(এই প্রবন্ধটি প্রফেসর ড. আসাদ জামান এর একটি সেমিনার সংকলন)
বিশ্বনবী মুস্তফা (স.) এর কাছে আল্লাহর প্রেরিত প্রথম ওহী আমাদের বলে যে, ইসলাম হলো জ্ঞানের ধর্ম। কারণ এই ওহীর প্রথম কথা— ইক্বরা, অর্থাৎ পড়ো। এবং পরের আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষকে সে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানতোনা। জ্ঞানের উপর গুরুত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম অনন্য। বলা হয়েছে জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও মূল্যবান। সুতরাং, ইসলাম জ্ঞানকে সবকিছুর কেন্দ্রে স্থাপন করেছে৷ তাহলে এখন প্রশ্ন হলো, আল্লাহ মানুষকে কোন জ্ঞান দান করেছেন? আল্লাহ নিজে বলেছেন যে, তিনি মানুষকে যতগুলো নেয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে জ্ঞান সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। তিনি আরও বলেছেন, “আল্লাহ এ কিতাবে সমস্ত কিছুর বর্ণনা দিয়েছেন এবং এ কিতাব হলো মুসলমানদের জন্য হেদায়াত ও রহমতস্বরুপ।” একইসাথে তিনি এটিও বলেন যে, “যারা ঈমান আনবে তাদেরকে তিনি অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসবেন।”
কীভাবে একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ করতে হয়, ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে সে শিক্ষাও দিয়েছেন এবং এর সামগ্রিক পন্থার (comprehensive approach) মধ্যে অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা এবং পরিবেশ সংক্রান্ত নীতিমালা; সবই অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং, “Islamic Economics is the information we receive from god about how to construct an economic system which creates just outcomes.”
“ইসলামী অর্থনীতি হলো একটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরীর জন্য আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান।” এটি এমন একটি সংজ্ঞা যা আজকের সময়ে বিদ্যমান কোন ইসলামী অর্থনীতির বইয়ে নেই।
এখন দেখা যাক, মানুষকে আল্লাহ প্রদত্ত এই জ্ঞানের প্রভাব কী ছিলো?
এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক সবচেয়ে সুন্দর যে কথাটি বলেছেন তা হলো, এটি একটি অন্ধকার দুনিয়াকে আলোকিত করেছে। মদীনার বেদুইনরা ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে পশ্চাদপদ এবং মূর্খ জাতি, ইসলামের আলো যাদেরকে দুনিয়ার নেতায় পরিণত করেছিলো। ইসলামী সভ্যতা গোটা পৃথিবীকে ১০০০ বছর এরও বেশি সময় ধরে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত রেখেছিলো। সুতরাং, এই জ্ঞান অত্যন্ত শক্তিশালী একটি জ্ঞান ছিলো।[1]
পরবর্তীতে দুনিয়াকে বদলে দেয়া এই জ্ঞানের সাথে কী হয়েছিলো? এটি কি তার সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলো? নাকি ১৪৪০ বছর পরে এখনো এর সেই বৈপ্লবিক ক্ষমতা বিদ্যমান আছে? উত্তর হলো, ১৪০০ বছর পর আজও আল্লাহ কর্তৃক মানুষকে প্রদত্ত সেই জ্ঞান একই রকম শক্তিশালী, একই রকম বৈপ্লবিক, যেমনটা শুরুতে ছিলো। আমাদের আজকের আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো এই ধারণাটিকে স্পষ্ট করে যাওয়া। অমুসলিমরা ইসলামী জ্ঞানের এই ক্ষমতাকে স্বীকার করে এবং তারা বলে থাকে যে, ইসলাম সেই সময়ের জন্য অসাধারণ ছিলো, কিন্তু আজকের সময়ের জন্য এটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজকের মুসলিমরাও একই ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে। এখন বেশিরভাগ মুসলিমরা বলে থাকে যে, আজকের দুনিয়ায় টিকে থাকার জন্য আমাদের যে জ্ঞান বা দিকনির্দেশনা প্রয়োজন, কুরআনে তার সামান্যই আছে বা একেবারেই নেই৷ আমাদেরকে উন্নত হতে হবে। পশ্চিমাদের কাছে শিখতে হবে; তাদের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, তাদের শাসন ব্যবস্থা এগুলো আমাদের গ্রহণ করতে হবে। কীভাবে সিস্টেমকে দূর্নীতিমুক্ত করা যায় এটিও আমাদের তাদের কাছ থেকে শিখতে হবে (!), কেননা তারা আজ সবক্ষেত্রে প্রশ্নাতীতভাবে বিজয়ী। ইসলামী সভ্যতার তুলনায় তারা অনেক এগিয়ে, তাই তাদের কাছে সবকিছুর সমাধান আছে। আমাদের উন্নত হতে হলে তাদের দেখানো রাস্তায় চলতে হবে; তাদের মতোই হয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ, এখানে কুরআনের কোন কার্যকরিতা নেই৷ এর ফলে একটি বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ দ্বীন/ জীবনব্যবস্থা কি আজ অকার্যকর হয়ে পড়েছে? অথচ কুরআনে আল্লাহ বলছেন, “বলো, (এ কুরআন) আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও রহমত, সুতরাং তোমাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। তারা যা সঞ্চয় করেছে তার চেয়ে এটি উত্তম।” (১০ : ৫৮)
