বিশ্বাসীদের জননী : হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.)

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিত্ব চিন্তা ও দর্শন

খাদিজা (রা.) ছিলেন বিশ্বাসীদের জননী, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রথম স্ত্রী, তাঁর সকল স্ত্রীর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ, তাঁর সন্তানদের মা এবং সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তি।

বংশপরিচয় ও শৈশব

তাঁর পুরো নাম খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ ইবন আসাদ ইবন আবদুল উযযা ইবন কুসাই। তিনি কুরাইশ গোত্রের বনু আসাদ বংশের ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল ফাতিমা বিনতে যায়িদাহ, তিনিও কুরাইশের আরেকটি সম্মানিত শাখার সদস্য ছিলেন। খাদিজা (রা.) ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বংশধারা তাঁদের পূর্বপুরুষ কুসাই-এর কাছে মিলিত হয়েছে। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সব স্ত্রীর মধ্যে তিনিই ছিলেন তাঁর সবচেয়ে নিকট আত্মীয়।

খাদিজা (রা.)-এর পরিবার ছিল অত্যন্ত সম্মানিত, প্রভাবশালী ও ধনী। তিনি নিজেও একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। নিজের সম্পদ দিয়ে তিনি লোক নিয়োগ করতেন, তারা তাঁর পক্ষে ব্যবসা করত এবং লাভের একটি অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পেত। সে সময় কুরাইশদের প্রধান পেশাই ছিল বাণিজ্য।

তিনি মক্কার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠেন। তাঁর বাবা আল-ফিজার যুদ্ধের দিনে মারা যান। রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বিয়ের আগে তিনি দুইবার বিবাহিত ছিলেন। প্রথম স্বামী ছিলেন আবু হালা ইবন জুরারাহ। তাঁদের ঘরে হিন্দ ও হালা নামে দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীতে তিনি আতিক ইবন আয়িদ-কে বিয়ে করেন। এই সংসারে তাঁদের হিন্দ নামে একটি কন্যাসন্তান জন্মায়। এ কারণে খাদিজা (রা.)-কে “উম্মু হিন্দ” (হিন্দের মা) নামেও ডাকা হতো।

খাদিজা (রা.) ব্যবসায় অসাধারণ সফল ছিলেন। তাঁর বাণিজ্য কাফেলা নিয়মিত মক্কা থেকে সিরিয়াসহ বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্রে যাতায়াত করত। ফলে তাঁর সম্পদ, সম্মান ও খ্যাতি আরও বৃদ্ধি পায় এবং তিনি মক্কার অন্যতম বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল, মার্জিত ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। মক্কার নারীরা তাঁর উদারতা ও সুন্দর আচরণের কারণে প্রায়ই তাঁর বাড়িতে আসতেন। তিনি যখন কাবা শরিফ তাওয়াফ করতে যেতেন, অনেক নারী তাঁকে ঘিরে থাকতেন। তাঁরা শুধু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েই কথা বলতেন; এমন কোনো তুচ্ছ বা অশোভন কথা বলতেন না যা খাদিজা (রা.)-এর অপছন্দ হতে পারে।

একদিন কাবার কাছে একজন ইহুদি লোক তাঁদের উদ্দেশে বলল, “হে কুরাইশের নারীরা! এই যুগে একজন নবী আবির্ভূত হবেন। তোমাদের মধ্যে যে তাঁর স্ত্রী হতে চায়, সে যেন সেই সৌভাগ্য অর্জনের চেষ্টা করে।” এ কথা শুনে উপস্থিত নারীরা রাগান্বিত হয়ে লোকটির দিকে পাথর ছুড়ে মারেন।

রাসূলুল্লাহ -এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ

খাদিজা (রা.) তাঁর ব্যবসার জন্য অনেক বিশ্বস্ত লোককে নিয়োগ দিতেন। একসময় তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কেও তাঁর ব্যবসার কাজে সিরিয়ায় পাঠান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর বিশ্বস্ত খাদেম মায়সারাহ।

সফর শেষে মায়সারাহ খাদিজা (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সততা, বিশ্বস্ততা, উত্তম চরিত্র এবং ব্যবসায় তাঁর অসাধারণ সাফল্যের কথা জানান। তিনি আরও দেখেন, আল্লাহর বরকতে এই সফরে আগের চেয়ে অনেক বেশি লাভ হয়েছে। এসব কারণে খাদিজা (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চাচা হামজা ইবন আবদুল মুত্তালিব খাদিজা (রা.)-এর চাচা আমর ইবন আসাদ-এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান। মোহর নির্ধারণ করা হয় ২০টি অল্পবয়সী উট। এরপর তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। তখনও নবুওয়ত লাভের ১৫ বছর বাকি ছিল।

