এণ্ডি শিল্প

রাজনীতি ও অর্থনীতি

ধন-ধান্যে-পুষ্পে ভরা রত্ন-প্রসবিনী ভারতবর্ষের নানা প্রদেশে নানা রেশম কীট জন্মিয়া থাকে, তাহা অবশ্য অনেকেই অবগত আছেন। কোন প্রকার কীট কূলপত্র, কোন কীট তুতপত্র ভক্ষণ করিয়া থাকে। তাহাদের কোষ বা গুটী দ্বারা বিবিধ রেশমী বস্ত্র প্রস্তুত হয়। অদ্য আমরা ‘এণ্ডি’ নামক এক প্রকার রেশমের জন্ম এবং ইতিহাস সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলোচনা করিব। এণ্ডি গুটী প্রধানতঃ আসাম অঞ্চলে এবং রংপুর জেলায় আবাদ হয়।

এণ্ডি গুটী আবাদ করিতে অধিক মূলধনের প্রয়োজন হয় না, পরিশ্রমও নগণ্য বলিলেই হয়। ইহার খাদ্য এরণ্ড পত্র। রংপুরে এরণ্ড গাছের কোন মূল্য নাই, যত্রতত্র প্রচুর পরিমাণে জন্মিয়া জঙ্গল হয়। সম্ভবতঃ এরগু-পত্র খায় বলিয়া এ রেশমের নাম “এণ্ডি” (“এরণ্ডি,” ক্রমে মধ্যস্থলের “র” লুপ্ত হইয়া যাওয়ায় “এণ্ডি”) হইয়াছে। সুতরাং রংপুরে এন্ডি পোকার খাদ্য সংগ্রহ কিছু মাত্র আয়াসসাধ্য ব্যাপার নহে। সম্ভবতঃ চারি আনার ডিম ক্রয় করিয়া যে পরিমাণ পোকার গুটী লাভ হয়, তদারা স্বচ্ছন্দে একখানা ১১ হাত লম্বা ও ৪৪ ইঞ্চি বহরের কাপড় প্রস্তুত হইতে পারে। পঁচিশ বৎসর পূর্ব্বে এই প্রকার একখানা কাপড়ের মূল্য ৬ ছয় টাকা ছিল; এখন (যদি পাওয়া যায়) তাহার মূল্য ন্যূনাধিক ১৬/১৭ টাকা। যে গুটী সূতা পূর্ব্বে এক পয়সায় পাওয়া যাইত, এখন তাহার মূল্য ছয় পয়সা। অতএব এণ্ডি ধুতির মূল্য এখন ৩৬ হইলেও আশ্চর্য্যের বিষয় হইত না। ঠিক চারি আনার ডিমে ৫/৬ কাহন (অর্থাৎ একখানি ১১ হাতি ধুতির উপযোগী) গুটী লাভ হয় কিনা তাহা আমি নিশ্চয় বলিতে পারি না। কারণ এখন রংপুর জেলায় এণ্ডি শিল্প বিলুপ্ত হওয়ায় আমি বহু চেষ্টা করিয়াও এ সম্বন্ধে সমস্ত জ্ঞাতব্য বিষয় জানিতে পারি নাই। এণ্ডি সম্বন্ধে বঙ্গের প্রসিদ্ধ লেখক কবিবর মৌলবী শেখ ফজলুল করিম সাহেব লিখিয়াছেন:

“এণ্ডির তুলির জন্য এখানে (রঙ্গপুরে) ২/৪ জনের কাছে অনুসন্ধান লইলাম, যাঁহারা সখের জন্যে পোকা পুষিয়া থাকেন, এমন ২/১ জনকেও জিজ্ঞাসা করিলাম, কিন্তু দর জানা ব্যতীত আর কোনই উপকার হইল না। ২০ গণ্ডা গুটীর দাম ১৫ পয়সা মাত্র। এখানে কাহারো ঘরে উহা বিক্রয়ের জন্য মৌজুদ নাই।”

গুটীর হিসাব এই প্রকার ২০ গণ্ডায় এক পণ; ১৬ পণে এক কাহন। তাহা হইলে দেখা যায়, এক কাহন গুটীর মূল্য মাত্র চারি আনা। তিন কাহন গুটীতে যে পরিমাণ সূতা প্রস্তুত হয়, তদারা ৬ হাত লম্বা ও তিন হাত চওড়া একখানি চাদর প্রস্তুত হইতে পারে। এইরূপ একখানি চাদরের মূল্য পূর্ব্বে ৩.০০/৪.০০ ছিল, এখন ৯.০০ হইতে ১৩.০০ পর্যন্ত।  আমাদের বাল্যকালে যখন এণ্ডি কাপড় দেখিতাম, তখন শুনিতাম যে উহা ভদ্রলোকের ব্যবহার্য্য নহে; উহা কেবল চাষারা ব্যবহার করে। সুতরাং এণ্ডি বস্ত্রকে হেয় দৃষ্টিতে দেখিতাম। দরিদ্র চাষী স্ত্রীলোকেরাই এন্ডি পোকা পোষণ করিত, এণ্ডি সূতা কাটিত এবং ইহার কাপড় ব্যবহার করিত। তাহারা স্বহস্তে কাপড়ের তানা পর্যন্ত করিয়া দিত, বাকী কার্য্য তত্ত্ববায়গণ করিত। আমরাত এইরূপে লক্ষ্মী পায়ে ঠেলিলাম, কিন্তু ইহার আদর কদর করিল কাহারা? আমরা যাঁহাদের পদলেহন-না, জুতার ধূলি লেহন করিয়া ধন্য হই!

আসাম অঞ্চলে এই এণ্ডি বস্ত্র বহুল পরিমাণে প্রস্তুত হয় বলিয়া আমাদের গুরুর গুরু–দেড় শত বৎসরের গুরু ইউরোপীয়গণ ইহাকে “আসাম সিল্ক” বলিয়া অতি আদরের সহিত ইহা দ্বারা কোট, স্কার্ট প্রভৃতি প্রস্তুত করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের দেখাদেখি, আমরাও হোয়াইট এ্যাওয়ে লেডলর দোকান হইতে “আসাম সিল্ক”-এর “সুট” ক্রয় করিয়া পরিধান করা ফ্যাশান মনে করিতে লাগিলাম। কিন্তু আমরা এই মূল্যবান শিল্পের উন্নতির কোন চেষ্টা করিলাম না। ক্রমে রংপুরের চাষা ও আসামের বন্য পাহাড়ী স্ত্রীলোকেরা এণ্ডি সূতা কাটা ভুলিয়া গেল। ফলে এখন আসাম হইতে গুটী বিদেশে রপ্তানী হয়, তথা হইতে কলে সূতা প্রস্তুত হইয়া পুনরায় আসামে আইসে। স্থানীয় তন্তুবায়গণ সেই সূত্রে বস্ত্র প্রস্তুত করে, পরে সেই “আসাম সিল্ক” কলিকাতার কোন কোন দোকানে বিক্রীত হয়। কিন্তু এখন সে অবস্থাও নাই, অর্থাৎ “আসাম সিল্ক” আর সহজে (অন্ততঃ লেডলর দোকানে) পাওয়া যায় না! সংবাদপত্রে যে আসামী এণ্ডির বিজ্ঞাপন দেখা যায় তাহা খাঁটি বস্তু কিনা সন্দেহ। কারণ “কাশী সিল্ক” নামে যে রেশমী কাপড় বাজারে দেখা যায়, তাহা জাম্মানী হইতে আমদানী করা খোঁটা মাল।

বর্তমান স্বদেশী আন্দোলনের পূর্ব্বে খদ্দর কাপড়ের কি মূল্য ছিল? তাহা কেবল পশ্চিম অঞ্চলের কোল, সাঁওতাল, জোলা, ধুনিয়া প্রভৃতি লোকেরা ব্যবহার করিত। এখন ত খদ্দর আমাদের মাথায় উঠিয়াছে। এই সুবর্ণ সুযোগে খদ্দর, এণ্ডি ও অপরাপর রেশমী বস্ত্রের বহুল প্রচার বাঞ্ছনীয়। শুনিতেছি, একা খদ্দর আমাদের দেশের যোল আনা অভাব পূরণ করিতে পারিবে না। তাহা হইলে ভারতের বিবিধ পট্টবস্ত্র অগ্রসর হউক। এণ্ডি খদ্দরের তুলনায় কয়েকটি বিষয়ে শ্রেষ্ঠ; (১) দীর্ঘকাল স্থায়ী-১০ বৎসর এর পূর্ব্বে ছিন্ন হইবার আশঙ্কা নাই); (২) খদ্দর অপেক্ষা ওজনে হাল্কা; (৩) ফ্লানেলের ন্যায় গরম; (৪) ইহাতে কোন প্রকার ভেজালের আশঙ্কা নাই। খদ্দরের তানায় মিলের সূতা ব্যবহৃত হয় বলিয়া তাহাকে খাঁটি স্বদেশী বা হস্তনির্মিত বলা যায় না। তাহা ছাড়া “জাপানী খদ্দর” নাকি বাজার ছাইয়া ফেলিয়াছে। এন্ডি বস্ত্রের এসব বালাই নাই। আরও এক মজার কথা এই যে, যাবতীয় কাপড় নূতন অবস্থায় নয়ন-রঞ্জন চকচকে থাকে, দুই তিন বার ধুইলে বিশ্রী হয়, পুরাতন হইলে একেবারে অকর্মণ্য হয়। এণ্ডি কাপড় ইহার বিপরীত-নূতন অবস্থায় বিশ্রী থাকে, প্রথম দর্শনে গ্রাহক বা ক্রেতাকে উহার প্রতি আকৃষ্ট করিবার মত মনোহর গুণ উহার নাই। কিন্তু এ কাপড় যতই ধোয়া যায়, যতই পুরাতন হয়, ততই সুশ্রী এবং ব্যবহারে আরামদায়ক, মসৃণ ও দেখিতে চিকচিকে হয়।

দুঃখের বিষয়, রংপুরের এণ্ডি শিল্প বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। সময় সময় সংবাদপত্রে “আসাম-জাত এণ্ডি” কাপড়ের বিজ্ঞাপন দেখা যায়, কিন্তু রংপুরের সহিত এণ্ডির কোন সম্পর্ক আছে বা ছিল বলিয়া কেহ জানে না। ঝাড়া ছয় মাস পর্য্যন্ত রংপুরের কতিপয় ভদ্রলোককে পত্র লিখিয়া বিরক্ত করিয়া আমি মাত্র একটি গ্রাম আবিষ্কার করিয়াছি, যেখানে এখন এণ্ডি শিল্পের শেষ নিঃশ্বাসটুকু বহিতেছে। কিন্তু এই সবে ধন নীলমণি বেলকা গ্রামের স্ত্রীলোকরাও এখন এন্ডি পোকা পোষণ করে না। কেহ কেহ নিতান্ত দারিদ্র্য-পেষণে অনন্যোপায় হইলে পোকা পুষিয়া কিছু উপাজ্জনের চেষ্টা করে। এ সময় এই নাভিশ্বাসটুকু রক্ষা না করিলে ইহারও অস্তিত্ব লোপ পাইবে।

বেলকা হাই ইংলিশ স্কুলের হেড মাস্টার মহাশয় অতিশয় দেশ-হিতৈষী উৎসাহী লোক। তিনি ঐ স্কুলে ছাত্রদের জন্য একটি বয়ন ক্লাশ খুলিয়াছেন। তাঁহার বয়ন যন্ত্রে এণ্ডি বস্ত্র বয়ন করা হয়। কিন্তু সূতার জন্য তাঁহাদিগকে অপরের উপর নির্ভর করিতে হয় বলিয়া বিশেষ অসুবিধা ভোগ করিতে হয়। সূতা লাভের সহজ উপায় স্কুলে পোকা-পোষণ করা। কিন্তু উৎসাহ, সহায় ও সহকর্মীর অভাবে তিনি পোকা প্রতিপালন করিতে অক্ষম।

এণ্ডি গুটী আবাদের প্রণালী এই:-

(১) হাট হইতে কতকগুলি পোকার বীজ ক্রয় করিয়া আনিতে হয়। বীজ অর্থে, কতকগুলি ডিমোলা প্রজাপ্রতি ও ডিম বুঝিতে হইবে।

(২) ডিমগুলি এক খণ্ড পরিষ্কার নেকড়ায় বাঁধিয়া একটা ডালাতে শিকায় তুলিয়া রাখা হয়।

(৩) সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ কাল পরে ডিম ফুটিয়া পোকা বাহির হইলে এরণ্ডের খুব কচি পাতা ছিঁড়িয়া উহাদের খাইতে দিতে হইবে।

(৪) প্রত্যহ পোকার বাসস্থান একবার পরিষ্কার করিতে হইবে; পিপীলিকা ও মাছি উহার পরম শত্রু। সেজন্য কেহ কেহ নেটের ন্যায় পাতলা কাপড় দ্বারা পোকা ঢাকিয়া রাখে।

(৫) দুই চারি দিন কচি পাতা খাইয়া পোকাগুলি একটু বড় হয়, ইহার পর একদিন দেখিবেন, পোকাগুলি অসাড়ভাবে পড়িয়া আছে, নড়েও না, পাতাও খায় না। তখন উহাদের মৃত জ্ঞানে ফেলিয়া দিবেন না। এই অবস্থাকে স্থানীয় ভাষায় “পোকার ঘুম” বলে। এক অহোরাত্রি কিম্বা ততোধিক কাল ঘুমাইবার পর পোকাগুলি একটু বড় পাতা অধিক পরিমাণে খাইতে আরম্ভ করে, এখন আর পাতা ছিঁড়িয়া দিতে হয় না।

(৬) কিছুদিন পরে পোকা আবার ঘুমাইবে। এইরূপ পোকা তিন কিম্বা চারি বার ঘুমায়।

(५) শেষবারে ঘুমের পর পোকাগুলি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩ ইঞ্চি হয়, রংটাও এরও পত্রের অনুরূপ হয়। এখন ইহারা রাক্ষসের মত পাতা খাইতে আরম্ভ করে। সে সময় ইহাদের পাতা খাওয়ার খস্ খস্ শব্দ শোনা যায়। এখন বড় বড় পাতা গোছা বাঁধিয়া পোকার মাচার উপর একটা বাঁশের আড়ে ঝুলাইয়া দিতে হয়। দিনে তিন চারিবার প্রচুর পরিমাণে পাতা দিতে হইবে এবং দুইবার পোকার বাসস্থান মাচা পরিষ্কার করিতে হইবে।

(৮) ইহার ৩/৪ দিন পরেই পোকা গুটী প্রস্তুত করিতে আরম্ভ করে, এ অবস্থাকে স্থানীয় ভাষায় “জরা” বলে। পোকা জরিতে আরম্ভ করিলে আর খায় না, বরং পাতার গাছে যেখানে সেখানে জরিয়া থাকে।

(৯) অতঃপর এই জরিত গুটীর যেগুলি বীজের জন্য রাখা হইবে, সেইগুলি ব্যতীত অপর

গুটীগুলিকে গরম ক্ষারের জলে ডুবাইয়া তাহাদের ভিতরকার পোকা মারিয়া ফেলা হয়। ঐরূপ না করিলে কিছুদিনের পর পোকাগুলি গুটি কাটিয়া প্রজাপতি রূপে বাহির হইয়া পড়ে। তখন ঐ ছিদ্রযুক্ত গুটী হইতে ভাল সূতা হয় না- হইলেও সে সূতা মজবুত হয় না।

(১০) ক্ষারে সিদ্ধ করিবার পর গুটীগুলিকে উল্টাইয়া আভ্যন্তরীণ মৃত কীট ফেলিয়া দিয়া ধুইয়া লওয়া হয়।

এক ফসল গুটী-অর্থাৎ ডিম ফুটা হইতে আরম্ভ করিয়া পোকা জরা পর্যন্ত যাবতীয় ক্রিয়া ২/৩ মাসে সম্পন্ন হয়। তাহা হইলে দেখা যায়, বৎসরে অন্ততঃ তিন ফসল গুটী আবাদ করা যাইতে পারে।

(১১) এন্ডি সূতা প্রস্তুত করিবার প্রণালী, চরকা দ্বারা তুলার সূতা, এবং অন্যান্য রেশমী গুটী হইতে সূতা প্রস্তুত করার পদ্ধতি হইতে অনুরূপ। ক্ষারে সিদ্ধ করা গুটীর ৫টি হইতে ১০টি পর্যন্ত অঙ্গুলীর অগ্রভাগে কিম্বা এক খণ্ড কাঠির উপর পরে পরে সাজাইয়া রাখা হয়; ইহাকে তুলি বলে। এই তুলিগুলিকে রৌদ্রে শুকাই 224/590 সূতা কাটিবার সময় ইচ্ছামত দুই তিনটি তুলি শীতল জলে কিছুদর্শ একটি কাঠিতে একটা তুলি রাখিয়া লোহার কিম্বা বাঁশের টোকোর সাহায্যে সূতা কাটা হয়। টোকোর অগ্রভাগ দেখিতে কতকটা ক্রুশের সুচের মত। টোকোর নিম্ন দিকে একটা পাথরের চাক্তি। এই চাক্তিব উপর টোকোতে সূতা জড়াইতে হয়। মাঝে মাঝে তুলিটা জলে ভিজাইয়া লইতে হয়। বাস্, বাম হস্তে তুলির কাঠি, দক্ষিণ হস্তে টেকো বসিয়া, দাঁড়াইয়া হাঁটিয়া বেড়াইয়া- যেরূপে ইচ্ছা সূতা কাটা যায়।

পূর্ব্বে পল্লীগ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যাবধূগণ সখ করিয়া স্বহস্তে অতি সূক্ষ্ম সূতা কাটিতেন। সে এণ্ডি সূতা, রেশমী সূতার সহিত প্রতিযোগিতা করিত। এখন আর সেদিন নাই, সুতরাং এখন কুলবালা দূরে থাকুক, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বউ-ঝিও আর টেকো হাতে লয় না।

পূর্ব্বে নিষ্ঠাবতী হিন্দু মহিলা পূজা করিবার সময় পট্ট বস্ত্র পরিধান করিতেন, এখন তাঁহাদের পুরোহিতের জন্য পৈতা আইসে জার্মানী হইতে! অধঃপতনের চূড়ান্ত আর কাহাকে বলে?

রংপুরে বামনডাঙ্গা ষ্টেশনের নিকটবর্তী যে দুই একটি পল্লীতে এণ্ডি শিল্পের নাভিশ্বাস বহিতেছে, তথাকার অধিবাসীগণ সামান্য চেষ্টা করিলে এই ব্যবসায় দ্বারা বেশ দু’পয়সা অর্জন করিতে পারেন। একখানা ৬ হাত লম্বা ও ৩ হাত চওড়া চাদরের জন্য মূলধন ও লাভের একটা মোটা হিসাব দেখুন:

মূলধন

১। তিন কাহন গুটী- ০.৭৫

২। সূতা কাটার মজুরী (৩ কাহন গুটিতে বোধ হয় ১ সের সূতা হয়) ১ সের সূতার জন্য-০.৫০

৩। বেলকা বয়ন বিদ্যালয়ে বয়ন করাইলে মজুরী- ৩.০০

সর্বমোট- ৪.২৫

কিম্বা-

১। হাট হইতে ১ সের সরু সূতা কিনিলে-৫.০০

২। বয়ন ব্যয়-৩.০০

মোট-৮.০০

ঐরূপ চাদরের মূল্য ন্যূনাধিক-১২.০০

এত অল্প মূলধনে যে ব্যবসায় পরিচালনা করা যায়, তাহার প্রতিও আমাদের মনোযোগ আকৃষ্ট হয় না, ইহার অপেক্ষা দুর্ভাগ্যের বিষয় আরকি হইতে পারে? আর একটি উপায়ে বিনা পয়সা ও বিনা পরিশ্রমে এন্ডি গুটী লাভ করা যায়। তাহা এই: যদি কেহ কেবল এরগু পত্র কৃষক-বধূদের পোকার খাদ্যের জন্য দান করেন, তবে তিনি সে ফসলের অর্ধেক গুটী পাতার বিনিময়ে পাইবেন! দুঃখের বিষয়, কৃষক-রমণীদের পোকা-পোষণ করিতে উৎসাহ দিবার লোক পর্য্যন্ত নাই।

খোদার ফজলে এখন দেশে যে স্বদেশীয় সঞ্জীবনী বাতাস বহিয়াছে, এ শুভক্ষণে ভারতের নানাবিধ সুপ্ত শিল্পের জাগরণ অনিবার্য্য! ৫০/৬০ বৎসরের পরিত্যক্ত-মৃত চরকা পুনর্জ্জীবন লাভ করিয়াছে; মৃতপ্রায় এণ্ডি শিল্পও নব জীবন লাভ করিবে। এখন আমাদের পরিধেয় খদ্দর, এণ্ডি ও অন্যান্য রেশমী বস্ত্র না হইয়া উপায় নাই। এই স্বদেশীয় মাহেন্দ্রক্ষণে খোদার ফজলে রংপুর ও আসামের এন্ডি জাগিবে; ভাগলপুর ও মুর্শিদাবাদের রেশমী শিল্প জাগিবে, জাগিবে নিশ্চয়!

এখন কথা এই যে, রংপুরের এণ্ডির পুনরুদ্ধার সাধন কে করিবে?

(১) স্থানীয় জমিদারগণ? তাহা হইলে ত আর কথা-ই নাই। তাঁহারা উপাধান হইতে মস্তক কিঞ্চিৎ উত্তোলন করিয়া সহানুভূতিসূচক ঈষৎ হাস্য করিলে একটু উৎসাহ আজ্ঞা প্রচার করিলে এণ্ডি শিল্পের সঞ্জীবনী শক্তি সঞ্চারিত হইবে-মৃত এণ্ডি প্রাণলাভ করিবে। গ্রামে গ্রামে কৃষক-বধূ পরস্পরে বলাবলি করিবে-“আমাদের জমিদার সাহেব, রাজা মহাশয়, মহারাজা এণ্ডি কাপড় চাহিয়াছেন; ওরে, আমি আজকেই পোকা পোষা আরম্ভকরিব।” এ বলিবে, “আমি আগে”, ও বলিবে, “আমি আগে!” কিন্তু না, জমিদার মহোদয়গণ সুখনিদ্রা, মোহনিদ্রা, আলস্য-নিদ্রা, আফিম-খাওয়া নিদ্রা, সর্পদৃষ্ট প্রাণঘাতিনী নিদ্রা ত্যাগ করিয়া তাহা করিবেন না!

(২) স্থানীয় সম্ভ্রান্ত বড়লোকেরা তাহা হইলেও অধিক কাঁদিতে হইত না। তাঁহারা আরাম-কেদারা হইতে নবনীত দেহখানিকে ঈষৎ দোলাইয়া, চক্ষু হইতে রঙ্গীন চশমা জোড়া একটু সরাইয়া, গ্রামের দুই চারি জন মাতব্বর শ্রেণীর লোককে ডাকিয়া দুই চারিটা মিষ্ট বাক্য ব্যয় করিলে এণ্ডির শিরায় শিরায় ধমনীতে ধমনীতে জীবনী-প্রবাহ বহিয়। যাইবে। কিন্তু না, তাঁহারা “ঝোঁপড়ি ম রহনা ও মহল কা খাব দেখনা” বংশ-গৌরব মান-মর্য্যাদা গৌরব ইত্যাদির অনুরোধে প্রতিবেশী রাজা, মহারাজা, খাঁ বাহাদুরদের সহিত টেক্কা দিবার খেয়ালে ভুলিয়া তাহা করিবেন না।

(৩) মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভদ্রলোকেরা? তাহা হইলেও বেশ হইত। তাঁহারা গ্রামের কৃষকদের সহিত কথাবার্তা কহিয়া, হাতে-কলমে উৎসাহ দিয়া, নিজেরা সখের জন্য পোকা প্রতিপালন করিলে একাধারে কিছু উপার্জন এবং দেশের বস্ত্রক্লেশ মোচন-উভয়ই করিতে পারিবেন। কিন্তু না, তাঁহারা:

“চাকুরী, চাকুরী, চাকুরী! চাকুরী মাথার মাণিক! চাকুরী বিনে বঙ্গবাসীর জীবন ধারণে ধিক! মল্ক করে হাত পাকিয়ে লিখে, ‘এ, বি, সি, ডী’; চাকুরী হলো-ডাক-পিয়াদা, গ্রামে প’লো টী টী!”

অথবা-

“চাকুরী মা! তোর চরণ দু’টি নিত্য পূজা করি, এই অফিসে চাকুরী যেন বজায় রেখে মরি!”

এহেন চাকুরীর মায়া ত্যাগ করিয়া এণ্ডি শিল্প উদ্ধার করিবেন না।

(৪) তবে অপর কোন জেলার দেশ-হিতৈষী লোক? তাহাও বাঞ্ছনীয়। কিন্তু তাঁহারা এ কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিবেন বলিয়া বোধ হয় না। তাঁহারা মনে করিবেন, বাবা! নিজের ঘর-দ্বার ছাড়িয়া কেউ জঙ্গলা দেশে যাইবে? রংপুরের জলবায়ু ভাল নয়-প্লীহা ও ম্যালেরিয়ার লীলাভূমি।

তবে?-নীলকর, চা-কর প্রভৃতির ন্যায় কোন শ্বেতাঙ্গ কৃষক (Planter) রংপুরে গিয়ে এণ্ডি গুটী আবাদ করিবেন। তখন সেই এণ্ডিকর সাহেবের এণ্ডি বাগানে ঐ রংপুরের দরিদ্র নরনারী কুলীরূপে খাটিবে! আর ভদ্রলোকেরা গুটি মাচার পরিদর্শক, বাজার সরকার কিম্বা অন্ততঃ কুলীর সরদার পদলাভ করিয়া ধন্য হইবেন! হইতে পারে শ্বেতাঙ্গ এণ্ডিকরেরা সূতা প্রস্তুত করিবার জন্য কোন সহজসাধ্য যন্ত্র নির্মাণ করিবেন। অতঃপর রংপুরের অধিবাসিগণ ত্রিগুণ, চতুর্গুণ মূল্যে “রংপুর রিফাইন্ড সিল্ক” কলিকাতা হইতে ক্রয় করিয়া ব্যবহার করিবেন।

প্রথমে “আসাম সিল্ক” নাম শুনিয়া আমাদের চমক লাগিয়াছিল; পরে যখন দেখিলাম, ত দেখিলাম, সেই নগণ্য এণ্ডি!

ফল কথা, অপর জেলার লোকে গুটী আবাদ করিতে গেলে, তাঁহাকে মূলধন স্বরূপ অন্ততঃ ২০০.০০ দুইশত টাকা সঙ্গে লইয়া যাইতে হইবে। আর স্থানীয় লোকে ঐ কার্যে হস্তক্ষেপ করিলে তাঁহাকে মাত্র ১০.০০ দশটি টাকা মূলধন স্বরূপ ব্যয় করিতে হইবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *