‘ইয়েমেনের সানা’ শহরটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন শহর, যেখানে আড়াই হাজার বছরের বেশি সময় ধরে অব্যাহতভাবে মানুষ বসবাস করে আসছে। এই শহরটি নিজেই এক জীবন্ত শিল্পকর্ম এবং আরবের সবচেয়ে বড় রত্নভান্ডারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
যদিও সানা’ শহর প্রতিষ্ঠার সঠিক তারিখ জানা যায়নি, ইয়েমেনি কল্পকথা অনুযায়ী এটি নূহ (আ.)-এর তিন ছেলের মধ্যে একজন, শেম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রাচীন যুগ থেকে ধূপ ও মসলার বাণিজ্যের জন্য শহরটি বিখ্যাত ছিল। কাদামাটি ও ইটের টাওয়ার-হাউস দ্বারা নির্মিত প্রাচীরবেষ্টিত এই শহর আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে জনবসতি এবং প্রাচীন ইসলাম-পূর্ব যুগেও ঘুমদান দুর্গের (Ghumdan) জন্য বিখ্যাত ছিল, যে দুর্গে রয়েছে একটি বিশ তলা বিশিষ্ট প্রাসাদ; ধারণা করা হয়, এটি বিশ্বের প্রথম ‘স্কাইস্ক্র্যাপার’।
এই শহরের বুকে শত শত বছর ধরে টিকে থাকা একশ ছয়টি ঐতিহাসিক মসজিদ, বারোটি হাম্মাম, এবং একাদশ শতকের আগে নির্মিত ছয় হাজার পাঁচশটিরও বেশি বাড়ি এর সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। পুরোনো দেয়ালগুলোতে খোদাই করা নকশা, গম্বুজগুলোর উদারতা, মিনারগুলোর উচ্চতা, বাগানগুলোর বিশালতা আর অজস্র ফোয়ারার বহমানতা যেন এই শহরের আড়াই হাজার বছরের প্রাণস্পন্দনেরই দলিল।
প্রাচীন এই শহরের প্রাচীরের ভেতর ছয় হাজারটিরও বেশি বাড়ি একে অপরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত এবং সরু রাস্তা ও গলির মাধ্যমে পরস্পর সংযুক্ত, যা খোলা আকাশের নিচে এক উন্মুক্ত জাদুঘরের মতো অনুভূতি দেয়। আশ্চর্যজনকভাবে, সানা’ তার ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন এবং সৌন্দর্য বহু শতাব্দী ধরে সংরক্ষণ করেছে, এবং আধুনিক স্থাপত্য দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত হয়নি; ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য এবং আধুনিক জীবনধারার মধ্যে একটি স্বচ্ছন্দপূর্ণ সমন্বয় বজায় রেখেছে।
সানা’ শহরের সাধারণ বাড়িগুলো নয় তলা পর্যন্ত উঁচু। নিচের অংশগুলো সাধারণত পাথর দিয়ে তৈরি হয়, এবং উপরের অংশগুলো হালকা ইট দিয়ে তৈরি। জানালাগুলো সাদা জিপসামে বেষ্টিত এবং রঙিন কাচ দিয়ে তৈরি, অথবা জিপসামের অলংকৃত নকশার উপর বসানো লাইট-ফ্যান দ্বারা আলোকিত।পুরনো শহরের বাড়ি ও ভবনগুলোর কাঁচের জানালাগুলো রাতে জ্বলজ্বল করে ওঠে।
সানা’র বড় মসজিদ বা আল-জামি আল-কবীর এই শহরের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ, এবং একইসাথে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ। মসজিদটি প্রাথমিক ইসলামী যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা যায়; ধারণা করা হয় ৬৩৩ সালে নবী করিম (স.)-এর নির্দেশে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, সানা প্রাথমিক যুগ থেকে শুরু করে উমাইয়া, আব্বাসীয় এবং উসমানীয়দের সময়েও ইসলামী সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। উমাইয়াদের সময়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তারা শহরের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটায়। রাস্তাঘাট, নগরায়ন, বাজার, খাল খনন—এগুলোও উমাইয়াদের বিশেষ অবদান। শহরের প্রাচীন স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো উমাইয়াদের নির্মিত ইয়েমেন গেট বা বাব আল-ইয়েমেন। ঐতিহাসিকভাবে শহরের মূল সাতটি প্রবেশপথের মধ্যে বর্তমানে একমাত্র এটিই অবশিষ্ট রয়েছে। এই তোরণের মধ্য দিয়ে শহরে প্রবেশ করলে অনুভব করবেন, আপনি যেন সময়ের মধ্য দিয়ে ফিরে গেছেন এক হাজার বছর আগে।
এই শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনাগুলোর মধ্যে আরেকটি হলো দার আল হাজার; মূল শহর থেকে পনের কিলোমিটার দূরে ওয়াদির ধারে অবস্থিত পাহাড়ের উপর নির্মিত একটি সুন্দর রাজপ্রাসাদ। এটি ১৯২০-এর দশকে ইয়াহ্ইয়া মুহাম্মদ হামিদ আদ-দিনের (১৯০৪–১৯৪৮) গ্রীষ্মকালীন বাংলো বাড়ি হিসেবে নির্মিত হলেও, মূলত ১৭৮৬ সালে আল-ইমাম মানসুরের জন্য নির্মিত একটি বিশ্রামাগারের মূল কাঠামো সংস্কার করেই এটি বানানো হয়েছে।
এই শহরের বিশেষত্ব হলো, ভবনগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, যদি ভবনগুলো ধ্বংসও হয়, ধ্বংসাবশেষ পরিবেশ বা মানুষ ও পশুপাখির জন্য ক্ষতির কারণ হয় না। কেননা মূল শহরটি ঊনসত্তরটি অঞ্চলে বিভক্ত এবং প্রতিটি অঞ্চলের কেন্দ্র ও প্রান্তভাগ উদ্যানবেষ্টিত ছিল, যা শহরে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের সরবরাহ নিশ্চিত করে।পুরনো শহরে প্রায় চল্লিশটি বাগান (Mqashama) বিদ্যমান ছিল। এই বাগানগুলো প্রতিটি বাড়ির জন্য পর্যাপ্ত সবজি উৎপাদন নিশ্চিত করত।
সানা’র প্রাচীন অংশে আবাসিক ও সরকারি ভবনগুলো, মসজিদসহ সকল স্থাপনাগুলোতে পানির সরবরাহ এবং ময়লা পানির নিষ্কাশনের জন্য একটি চমৎকার পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল, যা এই পাড়াগুলোর কেন্দ্রস্থলের বাগানগুলোতে সেচের পানির সরবরাহও নিশ্চিত করত।
এক হাজার বছরেরও বেশি আগে, সানা’র প্রাচীন অংশটি পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের একটি মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল। পুরনো সানা’ অনেক পরিকল্পনা ও নকশার দিক থেকে পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যগুলো বজায় রেখেছে, যা আধুনিক স্থাপত্যে প্রয়োগ করা যেতে পারে। আধুনিক গ্রীন সিটির ধারণার সূতিকাগার বলা যায় সানাকে। UN-Habitat (২০২০) অনুসারে, এ শহরের ছয় হাজার পাঁচশটি ভবন স্থানীয় পরিবেশবান্ধব উপকরণ যেমন পাথর, কাদা, পাকা ইট, কাঠ এবং জিপসাম ব্যবহার করে নির্মিত।
১৯৭২ সালে, ইতালীয় লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা পিয়ের পাওলো পাসোলিনি বলেছেন: “স্থাপত্যগত দিক থেকে ইয়েমেন বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর দেশ, এবং সানা’ হলো আরবের ভেনিস।”১৯৮৮ সালে সানা’কে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৯৫ সালে আগা খান আর্কিটেকচার পুরস্কার প্রদান করা হয়।
সময়ের ঝড়, যুদ্ধের ক্ষত আর ইতিহাসের উত্থান-পতন পেরিয়েও সানা’ আজও দাঁড়িয়ে আছে নিজের স্বকীয়তায়—এক জীবন্ত ইতিহাস হয়ে। এর প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি জানালা, প্রতিটি গলি যেন অতীতের গল্প বলে যায় নিঃশব্দে।
হয়তো এটাই এক শহরের সত্যিকারের সৌন্দর্য—তার স্থাপনায় নয়, তার টিকে থাকার ক্ষমতায়; তার ইট-পাথরে নয়, তার স্মৃতিতে। আর সেই অর্থে, সানা’ শুধু একটি শহর নয়—এটি মানবসভ্যতার এক উত্তরাধিকার, যা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আজও আমাদের মুগ্ধ করে রাখে।
