ফাতিমা আল কাব্বাজ ছিলেন মরক্কোর একজন প্রখ্যাত নারী ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমা। চল্লিশের দশকে ফেজ নগরীর ঐতিহাসিক আল কারাওয়িয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যে হাতেগোনা কয়েকজন নারী প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার গৌরব অর্জন করেছিলেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। আরব ইসলামী বিশ্বে নারীর উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে তাঁর এই পদার্পণ ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা।
পরবর্তীতে মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদের পুনর্গঠিত দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কাউন্সিল অব উলামার প্রথম এবং একমাত্র নারী সদস্য হিসেবে তিনি অনন্য উচ্চতায় আসীন হন। সেখানে সহনশীলতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর জোর দিয়ে ইসলামী শরীয়তের আধুনিক ও মানবিক ব্যাখ্যা তুলে ধরতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
আল কাব্বাজের এই ইলমি সফর মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীদের ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। মধ্যযুগ থেকেই মরক্কোর ইতিহাসে নারীশিক্ষার ধারা বহমান ছিল। তবে আধুনিক সংস্কারের আগ পর্যন্ত নানা সামাজিক ও পিতৃতান্ত্রিক বাধা সেই পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে রেখেছিল।
আল কারাওয়্যিনের কঠিন ও উচ্চমানের পাঠ্যক্রম সফলভাবে শেষ করার পর তিনি খোদ মরক্কোর বাদশাহ ও তাঁর ভাইবোনদের ফিকহ (ইসলামী আইনশাস্ত্র) পড়াতেন। এটিই প্রমাণ করে, দ্বীনি রেওয়ায়েতে তাঁর পাণ্ডিত্য কতটা গভীর ছিল। ধর্মীয় শিক্ষায় নারীর অসীম সম্ভাবনার কথা তিনি দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতেন। তাঁর স্পষ্ট বিশ্বাস ছিল, গ্রামাঞ্চলের নিরক্ষর মানুষের কাছে, বিশেষ করে প্রান্তিক নারীদের কাছে ইসলামের সঠিক আলো পৌঁছে দিতে নারী আলেমারা পুরুষ আলেমদের চেয়েও বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। এই দর্শন থেকেই তিনি পুরুষ ইমামদের পাশাপাশি নারীদের মুরশিদাত (নারী আধ্যাত্মিক গাইড) হিসেবে গড়ে তোলার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে প্রাণ সঞ্চার করেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম মরক্কো সরকারের উদার ও ভারসাম্যপূর্ণ দ্বীনি নীতিকে আরও শক্তিশালী করেছে। সেই নীতি অন্ধ গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবমুখী ও সমাজের উপযোগী চিন্তাকে অগ্রাধিকার দেয়।
প্রারম্ভিক জীবন ও পারিবারিক বুনিয়াদ
১. জন্ম ও বংশপরিচয়
ফাতিমা আল কাব্বাজ ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর প্রাচীন ও পুণ্যভূমি ফেজ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক বংশলতিকা সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, তিনি বেড়ে উঠেছিলেন এমন এক শহরে, যা আল কারাওয়িয়্যিন মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে হাজার বছর ধরে ইসলামী জ্ঞান ও সংস্কৃতির অনন্য কেন্দ্র হয়ে আছে। এই পবিত্র পরিবেশই শৈশবে তাঁর হৃদয়ে ইলমে দ্বীনের প্রতি গভীর অনুরাগের বীজ বুনে দিয়েছিল।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি মরক্কোর রক্ষণশীল সমাজে প্রাথমিক শিক্ষার পর নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা প্রায় বন্ধই ছিল। তাঁর পরিবার সেই সামাজিক প্রাচীর বুঝতে পেরেছিল এবং তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষায় উৎসাহ দিয়েছিল। চল্লিশের দশকে আল কারাওয়্যিনের চৌকাঠে তাঁর মতো পুণ্যবতী ও মেধাবী এক নারীর প্রবেশ তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে এক নীরব বিপ্লবের সূচনা করে।
২. ফেজ নগরীর কোলে বেড়ে ওঠা
ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ফেজ তখন ইসলামী সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার এক উত্তাল সময় পার করছিল। ঠিক সেই সময়েই ফাতিমা আল কাব্বাজ সেখানে বেড়ে উঠছিলেন। আল কারাওয়্যিনের সুউচ্চ জ্ঞানবৃক্ষের ছায়ায় থেকে তিনি ফেজের সেই ঐতিহ্যবাহী ইলমি পরিবেশ খুব কাছ থেকে দেখেছেন, যদিও তখন নারীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা লাভ ছিল অত্যন্ত দুরূহ।
তাঁর শৈশব কেটেছে ধর্মীয় অনুশাসন, তাকওয়া আর পবিত্র কুরআনের প্রাথমিক তালিমের মধ্য দিয়ে, যা তখনকার মুসলিম পরিবারগুলোর চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য ছিল। বৈষয়িক শিক্ষার চেয়ে তাঁর পরিবার আধ্যাত্মিক ও দ্বীনি শিক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দিত। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি আল কারাওয়্যিনের ইতিহাসে অন্যতম প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন: আল কারাওয়িয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণালী অধ্যায়
১৯৩২ সালে জন্ম নেওয়া ফাতিমা আল কাব্বাজ যেদিন ফেজের প্রাচীন জ্ঞানকেন্দ্র আল কারাওয়্যিনে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তির অনুমতি পেলেন, সেদিন ইসলামের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হলো। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি মরক্কোর শিক্ষানীতিতে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল, তারই সুফল হিসেবে শত শত বছর ধরে পুরুষ উলামাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই প্রাচীন প্রতিষ্ঠানের দরজা নারীদের জন্য খুলে যায়। এর আগে নারীরা কেবল অনানুষ্ঠানিকভাবে, পর্দার আড়ালে বসে বুজুর্গদের দরস শুনতে পেতেন। আল কাব্বাজের হাত ধরে তা ফিকহ, হাদীস ও তাফসীরের নিয়মতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমে রূপ নেয়।
সে সময় আল কারাওয়্যিনে ভর্তির নিয়ম ছিল অত্যন্ত কঠিন। মৌখিক পরীক্ষা দিতে হতো এবং আগের দ্বীনি ইলমের গভীরতা প্রমাণ করে নামকরা উলামাদের সুপারিশ সংগ্রহ করতে হতো। ফেজের স্থানীয় মসজিদ ও পারিবারিক পরিবেশে আল কাব্বাজ শাস্ত্রীয় আরবি ভাষা ও বুনিয়াদী কিতাবগুলোতে যে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, তা দেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ তাঁকে সানন্দে গ্রহণ করেন।
প্রথম নারী ব্যাচের একজন অগ্রদূত হিসেবে তিনি অত্যন্ত রক্ষণশীল পরিবেশেও নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্য মরক্কোর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণের পথ সুগম করে দেন। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে মরক্কো স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানে নারী ও পুরুষের একসঙ্গে পড়াশোনা বেশ সীমিত ছিল। তবু আল কাব্বাজের এই সাহসী পদক্ষেপ লিঙ্গবৈষম্যের প্রাচীন দেয়াল ভাঙতে প্রধান ভূমিকা রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কঠোর শিক্ষাজীবনই পরবর্তীতে তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ উলামা কাউন্সিলে নীতিনির্ধারণী আসনের উপযুক্ত করে গড়ে তোলে।
পাঠ্যক্রম ও ইলমি মনোযোগ
আল কারাওয়্যিনে ফাতিমা আল কাব্বাজের শিক্ষা ও ইলমি সাধনার মূল কেন্দ্রে ছিল ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শাস্ত্রের বুনিয়াদী বিষয়গুলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত মরক্কোর রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহ্যগত মালেকী মাযহাবের ফিকহ। এর পাশাপাশি তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে ছিল হাদীস, তাফসীর এবং আনুষঙ্গিক জ্ঞান, যেমন আরবি ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র ও যুক্তিবিদ্যা। এই পাঠ্যক্রম আল কারাওয়্যিনের সেই ঐতিহাসিক ধারাকেই বাঁচিয়ে রেখেছিল, যা বিংশ শতাব্দীতেও গণিত বা প্রাকৃতিক দর্শনের মতো বিষয়ের চেয়ে খাঁটি দ্বীনি ও আইনি ইলমের চর্চাকেই বেশি প্রাধান্য দিত।
এই গভীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মূল ধারা ও মৌলিক গ্রন্থগুলো গভীরভাবে বুঝতে অনন্য দক্ষ করে তোলে। নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দুয়ার খোলার পর প্রথম সারির শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁর এই কঠিন তালিম সম্পন্ন হয়েছিল এমন এক রক্ষণশীল কাঠামোর অধীনে, যেখানে ইবনে আবী যায়েদ আল কায়রাওয়ানীর মতো মহান মালেকী ইমামদের মূল কিতাবে পূর্ণ পাণ্ডিত্য অর্জনকেই সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া হতো। স্বাধীনতার পর মরক্কোয় যখন ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবল জোয়ার চলছিল, তখন এসব বুনিয়াদী বিষয়ে তাঁর নিবিষ্টতা ছিল ইসলামের প্রাচীন শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ন রাখার এক নীরব ও পবিত্র সংগ্রাম।
ইলমি জীবন ও প্রাতিষ্ঠানিক খিদমত
১. ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনন্য অবস্থান
বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদের ধর্মীয় সংস্কারের সময়ে ২০০০ সালের শুরুর দিকে তাঁর এই ঐতিহাসিক নিয়োগ জাতীয় ধর্মীয় নীতিনির্ধারণে নারী আলেমাদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
এই উচ্চ উলামা কাউন্সিলের ভেতরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ইফতা কমিশনের (ফতোয়া কমিটি) একমাত্র নারী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সমকালীন নানা ধর্মীয় জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়া এবং ইসলামের নামে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তি ও গোঁড়ামি দূর করে একটি সহনশীল ও উদার সমাজ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর মূল খিদমত। আল কারাওয়্যিনে অর্জিত প্রখর জ্ঞানকে পুঁজি করে তিনি ঐতিহ্যবাহী মালেকী ফিকহের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আধুনিক জীবনের জটিল সমস্যার সমাধান ও সময়োপযোগী ব্যাখ্যা দিতেন।
২. রাজপরিবারে পাঠদান ও পথপ্রদর্শন
মরক্কোর উলামা সমাজের এক উজ্জ্বল মুকুট হিসেবে ফাতিমা আল কাব্বাজ স্বয়ং বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ ও তাঁর ভাইবোনদের ব্যক্তিগত উস্তাদ হিসেবে খিদমত করার দুর্লভ সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। তিনি রাজপরিবারের সদস্যদের ইসলামী আকীদা, আমল ও ফিকহের মূলনীতি গভীর যত্নে শেখাতেন। মরক্কোর রাজদরবারে ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে তাঁর প্রতি আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা কতটা উঁচু ছিল, এটি তারই অকাট্য প্রমাণ।
ষোলো সদস্যের এই উলামা কাউন্সিলে (মজলিস আল উলামা) প্রথম নারীকণ্ঠ হিসেবে তিনি নারীদের ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ আরও বাড়ানোর পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখেন। তাঁর স্পষ্ট মত ছিল, গ্রামাঞ্চলের নিরক্ষর ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের হৃদয়ে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিতে পুরুষদের চেয়ে নারীরা অনেক বেশি বিশ্বস্ত ও কার্যকর হতে পারেন। এই দর্শনের আলোকেই তিনি বাদশাহর এক অনন্য উদ্যোগে প্রাণ সঞ্চার করেন, যার লক্ষ্য ছিল নারীদেরকে মুরশিদাত হিসেবে গড়ে তোলা।
রাজধানী রাবাতের বিখ্যাত দার আল হাদীস আল হাসানিয়ায় পুরুষ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি পঞ্চাশজন নারীর জন্য যে বিশেষ পাঠ্যক্রম চালু হয়েছিল, তার নেপথ্য কারিগর ছিলেন আল কাব্বাজ। এই পাঠ্যক্রমে ইসলামের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব ও ভাষাশিক্ষার মতো বিষয় যুক্ত করা হয়েছিল, যাতে এই নারী গাইডরা প্রজ্ঞা ও সহনশীলতা নিয়ে সমাজে আলো ছড়াতে পারেন। চরমপন্থা ও উগ্রবাদের বিষবাষ্প রুখতে তিনি ধর্মীয় শিক্ষায় তাসাউফ বা সুফিবাদের উদার দর্শন অন্তর্ভুক্ত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন।
ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারে অবদান ও তাত্ত্বিক ওকালতি
১. লেখনী ও সমকালীন ব্যাখ্যা
ফাতিমা আল কাব্বাজ কাগজের পাতায় কিতাব লেখার চেয়ে মানুষের বাস্তব জীবনে ইলম ও আমলের আলো ছড়াতেই বেশি ভালোবাসতেন। তাই তাঁর প্রকাশিত লেখার সংখ্যা সীমিত। তবু ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর বিখ্যাত সংবাদপত্র আল আলমে প্রকাশিত তাঁর “রিমুভাল অব দ্য ভেইল অ্যান্ড ডিসেন্সি” (পর্দা ও শালীনতা) শীর্ষক নিবন্ধটি ছিল এক কালজয়ী তাত্ত্বিক অবদান।
পবিত্র কুরআনের দলিল ও শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছিলেন, ইসলাম নারীকে শালীনতা ও মার্জিত পোশাকের নির্দেশ দিলেও মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ ঢেকে রাখা বা কঠোর নেকাব পরাকে বাধ্যতামূলক করেনি। শালীনতার সীমার ভেতরে থেকেই একজন নারী সমাজের সর্বস্তরে ও কর্মক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে অংশ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন, এই ছিল তাঁর যুক্তি। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি মরক্কোর রক্ষণশীল সমাজে এমন আধুনিক ও শাস্ত্রসম্মত ব্যাখ্যা ছিল সাহসী এক পদক্ষেপ। সেই কারণেই নিবন্ধটি পরবর্তীতে উত্তর আফ্রিকার নারীবাদী ও সংস্কারবাদী সাহিত্য সংকলনগুলোতে বিশেষ মর্যাদার স্থান পায়।
২. শাস্ত্রীয় শিক্ষার পাহারাদার
ফাতিমা আল কাব্বাজ মরক্কোর প্রাচীন মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার বছরের শিক্ষাপদ্ধতিকে মনেপ্রাণে ধারণ করতেন। শৈশবে বালিকাদের কুরআন হিফযের ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র দার আল ফকীহার স্মৃতি বুকে নিয়ে তিনি আমৃত্যু ইলমে দ্বীনের সুরক্ষায় কাজ করে গেছেন। আধুনিক পশ্চিমা ধাঁচের পরীক্ষা বা সনদের চেয়ে তিনি আস্থা রাখতেন সুফি মাশায়েখদের কাছ থেকে সরাসরি ইজাজত (অনুমতি বা সনদ) নেওয়া এবং সিনাবাসিনা মুখস্থ করার সেই সনাতন ও রূহানী রীতিতে, যা রাসুলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত সরাসরি যুক্ত।
২০০৪ সালে সুপ্রিম উলামা কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর মরক্কোর আধুনিক শিক্ষানীতির জোয়ারেও তিনি এই প্রাচীন রেওয়ায়েতগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মজবুত প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর স্পষ্ট অবস্থান ছিল, রাষ্ট্রীয় আধুনিকায়নের নামে যেন দ্বীনের আসল গভীরতা হারিয়ে না যায়। তরুণ প্রজন্মের নারী গবেষকদের তিনি এমনভাবে দীক্ষা দিয়েছিলেন, যাতে তাঁরা পশ্চিমা ধ্যানধারণার ওপর নির্ভর না করে সরাসরি আরবি মূল কিতাব ও ক্লাসিক্যাল গ্রন্থ থেকে খাঁটি শরীয়তের জ্ঞান আহরণ করতে পারেন।
পরিশেষ ও চিরন্তন উত্তরাধিকার
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ফেজের আল কারাওয়িয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সুউচ্চ প্রাচীর পেরিয়ে ফাতিমা আল কাব্বাজের স্নাতক সম্পন্ন করা মরক্কোর ইতিহাসে কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। এটি ছিল পিতৃতান্ত্রিক জড়তা ও লিঙ্গবৈষম্যের রুদ্ধ দুয়ারে এক সজোর আঘাত। পুরুষশাসিত সেই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে একাকী লড়াই করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নারীর হৃদয় ও রূহও ইলমে দ্বীনের সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠার সমান যোগ্যতা রাখে।
বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ কর্তৃক সুপ্রিম উলামা কাউন্সিলে তাঁর ঐতিহাসিক অন্তর্ভুক্তি মরক্কোর ধর্মীয় ইতিহাসে নারীদের জন্য সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী আসনের দুয়ার চিরতরে খুলে দিয়েছে। তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা পরবর্তী প্রজন্মের বহু প্রখ্যাত নারী ইসলামী চিন্তাবিদের (যেমন ফরিদা জুমুরূদ) জন্য নূরানী আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। মরক্কোর আধুনিক মাদ্রাসা ও ধর্মতত্ত্বের অঙ্গনে নারীর যোগ্য নেতৃত্বকে তিনি এক স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত করেছেন।
কোনো ইটপাথরের স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে ওঠেনি, গণমাধ্যমের জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারেও তাঁর নাম বেশি শোনা যায়নি। তবুও মরক্কোর ধর্মীয় সংস্কারে, সুফি ঘরানার মুরশিদাত মডেলে এবং উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে ইসলামের উদার ও ভারসাম্যপূর্ণ বাণীর প্রতিটি স্পন্দনে ফাতিমা আল কাব্বাজের পবিত্র নাম এক অমর ও বরকতময় আলোকবর্তিকা হয়ে চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে।
সংকলক: সানজিদা তাসনিম
