আত্নবিশ্বাস

চিন্তা ও দর্শন

যে নদীর স্রোত রুদ্ধ হইয়া যায়, তাহার পানি যেমন হাজিয়া মজিয়া পচিয়া দুর্গন্ধযুক্ত এবং অব্যবহার্য হইয়া পড়ে, তেমনি যে জাতি আত্মগৌরব ও আত্মশক্তিতে বিশ্বাসহারা হইয়া পড়ে, তাহারাও কালস্রোতে পদ্মার তীরের ন্যায় ক্রমশঃ ভাঙ্গিয়া পড়ে। পৃথিবীর সমস্ত লাঞ্ছনা ও দুর্গতি তাহাদের মস্তকেই পতিত হয়।

মেরুদণ্ড দুর্বল বা ভগ্ন হইলে মানুষ যেমন দণ্ডায়মান হইতে পারে না, আত্মশক্তিতে বিশ্বাস বিহীন জাতিও তেমনি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও, পৃথিবীর বক্ষে সোজা হইয়া দৃপ্ততেজে দণ্ডায়মান হইতে পারে না। আত্মশক্তির প্রতি যাহার শ্রদ্ধা আছে, সে একদিন যত বিলম্বেই হউক না কেন, তরুর ন্যায় নিজের পায়ে নির্ভর করিয়া গগনমার্গে শির উত্তোলন করিবেই। কিন্তু যাহার আত্মবিশ্বাস নাই, তাহার অন্য গুণ যতই থাকুক না কেন, চিরকাল আশ্রয়হীনা লতার ন্যায় শোচনীয় দুর্গতিগ্রস্ত হইয়াই কাল কাটাইবে। বিশ্বাসই হইতেছে-আত্মার খাদ্য

বিশ্বাস হইতে চিন্তা এবং চিন্তা হইতে কার্যের উৎপত্তি। প্রত্যেক মানবের কার্যই তাহার বিশ্বাসের অনুরূপ হইবে

সিংহশাবক যে ভেড়া না হইয়া সর্বদাই সিংহ হয়, সে তাহার বিশ্বাসের গুণেই। আর মেষশাবক যে সিংহ-স্বভাব না হইয়া মেষ হয়, সেও তাহার বিশ্বাসের গুণেই। “যাদৃশী কল্পনা যস্য সিদ্ধিভবতি তাদৃশী। একজন ভীরু ব্যক্তি যদি জোর করিয়া মনে মনে ভাবিতে পারে যে, সে সাহসী, তেজস্বী এবং বীর, তাহা হইলে ভয় এবং দুর্বলতা স্থলে সাহস ও শৌর্য আসিয়া দেখা দিবে। তার এই অনুভূতি তীব্র এবং স্থায়ী হওয়া চাই। তাহা হইলেই প্রেয় লাভের জন্য সে ব্যক্তি কঠোর নিয়ম পদ্ধতির কণ্টকাকীর্ণ রাস্তার মধ্য দিয়া বীরদর্পে চলিয়া যাইতে পারিবে। আর দুর্জয় আত্মবিশ্বাস আসিলে সিদ্ধিলাভ অনিবার্য। জগতের সকল জাতির অভ্যুত্থানের মূলেও আত্মবিশ্বাসের জ্বলন্ত প্রভাব বিদ্যমান রহিয়াছে। আরব জাতির অভ্যুত্থানের মূলেও এই আত্মবিশ্বাসের অগ্নিক্রীড়া ইতিহাসের পৃষ্ঠ ঝলসাইয়া দিয়াছে। সে অগ্নিক্রীড়ার দুঃসহ উত্তাপে একদিন বিস্মিত এবং স্তম্ভিত জগৎ বিচলিত হইয়া পড়িয়াছিল! তাই বিশ্বের সকল জাতিই তাহাদের চরণতলে মস্তক নত করিতে বাধ্য হইয়াছিল।
যাহারা যুগ-যুগান্তর হইতে বিচ্ছিন্ন এবং বিশৃঙ্খলভাবে জীবনযাপন করিতেছিল, তাহারা ইসলামের প্রভাবে খোদাভক্ত এবং ঐক্যসম্পন্ন জাতিতে পরিণত হইয়াছিল; শুধু তাহাই নহে- পরন্তু ইসলাম এবং ইসলামের মহাপয়গম্বর পুনঃ পুনঃ তাঁহাদিগকে বলিয়াছিলেন যে,- “তাহারাই (যথার্থ মুসলমান হইলে) পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হইবে। রুম, শাম, মিশর ও ইরান তাঁহাদের চরণতলে লুণ্ঠিত হইবে। বিশ্বের সমস্ত সুখ সম্পদ এবং প্রভুত্ব প্রতিপত্তি তাঁহাদের করতলগত হইবে।
মহাপয়গম্বরের এই অমৃত বাণীতে গভীর ও অটল বিশ্বাস স্থাপন করিয়াই আরবগণ সংখ্যা এবং অস্ত্রশস্ত্রে হীন হইয়া কাল-বৈশাখীর ঝঞ্ঝাবাতের মত প্রবল-প্রতাপ রাজ্যসমূহ বিজয়ে বহির্গত হইলেন। গভীর আত্মবিশ্বাসের জ্বলন্ত অনলে তাহাদের সমস্ত বাধা-বিঘ্ন ও দুর্বলতা ভষ্ম হইয়া উড়িয়া গেল! রোম ও পারস্যের বিশ্ব-বিজয়ী সৈন্যবল পর্যন্ত তাহাদের সম্মুখে চুরমার হইয়া গেল। দুর্বার আত্মবিশ্বাসের বলে উন্মুক্ত গগনমার্গে তাঁহারা আপনাদের বিজয়-বৈজয়ন্তী উড্ডীন করিলেন।
এইরূপ যখন যে জাতি পৃথিবীতে যে বিষয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে, তখন শুধু তাহা আত্মবিশ্বাসের বলেই লাভ করিয়াছে। শিক্ষিত বাঙ্গালী মুসলমানের মধ্যেও এই আত্মবিশ্বাসের সম্যক অভাব পরিলক্ষিত হইতেছে। শিক্ষিত মুসলিম যুবকগণ পর্যন্ত সকল বিষয়েই যেন নিরাশ এবং হতাশ। তেজঃ, বীর্য, সাহস, শৌর্য যেনবা জাতির ভিতর হইতে লোপ পাইয়াছে। উৎসাহ উদ্যমের নাম গন্ধও তাহাদের মধ্যে নাই। কি সাহিত্য সাধনা, কি সমাজসেবা- সকল বিষয়েই তাঁহারা নির্বাক, নিশ্চল এবং নিস্পন্দ। ইহাদের অনেকেই এরূপ অলস ও প্রাণহীন যে, তাহারা বিশ্বজগতের কোন খবরও রাখে না। ইহাদের মধ্য হইতে একজন বিখ্যাত কবি, লেখক বা বক্তা জন্মগ্রহণ করেন নাই। নিজের ধর্ম সম্বন্ধেও ইহারা নিতান্ত উদাসীন। ইহাদের মধ্যে একজনও ধর্ম প্রচারের ব্রত অবলম্বন করিতে অগ্রসর হন নাই। বি. এ., এম. এ. উপাধিধারী যুবকদিগের দ্বারা যতটা জাতি সেবার আশা করা গিয়াছিল, তাহার শতাংশের একাংশও কার্যক্ষেত্রে উপলব্ধি হইতেছে না! ইহাপেক্ষা লজ্জা ও ক্ষোভের বিষয় আর কি হইতে পারে?

আত্মবিশ্বাসের অভাবেই আমাদিগের গ্রাজুয়েটদিগের অন্তঃকরণে আত্মতেজের স্ফূরণ হইতেছে না। এই আত্মতেজের অভাবে তাহাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের বিকাশ অতি ক্ষীণভাবেই দেখা যাইতেছে। ফলতঃ শুধু গ্রাজুয়েট বলিয়া নহে, সকল শ্রেণীর মুসলমানের মধ্যেই ভীরুতা, দুর্বলতা এবং আলস্য ঔদাস্য অতি শোচনীয়ভাবে দেখা দিয়াছে। শিক্ষিত লোকেরাই সমাজ ও জাতির আদর্শ বলিয়া তাহাদিগের কথা বিশেষ করিয়া উল্লেখ করা আবশ্যক

এক্ষণে প্রশ্ন হইতেছে এই যে, এই আত্মবিশ্বাসের অভাব কেন? শিক্ষার প্রধানতম কার্যই হইতেছে আত্মসম্মান ও আত্মবোধ এবং আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হইয়া নিজকে, পরিমার্জিত এবং পরিচালিত করা। কিন্তু আমরা খুব জোর গলায় বলিতে পারি যে, বর্তমান শিক্ষায় মুসলমান যুবকদিগের মনে আত্মসম্মান ও আত্মশক্তির বৃদ্ধি দূরে থাকুক, শূন্যগর্ভ অভিমান-বিলাসিতা দ্রুত পরিবর্ধিত হইতেছে! জ্ঞান চর্চার স্পৃহা না থাকায় তাঁহারা স্কুল কলেজে লব্ধ যৎসামান্য জ্ঞান লইয়া বদ্ধ কোটরের পেঁচক সাজিতেছেন! সত্য কথা বলিতে গেলে বলিতে হয় যে, আমাদের শিক্ষিত যুবকমণ্ডলী জ্ঞান, চরিত্র, পুরুষাকারে, এবং স্বজাতি সেবায় আমাদিগকে কিছুমাত্র আনন্দিত এবং উৎফুল্ল করিতে পারেন নাই! পরম্ভআমাদিগকে বিষাদ সাগরে নিমজ্জিত করিয়াছেন! বর্তমানে যে কয়েকজন কর্মবীর আপ্রাণ চেষ্টায় বিরাট সমাজ দেহকে কিছু কিঞ্চিৎ জাগাইয়া রাখিয়াছেন, মুষ্টিমেয় এই লোকগুলির হঠাৎ অভাব হইলে বাঙ্গালার দুই হাজার গ্রাজুয়েট ও আন্ডার গ্রাজুয়েট এবং দশ হাজার মওলানা মৌলভীদিগের দ্বারা তাঁহাদের একজনের অভাব পূর্ণ হইবে কিনা সন্দেহ। হায়! সমাজের কি ভীষণ দুরবস্থা! কি শোচনীয় ব্যাপার!
আমরা স্কুল কলেজে এবং মাদরাসা মক্তবে ছেলে পাঠাইয়া দিয়া ভাবি যে, ছেলেকে শিক্ষা দিবার সমস্ত কর্তব্যই প্রতি পালন করিলাম। বৎসরের পর বৎসর পাশ করিয়া করিয়া গেলেই অভিভাবকেরা ছেলের যথেষ্ট তারিফ করেন! শিক্ষকেরাও আপনাদের বাহাদুরী ফলাইতে কম করেন না!! কিন্তু কেহই তলাইয়া দেখেন না যে, কেবল পাশ করিলেই বিদ্যার্জন হয় না। বাস্তবিক পক্ষে ছাত্রের বা সন্তানের মনে জ্ঞানের অনুরাগ এবং জ্ঞানের প্রতি আনন্দজনক শ্রদ্ধার উদ্রেক হইতেছে কিনা, তাহাই দেখিবার জিনিস। বলাবাহুল্য যে আধুনিক নিয়মের পরীক্ষার দ্বারা ছাত্রের জ্ঞান স্পৃহার সম্যক পরিচয় পাওয়া যায় না। এই জন্য আমরা প্রতিনিয়তই দেখিতে পাইতেছি যে, শত শত বি. এ., এম. এ. পাশ করা নামজাদা যুবকদের মধ্যেও জ্ঞান পিপাসার উদ্রেক হয় না। জ্ঞান চর্চার মধ্যে যে এক পরম রস ও আত্মপ্রসাদ আছে, তাহার স্বাদ তাহারা এক বিন্দুও পায় নাই। এই রসের স্বাদ গ্রহণেচ্ছা জন্মাইয়া দেওয়াই হইতেছে স্কুল কলেজের শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য। আর এই জ্ঞানের মধ্য দিয়া আত্মোপলব্ধি করাই হইতেছে জ্ঞানের প্রধান কার্য। আত্মোপলব্ধির অর্থ এখানে কেহ আত্মার লম্বাই- চওড়াইকে মনে করিবেন না। আত্মোপলব্ধির মানে হইতেছে নিজেকে মানুষ, সর্বজীবশ্রেষ্ঠ মানুষ, বিধাতার বিশেষ অনুগৃহীত মানুষ বলিয়া বিশ্বাস করা,

* নিজেকে কর্মী তেজস্বী এবং স্বাভাবিকভাবে চরিত্রবান বলিয়া বিশ্বাস করাই হইতেছে যথার্থ আত্মোপলব্ধি। এইরূপ আত্মবিশ্বাস এবং আত্মোপলব্ধি দ্বারাই । মানবজীবনের গৌরব ও মহিমা ফুটিয়া উঠে। এইরূপ আত্মবিশ্বাসের বলেই মানুষ মানুষ হইয়া উঠে!! আর এইরূপ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতেই জাতীয় ‘ জীবনের গৌরব ও প্রতাপ আকাশস্পর্শী হইয়া উঠে। ফলতঃ এই আত্ম-বিশ্বাসই হইতেছে মনুষ্যত্বের মূল ভিত্তি! কিন্তু নিতান্ত পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের ধর্ম ও সংসার সম্বন্ধীয় শিক্ষায় এই আত্মবিশ্বাসের নাম গন্ধও নাই। ধর্ম সম্বন্ধীয় শিক্ষার ধর্মের এক অঙ্গ যে দুনিয়াদারী, তাহা একেবারেই উপেক্ষিত এবং । অজিজ্ঞাসিত হইয়া রহিয়াছে। দুনিয়ার প্রাধান্য এবং প্রতিপত্তি লাভ না করিতে পারিলে যে আখেরাতের মুক্তি পাইবার পথ কঠিন ও সঙ্কট সঙ্কুল হইয়া দাঁড়ায়, তাহা আজকাল চিন্তা করিবার শক্তিও আমাদের নাই। ইসলাম দুনিয়াকে ত্যাগ করিয়া নহে বরং দুনিয়াকে গ্রাস করিয়া, বশ করিয়া এবং অধীন করিয়াই শুধু পূর্ণতা লাভ করিতে পারে। দুনিয়ার গোলাম হওয়া আর দুনিয়ার মালিক হওয়া যে, দুইটা পরস্পর ভয়ানক বিপরীত কথা, তাহাও আমরা ভুলিয়া গিয়াছি। যে ধর্মের চারি ফরজের মধ্যে দুই ফরজ (হজ ও জাকাত) ধনের উপরে স্থাপিত; আশ্চর্য ব্যাপার আজ সেই সমাজের শত শত আলেম পল্লীতে পল্লীতে যাইয়া – কেবল দরিদ্রতার মাহাত্ম্যই কীর্তন করিতেছেন! তাঁহারা ভ্রমেও ব্যবসায়-বাণিজ্য বা অর্থনীতি সম্বন্ধে একটি উপদেশও প্রদান করেন না। তাহারা অনবরত খয়রাতের কথাই বর্ণনা করেন, কিন্তু উপার্জন এবং সঞ্চয়ের কথা কখনও বলেন না।
যে ইসলামের পয়গম্বর নিজ হস্তে কুঠারের ডাণ্ডা লাগাইয়া দিয়া ভিক্ষার পরিবর্তে প্রার্থীকে কাঠ কাটিয়া পরিশ্রম করিয়া খাইবার জন্য বাধ্য করিয়াছেন, নিজে তিন দিবস অনাহারে থাকিয়া নিজের অভাবের কথা শিষ্যদিগকে জানিতে না দিয়া বিধর্মীর মেষ-পালকে জলপান করাইয়া তদ্বিনিময়ে মজুরী গ্রহণ করিয়াও জীবিকা নির্বাহে কুণ্ঠিত হন নাই, আজ তাঁহারই “উম্মত নামধারী জীবদিগের মধ্যে সহস্র সহস্র সবল ভিক্ষুক অকুণ্ঠিত চিত্তে বিরাজ করিতেছে। আরও পরিতাপের বিষয় যে তাঁহার প্রতিনিধি বলিয়া যাঁহারা দাবী করেন এরূপ শত শত মওলানা, মৌলভী, মুন্নী কেহ পাল্কীতে, পদব্রজে, কেহ বজরায়, কেহ মুরিদ করিবার ছলে, কেহ ভূত-প্রেত তাড়াইবার ছলে, কেহ দোওয়া-তাবিজ দিয়া ব্যারাম সারাইবার ছলে, কেহ সম্পত্তিশালী বিধবাকে নেকাহ করিবার ছলে, কেহ হজ্বে যাইবার ছলে, কেহ মসজিদ দিবার ছলে, কেহ মাদরাসা দিবার ছলে, কেহ কাবা শরীফে বাতি দিবার ছলে, কেহ কাবা শরীফের কবুতরদিগকে আহার দিবার ছলে, কেহ কবর জেয়ারত এবং কেহ গোর আজাব হইতে মোরদাকে বাঁচাইবার ছলে, কেহ গুপ্ত তন্ত্র-মন্ত্র প্রভাবে লোকের মনস্কামনা পূর্ণ করিবার ছলে, কেহ কপাল দেখিয়া অদৃষ্ট গণনা করিবার ছলে, কেহ যাকাত ও ফেত্রা, কোরবানী লিল্লাহ-ছদকা প্রভৃতি লুণ্ঠন করিবার ছলে পল্লীতে পল্লীতে ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন।
আমাদিগের মধ্যে ভণ্ডামী, ছলনা, প্রবঞ্চনা এবং বদমায়েশীর কিন্তু সীমা-পরিসীমা নাই, বিন্দুমাত্র আত্মসম্মান বা আত্মবিশ্বাসও ইহাদিগের মধ্যে নাই! কি ভীষণ ও শোচনীয় মারাত্মক অবস্থা!!
যে ধর্মের উপাসনার মুনাজাত হইতেছে “রব্বানা আতেনা ফিদদুনিয়া হাছানাতাও ওয়াফিল আখেরাতে হাছানা।অর্থাৎ হে প্রভু! ইহলোক ও পারলৌকিক মঙ্গল দান কর। সেই ধর্মের এবং শ্রেণীর প্রচারকগণ পৃথিবীর প্রভুত্ব প্রতিপত্তি, মান-সম্মান, শান-শওকতকে একেবারে ঝাঁটাইয়া দূর করিয়া দিতে আদাজল খাইয়া উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন। প্রতি সপ্তাহে জুমার খোতবায় যাহারা স্বজাতির এবং স্বজাতীয় বাদশাহদিগের রাজত্বের উন্নতি, বিস্তৃতি এবং কল্যাণ কামনা করিয়া থাকেন, অধিকন্তু আপনাদের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতার জন্য প্রার্থনা করেন, তাঁহারাই আবার রাজনীতির চর্চায় বেহুঁশ ও বেসামাল হইয়া পড়েন। রাজনীতি চর্চাকে অনাবশ্যক ‘ফজুল’ বা ‘বেহুদা’ বলিয়া মনে করেন। ইহা অপেক্ষা মূঢ়তা গোমরাহি কি হইতে পারে?

যে ইসলামের পত্রে পত্রে ছত্রে ছত্রে রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি, প্রভুত্ব ও পরাক্রমনীতি ষোলকলা বিরাজমান, আজ কালের কুটিল চক্রে সে ইসলামের সেবক ও রক্ষক আলেমগণই সাধারণতঃ রাজনীতিতে ভয়াবহরূপে উদাসীন ও বিমুখী। এমন জাতির যদি অধঃপতন না হয়, তাহা হইলে আর কাহার হইবে।

ফলতঃ আমাদের ধর্ম শিক্ষা হইতে রাষ্ট্রনীতি ও আত্মপ্রাধান্য নীতিকে পরিবর্জন করিবার ফলে আমাদের জাতির অনুকরণ হইতে আত্মতেজস্বী আত্ম বিশ্বাস, আত্মমর্যাদা বোধ একেবারে সমূহে উৎপাটিত হইয়াছে। তাহার সঙ্গে উচ্চ আশা, উচ্চ লক্ষ্য, উচ্চ কল্পনাও গায়েব হইয়া গিয়াছে।
আজকাল “জাতীয় উন্নতি” বলিয়া একটি কথা সর্বদাই উচ্চারিত ও শ্রুত হওয়া যায় বটে, কিন্তু বেশ জোরের সহিত বলিতে পারি যে, তা “জাতীয় উন্নতি” কথাটার চরম ও পরম অর্থ আমাদের উচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত বিদ্যাবাগীশদিগের মধ্যেও অনেকে বুঝিবার চেষ্টা করেন না। “জাতীয় উন্নতি অর্থে অনেকেই বুঝেন যে, কয়েকজন বা কয়েক মুসলমান যুবকের সাব-ডিপুটিগিরি, সাব-রেজিস্ট্রারী এবং দারোগাগিরির চাকরি। তাহার অধিক যদি কেহ বুঝেন, তবে আরও একটু জাগতিক হিসাবে উন্নতি। কিন্তু জাতীয় উন্নতির অর্থ কি ইহাই? যদি ইংরাজ, ফরাসী, জার্মানি, তুর্কীকে যাইয়া জিজ্ঞাসা কর জাতীয় উন্নতির অর্থ কি? ইংরাজ, তুর্কী জার্মানের একটি দশ বর্ষ বয়স্ক বালকও বলিয়া দিবে যে জাতীয় উন্নতির অর্থ ইহা নহে। জাতীয় উন্নতির অর্থ প্রতিযোগিতায় সকল বিষয়ে সকল জাতির সহিত সমকক্ষতা করা বা সকল জাতিকে প্রতিযোগিতায় হারাইয়া দেওয়া। বিশ্বের বক্ষে আপনার শ্রেষ্ঠত্ব ও গৌরবের পরিচয় দেওয়া। আমি জিজ্ঞাসা করি, অন্যান্য স্বাধীন ও পরাক্রান্ত জাতির সহিত প্রতিযোগিতা করা দূরে থাকুক, আমাদেরই অবস্থাপন্ন হিন্দুদিগের সহিত যে, আমাদিগকে প্রতিযোগিতা করিয়া নিজেদের মহিমা ও গৌরব প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে, সে বিষয়েই বা কয়টা লোক চিন্তা করিয়া থাকেন?
যদি শিক্ষিত ব্যক্তিরা, তেমন গভীর ও ব্যাপকভাবে এ বিষয়ে চিন্তা করিতেন, তাহা হইলে হিন্দু ভ্রাতাদিগের নিকট আমরা ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের পরিবর্তে প্রীতি ও সম্মান লাভ করিতে পারিতাম। আমরা যে হিন্দু ভ্রাতৃবৃন্দ কর্তৃক কাব্য-উপন্যাসে লাঞ্ছিত এবং ব্যবহারে অসম্মানিত হইতেছি, তাহাতে হিন্দুদিগের কিছুমাত্র দোষ নাই, সম্পূর্ণ দোষ আমাদেরই। লাঞ্ছনা করা অপেক্ষা, যে লাঞ্ছিত হয়, তাহারই দোষ বেশী। কারণ সে অক্ষম। অক্ষম তাহার আবার সম্মান কি? ইজ্জত কি? অক্ষমতাই সমস্ত পাপের আকর! এমন দর্শন শাস্ত্রে অক্ষমতাই হইতেছে জীবন্ত পাপ এবং অপরাধের মূর্তি।
যে কানমলা দেয়, সে অত্যাচারী হইতে পারে। কিন্তু সে অক্ষম নহে। বরং সে ক্ষমতাশালী। অন্ততঃ কানমলা দিবার শক্তি তাহার আছে। এই জন্য সে ভয়ের পাত্র হইতে পারে, কিন্তু ঘৃণার পাত্র নহে। কিন্তু যে কানমলা খায় এবং বিনা প্রতিশোধে নীরবে তাহা হজম করে, সে নিশ্চয়ই অধম ও অক্ষম। যে অধম ও অক্ষম, সে অল্পকালই ঘৃণার পাত্র- কখনই কখনই প্রশংসার পাত্র নহে! তাহাকে দয়া করা সঙ্গত হইতে পারে; কিন্তু হায়! সে দয়াতে কেবল তাহার নিসঙ্গ অধমতা ও অক্ষমতাই মাত্র প্রকাশ পায়!
যে যাহার কাছে দয়া প্রার্থী হয়, সে তাহার কাছে হেয় অধম এবং নীচ হইয়া যায়। সর্বপ্রকারের অক্ষমতাকে দূর করিয়া মনুষ্যত্বের দৃপ্ত বলে সহজে দণ্ডায়মান । হইয়া প্রতিযোগিতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুদ্ধে জয় লাভ করাই হইতেছে মানুষের পরম ধর্ম! ইসলাম এই পরম ধর্ম পালনে এরূপ চরম শিক্ষা এবং চরম শক্তি দান করে, আর কোন ধর্মে তাহা দান করিবার শক্তি নাই। ইউরোপের ইসলাম তত্ত্ববিদ, ইসলামের শত্রু-মিত্র সকল পণ্ডিতই একথা একবাক্যে স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু হায়! আমাদের দেশে ইসলাম হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের বৈরাগ্য এবং ঔদাস্যমূলক বিকৃত সূফী মতের দ্বারা আক্রান্ত হইয়া কর্ম শক্তি, তেজঃ ও দৃঢ়তাহীন হইয়া পড়িয়াছে।
যে ধর্মের মহা পয়গাম্বর অদ্বিতীয় কর্মী পুরুষ-সিংহ স্পষ্ট ভাষায় মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছেন যে, “লা রোহ্ বানিয়াতা ফিল ইসলাম।” অর্থাৎ ইসলাম ধর্মে বৈরাগ্য নাই, আজ সেই ধর্মেই লক্ষ কণ্ঠে কেবল বৈরাগ্যের মহিমাই কীর্তিত হইতেছে! এবং যাহারা তথাকথিত বৈরাগী অর্থাৎ নিজে কোনরূপ পরিশ্রম না করিয়া পরের মাথায় কাঁঠাল ভাঙ্গিয়া খায়, তাহারাই হইতেছে সমাজের আদর্শ পুরুষ। যে জঘন্য গুরুবাদ এবং পৌরহিত্য প্রথাকে সমূলে বিলুপ্ত করিবার জন্য ইসলামের আবির্ভাব হইয়াছিল, আজ সেই জঘন্য গুরুবাদই ইসলামের তেজঃ বীর্য্য বিনষ্ট করিয়া দিতেছে! যে ইসলাম মানুষকে সাক্ষাৎভাবে তাহার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতাআলার দরবারে হাজির করিয়া দেয়, আজ সেই ধর্মে বেদাত প্রথা প্রচলিত হওয়ায় অধিকাংশ লোকের আত্মার জ্যোতি মলিন হইয়া যাইতেছে।
বিশ্বসূর্য জগৎ শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ হযরত মুহাম্মদের (দঃ) আদর্শ জীবনী, আদর্শ শিক্ষা, তদীয় নিয়ম পদ্ধতি ত্যাগ করিয়া বেদাতী পীর, মাঝারী পীর, ছোট পীর বাখা পীর, লেকার পীর, মাদারী পীর ইত্যাকার অসংখ্য পীরের পূজা ও শিক্ষা আধ্যাত্মিক আদর্শ নিতান্ত হীন হইয়া পড়িয়াছে। ফলতঃ চতুর্দিক হইতে বৈরাগ্য, ঔদাস্য, মায়াবাদ, নর পূজা ও পৌত্তলিকতা (গোর পূজা) প্রচারের ফলে ইসলামের সাংসারিক প্রভুত্ব, ধনের ও মানের প্রাধান্য, জগদ্ব্যাপী ইসলাম প্রচারের আবশ্যকতা, চরিত্রের বিশ্বোজ্জ্বল প্রভা এবং সর্বোপরি অন্যায়, অসত্য, কোফর, শেরক্ ও পাপ দলনের প্রচণ্ডতা ও ‘জোয়ামদী’ আমাদের ভিতর হইতে লোপ পাইয়াছে। উচ্চাঙ্গের কর্তব্য বোধের অভাবে মন হইতে উচ্চশ্রেণীর আত্মবিশ্বাসও লোপ পাইয়াছে। প্রভুকে যদি দাস হইতে হয়, সুস্থকে যদি রুগ্ন হইতে হয় তাহা হইলে শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনকে দাসত্ব, চৌর্য এবং পীড়ার আক্রমণে নিশ্চয় মলিন এবং হীন হইতেই হয়। মন হইতে ধীরে ধীরে প্রভুত্ব সাধুতা এবং সুস্থতা লোপ পাইতে বসে।
আমাদের জাতীয় জীবনের অবস্থাও তাহাই হইয়াছে। উন্নত লক্ষ্য এবং উন্নত আদর্শের অভাবে মনের বিশ্বাসও নিতান্ত ক্ষীণ হইয়া পড়িয়াছে।

* সাপ্তাহিক ছোলতান, ২ জৈষ্ঠ্য ১৩৩১। (১৬ মে, ১৯২৪)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *