নারীজাতির উন্নয়নে বিশ্বনবী (স)

চিন্তা ও দর্শন

হযরতের অন্যতম প্রধান সংস্কার: নারীজাতির মর্যাদা ও মূল্যদান। নারীকে দিয়েছেন তিনি কল্যাণময়ী, পুণ্যময়ী রূপ। হযরত মুহম্মদের আবির্ভাবের পূর্বে জগতের সর্বত্র নারীকে অস্থাবর সম্পত্তির মতোই মনে করা হতো। কী ভারতবর্ষ, কী চীন, কী মিসর, কী আরব, কী ইউরোপ – কোথাও নারীর কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ছিল না। নারীকে দাসীর মতোই মনে করা হতো এবং তাকে যথেচ্ছ ব্যবহার করা চলত। এমনকি সভ্যতার প্রাচীন লীলাভূমি ভারতবর্ষেও নারীর মর্যাদা খুব উন্নত ছিল না। বৈদিক যুগে কোনো বিষয়ে নারীর অধিকার থাকলেও সাধারণত তারা পুরুষের কৃপার পাত্রী রূপেই পরিগণিত হতেন। সে যুগে নারীর অবস্থা কীরূপ ছিল, সে সম্বন্ধে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের ‘বেদবাণী’ থেকে আমরা কিঞ্চিৎ উদ্ধৃত করছি:
“বৈদিক যুগে বহু যুবতীর বিবাহ হইত না, তাহারা কুমারী অবস্থাতেই পিতৃগৃহে থাকিত। বিকলাঙ্গ কন্যাদের বিবাহ হইত না। বিবাহ হইয়া গেলে কন্যার পৈতৃক সম্পত্তিতে কোন অধিকার থাকিত না। এইজন্য কন্যার ভ্রাতারা ভগিনীর বিবাহ দিতে চেষ্টিত থাকিত। বিধবা প্রায়ই স্বামীর ভ্রাতাকে বিবাহ করিত। এইজন্য স্বামীর ভ্রাতার নাম হইয়াছিল দেবর (দ্বিতীয় বর)। পুরুষেরা বিবাহ করিত। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের ব্যভিচারই নিন্দনীয় ছিল কন্যা হরণ করিয়াও বীরগণ বিবাহ করিত। বিধবা হইলে পত্নী পতির চিতায় শয়ন করিয়া দেবরের আহ্বানে উঠিয়া আসিত ও পতির শব দাহ করিত।”
(বেদবাণী, ৩২৪-৩২৭)
এ দ্বারা বোঝা যায়, ভারতীয় নারীর মর্যাদা ও সম্ভ্রম খুব বেশি ছিল না; নানাভাবে তারা লাঞ্ছনা ভোগ করত। অবশ্য গার্গী, উত্তর-ভারতী, সীতা, সাবিত্রী ইত্যাদি মহিমাময়ী ও বিদুষী নারীও যে ছিলেন না, তা নয়; তবে সাধারণত নারীজাতির অবস্থা খুব উন্নত ছিল বলে মনে হয় না।
নারীর এই লাঞ্ছনা চরমে উঠেছিল খ্রিস্টানদের হাতে। নারী যে চির অভিশপ্ত, নারীই যে সকল পাপ ও সকল অকল্যাণের মূল, এ শুধু সংস্কার নয় এ তাদের ধর্মবিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত। তারা বলে: Adam (আদম) এবং Eve (হাওয়া) যখন স্বর্গে ছিলেন, তখন Eve-ই শয়তানের প্ররোচনায় প্রথম মুগ্ধ হন, আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করে নিজে জ্ঞান-বৃক্ষের (Tree of knowledge) ফল ভক্ষণ করেন এবং Adam-কে দিয়েও ভক্ষণ করান। ২২ সেই পাপের জন্যই আল্লাহ্ Adam এবং Eve-কে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেন। Adam-এর এই পতনে সমগ্র মানবজাতির পতন হয়েছে, আর এই পতনের মূল কারণই হচ্ছে Eve, Adam নয়। অন্য কথায়, নারীজাতিই হচ্ছে সকল পাপের মূল। এই জন্যই খ্রিস্টান পাদ্রীগণ নারীকে “শয়তানের যন্ত্র” (organ of the devil), “কামড় দেওয়ার জন্য সর্বদা প্রস্তুত বিচ্ছু” (a scorpion ever ready to sting), “বিষাক্ত বোলতা” (the poisonous asp) ইত্যাদি আখ্যায় বিভূষিত করে রেখেছে।
কিন্তু মানব-পতনের এই কাহিনী ইসলামের নয়। এই পতনের জন্য ইসলাম বিবি হাওয়াকে কোনোদিনই দায়ী করেনি। এই সম্বন্ধে কোরআন বলছে:

“এবং (আমরা বলিলাম) হে আদম, তুমি এবং তোমার স্ত্রী এই উদ্যানে (স্বর্গোদ্যানে) বাস কর; খুশিমত সব ফল-ফলারি খাও, কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটে যাইও না, কারণ তাহা হইলে তোমরা অন্যায়কারীদিগের মধ্যে গণ্য হইবে।”
