আত্ম-শক্তি ও প্রতিষ্ঠা

চিন্তা ও দর্শন

আপনার বল ব্যতীত- আপনার শক্তি সামর্থ ব্যতীত, অপরের বলে-অপরের শক্তিতে- অপরের সাহায্যে যে ব্যক্তি বা যে জাতি উঠিতে বা উন্নতি করিতে চায়, উত্থান দূরে থাক্ পদে পদে তাহার লাঞ্ছনা এবং অপমান ঘটিয়া থাকে। নিজের চলিবার শক্তি না থাকিলে, অন্যে তোমাকে কতক্ষণ চালাইয়া লইবে? সংসারের উচ্চতা-নীচতা, মান-অপমান, শ্রেষ্ঠতা-নিকৃষ্টতা, রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, পণ্ডিত-মূর্খ, সবল-দুর্বল, সমস্ত কথা শক্তি লইয়া। শক্তি বলিতে অর্থশক্তি, বিদ্যাশক্তি, বুদ্ধিশক্তি, মানসিক শক্তি, শারীরিক শক্তি, আধ্যাত্মিক শক্তি প্রভৃতি সমস্ত শক্তিকেই বুঝিতে হইবে। যাহার যে বিষয়ে শক্তি আছে, তিনি সেই বিষয়ে শ্রেষ্ঠ- প্রধান ক্ষমতাশালী।

জগতে চিরদিন শক্তির সেবা এবং শক্তির প্রাধান্য বিদ্যমান রহিয়াছে এবং চিরদিনই থাকিবে। ইহা ঐশিক বিধি। বিশ্ব জগতের সমস্তই শক্তি দ্বারা পরিচালিত হইতেছে। শক্তির নিকট সকলেই বিনত শির এবং ভূ-নতজানু। জগৎ শক্তির ভক্ত। নিজের শক্তি না থাকিলে, অপরের শক্তি লইয়া কেহ শক্তিমান হইতে পারে না। পারিবে কিসে? যাহার শক্তিই নাই, তাহার আবার শক্তি গ্রহণের সামর্থ্য কোথায়? শক্তি গ্রহণ করা যে মহাশক্তির কার্য।

নিজের শক্তিতে যদি দাঁড়াইতে পার- মাথা তুলিতে পার- দেখিবে, জগৎবাসী তোমার পায়ে লুটাইয়া পড়িবে। আর যদি নিজের শক্তি না থাকে,-যাও অন্যের কাছে প্রার্থনা করিতে- ফল- অপমান, লাঞ্ছনা এবং পদাঘাত। জগতের প্রতি অণু পরমাণুতে শক্তির ক্রিয়া।

যাহার শক্তি- তাহার প্রতিষ্ঠা। Might is right. জোর যার মুলুক তার। ইহা অভ্রান্ত এবং অকাট্য মহা সত্য। সংসারের সর্বত্র সর্বদা শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলিতেছে- যে জয়লাভ করিবে, প্রতিষ্ঠা তাহারই।

অনুনয়-বিনয়-ক্রন্দন-প্রার্থনা-ভিক্ষা, নীচাশয় শক্তিশূন্য ভিক্ষুকের কার্য। যে নীচাশয়, যে অশক্ত, যে ভিক্ষুক, তাহার আবার সম্মান কি? মর্যাদা কি? প্রতিষ্ঠা কি? ভিক্ষুক যত বড়ই হউক না কেন, তথাপি ভিক্ষুক ব্যতীত সে অন্য কিছু নয়।

তাহার কোন বিষয়ে জোর বা অধিকার নাই- claim নাই- right নাই। প্রভুর যাহা ইচ্ছা- দাতার যাহা দাতব্য- তাহাই দিবে; তাহাকে তাহাই লইতে হইবে। দাতার ইচ্ছা না হয়, কিছুই দিবে না। পুনঃ পুনঃ বিরক্ত করিলে কুকুরের ন্যায় ‘দূর্-দূর্” করিয়া তাড়াইয়া দিবে। অশক্ত অক্ষম ভিক্ষুক ইহা ব্যতীত আর কি আশা করিতে পারে? পরম প্রিয় পাঠক পাঠিকে! অশক্ত ভিক্ষুককে কে কবে মণি-মুক্তা দান করিয়া থাকে? ভিক্ষুককে বসিবার জন্য কে কবে নিজের আসন দিয়া থাকে? দাতা যতই বদান্য হউক না কেন, তথাপি ভিক্ষুককে নিজের আসন প্রদান করে না। ছিন্নবস্ত্র, এক মুষ্টি চাউল ও দুই একটি পয়সা ব্যতীত ভিক্ষুকের ভাগ্যে আর কি জোটে? তাই বলিতেছিলাম, যে শক্তিশূন্য- সেই ভিক্ষুক। যে ভিক্ষুক- সেই স্বত্ব (right) শূন্য। যে স্বত্বশূন্য, তাহার আবার প্রতিষ্ঠা কি? জগতের মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠা গৌরবে তাহার লুব্ধ দৃষ্টিপাতের অধিকার নাই। যে শক্তিশূন্য- সে অপদার্থ জড়।

পৃথিবীর ইতিহাসে দেখ- মহাপুরুষদিগের জীবনে দেখ- শক্তিশালী, উন্নত জাতির ইতিবৃত্ত দেখ, জাজ্বল্যমান দেখিতে পাইবে, শক্তিতেই প্রতিষ্ঠা-শক্তিতেই বিজয়- শক্তিতেই সুখ-সৌভাগ্য সম্পদ। শক্তি বলেই ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা- শক্তি বলেই জাতিগত প্রতিষ্ঠা। সর্বত্র একই শক্তির কার্য। আজ যে তুমি জনসমাজের পদতল স্পৃষ্ট হইলেও তোমার দিকে কেহ ফিরিয়া দেখিতেছে না- তোমার করুণ ক্রন্দনে পরমাত্মীয়ও কর্ণপাত করিতেছে না; কাল সেই তুমি- শক্তিশালী হও- লোক সমাজে কোন ক্ষমতার পরিচয় দাও- কোন কৃতিত্ব দেখাও- দেখিবে, সকলে তোমার সম্মাননার জন্য শশব্যস্ত- সকলে তোমার আদেশ শ্রবণে উৎকর্ণ।

তাই বলি, বঙ্গের মুসলমান! আলস্য, ঔদাস্য, অদৃষ্টবাদ, রাজার আশা, পরের আশা পরিত্যাগ করিয়া, আত্মবলে, আত্মশক্তিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে সচেষ্ট হও। ভ্রাতঃ! প্রার্থনা, ক্রন্দন, অশ্রু জলে কার্যোদ্ধার হইবে না। শক্তিবলে কার্যোদ্ধার করিতে প্রবৃত্ত হও। যদি মানুষ হইতে চাও- উন্নতি লাভ করিতে চাও- যদি জাতি প্রতিষ্ঠা করিতে চাও, তবে আত্মশক্তি উদ্বুদ্ধ এবং সচেতন কর। সমাজে শক্তির বিস্ফুরণ কর। শক্তিবলে যোগ্যতা এবং উপযুক্ততা লাভ কর। বিশ্ব-সংসারে সর্বদা যোগ্যের পূজা- (উপযুক্তের আদর- শ্রেষ্ঠের প্রাধান্য-শক্তিশালীর প্রতিষ্ঠা। Survival of the fittest.

বঙ্গের শক্তি-শূন্য মুসলমান

একবার চিন্তা করিয়া দেখ- শক্তির অভাবে আমরা কেমন অপদার্থ জড় রূপে পরিণত হইয়াছি। এক বঙ্গদেশে যত মুসলমান, পৃথিবীর বিধর্মীশূন্য কোনও মুসলমান শাসিত দেশেও তত মুসলমান নাই। অথচ এই বঙ্গদেশেই আমাদের জাতীয় অধঃপতন চরমে পঁহুছিয়াছে। আমরা বাঙালী মুসলমান যতদূর হেয় নীচ ও কাপুরুষ হইয়া পড়িয়াছি- আমাদের ধর্ম এবং কর্ম জীবন যেরূপ ক্ষীণ এবং নিষ্প্রভ হইয়া পড়িয়াছে- চিত্ত যেরূপ মালিন্য ও কঠোরতা লাভ করিতেছে-মস্তিষ্ক যেরূপ বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান শূন্য পশুভুক্ত কপিথবৎ হইয়া পড়িয়াছে- বিবাদ বিসম্বাদ এবং দ্বন্দ্ব কলহে আমাদের পারিবারিক জীবন যেরূপ ঘোরতর অশান্তি কর হইয়া উঠিয়াছে- উচ্চ আশা (High ambition), উচ্চ লক্ষ্য (High standard of aim) আমাদের হৃদয় হইতে যেরূপভাবে বিসর্জিত হইয়াছে-স্বজাতি-বাৎসল্য ও জাতীয় সহানুভূতি যেভাবে কথার কথা হইয়া উঠিয়াছে-পবিত্রতা, উদারতা, মনোবল (strength of mind), মানসিক তৎপরতা (Intellectual activity) যেরূপভাবে লোপ পাইয়াছে- ভীষণ দরিদ্রতা দাবানলরূপী দানবের সহস্র শিখা বিস্তার করিয়া সমগ্র সমাজকে শুষ্ক তৃণরাশিবৎ যেরূপভাবে বিদগ্ধ করিতেছে- এক কথায় আমরা যেমন সর্ববিধ শক্তিশূন্য হইয়া পড়িয়াছি; তাহাতে আমাদের এই শোচনীয় অবস্থার পরিণাম কতদূর ভয়াবহ, তাহা প্রত্যেক মুসলমানের চিন্তা করা অপরিহার্য্য কর্তব্য।

দিনের পর দিন- মাসের পর মাস- বছরের পর বছর গত হইতেছে-জগতের কত অসভ্য জাতি তৎসঙ্গে সঙ্গে সভ্য জাতিতে পরিণত হইতেছে- কত পর-পদ-দলিত, পরকর নিপীড়িত পরাধীন জাতি স্বাধীনতা লাভ করিয়া শক্তিশালী জাতিতে- power-এ পরিণত হইতেছে;- প্রত্যহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনা কতই না নব নব তত্ত্ব ও সত্য আবিষ্কৃত হইতেছে- শিক্ষার উজ্জ্বল আলোকে অশিক্ষা এবং কুসংস্কার রূপ অন্ধতমিস্রাবৃত কত দেশ বিভাসিত হইতেছে- আন্দোলন ও আলোচনার তরঙ্গাভিঘাতে জগতের ধর্মনীতি, রাজনীতি ও সমাজনীতির কতই বা উৎকর্ষ সাধিত হইতেছে- ফলতঃ সমগ্র ‘দুনিয়া’ কি যেন এক মাতোয়ারা ভাবে প্রমত্ত হইয়া, বিদ্যুৎ-গতিতে অনন্ত উন্নতির পথে অগ্রসর হইতেছে। কিন্তু কেবল একমাত্র বঙ্গীয় মুসলমানগণই, কর্ম ও উন্নতিময় জগতের বিশ্বকেন্দ্র বিকম্পন তুমুল কোলাহলেও গাঢ় নিদ্রায় মৃতবৎ আলস্য-শয্যায় শয়ান রহিয়াছে। সূর্যদেব চক্রবাল রেখা হইতে ধীরে ধীরে মধ্য গগন আশ্রয় করিতে চলিয়াছে- খরতর কিরণপুঞ্জে সমস্ত ‘দুনিয়া’ আলোক সাগরে সমুদ্ভাসিত হইতেছে। কিন্তু হায়! বঙ্গীয় মুসলমানদিগের জাতীয় জীবনের আকাশ-পটে উন্নতি-ভাস্করের উদয় দূরে থাক্ কুসুম-কুন্তলা ঊষা দেবীর শুভ্রদৃষ্টিও দৃষ্ট হইতেছে না। অন্ধ তমস-রাশি সহস্র পক্ষ বিস্তার করিয়া এ জাতির জীবন-অম্বর সম্পূর্ণরূপে আচ্ছাদিত করিয়া রাখিয়াছে।

জ্ঞানী পাঠক! চিন্তা করিয়া দেখ, বঙ্গীয় মুসলমান, বর্তমান সুসভ্য এবং সমন্বিত জগতের কত নিম্নে অসভ্য অবস্থায় নিপতিত রহিয়াছে। শিক্ষার আলোক তাহাদের মধ্যে এখনও অতি ক্ষীণভাবেই বিস্তারিত হইতেছে। যে যুগে ভারতের সাঁওতাল, কোল, ভীল, প্রভৃতি অসভ্য জাতি শিক্ষালোকে আলোকিত হইতেছে- যে যুগে ভারতের অন্যান্য জাতির নারীগণও উচ্চ জ্ঞান-গৌরবে ও বিদ্যা-বৈভবে বিমণ্ডিত হইতেছেন- হায়! সে যুগেও আমরা কেমন পশুর ন্যায় অলস ও অকর্মণ্যভাবে জীবন যাপন করিতেছি। আমরা সর্ববিধ উৎকৃষ্ট শক্তিশূন্য হইয়া অবনতি-স্রোতে তৃণের ন্যায় ভাসিয়া যাইতেছি; আর আমাদের দন্ত, বিঘর্ষণ জাত বাঁদরামী, “আহমকী’ এবং ‘বেওকুফী’ আমাদিগকে প্রতি মুহূর্তে তীব্র বেগে পতন আবর্তাভিমুখে আকর্ষণ করিতেছে!!

সহৃদয় পাঠকমণ্ডলী! একবার জ্ঞানচক্ষু উম্মীলনপূর্বক অতীতের সহিত বর্তমান অবস্থার তুলনা করিয়া দেখুন। দেখিবেন- ধীরে ধীরে আমরা কোথা হইতে কোথায় ভাসিয়া চলিয়াছি, ধীরে ধীরে আমাদের জ্বলন্ত ধর্মভাব কেমন নিষ্প্রভ এবং শীতল হইয়া পড়িয়াছে! হায়! আমরা কি ছিলাম, কি হইলাম এবং কি হইতে বসিয়াছি।

হায়! আমাদের মধ্যেই কি নীতিপূর্ণ মহাগ্রন্থ কোরান শরিফ বিদ্যমান আছে? হায়! আমরাই কি সেই মানবকুল শরণ জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম প্রচারক রাজনীতিবিদ সমাজ সংগঠনকারী প্রচণ্ডতেজাঃ মহাপুরুষ হজরত মোহাম্মদ মোস্তফার (দঃ) শিষ্য দলভুক্ত? হায়! এ দুঃখের কথা কাহাকে বলিব? যে ধর্মের উন্নত এবং বিমল নীতিতে পরিচালিত হইয়া যে ধর্মতরুর আশ্রয় লাভ করিয়া- যে ধর্মের ঐশী প্রভাবে সন্দীপ্ত হইয়া আমাদের পূর্ব-পুরুষগণ অত্যল্প সময়ে জগতে শিক্ষা ও দীক্ষাগুরুর পদে বরিত হইয়াছিলেন; হায়! আজ আমরা সেই ধর্ম অবলম্বন করিয়া এবং সেই বিশ্ববন্দ্য পুরুষ-সিংহদিগের বংশধর হইয়াও শক্তিহীনতা বশতঃ জগতের প্রতিষ্ঠামন্দিরের সোপান তলেও দণ্ডায়মান হইতে সমর্থ হইতেছি না। হায়! ইহা অপেক্ষা লজ্জা, দুঃখ এবং আক্ষেপের বিষয় আর কি হইতে পারে?

সমাজ-হিতৈষী মহোদয়গণ! আজ একবার চিন্তা করিয়া দেখুন, আমরা কোন্ রোগে এরূপ জর্জরিত হইয়া পড়িয়াছি। কিসে আমরা শক্তিশূন্য, তেজঃশূন্য, জীবনশূন্য জড়পিণ্ডে পরিণত হইয়াছি। মনের বল, আত্মার তেজঃ, শোণিতের উচ্ছ্বাস, উন্নত লক্ষ্য, কেন আমাদের মধ্য হইতে বিলুপ্ত হইল? হায়! এ প্রশ্নের উত্তর আজ কে দিবে? মহোদয়গণ! প্রাচীন ইতিহাস খুলিয়া দেখুন, আমাদিগের পিতৃ-পিতামহগণ একমাত্র ব্রহ্মতেজে প্রদীপ্ত হইয়া, সাংসারিক এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির চরম সীমায় উপস্থিত হইয়াছিলেন। তাহারা একমাত্র অদ্বিতীয় প্রভু সর্ব

শক্তি মূলাধার আল্লাহতাআলায় আত্মসমর্পণ করিয়া, বিশ্বাসের অগ্নি হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত করিয়া- সকলে ভ্রাতৃবৎ গলায় গলায় মিলিয়া শক্তি সাধনায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। তাই দেখিতে পাই- অদ্বিতীয় শক্তিশালী সর্বময় প্রভু আল্লাহতালার উপাসনা করিয়া, আপনারাও অদ্বিতীয় শক্তিশালী প্রভুত্ব পদ-উচ্ছিত মহাজাতিতে মহাশক্তিতে পরিণত হইয়াছিলেন।

মহোদয়গণ! আমরা বঙ্গীয় মুসলমান এমনই কাণ্ডজ্ঞানহীন মূর্খ হইয়া পড়িয়াছি যে, আমরা আমাদের অতীত ইতিহাস বিষয়ে কিছুই অবগত নহি। উন্নত জাতি অধঃপতিত হইলে একমাত্র প্রাচীন গৌরব কাহিনীই তাহাদিগকে উদ্বুদ্ধ এবং সচেতন করিতে পারে। প্রাচীন গৌরব গাঁথাই তাহাদিগের কর্ণে অমৃত বাণী উচ্চারণ করে। আজ আমরা বঙ্গের মুসলমান যদি পূর্ব-পুরুষদিগের শক্তি-সাধনা ও প্রতিষ্ঠার বিষয় অবগত থাকিতাম, তাহা হইলে বোধহয় আমাদের এই পরাধীনতার দাসত্ব-শৃঙ্খল ভাঙ্গিয়া যাইত। জ্ঞান বীর্যশালী পিতামহগণ যে হৃদয়ে যে বল লইয়া, যে অদৃশ্য উচ্চ উন্মাদনায় অধীর হইয়া জগতের শীর্ষস্থান অধিকার করিয়াছিলেন, আমাদের অন্তরে সেই বল- সেই সাহস সেই অধ্যবসায় ফিরিয়া আসিত। হতভাগ্য আমরা হারাধন পুনঃপ্রাপ্ত হইয়া ধন্য এবং কৃতার্থ হইতাম। শক্তিসাধনার বলে পুনরায় আমরা জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতাম।

বঙ্গীয় মুসলমান! একবার অতীত ইতিহাসের পৃষ্ঠায় দৃষ্টিপাত কর। অই যে বিদ্যুদ্দীপ্ত গিরিচূড়ার ন্যায় তেজঃপুঞ্জ মূর্তি, করুণাময় আঁখি, স্থির-বিশ্বাসী, ব্রহ্মপরায়ণ, বীরেন্দ্রবর্গকে দেখিতে পাইতেছেন, উহারাই কি আমাদের বিশ্বসভা বিমণ্ডিত বিশ্ব বরণীয় পূর্ব-পুরুষ নহেন? দেখুন- উহারা সংখ্যায় অল্প হইয়াও, পরস্পর প্রীতি-প্রফুল্ল বন্ধুর ন্যায় স্কন্ধে মিলিত হইয়া- আত্মায় আত্মায় যোগ রাখিয়া- মুখে বরা ভয়প্রদ ‘আল্লাহো আব্বর’ রব উচ্চারণ করিয়া, জগতের এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিকম্পিত করত কেমন গাম্ভীর্য, দৃঢ়তা এবং নির্ভীকতার সহিত প্রমত্ত তেজঃ উল্কা গতিতে জ্ঞান-রাজ্যে, ধর্ম-রাজ্যে এবং কর্ম-রাজ্যে ছুটিয়া চলিয়াছেন!! ফলতঃ যে সহস্র ভাস্করের তেজঃরাশি লইয়া, অযুত মত্ত রাবণের বল ধারণ করিয়া, বৈশাখ-ঝটিকার সর্ব বাধ-বিঘ্ন-বিমর্দিনী গতি লইয়া, পূর্ব পুরুষগণ কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, যে দুর্জয় বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত হইয়া তাঁহারা বিবিধ অসাম্য সাধন করিয়াছিলেন, যে বিশ্ব বিপর্য্যয়িনী মহাশক্তির বলে তাঁহারা অতুল প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিলেন; আমাদের মধ্যে তাহার কণামাত্র বিদ্যমান থাকিলে আমাদিগকে এমন ভাবে অহর্নিশ দুঃখ-দুর্দশা, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা এবং অপমানের পদাঘাত সহ্য করিতে হইত না। বাস্তবিক পক্ষে আমাদের মধ্যে সে ঐসলামিক মহাতেজের বিন্দুবিসর্গ অবশিষ্ট থাকিলে- এমন কি, বোধ হয় সে মহাতেজের   প্রচণ্ড-প্রভাবময়ী-সন্দীপনী-শক্তির বিষয়ে আমাদের ধারণা থাকিলেও আমরা এরূপ কাপুরুষ, উদ্যমহীন, অদৃষ্টবাদী জীবে পরিণত হইতাম না।হে সভ্যমণ্ডলী! আমাদিগকে দৃষ্টান্তের জন্য অধিক দূর যাইতে হইবে না। বঙ্গবিজয়ের ইতিহাস স্মৃতি-পটে দেদীপ্যমান রহিয়াছে। পাঠকমণ্ডলী! সপ্তদশজন অশ্বারোহী সেনাসহ মহাসামন্ত গাজী মোহাম্মদ বস্তিয়ার খিলজী কোটি শত্রু অধ্যুষিত অররু-পরিবেষ্টিত বঙ্গদেশে প্রবেশ করিতে অণুমাত্রও বিচলিত হইয়াছিলেন না। বীরদম্ভে অগ্রসর হইয়া, বিনা যুদ্ধেই রাজ্য অধিকার করিয়া লইয়াছিলেন।

আর আজ শত আক্ষেপ! বলিতে হৃদয় বিদীর্ণ হয়- যে বঙ্গে তিন কোটি মুসলমানের বাস, সেই বিরাট বঙ্গে জাতীয় শিক্ষা-সমিতির বিরুদ্ধে কোন কোন সমাজ ধুরন্ধর বস্তানী খুলিয়া ‘ফাল’ দেখিয়া উচ্চ চীৎকারে সমিতির ভবিষ্যৎ সফলতা অসম্ভব বলিয়া মত প্রকাশ করিতেছেন। ইহারা সমাজহিতকর কার্যের অনুষ্ঠানে এবং সমাজের হিত সাধন বিষে দগ্ধীভূত হইতেছে। আমরা উপসংহারে এই সমস্ত কাপুরুষ মৎস্যের প্রকৃতি জীবের কথায় বঙ্গীয় মুসলিম সমাজকে কর্ণপাত করিতে করপুটে নিষেধ করিতেছি। ইহাদের বাধা বিঘ্ন পদদলিত করিয়া দৃঢ়-বিশ্বাসে আমাদিগকে শক্তি সাধনা করিতে হইবে। আত্মশক্তির বিস্ফুরণ ব্যতীত প্রতিষ্ঠা লাভ করার আশা বাতুলতা মাত্র।

* মাসিক ইসলাম প্রচারক, ৬ষ্ঠ বর্ষ, মে-জুন ১৯০৪, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ, ১৩১১।

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *