ঐতিহাসিক পাঠকবর্গ অবগত আছেন, আধুনিক ইউরোপ যখন ঘোর অজ্ঞান-অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, প্রাচীন গ্রীসের দর্শন বিজ্ঞানের আলোক যখন নির্বাণ প্রাপ্ত হইয়াছিল; তখন মুসলমানগণই জ্ঞান বিজ্ঞান ও ন্যায় দর্শনের বর্তিকা হস্তে ইউরোপখণ্ডে প্রবেশ করিয়াছিলেন। মুসলমানগণ অত্যল্প সময় মধ্যেই সমগ্র স্পেন, পর্তুগালের অধিকাংশ এবং ইটালী ও ফ্রান্সের কতকাংশ অধিকার করিয়া লন। অধিকার স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁহারা অসভ্য ইউরোপে জ্ঞান ও সভ্যতা বিস্তারের প্রকৃষ্ট উপায়সমূহ অবলম্বন করিয়াছিলেন। ৮ম হইতে ১৫শ শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় ৮০০ বছর মুসলমানগণ আন্দালুসে (স্পেন) রাজত্ব করিয়াছিলেন। মুসলমান-স্পেনের জ্ঞান-সভ্যতায় খরতর রশ্মি তৎকালে সমগ্র ইউরোপখণ্ডে প্রকীর্ণ হইয়া উহাকে আলোকিত করিয়া তুলিয়াছিল। মুসলমান-স্পেনের জ্ঞান-গরিমা ও ঐশ্বর্য মহিমার বর্ণনা করিতে যাইয়া ডোজী (Dozy), লেনপুল (Stainly Lane Pool), সিপ্লট (Sidlot), হার্টওয়েল (Mr. Hart Well Horne) প্রভৃতি ইংরেজ এবং ফরাসী ঐতিহাসিকগণ আত্মহারা হইয়া পড়িয়াছেন।
গ্রানাডা, কর্ডোভা, টলিডো, ভেনিস, জীন, মলাগাঁ, সেভিল, কডিজ প্রভৃতি নগরে মুসলমানদিগের প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুমে (বিশ্ববিদ্যালয়ে) ধর্মসমৃদ্ধ জ্ঞান-বৃদ্ধ মুসলমান অধ্যাপকগণের পদতলে বসিয়াই জ্ঞানগর্বিত ইটালীয়, ফরাশি, জার্মান ও ইংরেজ জাতির পূর্ব-পুরুষগণ জ্ঞানাহরণ করিয়াছিলেন। একমাত্র গ্রানাডায় ৭০টি সাধারণ পাঠাগার (Public Library), ১৭টি কলেজ এবং ২০০ সাধারণ বিদ্যালয় ছিল। খলিফা আবদুর রহমানের (তৃতীয়) সময় কর্ডোভার শাহী কোতবখানায় (Royal Library) ছয় লক্ষেরও অধিক গ্রন্থ সংগৃহীত হইয়াছিল। পাঠকগণ! চিন্তা করুন, তৎকালে জগতের নানাদেশ হইতে ছয় লক্ষ গ্রন্থ সংগ্রহ করা কি বিরাট ব্যাপার এবং কীদৃশ পরিশ্রম ও ব্যয়সাধ্য কার্য ছিল। ক্ষুদ্র সিসিলি দ্বীপেও বহুসংখ্যক উচ্চ শ্রেণীর কলেজ বিদ্যমান ছিল। ফলতঃ প্রাথমিক যুগের মুসলমানদিগের জ্ঞান-গবেষণা ও বিদ্যালোচনার পরিমাণ করাও আমাদের পক্ষে অসম্ভব। পাঠক!
এক গোয়াদেল কুইভার নদী তীরে ক্ষুদ্র বৃহৎ দ্বাদশ সহস্র নগর ও সমৃদ্ধ পল্লী প্রতিষ্ঠিত ছিল; ইহা কি আমাদের নিকট স্বপ্ন বলিয়া বোধ হয় না? স্পেনের মহিলাগণ তৎকালে যেরূপ শিক্ষিতা ছিলেন, আধুনিক জগতের মুসলমান পুরুষগণও তাদৃশ শিক্ষিত বলিয়া বোধ হয় না। স্পেনে মুসলমান মহিলাগণ বিজ্ঞান সভায় (মছে-অল্-মীরুফ) পুরুষদিগের সহিত সমভাবে বসিয়া বিজ্ঞানালোচনা করিতেন। মুসলমান-স্পেনে স্ত্রী কবি, স্ত্রী বক্তা, স্ত্রী বৈদ্য এবং স্ত্রী দার্শনিকের অভাব ছিল না। স্পেনের মুসলমান ইতিহাসে চিরকাল লাজাহান, জেন্নাত হামেদা, হাফেজা, সোফিয়া, মরিয়ম, কালাইয়া প্রভৃতি প্রতিভাশালিনী বিদুষী মহিলামণ্ডলীর নাম ঐতিহাসিকগণ কর্তৃক সর্বদা উচ্চকণ্ঠে পরিকীর্তিত হইবে।
জ্ঞানী পাঠক! চিন্তা করুন, যে সমাজের মহিলাগণও এতাদৃশ উচ্চ শিক্ষিতা ছিলেন; সে সমাজের পুরুষগণের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা কিমধিক ছিল। পাঠক! এস্থলে আমরা বোগদাদ ও মিশরের জ্ঞান চর্চার কথা বাহুল্য ভয়ে উল্লেখ করিলাম না। দয়াময়ের কৃপা হইলে আমরা ক্রমশঃ তৎসমুদয় সুবিস্তৃতভাবে আপনাদের গোচরীভূত করিব।
আধুনিক অজ্ঞান তিমিরাচ্ছন্ন মুসলমান জগতের সহিত তুলনা করিয়া, যাঁহারা প্রাচীন মুসলমান জাতির জ্ঞান চর্চার পরিমাণ করিতে যাইবেন, তাঁহারা সম্পূর্ণরূপ বিড়ম্বিত হইবেন। ফলতঃ দাসত্ব-শৃঙ্খলাবদ্ধ ভগ্নপাদ রুগ্নদেহ জরাজীর্ণ আধুনিক মুসলমানগণকে দেখিয়া যেমন সেই সিংহবীর্য বীরবপুঃশালী অনলতেজাঃ প্রাচীন মুসলমানগণের তেজঃবীর্য ও পরাক্রম প্রতাপের কিছুই বুঝিতে পারা যায় না; তেমনি আধুনিক জ্ঞান বিদ্যা-বিমুখ পতিত মুসলমানগণকে দেখিয়া উন্নতি যুগের মুসলমানদিগের জ্ঞান বিদ্যা ও সভ্যতার পরিমাণ করা নিতান্ত দুষ্কর। ইসলাম ধর্মের শেষ প্রবর্তক ও সংস্কারক পুরুষশ্রেষ্ঠ হযরত মোহাম্মদ (দঃ) নিজে নিরক্ষর ছিলেন। কিন্তু জ্ঞানালোচনা এবং বিদ্যা শিক্ষা বিষয়ে তাঁহার অনুরাগ এবং জ্বলন্ত উপদেশমালা স্মরণ করিলে, মনীষাসম্পন্ন পণ্ডিতগণকেও চমকিত এবং বিস্মিত হইতে হয়। জগতের ধর্ম-প্রবর্তক অন্যান্য মহাপুরুষগণের কাহারও জীবনে এতাদৃশ শিক্ষানুরাগ পরিদৃষ্ট হয় না। প্রেরিত মহাপুরুষ নিজেই মুসলমান বালক-বালিকাদিগের শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া গিয়াছিলেন। আত্মরক্ষার জন্য শত্রুগণের সহিত তাঁহার যে সমস্ত যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল, সেই সমস্ত যুদ্ধে বন্দীদিগের মধ্যে যাঁহারা ভাল লেখাপড়া জানিতেন, তিনি তাঁহাদিগকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মুসলমান বালক-বালিকাদিগের শিক্ষার জন্য নিযুক্ত রাখিয়া বিনা নিষ্ক্রয়ে মুক্তি দান করিতেন। আর যাঁহারা শিক্ষকতা কার্যে ব্যাপৃত থাকিতে ইচ্ছা করিতেন, তিনি তাঁহাদিগের বেতন নির্ধারণ করিয় দিতেন। প্রেরিত মহাপুরুষ বলিয়াছেন, ধর্মার্থ নিহত শহীদদিগের (Martyr) শোণিত অপেক্ষা পণ্ডিতদিগের মসীর মূল্যই অধিক।” অন্যত্র বলিয়াছেন, “বিদ্যা শিক্ষা করা স্ত্রী পুরুষ উভয়ের জন্যই অপরিহার্য কর্তব্য (ফরজ)।” পুনরায় বলিয়াছেন,
প্রেরিত মহাপুরুষের জামাতা মহাত্মা হযরত আলী (কঃ ওঃ) একজন সুশিক্ষিত খ্যাতনামা কবি ও বক্তা ছিলেন। তৎপ্রণীত “দেওয়ান-ই-আলী” নামক কবিতা পুস্তকখানি নীতিপূর্ণ গ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থ অদ্যাবধি মুসলমান সমাজে বিশেষ আদরের সহিত গৃহীত হইয়া আসিতেছে। মহাত্মা আলীর একটি উক্তি এই, “যিনি আমাকে একটি নূতন অক্ষর শিক্ষা দিবেন, আমি সমস্ত জীবন তাঁহার দাস হইয়া থাকিব।” হযরত আলীর বহু উক্তি মুসলমান জগতে এবং তাঁহার মর্মানুবাদ ইউরোপের বহু দেশেও প্রবাদ বাক্যের (Proverb) ন্যায় প্রচলিত হইয়াছে।
প্রাথমিক যুগের আরবীয় মুসলমানগণ প্রেরিত মহাপুরুষের উপদেশ শিরোধার্য করিয়া জ্ঞানালোচনায় জীবন মন উৎসর্গ করিয়াছিলেন। তাঁহারা যেমন বজ্র প্রতাপে ঝটিকা গতিতে পৃথিবীর বহু রাজ্য অধিকার করিয়া লইয়াছিলেন তেমনি প্রাচীন জগতের যে স্থানে তাঁহারা যে বিদ্যার আলোচনা এবং যে গ্রন্থ দেখিতে পাইয়াছেন, সেই বিদ্যার এবং সেই গ্রন্থের জ্ঞান ও শিক্ষা লাভ করিতেও তাঁহারা কুণ্ঠিত ছিলেন না। তাই দেখিতে পাই, প্রাচীন আরবী ভাষায় জগতের যাবতীয় ভাষা হইতে উৎকৃষ্ট গ্রন্থাদি অনুবাদিত ও রচিত হইয়া যাবতীয় রাজকীয় লাইব্রেরী এবং সাধারণ পাঠাগার পূর্ণ করিয়াছিল। প্রাচীন মুসলমানগণ প্রাচীন সভ্য জগৎ হইতে যে শিক্ষা, জ্ঞান ও সভ্যতা সংগ্রহ করিয়াছিলেন, তৎপর তাঁহারা তৎসমস্তে চূড়ান্ত উন্নতি এবং অলৌকিক প্রতিভা দেখাইয়া গিয়াছেন। জগতের যাবতীয় পুরাতত্ত্ববিদ একবাক্যে স্বীকার করিয়াছেন যে, মুসলমান জাতির ন্যায় কোনও জাতিই অল্প সময়ের মধ্যে উভয় রাজ্য (পার্থিব রাজ্য ও জ্ঞানরাজ্য) অধিকার করিতে পারেন নাই।
এই প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ যে সমস্ত বিদ্যা গভীররূপে আলোচনা এবং তদ্বিষয়ের বহুল গ্রন্থাদি লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন তন্মধ্যে কৃষিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, উদ্ভিদতত্ত্ব, জীবতত্ত্ব, রসায়ন, খনিজবিদ্যা, ভাস্করবিদ্যা, ধাতু বিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা, ভূগোল, ইতিহাস, স্বাস্থ্যতত্ত্ব, ভৈষজ্য তত্ত্ব, দর্শন, বিজ্ঞান, গণিত, সাহিত্য, নৌবিদ্যা, সঙ্গীত, কবিত্ব, তর্কশাস্ত্র, বাগ্মিতা, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্মনীতি, সমাজতত্ত্ব, জীবনচরিত, প্রাকৃতিক বিদ্যা, শিল্প এবং বাণিজ্য প্রভৃতি প্রধান। বিদ্যালিদু, প্রাচীন মুসলমানগণের নিকট জ্ঞান ও শিক্ষা আহরণার্থ কোন কষ্টই কষ্ট বলিয়া, কোন ব্যয়ই ব্যয় বলিয়া বিবেচিত হইত না। তাঁহারা শিক্ষার জন্য সহস্র বাধা তুচ্ছ করিয়া নানা দেশ পর্যটন করিতেন, নানাভাষা অধ্যয়ন করিতেন, সর্বপ্রকার ব্যয় বাহুল্য আনন্দের সহিত স্বীকার করিতেন। ধন্য প্রেরিত মহাপুরুষ! আর ধন্য তাঁহার প্রাথমিক যুগের জ্ঞানোন্মত্ত শিষ্যমন্ডলী!
যে সমস্ত মনীষা সম্পন্ন কোবিদ-কুলমণিদিগের জ্ঞানালোচনায় প্রাচীন মুসলমান জগৎ গৌরবান্বিত এবং আলোকিত হইয়াছিল, যাঁহাদিগের শিক্ষানুরাগ অধ্যবসায় এবং ত্যাগ স্বীকারে জাতীয় জীবন-চন্দ্রমা পূর্ণকল হইয়া উঠিয়াছিল, সেই সমস্ত জ্ঞানগরীয়ান পুরুষদিগের সংখ্যা করা দুঃসাধ্য। প্রাচীন মুসলমান জগতে এমন কোনও পল্লী নাই, যে পল্লীতে দুই একজন বিপশ্চিৎ রত্ন জন্মগ্রহণ না করিয়াছিলেন। এমন কোন নগর নাই, যে নগরে ন্যূনপক্ষে দশ-বিশজন মহাপণ্ডিত আবির্ভূত না হইয়াছিলেন। অনুসন্ধান করিলে মুসলমানের গৌরব যুগের ইতিহাসে জ্ঞানবিদ্যা প্রতিভা শালিনী বিদুষী মহিলা সংখ্যাই কয়েক সহস্র হইবে। হায়! দুর্বৃত্ত হালাকু কর্তৃক বোগদাদের অদ্বিতীয় লাইব্রেরী, মূর্খ মামলুকগণ কর্তৃক মিশরের লাইব্রেরী এবং অসভ্য বর্বর খৃস্টানগণ কর্তৃক স্পেনের লাইব্রেরী যদি ধ্বংস না হইত তবে জানিনা জগতে আজ জ্ঞান বিজ্ঞানের কি বিচিত্র দৃশ্যই না প্রতিভাত হইত! মুসলমান পণ্ডিতবর্গের উর্বর মস্তিষ্ক প্রসূত জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং ন্যায় দর্শনের সেই সমস্ত সহস্র সহস্র গ্রন্থ বিদ্যমান থাকিলে ইউরোপ আজ নব আবিষ্কার এবং নব উদ্ভাবনার গৌরব-মান্যে সম্মানিত হইত কি না, সন্দেহের বিষয়। এক্ষণে মুসলমানদিগের যে সমস্ত মূল্যবান গ্রন্থ পৃথিবীতে বিদ্যমান রহিয়া জাতীয় মহিমার পরিচয় প্রদান করিতেছে; তাহা ধ্বংসীভূত গ্রন্থের তুলনায় অযুতাংশের একাংশও নহে। প্রাচীন মুসলমান বিপশ্চিদ্বর্গের আবিষ্কৃত বহু বিষয় এখনও ইউরোপীয় পণ্ডিতকুলের কপিশ-কেশাবৃত মস্তিষ্ক মধ্যে প্রতিভাত হইতে বহু বিলম্ব আছে। ধাতুবিদ্যা এবং ভাস্করবিদ্যায় খৃস্টান জগৎ এখনও প্রাচীন মুসলমান জগতের সমকক্ষতা লাভকরিতে পারে নাই। কিন্তু হয়! আধুনিক মুসলমানগণ জ্ঞানগৌরবোন্নত পূর্বপুরুষগণের শিষ্যবংশ খৃস্টানদিগের শিষ্যত্ব গ্রহণেরও উপযোগিতা লাভ করিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। হায়! ইহা অপেক্ষা দুঃখ ও লজ্জার বিষয় আর কি হইতে পারে?
যাহা হউক প্রবন্ধ দীর্ঘ হইয়া পড়িতেছে, আমরা অতি সংক্ষেপে কতিপয় মহাপণ্ডিতের সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদান পূর্বক এই প্রবন্ধের উপসংহার করিতেছি। প্রাচীন জগতে যে সমস্ত অলৌকিক শক্তিশালী প্রতিভান্বিত মহাপণ্ডিতগণ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে আবু রয়হান মোহাম্মদ আলবেরুনী এবং আবু আলী অল্ হোসেন এবনে সিনার নাম পাশ্চাত্য জগতে বিশেষ প্রসিদ্ধ। প্রথমোক্ত মহাপণ্ডিত ৩৫৯ হিজরীতে (৯৭১ খৃঃ অব্দ) জন্মগ্রহণ করেন। এই খ্যাতনামা পণ্ডিত তাঁহার সময়ের কেবল পরন্তু একজন সুগভীর জ্যামিতি শাস্ত্রজ্ঞ তার্কিক এবং প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি গ্রহ-নক্ষত্রাদির গতিবিধি বিষয়ে বহু সংখ্যক গবেষণাপূর্ণ সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। জ্যামিতি শাস্ত্রের কোণ-বিভাগ, ঘনমূল এবং পঞ্জিকার সংস্কার সাধন করিয়াছিলেন। গজনীপতি দিগ্বিজয়ী মহাবীর সুলতান মাহমুদের ভারতাভিযানে তিনি ভারতবর্ষে আগমন করিয়াছিলেন। মহামতি সেকেন্দার শাহের (Alexander the Great) সহিত মাহমুদের তুলনা করিলে, আরাম্ভর (Aristotle) সহিত আল্বেরুনীর তুলনা করা যায়। কিন্তু আরাম্ভ অপেক্ষা জ্ঞান পাণ্ডিত্য ও বহুদর্শিতায় আল্বেরুনী শ্রেষ্ঠ ছিলেন। আল্বেরুনী চত্বারিংশৎবর্ষ ভারতবর্ষ এবং অন্যান্য দেশ পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন। এই সুদীর্ঘ পরিব্রাজন কালে ভারতবর্ষীয় যাবতীয় বিদ্যার অনুশীলন এবং বহুবিধ গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। কথিত আছে, তাঁহার রচিত গ্রন্থাবলী এক উষ্ট্রের বহনীয় ছিল। তিনি ভারতবর্ষের তদানীন্তন বৃত্তান্ত, হিন্দু জাতির আচার ব্যবহার, ধর্মতত্ত্ব ষড়দর্শন, ভারতের ভৌগোলিক বৃত্তান্ত “কেতাবল হেন্দ” নামক গ্রন্থে অতি বিস্তৃতভাবে লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। সংস্কৃত ভাষায় তাঁহার অসাধারণ ব্যুৎপত্তি ছিল। তিনি ভারতের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের বহু প্রাদেশিক ভাষাও শিক্ষা করিয়াছিলেন। তাঁহার সার্বভৌমাগুলিক ভূগোল গ্রন্থ সুবৃহৎ ষষ্ঠি খণ্ডে বিভক্ত। তাঁহার “কেতাবল হেন্দ” (ভারত-বৃত্তান্ত) ভারতের তদানীন্তন অবস্থা জানিবার জন্য সর্বাপেক্ষা মূল্যবান গ্রন্থ। এই মূল্যবান প্রামাণিক গ্রন্থখানি অল্পদিন হইল বার্লিন রাজকীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসার এওয়ার্ড সাচন (Edward Sachan) কর্তৃক জার্মান ভাষায় অনুবাদিত হইয়াছে।এই মূল্যবান গ্রন্থের কতকাংশ ইংরাজি ভাষায়ও অনুবাদিত এবং মুদ্রিত হইয়াছে। মহাপণ্ডিত আবু রয়হান মোহাম্মদ আলবেরুনী হিজরী ৪২৮ অব্দে
পুরুষগণের শিষ্যবংশ খৃস্টানদিগের শিষ্যত্ব গ্রহণেরও উপযোগিতা লাভ করিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। হায়! ইহা অপেক্ষা দুঃখ ও লজ্জার বিষয় আর কি হইতে পারে?
যাহা হউক প্রবন্ধ দীর্ঘ হইয়া পড়িতেছে, আমরা অতি সংক্ষেপে কতিপয় মহাপণ্ডিতের সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদান পূর্বক এই প্রবন্ধের উপসংহার করিতেছি। প্রাচীন জগতে যে সমস্ত অলৌকিক শক্তিশালী প্রতিভান্বিত মহাপণ্ডিতগণ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে আবু রয়হান মোহাম্মদ আলবেরুনী এবং আবু আলী অল্ হোসেন এবনে সিনার নাম পাশ্চাত্য জগতে বিশেষ প্রসিদ্ধ। প্রথমোক্ত মহাপণ্ডিত ৩৫৯ হিজরীতে (৯৭১ খৃঃ অব্দ) জন্মগ্রহণ করেন। এই খ্যাতনামা পণ্ডিত তাঁহার সময়ের কেবল পরন্তু একজন সুগভীর জ্যামিতি শাস্ত্রজ্ঞ তার্কিক এবং প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি গ্রহ-নক্ষত্রাদির গতিবিধি বিষয়ে বহু সংখ্যক গবেষণাপূর্ণ সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। জ্যামিতি শাস্ত্রের কোণ-বিভাগ, ঘনমূল এবং পঞ্জিকার সংস্কার সাধন করিয়াছিলেন। গজনীপতি দিগ্বিজয়ী মহাবীর সুলতান মাহমুদের ভারতাভিযানে তিনি ভারতবর্ষে আগমন করিয়াছিলেন। মহামতি সেকেন্দার শাহের (Alexander the Great) সহিত মাহমুদের তুলনা করিলে, আরাম্ভর (Aristotle) সহিত আল বিরুনীর তুলনা করা যায়। কিন্তু আরাম্ভ অপেক্ষা জ্ঞান পাণ্ডিত্য ও বহুদর্শিতায় আল্বেরুনী শ্রেষ্ঠ ছিলেন।
আল বিরুনী চত্বারিংশৎবর্ষ ভারতবর্ষ এবং অন্যান্য দেশ পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন। এই সুদীর্ঘ পরিব্রাজন কালে ভারতবর্ষীয় যাবতীয় বিদ্যার অনুশীলন এবং বহুবিধ গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। কথিত আছে, তাঁহার রচিত গ্রন্থাবলী এক উষ্ট্রের বহনীয় ছিল। তিনি ভারতবর্ষের তদানীন্তন বৃত্তান্ত, হিন্দু জাতির আচার ব্যবহার, ধর্মতত্ত্ব ষড়দর্শন, ভারতের ভৌগোলিক বৃত্তান্ত “কেতাবল হেন্দ” নামক গ্রন্থে অতি বিস্তৃতভাবে লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। সংস্কৃত ভাষায় তাঁহার অসাধারণ ব্যুৎপত্তি ছিল। তিনি ভারতের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের বহু প্রাদেশিক ভাষাও শিক্ষা করিয়াছিলেন। তাঁহার সার্বভৌমাগুলিক ভূগোল গ্রন্থ সুবৃহৎ ষষ্ঠি খণ্ডে বিভক্ত। তাঁহার “কেতাবুল হেন্দ” (ভারত-বৃত্তান্ত) ভারতের তদানীন্তন অবস্থা জানিবার জন্য সর্বাপেক্ষা মূল্যবান গ্রন্থ। এই মূল্যবান প্রামাণিক গ্রন্থখানি অল্পদিন হইল বার্লিন রাজকীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসার এওয়ার্ড সাচন (Edward Sachan) কর্তৃক জার্মান ভাষায় অনুবাদিত হইয়াছে। এই মূল্যবান গ্রন্থের কতকাংশ ইংরাজি ভাষায়ও অনুবাদিত এবং মুদ্রিত হইয়াছে।
মহাপণ্ডিত আবু রয়হান মোহাম্মদ আলবেরুনী হিজরী ৪২৮ অব্দে (১০৩৮ খৃস্টাব্দ) গারণা নগরে প্রাণত্যাগ করেন। আল্বেরুনী জগদ্বিখ্যাত ভিষক্ এবং অদ্বিতীয় দার্শনিক আবু আলী আল্ হোসেন এবনে আবদুল্লা এবনে সিনার (Avicenna) সমসাময়িক এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। সর্ব শাস্ত্রবিদ মহাপণ্ডিত আলবেরুনী, সর্ব শাস্ত্রজ্ঞ দর্শন-শাস্ত্র সিন্ধুর অমূল্য রত্ন কোবিদ কুলতিলক আবু আলী-সিনাকে যে সমস্ত দুরূহ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তিনি তৎসমুদয়ের গভীর গবেষণাপূর্ণ অকাট্য উত্তর স্বীয় গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। সেই সমস্ত প্রশ্নোত্তর পাঠ করিলে উভয় পণ্ডিতের অতুলনীয় বিদ্যাবত্তা এবং কুশাগ্র সূক্ষ্ম ধীশক্তি দেখিয়া চমৎকৃত হইতে হয়।
মহাপণ্ডিত আবু আলী-সিনা মুসলমান জগতের সর্বপ্রধান দার্শনিক। ৩৬৮ হিজরীর ১৮ই মহরম (৯৮০ খৃঃ ৮ই আগস্ট) বোখারার অন্তর্গত ‘আফসিনা’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার প্রতিভা, অধ্যয়নানুরাগ এবং বিচারশক্তি অসাধারণ ছিল। ষোড়শ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে বিজ্ঞান এবং চিকিৎসা শাস্ত্রের যাবতীয় শাখায় ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়া, চিকিৎসা ব্যবসায় অবলম্বন করেন। আমীর নোহ বিন্ মন্সুর রাজভিষক কর্তৃক অসাধ্য পীড়াক্রান্ত বলিয়া পরিত্যক্ত হইলে পরে আবু আলী-সিনার সুচিকিৎসায় তিনি আশ্চর্যরূপে আরোগ্য লাভ করেন। এই ঘটনায় আবু আলী-সিনা আমীরের একান্ত শ্রদ্ধা এবং প্রীতিভাজন হইয়া পড়েন, রাজকীয় বিরাট লাইব্রেরীতে অধ্যয়নের বিশেষ সুযোগ ও সুবিধাপ্রাপ্ত হন। রাজকীয় বিরাট গ্রন্থশালার দ্বার তাঁহার নিকট উন্মুক্ত হওয়ায় অদমনীয় অধ্যয়নানুরাগ সফলতাপ্রাপ্ত হইতে থাকে। বোখারার এই “কোতবখানায়” জগতের দুষ্প্রাপ্য কয়েক লক্ষ গ্রন্থ সংগৃহীত ছিল। আবু আলী-সিনা প্রগাঢ় মনোনিবেশ এবং গভীর গবেষণার সহিত তৎসমুদয় পাঠ করিয়া জ্ঞান সমুদ্রের অতল তলে নিমজ্জিত হইয়া অমূল্য রত্নরাজি উদ্ধার করিতে লাগিলেন। অনন্তর দ্বাবিংশ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে তিনি বহুদর্শিতা লাভের জন্য নানা প্রদেশ এবং কাস্পিয়ান সাগরের তীরভূমি পরিভ্রমণ করেন। এই পরিব্রাজনকালে কিয়ৎকাল জর্দানে অবস্থিতি করিয়া তাঁহার সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ “ভৈষজ্য-ব্রহ্মাস্ত্র” (Canon of Medicine) রচনা করেন। এই গ্রন্থ রচনার পরেই তিনি তদানীন্তন কালের এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা খণ্ডের যাবতীয় সভ্য রাজ্যের সুপরিচিত হইয়া পড়েন। তাঁহার গ্রন্থের সহস্র সহস্র পাণ্ডুলিপি পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন স্থানের পণ্ডিত সমাজে বিশেষ আদরের সহিত গৃহীত হয়। এই গ্রন্থ বহু শতাব্দী পর্যন্ত চিকিৎসা-জগতে সমভাবে আদৃত হইয়াছিল। আবু সিনা হামাদানে অবস্থিতি কালে কিছু কালের জন্য তত্রত্য মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন। এই সময়েই তিনি তাঁহার সর্বপ্রধান গ্রন্থ “আশাফা” (স্বাস্থ্য) রচনা করেন। আবু সিনা ৫৯ বছর বয়সে ৪২৫ হিজরীতে হামাদান নগরে শান্তি ও বিশ্বাসের সহিত প্রাণত্যাগ করেন।
আবুসিনার ন্যায় দার্শনিক এবং সর্ব শাস্ত্রবিদ মহা পণ্ডিত জগতে আর কেহ জন্মগ্রহণ করিয়াছেন কি না সন্দেহ। তাঁহার সময়ে এমন কোনও শাস্ত্র ছিল না, যে শাস্ত্রে তাঁহার অসাধারণ জ্ঞান এবং পাণ্ডিত্য দৃষ্ট না হইত। তিনি অকাট্য যুক্তি তর্ক এবং গবেষণা বলে মানবাত্মার স্বাতন্ত্র্য এবং অমরতা অতি সুন্দররূপে প্রমাণ করিয়া গিয়াছেন। মানবাত্মা যে বিশুদ্ধ এবং প্রমুক্ত, তদ্বিষয়ে তিনি গভীর আলোচনা করিয়া গিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, “মন যতই উদার প্রশস্ত এবং সার্বজনীন প্রেমে পূর্ণ হইবে, আত্মাও ততই বিশুদ্ধ এবং প্রমুক্ত হইবে। বিশুদ্ধ এবং প্রমুক্ত আত্মাই ঈশ্বরের স্বারূপ্য লাভের অধিকারী। চিন্ময় জ্ঞানরাজ্য লাভই আত্মার কাম্য।” মনস্তত্ত্ব এবং আত্ম-দর্শনে তাঁহার অলৌকিক প্রতিভা এবং অসাধারণ জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বিজ্ঞান, দর্শন, রসায়ন, শারীরস্থান বিদ্যা (Anatomy) এবং ভৈষজ্য ও চিকিৎসাতত্ত্ব সম্বন্ধে প্রায় ছয় শত মূল্যবান গ্রন্থ লিখিয়া গিয়াছিলেন। গত শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত আবু আলী-সিনার গ্রন্থাবলীই ইউরোপীয় চিকিৎসকগণের প্রধান অবলম্বন ছিল। পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ তাঁহাকে Father of philosophy (দর্শনের জনক) বলিয়া মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিয়াছেন।
২
ইসলাম অত্যল্প কালের মধ্যেই সর্বশ্রেণীর সংখ্যাতীত দার্শনিক পণ্ডিতের জন্মদান করিয়াছিল। কথিত আছে, দ্বিতীয় খলিফা মহাত্মা হজরত ওমর ফারুক একজন মরুবাসী আরবকে উপদেশচ্ছলে তাহার পুত্রকে বলিতে শুনিয়াছিলেন, “হে পুত্র! পুনরুত্থানের দিনে (The day of resurrection) তুমি পৃথিবীতে কোন্ বিষয়ে পাণ্ডিত্য লাভ এবং কোন্ বিষয়ের চর্চা করিয়াছিলে, তদ্বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হইবে। কিন্তু কাহার পুত্র এবং কোন্ বংশধর তদ্বিষয়ে নহে।”
সংক্ষেপে মুসলমান জগতের পণ্ডিতদিগের পরিচয় দিতে হইলেও কয়েকখানি বৃহৎ পুস্তক প্রণয়ন আবশ্যক হইয়া পড়ে। যাহা হউক, আমরা অতি সংক্ষেপে ইসলাম জগতের মহাপণ্ডিতদিগের বিবরণ পাঠকগণকে উপহার প্রদান করিতেছি। আচার্যদিগের মধ্যে এমাম আবু হানিফা (রহঃ), এমাম মালেক (রহঃ), এমাম শাফী (রহঃ), এমাম আহমদ হাম্বল (রহঃ) ব্যবস্থা প্রণেতাদিগের মধ্যে গৌরবের উন্নত স্তম্ভ। ইসলাম জগতে ইহাদের ব্যবস্থা এখনও অতি সম্মানের সহিত প্রচলিত হইয়া আসিতেছে। ইমাম আবু হামেদ গাজ্জালী এবং ইমাম ফখরুদ্দীন (রাজি) পবিত্র কোরানের বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক ভাষ্য (তফসির) প্রণেতা। ইহারা উভয়ে ইসলামের প্রত্যেক বিষয় বিজ্ঞান এবং দর্শনের উপর অচলভাবে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন। ইহারা যেমন মহাপণ্ডিত ও সুগভীর দার্শনিক ছিলেন, তেমনি ইহাদের ধর্ম-জীবনও নিতান্ত উন্নত এবং পবিত্র ছিল। এমাম গাজ্জালীর “জওয়াহের অল্-কোরান” এবং এমাম ফখরুদ্দীনের “তফসিরে কবীর” কোরান শরীফের সর্ব্বোৎকৃষ্ট বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক তফসির জওয়াহের অল্-কোরানের উচ্চভাব গ্রহণ করিতে সমর্থ, এরূপ পণ্ডিতের সংখ্যা এ যুগে নিতান্ত বিরল। এই উভয় মহাত্মাই বিজ্ঞান এবং সত্যকে একই বস্তু বলিয়া প্রতিপন্ন করিয়া গিয়াছেন। এমাম গাজ্জালী (রহঃ) ও এমাম ফখরুদ্দীন রাজি (রহঃ) বহু গ্রন্থ রচনা করিয়া গিয়াছেন। দুঃখের বিষয়, তৎসমুদয়ের অধিকাংশই এক্ষণে নষ্ট ও লুপ্ত হইয়া গিয়াছে।
হাদিস সংগ্রহকারীদিগের মধ্যে আল বোখারী, মোসলেম, আল্ ফারমিদি (তেরমিজি), আবু দায়ুদ, আল নেসায়ী ও এবনে মাজা সর্বপ্রধান। ইহাদের পরেই কাসেম বিন আব্বাস, আবু জয়েদ অল্-মারওয়াজী, এবনে আওয়ানা, আল্-হাজিনী, দারমী, এমাম নওয়ী, এবনে জওজী, এমাম আবু মোহাম্মদ, বয়হাকী, রজিন, দারকোতনীর নাম উল্লেখযোগ্য। ইহারা শ্রুতি (হাদিস) সংগ্রহ বিষয়ে যে প্রকার কষ্ট, ত্যাগ ও ধৈর্য স্বীকার করিয়াছিলেন, তাহা চিরস্মরণীয়। আল বোখারী দশ সহস্র হাদিস সত্য বলিয়া লিপিবদ্ধ করিয়া যান। এই দশ সহস্রের মধ্যে ৭২২৫টি শ্রুতিকে তিনি সম্পূর্ণ সত্য এবং অবিকৃত-ভাষা বলিয়া গ্রহণ করিয়াছেন। তদ্ব্যতীত তিনি সর্বশুদ্ধ দুই লক্ষ হাদিস মিথ্যা ও কৃত্রিম বলিয়া পরিবর্জন করিয়াছিলেন। বোখারী ১১ শত লোকের নিকট হাদিস শ্রবণ করিয়া লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন, একথা তিনি নিজেই লিখিয়া গিয়াছেন।
হিজরী প্রথম শতাব্দীতে সর্বপ্রধান বৈজ্ঞানিক এবং বিদ্যোৎসাহী বলিয়া উমাইয়া বংশীয় তৃতীয় খলিফা খালেদ বিন্ এজিদ কেবল মুসলমান জগতে নহে, পরন্ত সমগ্র জগতে পরিকীর্তিত। ইনি বিস্তৃত রাজ্য শাসনে নিযুক্ত থাকিয়াও যেরূপ জ্ঞানালোচনা এবং বিদ্যাচর্চা করিয়া গিয়াছেন, তাহা ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়। ইনিই সর্ব প্রথমে নানা ভাষা হইতে আরব্য ভাষায় বিবিধ উৎকৃষ্ট গ্রন্থ অনুবাদ করাইতে আরম্ভ করেন। ইনিই সুপ্রসিদ্ধ গ্রীক পণ্ডিত স্টীফান্সকে (Stephanus) সিরীয় এবং গ্রীক ভাষা হইতে রসায়ন এবং বিজ্ঞান শাস্ত্র আরবীতে অনুবাদ করিবার জন্য নিযুক্ত করেন। মহামতি খালেদ নিজেও রসায়ন
এবং ভৈষজ্য-শাস্ত্র সম্বন্ধে অনেকগুলি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। প্রসিদ্ধ প্রত্নতত্ত্ববিদ এনে খল্লেকান বলেন, “খালেদ তৎকালে কোরেশ বংশের মধ্যে সর্ব শাস্ত্রবিদ অদ্বিতীয় পণ্ডিত ছিলেন।” রসায়ন শাস্ত্র সম্বন্ধে তাঁহার গভীর অভিজ্ঞতা এবং অনুরাগ পরিদৃষ্ট হয়। তিনি রসায়ন বিষয়ে “জ্ঞানের স্বর্গভূমি” (Paradise of Wisdom) শীর্ষক একটি অত্যুৎকৃষ্ট কবিতা রচনা করিয়াছিলেন। খলিফা খালেদ হিজরী ৮০ অব্দে (৭০৪ খৃঃ) নশ্বর জগৎ পরিত্যাগ করেন। মুসলমান বৈজ্ঞানিকদিগের নাম স্মরণ রাখিতেও সংখ্যাধিক্য বশতঃ স্মৃতি নিপীড়িত হইয়া উঠে। এই অগণ্য বিজ্ঞান-চার্যদিগের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ আবু মুসা জাফর- যিনি ইতিহাসে বিজ্ঞানের জন্মদাতা বলিয়া পরিকীর্তিত এবং তাঁহার খ্যাতনামা শিষ্য আবদুল জব্বার বিন্-হাইয়াম রসায়ন বিদ্যার জনয়িতা বলিয়া ইতিহাসে বিশ্রুত। মোহাম্মদ বিন্-ইব্রাহিম বিনহবিব-অল্-ফেজারী নামক প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ, বিদ্যোৎসাহী খলিফা আল্ মনসুরের রাজত্বকালে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন। অল্ ফারগণী প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ। ইনি বোগদাদ এবং দামেস্কের নিকটবর্তী ‘কাসিয়ান’ গিরিশৃঙ্গে মানমন্দির (Observatory) প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। ইনিই সঞ্জর প্রদেশ জরিপ করিয়া পৃথিবীর পরিধি অনুর্ধ ২৫০০০ মাইল বলিয়া নির্ণয় করিয়াছিলেন। মোহাম্মদ বিন আবদুল জব্বার অল্ বাতানী (Latinised Albatagnius) পৃথিবীর প্রথম শ্রেণীর চল্লিশ জন জ্যোতির্বিদের একজন। আলী বিন্-ইউসুফ-অল্ মিসরী খৌগোলিক মানচিত্রের জন্য প্রসিদ্ধ। তাঁহার পিতা ইউনুস মিসরী প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক। অল্ বৎহের প্রসিদ্ধ উদ্ভিদতত্ত্ববিদ। ইনি উদ্ভিদ তত্ত্বে সম্যকরূপে জ্ঞান লাভ করিবার জন্য এশিয়ার নানা দেশ পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন। আবুল আসাদ উদ্দৌলা আরব্য ভাষার প্রসিদ্ধ বৈয়াকরণ। অল্ খলিল বিন্-আহমদ ছন্দ রচয়িতা। তাঁহার ছাত্র শিবওয়াই আরব অভিধান এবং ব্যাকরণের সূত্র প্রণেতা। তিনি ব্যাকরণ সূত্র এবং অভিধান প্রণয়ন বিষয়ে গভীর পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন।
ঐতিহাসিকদিগের মধ্যে মোহাম্মদ বিন্-এসহাক অল্ ওয়াকেদী, আবু জাফর তাবেরী, ইউনুস মিসরী, আবুল ফরজ, মেরেজী, সম্রাট আবুলফেদা, এক্সে খলদুন, এবনে আবদুল হাকিম, এহিয়া অল্-হলবী প্রভৃতি পণ্ডিতগণ ইতিহাস বিষয়ে গভীর পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন। বালাজরী প্রণীত প্রসিদ্ধ ইতিহাস “ফতোহল-ব্লদান” একখানি মূল্যবান ইতিহাস। এমাম মসউদী প্রণীত “আখবারোজ্জামান” (যুগ বৃত্তান্ত) নামক ইতিহাস ষষ্ঠি খণ্ডে বিভক্ত। এক্সে খল্লিকান প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক এবং জৈবনিক (Biography)। ভ্রমণকারীদিগের মধ্যে এমাম মসউদী, আল্লামায় মোকদ্দসী, এবনে বতুতা প্রভৃতি প্রধান। ইহাদের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত জগতের আদরের সামগ্রী। তদ্ব্যতীত তৎকালীন দরবেশ এবং পণ্ডিতগণের প্রায় সকলেই অভিজ্ঞতা লাভের জন্য জীবনের কিয়দংশ দেশ পর্যটন কার্যে অতিবাহিত করিতেন।
আবু সইদ আবদুল মালেক বিন্-কুরেব অল্ আসমায়ী এবং তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী আবু ওবেয়দা প্রসিদ্ধ ভাষা সংস্কারক। এইরূপে তার্কিক, চিকিৎসক, কবি, সঙ্গীতবেত্তা, দার্শনিক প্রভৃতি প্রত্যেক শ্রেণীর সহস্র সহস্র পণ্ডিতের নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। আমরা বিভিন্ন প্রবন্ধে ক্রমশঃ তৎসমুদয়ের বিস্তৃত আলোচনা করিব।
এক্ষণে অনুসন্ধিৎসু পাঠক! একবার পারস্যের দিকে দৃত্পাত করুন। পারস্য দেশ কবিকুঞ্জধাম এবং পারস্য ভাষা কবিভাষা হইলেও ইহাতে সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শনের আলোচনা পরিত্যক্ত হয় নাই। পারস্য কবিতার জনক কবিবর রোজী হিজরী চতুর্থ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি সংস্কৃত বহু উপাখ্যান পারস্য ভাষায় অতি সুন্দররূপে অনুবাদ করেন। মহাকবি ফেরদৌসী তুসী ঐতিহাসিক মহাকাব্য “শাহ্-নামার” রচয়িতা। বীররসে জগতের কোনও কবি তাঁহার সমতুল্য নহেন। ইউরোপে ইনি প্রাচ্যখণ্ডের হোমার (Homer of the Orient) বলিয়া পরিকীর্তিত। ইহার রচিত “শাহনামা” জগতের নানা ভাষায় অনুবাদিত হইয়াছে। তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বীদিগের মধ্যে আনসারী এবং আত্মদ আসাদী গীতি কবিতার জন্য বিখ্যাত। সুকবি শেখ সাদীর “গোলেস্তান” ও ‘বোস্তান” উচ্চশ্রেণীর নৈতিক উপদেশপূর্ণ সদ্গ্রন্থ। এই উভয় গ্রন্থই জগতের নানা ভাষায় অনুবাদিত এবং সাদরে গৃহীত হইয়াছে। মহামতি হাফেজের কবিতাবলী (দিওয়ান হাফেজ) ঈশ্বর প্রেমিক মহাজনদিগের আদরের ধন। মোল্লা আবদুর রহমান জামীও একজন উচ্চশ্রেণীর কবি। তাঁহার কবিত্বে উদ্ভাবিনী এবং চিত্তরঞ্জিনী শক্তির বিশেষ বিকাশ দেখিতে পাওয়া যায়। তৎপ্রণীত ‘জোলেখা” পারস্য ভাষার উৎকৃষ্ট প্রেমকাব্য। শেখ সাদীর প্রতিদ্বন্দ্বী কবি ফরিদ উদ্দীন আত্তার প্রণীত “পন্দেনামা” হিতোপদেশপূর্ণ সগ্রন্থ। কবি নিজামীর “সেকেন্দরনামা” বীররসপূর্ণ ঔপন্যাসিক কাব্য। কালিদাসের রঘু-বংশের সহিত ইহার তুলনা হইতে পারে। ওমর খৈয়াম প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক কবি। ইউরোপ ও আমেরিকার পণ্ডিত সমাজে ইহার কবিতা বিশেষ সমাদর লাভ করিয়াছে। মোল্লা হোসেন প্রণীত “আনওয়ার সোহেলী” একখানি উপদেশপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। ইহার প্রণীত “রওজতশ্ শোহ্দা” পারস্য ভাষায় কারবালার হত্যাকাণ্ডের উৎকৃষ্ট ইতিবৃত্ত। মৌলানা জালালুদ্দিন রুমী প্রণীত “মস্নবী” আধ্যাত্মিক উপদেশপূর্ণ উচ্চ কবিত্ব ও ভাবপূর্ণ বিরাট কাব্যগ্রন্থ। দিল্লী দরবারের প্রসিদ্ধ রাজকবি আমীর খসরু ভারতের অদ্বিতীয় পারস্য কবি। ইতিহাস, ভূগোল এবং দর্শন-শাস্ত্র সম্বন্ধেও পারস্য ভাষায় বহু মূল্যবান বৃহৎ বৃহৎ গ্রন্থাদি বিদ্যমান রহিয়াছে। আবদুল্লা বিন্ আবুল কাসেম বিল্লী ৬৭৫ হিজরীতে (১২৭৬ খৃঃ) আদি পিতা হজরত আদম (আ.) হইতে তাঁহার সময় পর্যন্ত “ঐতিহাসিক মুক্তামালা” নামক একখানি গবেষণাপূর্ণ সুবিস্তৃত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। মোহাম্মদ বিন্ খাওন্দ শাহ্ বিন্ মাহমুদ (Western Europe-এর Mirkhond) হিরাটের আমীর আলী শেরের আশ্রয়ে অবস্থানপূর্বক “রওজাতশ শাফা ফি সেরাৎ-অল্-আম্বিয়া অ-উল্ মোল্ল্ক অল্-খোলফা” নামক সুবিখ্যাত ইতিহাস রচনা করেন। “রওজতশ্-শাফা” অতীব বিস্তৃত ইতিহাস। ইহাতে ইসলাম প্রবর্তক যাবতীয় পয়গম্বর (Prophets), পৃথিবীর দিগ্বিজয়ী প্রধান প্রধান সম্রাট এবং খলিফাদিগের বিস্তৃত জীবনী লিপিবদ্ধ হইয়াছে। ইহার গ্রন্থকার ৯০৩ হিজরীতে গতাসূ হন।
তৎপর মোহাম্মদ কাসেম ফেরেস্তা (সুপ্রসিদ্ধ ইতিহাস ফেরেস্তার প্রণেতা), আবুল ফজল, ফৈজি, উরফী, সৈয়দ গোলাম হোসেন (প্রসিদ্ধ ইতিহাস সিয়ারুল মোতাক্ষেরিন্ প্রণেতা) প্রভৃতি মহাত্মাগণ অতি উচ্চশ্রেণীর ঐতিহাসিক ও সাহিত্যবিদ পণ্ডিত।
নাসের উদ্দীন এবং মায়মুন রশিদ ইউক্লিডের অনুশীলনী এবং ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ করেন। প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ ওমর চেহান মালেক শাহের রাজত্বকালে সৌর বৎসর ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে গণনা করেন। নাসের উদ্দীন তৎকালে প্রচলিত প্রত্যেক শাস্ত্র সম্বন্ধে বিবিধ গ্রন্থ লিখিয়া গিয়াছেন। বোগদাদ ধ্বংসকারী হালাকু এলেকনি কর্তৃক তিনি ইরানের শিক্ষা বিভাগের ডাইরেক্টার (উজীর অল্-কলম) পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন।
* মাসিক ইসলাম প্রচারক, জুলাই-আগস্ট ১৯০৩ ও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, ১৯০৩।