"কিন্তু তাহাদের ভিতরকার কু-প্রবৃত্তিগুলি যাহাতে বাহির হইয়া আসে সেই উদ্দেশ্যে সে (শয়তান) বলিল: তোমাদের প্রভু (আল্লাহ্) এই গাছের ফল ভক্ষণ করিতে নিষেধ করিয়াছেন কেন জানো? তোমরা উভয়ে দুইটি ফেরেশতা না বনিতে পার অথবা যাহাতে অমর না হইতে পার, এবং সে উভয়ের নিকটেই প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিল: নিশ্চয়ই আমি তোমাদের হিতৈষী বলিয়াই উপদেশ দিতেছি।"
“তখন সে তাহাদিগকে ধোঁকা দিয়া পতন ঘটাইল; কাজেই যখন তাহারা সেই নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করিল, তাহাদের কু-প্রবৃত্তিগুলি তাহাদের নিকট প্রতিভাত হইয়া উঠিল এবং তখন উভয়ে বৃক্ষের পত্রদ্বারা নিজদিগকে আচ্ছাদিত করিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিল। তখন তাহাদের প্রভু বলিলেন: “আমি কি তোমাদের ঐ বৃক্ষের নিকট যাইতে নিষেধ করি নাই এবং বলি নাই যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?” তাহারা বলিল: “হে আমাদের প্রভু, আমরা নিজেদের প্রতি নিজেরাই অন্যায় করিয়াছি, যদি তুমি আমাদিগকে ক্ষমা না কর, তাহা হইলে নিশ্চয়ই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হইব।”
(৭:১৯-২৩)

শয়তান যে তার কু-প্রস্তাব প্রথমত আদমের নিকটেই করে, এবং আদমই যে প্রথম প্রলুব্ধ হয়ে বিবি হাওয়ার সঙ্গে একত্রে মিলে নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করেন, কোরআন তা স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে:

"কিন্তু শয়তান তাহার নিকট (আদমের নিকট) কু-প্রস্তাব করিল, বলিল: হে আদম, আমি কি তোমাকে অমরতা বৃক্ষের কাছে এবং অনন্তকালস্থায়ী একটি রাজ্যে লইয়া যাইব?"
"তখন তাহারা উভয়েই সেই বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করিল, কাজেই তাহাদের কু-প্রবৃত্তিগুলি তাহাদের নয়ন সম্মুখে ভাসিয়া উঠিল এবং তাহারা তখন উভয়েই বৃক্ষপত্রের দ্বারা নিজদিগকে আচ্ছাদিত করিতে লাগিল। এইরূপে আদম তাহার প্রভুর আজ্ঞা লঙ্ঘন করিল এবং তাহার জীবন দুঃখময় হইল। "

অতএব দেখা যাচ্ছে, মানবজাতির এই পতনের জন্য নারী দায়ী নয়। ইসলাম নারীকে এই অপবাদ থেকে রক্ষা করেছে। নারীকে সে দিয়েছে এক মহিমাময়ীর রূপ। সুখে-দুঃখে, দুর্দিনে-সুদিনে নারী যে পুরুষের চিরসঙ্গিনী, এই আদর্শই দেখতে পাচ্ছি আমরা বিবি হাওয়ার মধ্যে। আদর্শ স্বামী-স্ত্রীর মতোই তাঁরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হয়ে হাত ধরাধরি করে বেহেশত থেকে বিদায় হয়েছেন। এখানে ইসলাম নারী-পুরুষের দাম্পত্য জীবনের যে মহান চিত্র এঁকেছে, তার তুলনা নেই। এত বড় সর্বনাশের পরও কারও প্রতি কেউ অনুযোগ করছে না, বা সে সম্বন্ধে কোনো একটি কথাও উঠছে না। স্বামীর অপরাধ হলেও হয়েছে, স্ত্রীর অপরাধ হলেও হয়েছে – উভয়ে উভয়ের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুঃখ-বেদনাকে সমানভাবে ভাগ করে নিয়ে পথে বের হয়েছে। এ দাম্পত্য জীবনের কী পবিত্র উজ্জ্বল আদর্শ।
ইসলামে নারীর জন্মের যে ইতিহাস আছে, তা থেকেও দেখা যাবে, নারী-পুরুষের মধ্যে মূলত কোনোই পার্থক্য নেই; একই উপাদান দ্বারা আল্লাহ্ উভয়কেই সৃষ্টি করেছেন:

"হে লোকসকল তোমাদের প্রভুর প্রতি (কর্তব্য সম্বন্ধে) সজাগ হও তিনি তোমাদিগকে একটি প্রাণী (আদম) হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং তাহার সঙ্গিনীকে (হাওয়াকে) একই উপাদান হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন।"(৪:১)

বিবি হাওয়া যে হযরত আদমের পার্শ্বদেশ থেকে সৃষ্টি হয়েছিলেন; অন্যকথায় পুরুষ ও নারীর উপাদান যে একই, এই কথাও কোরআনে স্পষ্ট উল্লেখিত হয়েছে:

"এবং আল্লাহর একটা নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদিগের মধ্য হইতে তোমাদের সঙ্গিনীদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন যাহাতে তোমরা মনের শান্তি পাইতে পার।(৩০:২১)

অতএব দেখা যাচ্ছে, উৎপত্তির দিক দিয়ে ইসলাম নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনি- উভয়কেই তুল্য মর্যাদা দান করেছে।
স্ত্রীরূপে নারীর মর্যাদা এবং অধিকার সম্বন্ধে কোরআন কী বলছে দেখুন:

"তাহারা (তোমাদের স্ত্রীগণ) তোমাদের অঙ্গাবরণ এবং তোমরা তাহাদের অঙ্গাবরণ।"
(২:১৮৭)
"এবং পুরুষের উপর তাহাদের ঠিক সেইরূপ ন্যায্য অধিকার আছে যেমন তাহাদের উপর পুরুষদের আছে।"(২:২২৮)

অন্যত্রঃ
পিতা বা স্বামীর সম্পত্তিতে নারীর যে কতখানি অধিকার আছে সে কথাও এখানে স্মরণীয়। এই সম্বন্ধে ইসলাম নারীকে যা দান করেছে আজ পর্যন্ত অন্য কোনো ধর্ম তা করতে পারেনি।
বিবাহকালীন স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর দেনমোহর-দানও মুসলিম নারীর সম্ভ্রমের আর একটি দৃষ্টান্ত। ইসলামে শুধু যে পুরুষই স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে তা নয়, স্ত্রীও প্রয়োজন হলে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করাতে পারে। নারীজাতির অধিকারের এ এক চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত সন্দেহ নেই।
নারীদের আত্মা আছে কিনা এবং তারা স্বর্গে যাওয়ার অধিকারী কি-না, এ খ্রিস্টান জগতে আজও তর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে। বহু গবেষণার পর পাদ্রীগণ স্থির করলেন: স্ত্রীলোকেরা স্বর্গে যেতে পারবে বটে, কিন্তু তখন তাদের নারীত্বের কোনো চিহ্ন থাকবে না।
ঠিক এরই পাশে ইসলাম কী বলছে দেখুনঃ
“এবং যে কেহই ন্যায় কার্য করিবে বিশ্বাসী হয় স্ত্রীই হউক, পুরুষই হউক স্ত্রী হউক, পুরুষই হউক এবং যদি সে তাহারা সকলেই বেহেশতে যাইবে।”
(৪০:৪০)
“একই ফল মিলিবে সেখায়
পাবে তারা পবিত্র সঙ্গিনী
একসাথে তারা সেখা রবে চিরকাল।”(২:২৫)
“অনন্তকাল স্থায়ী বেহেস্তের সেই উদ্যান-যেখানে তাহারা (পুণ্যবানেরা) প্রবেশ করিবে তাহাদের সৎকার্যশীল মাতাপিতার সহিত এবং তাহাদের স্ত্রীদিগের সহিত এবং পুত্রকন্যাদিগের সহিত এবং ফেরেস্তাগণ প্রত্যেক দরজা দিয়া তাহাদের নিকট হাজির হইবে।”(১২: ২৩)
নারীজাতির সম্বন্ধে কোরআনের তথা হযরত মুহম্মদের এ-ই হচ্ছে অভিমত। হযরত নিজে যে এইসব নির্দেশ সর্বতোভাবে মেনে চলতেন, সে কথা বলাই বাহুল্য। নারীদের সম্বন্ধে তিনি নিজে কী বলছেন, দেখুন:
“তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন শাসনকর্তা। কাজেই আল্লাহ্ প্রত্যেককে তাহাদের প্রজাদিগের প্রতি ব্যবহার সম্বন্ধে প্রশ্ন করিবেন। আমির (রাজা) দেশের শাসনকর্তা, পুরুষ তাহার বাড়ির সকলের উপর শাসনকর্তা, স্ত্রী তাহার স্বামীর এবং তাহার পুত্রকন্যাদের শাসনকর্ত্রী এবং এই জন্যই তোমাদের প্রত্যেককেই তোমাদের প্রজা সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হইবে।”
“তোমাদের মধ্যে তাহারাই শ্রেষ্ঠ যাহারা তাহাদের স্ত্রীদিগের প্রতি শ্রেষ্ঠ ব্যবহার করে।”
“কোন মুসলিম তাহার স্ত্রীকে ঘৃণা করিবে না। সে যদি তাহার স্ত্রীর একটি দোষের জন্য অসন্তুষ্ট হয় তবে অন্য আর একটি গুণের জন্য তাহার উপর সন্তুষ্ট থাকিবে।”
“তোমাদের স্ত্রীকে সদুপদেশ দাও, ক্রীতদাসীর মত তোমার সম্ভ্রান্ত স্ত্রীকে প্রহার করিও না।”
“তোমরা যখন খাইবে, তোমাদের স্ত্রীদিগকেও খাইতে দিবে। তোমরা যখন নূতন বসন-ভূষণ পরিবে, তোমাদের স্ত্রীদিগকেও পরিতে দিবে।”
হযরত শুধু উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি। নিজের স্ত্রীদের প্রতি তিনি এই শ্রেষ্ঠ ব্যবহারই করে গেছেন। হযরত যখন ২৫ বছরের যুবক তখন তিনি ৪০ বছর বয়স্কা বিধবা খাদিজাকে বিবাহ করেন। এই স্ত্রীর সঙ্গে তিনি ২৫ বছর একত্রে বাস করেন। ৬৫ বছর বয়সে বিবি খাদিজার মৃত্যু হয়, তখন হযরতের বয়স ৫০ বছর। কাজেই বলা যেতে পারে জীবনের শ্রেষ্ঠ অংশ তিনি এই বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়েই কাটিয়ে দেন। তবু কী মধুর সম্বন্ধই না ছিল এই দম্পতি যুগলের মধ্যে! হযরত যে বিবি খাদিজাকে কত গভীরভাবে ভালোবাসতেন এবং কত যে সম্ভ্রমের চোখে দেখতেন, তা এই কথা থেকে প্রমাণিত হয় যে, বিবি খাদিজার জীবদ্দশায় তিনি অন্য কাউকে বিবাহ করেননি। এর পরেও যে-সমস্ত নারীকে তিনি বিবাহ করেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার ছিল একেবারে অনবদ্য। তিনি কাউকে নিগ্রহ কাউকে অনুগ্রহ করেননি; সকল স্ত্রীর প্রতিই সমান ব্যবহার করে গেছেন।
অবশ্য হযরত যে নারীকে অবাধ স্বাধীনতা দান করে গেছেন, তাও নয়। আদর্শচ্যুত বিকৃত নারী-প্রগতিকে তিনি কখনও সমর্থন করেননি, কারণ তিনি জানতেন, ওটা নারীর প্রগতি নয় অধোগতি। সমাজে যাতে দুর্নীতি না ঢোকে, সেইজন্য তিনি যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে গেছেন। স্ত্রীকে সর্বপ্রথম স্বাধীনতা দান করলেও তাকে তার স্বামীর অধীন করে দিয়েছেন। এ তাঁর নিজের ইচ্ছা নয়, স্বয়ং আল্লাহর বিধান:
“এবং তোমাদের উপর তাহাদের (স্ত্রীদের) ন্যায্য অধিকার আছে, তবে পুরুষ নারী অপেক্ষা একধাপ উর্ধ্বে।”(২:২২৮)
“পুরুষ স্ত্রীদিগের রক্ষাকর্তা, কারণ আল্লাহ্ একজনের অপেক্ষা আর একজনকে (কোন কোন বিষয়ে) শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন।”(৪:৩৪)
বলা বাহুল্য, এই বিধান খুবই সঙ্গত হয়েছে। পুরুষ নারী অপেক্ষা বলিষ্ঠ ও শক্তিমান, কঠোর জীবন-সংগ্রামের জন্য সে উপযোগী। পক্ষান্তরে নারী দয়া-মায়া, স্নেহ-মমতা ও প্রীতি-প্রেমের জীবন্ত মূর্তি। এইজন্য উভয়ের কর্মক্ষেত্র ভিন্ন। কিন্তু তাই বলে কেউ কারও চেয়ে নিকৃষ্ট নয়, প্রত্যেকের কার্যই মহৎ এবং অপরিহার্য। সৃষ্টির মূলে দেখতে পাওয়া যায় দুটি শক্তি ক্রিয়াশীল: সংরক্ষণ এবং প্রতিপালন (protection and preservation)। সংরক্ষণের কার্য পুরুষের আর প্রতিপালনের কার্য নারীর। সৃষ্টিকে রক্ষা করতে হলে আগে সংরক্ষণের প্রয়োজন। এই হিসাবেই নারী পুরুষের অধীন। অন্যান্য কতকগুলি স্বাভাবিক প্রতিবন্ধকও নারীকে পুরুষ অপেক্ষা ‘একধাপ নিচে’ নামিয়ে রেখেছে।
স্ত্রী-পুরুষের মেলামেশা সম্বন্ধেও ইসলাম সতর্কতা অবলম্বন করেছে। ইসলামে নারীর অবরোধের ব্যবস্থা নেই সত্য, কিন্তু পর্দার ব্যবস্থা আছে। কোরআন বলছে:
“বিশ্বাসী পুরুষদিগকে বল, তাহারা তাহাদের দৃষ্টি নত করুক এবং গুপ্ত স্থানগুলি আচ্ছাদিত রাখুক: ইহাই তাহাদের পক্ষে পবিত্রতা এবং বিশ্বাসী নারীদিগকেও বল, তাহারাও তাহাদের দৃষ্টি নত করুক এবং গোপনীয় অংশগুলি আবৃত রাখুক এবং যেটুক না-বাহির করিলে চলে না, সেইটক ছাড়া (অর্থাৎ হাত, পা ও মুখ) অন্য কোন অংশের অলঙ্কার প্রদর্শন না করে।”
