শিশুরা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য অমূল্য ধন ও মহামূল্যবান আমানত। মুসলিম হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটি শিশু পবিত্র ও স্বতন্ত্র এক সত্তা, যে সম্মান, মর্যাদা ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার রাখে। শিশুরা ভালোবাসা পাওয়ার জন্য, স্নেহে আগলে রাখার জন্য এবং সুস্থ ও আনন্দময় পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাওয়ার জন্যই আমাদের কাছে আসে।
কিছু মানুষ মনে করেন, সন্তানকে মানুষ করতে হলে খুব কঠোর হতে হবে। শিশুর সামান্য ভুল, ছোটখাটো দুষ্টুমি কিংবা তুচ্ছ কোনো হোঁচটও তারা সহ্য করতে চান না। কঠোর শাসনের মাধ্যমে সব ভুল থেকে সন্তানকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এমন সংকীর্ণ ও কঠিন পরিবেশ অনেক সময় শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল এবং নিজের মতো করে পৃথিবীকে জানার ও আবিষ্কার করার সহজাত আগ্রহের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আবার কিছু মা বাবা মনে করেন, সন্তানকে বেশি আদর বা ভালোবাসা দেখালে সে নষ্ট হয়ে যাবে। এই আশঙ্কা থেকে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সন্তানের প্রতি আবেগ, স্নেহ ও ভালোবাসার প্রকাশ কমিয়ে দেন।
মহান রব্বুল আলামিনের দৃষ্টিতে প্রতিটি শিশুই মূল্যবান। তাই প্রতিটি শিশুরই ভালোবাসা, যত্ন, লালনপালন ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে, যাতে সে তার ভেতরে আল্লাহ প্রদত্ত সম্ভাবনাগুলো পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করতে পারে।
তাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তোলার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে শিক্ষা নিতে হবে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে। তিনি শুধু তাঁর কথার মাধ্যমে মানবজাতিকে পথনির্দেশনা দেননি, তাঁর প্রতিটি কাজও যুগে যুগে মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। ইতিহাসজুড়ে তিনিই মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ।
মুহাম্মদ (স.)-এর ব্যক্তিত্ব কোনো নির্দিষ্ট সময়, প্রজন্ম, জাতি, ধর্ম বা স্থানের জন্য সীমাবদ্ধ ছিলো না। বরং তিনি সময়ের সীমা অতিক্রম করে সমগ্র মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন বৈশ্বিক আদর্শ হয়ে আছেন।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَكْمَلِ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَأَلْطَفُهُمْ بِأَهْلِهِ
মুমিনদের মধ্যে ঈমানে সবচেয়ে পরিপূর্ণ সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর এবং যে তার পরিবারের প্রতি সবচেয়ে কোমল ও সদয়।(সুনানে তিরমিযি)
ইসলামে যেমন আমাদের উপর আমাদের মা বাবার অধিকার রয়েছে, তেমনি আমরা যখন মা বাবা হই, তখন আমাদের সন্তানদেরও আমাদের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রত্যেক মা বাবার যেসব গুণ অর্জনের চেষ্টা করা উচিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে আমরা তার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। সন্তানদের সঙ্গে তাঁর আচরণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি নিচে তুলে ধরা হলো।
শিশুদের প্রতি রাসূল (স.)-এর ভালোবাসা
প্রিয় নবীজির অফুরন্ত রহমত ও মমতার সবচেয়ে বড় অংশীদার সম্ভবত শিশুরাই। কারণ তিনি যখন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পৃথিবীতে আগমন করেন, তখন আরবের জাহেলী সমাজে শিশুদের, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের অবস্থা ছিলো অত্যন্ত করুণ। কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জা ও অপমানের বিষয় মনে করা হতো। নিষ্পাপ কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো হৃদয়বিদারক প্রথাও তখন সমাজে প্রচলিত ছিলো। অনেক শিশু বেড়ে উঠতো ভালোবাসা, স্নেহ ও মমতা থেকে বঞ্চিত হয়ে। রাসূল (স.) এসে এই অমানবিক প্রথা ও ভ্রান্ত মানসিকতার মূলোৎপাটন করেন। তিনি শিশুদের ফিরিয়ে দেন তাদের প্রাপ্য মর্যাদা, ভালোবাসা ও সম্মান। তাঁর শিক্ষা মানুষকে জানিয়ে দেয়, সন্তান কোনো বোঝা নয়; সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে অমূল্য আমানত, জীবনের সৌন্দর্য এবং রহমতের এক বিশেষ উপহার।
ঈমান, ইবাদত, আখলাক ও সামাজিক জীবনের অসংখ্য ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন সুন্দর ও কল্যাণকর আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তেমনি শিশুদের সঙ্গে আচরণ, তাদের শিক্ষা ও প্রতিপালন, তাদের মর্যাদা দেওয়া এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা প্রকাশের ক্ষেত্রেও রেখে গেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত।
একজন মুসলিম মা বাবা যেমন স্নেহভরে সন্তানকে চুমু দেন, তেমনি রাসূলও শিশুদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতেন।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমত হয়ে আগমন করা রাসূল (স.)-এর স্বভাবজাত দয়া ও মমতা ছিলো অতুলনীয়। শুধু নিজের সন্তান বা বংশধর নয়, সব শিশুর সঙ্গেই তাঁর আচরণ আমাদের জন্য আদর্শ। তিনি শিশুদের প্রায়ই চুমু দিতেন, বুকে জড়িয়ে নিতেন এবং তাদের প্রতি কোমল ভালোবাসা ও মমতা প্রকাশ করতেন।
শিশুদের সম্পর্কে একটি হাদিসে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন, আকরা ইবনে হাবিস রাসূলকে তাঁর প্রিয় নাতি হযরত হাসান (রা.)-কে চুমু দিতে দেখলেন। তখন আকরা বললেন, আমার দশটি সন্তান আছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু দিইনি।
তখন রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন,
إِنَّهُ مَنْ لاَ يَرْحَمْ لاَ يُرْحَمْ
যে অন্যের প্রতি রহম করে না, তাকেও কেউ রহম করে না!সহিহ মুসলিম)
তাই, নিজের ছোট্ট শিশুকে কোলে নেওয়া, বুকে জড়িয়ে রাখা সুন্নাহ।
রাসূল (স.) যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন মদিনার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি নারী পুরুষ সবাই তাঁর বরকতময় আগমনের অপেক্ষায় অধীর হয়ে ছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয় নবীকে স্বাগত জানাতে যে বিশাল জনসমুদ্র সারিবদ্ধ হয়েছিল, তাদের মধ্যে মদিনার শিশুরাও ছিলো। আনন্দে তারা গান গাইতে শুরু করলো, প্রিয় নবীর প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠলো।
একদিন নবীজির প্রিয় দুই নাতি হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন (রা.) তাঁর কাছে একটি উট চাইলেন। তারা ভাবলেন, দাদাজানের কাছে বললে নিশ্চয়ই তিনি তাদের জন্য একটি উটের ব্যবস্থা করে দেবেন। কিন্তু সে সময় তিনি (স.)-এর আর্থিক সামর্থ্য এমন ছিলো না যে তিনি শিশুদের জন্য একটি উট কিনে দিতে পারেন। তবু তিনি তাদের আবদারকে অবহেলা করলেন না। তাদের মনও ভাঙতে চাইলেন না। তিনি এমন একটি উপায় বের করলেন, যাতে শিশুরা কষ্ট না পায়, আবার তাদের উট পাওয়ার ইচ্ছাটিও আনন্দের মধ্যে ভুলে যায়।
রাসূল (স.) তাঁর ছোট্ট দুই নাতির সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তারপর স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন, এসো, চড়ে বসো। এর চেয়ে ভালো উট আর কোথায় পাবে? শিশুরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাদের প্রিয় দাদাজানের পিঠে উঠে বসলো। মুহূর্তের মধ্যেই তারা আসল উটের কথা ভুলে গেল। তাদের কাছে তখন সবচেয়ে আনন্দের বাহন হয়ে উঠেছিলেন তাদের প্রিয় নানাজান।
একবার রাসূলকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তিনি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, হাসান ও হুসাইন এরপর তিনি তাদের ডেকে আনতে বললেন, কাছে টেনে নিলেন এবং চুমু দিলেন।
একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের সঙ্গে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাঁর প্রিয় নাতি হযরত হুসাইন (রা.)-কে রাস্তায় খেলতে দেখলেন। নবীজি তার দিকে দুহাত প্রসারিত করলেন। কিন্তু ছোট্ট হুসাইন খেলাচ্ছলে দৌড়ে পালাতে লাগলো। নবীজিও তার পেছনে গেলেন, তাকে ধরে ফেললেন, বুকে জড়িয়ে নিলেন এবং যেখানে ধরেছিলেন সেখানেই স্নেহভরে চুমু দিলেন।
অত্যন্ত ব্যস্ত জীবনযাপন করা সত্ত্বেও আল্লাহর রাসূল শিশুদের জীবনের ছোট ছোট বিষয়েও আন্তরিক আগ্রহ দেখাতেন। তিনি শিশুদের সুগন্ধি তুলসী বা সুবাসিত ফুলের সঙ্গে তুলনা করতেন এবং বলতেন, শিশুর ঘ্রাণ জান্নাতের ঘ্রাণ।তিনি শিশুদের চুমু দিতেন, বুকে জড়িয়ে নিতেন এবং স্নেহভরে আদর করতেন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ছোট্ট আবু উমাইরের পোষা পাখিটি মারা গেলে নবীজি নিজে বিশেষভাবে তার মন ভালো করার চেষ্টা করেছিলেন। হাদীসে এসেছে-
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَدْخُلُ عَلَيْنَا وَلِي أَخٌ صَغِيرٌ يُكْنَى أَبَا عُمَيْرٍ وَكَانَ لَهُ نُغَرٌ يَلْعَبُ بِهِ فَمَاتَ فَدَخَلَ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ يَوْمٍ فَرَآهُ حَزِينًا فَقَالَ مَا شَأْنُهُ. قَالُوا مَاتَ نُغَرُهُ فَقَالَ يَا أَبَا عُمَيْرٍ مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন,
রাসুলুল্লাহ (স.) আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমার একটি ছোট ভাই ছিলো, যার কুনিয়াত ছিলো আবু উমাইর। তার একটি ছোট পাখি ছিলো, যেটি নিয়ে সে খেলতো। একদিন পাখিটি মারা গেলো। পরে একদিন নবী এসে তাকে বিষণ্ন অবস্থায় দেখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ওর কী হয়েছে?লোকেরা বললো, তার পাখিটি মারা গেছে।&তখন তিনি বললেন, হে আবু উমাইর, তোমার ছোট্ট পাখিটির কী হলো ? (সুনান আবু দাউদ)
এই হাদিসে আমরা দেখতে পাই, নবী স্বয়ং একটি শিশুর কষ্ট লাঘব করার জন্য নিজে এগিয়ে যাচ্ছেন। অথচ অনেক বড় মানুষের চোখে এমন ঘটনা খুব তুচ্ছ বলেই মনে হতে পারে।
শিশুর দুঃখকে গুরুত্ব দেওয়া, তার অনুভূতিকে সত্য বলে স্বীকার করা এবং তার পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে তার সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়, খোলামেলা কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং সে অনুভব করে যে তার অনুভূতিরও মূল্য আছে।
বর্তমান সময়ে অনেক মা বাবা সন্তানদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাই যতটুকু সময়ই সন্তানদের সঙ্গে কাটানো হোক, সেই সময়টুকু যেন সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন হয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হৃদয় থেকে আনন্দময় খেলাধুলা এবং ভালোবাসাময় কথোপকথনের সমন্বয় শিশুর মনে নিরাপত্তা ও প্রশান্তি সৃষ্টি করে। এর ফলে তার আবেগীয় বিকাশও সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
শিশুদের প্রতি রাসূল (স.)-এর ধৈর্য
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (স.) সবসময় শিশুদের মসজিদে আসতে স্বাগত জানাতেন, যদিও শিশুরা অনেক সময় সেখানে শব্দ করত কিংবা কিছুটা ব্যাঘাত সৃষ্টি করতো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন,
এক রাতে রাসূল (স.) মাগরিব অথবা এশার নামাজে আমাদের ইমামতি করার জন্য বের হলেন। তাঁর কোলে ছিলেন হাসান। তিনি সামনে এসে শিশুটিকে নিচে নামিয়ে রাখলেন। এরপর আল্লাহু আকবার বলে নামাজ শুরু করলেন। নামাজের এক পর্যায়ে তিনি সিজদায় গেলেন এবং সিজদা দীর্ঘ করলেন। আমার পিতা বলেন, আমি মাথা তুলে দেখলাম, আমাদের নবী সিজদায় আছেন এবং শিশুটি তাঁর পিঠের ওপর বসে আছে। আমি আবার সিজদায় ফিরে গেলাম। নামাজ শেষ হওয়ার পর সাহাবীরা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, নামাজে আপনি এত দীর্ঘ সময় সিজদায় ছিলেন যে আমরা ভেবেছিলাম কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটেছে অথবা আপনার কাছে ওহি নাজিল হচ্ছে। তিনি বললেন, এমন কিছুই ঘটেনি। হাসান আমার পিঠে উঠেছিল। সে নিজের ইচ্ছায় নেমে না আসা পর্যন্ত আমি তাকে বিরক্ত করতে চাইনি।(সুনানে নাসাঈ)
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন,
একটি শিশুকে রাসূল (স.)-এর কাছে তাহনিক করানোর জন্য আনা হলো। অর্থাৎ খেজুর চিবিয়ে শিশুর মুখে দেওয়ার জন্য। শিশুটি নবীজির ওপর প্রস্রাব করে দিলো। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রস্রাব লাগা স্থানে পানি ঢেলে দিলেন। (সহিহ বুখারী)
শিশুটি তাঁর কাপড়ে প্রস্রাব করে দেওয়ার পরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো বিরক্তি বা ঘৃণা প্রকাশ করেননি। এ ঘটনা নবজাতকের স্বাভাবিক আচরণের প্রতি তাঁর অসাধারণ সহনশীলতার পরিচয় বহন করে। কারণ ছোট শিশুর বারবার প্রস্রাব করা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
এসব কারণে আমাদের কাপড়, আসবাবপত্র কিংবা ঘরের কোনো কিছু নোংরা হলেও বিরক্ত হওয়া উচিত নয়। বরং পরিষ্কার করার কাজে সাহায্য করা উচিত এবং এমন কাজকে কখনো নিজের সামাজিক মর্যাদার নিচে মনে করা উচিত নয়।
শিশু যখন একটু বড় হয়, হাঁটতে শুরু করে, দৌড়ঝাঁপ করে এবং প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে, তখন আমাদের ধৈর্য ও বোঝাপড়ার মাত্রাও আরও বাড়াতে হয়। কারণ সে জীবনের নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
আমাদের প্রিয় নবী শিশুদের মসজিদের সঙ্গে পরিচিত করাতে, তাদের কাছে টেনে নিতে এবং তাদের সঙ্গে নিয়ে ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করতে সবসময় উৎসাহিত করেছেন। রাসূল (স.) বলেছেন, তিনি নামাজের মধ্যে কোনো শিশুর কান্না শুনলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করে দিতেন। কারণ তিনি চাইতেন না শিশুটির মা কষ্টে পড়ুক। আমরা তো সেই মহান নবীর উম্মত, যিনি তাঁর নাতনি উমামা বিনতে যায়নাব রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কাঁধে নিয়েও নামাজ আদায় করেছেন। দাঁড়ানো অবস্থায় তিনি শিশুটিকে কোলে বা কাঁধে রাখতেন, রুকু ও সিজদায় যাওয়ার সময় তাকে নিচে নামিয়ে দিতেন, আবার দাঁড়ালে সস্নেহে তুলে নিতেন। এভাবেই তিনি জামাতে নামাজ আদায় করেছেন।
শিশুদের প্রতি তিনি এতটাই কোমল ছিলেন। এতটাই গভীর ছিলো শিশুদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা। শিশুদের ছোট ছোট ভুল তিনি সহ্য করতেন এবং ক্ষমা করে দিতেন। তিনি তাদের সঙ্গে খেলতেন, নিজের উটের পিঠে চড়াতেন এবং পরে তাদের খেজুর খেতে দিতেন। তিনি জানতেন, ছোট শিশুরা কৌতূহলী হয়। নতুন নতুন জিনিস দেখার ও জানার প্রবল আগ্রহ তাদের মধ্যে থাকে। শিশুদের স্বাভাবিক আচরণের ব্যাপারে আমাদের পয়গাম্বর কতটা সহনশীল ছিলেন, তার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) যখন কিশোর বয়সে ছিলেন, তখন তিনি (স.)-এর খেদমত করার সৌভাগ্য লাভ করেন। হযরত আনাস কাছ থেকেই বর্ণিত হয়েছে, তিনি দশ বছর নবীজির খেদমত করেছেন, অথচ এই দীর্ঘ সময়ে মুহাম্মদ (স.) কোনো দিন তাঁর প্রতি অধৈর্যতার একটি কথাও বলেননি এবং কখনো তাঁকে তিরস্কারও করেননি। হযরত আনাস (রা.) বলেন,
خَدَمْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم عَشْرَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِي أُفٍّ. وَلاَ لِمَ صَنَعْتَ وَلاَ أَلاَّ صَنَعْتَ
আমি দশ বছর নবী (স.)-এর খেদমত করেছি। তিনি কোনো দিন আমাকে উফ পর্যন্ত বলেননি। কোনো কাজ করলে কখনো বলেননি, তুমি এটা কেন করলে?আবার কোনো কাজ না করলে বলেননি, তুমি এটা কেন করলে না? (সহিহ বুখারী)
একটি শিশু যখন একটু বড় হয়ে ছয় বা সাত বছরের ঊর্ধ্বে পৌঁছে, তখন ধীরে ধীরে ভালো মন্দ এবং সঠিক ভুলের পার্থক্য বুঝতে শুরু করে। রাসূল (স.) যখন কোনো শিশুকে ভুলভাবে কোনো কাজ করতে দেখতেন, তখন খুব কোমল কণ্ঠে তাকে সংশোধন করতেন। কীভাবে সঠিকভাবে কাজটি করতে হবে, তা বুঝিয়ে দিতেন। তিনি কঠোরভাবে ধমক দিতেন না এবং অন্যদের সামনে শিশুটিকে অপমানিতও করতেন না।
উমর ইবনে আবু সালামা (রা.) বলেন,
আমি তখন শিশু এবং (স.) তত্ত্বাবধানে ছিলাম। খাবারের পাত্রের বিভিন্ন দিকে আমার হাত ঘুরে বেড়াত। তখন তিনি আমাকে বললেন, হে বৎস, আল্লাহর নাম নাও, অর্থাৎ বিসমিল্লাহ বলো। ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনে থেকে খাও। (সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম)
শিশুদের অসুস্থতাতেও রাসূল (স.) গভীরভাবে খোঁজ নিতেন, দেখতে যেতেন এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসার পরামর্শ দিতেন। শিশুদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা বোঝাতে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়।
একবার উসামা (রা.) দরজার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। তার মুখে আঘাত লাগে এবং রক্ত বের হতে থাকে। রাসূল (স.) নিজ হাতে তার মুখের রক্ত পরিষ্কার করে দেন এবং তার ক্ষতের যত্ন নেন।
তিনি শুধু মুসলিম শিশুদেরই নয়, অমুসলিম শিশুদেরও অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যেতেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন, একবার এক ইহুদি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে নবীজি তাকে দেখতে যান। সেই সাক্ষাতের প্রভাবে শিশুটি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে।
আপ্যায়ন মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বাড়ায়। বিশেষ করে শিশুদের সামান্য কিছু খেতে দেওয়া কিংবা ছোট কোনো উপহার দেওয়া তাদের মন দ্রুত জয় করে নেয় এবং বড়দের প্রতি তাদের ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়। হযরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত একটি বক্তব্যে এ বিষয়টি সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিবেশীর কোনো শিশু তোমাদের ঘরে এলে তাকে কিছু খেতে দাও। কারণ এতে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।
এছাড়া তিনি বলেছেন, তোমাদের সন্তানদের যথাযথভাবে আপ্যায়ন করো এবং তাদের উত্তমভাবে শিক্ষা দাও।
এ থেকে বোঝা যায়, শিশুকে সম্মান ও ভালোবাসার সঙ্গে আপ্যায়ন করা এবং সুন্দরভাবে মানুষ করে তোলার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বছরের প্রথম ফল তার কাছে এলে তিনি প্রথমে বরকতের জন্য দোয়া করতেন। এরপর সেখানে উপস্থিত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট শিশুটিকে ডেকে সেই ফল তার হাতে তুলে দিতেন।
আমাদের রাসূল শিশুদের সঙ্গে যে ভালোবাসাপূর্ণ ও কোমল আচরণ করতেন, তা নিয়মিত পড়া ও অধ্যয়ন করা আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এর মাধ্যমে আমরা এমন আচরণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি, যা আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট করে দিতে পারে।
নিজের সন্তানদের জন্য দোয়া করাও নববী পদ্ধতির একটি অংশ। বর্ণিত হয়েছে, সন্তানের জন্য মা বাবার দোয়া আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রত্যাখ্যাত হয় না। এবং শিশুদের সুশিক্ষা ও উত্তম চরিত্র গঠনের গুরুত্ব বোঝাতে রাসূল (স.) বলেছেন,কোনো পিতা তার সন্তানকে উত্তম আদব ও সুন্দর চরিত্রের চেয়ে মূল্যবান কোনো উপহার দিতে পারে না।
- অর্থাৎ সন্তানকে সম্পদ দিয়ে যাওয়া বড় কথা নয়, তার ভেতরে ঈমান, আদব, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং আল্লাহভীতির আলো জ্বালিয়ে দেওয়াই মা-বাবার সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার।
- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের সন্তানদের ভালোবাসতে হবে। কারণ ছোট্ট শিশুরা পৃথিবীর অন্য যেকোনো ভাষার চেয়ে ভালোবাসার ভাষাই সবচেয়ে সহজে বুঝতে পারে।
তরুণদের প্রতি মুহাম্মদ (স.)-এর আস্থা
হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) যখন ছোট ছিলেন, রাসূল তাঁর সঙ্গে খেলতেন। পরে আনুমানিক সতেরো বছর বয়সে মদিনার প্রতিরক্ষা বাহিনীর নেতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তার হাতে অর্পণ করেন। বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে এত বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো। শুধু তাই নয়, উসামার অল্প বয়সের কারণে কেউ যেন তার নেতৃত্বের সমালোচনা না করে, সে ব্যাপারেও রাসূল সকলকে সতর্ক করেছিলেন।
একটি হাদিসে এসেছে,
إِنْ تَطْعُنُوا فِي إِمَارَتِهِ فَقَدْ كُنْتُمْ تَطْعُنُونَ فِي إِمَارَةِ أَبِيهِ مِنْ قَبْلُ، وَايْمُ اللَّهِ، إِنْ كَانَ لَخَلِيقًا لِلإِمَارَةِ، وَإِنْ كَانَ لَمِنْ أَحَبِّ النَّاسِ إِلَىَّ، وَإِنَّ هَذَا لَمِنْ أَحَبِّ النَّاسِ إِلَىَّ بَعْدَهُ
তোমরা যদি উসামার নেতৃত্বের সমালোচনা করো, তবে এর আগেও তোমরা তার পিতার নেতৃত্বের সমালোচনা করেছিলে। আল্লাহর কসম, তার পিতা নেতৃত্বের যোগ্য ছিলো এবং সে ছিলো আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষদের একজন। আর তার পরে এই উসামাও আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষদের একজন। (সহিহ বুখারী)
মা বাবার উচিত সন্তানদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের ওপর আস্থা রাখতে ভয় না পাওয়া। একটি শিশু চায় তার ওপর বিশ্বাস রাখা হোক। মা বাবা যদি তাকে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কিছু ক্ষেত্রে অংশ নিতে দেন, তাহলে সেই আস্থার অনুভূতি আরও শক্তিশালী হয়। সন্তানের মতামত জানতে চাওয়া এবং পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করলে সে অনুভব করে যে, সে পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এ ধরনের আচরণ পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করে।
আমর ইবনে সালামা ছোটবেলা থেকেই জ্ঞান অর্জন করতে খুব ভালোবাসতেন। শহরে যেসব সাহাবি আসতেন, তাদের কাছ থেকে তিনি কোরআন শিখতেন। ধীরে ধীরে তার ছোট্ট হৃদয়ে রাসূল (স.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্ম নেয়। একসময় তার গোত্রের লোকেরা একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে রাসূল (স.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলোচনা করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। ছোট্ট আমরও সেই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে গেলেন। তার গোত্রের লোকেরা রাসূল (স.)-এর সামনে উপস্থিত হলো। নবীজি তাদের সঙ্গে কথা বললেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করলেন। তাদের গোত্রের জন্য একজন ইমাম নির্বাচন করা প্রয়োজন ছিলো। কাকে ইমাম করা হবে, এর প্রধান মানদণ্ড ছিলো কে সবচেয়ে ভালো ও বেশি কোরআন জানে। সেখানে বয়স, সামাজিক মর্যাদা কিংবা বাহ্যিক অবস্থার চেয়ে কোরআনের জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া হলো।
রাসূল (স.) দেখলেন, তাদের মধ্যে ছোট্ট আমর ইবনে সালামাই সবচেয়ে বেশি কোরআন জানেন। তাই তিনি আমর ইবনে সালামাকেই তাদের ইমাম হিসেবে নির্বাচন করলেন। নবীজি যখন তাকে তার গোত্রের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব দেন, তখন আমরের বয়স ছিল মাত্র আট বছর।
একটি শিশুর জ্ঞান, যোগ্যতা ও ব্যক্তিত্বকে কতটা সম্মান দিলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, এই ঘটনাটি তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের শুধু ভালোবাসতেন না, তাদের ভেতরে যে যোগ্যতা ও সম্ভাবনা ছিলো, সেটিকেও চিনতেন, সম্মান করতেন এবং যথাযথ জায়গায় তার মূল্য দিতেন। মানুষ আল্লাহ তায়ালার এক অপূর্ব সৃষ্টি। মহান আল্লাহ মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। শারীরিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আত্মিক গুণ, চরিত্র ও নৈতিকতার দিক থেকেও মানুষকে এমন সামর্থ্য দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সে পূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারে। তবে এত সুন্দর ও পরিপূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ বাস্তব জীবনে সেই পূর্ণতা অর্জন করতে পারবে কি-না, তার পেছনে মা বাবা, বন্ধু, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং আরও অনেক বিষয়ের গভীর প্রভাব থাকে। এ কারণেই মানুষের জীবনে শৈশবকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জীবনের বহু অভ্যাস, মূল্যবোধ, অনুভূতি ও আচরণের ভিত্তি মানুষ ছোটবেলাতেই অর্জন করে।
কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর প্রতি রাসূল (স.)-এর গভীর সম্মান
কনিষ্ঠ কন্যা হযরত ফাতিমা যখন তাঁর বাবার কাছে আসতেন, রাসূল (স. ) তাকে স্বাগত জানাতে উঠে দাঁড়াতেন, তাঁর হাত ধরতেন, তাঁকে চুমু দিতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাঁকে বসাতেন। আবার মা ফাতিমা ঠিক একইভাবে বাবাকে সম্মান করতেন।
এই কাজগুলো বাহ্যত খুব সাধারণ হলেও এর মধ্যে বাবা ও মেয়ের গভীর ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মানের অপূর্ব প্রকাশ রয়েছে। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন,
ما رأيتُ أحدًا كانَ أشبَه سمتًا وَهديًا ودلًّا برسولِ اللَّهِ صلَّى اللَّهُ عليهِ وسلَّمَ من فاطمةَ كانت إذا دخلت عليهِ قامَ إليها فأخذَ بيدِها وقبَّلَها وأجلسَها في مجلسِه وَكانَ إذا دخلَ عليها قامت فأخذت بيدِه فقبَّلتهُ وأجلستهُ في مجلسِها
আচার-আচরণ, চলাফেরা ও শিষ্টাচারের দিক থেকে রাসূলের সঙ্গে ফাতিমার চেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ কাউকে আমি দেখিনি। নবী যখন ফাতিমাকে আসতে দেখতেন, তখন তাঁর জন্য উঠে দাঁড়াতেন, তাঁর হাত ধরতেন, তাঁকে চুমু দিতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন। আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর কাছে যেতেন, তখন ফাতিমাও উঠে দাঁড়াতেন, তাঁর হাত ধরতেন, তাঁকে চুমু দিতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন। (সুনানে তিরমিযি)
নিজের সন্তানকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সম্মান মানে শুধু ভালোভাবে কথা বলা নয়। সন্তানের ব্যক্তিগত গোপন কথা গোপন রাখা, তার বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করা এবং অন্যদের সামনে তাকে অপমান না করাও সম্মানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সন্তানদের প্রতি সমানভাবে আচরণ করার উপর গুরুত্বারোপ
রাসূল (স.) মা বাবাকে সন্তানদের সঙ্গে সমান ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক পরিবারে একটি সাধারণ সমস্যা হলো এক সন্তানকে অন্য সন্তানের তুলনায় বেশি প্রাধান্য দেওয়া। রাসূল (স.) সন্তানদের ক্ষেত্রে ন্যায় ও সমতার নির্দেশ দিয়েছেন।
হযরত নুমান (রা.) থেকে বর্ণিত, তার পিতা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল (স.)-এর কাছে এলেন। তিনি তার ছেলেকে একটি উপহার দিয়েছিলেন এবং চেয়েছিলেন নবীজি এর সাক্ষী হোন। নবীজি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি তোমার সব সন্তানকে এরকম উপহার দিয়েছ?
তিনি বললেন, না।
তখন নবীজি বললেন, আমি এমন কিছুর সাক্ষী হবো না। তুমি কি পছন্দ করবে না যে, তোমার সব সন্তান তোমার সঙ্গে সমানভাবে সদ্ব্যবহার করুক?
তিনি বললেন, অবশ্যই।
নবীজি বললেন, তাহলে এভাবে করো না। (সুনানে নাসাঈ)
এক সন্তানকে সবসময় প্রশংসা করা, সন্তানদের পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করা, কন্যার তুলনায় পুত্রসন্তানকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া কিংবা একজনকে প্রচুর উপহার দিয়ে অন্যজনকে বঞ্চিত করা, এসব সমস্যা আজও অনেক পরিবারে দেখা যায়। এ ধরনের আচরণ যেকোনো মূল্যে এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ এর ফলে একটি শিশুর আত্মসম্মানবোধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ধীরে ধীরে তার মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি হতে পারে। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পুরো জীবন দিয়েই দেখিয়েছেন, ভালোবাসা দিয়েই মানুষের হৃদয়ে সবচেয়ে স্থায়ী পরিবর্তন আনা যায়।
এতিমদের প্রতি রাসূল (স.)-এর মমতা
শিশুদের প্রতি রাসূল (স.)-এর ভালোবাসা কত গভীর ছিলো, তা বুঝতে হলে আমাদের সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। তিনি শুধু অবহেলিত শিশুদের মর্যাদাই ফিরিয়ে দেননি, বরং তাদের সর্বোত্তমভাবে লালনপালন ও মানুষ করে তোলার গুরুত্বও বারবার তুলে ধরেছেন এবং নিজের জীবনে তা বাস্তবভাবে দেখিয়েছেন।
আমাদের প্রিয় নবীজি এতিম শিশুদের যত্ন নিতেন এবং তাঁর সাহাবীদেরও তাদের রক্ষা করতে ও সুন্দরভাবে আচরণ করতে বলতেন। এতিমের যত্ন নেওয়ার যে অসাধারণ মর্যাদা ও প্রতিদান রয়েছে, তাও তিনি মানুষকে বুঝিয়েছেন।
ইমাম বুখারি বর্ণনা করেছেন, রাসূলে পাক (স.) বলেছেন- আমি এবং এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এভাবে একসঙ্গে থাকব। এ কথা বলে তিনি নিজের তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি মিলিয়ে দেখালেন।
ইবনে মাজাহতে হযরত আবু হুরাইরা (রা.)-এর সূত্রে আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (স.) বলেছেন- মুসলিমদের মধ্যে সেই ঘরটি সর্বোত্তম, যেখানে কোনো এতিমের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা হয়। আর মুসলিমদের মধ্যে সেই ঘরটি সবচেয়ে নিকৃষ্ট, যেখানে কোনো এতিমের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়।
এই নববী হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে দেখায়, এতিম শিশুর যথাযথ যত্ন নেওয়ার মর্যাদা কত উচ্চ এবং তার জন্য জান্নাতের কত বড় সুসংবাদ রয়েছে।
শেষ কথা
শিশুরা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক অপূর্ব উপহার। তাদের উপস্থিতি মানুষের হৃদয়ে আনন্দ আনে, পরিবারে প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয় এবং আশপাশের মানুষের জীবনে বরকতের সুবাস ছড়িয়ে দেয়। এই কোমল প্রাণগুলোকে সুন্দর, উপকারী ও সমাজের কল্যাণে অবদান রাখতে সক্ষম মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন বিশেষ মনোযোগ, গভীর মমতা এবং সর্বোচ্চ যত্ন।
আজ আমাদেরও নিজেদের কাছে প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন, আমাদের সন্তানরা কি আমাদের আচরণের মধ্যে নবীজির মমতা দেখতে পায়? তারা কি আমাদের কাছ থেকে দ্বীনকে ভালোবাসতে শিখছে, নাকি শুধু ভয় করতে শিখছে? তারা কি আমাদের ঘরে সম্মান, কোমলতা, ক্ষমা ও ভালোবাসার পরিবেশ পাচ্ছে? আজ আমরা কতজনই বা এমন শিশুর প্রতি এতটা সহনশীল হতে পারি, যে একেবারেই শিশুসুলভ কোনো আচরণ করে বসেছে? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, এমন অবস্থায় আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
আমাদের কোনো শিশু যদি মজা করে বা অনুকরণ করতে গিয়ে আজানের শব্দ উচ্চারণ করে, তখন আমরা তাকে কী বলবো? আমাদের কাছে দ্বীনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যদি সে নিছক শিশুসুলভ আচরণ করে, তাহলে তাকে ভয় দেখানোর জন্য আমরা কী কী বলে বসবো? কতটা কঠোর ভাষায় তাকে ধমক দেবো? কতটা তীব্রভাবে তার আচরণের নিন্দা করবো?
অথচ শিশু তো শিশু। তার আচরণের পেছনে সবসময় অবজ্ঞা বা অসম্মান থাকে না। অনেক সময় থাকে কৌতূহল, অনুকরণ, খেলা আর নিষ্পাপ শিশুমন।
একবার আমরা নিজেদের দিকেও তাকিয়ে দেখি। আমাদের সন্তানদের সঙ্গে আমরা কতজন এমন সুন্দর, কোমল ও আস্থাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি? সম্ভবত এ কারণেই আমরা বলতে পারি, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী শিশুদের মধ্যে ছিলেন সেই সৌভাগ্যবান শিশুরা, যারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে বেঁচে ছিলো।
আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যিনি সর্বোত্তম আদর্শ, সেই প্রিয় নবী মুহাম্মদের সঙ্গে মদিনার অলিগলিতে বেড়ে ওঠা ছোট্ট শিশুদের কিছু স্মৃতি যেন আজও আমাদের হৃদয়ে কথা বলে।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) কোনো কঠোর পদ্ধতিকে গ্রহণ করেননি। কারণ তিনি জানতেন, প্রতিটি শিশুরই ভালোবাসা অনুভব করার গভীর মানসিক প্রয়োজন রয়েছে। অত্যন্ত ব্যস্ত জীবন থাকা সত্ত্বেও তিনি শিশুদের প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য সময় বের করতেন। এর মধ্যেও আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। জীবনে যত ব্যস্ততাই থাকুক, সন্তানের যত্ন নেওয়া এবং তাকে ভালোবাসা অনুভব করানো সম্ভব।
রাসূল (স.) আমাদের শিখিয়েছেন, কীভাবে শিশুদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতে হয়, কীভাবে তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয় এবং সন্তান নামক আল্লাহর এই মূল্যবান উপহার আমাদের জীবনে থাকার আনন্দ কীভাবে প্রকাশ করতে হয়।
এখন আমাদের দায়িত্ব হলো, সন্তানদের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়ন করা। যে সন্তানরা আল্লাহর অনুগত হয়, মা বাবার প্রতি সদাচারী হয় এবং নিয়মিত তাদের জন্য দোয়া করে, তারাই এই পৃথিবীতে রেখে যাওয়া আমাদের অমূল্য রত্ন। তারাই প্রকৃত বিনিয়োগ, যা আমরা দুনিয়ায় করি, কিন্তু যার ফল আমরা আখিরাতে লাভ করার আশা রাখি। আর আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
সাবিহা শুচি
