মরক্কো: আফ্রিকার বুকে সভ্যতার পদধ্বনি

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিত্ব

উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় অবস্থিত মরক্কো (আল-মাগরিব) মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্র। একদিকে আটলান্টিক মহাসাগর, অন্যদিকে ভূমধ্যসাগর—এই অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এটি আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে আরব মুসলিমদের আগমনের মাধ্যমে এই ভূখণ্ডে ইসলামী সভ্যতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সাহাবিদের সময় থেকেই ইসলামের শান্তি ও মানবতার মহান বার্তা মরক্কোর উর্বর ভূমিতে পৌঁছালেও উমাইয়া সেনাপতি উকবা ইবন নাফে প্রথম আটলান্টিক অভিমুখে বিজয়ের পদধ্বনি পৌঁছে দেন। এসময় তিনি আটলান্টিকের তীরে নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন—

হে সমুদ্র! আমি যদি জানতাম, তোমার ওপারেও কোনো মানবসভ্যতার চিহ্ন আছে, তাহলে কোনো দ্বিধা না করেই তোমার উত্তাল ঢেউ ভেদ করে আমি আমার ঘোড়া ছুটিয়ে দিতাম।

এই বিজয়ের পর থেকে স্থানীয় আমাজিঘ (বারবার) জনগোষ্ঠীর মানুষও ধীরে ধীরে ইসলাম গ্রহণ করে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। আমাজিঘ ও আরবদের সম্মিলিত নেতৃত্বে গড়ে ওঠে এমন সব রাজবংশ, যারা শুধু উত্তর আফ্রিকাই নয়, আল-আন্দালুসের ইতিহাসেও অমর হয়ে আছে।
৭১১ সালে তারিক ইবন জিয়াদের আইবেরিয়া অভিযান থেকে শুরু করে আলমোরাভিদ ও আলমোহাদ সালতানাতের উত্থান—সব ক্ষেত্রেই মরক্কো ছিল ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

মুসলমানদের আগমনের ফলে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে আন্দালুসীয় ও আরবীয় সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে এখানে এক সমৃদ্ধ ও অনন্য সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।
নান্দনিক স্থাপত্য, সুনিপুণ কারুকার্যমন্ডিত বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মোজাইক শিল্প, বাজারে নানা রঙের নানা স্বাদের মসলার বাহার, স্থানীয় নারীদের হাতে বোনা কার্পেট ও হস্তশিল্প, পিতল ও তামার কারুশিল্প আজও যেকোন মানুষকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। এছাড়াও মরক্কোর রয়েছে সমৃদ্ধ সঙ্গীত ও মিউজিক এর ঐতিহ্য। এবং এদেশের অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে, এর প্রত্যেকটি শহরের নিজস্ব কিছু ঐতিহ্য ও প্রতীকী সৌন্দর্য রয়েছে। ফলে প্রতিটি শহরই আলাদা আলাদা অর্থবহতা বহন করে। 

ফেজ, মারাকেশ, রাবাত, শেফশাওয়েন, তেতুয়ান, মেকনেস, টাঙ্গিয়ার ও সিজিলমাসার মতো শহরগুলো আজও সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে।

ফেজ : মরক্কোর হৃদয়
৭৮৯ সালে মহানবী (সা.)-এর বংশধর ইদরিস প্রথম ফেজ নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পরপরই এটি কেবল একটি শহরই ছিল না; বিশ্বের সুদূর পশ্চিম প্রান্তে আফ্রিকার বুকে সভ্যতার নোকতা সদৃশ।

পরবর্তীতে আন্দালুস থেকে আগত হাজার হাজার মুসলিম এবং কায়রাওয়ান হয়ে কিছু আরব পরিবার শহরের দুই তীরে বসতি স্থাপন করে। এর ফলে এমন এক নগরীর জন্ম হয়, যেখানে পূর্ব ও পশ্চিমের সভ্যতা মিলিত হয়ে এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে তোলে।

নবম শতকে প্রতিষ্ঠিত আল-কারাউইয়্যিন (al-Qarawiyyin) মসজিদ পরবর্তীতে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। এই শহরের সাথে জড়িত সবচেয়ে বিখ্যাত নামগুলোর একটি কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ফাতিমা আল ফিহরি। এছাড়া প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন ও তার জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি সময়ে এই শহরে কাটিয়েছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ফেজ ছিল মরক্কোর বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় রাজধানী—যেখানে সারা দুনিয়ার আলেমরা জ্ঞান চর্চার জন্য সমবেত হতেন। এভাবে এটি পৃথিবীর অন্যতম সভ্য নগরী গুলোর একটি হয়ে ওঠে। এর শিল্প-সংস্কৃতি  ও স্থাপত্যেও তার ছাপ প্রতিফলিত হতে থাকে। 

মারাকেশ : রাজকীয় আভিজাত্যের নগরী
১০৭০ সালে সাহারা থেকে উঠে আসা আলমোরাভিদরাঈমান ও তেজদীপ্ততা ছিলো যাদের বৈশিষ্ট্য—মারাকেশকে তাদের সালতানাতের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এখান থেকেই তারা সাহারা থেকে পিরেনিজ পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত এক সালতানাত পরিচালনা করেছিল, আল-আন্দালুসকে কনকুইস্তার হাত থেকে রক্ষা করেছিল এবং ভূমধ্যসাগরের উভয় তীরকে এক পতাকার নীচে একত্রিত করেছিল। তবে এই শহরের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় ইউসুফ বিন তাশফিনকে, যিনি ১০৮৬ সালের সাগরাজাস (Zallaqa/Sagrajas) যুদ্ধে কাস্তিলের রাজা ষষ্ঠ আলফন্সোকে পরাজিত করে আল-আন্দালুসকে দীর্ঘ সময়ের জন্য রক্ষা করেন। তাঁর শাসন ইসলামী পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। 

পরবর্তীতে আলমোহাদরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং কুতুবিয়া মসজিদ নির্মাণ করে, যার মিনার আজও নগরীর আকাশসীমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এরপর সাদীয় রাজবংশ আবারও মারাকেশকে তাদের রাজধানী বানায় এবং রেখে যায় সাদীয় সমাধিসৌধ—যা ইসলামী বিশ্বের সবচেয়ে চমৎকার সমাধি-স্থাপত্যগুলোর একটি। তিনটি রাজবংশ। তিনটি স্বর্ণযুগ। একটি শহর, যার কাছে মরক্কোর ইতিহাস বারবার ফিরে এসেছে।
যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে আল বান্না আল মারাকুশি এই শহরের সন্তান। গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো দীর্ঘদিন ইসলামী বিশ্বে পাঠ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

রাবাত : বিজয়ের দুর্গ
রাবাতের সূচনা হয় রিবাত আল-ফাতহ (অর্থাৎ বিজয়ের দুর্গ) হিসেবে। আলমোহাদরা আল-আন্দালুসে তাদের সামরিক অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে এটি নির্মাণ করেছিল। সুলতান ইয়াকুব আল-মানসুরের উদ্যোগে নির্মাণ শুরু হওয়া হাসান টাওয়ার—যা বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার হওয়ার কথা ছিল—আজও শহরের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে তাঁর মৃত্যুর কারণে এটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়; অপূর্ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক স্মারক হয়ে।

শতাব্দীকাল পরে, নিজস্ব মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত আন্দালুসি নাবিক ও জলযোদ্ধারা কাসবাহ অব দ্য উদায়াসকে স্পেনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা এবং আটলান্টিক মহাসাগরে ইউরোপীয় জাহাজে আক্রমণের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
১৯১২ সালে ফ্রান্স মরক্কোতে তাদের প্রটেক্টরেট প্রতিষ্ঠা করলে রাবাতকে প্রশাসনিক রাজধানী ঘোষণা করে। স্বাধীনতার পরও আজ পর্যন্ত এটি মরক্কোর রাজধানী হিসেবে বহাল রয়েছে।

শেফশাওয়েন : নীল দেয়ালের নগরী
১৪৭১ সাল, যখন পর্তুগিজরা মরক্কোর উপকূল দখলের পথে এগোচ্ছিল এবং কনকুইস্তা আল-আন্দালুসের ওপর ক্রমেই শক্ত হয়ে উঠছিল, তখন মাওলায়ে আলী ইবনে রশিদ আল-আন্দালুস থেকে আগত মুসলিম ও ইহুদি শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলেন এবং আইবেরীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগঠিত করেন। রিফ পর্বতমালায় একটি দুর্গনগর প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল আইবেরিয়া থেকে পালিয়ে আসা আন্দালুসি মুসলিম ও ইহুদিদের জন্য আশ্রয়স্থল এবং আইবেরীয় সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ঘাঁটি।

পাশের তেতুয়ানের মতো এখানেও তারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল তাদের ভাষা, স্থাপত্য ও বেদনা। চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শহরটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাইরের বিশ্বের জন্য বন্ধ ছিল। খ্রিস্টানদের প্রবেশ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো।
আজ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আলোকচিত্রে ধরা পড়া শহরগুলোর একটি হিসেবে শেফশাওয়েনের যে নীল রঙে রঞ্জিত দেয়ালগুলো পরিচিত, সেগুলো তাদেরই উত্তরাধিকার—হারিয়ে যাওয়া আল-আন্দালুসের একটি অংশ, যা মরক্কোর পাহাড়ে নির্বাসনের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। এই শহরের নীল দেয়ালগুলো আজও আন্দালুসের মানুষের মাতৃভূমি ছেড়ে আসার কষ্ট, প্রতিরোধের স্পৃহা এবং আত্মপরিচয়ের স্মারক হিসেবে পরিচিত। 

তেতুয়ান : আন্দালুসের উত্তরাধিকার
রিফ পর্বতমালার পাদদেশে এবং ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত তেতুয়ান বহু শতাব্দী ধরে মরক্কো ও আল-আন্দালুসের মধ্যে এক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন নগরীটি ধ্বংস হওয়ার পর পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে গ্রানাডার পতন এবং কনকুইস্তার প্রেক্ষাপটে আন্দালুস থেকে নির্বাসিত মুসলিম ও ইহুদিরা এটিকে নতুন করে গড়ে তোলেন।
এসময় সিদি আল-মানদারি গ্রানাডা পতনের পর নির্বাসিত আন্দালুসি মুসলিমদের নেতৃত্ব দিয়ে তেতুয়ান পুনর্নির্মাণ করেন। তাঁর হাত ধরে আন্দালুসি স্থাপত্য, সংগীত ও কারুশিল্প মরক্কোতে নতুন জীবন লাভ করে।
তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন তাদের স্থাপত্যশৈলী, কারুশিল্প, ভাষা, সঙ্গীত এবং নগর-সংস্কৃতি। ফলে তেতুয়ান দ্রুতই আন্দালুসি ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। এই শহরের প্রতিটি বাড়ির চুনকাম করা দেয়াল, সাজানো আঙিনা ও রোয়াক এর মাধ্যমে আবাসন এবং কারুশিল্পের ঐতিহ্যে আজও সেই উত্তরাধিকার স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে তেতুয়ান ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য এবং আন্দালুসি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। আজও তেতুয়ানকে অনেকেই “আল-আন্দালুসের কন্যা” বলে অভিহিত করেন—একটি শহর, যেখানে নির্বাসিত এক সভ্যতার স্মৃতি এখনো জীবন্ত হয়ে আছে। 

মেকনেস : পাথরে গড়া সুলতানের স্বপ্ন
আলাউই সুলতান মাওলায় ইসমাইলের আগে মেকনেস ছিল একটি সাধারণ শহর। তাঁর পর এটি ইসলামী বিশ্বের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ রাজধানীতে পরিণত হয়।

সুলতান ইসমাইল পঞ্চান্ন বছর শাসনকালে বিশাল প্রাসাদ, বিজয়তোরণ, শস্যাগার, বারো হাজার ঘোড়ার আস্তাবল এবং মাইলের পর মাইল দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ করেন। তাঁর এই কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছিল এক নিরবচ্ছিন্ন মহিমার স্বপ্ন এবং তাঁর সমসাময়িক ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুইয়ের প্রাসাদ ভার্সাইকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘোষিত আকাঙ্ক্ষা থেকে। তাঁর অভিজাত কৃষ্ণাঙ্গ বাহিনী আবিদ আল-বুখারি এখানেই অবস্থান করত, ফলে মেকনেস যেমন ছিল একইসাথে সালতানাতের রাজধানী, তেমনি ছিল এক শক্তিশালী সামরিক দুর্গও। ইউনেস্কো মেকনেসকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

টাঙ্গিয়ার: বন্দর নগরী
মরক্কোর অন্য কোনো শহর এতবার বিভিন্ন শক্তির দখলে যায়নি। স্থানীয় গোত্র ও রাজবংশ, ফিনিশীয়, রোমান, আরব, পর্তুগিজ, স্প্যানিশ, ইংরেজ এবং ফরাসি—সকলেই কোনো না কোনো সময় এই শহর দখল করেছে, হারিয়েছে এবং এর জন্য যুদ্ধ করেছে।
৭১১ সালে তারিক ইবন জিয়াদ টাঙ্গিয়ার থেকেই আইবেরিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন, যার মাধ্যমে আল-আন্দালুসের ইতিহাসের সূচনা হয়। ইংরেজরা দুই দশক শহরটি দখলে রাখলেও ১৬৮৪ সালে মাওলায় ইসমাইল তাদের বহিষ্কার করেন।
বিংশ শতকে টাঙ্গিয়ার একটি আন্তর্জাতিক শক্তিতে পরিণত হয়, যা একাধিক ইউরোপীয় শক্তির যৌথ প্রশাসনের অধীনে ছিল। কৌশলগত অবস্থানের কারণে এটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে একক কোনো রাষ্ট্রের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে ইউরোপীয় শক্তিগুলো প্রস্তুত ছিল না।

১৯৫৬ সালে মরক্কো সম্পূর্ণভাবে টাঙ্গিয়ার পুনরুদ্ধার করে। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে টাঙ্গিয়ার কেবল একটি শহরই ছিল না; এটি ছিল পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের নিয়ন্ত্রণের প্রতীক—যার জন্য একের পর এক সাম্রাজ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পর্যটক, আর রিহলার রচয়িতা ইবনে বতুতার জন্মস্থান এই শহরেই। 

সিজিলমাসা : হারিয়ে যাওয়া মরূদ্যান
আজ সিজিলমাসা তাফিলালাত মরূদ্যানে অবস্থিত এক ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগে এটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী।
৭৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শহর ছিল ট্রান্স-সাহারান স্বর্ণবাণিজ্যের উত্তর প্রান্তের প্রধান কেন্দ্র। মালি, ঘানা এবং সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আগত কাফেলাগুলো এখানেই তাদের স্বর্ণ নিয়ে আসত, যা পরে ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বে প্রবেশ করতো। ইসলামী ও ইউরোপীয় অর্থনীতিতে প্রচলিত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ প্রথমে সিজিলমাসার মধ্য দিয়েই অতিক্রম করত।

এখানেই আলমোরাভিদ আন্দোলন তাদের প্রাথমিক সমর্থন লাভ করেছিল। এখানেই মরক্কোর বর্তমান শাসক আলাউই রাজবংশের শিকড় নিহিত। উনবিংশ শতকে গোত্রীয় সংঘাতের ফলে শহরটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং আর কখনো পুনর্নির্মিত হয়নি।

মরক্কোর ইতিহাস কেবল রাজবংশ, যুদ্ধ কিংবা সাম্রাজ্যের ইতিহাস নয়; এটি জ্ঞান, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, স্থাপত্য এবং সভ্যতার অগ্রযাত্রার এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। ফেজের জ্ঞানকেন্দ্র, মারাকেশের ঐশ্বর্য ও নান্দনিকতা, রাবাতের দুর্গ, শেফশাওয়েন ও তেতুয়ানের আন্দালুসি উত্তরাধিকার, মেকনেসের রাজকীয় স্থাপত্য, টাঙ্গিয়ারের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত গুরুত্ব এবং সিজিলমাসার বাণিজ্যিক ঐশ্বর্য—এভাবে প্রতিটি শহরই মরক্কোর ইতিহাসের এক একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়।

আজও এই নগরীগুলোর অলিগলি, মসজিদ, দুর্গ, প্রাসাদ, মদিনা ও ধ্বংসাবশেষ অতীতের সেই গৌরবোজ্জ্বল যুগের স্মৃতি বহন করে। তাই মরক্কো শুধু একটি দেশ নয়; এটি ইসলামী সভ্যতার পশ্চিম প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস, যেখানে প্রতিটি শহর অতীতের এক একটি অমূল্য দলিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *