চাষার দুক্ষু

বাংলাদেশ রাজনীতি ও অর্থনীতি

“ক্ষেতে ক্ষেতে পুইড়া মরি, রে ভাই পাছায় জোটে না ত্যানা।

বৌ-এর পৈছা বিক্যয় তবু ছেইলা পায় না দানা।”

শুনিতে পাই, দেড় শত বৎসর পূর্বে ভারতবাসী অসভ্য বর্ব্বর ছিল, এই দেড় শত বৎসর হইতে আমরা ক্রমশঃ সভ্য হইতে সভ্যতর হইতেছি। শিক্ষায়, সম্পদে আমরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশ ও জাতির সমকক্ষ হইতে চলিয়াছি। এখন আমাদের সভ্যতা ও ঐশ্বর্য্য রাখিবার স্থান নাই। সত্যই ত, এই যে অভ্রভেদী পাঁচতলা পাকা বাড়ী, রেলওয়ে, ট্রামওয়ে, ষ্টীমার, এরোপ্লেন, মোটর লরী, টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, পোষ্টাফিস, চিঠিপত্রের সুনিয়মিত ডেলিভারী, এখানে পাটকল, সেখানে চটকল, অট্টালিকার চূড়ায় বড় বড় ঘড়ি, সামান্য অসুখ হইলে আট দশ জন ডাক্তারে টেপে নাড়ী, চিকিৎসা, ঔষধ, অপারেশন, ইনজেকশন, ব্যবস্থা-পত্রের ছড়াছড়ি, থিয়েটার, বায়স্কোপ, ঘৌড়দৌড় জনতার হুড়াহুড়ি, লেমলেও জিঞ্জারেও, বরফের গাড়ী, ইলেকট্রিক লাইট, ফ্যান, অনারেবলের গড়াগড়ি (বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় খাদ্য-দ্রব্যে ভেজালের বাড়াবাড়ি)-এ সব কি সভ্যতার নিদর্শন নহে? নিশ্চয়! যে বলে “নহে”, সে ডাহা নিমকহারাম।

কিন্তু ইহার অপর পৃষ্ঠাও আছে-কেবল কলিকাতাটুকু আমাদের গোটা ভারতবর্ষ নহে এবং মুষ্টিমেয়, সৌভাগ্যশালী ধনাঢ্য ব্যক্তি সমস্ত ভারতের অধিবাসী নহে। অদ্য আমাদের আলোচ্য বিষয়, চাষার দারিদ্র্য। চাযাই সমাজের মেরুদণ্ড। তবে আমার “ধান ভানিতে শিবের গান” কেন? অবশ্যই ইহার কারণ আছে। আমি যদি প্রথমেই পল্লীবাসী ক্যকের দুঃখ-দুর্দশার কান্না কাঁদিতে বসিতাম, তবে কেহ চট্ করিয়া আমার চক্ষে আঙ্গুল দিয়া দিয়া দেখাইতেন যে, আমাদের মোটরকার আছে, গ্রামোফোন আছে, ইত্যাদি। ভালর ভাগ ছাড়িয়া কেবল মন্দের দিকটা দেখা কেন? সেইজন্য ভালর দিকটা আগে দেখাইলাম। এখন মন্দের দিকে দেখা যাউক।

ঐ যে চটফল আর পাটকল; এক একটা জুট মিলের কর্মচারীগণ মাসিক ৫০০,০০-৭০০.০০ (পাঁচ কিম্বা সাত শত) টাকা বেতন পাইয়া নবাবী হালে থাকে, নবাবী চালে চলে, কিন্তু সেই জুট (পাট) যাহারা উৎপাদন করে, তাহাদের অবস্থা এই যে- “পাছায় জোটে না ত্যানা!” ইহা ভাবিবার বিষয় নহে কি? আল্লাহ্তা’লা এত অবিচার কিরূপে সহ্য করিতেছেন?

সমগ্র ভারতের বিষয় ছাড়িয়া কেবল বঙ্গদেশের আলোচনা করিলেই যথেষ্ট হইবে। একটি চাউল পরীক্ষা করিলেই হাঁড়িভরা ভাতের অবস্থা জানা যায়। আমাদের বঙ্গভূমি সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা, তবু চাষার উদরে অন্ন নাই কেন? ইহার উত্তর শ্রদ্ধাস্পদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দিয়াছেন, “ধান্য তার বসুন্ধরা যার”। তাই ত, অভাগা চাষা কে? সে কেবল “ক্ষেতে ক্ষেতে পুইড়া মরিবে,” হাল বহন করিবে, আর পাট উৎপাদন করিবে। তাহা হইলে চাষার ঘরে যে “মরাই-ভরা ধান ছিল, গোয়াল ভরা গরু ছিল, উঠান ভরা মুরগী ছিল,” এ কথার অর্থ কি? ইহা কি শুধুই কবির কল্পনা? না, কবির কল্পনা নহে, কাব্য উপন্যাসও নহে, সত্য কথা। পূর্ব্বে ওসব ছিল, এখন নাই। আরে! এখন যে আমরা সভ্য হইয়াছি! ইহাই কি সভ্যতা? সভ্যতা কি করিবে, ইউরোপের মহাযুদ্ধ সমস্ত পৃথিবীকে সবর্বস্বান্ত করিয়াছে, তা বঙ্গীয় কৃষকের কথা কি?

আমি উপযুক্ত উত্তরে সন্তুষ্ট হইতে পারি না, কারণ ইউরোপীয় মহাযুদ্ধত এই সাত বৎসরের ঘটনা। ৫০ বৎসর পূর্বেও কি চাষার অবস্থা ভাল ছিল? দুই একটি উদাহরণ দেখাই-বাল্যকালে শুনিতাম, টাকায় ৮ সের সরিষার তৈল ছিল, আব টাকায় ৪ সের ঘৃত। যখন টাকায় ৮ সের সরিষার তৈল ছিল, তখনকার একটা গল্প এই:

“কৃষক কন্যা জমিরনের মাথায় বেশ ঘন ও লম্বা চুল ছিল, তার মাথায় প্রায় আধ পোয়াটাক তেল লাগিত। সেইজন্য যেদিন জমিরন মাথা ঘষিত, সেদিন তাহার মা তাকে রাজবাড়ী লইয়া আসিত, আমরা তাকে তেল দিতাম।” হা অদৃষ্ট! যখন দুই গণ্ডা পয়সায় এক সের তৈল পাওয়া যাইত, তখনও জমিরনের মাতা কন্যার জন্য এক পয়সার তেল জুটাইতে পারিত না।

এইত ৩০/ ৩৫ বৎসর পূর্ব্বে বেহার অঞ্চলে দুই সের খেসারী বিনিময়ে কৃষক-পত্নী কন্যা বিক্রয় করিত! পচিশ বৎসর পূর্ব্বে উড়িষ্যার অন্তর্গত কণিকা রাজ্যের অবস্থা এই ছিল যে, কৃষকেবা “পখাল” (পাস্তা) ভাতের সহিত লবণ ব্যতীত অন্য কোন উপকরণ সংগ্রহ করিতে পারিত না। সুটকী মাছ পরম উপাদেয় বাঞ্জন বলিয়া পরিগণিত হইত। তখন সেখানে টাকায় ২৫।২৬ সের চাউল ছিল। সাত ভায়া নামক সমুদ্র-তীরবর্তী গ্রামের লোকেরা পখাল ভাতের সহিত লবণও জুটাইতে পারিত না। তাহারা সমুদ্র-জলে চাউল ধুইয়া ভাত রাঁধিযা খাইত। রংপুর জেলাব কোন কোন গ্রামের কৃষক এত দরিদ্র যে, টাকায় ১০ সের চাউল পাওয়া সত্ত্বেও ভাত না পাইয়া লাউ, কুমড়া প্রভৃতি তরকারী ও পাট-শাক, লাউ শাক ইত্যাদি সিদ্ধ করিয়া খাইত।

আর পরিধান করিত কী, শুনিবেন? পুরুষেরা বহু কষ্টে স্ত্রীলোকদের জন্য ৮ হাত কিম্বা ৯ হাত কাপড় সংগ্রহ করিয়া দিয়া নিজেরা কৌপিন ধারণ করিত। শীতকালে দিবাভাগে মাঠে মাঠে রৌদ্রে যাপন করিত; রাত্রিকালে শীত অসহ্য বোধ হইলে মাঝে মাঝে উঠিয়া পাটখড়ি জ্বালিয়া আগুন পোহাইত। বিচালী (বা পোয়াল খড়) শয্যায় শয়ন করিত। অথচ এই রংপুর ধান্য ও পাটের জন্য প্রসিদ্ধ। সুতরাং দেখা যায়, ইউরোপীয় মহাযুদ্ধের সহিত চাষার দারিদ্র্যের সম্পর্ক অতি অল্পই। যখন টাকায় ২৫ সের চাউল ছিল, তখনও তাহারা পেট ভরিয়া খাইতে পায় নাই-এখন টাকায় ৩/৪ সের চাউল হওয়ায়ও তাহারা অর্ধানশনে থাকে:

“এ কঠোর মহীতে

চাষা এসেছে শুধু সহিতে;

আর মরমের ব্যথা লুকায়ে মরমে

জঠর-অনলে দহিতে!”

পঁচিশ, ত্রিশ বৎসর পূবের্বর চিত্রত এই, তবে “মরাই-ভরা ধান ছিল, গোয়াল-ভরা গরু ছিল, ঢাকা-মসলিন কাপড় ছিল” ইত্যাদি কোন সময়ের অবস্থা? মনে হয়, অন্ততঃ শতাধিক বৎসর পূর্বের অবস্থা। যখন-

কৃষক-রমণী স্বহস্তে চরকায় সূতা কাটিয়া বাড়ীশুদ্ধ সকলের জন্য কাপড় প্রস্তুত করিত। আসাম এবং রংপুর জেলায় এক প্রকার রেশম হয়, স্থানীয় ভাষায় তাহাকে “এণ্ডি” বলে। এণ্ডি রেশমের পোকা প্রতিপালন ও তাহার গুটি হইতে সূতা কাটা অতি সহজসাধ্য কার্য্য। এই শিল্প তদ্দেশবাসিনী রমণীদের একচেটিয়া ছিল। তাহারা এ-উহার বাড়ী দেখা করিতে যাইবার সময় টেকো হাতে লইয়া সূতা কাটিতে কাটিতে বেড়াইতে যাইত।

এণ্ডি কাপড় বেশ গরম এবং দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়। ইহা ফ্লানেল হইতে কোন অংশে ন্যূন নহে, অথচ ফ্লানেল অপেক্ষা দীর্ঘস্থায়ী। একখানি এণ্ডি কাপড় অবাধে ৪০ (চল্লিশ) বৎসর টেকে। ৪/৫ খানি এণ্ডি চাদর থাকিলে লেপ, কম্বল, কাঁথা-কিছুরই প্রয়োজন হয় না। ফল কথা, সেকালে রমণীগণ হাসিয়া খেলিয়া বস্ত্র-সমস্যা পূরণ করিত। সুতরাং তখন চানা অন্নবস্ত্রের কাঙ্গাল ছিল না। তখন কিন্তু সে অসভ্য বর্বর ছিল। এখন তাহারা সভ্য হইয়াছে, তাই-

শিরে দিয়ে বাঁকা তাজ

ঢেকে রাখে টাক।

কিন্তু তাহাদের পেটে নাই ভাত। প্রশ্ন হইতে পারে-সভ্যতার সহিত দারিদ্র্য বৃদ্ধি হইবার কারণ কি? কারণ:- যেহেতু আপাতঃ-সুলভ মূল্যে বিবিধ রঙ্গীন ও মিহি কাপড় পাওয়া যায়, তবে আর চরকা লইয়া ঘর্ঘর করিবে কেন? বিচিত্র বর্ণের জুট ফ্লানেল থাকিতে বর্ণহীন এণ্ডি বস্ত্র ব্যবহার করিবে কেন? পূর্ব্বে পল্লীবাসিনীগণ ক্ষার প্রস্তুত করিয়া কাপড় কাচিত; এখন তাহাদের কাপড় ধুইবার জন্য হয় ধোপার প্রয়োজন, নয় সোডা। চারি পয়সার সোডায় যে কার্য্য সিদ্ধ হয়, তাহার জন্য আর কষ্ট করিয়া ক্ষার প্রস্তুত করিবে কেন?

এইরূপে বিলাসিতা শিরায় শিরায়, ধমনীতে ধমনীতে প্রবেশ করিয়া তাহাদিগকে বিষে জর্জরিত করিয়া ফেলিয়াছে। ঐ যে “পাছায় জোটে না ত্যানা” কিন্তু মাথায় ছাতা এবং সম্ভবতঃ পায়ে জুতা আছে ত! “বৌ-এর পৈছা বিকায়” কিন্তু তবু “বেলোয়ারের চুড়ি” থাকে ত! মুটে মজুর ট্রাম না হইলে দুই পদ নড়িতে পারে না। প্রথম দৃষ্টিতে ট্রামের ভাড়া পাঁচটা পয়সা অতি সামান্য বোধ হয়- কিন্তু ঐ যাঃ, যাইতে আসিতে দশ পয়সা লাগিয়া গেল! এই রূপে দুইটি পয়সা, চারি পয়সা করিয়া ধীরে ধীরে সর্ব্বস্বহারা হইয়া পড়িতেছে।

নিজ অন্ন পর কর পণ্যে দিলে,

পরিবর্ত ধনে দুরভিক্ষ নিলে!

বিলাসিতা ওরফে, সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে ‘অনুকরণপ্রিয়তা’ নামক আর একটা ভূত তাহাদের স্কন্ধে চাপিয়া আছে। তাহাদের আর্থিক অবস্থা সামান্য একটু সচ্ছল হইলেই তাহারা প্রতিবেশী বড়লোকদের অনুকরণ করিয়া থাকে। তখন চাষার বৌ-ঝির যাতায়াতের জন্য সওয়ারী চাই; ধান ভানিবার জন্য ভারানী চাই, ইত্যাদি। এইরূপ ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত আছে:

সর্ব্ব অঙ্গেই ব্যথা,

ঔষধ দিব কোথা?

এ বহ্নির শত শিখা

কে করিবে গণনা?

অতঃপর শিবিকাবাহকগণ পাল্কী স্কন্ধে লইয়া ট্রামে যাতায়াত করিলেই সভ্যতার চূড়ান্ত হইবে।

আবার মজা দেখুন, আমরাত সুসভ্য হইয়া এণ্ডি কাপড় পরিত্যাগ করিয়াছি, ‘কিন্তু ঐ এন্ডি কাপড়ই “আসাম সিল্ক” নামে অভিহিত হইয়া কোট, প্যান্ট ও স্কার্ট রূপে ইউরোপীয় নর-নারীদের বর-অঙ্গে শোভা পাইতে লাগিল। ক্রমে পল্লীবাসিনীর সভ্যতার মাত্রাধিক্য হওয়ায় (অর্থাৎ আর এন্ডি পোকা প্রতিপালন করা হয় না বলিয়া) এখন আর হোয়াইট-এ্যাওয়ে লেডলর দোকানে “আসাম সিল্ক” পাওয়া যায় না। কেবল ইহাই নহে, আসাম হইতে এণ্ডি গুটি বিদেশে চালান যায়- তথা হইতে সূত্ররূপে আবার আসামে ফিরিয়া আইসে।

এই ত সেদিনের কথা- বঙ্গের গভর্ণর লর্ড কার্মাইকেল একখানি দেশী রেশমী রুমালের জন্মস্থানের অনুসন্ধান করেন, কেহই বলিতে পারিল না, সেরূপ রুমাল কোথায় প্রস্তুত হয়। কিন্তু লর্ড কার্মাইকেল ইংরাজ বাচ্চা- সহজে ছাড়িবার পাত্র নহেন; তিনি রুমালটার জন্মভূমি আবিষ্কার করিয়া ফেলিলেন। পূর্বে মুর্শিদাবাদের কোন গ্রামে ঐরূপ রেশমী রুমাল প্রস্তুত হইত, এখন আর হয় না, কারণ সে গ্রামের লোকেরা সুসভ্য হইয়াছে! ফল কথা, সভ্যতা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দেশী শিল্পসমূহ ক্রমশঃ বিলুপ্ত হইয়াছে।

সুখের বিষয়, সম্প্রতি পল্লীগ্রামের দুর্গতির প্রতি দেশবন্ধু নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি পড়িয়াছে। কেবল দৃষ্টিপাতই যথেষ্ট নহে; চাযার দুক্ষু যাহাতে দূর হয়, সেজন্য তাঁহাদিগকে বিশেষ চেষ্টা যত্ন করিতে হইবে। আবার সেই “মরাই-ভরা ধান, ঢাকা মসলিন” ইত্যাদি লাভ করিবার একমাত্র উপায় দেশী শিল্প-বিশেষতঃ নারী শিল্পসমূহের পুনরুদ্ধার। জেলায় জেলায় পাটের চাষ কম করিয়া তৎপরিবর্তে কার্পাসের চাষ প্রচুর পরিমাণে হওয়া চাই এবং চরকা ও এণ্ডি সূতার প্রচলন বহুল পরিমাণে হওয়া বাঞ্ছনীয়। আসাম এবং রংপুরবাসিনী ললনাগণ এন্ডি পোকা প্রতিপালনে তৎপর হইলে সমগ্র বঙ্গদেশের বস্ত্র-ক্লেশ লাঘব হইবে। পল্লীগ্রামে সুশিক্ষা বিস্তারের চেষ্টা হওয়া চাই। গ্রামে গ্রামে পাঠশালা আর ঘরে চরকা ও টেকো হইলে চাষার দারিদ্র্য ঘুচিবে।

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *