রোমের ঐশ্বর্য, ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান কিংবা পারসেপোলিসের ঝলমলে প্রাসাদগুলোরও বহু আগে থেকেই পৃথিবীতে ছিলো এক সমৃদ্ধ নগরী; ‘বালখ’—যাকে বলা হয় পৌরাণিক বিশ্বের উজ্জ্বল রত্ন। গ্রিকদের কাছে এটি পরিচিত ছিল ‘বাক্ট্রা’ নামে—ঐশ্বর্য ও জ্ঞানের নগরী হিসেবে; পারসিকদের কাছে ‘জারিয়াস্পা’, অর্থাৎ “সোনালী ঘোড়ার নগরী।” আরব ঐতিহাসিকরা যখন প্রথম এই শহরে পদার্পণ করেন, তারা এর ঐশ্বর্য, ঐতিহ্য ও প্রাচীনত্বে মুগ্ধ হয়ে এর নাম দেন উম্ম আল-বিলাদ, “সকল নগরীর জননী।”

আমার দাদার বংশের একটি শাখা কয়েক প্রজন্ম ধরে এই শহরে বসবাস করে আসছেন। ফলে এখনো আমাদের কিছু আত্মীয়-স্বজন সেখানে আছেন। সেই সুবাদে কয়েক বছর আগে আমি একবার বালখে গিয়েছিলাম। এক শান্ত বিকেলে আমি যখন বালখে পৌঁছাই, সেখানে পুরনো একটি বাড়ির ছোট্ট উঠানে প্রথম পা রাখি। অতিথি আপ্যায়নের জন্য বাড়ির আঙিনায় চা ও শুকনো ফলের ট্রেসহ একটি দস্তরখান (ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশনের আয়োজন) সাজানো ছিলো। ভেতরে ঢুকতেই উষ্ণ বাতাসে ভেসে আসা এলাচ ও গোলাপজলের গন্ধ স্পষ্টভাবে টের পাওয়া যাচ্ছিল। আমি একটি কুশনের উপর বসতেই কেউ আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন এক বৃদ্ধার সাথে, যিনি একটু দূরে দেয়ালের পাশে বসে ছিলেন।
গুল বিবি সোজা হয়ে বসেছিলেন, তার আলগা হয়ে যাওয়া ওড়না ভেদ করে বের হয়ে আসা শুভ্র কেশ যেন তার বয়সের জানান দিচ্ছিলো। তিনি অন্ধ ছিলেন, তার দৃষ্টি শূন্য; তবুও আমি নীরবে তাকে সালাম জানালে, তিনি মাথা ঘুরিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, যেন আমার কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে আমি কে তা বোঝার চেষ্টা করছেন।
আমি কে, বা কেন এসেছি—তা বলার জন্য উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পাওয়ার আগেই, তিনি আবার কথা বললেন। তার কণ্ঠস্বর ছিল ক্ষয়িষ্ণু, কিন্তু স্থির। “তুমি এখানে নতুন,” তিনি আস্তে বললেন, প্রায় হাসতে হাসতে। “আমি আগে তোমার কণ্ঠ শুনিনি। কাছে এসো।” আমি তার কথা মতো কুশনের উপর থেকে সরে গিয়ে এমনভাবে বসলাম যাতে তিনি আমার নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পারেন। আমি তাকে বললাম, “আমি লন্ডন থেকে এসেছি, এবং এটি আমার প্রথম বালখ সফর।” তিনি শহরের নাম উচ্চারণ করলেন গভীর শ্রদ্ধার সাথে—“তুমি যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছো, তা তোমার শোনা গল্পগুলোর চেয়েও প্রাচীন।” এরপর তিনি আমাকে বালখের গল্প বলতে শুরু করেন এবং আমি বিনয় ও মনোযোগের সাথে তা শুনতে থাকি। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, তিনি শহরের কাহিনি, মহাকাব্য এবং বিস্মৃত ইতিহাস কাউকে শোনাতে উদগ্রীব হয়ে ছিলেন। যেন নিজের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন অজস্র গল্পে ঠাঁসা এক গোপন বাক্স। যেন জীর্ণ শরীরে ইতিহাসের অগণতি অধ্যায়ের সুগন্ধি গায়ে মেখে দীর্ঘদিন অপেক্ষায় ছিলেন তা হস্তান্তরের জন্য। আমার কাছে তাকে বলার মতো কোনো গল্প ছিল না। আমি আর একটি শব্দও উচ্চারণ না করে কেবল শুনতে থাকি। শান্ত নদীর ঢেউয়ের মতো তার গল্প এগিয়ে যেতে থাকে। আর আমি যেন ডুব দিতে থাকি প্রাচীন এই শহরের দীর্ঘ ইতিহাসের গভীর থেকে গভীরে।
পারসিক কিংবদন্তি অনুযায়ী, ইরানীয় জনগণ আমু দরিয়ার উত্তরাঞ্চলে প্রথম যে অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে—সেটিই পরবর্তীতে বলখ শহর নামে পরিচিত হয়। সে হিসেবে এই শহরটি গড়ে উঠেছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ অব্দে। বলা হয়, এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কেইমারস—বিশ্বের প্রথম রাজা, যার কথা ফেরদৌসী তার শাহনামায় বর্ণনা করেছেন। জরথুস্ত্রীয় শাস্ত্র আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলখকে আহুরা মাজদার ‘ষোলোটি পরিপূর্ণ ভূমি’র একটি হিসেবে ঘোষণা করে, যেখানে প্রথম পবিত্র আগুন প্রজ্বলিত হয়েছিল।

“বালখ আজ যেমন দেখায়, তারও আগে,” তিনি বললেন, “পণ্ডিত জরথুস্ত্র এখানে জন্মেছিলেন এবং এখানেই বেড়ে উঠেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি আহুরা মাজদার বাণী সর্বপ্রথম এই শহরের আকাশের নিচেই প্রচার করেছিলেন। কিংবদন্তি আছে, তিনি এখানে শক্তিশালী রাজা ভিস্তাস্পকে ধর্মান্তরিত করেন, এমন এক সময়ে যখন অদৃশ্য দানবরা সেখানে বিচরণ করত। রাজা ভিস্তাস্প অত্যন্ত ধৈর্যের সহিত জরথুস্ত্রের কথা শোনেন এবং এক পর্যায়ে তার প্রচারিত বাণীকেই সত্য ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, জরথুস্ত্রকেও রাজকীয় সুরক্ষা প্রদান করেন।”

শতাব্দী পেরোতে পেরোতে, বালখ এমন এক নগরীতে পরিণত হয় যেখানে চিন্তাগুলো পণ্যের মতোই অবাধে প্রবাহিত হতো। কালে এটি হয়ে ওঠে সংস্কৃতি ও দর্শনের মিলনস্থল, যেখানে জরথুস্ত্রীয় পুরোহিতরা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে দার্শনিক বিতর্ক করতেন, এবং পরে ইসলামী আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ এটিকে এক প্রশান্তির নগরীতে পরিণত করে। উমাইয়া এবং আব্বাসীয়দের সময়েও এটি হয়ে উঠে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ।


বালখ থেকে উঠে আসা মহান মনীষীদের মধ্যে একজন ছিলেন ইবনে সিনা—ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক ও দার্শনিক, যার জ্ঞান, চিন্তা ও দর্শন হাজার হাজার বছর ধরে আন্দালুসিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত সর্বত্র সব যুগের স্কলারদের প্রভাবিত করেছে।
তিনি যখন বালখের গল্প বলতে থাকলেন, বৃদ্ধার কণ্ঠে এমন চাঞ্চল্য ফিরে এলো—যেন তিনি কোনো অচেনা সাহিত্যিক চরিত্র নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রিয় বন্ধুর কথা স্মরণ করছেন। “তুমি ফেরদৌসীকে চেনো?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন। আমি মাথা নাড়তেই তার কণ্ঠে উত্তেজনা ধরা পড়ল। “ফেরদৌসী শাহনামা রচনা করার আগে, বালখের আরেক সন্তান দাকিকী বালখী এর সূচনা করেছিলেন। সামানিদ শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়, দাকিকী সেই প্রথম ১০০০ পংক্তি রচনা শুরু করেন, যা পরে আমাদের শ্রেষ্ঠ পারসিক মহাকাব্যের ভিত্তি হয়ে ওঠে। দুঃখজনকভাবে, তার মৃত্যুতে কাজটি অসমাপ্ত রয়ে যায়। কিন্তু ফেরদৌসী তাকে সম্মান জানিয়ে, সেই পঙ্কতিগুলোর উপর ভিত্তি করে কাজ চালিয়ে যান এবং নিশ্চিত করেন যে বলখের নাম সর্বদা পারসিক সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনার সাথে যুক্ত থাকবে।”

আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখি, বৃদ্ধার গল্প অন্যরাও শুনছে—মুগ্ধ হয়ে।
“শাহনামায় বালখ চিত্রিত হয়েছে বৃহত্তর পারস্যের পৌরাণিক ভূগোলের অন্যতম রাজকীয় ও অভিজাত দরবার হিসেবে।”
শাহনামা থেকে বালখে প্রোথিত বহু কিংবদন্তির একটি ছিল গোষতাস্প এবং কাতায়ুনের প্রেমকাহিনি। গোশতাস্প, পারসিক দরবার থেকে নির্বাসিত এক যুবরাজ, যিনি বালখে আশ্রয় পান। শহরের স্বর্গীয় উদ্যান, মহিমান্বিত মন্দির এবং পবিত্র অগ্নি তাকে বিস্মিত করে তোলে। ভাগ্য তাকে নিয়ে আসে কাতায়ুনের কাছে। কাতায়ুন ছিলেন একজন রোমান কাইজারের কন্যা, যিনি পারস্য ও রোমের জোট শক্তিশালী করতে বালখে এসেছিলেন। তিনি জ্ঞান ও সৌন্দর্যের জন্য খ্যাত ছিলেন, এমনকি তার সৌন্দর্যকে চাঁদের সাথে তুলনা করা হতো। যখন গোশতাস্প প্রথম তাকে একটি রাজকীয় সমাবেশে দেখেন, তাদের সেই প্রথম সাক্ষাৎ ছিল তাৎক্ষণিক ও অনস্বীকার্য। কিন্তু তাদের মিলন সহজ ছিল না। কাতায়ুনের পিতা এই সম্পর্কের বিরোধিতা করেন, গোশতাস্পকে নির্বাসিত রাজপুত্র হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন। নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে গোশতাস্প প্রতিজ্ঞা করেন তুরানীয় বাহিনীর আগ্রাসন থেকে বালখকে রক্ষা করবেন। কাতায়ুনের প্রতি তার ভালোবাসা এবং শহরের সৌন্দর্যে অনুপ্রাণিত হয়ে, তিনি যুদ্ধে বলখের রক্ষকদের নেতৃত্ব দেন। জরথুস্ত্রীয় পুরোহিতদের দিকনির্দেশনা এবং জনগণের দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে, গোশতাস্প যুদ্ধে বিজয়ী হন, শহরের শান্তি নিশ্চিত করেন। তাদের প্রেম উদযাপিত হয় মহোৎসবের মাধ্যমে, এবং তারা একসাথে বলখকে জরথুস্ত্রীয় ধর্মের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে জরথুস্ত্রীয় বিশ্বাস মোতাবেক পবিত্র অগ্নি চিরন্তন উজ্জ্বলভাবে জ্বলতে থাকে।
“আর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কথাও ভুলে যেও না,” তিনি বললেন।
আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট—যাকে কেউ নায়ক হিসেবে স্মরণ করে, আবার কেউ প্রতারক দখলদার হিসেবে। এখানকার লোকেরাও স্মরণ করে, যদিও তা শুধু রাস্তার মোড়ে চায়ের কাপ হাতে বসে থাকা বৃদ্ধদের মৃদু ফিসফাসে। যে শহরটিকে তিনি সমীহ করেছিলেন বা দখল করেছিলেন (কোনটি সত্য, কে জানে?), সেই শহর শতাব্দীর সংগ্রামকে সহ্য করে টিকে গেছে, অথচ তিনি নিজে ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেছেন। আর তাই, বালখের গল্পে তুমি হয়তো দেখতে পাবে এক গ্রিক রাজাকে, যিনি ধূলিধূসর নথিপত্রের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে তার সেনাবাহিনীর চেয়েও প্রাচীন জ্ঞানে বিস্মিত হচ্ছেন।
খ্রিস্টপূর্ব ৩২৯ সালের মধ্যে, বালখ—তখন যার নাম ছিল বাক্ট্রা—পারসিক আকামেনিড সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গে পরিণত হয়। আকামেনিডদের শেষ কাইজার ৩য় দারিউসকে পরাজিত করে তাকে পূর্বদিকে তাড়া করার পর, আলেকজান্ডার বাক্ট্রিয়ার দিকে অগ্রসর হন এবং খুব সংক্ষিপ্ত প্রতিরোধের মাধ্যমেই বালখ দখল করেন। বালখে অবস্থানকালে, আলেকজান্ডার পরিচিত হন রোক্সানার সাথে। রোক্সানা ছিলেন স্থানীয় এক অভিজাত ব্যক্তি অক্সিয়ার্তেসের কন্যা। পুরাণে তার সম্পর্কে বলা হয়, তার চুল যেন সোনার সুতো দিয়ে বোনা, আর তার উপস্থিতি যেন দেবী আফ্রোদিতির মতোই উজ্জ্বল। তার সৌন্দর্য ও কোমলতায় মুগ্ধ হয়ে আলেকজান্ডার প্রায় সাথে সাথেই তাকে বিয়ে করেন।
তবে বালখের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউই এই শহরকে এতটা গভীরভাবে ধারণ করেন না যতটা করেন মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি। বিশ্ববিখ্যাত সুফি মাওলানা রুমি ১২০৭ সালে বলখে জন্মগ্রহণ করেন। রুমির শৈশব গড়ে উঠেছিল এই শহরের আধ্যাত্মিকতা ও জ্ঞানের সংস্কৃতির মধ্যে। বলা হয়, ছোটবেলায় রুমি প্রায়ই তার পিতার সঙ্গে শহরের বাগান ও উদ্যানগুলোতে যেতেন—তার পিতা, যিনি “সুলতান আল-উলামা” বা “আলেমদের সুলতান” হিসেবে পরিচিত ছিলেন, সেখানে আলেম, সুফি সাধক ও কবিদের সঙ্গে সমাবেশ করতেন।
বহু বছর পরে, যখন তাদের পরিবার মঙ্গোল আক্রমণ থেকে বাঁচতে বালখ ছেড়ে পালিয়ে যায়, তখন রুমি বালখকে তার আধ্যাত্মিক জাগরণের সূচনা হিসেবে স্মরণ করতেন। রুমির কবিতায় “স্বদেশ”কে কোনো ভৌগোলিক স্থান হিসেবে নয়, বরং সেই আদি আধ্যাত্মিক উৎস হিসেবে তুলে ধরা হয়, যেখান থেকে সকল সত্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে—
“যেদিন থেকে আমাকে বাঁশবনের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে,
আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ নারী-পুরুষ সকলকেই কাঁদিয়েছে।
তাই আমি খুঁজে ফিরি এমন এক হৃদয়, যা আকাঙ্ক্ষায় বিদীর্ণ,
যাতে এই বিচ্ছেদের বেদনা ভাগ করে নিতে পারি।”

“তুমি কি Rabia Balkhi-এর কথা শুনেছ?” বৃদ্ধা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।
“আহা মেয়ে, শোনো। সে বহু আগের কথা। প্রাচীন বালখ নগরীতে জন্ম নেওয়া এক সম্ভ্রান্ত আমিরের মেয়ে রাবিয়া। সেটি ছিল এমন এক সময়, যখন কোনো নারী কবিতা লিখবে, তা কেউ কল্পনাও করত না। তবুও রাবিয়া নিজেকে বাড়ির দেউড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে অস্বীকার করেছিলেন। কবিতা ও সাহিত্য শুধু পুরুষদের জন্য- প্রচলিত এই ধারণাকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। আর যখন তিনি বাক্তাশ নামের এক তুর্কি দাসের প্রেমে পড়লেন—যে তার ভাইয়ের অধীনে কাজ করত—তখন সেই কেলেঙ্কারি এক রাজকন্যার জন্য সহ্য করার মতো ছিল না। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে, তার ভাই বাক্তাশকে একটি কূপে নিক্ষেপ করে এবং রাবিয়াকে একটি হাম্মামে বন্দি করে রাখে। আহত ও একা রাবিয়া নিজের রক্ত দিয়ে দেয়ালের উপর তার শেষ কবিতাগুলো লিখে যান। এভাবে তিনি হাম্মামের দেয়ালে এমন এক উত্তরাধিকার রেখে যান, যা মানুষের প্রচলিত সেই ধ্যান-ধারণাকে ভেঙে দেয় এবং বালখের ঘরে ঘরে তাকে পরিচিত নাম করে তোলে।
অনেকে মনে করে তিনি একজন পুরুষের জন্য মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি তার সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়। প্রমাণ করেছিলেন পৃথিবী যতই দমিয়ে রাখার চেষ্টা করুক না কেন একজন নারীর কণ্ঠ—তবুও প্রতিধ্বনিত হতে পারে এবং সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।”
১৩শ শতাব্দীতে এসে, বলখের স্বর্ণযুগ নির্মমভাবে সমাপ্ত হয়।
“১২২০ সালে, চেঙ্গিস খানের সেনাবাহিনী শহরের উপর উদ্যাম লালসা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, এর মসজিদ, মন্দির, গ্রন্থাগার ও বাজার ধ্বংস করে দেয়। জরথুস্ত্রীয় ধর্মের পবিত্র অগ্নিশিখা নিভে যায়, সকল আলেমদের হত্যা করা হয়, এবং এর শতাব্দী প্রাচীন রাস্তাগুলো ছাইয়ে পরিণত হয়। বহুদিন ধরে শহরটি ধুঁকতে থাকে, আর তার জাঁকজমক মঙ্গোলদের নিষ্ঠুরতা ও সহিংসতার কাছে হারিয়ে যায়।”
এ পর্যায়ে এসে গুল বিবির দৃষ্টিহীন চোখের কোণে অশ্রুবিন্দু ঝলমল করছিল, যদিও তার কণ্ঠে কোনো দুর্বলতা ছিল না।
“পরবর্তীতে মার্কো পোলোর মতো পর্যটকরা ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে শহরের ভাঙা দেয়াল, বিচ্ছিন্ন পাথর আর উপড়ে যাওয়া স্তম্ভগুলোর দিকে তাকিয়ে বালখের অতীত গৌরবের কথা বর্ণনা করেছেন—একেই তারা বর্ণনা করেছেন “একটি মহান নগরী এবং জ্ঞানের এক বিশাল কেন্দ্র” হিসেবে।
বালখের স্মৃতি বেঁচে ছিল রুমির কবিতায়, ইবনে সিনার জ্ঞানে, এবং শাহনামার পংক্তিতে—এছাড়াও অগণিত সুফি-দরবেশ, আলেম, স্কলার, দার্শনিক ও কবিদের মাধ্যমে, যারা বলখ থেকেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছেন; পৃথিবীকে গড়ে তুলেছেন। যদিও সময়ের সাথে সাথে আমরা ভুলে গেছি সেই ইতিহাস। ভুলে গেছি যে, এই উত্তরাধিকারগুলোর শিকড় এই প্রাচীন নগরীর রাস্তাগুলোতেই প্রোথিত।”

তিনি আমার দিকে মুখ ফেরালেন—দেখতে না পারলেও, আমার উপস্থিতি সম্পূর্ণভাবে অনুভব করছিলেন। “এখন কি বুঝতে পারছো, মা? বালখ শুধু একটা শহর নয়, কিংবা আজ তুমি যা দেখছো তা-ই নয়। এটি একটি চিন্তা—মানব হৃদয়ে সংরক্ষিত এক মূল্যবান স্মৃতি, পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া এক মহান উত্তরাধিকার। মহান নগরীগুলো কেবল তাদের স্থাপনা বা ঐশ্বর্য দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয় না, বরং এর সাথে জুড়ে থাকে সেই চিন্তাগুলো, যেগুলো তারা লালন করে; সেই বিশ্বাস, যা তারা জাগিয়ে তোলে; এবং সেই গল্পগুলো, যা তারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেয়। শহরের দেয়াল ভেঙে পড়ার পর, সাম্রাজ্য ধ্বসে পড়ার পর, প্রতিরক্ষা বাহিনী চলে যাওয়ার পর এমনকি শতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এগুলো অবশিষ্ট থাকে।”
পুরোনো সেই বাড়ির উঠানজুড়ে এক অখণ্ড নীরবতা নেমে এলো—যেন সবাই নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে, সেই মায়াবী পরিবেশ ভাঙতে চায় না। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম, আমার চা ঠান্ডা হয়ে গেছে, এবং এখন বিদায় নেওয়ার সময়।
দীর্ঘ নীরবতার পরে, তিনি হাত বাড়ালেন, আর আমি আস্তে করে আমার হাত তার হাতের উপর রাখলাম। তার স্পর্শ ছিল শীতল, তার মুষ্টি ছিল দুর্বল, কিন্তু আমি অনুভব করলাম তার বলা সমস্ত কথার ভার। সেই নীরবতার ভাষা বিনিময়ের মধ্যে আমি বুঝতে পারলাম—এখন আমি নিজের স্মৃতিতে অমূল্য কিছু বহন করছি, বহন করছি বলখের রূহের একটি অংশ—যা আমি ধরে রাখব, মনে রাখব—এবং একদিন, অন্যদের কাছে পৌঁছে দেব।
অনুবাদ: নাজিয়া তাসনিম
