মাতৃভাষা ও জাতীয় উন্নতি

রাজনীতি ও অর্থনীতি সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ভাষা মানব জাতির উন্নতির সর্বপ্রধান কারণ। উন্নতি-কুসুম ভাষা তরুতেই জন্মিয়া থাকে। মানবের ন্যায়নীতি, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস সমস্তই ভাষায় আবদ্ধ। আমাদের ভাষা আছে বলিয়াই জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মধ্যে পরিগণিত হইতেছি। ভাষা প্রভাবে সুখ-দুঃখ, শোক-হর্ষ প্রভৃতি মনোভাব পরস্পর পরস্পরের নিকট প্রকাশ করিতে পারি। পৃথিবীতে জাতীয় উন্নতির সহিত ভাষার উন্নতি দুশ্ছেদ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ। যে জাতির ভাষা যত উন্নত, সে জাতির ভাষায় উৎকৃষ্ট গ্রন্থের সংখ্যা তত অধিক। পৃথিবীতে চিরকাল সেই জাতি সেই পরিমাণে উন্নতি লাভ করিয়াছে এবং করিতেছে। ভাষার উন্নতি করিতে না পারিলে জাতীয় উন্নতি আশা করা “আকাশ-কুসুম” ব্যতীত আর কিছুই নহে। পৃথিবীতে যখন যে জাতি গৌরবের পতাকা উড়াইয়াছে, তখনই দেখিতে পাইবেন সে জাতি আপনাদের মাতৃভাষাকে পরিপুষ্ট সমলঙ্কৃত পরিপূর্ণ এবং সমুজ্জ্বল ও সুমার্জিত করিয়া তুলিয়াছে। যেমন মাতৃদুগ্ধে শিশু-শরীর অনুদিন হৃষ্ট-পুষ্ট-দ্রঢ়িষ্ঠ ও বলিষ্ঠ হয়, তেমনি মাতৃভাষাও জাতিকে গঠিত, উন্নত এবং পরিচালিত করে। মাতৃভাষা প্রাণের ভাষা- ইহা পবিত্র এবং পূজ্য। ইহার সেবা না করিলে ঘোরতর অধর্ম হয়।

বর্তমান সময়ে বঙ্গীয় মুসলমানদিগের মাতৃভাষা বাঙ্গালায় পরিণত হইয়াছে। মুসলমান রাজত্বের সময় হইতেই বাঙ্গালা ভাষার বিকাশ এবং গঠন হইতে থাকে, ইংরেজ রাজত্বে উহা এক্ষণে পুষ্টতা ও পক্কতা লাভ করিতেছে। বাঙ্গালার শ্রেষ্ঠতম কবি সৈয়দ আলাওল ২৫০ শত বছর পূর্বে যদিও মুসলমান-কুলে জন্মগ্রহণ করিয়া বঙ্গ সাহিত্যাকাশে অপূর্ব জাতীয় গৌরব এবং বঙ্গের পতাকা উড়াইয়া গিয়াছে তথাপি মুসলমান কীর্তি বঙ্গ সাহিত্যে আজ পর্যন্ত নিতান্তই অল্প পরিমাণে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।

আমাদিগের স্বাধীনতার সময়ে বাঙ্গালা ভাষায় আলোচনা তত কিছু প্রয়োজন ছিল না। তখন আরবী-পারসী যথাক্রমে ধর্ম ও রাজভাষা এবং সর্ব সাধারণের কথিত ভাষা ছিল। হিন্দু-মুসলমান সকলেই পারসী ও উর্দুর আলোচনা করিতেন। পারসী ও উর্দুতেই রাজকীয় সমস্ত কার্য নির্বাহিত হইত। তাই তখন বাঙ্গালা শিক্ষার বর্তমান সময়ের ন্যায় একান্ত আবশ্যকতা ছিলনা। কিন্তু এক্ষণে বাঙ্গালা ভাষা ব্যতীত আমাদিগের আর উপায় নাই। মাতৃভাষা বাঙ্গালা ব্যতীত বঙ্গীয় মুসলমানদিগের উত্থানের এবং নব জীবনের আশা করা নিতান্তই মূর্খতা প্রকাশ মাত্র। কিন্তু নিতান্তই দুঃখ এবং পরিতাপের বিষয় যে, বঙ্গীয় শিক্ষিত মুসলমানগণ এখনও এ মহাসত্য হৃদয়ঙ্গম করিতে সম্পূর্ণ সমর্থ হইতেছে না। অথবা অবহেলা করিয়া জাতীয় উন্নতির মূল সূদৃঢ় করিতে উদাসীন রহিয়াছেন।

আজ হিন্দুস্থানের মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দ কি আমাদিগের অপেক্ষা ইংরাজি শিক্ষায় অধিকতর অগ্রসর হইয়াছেন? আমি দৃঢ়তা এবং সততার সহিত বলিতেছি, নিশ্চয়ই না। কিন্তু তাহাদের মাতৃভাষা উর্দুর আলোচনা থাকায় উর্দু ভাষায় প্রচুর পরিমাণে উৎকৃষ্ট গ্রন্থ নিরন্তর অনুবাদিত হওয়ায় উর্দুর প্রতি তাহাদের মাতৃবৎ শ্রদ্ধা এবং অনুরাগ থাকায় আজ তাহাদের মধ্যে নব জীবনের লক্ষণ পরিদৃষ্ট হইতেছে। ভ্রাতঃ বঙ্গীয় মুসলমান! তুমিও তোমার মাতৃভাষা পরম পবিত্র বাংলার সেবায় বদ্ধপরিকর হও, শীঘ্রই দেখিবে, বঙ্গীয় মুসলমান গগনে শুভ ঊষার আগমন হইয়াছে।

সমাজহিত চিকিৎর্ষ মহোদয়গণ! নিশ্চয় জানিয়া রাখিবেন আমরা যতই আরবী, পারসী, উর্দু এবং ইংরাজিতে পণ্ডিত হই না কেন, যতই আমরা অন্যান্য ভাষার আলোচনা করি না কেন, যতদিন আমরা বাংলার আলোচনায় বদ্ধপরিকর না হইব, যতদিন জাতীয় সাহিত্য ইতিহাস এবং দর্শন বিজ্ঞান ভূরি পরিমাণে লিখিত এবং রচিত না হইবে- যতদিন আমাদের মধ্যে শত শত জাতীয় কবি এবং বক্তা আবির্ভূত না হইবে, ততদিন আমাদের জাতীয় উন্নতির আশা করা নিতান্তই মূর্খতা। মাতৃভাষার আলোচনা ব্যতীত অন্যান্য ভাষায় সুপণ্ডিত হইয়া দুই চারিটি লোকের ব্যক্তিগত উন্নতি হইলেও হইতে পারে- কিন্তু জাতীয় উন্নতি বা অভ্যুত্থান কদাপি হইতে পারে না।

মাতৃভাষা ব্যতীত কোন জাতি উন্নতি লাভ করিতে পারে নাই। যখন আরব জাতি জ্ঞান গৌরবের এবং জয় মহিমার বিজয় পতাকা পৃথিবীর নানাদেশে উড্ডীয়মান করিয়াছিলেন, যখন বর্তমান জগতের ভাগ্যচক্রের বিধাতা ইউরোপখণ্ড তাঁহাদের পাদমূলে বসিয়া শিক্ষা ও সভ্যতা লাভ করিয়াছিল- তখন আরবগণ তাঁহাদের মাতৃভাষা আরবীর কীদৃশ কঠোর সাধনা এবং গভীর অধ্যবসায়-বলে বিবিধ রত্নরাজিতে বিভূষিত করিয়াছিলেন, তাহা চিন্তা করিলে বিস্মিত হইতে হয়। পৃথিবীর যাবতীয় ভাষা- গ্রীক, ল্যাটিন, হিব্রু, জেন্দ, সংস্কৃত এমন কি চীনা ভাষা হইতেও যাবতীয় উৎকৃষ্ট গ্রন্থ আরব্য ভাষায় অনুবাদিত হইয়াছিল। তাই আরব জাতি ভূতলে অতুল কীর্তির পতাকা উড়াইয়া গিয়াছেন।

বর্তমান যুগে ইংরেজ জাতির ইংরাজি ভাষার প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করিয়া দেখ। আজ ইংরাজি ভাষা অন্যূন ২৫ লক্ষ গ্রন্থে সমলঙ্কৃত। আরবী, পারসী, চীনা, সংস্কৃত প্রভৃতি পৃথিবীর যাবতীয় শ্রেষ্ঠ এবং অশ্রেষ্ঠ ভাষা হইতে প্রতিদিন শত শত গ্রন্থ অনুবাদিত হইয়া ইংরাজি ভাষাকে পরিপুষ্ট করিতেছে- সহস্র সহস্র ধীসমৃদ্ধ জ্ঞানবৃদ্ধ মহা মহা পণ্ডিত, নিরন্তর মস্তিষ্ক পরিচালনা করিয়া অনবরত ইংরাজি ভাষায় আপনাদের অমূল্য চিন্তাস্রোত ঢালিয়া দিতেছেন। তাই আজ ইংরাজি পৃথিবীর অদ্বিতীয় ভাষা এবং তাহার সেবক ইংরেজ ও আমেরিকান পৃথিবীর অদ্বিতীয় জাতি। তাই বলিতেছি, হে বঙ্গীয় মুসলমান! যদি জাতীয় মঙ্গল এবং কুশল কামনা কর তবে মাতৃভাষার সেবায় বদ্ধপরিকর হও।

বঙ্গের প্রতি মাদ্রাসায় বাঙ্গালা ভাষার প্রতিষ্ঠা করা একান্তই কর্তব্য। আমাদের বঙ্গীয় মৌলভী সাহেবগণ, মাতৃভাষায় অনভিজ্ঞ বলিয়া সমাজের বা ধর্মের কোনই উপকার সাধন করিতে সমর্থ হইতেছেন না। তাঁহারা এক্ষণে কোনও সভা সমিতিতে বক্তৃতা বা ওয়াজ করিবার জন্য দণ্ডায়মান হইলে তাঁহাদের কদর্য খিচুড়ী ভাষা শ্রবণে শিক্ষিত সভ্য শ্রোতাগণের হাস্য সম্বরণ করা কঠিন হইয়া পড়ে। হায়! শত আক্ষেপ! আজ যদি আমাদের মৌলভী সাহেবগণ, একটুকু ভাল বাঙ্গালাও জানিতেন, তাহা হইলে আজ তাঁহাদিগকে ভিক্ষার ঝুলি স্কন্ধে করিয়া দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিয়া জঠর জ্বালা নিবারণ করিতে হইত না। ভাল বাঙ্গালা জানিলে জমিদারী বা মহাজনী লাইনে অথবা আদালতে সেরেস্তায় কিম্বা চিকিৎসা বা গ্রন্থানুবাদ কার্যে ব্যাপৃত থাকিয়া গৌরবের সহিত জীবনযাত্রা নির্বাহ করিতে পারিতেন। মাদ্রাসা সমূহে রীতিমত বাঙ্গালা ভাষার অধ্যাপনা না হওয়ায় তাঁহারা আরবী-পারসী প্রভৃতি ভাষার যে দুই চারিখানি ভাল গ্রন্থ পড়েন, তাহাও তাঁহাদের হৃদয়ঙ্গম হয় না।

বাঙ্গালা না জানায় আমাদিগের শুদ্ধ আরবী-পারসী পড়া মৌলভী সাহেবদিগের দ্বারা সমাজের উপকার হওয়া দূরে থাকুক, অনুদিন ক্ষতি এবং অবনতির মাত্রা বাড়িয়া চলিয়াছে। হায়! জানি না কবে মাদ্রাসা সমূহের সংস্কার হইবে। কবে হিন্দুস্থানী মৌলভীদিগের ন্যায় আমাদিগের দেশের মৌলভীগণ মাতৃভাষায় কৃতিত্ব লাভ করিয়া আরবী, পারসী ভাষার গ্রন্থ সকল অনুবাদ করতঃ জাতীয় উন্নতির পথ সুগম করিয়া দিবেন? হে মৌলভী সাহেবগণ! ইহা কি নিতান্তই লজ্জা এবং পরিতাপের বিষয় নহে যে, বঙ্গে সহস্র সহস্র মাদ্রাসা পাস মুসলমান থাকিতে, আজ ব্রাহ্ম পণ্ডিত আমাদিগের কোরান এবং হাদিসের অনুবাদ করিতেছেন?

তাই বলি, ভ্রাতঃ বঙ্গীয় মুসলমান! আর আলস্যে কাল কাটাইও না। বঙ্গভাষাকে হিন্দুর ভাষা মনে করিও না। যে ভাষায় তুমি মনে সুখ দুঃখের কথা প্রকাশ কর, যে ভাষায় তুমি স্বপ্ন দেখ, যে ভাষায় তুমি মনোভাব ব্যক্ত করিয়া সমস্ত শান্তি এবং আরাম লাভ কর তাহা নিজের মাতৃভাষা। জগতের সমস্ত ভাষা অপেক্ষা তাহার গৌরবের পরিমাণ নিতান্ত অল্প নহে। মাতাকে ঘৃণা করিলে, তাঁহার সেবা শুশ্রূষা না করিলে যে পাপ; মাতৃভাষার সেবা না করিলে, তাহার যত্ন না করিলেও সেই পাপ।

* মাসিক ইসলাম প্রচারক, পৌষ-মাঘ ১৩০৮, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ১৯০২।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *