ইসলামের ইতিহাসের ১০ জন নারী হাদীস বিশারদ: যাঁদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ আলেমগণ

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিত্ব

ইসলামী জ্ঞানের ইতিহাসে নারীর উপস্থিতি কখনোই প্রান্তিক ছিল না। তাঁরা কেবল জ্ঞানের অনুসন্ধানী ছিলেন না; বরং ছিলেন জ্ঞানের সংরক্ষক, ধারক এবং উত্তরসূরি প্রজন্মের শিক্ষক। বিশেষত হাদীসশাস্ত্রে এমন বহু নারী মুহাদ্দিসার সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নির্ভরযোগ্যতার স্বীকৃতি সমকাল অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে। তাঁদের দরসে অংশ নিতে, ইজাযত লাভ করতে এবং উচ্চ ইসনাদ অর্জনের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে সফর করেছেন খ্যাতিমান মুহাদ্দিস, ফকিহ, ইতিহাসবিদ ও অন্যান্য আলেম। রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর সুন্নাহ সংরক্ষণ ও প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়ার এই মহৎ ধারায় তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য।
জীবনীগ্রন্থ ও তাবাকাতসাহিত্যের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ইবন তাইমিয়্যা, আয-যাহাবি, আল-খতিব আল-বাগদাদি, আল-মিয্জী, আল-বারযালীসহ বহু প্রখ্যাত আলেম নারী মুহাদ্দিসাদের কাছেই হাদীস অধ্যয়ন করেছেন।
ইতিহাসের এমনই দশজন বিশিষ্ট মুহাদ্দিসার সংক্ষিপ্ত পরিচয় এখানে তুলে ধরা হলো।
১. কারিমা আল-মারওয়াযিয়্যা : সহীহ আল-বুখারির অন্যতম নির্ভরযোগ্য সংরক্ষক সহীহ আল-বুখারির বর্ণনা ও শিক্ষাদানে তিনি ছিলেন তাঁর যুগের অন্যতম প্রধান সংরক্ষক। একাদশ শতাব্দীতে মক্কায় সহীহ আল-বুখারি অধ্যয়নের জন্য বহু আলেম তাঁর শরণাপন্ন হতেন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ আল-খতিব আল-বাগদাদি তাঁর কাছেই সহীহ আল-বুখারির অধ্যয়ন সমাপ্ত করেন।
২. সিত্ত আল-উযারা আল-তানুখিয়্যা : দামেস্কের মুসনিদা নিজ যুগে তিনি ‘মুসনিদা’ উপাধিতে সুপরিচিত ছিলেন। দামেস্ক ও কায়রোতে দীর্ঘ সময় ধরে সহীহ আল-বুখারির দারস দিয়েছেন। বার্ধক্য তাঁর জ্ঞানচর্চাকে থামাতে পারেনি; জীবনের অন্তিম দিন পর্যন্ত তিনি ইলমের খিদমতে নিয়োজিত ছিলেন।
৩. জয়নব বিনতে আল-কামাল : দামেস্কের সর্বোচ্চ ইসনাদের অধিকারী মুহাদ্দিসা তাঁর ইসনাদ ছিল সমকালীন বহু আলেমের তুলনায় অধিক উচ্চ ও সমাদৃত। এই কারণেই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর নিকট ইজাযত গ্রহণের উদ্দেশ্যে সফর করতেন।
৪. ফাতিমা বিনতে সা’দ আল-খায়র : এক শহর থেকে অন্য শহরে জ্ঞানের অভিযাত্রী ইসফাহান, আলেপ্পো ও বাগদাদসহ বিভিন্ন নগরে তিনি হাদীসের দারস দিয়েছেন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থী গড়ে তুলেছেন। তাঁর বর্ণিত ইসনাদ আজও একাধিক হাদীসগ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে।
৫. জয়নব বিনতে উমর আল-কিন্দি : আয-যাহাবির শিক্ষিকা দামেস্ক ও বালবেকে তিনি সহীহ আল-বুখারি, সহীহ মুসলিম এবং মুআত্তা পাঠদান করতেন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ আয-যাহাবি তাঁর কাছ থেকে সহীহ আল-বুখারির একটি অংশ অধ্যয়ন করেন।
৬. উম্মুদ দারদা আস-সুঘরা : যাঁর ছাত্রদের একজন ছিলেন একজন খলিফা তাবিঈ যুগে দামেস্ক ও জেরুজালেমের মসজিদগুলো ছিল তাঁর পাঠদানের কেন্দ্র। উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানও তাঁর ছাত্রদের অন্যতম ছিলেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, জ্ঞানের মর্যাদা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে।
৭. আয়িশা বিনতে মুহাম্মাদ ইবন আবদুল হাদি : ইসনাদের জীবন্ত সেতুবন্ধন শৈশবেই তিনি এক প্রবীণ মুহাদ্দিসের নিকট হাদীস শ্রবণ করেন। দীর্ঘ জীবন শেষে সেই শায়খের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ হয়েছিল, এমন অল্প কয়েকজনের একজন হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। এই সূত্রেই বহু আলেম তাঁর কাছ থেকে হাদীস গ্রহণে আগ্রহী হন।
৮. জয়নব বিনতে মাক্কি আল-হাররানিয়্যা : ইবনে তাইমিয়্যার শিক্ষিকা ইবনে তাইমিয়্যা, আল-মিয্জী ও আল-বারযালীর মতো প্রখ্যাত আলেম তাঁর দরসে অংশ নিয়েছেন। পরবর্তী যুগের ইসলামী জ্ঞানচর্চায় যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছেন, তাঁদের শিক্ষাজীবনের সঙ্গে তাঁর নাম নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।
৯. ফাতিমা বিনতে আল-হাসান আল-কুশাইরী : মুহাদ্দিসা ও ক্যালিগ্রাফার হাদীসশাস্ত্রে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি ক্যালিগ্রাফিতেও ছিল বিশেষ দক্ষতা। সমকালীন আলেমরা তাঁর বর্ণিত ইসনাদের নির্ভুলতা ও বিশ্বস্ততার প্রশংসা করেছেন।
১০. উম্মুল খায়র আমাতুল খালিক : হিজাজের শেষ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসা পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত তিনি সহীহ আল-বুখারির দারস প্রদান করে গেছেন। তাঁর জীবন যেন হিজাজের সমৃদ্ধ হাদীস-ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের শেষ সাক্ষ্য, যার মাধ্যমে একটি দীর্ঘ জ্ঞানধারা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।

সূত্র
Muhammad Akram Nadwi, Al-Muhaddithat: The Women Scholars in Islam (2007)
Asma Sayeed, Women and the Transmission of Religious Knowledge in Islam (2013)
Josef W. Meri (ed.), Medieval Islamic Civilization: An Encyclopedia (2006)
M. Ahmed, “Women in Hadith,” Shari, Vol. 10, No. 2 (2024)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *