত্ব এবং একটি জাতির ধীরে ধীরে শিকড়হীন হয়ে পড়ার দৃশ্য।
আন্দালুস থেকে পালিয়ে মরক্কোতে আশ্রয় নেওয়ার পরও সেই ক্ষত তার ভেতর থেকে যায়। শরণার্থীজীবন, পরিচয় হারানোর বেদনা এবং নিজের জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার কষ্ট তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল সেসময়। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী জীবনে তার রাজনৈতিক চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরিবারের সিদ্ধান্তে তিনি বিয়ে করেন মরক্কোর এক বয়স্ক ও প্রভাবশালী শাসক আলী সিদি আল-মন্দ্রিকে। বয়সের বড় ব্যবধান থাকলেও এই বিয়েই সাইয়্যিদার জীবনে নতুন এক দরজা খুলে দেয়। তার স্বামী ছিলেন তেতুয়ানের গুরুত্বপূর্ণ একজন শাসক। স্বামীর পাশে থেকেই সাইয়্যিদা ধীরে ধীরে রাজনীতি, প্রশাসন ও কূটনীতির জটিল জগতকে খুব কাছ থেকে চিনতে শুরু করেন। বেশ অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তার স্বামী ও স্থানীয়দের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা ও নেতৃত্বের গুণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার বুদ্ধিমত্তা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং অসাধারণ পরামর্শ নিজ স্বামীকে তো মুগ্ধ করেছিল বটেই, সেই সাথে অল্প সময়ের মধ্যেই মরক্কোর রাজনৈতিক অঙ্গনেও তার নিজের একটি শক্ত পরিচয় তৈরি হয়।
স্বামীর মৃত্যুর পর সেই পরিচয় আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মরক্কোর শাসক তাকে তেতুয়ান শহরের গভর্নর নিযুক্ত করেন। একজন নারীকে এতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসানোর ঘটনা ছিল সে সময়ের জন্য অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। একদিকে ইউরোপে নারীদের ‘ডাইনি’ ও অন্যান্য কুৎসা রটনা করে আখ্যা দিয়ে নির্যাতন ও আগুনে পুড়িয়ে মারা হচ্ছিল; অন্যদিকে মরক্কোর মাটিতে একজন মুসলিম নারী নিজের যোগ্যতা ও রাজনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসছিলেন। তার পুরো নাম ছিল আয়েশা বিনতে আলী ইবনে রাশিদ আল-আলামি। ইতিহাসে অবশ্য তিনি বেশি পরিচিত হন সাইয়্যিদা আল-হুররা নামেই।
তেতুয়ানের শাসক হওয়ার পর সাইয়্যিদার ক্ষমতা শুধু শহরের প্রশাসনিক কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভূমধ্যসাগরের রাজনীতি, বাণিজ্য ও নৌযুদ্ধেও তার প্রভাব ক্রমশই বাড়তে থাকে। এই সময় তিনি মরক্কোর অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে মুহাম্মদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এর ফলে মরক্কোর রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও বেশী শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
তবে সাইয়্যিদার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার নিজের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধি। তিনি নিজে কোনো যুদ্ধজাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে তলোয়ার হাতে যুদ্ধ করতেন না। কিন্তু সেসময় তিনি এমন এক গোয়েন্দা ও তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, যার মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে চলাচলকারী জাহাজ, নাবিক, বণিক এবং শত্রুপক্ষের গতিবিধি সম্পর্কে আগেভাগেই তথ্য পাওয়া যেত।
ঠিক এই সময়েই তার যোগাযোগ হয় উসমানীয় নৌসেনাপতি বারবারোসা হায়রেদ্দিন পাশার সঙ্গে। প্রথম সাক্ষাতে বারবারোসা অবাক হয়েছিলেন যে, একজন নারী কীভাবে এত বড় রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করেছেন! ইতিহাসে পাওয়া যায়, নারী হওয়ার কারণে নাকি শুরুতে তিনি সাইয়্যিদার পরামর্শকে খুব একটা গুরুত্বও দেননি। কিন্তু খুব শিগগিরই তার ধারণার আমুল পরিবর্তন ঘটে। তিনি বুঝতে পারেন, সাইয়্যিদা শুধু একজন শাসক নন; তিনি ভূমধ্যসাগরের রাজনীতি ও সামরিক বাস্তবতা সম্পর্কে অসাধারণ জ্ঞান রাখেন। কোন শক্তি কখন কোথায় আঘাত করতে পারে, কোন বন্দর কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কার সঙ্গে জোট করা দরকার; এসব বিষয়ে তার বিশ্লেষণ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম।
এরপর থেকে বড় কোনো নৌ-অভিযান কিংবা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক জোটের আগে বারবারোসা তার পরামর্শ নিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তেতুয়ান হয়ে ওঠে ভূমধ্যসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামুদ্রিক কেন্দ্র। নাবিকেরা সেখানে আসত, যুদ্ধের পরিকল্পনা হতো, বন্দিদের নিয়ে আলোচনা চলতো এবং বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ পরিচালিত হতো। এমনকি ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগালের শাসকরাও বন্দিবিনিময় ও মুক্তিপণের বিষয়ে সাইয়্যিদার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধ্য হতে লাগলো।
ধীরে ধীরে সাইয়্যিদার সবচেয়ে বড় কৌশলগুলোর একটি হয়ে উঠলো বন্দিদের ব্যবহার করার পদ্ধতি। সেই সময়ে যুদ্ধে বন্দি হওয়া মানুষদের সাধারণত দাস হিসেবে বিক্রি করা হতো কিংবা মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হতো। কিন্তু সাইয়্যিদা বুঝতে পেরেছিলেন, একজন বন্দির মূল্য শুধু তার মুক্তিপণের অর্থেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারেনা, বরং তার রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে কোনো দারুণ স্বার্থ।
তাই তিনি ভূমধ্যসাগরজুড়ে একটি বিস্তৃত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। বণিক, নাবিক, জলদস্যু এমনকি শত্রুপক্ষের লোকজনকেও তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হতো। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বন্দি হলে তার পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান, সম্পদ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হতো। আর এরপর সেই তথ্যই আবার ব্যবহার করা হতো কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে। ফলে একজন বন্দি হয়ে উঠত একটি আপাদমস্তক রাজনৈতিক হাতিয়ার।
এই কৌশল সাইয়্যিদাকে এমন এক শক্তিতে পরিণত করেছিল, যাকে উপেক্ষা করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তার কর্মকাণ্ডের প্রভাব ইস্তাম্বুলেও পৌঁছে যায়। সেসময় বারবারোসা হায়রেদ্দিন পাশা যে গুরুত্বপূর্ণ বন্দিদের উসমানীয় রাজধানীতে পাঠাতেন, তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দর-কষাকষিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। আর এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে ছিলেন একজন নারী; সাইয়্যিদা আল-হুররা।
স্পেনের জন্য এক দুঃস্বপ্ন আন্দালুসের স্মৃতি সাইয়্যিদার কাছে স্মৃতির চেয়েও বেশি কিছু ছিল, সেটা তার সংগ্রামমুখর জীবনে স্পষ্ট। নিজের হারানো জন্মভূমির কথা তিনি ভুলে যাননি। ফলে স্পেনের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল বিশেষভাবে কঠোর। বারবারোসা হায়রেদ্দিন পাশার সঙ্গে জোট গড়ে তিনি স্পেন ও পর্তুগালের জন্য ভূমধ্যসাগরকে ক্রমশ অনিরাপদ ও তাদের জন্য ভয়ের রাজ্যে পরিনত করে তোলেন।
শুধু তাই নয়, স্পেনের কোনো নৌবহর বা সামরিক দল আক্রমণের প্রস্তুতি নিলে হুররার গোয়েন্দারা অনেক সময় আগেই খবর পৌঁছে দিত। ফলে মুসলিমরা প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত হতে পারত এবং অনেক নিরীহ মানুষকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতো। অন্যদিকে স্পেনের উপকূলে পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনাতেও সাইয়্যিদার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে স্প্যানিশদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন এক ভয়ংকর ও অপরাজেয় শত্রু।
সেসব অঞ্চলে বারবারোসা হায়রেদ্দিন পাশার নামের পরই সাইয়্যিদা আল-হুররার নাম উচ্চারিত হতে থাকে আতঙ্ক ও ঘৃণার সঙ্গে। এমনকি তাকে অভিশাপ দেওয়ার জন্য স্পেনের পক্ষ থেকে পোপের কাছে ধর্মীয় আচার পালনের অনুরোধ করা হয়েছিল বলেও বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি ভূমধ্যসাগরের রাজনীতিতে ঠিক এভাবেই স্পেন ও পর্তুগালের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন।
তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল; একদিন হারানো গ্রানাডা আবার মুসলিমদের হাতে ফিরে আসবে। যদিও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবুও তিনি থেমে যাননি। গ্রানাডা পুনরুদ্ধার করতে না পারলেও আন্দালুসের হারানোর প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা তিনি চালিয়ে গেছেন জীবনভর। একের পর এক অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা, নৌ-আক্রমণ ও কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে তিনি স্পেনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ছিলেন। তার হাতে ছিল না বিশাল কোনো সাম্রাজ্য, ছিল না একটি বিশাল সেনাবাহিনী। কিন্তু ছিল অসাধারণ রাজনৈতিক বুদ্ধি, কূটনৈতিক মেধা এবং হারানো জন্মভূমির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।
সাইয়্যিদা আল-হুররা তাই ইতিহাসে শুধু একজন নারী শাসক হিসেবেই নন, একইসাথে এমন এক নারী হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন যিনি তলোয়ারের চেয়ে কৌশলকে, পেশি শক্তির চেয়ে কূটনীতিকে এবং যুদ্ধের চেয়ে বুদ্ধিমত্তাকে বেশি কার্যকর করে তুলেছিলেন।
আন্দালুসের পতনের যে ক্ষত তার শৈশবকে বিষাদে ভরিয়ে দিয়েছিল, জীবনের পরবর্তী প্রায় তিন দশক ধরে সেই ক্ষতই যেন তার প্রতিরোধের শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