(২৪:৩০-৩১)
অন্যত্র আল্লাহ্ বলছেন:
“হে রসূল, তোমার স্ত্রী-কন্যাদিগকে এবং বিশ্বাসীদিগের স্ত্রী-কন্যাদিগকে বল, তাহারা যেন তাহাদের গায়ের উপর একটি অঙ্গাবরণ দেয়। ইহাই অধিকতর সঙ্গত হইবে, কারণ তাহা হইলে লোকে তাহাদিগকে সম্ভ্রান্ত বংশীয়া বলিয়া চিনিতে পারিবে এবং পীড়া দিবে না।” (৩৩:৪৯)
এ দ্বারা এই কথা যেন কেউ মনে না করেন: তবে আর নারীর স্বাধীনতা রইল কোথায়? রইল বৈকি! উচ্ছৃঙ্খলতা বা বাড়াবাড়ি দমন করলেই যে স্বাধীনতার লোপ হয়, তা নয়। মুসলিম নারী অবাধে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে পারে, ঈদ উৎসবে যোগ দিতে পারে, হজে যেতে পারে, যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবা করতে পারে, নিজে যুদ্ধ করতে পারে, জ্ঞানচর্চা করতে পারে, অন্যান্য ক্ষেত্রেও সে স্বাধীনভাবে বহু কাজ করতে পারে। সর্বক্ষেত্রেই নারীর প্রবেশাধিকার আছে। ইসলামের ইতিহাসই তার প্রমাণ।
সমাজে যাতে ব্যভিচার ও দুর্নীতির প্রসার না হয়, সেজন্যও ইসলাম কঠোর ব্যবস্থা করে রেখেছে। এই সম্বন্ধে কোরআনের বিধান দেখুন:
“ব্যভিচারকারিণী এবং ব্যভিচারকারী সম্বন্ধে প্রত্যেককে ১০০টি দোৱা (চাবুক) মার এবং কোনরূপ অনুকম্পা দ্বারা চালিত হইয়া আল্লাহর বিধান পালনে শৈথল্য করিও না – যদি তোমরা আল্লাহ্ এবং রোজকিয়ামতে বিশ্বাস কর, এবং একজন বিশ্বাসীকে তাহাদের শাস্তির সাক্ষী করিয়া রাখ। ব্যভিচারকারী অথবা কোন পৌত্তলিক নারীকে বিবাহ করিবে না এবং ব্যভিচারিণী সম্বন্ধে বিধান এইঃ যে তাহার সহিত ব্যভিচার করিয়াছে অথবা কোন পৌত্তলিক ছাড়া অন্য কেহ তাহাকে বিবাহ করিতে পারিবে না, বিশ্বাসীদিগের এই কার্য করা নিষেধ। এবং যাহারা স্বাধীন-স্ত্রীলোকদিগের সম্বন্ধে কুৎসা প্রচার করে, অথচ চারিটি সাক্ষী উপস্থিত করিতে পারে না, তাহাদিগকে ৮০টি চাবুক মার এবং কখনও তাহাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করিও না; ইহারাই সীমা লঙ্ঘনকারী। শুধু তাহারা ছাড়া যাহারা অনুতপ্ত হয় এবং ন্যায় কার্য করে; নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ক্ষমাশীল এবং দয়াময়! এবং যাহারা তাহাদের স্ত্রীদিগের (চরিত্র) সম্বন্ধে দোষারোপ করে, কিন্তু নিজে ছাড়া অপর কোন সাক্ষী উপস্থিত করিতে পারে না, তাহাদের উভয়ের মধ্যে (স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে) একজনের সাক্ষ্য চারিবার লইতে হইবে; আল্লাহকে সাক্ষী করিয়া তাহাকে বলিতে হইবে যে, সে নিশ্চয় সত্যবাদী। এবং পঞ্চম বার তাহাকে এই বলিতে হইবে যে, যদি সে মিথ্যাচারী হয়; এবং আল্লাহর অভিশাপ যেন তাহার শিরে নামিয়া আসে তাহার (স্ত্রী) শাস্তি মাফ হইবে – যদি সে চারিবার আল্লাহর কসম করিয়া বলে যে সে (পুরুষ) মিথ্যা কথা বলিতেছে। এবং পঞ্চম-বার যদি বলে যে, আল্লাহর গজব তাহার (নিজের) উপর পড়িবে যদি পুরুষটি সত্যবাদী হয়।”(২৪:২-৯)
আল্লাহ্ এবং রসূলের এই বিধান নারীজাতির মর্যাদাকে যে কতদূর বাড়িয়ে দিয়েছে; তা আর বলে বোঝানোর অপেক্ষা রাখে না। মুসলিম নারীর সঙ্গে একজন অ-মুসলিম নারীর তুলনামূলক সমালোচনা করলেই তা অনায়াসে বোঝা যায়। এই প্রগতির যুগেও অন্য সমাজে নারীজাতির দুর্গতির অন্ত নেই। পতিতা বা অধঃপতিত নারীর সংখ্যা দেখলেই তা বোঝা যাবে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, মুসলিম সমাজে ঐ শ্রেণীর নারী নেই বললেই চলে। এর কারণ এই যে, মুসলিম সমাজে এই জঘন্য পরিস্থিতি ঘটার কোনো অবকাশ নেই। মুসলমান পুরুষ কোনো নারীর উপর যত অত্যাচারই করুন না কেন, নারীকে কখনও গৃহ বা সমাজ ত্যাগ করে চলে যেতে হয় না- আপন পায়েই সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। সমাজও তাকে সাহায্য করে। পক্ষান্তরে ইসলামের শিক্ষার গুণে কোনো পুরুষ কোনো নারীকে সমাজ থেকে বের করে দেওয়ার মতো নির্মম হতে পারে না; কারণ সে কোরআনের বিধানকে ভয় করে। নারীর প্রতি শ্রদ্ধা তার মজ্জাগত। এমনকি নারী-হরণের মতো এমন জঘন্য পাপ কার্যের মধ্যেও ইসলাম পথভ্রষ্টদের পুণ্য ও কল্যাণের দিকে আহ্বান করে। অ-মুসলমান গুণ্ডা নারী-হরণ করলে সে নিজে তো অধঃপাতে যায়, সঙ্গে সঙ্গে অপহৃতা নারীটির সমগ্র জীবনকে ব্যর্থ করে দেয়। হতভাগিনীর ইহকাল পরকাল দুই-ই নষ্ট হয়ে যায়। তার সারা জীবন ধরে বাজে শুধু একটা ব্যর্থতার সুর। মহিমময়ী কুলবধূর মর্যাদা সে কিছুতেই পায় না। কাজেই কোনো অ-মুসলমানের নারী-হরণের মধ্যে শুধু থাকে পাপ, শুধু থাকে ছলনা, শুধু সর্বনাশের পরিকল্পনা। মনুষ্যত্বের নাম গন্ধও সেখানে নেই, কোনো কল্যাণ জিজ্ঞাসা নেই – আছে কেবল পশু জীবনের ঘৃণিত সুখভোগের উদগ্র কামনা। কিন্তু মুসলমানের নারী-হরণের মধ্যে একটি বলিষ্ঠ মনুষ্যত্ব আছে; পাপপথে নামলেও পুণ্যের প্রতি তার আকর্ষণ আছে। অ-মুসলমান গুণ্ডার মতো কিছুতেই সে অপহৃতা নারীকে অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগ করে না। সে চায় প্রকাশ্য দিবালোকে সমাজ জীবনের মধ্যে এনে মানুষের মর্যাদা দিয়ে তাকে উপভোগ করতে। বাইরের সকল ভ্রুকুটি এবং সকল বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে যখন কোনো পতিতাকে বা কোনো অপহৃতা নারীকে বিবাহ করে তাকে গৃহিণীর গৌরবময় আসনে অধিষ্ঠিত করে, তখন একটা সবল মনুষ্যত্বই তার মধ্যে ফুটে ওঠে। সে নিজে বাঁচে, নারীটিকেও বাঁচায়। একটা নারীর ব্যর্থ জীবন যখন এইরূপ সার্থকতার ফলপুষ্পে পল্লবিত হতে দেখি, তখন অন্তরের সকল শ্রদ্ধা নিবেদিত হয় সেই গুণ্ডার পদতলে, আর মনে জাগে সে মহাপুরুষের শিক্ষা ও আদর্শের কথা- যাঁর জন্য এমন জঘন্য পাপ-কার্যের মধ্য দিয়েও এতবড় কল্যাণ সম্ভব হয়। 
“বেহেশত জননীর চরণ তলে অবস্থিত” মাতৃজাতির প্রতি শ্রদ্ধা এর চেয়ে আর অধিকতর হতে পারে কি? মাতাপিতাকে সেবা এই অমর বাণী হযরত মুহম্মদের।
মাতৃজাতির প্রতি শ্রদ্ধা এর চেয়ে আর অধিকতর হতে পারে কি? মাতাপিতাকে সেবা
করার সুযোগ তাঁর জোটেনি, তবু আপন মৃতা জননীর প্রতি এবং দুধ-মা হালিমার প্রতি তিনি যে ব্যবহার দেখিয়ে গেছেন তাই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট। পরিণত বয়সে হযরত একবার বিবি আমিনার সমাধিক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে তাঁর কবর জিয়ারত করেছিলেন এবং নীরবে অশ্রুবর্ষণ করেছিলেন। দুধ-মা হালিমার প্রতিও তাঁর শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। একবার হালিমা মদিনায় হযরতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন, সাহাবাবৃন্দের মধ্যে বসেছিলেন। হালিমাকে দেখতে পেয়ে তিনি সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ান এবং তাঁর বসার জন্য নিজের শিরস্ত্রাণ বিছিয়ে দেন, সঙ্গে সঙ্গে সকলের নিকট পরিচয় দেনঃ “ইনি আমার মা”। হালিমা যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন তিনি তাঁকে নানাভাবে সাহায্য করে এসেছেন। হোনায়েনের যুদ্ধে তাঁর দুধ-বোন শায়েমার কারণেই তিনি ৬০০০ বন্দীকে বিনাপণে মুক্তিদান করেন।
মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য সম্বন্ধে তিনি অন্যত্র যে-সব উপদেশ দিয়েছেন, তাও প্রণিধানযোগ্য।
“পিতার সন্তোষই আল্লাহর সন্তোষ, পিতার অসন্তোষই আল্লাহর অসন্তোষ।”
মাতাপিতা মারা গেলেই যে তাঁদের প্রতি কর্তব্য বা বাধ্যতার শেষ হয়, তা নয়। “তাঁহাদের আত্মার মুক্তির জন্য পুত্রকে প্রার্থনা করিতে হইবে এবং তাঁহাদের নামে দান-খয়রাত ও পুণ্য কার্য করিতে হইবে।” এ-ই হযরতের আদেশ।
বিবাহ-প্রথার উন্নতি সাধন হযরতের একটি প্রধান সংস্কার। এ দ্বারা নারীজাতির মহিমা ও মর্যাদাকে তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিবাহকে তিনি একটা পবিত্র অনুষ্ঠানে পরিণত করেছেন। হযরতের আবির্ভাবের পূর্বে জগতের প্রত্যেক জাতিই বিবাহকে অতি হালকাভাবে গ্রহণ করত। আরবে তো বিবাহের কোনো মর্যাদাই ছিল না; যখন খুশি, যাকে খুশি বিবাহ করা যেত। যখন খুশি তালাক দেওয়া যেত। এক পুরুষ বিভিন্ন নারীকে তো বিবাহ করতই, এক নারীও একই সময়ে একাধিক পুরুষকে বিবাহ করত। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যেও বিবাহের নামে যথেচ্ছাচার চলত। বাইরে এক বিবাহের প্রচলন থাকলেও ভিতরে ভিতরে বহু প্রকারের অনাচার ও ব্যভিচারের স্রোত বইত। স্বাধীন প্রেমই ছিল তাদের যৌন মিলনের আদর্শ। প্রাচীন ভারতেও বিবাহের কোনো মর্যাদা ছিল না। রাক্ষস-বিবাহ, পৈশাচিক-বিবাহ, গান্ধর্ব বিবাহ ইত্যাদি তো ছিলই, তদুপরি আবার কৌলিন্য প্রথার কল্যাণে বিবাহের নামে যে অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতা চলত, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।
কিন্তু হযরত এসে এই বিবাহ-প্রথাকে মধুর এবং মহিমান্বিত করেছেন। বিবাহকে ধর্মের অঙ্গীভূত করে তিনি একে পবিত্র করেছেন। তিনি বলেছেন
” যে ব্যক্তি বিবাহ করে, সে তাহার অর্ধেক ধর্ম পালন করে।”
ইসলাম বিবাহকে কী চোখে দেখে, কোরআনের আয়াত থেকেই তা সুস্পষ্ট হবে। কোরআন বলছে:
“হে লোকসকল, তোমাদের প্রভুর প্রতি কর্তব্য সম্বন্ধে তোমরা সাবধান হও – যে-প্রভু একজন হইতে (হযরত আদম হইতে) তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং তাহার সঙ্গিনীকে (হাওয়াকে) একই উপাদান হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহাদের দুইজন হইতে বহু নর-নারীকে ছড়াইয়া দিয়াছেন।”
(৪:১)
অন্যত্র বলছেঃ
“তিনি তোমাদিগকে একটি প্রাণী হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং তাহারই মধ্য হইতে তাহার সঙ্গিনীকে পয়দা করিয়াছেন যাহাতে সে (স্বামী) তাহার (স্ত্রীর) প্রতি আকৃষ্ট হইতে পারে।”
(৭:১৮৯)
আর এক স্থানে আছেঃ
এবং তাঁহার (আল্লাহ্) একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হইতে তোমাদের সঙ্গিনী পয়দা করিয়াছেন মনের সুখ পাইতে পার।” যাহাতে তোমরা তাহাদের মধ্যে
(৩০৪ ২১)
“তাহারা (স্ত্রীরা) তোমাদের (পুরুষদের) ভূষণ এবং তোমরা তাহাদের ভূষণ।”
(২৪১৮৭)
উপরোক্ত আয়াতগুলি থেকে এ-ই প্রতিপন্ন হচ্ছে যে, বিবাহ শুধু দৈহিক সম্বন্ধ নয় – আত্মিক এবং এ এমন দুটি হৃদয়ের মিলন যারা মূলত এক এবং অভিন্ন।
স্বামী-স্ত্রীর এই অভিন্নতা এবং আত্মিক মিলনের উপরেই ইসলামের বিবাহ প্রথা সংস্থাপিত। কাজেই এই সম্বন্ধ অতি পবিত্র। ইহজীবনেই এর শেষ নয় – অনন্তকাল এ স্থায়ী। কোরআন বলছে:
“চিরস্থায়ী সেই জান্নাত-বাগিচা। সেখানে তাহারা (পুণ্যাত্মারা) তাহাদের সৎকর্মশীল মাতাপিতার এবং স্ত্রীপুত্রের সহিত প্রবেশ করিবে; এবং ফেরেন্ডারা প্রত্যেক দরজা দিয়া তাহাদের খিদমতে হাজির হইবে।”
(১৩:২৩)
সমগ্র জগৎজুড়ে যখন নারীর লাঞ্ছনার সীমা ছিল না, তখন মহামানব মুহম্মদ আনলেন এই নববিধান। ধূলিধূসরিত অবজ্ঞাত নারীকে তিনি করলেন মহীয়সী ও গরীয়সী।
বিদায়-হজের সময় হযরত মুসলমানদের যে শেষ উপদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। বলে গেছেন: “হে মুসলমানগণ তোমাদের স্ত্রীদিগের কথা ভুলিও না। মনে রাখিও, তাহাতেও তিনি নারীকে ভুলেন নাই। বার বার তিনি মুসলমানদিগকে সাবধান করিয়া আল্লাহকে সাক্ষী করিয়া তোমরা তাহাদিগকে গ্রহণ করিয়াছ।”
বিবাহকালে স্ত্রীর দেনমোহর, যৌতুক ইত্যাদির ব্যবস্থা এবং স্বামী ও পিতার সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার দানও স্ত্রীর মর্যাদাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
এইখানে ইসলামের বহুবিবাহের প্রশ্ন তুলে কেউ একটা সন্দেহের ছায়াপাত করতে পারেন। বলতে পারেন: বহুবিবাহই যদি সমর্থিত হলো, তবে আর একনিষ্ঠ দাম্পত্য প্রেমের স্থান রইল কোথায়?
ঠিক কথাই বটে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ইসলামে বহুবিবাহ নিয়ম নয় – ব্যতিক্রম। আমরা সর্বক্ষেত্রেই বলে আসছি ইসলাম কোথাও এমন বিধান দেয়নি যা বাস্তব জীবনে অচল হয়। প্রত্যেক সম্ভাব্য অবস্থার জন্যই সে পূর্ব থেকে ব্যবস্থা করে রেখেছে। দূরদর্শিতা ও সনাতনত্ব তার বৈশিষ্ট্য। পুরুষের চারটি পর্যন্ত বিবাহ করার অধিকার সে দিয়েছে বটে, কিন্তু তা অবস্থাবিশেষে; সাধারণত এক বিবাহই ইসলামের বিধান। কোরআন বলছে:
“এবং যদি তোমরা আশঙ্কা কর অনাথদিগের (এতিম) প্রতি তোমরা যথাযোগ্য ন্যায়-ব্যহার করিতে পারিবে না, তখন যাহাদিগকে ভাল মনে কর, তাহাদের মধ্য হইতে দুই, তিন বা চারিটি বিবাহ কর। কিন্তু যদি ভয় কর যে তাহাদের (স্ত্রীদের) প্রতি নম্র ব্যবহার করিতে পারিবে না, তবে মাত্র একটিই বিবাহ কর।” 
(৪:৩)
এ দ্বারা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, যখন-তখনই আপন খুশিমতো চারটি বিবাহ করার আদেশ দেওয়া হয়নি। মানুষের জীবনে এমন এক একটি অবস্থা আসে, যখন একাধিক বিবাহ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যুদ্ধে যখন সমাজের পুরুষ-সংখ্যা কমে যায়, অথবা প্রথমা স্ত্রী বন্ধ্যা বা চিররুগ্ণা হয়, অথবা অন্য কোনো কারণে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিল-মহব্বত না হয়, তখন দ্বিতীয় বিবাহের প্রয়োজন অনুভূত হয় বৈকি। সেইরূপ অবস্থার জন্য ইসলাম পূর্ব থেকেই বিধান দিয়ে ভালো করেনি কি? এই যে ইউরোপের এক-একটা মহাসমরে লক্ষ লক্ষ পুরুষ নিহত হলো, তাদের বিধবা স্ত্রী এবং কন্যাদের অবস্থা কী দাঁড়াল? তাদের বিবাহ হলো কি? কোথায় অত পুরুষ মিলবে? পুরুষদের একাধিক বিবাহ করারও উপায় নেই, কারণ খ্রিস্টধর্মে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ। বাধ্য হয়ে নারী-পুরুষ ব্যভিচার আরম্ভ করল এবং তার ফলে জন্মগ্রহণ করল লক্ষ লক্ষ অবৈধ সন্তান, আর তাদের নাম দেওয়া হলো “War babies”। এ-ই কি সুব্যবস্থা? এই বিধানই কি হলো কল্যাণকর? এ-ই কি ইসলাম রাষ্ট্র ও ধর্ম? কল্পনা করাই অসম্ভব।

কবি গোলাম মোস্তফা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *