বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণের পূর্বশর্ত কথাটা শুনতে এবং শিরোনাম হিসেবে দেখতে যতটা তাত্ত্বিক কিংবা গুরুগম্ভীর বলে বোধ হয়; আসলে বিষয়টা ততটা ভারিক্কি নয়, অন্তর্নিহিতও নয়। মূলত এটা আমাদের সাম্প্রতিক জীবন প্রবাহের মধ্যেই খুব সহজ ও সাধারণ সত্য হিসেবে মিশে আছে, আমরা চাইলেই এগুলোকে আলাদাভাবে তুলে ধরতে পারি।
উপনিবেশ পরবর্তী সময়ে জ্ঞান ও চিন্তার আন্দোলনের অসংখ্য ধারা তৈরি হয়েছে, এখনো বেশকিছু বিদ্যমান আছে। কিন্তু তাতে জ্ঞানের দৈন্যতা কি দূর হয়েছে? নাকি সত্যিকার জ্ঞাননির্ভর একটি জাতি গড়ে উঠেছে? এমনকি জ্ঞানভিত্তিক জাতির উচ্চাশাকে ভবিষ্যতের জন্য একপাশে রেখে যদি আমরা কেবল এমন কোনো জ্ঞান ও চিন্তার আন্দোলন কে খুঁজি যারা জাতির সংকট ও যাবতীয় প্রয়োজনে নির্মোহভাবে অভিভাবকের ভূমিকা পালনের নিমিত্তে নিয়োজিত— তবে খুঁজে পাবো কি?
ঔপনিবেশিক কাল এবং উপনিবেশ পরবর্তী সময়ে বাংলা অঞ্চলসহ সমগ্র ভারতবর্ষে যতগুলো জ্ঞানের আন্দোলন কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন হয়েছে, তার প্রায় সবগুলো ধারাই ছিল উপনিবেশের প্রকল্প। এই জ্ঞানের প্রকল্প কোন না কোনভাবে উপনিবেশকে বৈধতা দেয়। উপরন্তু বৈধতাতেই থেমে থাকে না, কয়েক ধাপ এগিয়ে স্তুতির পর্যায়েও নিয়ে যায়। আমরা যে জ্ঞানের প্রক্রিয়াতে জ্ঞানী হচ্ছি, আমাদের বুদ্ধির ধারকে শানিত করছি- এটা মোটেও ঔপনিবেশিক প্রকল্পের বাইরের কিছু না, এটা উপনিবেশের প্রত্যাশারই অন্তর্ভুক্ত। এটা খুব স্পষ্ট বিষয়, এর জন্য জটিল-কঠিন-বিরাট গবেষণা কিংবা সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না; কেবল অকপট দৃষ্টি বুলালেই চলে। উপনিবেশবাদীদের সব কর্মকাণ্ডকে আমরা ঘৃণা করি, শোষণ হিসেবে অভিহিত করি। কিন্তু শিক্ষার বিষয়ে আমরা নীরব হয়ে যাই। কারণ, তাদের প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা, জ্ঞানের ধারাকে আমরা সভ্য হওয়ার চাবিকাঠি বলে বিশ্বাস করি। অন্তত আমরা এভাবেই প্রস্তুত হই। রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষ, যিনি ব্রিটিশদের যাবতীয় নিষ্ঠুরতায় হতাশ হয়েছেন, তাঁর সাহিত্যে আমরা সেই হতাশার দীর্ঘশ্বাসও কোথাও কোথাও শুনতে পাই। ব্রিটিশরা আমাদের রক্ত শুষে নিঃশেষ করে দিচ্ছে, এটা রবীন্দ্রনাথের হতাশার জায়গা কিন্তু আরো একটা জায়গা আছে, যেখানে তাঁর হতাশা একেবারে ঘনীভূত হয়ে উঠেছে, গাঢ় হয়ে উঠেছে। সেটা হলো: ব্রিটিশদের জ্ঞান-দর্শন সভ্যতার প্রাণ-প্রাচুর্যে টইটম্বুর, কিন্তু তাদের নিষ্ঠুরতার কারণে এই ঐশ্বর্য চাপা পড়ছে। হায়! যদি তারা এহেন বদমাশি না করতো তাহলে অনাথা ভারত কৃতজ্ঞতাবনত মস্তকে কতই না ঐশ্বর্য গ্রহণ করতে পারতো।
অর্থাৎ বিষয় দাঁড়াচ্ছে এমন: ব্রিটিশদের, ইউরোপীয়দের কিংবা আজকের দুনিয়ার তথাকথিত মাতব্বরদের সবই খারাপ, ব্যতিক্রম কেবল তাদের শিক্ষাব্যবস্থা। তারা চিকিৎসা ক্ষেত্রে, বিজ্ঞানে রীতিমতো বিপ্লব সাধন করেছে। হেন কিছু নেই যা তারা ব্যাখ্যা করতে জানে না। তারা চাঁদে মানুষ পাঠাচ্ছে, মঙ্গলে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে, সাগর সেচে মুক্ত আনছে— এক কথায় নজরুল তাঁর সংকল্প কবিতাতে যেমন বলেছিলেন, বিশ্ব-জগৎ দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে ।তেমনই যেন এই জ্ঞান আমাদের অলীক কল্পনাকে বাস্তব করে দিয়েছে। অতএব, এই জ্ঞানকে আমরা গ্রহণ করবো না কেন?
রবীন্দ্রনাথের আফসোস, তাঁর হতাশার কালো মেঘ কিন্তু কেটে গেছে। বাংলার মানুষ অত্যাচারিত, নিপীড়িত হয়েও, অজস্র লাথি-ঝাঁটা খেয়েও তাদের জ্ঞানকেই মুক্তি এবং উন্নয়নের দুয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। কালে কালে বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে সভ্যতা গ্রহণের ধারা জারি রয়ে গেছে।
উনিশ ও বিশ শতকের নবজাগরণ কে এ ধারার সূচনাবিন্দু হিসেবে বলা যেতে পারে। তবে, নবজাগরণের সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও এটাকে ঢালাওভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে আলাপের সুযোগ খুব একটা মেলে না। বরং, নবজাগরণ প্রসঙ্গে দুটা দিক অপরিহার্যভাবে সামনে আসে;
প্রথম বিষয় হলো: নবজাগরণ বাঙালিদের ক্ষেত্রে হলেও জেগে ওঠাটা পাশ্চাত্যের ভাবধারায়। পশ্চিমাদের চোখের ভালো-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর, সভ্য-অসভ্য প্রভৃতি ধারনাকে বাঙালির চোখে দেখতে পাওয়ার ঘটনাটাকেই বলা হচ্ছে নবজাগরণ।
দ্বিতীয় বিষয় হলো: এটা পুরোদস্তুর সাম্প্রদায়িক বিষয় হিসেবেই পরিণতি লাভ করেছে। বাংলার নবজাগরণের হাওয়া সমগ্র বাংলা দিয়ে বয়ে যায়নি, গিয়েছে বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর দিয়ে। সতীদাহ বিলোপ, বিধবা বিবাহ প্রভৃতি ধর্মীয়-সামাজিক সংস্কারের সাথে সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাতিও প্রজ্বলিত হয়, যার আলোয় নতুন এক শ্রেণির উত্থান ঘটে, তারা হলেন: হিন্দু-মধ্যবিত্ত-শিক্ষিত শ্রেণি। এই শিক্ষিত শ্রেণির অর্জিত জ্ঞান গরিমা ঠিক কেমন ছিল তা ঐ সময়ে রচিত কিছু সাহিত্য কর্মে উঁকি দিলেই ভালোমতো বোঝা যায়।
মোটাদাগে নিজের বলতে যা, তা পরিত্যাগ করে পাশ্চাত্যের রঙ মেখে সং সাজা, কথায় কথায় দু-চারটা ইংরেজি, অবাধে মদ্যপান ইত্যাদি ইত্যাদি। এই শ্রেণি হয়তো হিন্দু সমাজে গেঁড়ে বসা কুসংস্কার থেকে সমাজকে মুক্ত করার একটা প্রত্যাশা রাখতেন, কিন্তু কুসংস্কার মুক্তির বাতিক কুসংস্কারকে যতটা না ছিন্ন করেছে তার চেয়ে বেশি ছিন্নভিন্ন করেছে এই অঞ্চলের শ্বাশ্বত নীতি-নৈতিকতার বোধকে, যে নীতি নৈতিকতার সাথে কুসংস্কারের কোন আত্মীয়তা ছিল না, বরং সুস্থ সমাজের সম্পর্ক ছিল। তাদের ধারণ করা শিক্ষা কুসংস্কার এবং নৈতিকতার মধ্যে সঠিক সীমারেখা তৈরী করতে পারেনি। কিংবা বিদ্যমান নীতির পরিবর্তে উত্তম কিছুও হাজির করতে পারেনি। ফলে, শিক্ষিত শ্রেণির অবক্ষয়, লাম্পট্য একেবারে আলগাভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। এতে পশ্চিমা প্রেমী মধুসূদনও বেজায় আহত হয়েছেন, কাতর দীর্ঘশ্বাসে প্রশ্ন ছুঁড়েছেন— একেই কি বলে সভ্যতা?দত্ত কবির এই প্রহসনই ঐ শিক্ষার সারমর্ম। তবু অনেকেই এ শিক্ষার বিষয়ে নিরাশ হতে চাননি; তাদের যুক্তি : প্রথম প্রজন্মের এই উন্মাদনা অস্বাভাবিক নয়। জ্ঞান গা সওয়া হতে এবং ভারত্ব আনতে কয়েক প্রজন্মের প্রয়োজন তো পড়েই।
তাদের কথা অযৌক্তিক নয়। কয়েক প্রজন্মের ব্যাবধানে জ্ঞান সত্যিই গা সওয়া হয়েছে, জ্ঞানের সমস্ত ভার উদর গ্রহণ করে স্থুল হয়েছে। জ্ঞান অর্থোপার্জনের সবচেয়ে বড় সহায়ে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষা সমান সমান অর্থ, অর্থ সমান সমান প্রতিপত্তি। আসল বিষয়টা হলো: এই শিক্ষা টাকাওয়ালা এবং ক্ষমতাবান শ্রেণি তৈরি করেছে কিন্তু টাকা এবং ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেছে। এ জ্ঞান মস্তিষ্ক এবং হৃদয়ের মধ্যে বন্ধনও তৈরি করতে পারেনি, কিন্তু অর্থ এবং শক্তির প্রয়োজনে একেবারে পাকা হাতে দুটাকেই সম্ভাব্য মাত্রায় ব্যবহারে সক্ষম হয়েছে।
ব্রিটিশরা কপট যুদ্ধে নবাবকে পরাজিত করে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই মুসলমানদের মধ্যে ক্ষমতা এবং জ্ঞান প্রসঙ্গে বৈরাগ্য দেখা যায়। ক্ষমতা যেহেতু কাফেরদের হাতে, তাই ক্ষমতা বিষয়টাই পরিত্যাজ্য; শিক্ষাব্যবস্থাও যেহেতু তাদেরই, ফলে সেটিও মন্দ। বিশেষত নবজাগরণের ফসল সমাজে ফলার পর থেকে শিক্ষা বিষয়ে মুসলমানদের অনীহা আরো বেড়ে গেলো। অনীহা এতদূর গড়ালো যে, জ্ঞানকেই দুই ভাগ করে ফেললো, এক ভাগ পড়লো দুনিয়াতে আরেক ভাগ পরকালে। ব্রিটিশদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে, শরীর-পৃথিবী-ইহকাল; অর্থাৎ বস্তুই সর্বেসর্বা। অতএব, এটা নিখাঁদ দুনিয়াবি জ্ঞান, পরকাল ধ্বংসকারী জ্ঞান।
কারণ, মুসলমান নর-নারীর উপর আল্লাহ যে জ্ঞান ফরজ করেছেন, এখানে তার অস্তিত্বটুকুও নেই। সুতরাং, মুসলমানদের প্রয়োজন পরকালে মুক্তির ওসিলা হয় এমন জ্ঞান, অর্থাৎ দ্বীনী জ্ঞান। কাফের শাসক অধ্যুষিত ভূমিতে ফরজ জ্ঞান আহরণের যেহেতু বন্দোবস্ত ছিল না, তাই দারুল উলুম দেওবন্দের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। সন্দেহ নেই, এটা মুসলমানদের ক্রান্তিলগ্নে ঐ সময়ের প্রেক্ষাপটে একটা সেরা সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু এটা প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটই ছিল ব্রিটিশ একাডেমিয়া। খোলাখুলিভাবে বললে, এ ধারা এবং এটার দ্বারা অনুপ্রাণিত প্রায় সব ধারাই ছিল পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ। স্বাভাবিকভাবেই এ ধারাগুলোকে ক্রিয়ার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। নিজস্ব ও শ্বাশ্বত গতি এখানে থাকে না।
ঔপনিবেশিক এবং উপনিবেশ পরবর্তী সময় জুড়ে বাংলা অঞ্চলে জ্ঞানের প্রধান প্রধান যে ধারাসমূহ গড়ে উঠেছে, সেগুলো বিশেষ কিছু কারণে ব্যর্থ এবং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। নবজাগরণীয় ধারা— যেটা মূলত মাকাল ফল সদৃশ, এর বহিরাংশ চোখ ও মন জুড়ায় বটে, কিন্তু ভেতরের দিকটা দীর্ঘমেয়াদে একটা সভ্যতার গুরুতর সর্বনাশ ডেকে আনে। কারণ এটা এমন জ্ঞান, যা একটা শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করে কিন্তু শিক্ষার সাথে দায়িত্ববোধকে সম্পৃক্ত করে না। দায়িত্বের পরিসরকে সংকীর্ণ করতে করতে মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। আত্মকেন্দ্রিক মানুষ কখনো কোনো আন্দোলনে বিশেষত জ্ঞানের জাগরণের আন্দোলনের মতো আন্দোলনে স্থির থাকতে পারে না।
আমাদের একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে।
কথাটা কেবল খটকা লাগানোর জন্য বলা না, ইতিহাসের গভীর সত্য উন্মোচনের দায় থেকেও বলা। জ্ঞানের আন্দোলন অন্যান্য গতানুগতিক আন্দোলন নয় যে, এর সদস্য সংখ্যা, মিছিল, মিটিং ইত্যাদি দিয়ে বিচার করা যাবে। জ্ঞানের আন্দোলন একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, দায়িত্ববান শ্রেণি তৈরি করে। আর এটার জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে ।জ্ঞান আসলে কী বা কেমন হওয়া উচিত এই প্রশ্নগুলোর জবাব। নবজাগরণী ধারায় জ্ঞান হলো শক্তি। যে যত জ্ঞানী, সে তত শক্তিবান। সে তত মানুষকে তার অধীনে রেখে পিষতে সক্ষম।
অপরদিকে ফরজে কেফায়া আদায়ের উদ্দেশ্যে যে জ্ঞানের ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেগুলো
প্রথমত ক্রিয়া মুখাপেক্ষী,
দ্বিতীয়ত জ্ঞানের দ্বীনী ও দুনিয়াবি। এই দুই ভাগকে স্বীকার করে চরম মাত্রায় প্রকাশকারী ধারা। অথচ এই বিভাজনের মাধ্যমে জ্ঞানের অখণ্ডতার প্রকৃত সৌন্দর্য শোচনীয়ভাবে খর্ব হয় এবং জ্ঞানের সত্যিকারের কার্যকারিতা নষ্ট হয়।
ফলত, উপনিবেশ পরবর্তী সময়ে আমাদের এ অঞ্চলে জ্ঞানের আন্দোলন নামে অনেকগুলো আন্দোলন দানা বাঁধলেও সমাজে কোন পরিবর্তন দেখা যায়নি। বর্তমানে আমরা বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা আলোকিত হতে চাই, বুদ্ধিকে মুক্ত করতে চাই। কিন্তু খোদ বুদ্ধিজীবীরাই কি মুক্ত? তারা কেমন হবেন? বুদ্ধিজীবীদের হতে হবে পক্ষপাতহীন; জাতীয় অভিভাবক। যারা ক্ষমতা কিংবা মুহূর্তের খ্যাতির দিকে হেলে না গিয়ে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্তকে সহজভাবে তুলে ধরবেন। সহজভাবে বলতে, সময়ের সাথে সত্যকে প্রাসঙ্গিক করে তুলবেন। কে বা কারা, এ পরিচয়ে বশীভূত না হয়ে কী বক্তব্য- তার ভিত্তিতে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করবেন। একজন বুদ্ধিজীবী, একজন শিল্পী অবশ্যই ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলবেন। তারা কখনোই ভালোকে মন্দ আর মন্দকে ভালো বলে পরিবেশনের যন্ত্র হিসেবে কোনো পক্ষ দ্বারা ব্যাবহৃত হবেন না। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, ঔপনিবেশিক কালের ইতিহাস থেকে বর্তমান পর্যন্ত বুদ্ধিজীবী শব্দটি পরিহাসে পর্যবসিত হয়েছে। আমাদের বুদ্ধিজীবীগন এত বেশি পক্ষপাতদুষ্ট থেকেছেন যে, কোনো জ্ঞানী-গুণীজনকে বুদ্ধিজীবী বলে একক শব্দে আখ্যায়িত করে ঠিক পূর্ণতার স্বাদ পাওয়া যায় না। পূর্ণতার জন্য অমুক দল, তমুক দল এর সাথে ষষ্ঠী বিভক্তি যোগে বুদ্ধিজীবীর আসন পাতা জরুরি হয়ে পড়ে। এটা একটা জাতির জন্য ভয়ানক বাস্তবতা, যা দূর ভবিষ্যত পর্যন্ত জাতির ললাটে দুর্ভাগ্যের কালো ছায়া ফেলে রাখে।
এসমস্ত সংকটের কালো মেঘ দূর করতে হলে, জ্ঞানের মাধ্যমে জাগরণ ঘটানোর প্রথম প্রস্তুতি হিসেবে জ্ঞানের স্বরূপকে এমনভাবে উন্মোচন করা উচিত যাতে জ্ঞানই জাগ্রত হয়। জ্ঞান জাগ্রত হলে জাগরণ যেমন ত্বরান্বিত হবে তেমন কার্যকরও হবে। জাগরণের অন্তরায় হিসেবে বেশ কয়েকটি কারণকে আমরা এখানে চিহ্নিত করেছি। এই সমস্ত কারণকে এক ঢিলে বিতাড়িত করা যেতে পারে, যদি আমরা জ্ঞানকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। জ্ঞান হক্ব, তথা সত্য অভিগামী সফর। হাকিকত অর্থাৎ আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছানোর মাধ্যম।
জ্ঞানকে যখন আমরা সত্য অভিগামী হিসেবে বিবেচনা করতে পারবো এবং জ্ঞান সম্পর্কিত এই জ্ঞানে অভ্যস্ত হবো তখন আমাদের অর্জিত জ্ঞান আমাদের কেবল অর্থবিত্ত ও ক্ষমতার জন্য মরিয়া করে রাখবে না, দায়িত্ববোধ সম্পন্ন করে তুলবে। ভালো-মন্দের মানদন্ড তৈরির সাথে সাথে আমাদের তা পালনের জন্য তাড়িত করবে। তখন জ্ঞান সমান সমান অর্থ ও ক্ষমতা না হয়ে জ্ঞান সমান সমান দায়িত্ববোধ ও আখলাক হবে।
জ্ঞান হাকিকত সন্ধানী হলে তা মুহূর্ত, যুগ, সভ্যতা প্রভৃতির বেড়া ছিন্ন করে চিরন্তন হয়ে ওঠে। তখন ক্রিয়ার মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন থাকে না, অপ্রাসঙ্গিক হওয়ারও সংকট তৈরি হয় না।
মোদ্দাকথা হলো, জ্ঞান ও চিন্তার পুনর্জাগরণে প্রথমত, জ্ঞানকেই সজ্ঞান করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে এমন একটা শ্রেণি গড়ে তুলতে হবে, যারা হাকীকতমুখী জ্ঞানে জ্ঞানপ্রাপ্ত। মূলত এই শ্রেণি জাতির সামনে নজির স্বরূপ হবেন।
জ্ঞানকে সজ্ঞান করার যাবতীয় উপায়কে একত্র করে, তা ক্রিয়াশীল করে তুলবেন।জ্ঞানকে সভ্যতার সিঁড়ি হিসেবে তুলে ধরবেন। জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে কাজ করবেন।
দ্বিতীয়ত, জাতির পুনর্জাগরণের জন্য খেয়াল করতে হবে, জাতির ধর্মীয় বিশ্বাসের বৃত্তান্ত। জাতি হিসেবে বাংলাদেশের অধিবাসী দ্বীনে ইসলামের অনুসারী। যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ মুসলমান এবং জ্ঞানের উৎস হিসাবে ইসলামী চিন্তা ও দর্শন দ্বারা আন্তরিকভাবে অনুপ্রাণিত, সেহেতু জ্ঞানভিত্তিক জাতীয় জাগরণে ধর্মীয়, তথা ইসলামী চিন্তার পুনর্গঠন জরুরি। এখানে বিন্দুমাত্র ফাঁকি রেখেও অগ্রসর হওয়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে একটি বিষয়ে বিশেষভাবে আলোকপাত করা প্রয়োজন। সেটি হলো, নব্বই ভাগ অধিবাসীর সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে মুসলমানরা অবশ্যই আত্মম্ভরিতার দম্ভে স্পর্ধা প্রদর্শন করবে না। কারণ এই স্পর্ধা নিয়ে যখন তারা মাথা তুলবে, তখন তারা সংখ্যা গরিষ্ঠ হলেও তাদের একত্র করার ভিত্তি তথা ইসলামের মৌলিকত্বই লাঞ্ছিত হয়ে যাবে, সংখ্যা কেবল বোঝা হিসাবেই থেকে যাবে। এক্ষেত্রে এই শ্রেণী অবশ্যই শরীয়তের পাঁচটি বিষয় আমলে রাখবেন।
১. পাশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।
২. মানুষ যেন স্বাধীনভাবে চিন্তা বা আকলের চর্চা করতে পারে।
৩.বিশ্বাসের আলোকে জীবন ধারণের স্বাধীনতা প্রদান
৪. বংশ রক্ষার স্বাধীনতা
৫. সম্পদ রক্ষার স্বাধীনতা
একজন সত্যিকারের মুসলমান কখনোই আসাবিয়্যাত তথা সংহতির এ সীমা অতিক্রম করবেন না।
তৃতীয়ত এই শ্রেণী আখলাকের জাগরণ ঘটানোর জন্য যাবতীয় ক্ষেত্র প্রস্তুত করবেন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সংকটের প্রধান কারণ আখলাকের অনুপস্থিতি। ধর্ম, জ্ঞানসহ জেগে ওঠার অন্যান্য অনুঘটক অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ার সিংহভাগ দায় বহন করে আখলাকের নিস্ক্রিয়তা। আখলাক, তথা মানুষের ভেতর ফুঁকে দেওয়া আল্লাহ প্রদত্ত প্রাকৃতিক কাণ্ডজ্ঞান, যা দীর্ঘ আগ্রাসনে ভোঁতা হয়ে গেছে, তা পুনরায় ধারালো করতে হবে।
চতুর্থত, এই শ্রেণি ইতিহাসের সাথে বর্তমানের মেলবন্ধন ঘটাবে। ইতিহাসের উৎকর্ষপূর্ণ দিক বর্তমানের বক্ষে স্থাপন করে সুন্দর ভবিষ্যতের উদ্দেশ্য সামনে চালিত করবেন। আর ত্রুটি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন।
এই মূলনীতিসমূহের সমন্বয়েই জ্ঞান ও চিন্তার জাগরণ অগ্রসর হতে পারে এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতামুখী জাতি বিনির্মান সম্ভব হবে।