বিয়ের সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বয়স ছিল ২৫ বছর এবং খাদিজা (রা.)-এর বয়স ছিল ৪০ বছর। তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত সুখী ও সম্মানজনক। আল্লাহ তাঁদের ছয়টি সন্তান দান করেন। তারা হলেন: কাসিম, আবদুল্লাহ, যায়নাব, রুকাইয়্যাহ, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা (রা.)।

খাদিজা (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি সবসময় তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জায়েদ ইবন হারিসা (রা.)- এর প্রতি বিশেষ স্নেহ দেখে তিনি তাঁকে নিজের দাস জায়েদ ইবন হারিসা-কে উপহার হিসেবে দিয়ে দেন।

রাসূলুল্লাহ -কে সমর্থন ও সহযোগিতায় তাঁর ভূমিকা

নবুওয়তের আগে খাদিজা (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য একটি শান্তিপূর্ণ ও সুখের পরিবার গড়ে তুলেছিলেন। তিনি তাঁকে মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক; সব দিক থেকেই সহযোগিতা করতেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন হেরা গুহায় নির্জনে ইবাদত ও চিন্তায় সময় কাটাতেন, তখনও তিনি তাঁর প্রয়োজনীয় সব সহায়তা করতেন। প্রথম ওহি নাজিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ ভীত ও কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরে এসে বলেছিলেন, “আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও।” তখন খাদিজা (রা.) তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে দেন এবং শান্ত হতে সাহায্য করেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কথায় পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং তাঁর নবুওয়তকে সর্বপ্রথম গ্রহণ করেন।

নিজের প্রখর বুদ্ধিমত্তা, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও গভীর প্রজ্ঞার মাধ্যমে খাদিজা (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সাহস, সান্ত্বনা ও শক্তি জুগিয়েছিলেন। ইসলামের শুরুর কঠিন সময়ে তাঁর এই সমর্থন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইমাম বুখারি তাঁর “ওহী কীভাবে শুরু হয়েছিল” অধ্যায়ে এবং ইমাম মুসলিম তাঁর “ঈমান” অধ্যায়ে উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন,

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে ওহী আসার শুরু হয়েছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা দিনের আলোর মতো স্পষ্টভাবে সত্য হয়ে যেত। এরপর তিনি নির্জনতা পছন্দ করতে শুরু করেন। তিনি মক্কার হেরা গুহায় গিয়ে একটানা কয়েক রাত ইবাদত ও ধ্যানে কাটাতেন। যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় খাবার ও সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যেতেন। সেগুলো শেষ হয়ে গেলে তিনি বাড়িতে ফিরে খাদিজা (রা.)-এর কাছ থেকে আবার রসদ নিয়ে গুহায় ফিরে যেতেন।

এভাবেই চলতে থাকে, যতক্ষণ না হেরা গুহায় তাঁর কাছে প্রথম ওহি নাজিল হয়। একদিন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এসে বললেন, “পড়ুন।” রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “আমি পড়তে জানি না।” তিনি বলেন, এরপর ফেরেশতা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। এত জোরে ধরলেন যে আমি খুব কষ্ট অনুভব করলাম। তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে আবার বললেন, “পড়ুন।” আমি আবার বললাম, “আমি পড়তে জানি না।” দ্বিতীয়বারও তিনি একইভাবে আমাকে শক্ত করে ধরলেন। এরপর ছেড়ে দিয়ে আবার বললেন, “পড়ুন।” আমি আবারও বললাম, “আমি পড়তে জানি না।” তৃতীয়বারও তিনি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর বললেন, “পড়ুন, আপনার সেই প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন…” এভাবেই সূরা আলাকের প্রথম আয়াতগুলো নাজিল হয়।

ওহি গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরে এলেন। তিনি খাদিজা (রা.)-কে বললেন, “আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও।” খাদিজা (রা.) তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। ভয় কেটে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ সব ঘটনা তাঁকে খুলে বললেন এবং বললেন, “আমি আমার নিজের ব্যাপারে আশঙ্কা করছি।” তখন খাদিজা (রা.) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “আল্লাহর কসম! কখনোই না। আল্লাহ আপনাকে কখনো অপমান করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, মানুষের বোঝা বহন করতে সাহায্য করেন, দরিদ্রদের সাহায্য করেন, অতিথিদের সম্মান করেন এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান।

এরপর খাদিজা (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফলের কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি তখন খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হিব্রু ভাষা জানতেন এবং আল্লাহ যতটুকু চেয়েছিলেন, ততটুকু ইনজিল লিখেছিলেন। তখন তিনি বৃদ্ধ ও দৃষ্টিহীন ছিলেন। খাদিজা (রা.) বললেন, “ভাই, আপনার ভাতিজার কথা শুনুন।” ওয়ারাকা জিজ্ঞেস করলেন, “ভাতিজা, তুমি কী দেখেছ?” রাসূলুল্লাহ ﷺ সব ঘটনা তাঁকে জানালেন। সব শুনে ওয়ারাকা বললেন, “এ সেই মহান ফেরেশতা জিবরাইল (আ.), যাঁকে আল্লাহ মুসা (আ.)-এর কাছেও পাঠিয়েছিলেন। আহা! যদি আমি তখন যুবক হতাম! যদি আমি সেই দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতাম, যেদিন তোমার জাতি তোমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে!” রাসূলুল্লাহ ﷺ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তারা কি সত্যিই আমাকে বের করে দেবে?” ওয়ারাকা বললেন, “হ্যাঁ। যে-ই তোমার মতো সত্যের দাওয়াত নিয়ে এসেছে, তার বিরোধিতা করা হয়েছে। যদি আমি সেই সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকি, তবে সর্বশক্তি দিয়ে তোমাকে সাহায্য করব।” এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা (রহ.) ইন্তেকাল করেন। এরপর কিছু সময়ের জন্য ওহি নাজিল হওয়া বন্ধ ছিল।

আল্লাহ তাআলা যখন এই আয়াতগুলো নাজিল করলেন: “হে চাদরে আবৃত ব্যক্তি! উঠুন এবং মানুষকে সতর্ক করুন। আপনার প্রতিপালকের মহিমা ঘোষণা করুন এবং আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন।” (সূরা আল-মুদ্দাসসির ১–৪) তখন থেকেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নবুওয়তের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁকে মানুষের কাছে ইসলাম প্রচার করার নির্দেশ দেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর আদেশ সম্পূর্ণভাবে মেনে নেন এবং ইসলামের দাওয়াত শুরু করেন। প্রথমদিকে তিনি গোপনে দাওয়াত দিতেন, যাতে কুরাইশদের সাথে অপ্রয়োজনীয় শত্রুতা শুরু না হয়। তিনি প্রথমে নিজের পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ইসলামের দিকে আহ্বান জানান। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রা.)। এরপর ইসলাম গ্রহণ করেন তাঁর মুক্তদাস জায়েদ ইবন হারিসা (রা.)।

খাদিজা (রা.) নিজের জীবন, সম্পদ ও ঘর; সবকিছু ইসলামের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি শুধু নতুন মুসলিমদের আশ্রয় ও সহযোগিতাই করেননি, বরং নিজের সামাজিক মর্যাদা ব্যবহার করে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বিভিন্ন ক্ষতি ও নির্যাতন থেকেও রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। এই কারণেই খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত গভীরভাবে শোকাহত হয়েছিলেন। কারণ, তাঁর জীবনে খাদিজা (রা.)-এর মতো বিশ্বস্ত সহায়ক ও সঙ্গী আর কেউ ছিলেন না।

খাদিজা (রা.)-এর এই মহান ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আল্লাহ তাআলা নিজেই তাঁর প্রতি সালাম পাঠিয়েছিলেন এবং তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। তাঁকে জানানো হয়েছিল যে, জান্নাতে তাঁর জন্য ফাঁপা মুক্তা দিয়ে নির্মিত একটি প্রাসাদ রয়েছে, যেখানে কোনো কোলাহল, ঝগড়া বা ক্লান্তি থাকবে না। যেমন তিনি পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তেমনি জান্নাতের সুসংবাদও সর্বপ্রথম লাভকারীদের অন্যতম ছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দেন, তখন তিনি এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঈমান গ্রহণ করেন। শুধু বিশ্বাস করেই থেমে থাকেননি; বরং নবুওয়তের প্রতিটি কঠিন সময়ে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পাশে থেকেছেন, তাঁর একাকীত্ব দূর করেছেন, তাঁকে সাহস যুগিয়েছেন এবং সব ধরনের কষ্ট মোকাবিলায় সাহায্য করেছেন। তাঁর এই মহান ত্যাগের প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তাঁকে এমন এক জান্নাতের ঘরের সুসংবাদ দিয়েছেন, যেখানে থাকবে না কোনো ক্লান্তি, কোনো কষ্ট এবং কোনো উচ্চস্বরে বিবাদ। ইমাম বুখারিসহ অন্যান্য হাদিসগ্রন্থে এ বিষয়ে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাফিজ ইবন হাজার আল-আসকালানি (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন,

“রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তখন খাদিজা (রা.) কোনো দ্বিধা ছাড়াই তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন। তাঁকে বোঝানোর জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে উচ্চস্বরে কথা বলতে, তর্ক করতে বা কষ্ট করতে হয়নি। বরং খাদিজা (রা.) তাঁর সব ক্লান্তি দূর করেছেন, একাকীত্বে সঙ্গ দিয়েছেন এবং প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁর কষ্ট লাঘব করেছেন। তাই আল্লাহ তাঁর জন্য জান্নাতে যে ঘরের সুসংবাদ দিয়েছেন, সেটি তাঁর এসব মহান কাজেরই যথার্থ প্রতিদান।”
হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানি (রহ.)
Tweet

খাদিজা (রা.) জীবিত থাকা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ ﷺ আর কোনো নারীকে বিয়ে করেননি। এটিও তাঁর প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর গভীর ভালোবাসা ও বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ। খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পরও রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে কখনো ভুলে যাননি। তিনি প্রায়ই তাঁর কথা স্মরণ করতেন, তাঁর প্রশংসা করতেন এবং তাঁর প্রতি নিজের গভীর ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতেন। তিনি বলেছেন, “আল্লাহ আমার অন্তরে তাঁর ভালোবাসা দান করেছেন।” আরও বলেছেন, “সব মানুষ যখন আমাকে অস্বীকার করেছিল, তখন সে আমার প্রতি ঈমান এনেছিল। মানুষ যখন আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছিল, তখন সে আমাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করেছিল। সবাই যখন আমাকে তাদের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেছিল, তখন সে তার সম্পদ দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছিল। আর আল্লাহ অন্য কোনো স্ত্রীর মাধ্যমে নয়, শুধু তাঁর মাধ্যমেই আমাকে সন্তান দান করেছেন।” এই কারণেই উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) স্বীকার করেছেন যে, তিনি খাদিজা (রা.)-কে সবচেয়ে বেশি ঈর্ষা করতেন।

খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পরও রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। এটি ছিল তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততার প্রকাশ। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখনই একটি ছাগল জবাই করতেন, তখন বলতেন, “এ থেকে কিছু খাদিজার বান্ধবীদের কাছে পাঠিয়ে দাও।” এমনকি খাদিজা (রা.)-এর বোন হালা (রা.)-এর কণ্ঠস্বর শুনলেও রাসূলুল্লাহ ﷺ খাদিজা (রা.)-এর কথা স্মরণ করতেন। তাঁর কণ্ঠস্বর স্ত্রীর কণ্ঠের কথা মনে করিয়ে দিত এবং তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন।

রাসূলুল্লাহ -এর হাদিসে খাদিজা (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব

রাসূলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন হাদিসে খাদিজা (রা.)-এর অসাধারণ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, “জান্নাতের সর্বশ্রেষ্ঠ নারীরা হলেন: খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ, ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিম এবং ইমরানের কন্যা মারইয়াম।” আরেকটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “নিজ নিজ যুগের নারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন মারইয়াম বিনতে ইমরান এবং খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ।”

খাদিজা (রা.)-এর প্রজ্ঞা, ঈমান, উত্তম চরিত্র এবং স্বামীর প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসা ও সহযোগিতা তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল। এর প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-কে পাঠিয়ে তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন,

একদিন জিবরাইল (আ.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে বললেন,

“হে আল্লাহর রাসূল! খাদিজা আপনার কাছে একটি পাত্রে খাবার বা পানীয় নিয়ে আসছেন। তিনি এলে তাঁকে তাঁর রবের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকেও সালাম জানাবেন। আর তাঁকে সুসংবাদ দিন যে, জান্নাতে তাঁর জন্য ফাঁপা মুক্তা দিয়ে তৈরি একটি প্রাসাদ রয়েছে। সেখানে কোনো কোলাহল থাকবে না এবং কোনো ক্লান্তিও থাকবে না।”

খাদিজা (রা.) ছিলেন অত্যন্ত নেককার ও ঈমানদার নারী। তাঁর গভীর ঈমান ও ত্যাগের কারণে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হৃদয়ে এমন একটি বিশেষ স্থান লাভ করেছিলেন, যা তাঁর অন্য কোনো স্ত্রী অতিক্রম করতে পারেননি। এমনকি উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.)-ও স্বীকার করেছেন যে, তিনি খাদিজা (রা.)-কে সবচেয়ে বেশি ঈর্ষা করতেন। অথচ তিনি কখনো খাদিজা (রা.)-কে দেখেননি। আয়িশা (রা.) বলেন,

“রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কোনো স্ত্রীর প্রতি আমি এতটা ঈর্ষান্বিত হইনি, যতটা খাদিজা (রা.)-এর প্রতি হয়েছিলাম। অথচ আমি তাঁকে কখনো দেখিনি। কারণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে খুব বেশি স্মরণ করতেন। কখনো তিনি একটি ছাগল জবাই করলে তার কিছু অংশ খাদিজা (রা.)-এর বান্ধবীদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। একদিন আমি বললাম, ‘মনে হয় পৃথিবীতে খাদিজা ছাড়া আর কোনো নারীই ছিল না!’ তখন তিনি বললেন, ‘তিনি এমন ছিলেন, এমন ছিলেন, আর আল্লাহ তাঁর মাধ্যমেই আমাকে সন্তান দান করেছেন।'”

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পরও রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে কখনো ভুলে যাননি। তিনি সবসময় তাঁর প্রশংসা করতেন, তাঁর কথা স্মরণ করতেন এবং তাঁর বন্ধুদের প্রতিও ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করতেন। এটি খাদিজা (রা.)-এর প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসারই প্রমাণ। কিছু তাফসিরকারক আল্লাহর এই বাণী:

“তিনি কি আপনাকে অভাবগ্রস্ত পাননি? অতঃপর তিনি আপনাকে স্বচ্ছল করে দিয়েছেন?” (সূরা আদ-দুহা: ৮)

এর ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, আল্লাহ তাআলা খাদিজা (রা.)-এর সম্পদের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আর্থিক স্বচ্ছলতা দান করেছিলেন। এটিও খাদিজা (রা.)-এর মর্যাদা ও অবদানের একটি বড় প্রমাণ।

খাদিজা (রা.)-এর ঘরে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

খাদিজা (রা.)-এর ঘর ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ একটি স্থান। বহু আলেম, ইতিহাসবিদ ও ইসলামী আইনজ্ঞ তাঁদের বিভিন্ন গ্রন্থে এই ঘরের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আবু সুলাইমান তাঁর আল-আমাকিন আল-মা’ছুরাহ ফি মাক্কাহ আল-মুকাররমাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, অনেক প্রসিদ্ধ আলেম ও ইতিহাসবিদ খাদিজা (রা.)- এর ঘরের মর্যাদা নিয়ে লিখেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আল-আজরাকি, আল-ফাকিহি, ইবনুল জাওযি, মুহিব্বুদ্দীন আত-তাবারি, ইযযুদ্দীন ইবন জামাআহ, তাকিউদ্দীন আল-ফাসি, জামালুদ্দীন ইবন জাহিরাহ, মুহাম্মাদ ইবন আল্লান আস-সিদ্দিকি, আশ-শাব্বাগসহ আরও অনেকেই।

প্রখ্যাত আলেম কাজী ইয়াদ (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আশ-শিফা–তে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সম্মান করার প্রসঙ্গে বলেন,

রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সম্মান করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্রকে সম্মান করা এবং মক্কা ও মদিনায় তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত সব স্থানকে শ্রদ্ধা করা। তিনি যেসব স্থানে অবস্থান করেছেন, যেসব স্থানকে ভালোবেসেছেন, তিনি যেসব জিনিস স্পর্শ করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে যেগুলোর সম্পর্ক রয়েছে; এসব কিছুর প্রতিই যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা উচিত।

এখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ব্যবহৃত জিনিসপত্র বলতে তাঁর আসবাবপত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রীকে বোঝানো হয়েছে। আর তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত স্থান বলতে তিনি যেখানে বসবাস করেছেন, যেসব স্থানে গিয়েছেন এবং যেসব স্থানকে ভালোবাসতেন, সেসব স্থানকে বোঝানো হয়েছে। কাজী ইয়াদ (রহ.) এসব স্থানের মর্যাদা সম্পর্কে আরও বলেন,

যেসব স্থান আল্লাহর ওহির আলোয় আলোকিত হয়েছে, যেখানে জিবরাইল (আ.), মিকাইল (আ.) এবং অন্যান্য ফেরেশতারা আগমন করেছেন, যে ভূমিতে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ নেতা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পদচারণা হয়েছে, যেখান থেকে আল্লাহর দ্বীন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তাঁর মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এসব স্থান সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত।

খাদিজা (রা.)-এর এই ঘরেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সব সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং এখানেই খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনায় হিজরত করার আগ পর্যন্ত এই ঘরেই বসবাস করেছিলেন। ঐতিহাসিকদের একটি বর্ণনা অনুযায়ী, পরে হযরত আকীল ইবন আবি তালিব (রা.) এই ঘরটি খলিফা মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে বিক্রি করেন। এরপর তিনি এটিকে একটি মসজিদে রূপান্তর করেন। তবে আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, এই ঘরটি বিক্রি করেছিলেন মাতিব ইবন আবি লাহাব।

এই ঘর থেকেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নবুওয়তের দাওয়াতের সূচনা হয়েছিল। এখানেই ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) বিশ্বস্ত রাসূল ﷺ-এর কাছে পবিত্র কুরআনের ওহি নিয়ে আসতেন। এখানেই আল্লাহ তাআলা সেই আয়াতগুলো নাজিল করেন, যার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আর এই ঘরেই তিনি তাঁর প্রথম ও সবচেয়ে বড় সহায়ক হিসেবে খাদিজা (রা.)-কে পাশে পান।

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে: প্রথম ওহি নাজিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাড়িতে ফিরে এসে বললেন, “আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও।” খাদিজা (রা.) তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। ভয় কেটে গেলে তিনি সব ঘটনা তাঁকে খুলে বললেন এবং বললেন, “আমি আমার নিজের ব্যাপারে আশঙ্কা করছি।” তখন খাদিজা (রা.) বললেন, “আল্লাহর কসম! আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমান করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, মানুষের কষ্ট লাঘব করেন, দরিদ্রদের সাহায্য করেন এবং অতিথিদের সম্মান করেন।”

এই ঘরেই আল্লাহ তাআলা নাজিল করেন: “হে চাদরে আবৃত ব্যক্তি! উঠুন এবং মানুষকে সতর্ক করুন। আপনার প্রতিপালকের মহিমা ঘোষণা করুন এবং আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন।” (সূরা আল-মুদ্দাসসির: ১–৪) এই ঘরে বহুবার ওহি নাজিল হয়েছে। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘরের যে স্থানে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) ওহি নিয়ে অবতরণ করতেন, পরবর্তীকালে সেই স্থানটি “কুব্বাতুল ওহি” (ওহির গম্বুজ) নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এই ঘরেই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন খাদিজা (রা.)। এখানেই ইসলাম গ্রহণ করেন তাঁর মুক্তদাস জায়েদ ইবন হারিসা (রা.)। এছাড়া এই ঘরেই বেড়ে ওঠা আলী ইবন আবি তালিব (রা.)-ও ইসলাম গ্রহণ করেন।

অনেক বর্ণনা অনুযায়ী, এই ঘরেই ইসরা ও মিরাজের আগে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বক্ষ বিদীর্ণ করা হয় এবং তা জমজমের পানি দিয়ে ধৌত করা হয়। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “মক্কায় আমার ঘরের ছাদ খুলে দেওয়া হলো। এরপর জিবরাইল (আ.) অবতরণ করলেন। তিনি আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন এবং জমজমের পানি দিয়ে তা ধুয়ে দিলেন। তারপর তিনি একটি স্বর্ণের পাত্র নিয়ে এলেন, যা প্রজ্ঞা ও ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তিনি তা আমার বক্ষে ঢেলে দিলেন এবং পরে তা বন্ধ করে দিলেন। এরপর তিনি আমাকে নিয়ে আকাশের দিকে আরোহণ করলেন।”

কিছু বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, ইসরা ও মিরাজের যাত্রা মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে শুরু হয়েছিল। আবার কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বক্ষ বিদীর্ণ করার ঘটনা কাবা শরিফের পাশের অর্ধবৃত্তাকার স্থান হাতীম বা হিজর ইসমাঈল-এ ঘটেছিল।

হাফিজ ইবন হাজার আল-আসকালানি (রহ.) এ দুটি বর্ণনার সমন্বয় করে বলেন, প্রথমে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘরেই তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করা হয়। এরপর ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) তাঁকে মসজিদুল হারামে নিয়ে যান এবং সেখান থেকেই ইসরা ও মিরাজের যাত্রা শুরু হয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রায় ২৮ বছর এই ঘরে বসবাস করেছিলেন। এর মধ্যে নবুওয়ত লাভের আগে ১৫ বছর এবং নবুওয়ত লাভের পরে ১৩ বছর। তিনি ২৫ বছর বয়সে খাদিজা (রা.)-কে বিয়ে করেন এবং ৪০ বছর বয়সে প্রথম ওহি লাভ করেন।

খাদিজা (রা.)-এর এই ঘর ইসলামের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিবেশী কিছু কুরাইশ কাফির প্রায়ই এই ঘরের সামনে ও দরজার কাছে ময়লা-আবর্জনা এবং পশুর রক্ত ফেলে তাঁকে কষ্ট দিত। এদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল তাঁর চাচা আবু লাহাব, তার স্ত্রী উম্মে জামিল: যাকে কুরআনে “কাঠ বহনকারিণী” বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং উকবা ইবন আবি মুআইত।

ঐতিহাসিক আল-আজরাকি, আল-ফাকিহি ও আল-ফাসি উল্লেখ করেছেন যে, কাফিরদের পাথর নিক্ষেপ থেকে বাঁচার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো কখনো নিজের ঘরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে আশ্রয় নিতেন। পরবর্তীকালে সেই স্থানটি “কুব্বাতুল ইখতিফা” (আত্মগোপনের গম্বুজ) নামে পরিচিত হয়। কুরাইশের কিছু অবিশ্বাসী এই ঘরের কাছে এসে কুরআন তিলাওয়াত শুনত। কিন্তু তারা মানুষকে কুরআন শুনতে বাধা দেওয়ার জন্য উচ্চস্বরে অপ্রয়োজনীয় ও বিভ্রান্তিকর কথা বলত। তাদের মধ্যে আবু জাহল অন্যতম ছিল। সে কুরআন শুনে পরদিন আবার এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে উপহাস করত এবং তাঁকে কষ্ট দিত।

এই ঘরটি নতুন মুসলমানদের জন্যও একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল। খাদিজা (রা.) তাঁদের আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করতেন এবং সাধ্যমতো সহযোগিতা করতেন। বিশেষ করে নারীদের জন্য এখানে ইসলামের শিক্ষা দেওয়া হতো। আরকাম ইবন আবি আরকামের (রা.) ঘরের মতো এখানেও নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের ধ্বনি শোনা যেত।

হিজরতের সময় কুরাইশরা যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যা করার পরিকল্পনা করে, তখন তারা এই ঘরটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। সেই রাতেই আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনার উদ্দেশে বেরিয়ে যান। আর তাঁর বিছানায় সাহসিকতার সঙ্গে শুয়ে ছিলেন আলী ইবন আবি তালিব (রা.), যাতে শত্রুরা বুঝতে না পারে যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘর ছেড়ে চলে গেছেন। এটি ছিল নবুওয়তের ত্রয়োদশ বছর, খ্রিস্টাব্দ ৬২২ সালের ঘটনা।

খাদিজা (রা.) হিজরতের প্রায় তিন বছর আগে ইন্তেকাল করেন। তখনও মিরাজের ঘটনা ঘটেনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৬৫ বছর। তাঁকে মক্কার জান্নাতুল মুআল্লা (আল-মা’লা) কবরস্থানে দাফন করা হয়। তিনি এমন একটি গৌরবময় জীবন কাটিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, যার স্মৃতি আজও মুসলিমদের হৃদয়ে অম্লান। যুগে যুগে মানুষ তাঁকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করে এসেছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন এবং তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন।

অনুবাদ : নাফিসা নাজমী

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *