নারীর অধিকার নিয়ে বর্তমান আলোচনায় একটি শব্দ সবচেয়ে বেশি শোনা যায়: ‘সমতা‘। জাতিসংঘের CEDAW সনদ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি, সবখানে ধরে নেওয়া হয়, নারীর প্রতি অবিচারের মূল কারণ পুরুষের সঙ্গে তার অসমতা। এই ধারণা এত বদ্ধমূল যে প্রশ্ন তুলতেই অনেকে অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু ইসলামী চিন্তার আলোকে একটু থেমে ভাবলে একটি জরুরি প্রশ্ন সামনে আসে: আমরা কি গোড়া থেকেই ভুল প্রশ্নটি করছি?
মুসলিম সমাজে CEDAW নিয়ে বিতর্কে সাধারণত দুটি পক্ষ দেখা যায়। একপক্ষ সনদকে পুরোপুরি বা শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করতে চায় এবং ইসলামের সঙ্গে তার মিল দেখাতে ফিকহের নানা মত তুলে ধরে। অন্যপক্ষ ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে সনদ প্রত্যাখ্যান করে। বাইরে থেকে দুই পক্ষ পরস্পরের বিপরীত মনে হলেও তাদের মধ্যে একটি মিল আছে। দুই পক্ষই ফিকহের বাছাই করা অংশ হাতে নিয়ে তর্ক করছে, আর দুই পক্ষই বিতর্কটা চালাচ্ছে বৈশ্বিক আলোচনার বেঁধে দেওয়া সংকীর্ণ গণ্ডির ভেতরে।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। শরীয়ত আর ফিকহ এক জিনিস নয়। শরিয়াহ আল্লাহর দেওয়া অপরিবর্তনীয় বিধান, যা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর মাধ্যমে আমাদের কাছে এসেছে। ফিকহ সেই বিধান বোঝার মানবীয় প্রচেষ্টা। আক্ষরিক অর্থেই ফিকহ মানে “বোঝা”। অতীতের ফকিহরা নিজেরাই কখনো দাবি করেননি যে তাঁদের মতই একমাত্র সঠিক। অথচ আজ কোনো একটি মাযহাবের মতকে “শরীয়ত” বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, আর সেই মত রাষ্ট্রের সুবিধামতো বেছে নেওয়া হয়। তাই দেখা যায়, CEDAW-তে সংরক্ষণ রাখা দুটি দেশও একই ধারা একইভাবে বা একই কারণে প্রত্যাখ্যান করেনি। যে ব্যাখ্যা এত বিচিত্র, তাকে একমাত্র ইসলামী ব্যাখ্যা বলা যায় না।
আজকের ব্যক্তিগত আইনের অনেকটাই ফিকহ, স্থানীয় প্রথা আর উনিশ শতকের ইউরোপীয় ভিক্টোরীয় মূল্যবোধের এক জোড়াতালি। উপনিবেশের আমলে অনেক মুসলিম অঞ্চলে পরিবারে পুরুষের কর্তৃত্বই প্রাধান্য পেয়েছে, ইসলামের নির্ধারিত নারীর উত্তরাধিকার-অংশ অস্বীকার করা হয়েছে, পারিবারিক নির্যাতনকে সহ্য করা হয়েছে। পরবর্তীকালে স্বৈরাচারী শাসকরা ঐতিহ্যবাদী মহলের সঙ্গে রাজনৈতিক আপস করে সেই কঠোরতা পাকাপোক্ত করেছেন। অর্থাৎ নারীর অধস্তনতার যে চেহারা আমরা আজ দেখি, তাকে নির্ভেজাল ইসলামী বিধান বলা ইতিহাসের প্রতি অবিচার।
সমতা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি গভীর সমস্যা হলো, সে নারীকে দেখে একজন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হিসেবে, বাজারের ভোক্তা ও শ্রমশক্তি হিসেবে। এই চিন্তার শিকড় নব্য-উদারবাদী কাঠামোয়, যেখানে স্বাধীনতা আর স্বনির্ভরতাই চূড়ান্ত লক্ষ্য, আর পরিবার ও সমাজের বন্ধন গৌণ।
একটি উদাহরণ ভাবা যাক। কোনো কারখানার রাতের শিফটে নারীরা কাজ করতে ভয় পান, কারণ জায়গাটা অন্ধকার ও অনিরাপদ। সমতাবাদী সমাধান হলো আলো বাড়ানো আর যাতায়াতের ব্যবস্থা করা, যাতে নারীরাও পুরুষের মতো রাতে কাজ করতে পারেন। কথাটা ভুল নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। এখানে কেউ জিজ্ঞেস করে না, একজন নারীকে প্রতি রাতে ঘর ছেড়ে বেরোতে হচ্ছে কেন। কোন অর্থনৈতিক চাপ তাকে বিশ্রাম, স্বাস্থ্য আর সন্তানের পাশে থাকার সুযোগ বিসর্জন দিতে বাধ্য করছে। এই ব্যবস্থায় আসল লাভটা যায় কার ঘরে। আয়ের পথ খোলা রাখা জরুরি, তবে সেই পথে নারীকে ঠেলে দেওয়ার কারণটাই যদি অনালোচিত থেকে যায়, তাহলে “ক্ষমতায়ন” শব্দটা কেবল সুন্দর মোড়ক হয়ে থাকে।
পরিবারে সহিংসতার পরিসংখ্যানেও একই কথা। প্রতি ঘণ্টায় গড়ে পাঁচজনের বেশি নারী ও কন্যা নিজের পরিবারের কারও হাতে খুন হচ্ছেন, এ তথ্য বুক কাঁপিয়ে দেয়। কিন্তু এর পেছনে শুধু একজন অপরাধী আর একজন ভুক্তভোগীর গল্প নেই। আছে এমন এক পরিবার ও সমাজের গল্প, যারা মানবসম্পর্কের ভিত্তি যে রহমত, সেটাই হারিয়ে ফেলেছে। আইন ও শাস্তি জরুরি, কিন্তু যে সমাজে দায়িত্ব, দরদ আর পারস্পরিক নির্ভরতার বোধ ক্ষয়ে গেছে, সেখানে শুধু ফৌজদারি ব্যবস্থা এই ক্ষতের গভীরে পৌঁছাতে পারে না।
ইসলামে অবিচারের ধারণা “জুলম”, আর এর পরিসর ধর্মনিরপেক্ষ ধারণার চেয়ে বিস্তৃত। জুলমের মধ্যে আছে আত্ম-অবিচারও, যাকে বলে জুলমুন নফস। ফলে মূল প্রশ্ন শুধু এটা নয়, নারী পুরুষের মতো সুযোগ পাচ্ছে কি না। প্রশ্ন এটাও, কোন শক্তি তাকে অন্যায্য অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে, আর সেই অবস্থান তার মর্যাদা, পরিবার ও আত্মার কী ক্ষতি করছে।
এখানে অনেকে ভাবতে পারেন, তাহলে কি নারী-পুরুষের সমতা ইসলামে অস্বীকৃত? উত্তরটা এত সরল নয়।কুরআন সমতাকে ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা বানায়নি। সে বলে,
তাহলে মানুষ একে অপরের সঙ্গে আচরণ করবে কোন ভিত্তিতে? সূরা হুজুরাতে (৪৯:১১-১৩) আল্লাহ তা বলে দিয়েছেন। সেখানে সমতার নিশ্চয়তা নয়, বরং মূল্যের অজ্ঞতার কথা আছে। আল্লাহর কাছে কে উত্তম, তা আমরা জানি না। তাই কাউকে তুচ্ছ করা যাবে না, মন্দ ধারণা করা যাবে না, পেছনে নিন্দা করা যাবে না। আমরা সবাই একই উৎস থেকে এসেছি, আমাদের ভিন্নতা পরিচয়ের জন্য, বিভাজনের জন্য নয়। আর মর্যাদার মাপকাঠি একটাই–’তাকওয়া’।
এই দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। উভয়েই আল্লাহর বান্দা, উভয়ের জবাবদিহি তাঁরই কাছে, আর উভয়ের দায়িত্ব হলো ইলাহী দিকনির্দেশনার আলোয় একে অপরের মর্যাদা রক্ষা করা। এমন একটি পৃথিবী কল্পনা করা সম্ভব, যেখানে নারী ঠিক পুরুষের মতো সবকিছু করছে। কিন্তু তখনো প্রশ্ন থেকে যায়, এই প্রতিযোগিতামূলক, খণ্ডিত জীবনদৃষ্টিই কি নারী ও মানবতার জন্য সর্বোত্তম পথ?
ইসলামী দৃষ্টিতে নারীর ক্ষমতায়ন কোনো বাইরের হাত থেকে আসা উপহার নয়। এর তিনটি উৎস আছে, যা নারীর নিজের সত্তার ভেতরেই নিহিত।
প্রথম উৎস আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক। ওহি নারীকে সরাসরি স্রষ্টার সঙ্গে সংলাপের অবস্থানে রাখে। কুরআনে বর্ণিত তাকওয়াবান নারীরা, কেউ সাধারণ জীবনের, কেউ অসাধারণ, সবাই এই আস্থা নিয়েই ব্যক্তিগত ও জনজীবনের কঠিন পরিস্থিতি সামলেছেন। পরিস্থিতি তাঁদের সীমিত করেছে, কিন্তু নির্ধারণ করে দেয়নি। যে নারী জানেন তাঁর মর্যাদা আল্লাহর কাছ থেকে আসে, তাঁকে কোনো সমাজ বা বাজার সহজে ছোট করতে পারে না।
দ্বিতীয় উৎস নিকটজনের সঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরতা। রাষ্ট্রের কাছে হাত পাতার অনেক আগে একজন নারী তাঁর পরিবারের যত্ন পাওয়ার অধিকারী, যেমন তিনি নিজেও যত্ন করতে দায়বদ্ধ। “পুরুষ খরচ দেবে, বিনিময়ে নারী অধীন থাকবে”, এই ধারণা কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা। মারইয়াম (আ.)-এর জীবন দেখুন। আল্লাহ তাঁকে সুন্দরভাবে কবুল করলেন, সুস্থভাবে বড় করলেন। পরিবারের পুরুষদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে গেল কে তাঁর দায়িত্ব নেবে, কারণ এটি ছিল এক সম্মানের কাজ, যা যত্নদাতা ও যত্নগ্রহীতা উভয়কে আল্লাহর কাছে নিয়ে যায়। আর তিনি পেলেন বাধাহীন আত্মবিকাশের সুযোগ। সূরা নিসার “কিওয়ামা”-র (৪:৩৪) মর্মও এখানে: আল্লাহ পুরুষকে যা প্রাচুর্য দিয়েছেন, তা থেকে নারীর আসল প্রয়োজনে সাড়া দেওয়া, যাতে সে নিজের আকাঙ্ক্ষা ও আল্লাহর পথে এগিয়ে যেতে শক্তি পায়। কুরআন মুমিন নারী-পুরুষকে বলে একে অপরের অংশ, একে অপরের অভিভাবক ও বন্ধু, একে অপরের পোশাক। এ ভাষা প্রতিপক্ষের ভাষা নয়, আপনজনের ভাষা।
তৃতীয় উৎস সৃষ্টির বৃহৎ জালে নিজের অবস্থান বোঝা। নারী একা লড়াই করা কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নন। তিনি মানুষ, প্রাণী, গাছপালা, নদী, পাহাড়, সবকিছুর সঙ্গে সংযুক্ত। নারীর লিঙ্গভিত্তিক বিশেষ প্রয়োজন ও উদ্বেগ সম্পূর্ণ বৈধ, সেগুলো স্বীকার করাও জরুরি। তবু নারী, পুরুষের মতোই, একটি বিশাল সমগ্রের অংশ। এই বোধ থেকেই আসে সেই ভারসাম্য, যা একদিকে জীবনের স্থায়ী নৈতিক ভিত্তি রক্ষা করে, অন্যদিকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর নমনীয়তা দেয়।
এসব কথার অর্থ এই নয় যে CEDAW একেবারেই মূল্যহীন। অনেক নারীর জন্য বিশেষ পরিস্থিতিতে এটি সাময়িক স্বস্তি এনে দিতে পারে, আর সংলাপের একটি মঞ্চও তৈরি করে। কিন্তু এটি সর্বজনীন বা সর্বাঙ্গীণ সমাধান নয়, কারণ যে কাঠামো বদলাতে চায়, সে নিজেই সেই কাঠামোর ভাষায় কথা বলে।
বাস্তব পথ তাই কয়েকটি ধাপে ভাবা যায়।
- প্রথমত, রক্ষণশীলবাদ, আধুনিকতাবাদ ও নারীবাদ, এই তিনটি ফাঁদ থেকেই সতর্ক থাকতে হবে।
- দ্বিতীয়ত, ওহি থেকে শুরু করতে হবে, সূচনাবিন্দুতে রাখতে হবে উদ্দেশ্যকে: আল্লাহ কী চান, আমাদের এই সময়ের জন্য ওহির দিকনির্দেশনা কী, কীভাবে ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণ এগিয়ে নেওয়া যায়।
- তৃতীয়ত, গবেষণাভিত্তিক নীতি গড়তে হবে, যা নারীকে তার পরিবার ও সমাজের সঙ্গে জুড়ে দেখে, বিচ্ছিন্ন করে নয়।
- আর চতুর্থত, যে অবস্থান নারীকে পুরুষের চিরস্থায়ী প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে, তাকে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করতে পারে না। পুরুষকে সহায়ক, অংশীদার, বন্ধু, পুত্র ও প্রিয়জন হিসেবে না দেখলে নারীর অধিকার কোনো সমাজেই নিরাপদ হবে না।
আমাদের নতুন প্রজন্ম অর্থ খুঁজছে, সম্পর্ক খুঁজছে। যুদ্ধ, জীবিকা আর প্রকৃতির সংকটে উদ্বিগ্ন এই তরুণদের কাছে খণ্ডিত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জবাব যথেষ্ট নয়। ইসলামের সামনে সুযোগ আছে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার, যেখানে মানুষ আল্লাহর ওপর নিজের নির্ভরতা, একে অপরের ওপর পারস্পরিক নির্ভরতা এবং সমগ্র সৃষ্টির সঙ্গে নিজের সংযুক্তি অনুভব করে। এমন সমাজ গড়াই হতে পারে নারীর মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে টেকসই পথ, যে সমাজের ভিত্তি অধিকারের দাবির লড়াই নয়, রহমত।
সাবিহা শুচি