অতএব নিঃসন্দেহে মানুষের অর্জিত যেকোন জ্ঞানের তুলনায় কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান শ্রেষ্ঠ৷ যদিও আমাদের ক্বলব এটি বিশ্বাস করে। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক, মন, আমাদের চোখ-কান সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু প্রকাশ করে। বর্তমানে সারা পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে কেবলমাত্র পাশ্চাত্যের জ্ঞান শিক্ষা দেয়া হয়। এমনকি তাতে কুরআন, সুন্নাহ কিংবা ইসলামী সভ্যতার পুরো ১৪০০ বছরের জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের কোন উল্লেখ নেই। পাশ্চাত্য আমাদের জ্ঞানগত উত্তরাধিকার থেকে প্রয়োজনীয় সবকিছুকে গ্রহণ করেছে, কিন্তু ইতহাস থেকে ইসলামী সভ্যতার নাম-নিশানা মুছে দিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের একটি শক্ত যুক্তি হলো, যদি কুরআন এতটাই মূল্যবান পথনির্দেশক হয়, তাহলে কি মুসলমানদের এতটা পশ্চাদপদ এবং মূর্খ হওয়ার কথা, যতটা তারা আজ হয়েছে? তাদের এই পশ্চাদপদতাই আধুনিক সময়ে কুরআনের অকার্যকরীতার দিকে দিক-নির্দেশ করে৷
এখন আমাদের এই যে হৃদয় এবং মস্তিষ্কের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব— এটি নিরসনের কোন সহজ সমাধান নেই৷ বর্তমানে আমরা মুসলিমরা যতগুলো দ্বন্দ্বের মধ্যে আছি তার কেন্দ্রবিন্দু এটি এবং আমাদেরকে এটি আগে সমাধান করতে হবে।
এটি সম্ভব, তবে সহজসাধ্য নয়। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন কুরআনে ওয়াদা করেছেন যে, যারা ঈমান আনবে তাদেরকে তিনি অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসবেন। এবং অবিশ্বাসীরা অন্ধকারেই রয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এর বিপরীত দৃশ্য দেখতে পাই। আজকে আমাদের পর্যবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা আমাদেরকে বারবার পাশ্চাত্য জ্ঞানের শক্তি-সামর্থ্যের প্রতি প্রলুব্ধ করে। আমাদের চোখ আমাদের যা দেখায়, মনে হয় যেন তা আমাদের বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা আমাদের ঈমান আমাদের বলে যে, কুরআনই কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষকে পূর্ণাঙ্গ এবং সঠিক পথনির্দেশনা দিবে। তাহলে এই দ্বন্দ্বের সমাধান কী? আমাদের ঈমান আনতে হবে, বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং তাকওয়ার অধিকারী হতে হবে। কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন বলেছেন, “যারা আল্লাহ এবং কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস রাখে, আল্লাহই তাদের পথ দেখাবেন। এমন জায়গা থেকে তাকে দান করবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারেনি। আর যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” অর্থাৎ, একমাত্র আল্লহই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি চাইলেই পৃথিবীকে পরিবর্তন করতে পারেন।
আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে বিপরীত মনে হলেও কুরআন যে আমাদের আজও পূর্ণাঙ্গ এবং সঠিক পথনির্দেশ করতে পারে, সেটি বুঝার উপায় আমাদের জানতে হবে।
-আজকে আমাদের মনে হচ্ছে আমাদেরকে অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক, পরিবেশ বিজ্ঞান পশ্চিমাদের কাছ থেকে শিখতে হবে, আমরা এগুলোতে পিছিয়ে আছি৷ কেননা পশ্চিমারা এই সবক্ষেত্রে পারদর্শী বলে নিজেদের দাবী করছে এবং সারা পৃথিবীর সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনটাই পড়ানো হচ্ছে।
-মুসলমানদের মধ্যে যারা সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী আছেন বা যারা আলেম আছেন, তাদের কারও কাছেই এসব ব্যাপারে কোন প্রস্তাবনা বা সমাধান নেই। মূলত মুসলমানরা ময়দানেই নেই।
কাজেই আমরা কি এখন বলবো যে, তাহলে আল্লাহর পয়গামই অকার্যকর হয়ে গেছে? ইসলামী সমাজের সমস্যা সমাধানের জন্য কি এখন আমাদেরকে পশ্চিমা পন্ডিতদের সাথে আলোচনা করতে হবে?
কক্ষনো না! এই সমস্যা মোকাবেলা করতে হলে আমাদের গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। যেকোন মানুষের জন্য তিনটি জ্ঞানটি অর্জন করা সবচেয়ে বেশি জরুরি:
-যেহেতু এই পৃথিবীতে আমাদের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত৷ তাই, এটি জানা খুব জরুরি যে ক্ষুদ্র এই জীবন কীভাবে যাপন করতে হবে?
-পৃথিবীর জীবনের এই ক্ষুদ্র, কিন্তু মূল্যবান সময়কে কীভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে?
-আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী?
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, পশ্চিমা শিক্ষা কি আমাদেরকে এই প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে সক্ষম?
রসায়ন, জীব বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এই বিষয়গুলো পড়ে কি আমরা শিখতে পারবো, কীভাবে বেঁচে থাকতে হয় বা জীবন-যাপন করতে হয়? এই শিক্ষা কি আমাদের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে শেখায়? পবিত্র কুরআন আমাদের বলে যে, প্রতিটি মানব জীবনই গোটা মানবতার সমান মূল্যবান। অর্থাৎ আমার-আপনার জীবন ঠিক ততটাই মূল্যবান, পৃথিবীর সাতশ কোটি মানুষের জীবন যতটা মূল্যবান। এটি খুবই জটিল একটি সমীকরণ। আমরা কি এই সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারি?
যেভাবে একটি বীজ গাছে পরিণত হতে পারে, বা গাছ বীজ উৎপন্ন করে একটি বন সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি প্রতিটি মানুষের ভেতরে বিপুল পরিমাণ শক্তি ও সম্ভাবনা রয়েছে। যদি মানুষ তার সক্ষমতাকে বিকশিত করতে পারে, তাহলে তারা দুনিয়াকে বদলে দিতে পারবে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি আমাদের শেখায় কীভাবে আমাদের এই সক্ষমতাকে বিকশিত করতে হবে? উত্তরটা নিশ্চয়ই, ‘না’। কিন্তু কেন?
কেন আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা আমাদেরকে এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর জবাব শেখায়না? যুবক বয়সে আমি একবার আমাদের এক প্রফেসরকে এই প্রশ্নগুলো করেছিলাম। কিন্তু তিনি কোন জবাব দেননি।
কেন আধুনিক শিক্ষা মানুষের চরিত্রকে বিকশিত করতে ব্যর্থ হয়, যা নাটকীয়ভাবে নিকৃষ্ট জীবন যাপনের দিকে নিয়ে যায়? যে শিক্ষা আমাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা শেখায়, কিন্তু কোন জীবনধর্মী শিক্ষা দেয়না তার ক্ষতিকর প্রভাব আমাদের সামনেই রয়েছে। যদি আপনি অর্থনীতির শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন, আপনি সেখান থেকে যা শিখবেন তা হলো জীবন গলা কাটা প্রতিযোগীতার এক উন্মুক্ত ময়দান। জীবনের লক্ষ্য হলো নিজের জীবনের আনন্দকে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি করা, তাতে অন্যদের যা-ই হোকনা কেন। এমনকি আপনি নিজের আনন্দের জন্য হাজার জনকেও কষ্ট দিতে পারবেন। বিয়ের লক্ষ্যও হলো স্রেফ আনন্দ লাভ, পরিবার গঠন নয়। যেকারণে ইউরোপ-আমেরিকার ৫০% এরও বেশি সন্তান সিংগেল মাদার এর ঘরে জন্মায়। একটি পরিবারে বাবা-মা দুজন মিলে সন্তানকে যে ভালোবাসা এবং নিরাপত্তা দিতে পারে, তারা সেক্ষেত্রে ব্যর্থ। আমাদের অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানে যে Individualism বা ব্যক্তিত্ববাদ শেখানো হয়, তা মানুষকে একাকীত্বের দিকে নিয়ে যায়। আমরা কারও সাথে বন্ধুত্ব করিনা, কারও সাথে সুন্দর সম্পর্ক রাখিনা। গবেষণা বলছে, দীর্ঘমেয়াদী সুখ আসে সামাজিক সম্পর্ক ও সুন্দর আখলাক থেকে যার কোনটিই আধুনিক পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থায় শেখানো হয়না। সুতরাং জীবনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোই পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থায় অনুপস্থিত। কেন এটি হয় এবং কীভাবে হয় এ বিষয়ে হার্ভার্ড প্রফেসর জুলি রুবেন এর লেখা একটি সুন্দর বই আছে। বইটির নাম The Making of Modern University : Intellectual Transformation & Marginalization of Morality. তিনি বলেছেন, যদি আপনি ২০ শতকের প্রথমার্ধের কলেজসমূহের কারিকুলাম দেখেন, তাহলে দেখবেন বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের লক্ষ্য ছিলো চরিত্র (character) নির্মাণ, নেতৃত্বের গুণাবলী, নাগরিক এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ শিক্ষা দেওয়া। কিন্তু আজকের বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম যদি আপনি দেখেন এসবের কোনটির উল্লেখ নেই। নৈতিক/ আখলাকী শিক্ষা সেখানে একেবারেই অনুপস্থিত, শুধুমাত্র কারিগরি শিক্ষাই দেয়া হচ্ছে।
মানুষকে কীভাবে মানুষ হয়ে উঠতে হয় সে শিক্ষা দানে ব্যর্থতা আমাদেরকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো (moral midgets) নৈতিক বামন জন্ম দিচ্ছে। আমরা আখলাকের কিছুই জানিনা। এর মূল্য আমাদের শোধাতে হচ্ছে মানুষের জীবন দিয়ে। এটম বোমার আবিষ্কারকদের একটি কংগ্রেসে ডাকা হয়েছিলো এবং কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো। তখন তারা বললো,০০ “সেখানে কালার এবং লাইট শো হবে।” একজন পাল্টা প্রশ্ন করলো যে, সেখানে থাকা মানুষদের কী হবে? তখন তারা খুব হালকাভাবে বললো যে, “ওহ! তারাতো সবাই মারা যাবে।” মিলিয়ন মিলিয়ন নিরীহ মানুষ এবং শিশুদের মৃত্যু তাদের কাছে খুব সামান্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো (!) ম্যাকনামারার মতো ইয়েলের গ্র্যাজুয়েটরা চোখের পলকে কয়েক মিলিয়ন ভিয়েতনামী নাগরিককে মেরে ফেলেছিলো। তাদের কাছে এই মানুষগুলোর জীবনের মূল্য অন্য যেকোন বস্তুর মতোই। তাহলে এটিকে কি আমরা সভ্যতা বলতে পারি? প্রতিদিন কোন না কোন স্কুলে গোলাগুলি হচ্ছে। কিন্তু সংসদে এসব বন্দুকধারীদের বিরুদ্ধে একটি বিল পর্যন্ত পাশ করা যাচ্ছেনা। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে মারার জন্য বোমা হামলায় তারা লক্ষ লক্ষ ইরাকী শিশুকে হত্যা করেছিলো। এরপর ম্যাডেলিনে আলব্রিগ বলছিলো, “পাঁচ লক্ষ ইরাকী শিশু হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়াটা কঠিন ছিলো, কিন্তু তার বিনিময়ে আমরা যা পেতাম (প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম এর মৃত্যু) সেটি এর চেয়ে দামী ছিলো।” মূলত, পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের এই শিক্ষাই দিচ্ছে। টাইম ম্যাগাজিনের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, হার্ভার্ডের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোন সততা, নিষ্ঠা নেই; তারা প্রতারণামূলক কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত। নিজের সুবিধার জন্য যখনই প্রয়োজন হচ্ছে তখনই তারা মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে।
আধুনিক অর্থনীতিও আমাদের এটি শেখায়। আপনি যদি প্রিজনারস ডিলেমা পড়ে থাকেন, তাহলে আপনি জানেন যে, আপনি অপর পক্ষের সাথে ওয়াদা করতে পারেন যে, হ্যাঁ আমি সমন্বয় করবো, কিন্তু আপনার উচিত হবে নিজের স্বার্থের জন্য কাজ করা, এর জন্য প্রয়োজনে প্রতারণা করা। সমাজ সম্পর্কে আমাদের শেখানো হয়, এটি হলো গলাকাটা প্রতিযোগিতার এক নিষ্ঠুর ময়দান, এখানে একমাত্র আইন হলো survival of the fittest. ইউটিউবে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ হওয়া একটি ভিডিও আছে, যেখানে মাইকেল স্যান্ডেল হার্ভার্ডের হাজার হাজার আন্ডারগ্রেড এর ছাত্রকে ‘আদালত’ সম্পর্কে এবং কোন কাজটা করা সঠিক সে সম্পর্কে পড়াচ্ছেন। সেখানে তিনি কী পড়িয়েছেন? তিনি আপেক্ষিক নৈতিকতা নিয়ে পড়িয়েছেন। যদি আপনার সামনে দুটো অপশন থাকে; তিনজন অথবা দশজন মানুষ মারা যাবে। মানুষ আপনাকে মারতেই হবে। এখন বিষয় হচ্ছে আপনি কম মানুষ মারবেন নাকি বেশি। নৈতিকতা এরকমই আপেক্ষিক বিষয়। হত্যা করা যাবেনা— এরকম পরম আখলাক বলে কিছু নেই। এই থিওরি দিয়েই তারা হিরোশিমা এবং নাগাসাকির হত্যাকান্ডের পক্ষে সাফাই দেয়। তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি যা শেখাচ্ছেন তা শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্রের জন্য ভয়াবহ হবে। এবং তিনি তার ক্লাসের শুরুতেই ছাত্রদের বলেছিলেন, এই ক্লাস তোমাদেরকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে তৈরী করবেনা। এসবই হলো গৌণ ঘটনা (epiphenomena/ surface phenomena) যা দর্শন এবং এপিস্টেমোলজির আলোচ্য বিষয়।
এপিস্টেমোলজি হলো জ্ঞানের তত্ত্ব। এপিস্টেমোলজিতে একটি নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। উইকিপিডিয়ায় একটি মজার আর্টিকেল আছে ‘Getting to Philosophy’ শিরোনামে। সেখানে বলা হয়েছে উইকিপিডিয়ায় সবধরণের জ্ঞান পাওয়া যায়। আপনি কোন কিছু সার্চ দিয়ে প্রথম যে লিংকটি পাবেন সেটিতে ক্লিক করেন। তার ভেতরে আরও ইন্টার্নাল লিংক থাকে। তাতে ক্লিক করলে আরেকটা উইকিপিডিয়া আর্টিকেল পাবেন৷ আবার তার ইন্টার্নাল লিংকে ক্লিক করলে আরেকটি উইকি আর্টিকেল। এভাবে সর্বশেষ যেখানে গিয়ে উইকিপিডিয়া থেমে যায় সেটি হলো দর্শন সংক্রান্ত আর্টিকেল৷ যদিও আমরা এই বিষয়ে সচেতন নই, জ্ঞানের সামগ্রিক কাঠামো দার্শনিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। “জ্ঞান কাকে বলে?” এই মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর দিয়ে থাকেন দার্শনিকরা৷ কিন্তু এই প্রশ্নটির উত্তর বিশ শতকের প্রথমার্ধে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং এই পরিবর্তনের নেপথ্যের কারিগর হলো লজিক্যাল পজিটিভিজম। সুতরাং আমরা যদি পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিমূলকে বুঝতে চাই, তাহলে এই দর্শন আমাদের জানতে হবে। এবং একইসাথে জানতে হবে, কীভাবে আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে হবে, কীভাবে ইসলামী জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে; যা উম্মাহর ভবিষ্যতের জন্য জরুরি।
লজিক্যাল পজিটিভিজমের উত্থান:
Emergence of Logical Positivism[2] শিরোনামে আমার একটি আর্টিকেল আছে, যেখানে খুব খোলামেলাভাবে বলা হয়েছে যে, এক শতকেরও বেশি সময় ধরে ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে মারাত্মক যুদ্ধ হয়েছিলো, যা পাশ্চাত্যে জ্ঞানের সোর্স হিসেবে খ্রীস্টবাদকে (বাইবেল) গ্রহণ করাকে প্রত্যাখ্যানের দিকে ধাবিত করেছিলো। প্রধানত তারা দেখতে পেয়েছিলো যে, খ্রীস্টবাদ মানুষকে কেবল যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। তাই তারা বললো যে, আমাদেরকে নতুন করে আমাদের সমাজবিজ্ঞানকে বিনির্মাণ করতে হবে। কীভাবে একটি সমাজ পরিচালিত হয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কিভাবে বজায় রাখতে হয়, অর্থনীতি, রাজনীতি; এর কোনটিই আমরা বাইবেলের শিক্ষার ভিত্তিতে করতে পারিনা। কেননা এটি আমাদেরকে যুদ্ধের দিকে ধাবিত করে। সুতরাং, যখন তারা জ্ঞানের সোর্স হিসেবে বাইবেলকে প্রত্যাখ্যান করলো তখন নতুন একটি ভিত্তির উপর জ্ঞানকে দাঁড় করানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলো। এরপর এলো তাদের বিখ্যাত দার্শনিক রেনে দেকার্ত এর চিন্তা: I think therefore I am (আমি চিন্তা করতে পারি, সুতরাং আমার অস্তিত্ব আছে)। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে মানুষকে কেন নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণ করতে হবে? এটি খুবই মৌলিক একটি বিষয়। কিন্তু যেহেতু তারা বাইবেলকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো, তাই তাদেরকে সবকিছু শূন্য থেকে সৃষ্টি করতে হয়েছিলো। এটিই ছিলো সবধরণের এনলাইটেনমেন্ট দর্শনের মূল প্রজেক্ট। সেসময় তারা সবাই জ্ঞানতত্ব নিয়ে কথা বলছিলো। সেখান থেকে দুটি স্কুল অব থটের সৃষ্টি হয়। এর একটি অনুযায়ী জ্ঞান সৃষ্টি হয় অভিজ্ঞতা (observation) থেকে, যেটিকে বলা হয় empiricism। অন্য মত অনুযায়ী জ্ঞান সৃষ্টি হয় যুক্তি (logic) থেকে; এটি হলো rationalism. দুটো মতেরই ঝুঁকি এবং ত্রুটি রয়েছে। এগুলো নিয়ে আলাপ করাটা আজকে আমার উদ্দেশ্য নয়। বিশ শতকের শুরুর দিকে লজিক্যাল পজিটিভিজম নামে নতুন একটি সিনথেসিস এর আবির্ভাব হয়। এর মূল দাবী হলো সব ধরণের জ্ঞানের উৎপত্তি হয় অভিজ্ঞতা এবং যুক্তি থেকে। যদি কোন বাক্য বা স্টেটমেন্টকে এই অভিজ্ঞতা এবং যুক্তি দিয়ে বিচার (পক্ষে অথবা বিপক্ষে) করা না যায়, তাহলে সেটি অর্থহীন। এবং এই ধারণাই তাদের এই উপসংহারের দিকে নিয়ে যায় যে, আখলাকী মূল্যবোধগুলো অর্থহীন। যেমন ধরেন, নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করা পাপ। এটিকে কোন অভিজ্ঞতা বা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করবেন বা প্রত্যাখ্যান করবেন? করতে পারবেননা। এজন্য তাদের মতে, নৈতিক মূল্যবোধ বলে কিছু নেই। এটিকে সত্য বা মিথ্যা বলারও কিছু নেই। তাই এগুলো অর্থহীন। এর ফলে কুরআনের অর্ধেক আয়াতই অর্থহীন হয়ে যায়। অন্যদিকে বিজ্ঞান যেহেতু ঘটনা বা তথ্য নিয়ে কাজ করে, যেগুলোকে অভিজ্ঞতা এবং যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়; তাই লজিক্যাল পজিতিভিস্টরা দাবী করে থাকে যে, শুধুমাত্র বিজ্ঞানই জ্ঞান সরবরাহ করতে পারে। ধর্ম হলো স্রেফ অর্থহীন কুসংস্কার।
এখন, শিক্ষা পরিচালিত হয় এপিস্টেমোলজি দ্বারা। অর্থাৎ শিক্ষার কাজ হলো ছাত্রদের জ্ঞান সরবরাহ করা। এখন আপনার হাতে যদি এরকম একটি থিওরি থাকে যে, বিজ্ঞান ব্যতিত আর কোন কিছুই জ্ঞান নয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞান ছাড়া আর কোন কিছুই শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হবেনা। সুতরাং, আখলাক, মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ব এসব কিছুই আর শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত হবেনা। সুতরাং জ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য হয়ে গেলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কারিকুলাম হয়ে গেলো শুধু কারগরি শিক্ষা দেয়া এবং কোন ধরনের চারিত্রিক মূল্যবোধ গঠন এর আওতায় পড়েনা। আজ অবধি এটিই চলমান আছে।
এখন কথা হলো ইসলামী বিশ্ব কেন এমন একটি এপিস্টেমোলজি মেনে নিলো যা কুরআনের জ্ঞানকে অস্বীকার করে? এখানে এসে আমাদের আবার কলোনাইজেশনকে বুঝতে হবে। কলোনাইজেশন হলো মূলত মানুষের চিন্তা এবং মনকে জয় করে নেয়া। হাজার হাজার ইংরেজ মিলে যে ভারতীয়দের শাসন করতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়নি, সেই ভারতীয়দের কলোনাইজড মাইন্ড/ উপনিবেশায়িত মানস আজ সেই কলোনাইজারদের মানার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। অর্থাৎ, তারা আমাদের চিন্তা-চেতনা ও মনকে তাদের গোলামীর জন্য প্রস্তুত করেছে। অন্যথায় এটি একেবারে অসম্ভব ছিলো। এমনকি ইংরেজ সাম্রাজ্য যখন চূড়ায় অবস্থান করছিলো, তখনও ভারতবর্ষে মাত্র ১০০০ ইংরেজ আমলা ছিলো। এই কলোনাইজড মানস তৈরীর কাজটি হয়েছিলো শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে। যে শিক্ষা ব্যবস্থা নারিকেলের মতো কিছু মানুষ তৈরী করে যারা বাহ্যিকভাবে দেখতে শ্যমলা/ ভারতীয় হলেও চিন্তা-চেতনায় পুরোপুরি সাদা/ ইংরেজ। লর্ড ম্যাকলে তার বিখ্যাত প্রস্তাবনা ম্যাকলে’জ মিনিট[3] এ বলেন যে, “আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হবে এমন এক শ্রেণির মানুষ তৈরী করা, যারা আমাদের সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং মূল্যবোধকে মনে-প্রাণে ধারণ করবে এবং নিজেদের জনগণ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সভ্যতাকে অবজ্ঞা ও ঘৃনা করবে।” আজকের শিক্ষা ব্যবস্থা কিন্তু হুবহু তাই। ম্যকলের শিক্ষাব্যবস্থা প্রসূত সন্তানরা কেমন হবে সালমান রুশদী তার চমৎকার দৃষ্টান্ত। Midnight’s Children এ তার নিজ জাতি ও জনগনের প্রতি তার ঘৃণা এবং অবজ্ঞা ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে Satanic Verses এ নিজ ধর্ম এবং ইতিহাসের প্রতি ঘৃণা প্রতিফলিত হয়েছে। এবং তিনজন সাদা রমনীকে বিয়ে করার মাধ্যমে সে ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে গ্রহণ করার প্রতি তার মনোভাব পূর্ণ মাত্রায় ব্যক্ত করেছে। সুতরাং এগুলো সবই হলো পশ্চিমা শিক্ষার প্রভাব।
আমরা অনেক সময় বলি যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে উপনিবেশের অবসান হয়েছে। না।
বরং, পশ্চিমা শিক্ষার মাধ্যমে মন-মগজের কলোনাইজেশন প্রথা জারি রয়েছে। এই শিক্ষা ব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বের উপর আজ আরও গভীরভাবে জেঁকে বসেছে। মুসলিম বিশ্বের দেশসমূহে যেসব মানুষ ইংরেজী জানে আর যারা জানেনা উভয় পক্ষের মধ্যে একটি গাঢ় বিভাজন লক্ষ্য করা যায়। একজন মানুষ কত ভালোভাবে ইংরেজী বলতে পারে, তার উচ্চারন কতটা ইংরেজদের মতো, তার বাচ্চাকে কেমন ইংরেজী শেখায় তার উপর ভিত্তি করে এঙ্গলোফিলিস এবং ভার্নাকুলার ক্লাস হিসেবে তাদের বিভাজন করা হয়। এখানে স্মরণ রাখা দরকার কলোনাইজড রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা এবং সামাজিক কাঠামো সবকিছুই ডিজাইন করা হয়েছে জনগণ থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে। বর্তমানে ইংরেজ কলোনাইজারদের জায়গাটি নিয়েছে কোকোনাট ক্লাসের মানুষেরা। তারা ঠিক একইভাবে কলোনাইজড প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনা করে যাচ্ছে। কোন ভিনদেশের জন্য নয়, বরং তারা নিজেদের জন্যই এই রাজস্ব আদায় করে নিচ্ছে। বিদেশীদের পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা এসব আর্মি, জমিদার/ ভূপতি এবং রাজনৈতিক এলিটরা সবাই নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার বিনিময়ে জনগণের কাছ থেকে আদায় করা রাজস্ব দেশের বাইরে পাঠাচ্ছে। এভাবেই আজও কলোনাইজেশন আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জারি রয়েছে।
লজিক্যাল পজিটিভিজম বলে যে, যা দেখা বা পর্যবেক্ষণ করা যায়না, তার কোন অস্তিত্ব নেই। সুতরাং, স্রষ্টা, পরকাল, বিচার দিবস এসবের কোন অস্তিত্বই নেই। আমাদের উচিত দুনিয়ার জীবনকে যতটা সম্ভব উপভোগ করা এবং এই বিষয়টিই অর্থনীতিতে পরিষ্কারভাবে পড়ানো হয়। দুঃখজনকভাবে ইসলামী অর্থনীতিবিদরাও এই মতবাদটিকে প্রত্যাখ্যান করেননি। যখন আমরা এটি বুঝতে পারি যে, শিক্ষা ব্যবস্থা হলো কেবলমাত্র দুনিয়াবী জীবনকে ঘিরে এবং শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো ছাত্রদের চাকরী এবং অর্থ উপার্জনে সক্ষম করে তোলা। তাছাড়া পুঁজিবাদী দুনিয়ায় চাকরি নির্ভর করে পশ্চিমা শিক্ষার উপর। ছাত্ররা বিশ্বাস করে যে, কেবলমাত্র পশ্চিমা শিক্ষাই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এটিই শেখানো হয় এবং এটিই তাদের চাকরির পথ সুগম করে। পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ছাত্রদের মনে এই বিশ্বাস জন্ম দেয় যে, কুরআন, সুন্নাহ, ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এগুলো অপ্রাসঙ্গিক। কেননা আধুনিক শিক্ষায় এগুলোর কোন উল্লেখই নেই। বরং এই শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের মধ্যে এই বিশ্বাস গেঁথে দেয় যে, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হলো অর্থ উপার্জন।
দিনশেষে আমরা বিশ্বাস করে নিই যে, পশ্চিমা শিক্ষা কুরআনের চেয়ে উন্নত। কারণ এই শিক্ষাব্যবস্থা আমাদেরকে শেখায়:
- এই পৃথিবীর জীবনকে মূল্য দিতে
- অর্থনীতি আমাদের উপভোগ করতে, রাজনীতি ক্ষমতার পেছনে এবং বাণিজ্য মুনাফার পেছনে ছুটতে শেখায়
- এসবকিছু আমাদের স্রষ্টা, পরকাল এবং বিচার দিবসকে প্রত্যাখ্যান করতে এবং
- কেবল সম্পদ উপার্জনকেই জীবনের লক্ষ্য মনে করার দিকে ধাবিত করে
এর ফলে কুরআন, সুন্নাহ এবং মুসলিমদের জ্ঞানগত উত্তরাধিকার অপ্রাসঙ্গিক এবং অসার বলে প্রতীয়মান হয়। কুরআনতো আমাদের শেখাচ্ছেনা কীভাবে মুনাফা এবং সম্পদকে উত্তরোত্তর বাড়ানো যায়, কিভাবে দুনিয়াবী সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ানো যায়। সু্তরাং, আমাদের সবচেয় বড় আধ্যাত্মিক সমস্যা হচ্ছে আমরা পশ্চিমা শিক্ষাকে কুরআনের উপর অগ্রাধিকার দিই। কীভাবে আমরা এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারি?
এক্ষেত্রে আমাদের প্রথম কাজ হল পশ্চিমা শিক্ষার এই সম্মোহন থেকে বের হয়ে আসা এবং এটি উপলব্ধি করা যে, পশ্চিমা শিক্ষা হলো একটি চকচকে মোড়কে আবৃত ফাঁকা এবং ক্ষতিকর বুলির সমাহার। পশ্চিমাদের তৈরীকৃত কিছু উল্লেখযোগ্য বিভাজন হলো:
- বস্তুনিষ্ঠ (objective) জ্ঞান বনাম বিষয়নিষ্ঠ (subjective) জ্ঞান
- ধর্ম বনাম বিজ্ঞান
- তথ্য/ ঘটনা বনাম মূল্যবোধ
- অভিজ্ঞতা ও যুক্তি বনাম সজ্ঞা/ আত্মিক/ intuition ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান
অথচ এগুলো সবই ভুল বিভাজন। বিশ্বব্যবস্থা এভাবে চলেনা, কিন্তু আমাদেরকে এগুলো বিশ্বাস করানো হয়। এবং সত্যটা আমাদের কাছে খুব দুর্লভ করে তোলা হয়।[4]
এই সম্মোহন থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের অবশ্যই জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। সকল মানুষের জন্য এটিই কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। মানুষের জন্য তিনটা অবস্থান বেছে নেয়া সম্ভব:
- এথেইজম/ নাস্তিকতাবাদ- স্রষ্ট্রার অস্তিত্ব নেই
- এগনস্টিসিজম/ আজ্ঞাবাদ- স্রষ্টা আছেন কি নেই তা আমরা জানিনা বা জানতে পারিনা
- দেইজম/ একেশ্বরবাদ- স্রষ্টা আছেন
এর কোনটিই কিন্তু মূল্যবোধের বাইরে নয়। সুতরাং মূল্যবোধ শূন্য কোন অবস্থান আসলে সম্ভব নয়। পাশ্চাত্য যে আমাদের মূল্যবোধ শূন্য শিক্ষার কথা বলছে, এটি আসলে একটি ভুল চিন্তা। এটি পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের একটি অন্তর্নিহিত ভুল। এখন এই তিনটি ধারণা ব্যাখ্যা করা যাক।
এথেইজম/ নাস্তিকতাবাদ : স্রষ্টা, আখেরাত এবং বিচার দিবসকে অস্বীকার
এই মত অনুযায়ী মহাবিশ্ব একটি দূর্ঘটনার ফলে সৃষ্টি হয়েছিলো। আমাদের জীবনের কোন অর্থ নেই। মহাবিশ্বের সবকিছুই বিশৃঙ্খলা। আমরা আমাদের ইচ্ছামতো যা খুশি বেছে নিতে পারি। এটি আমাদেরকে তিনটি মতবাদের দিকে ধাবিত করে।
- Existentialism/ অস্তিত্ববাদ- আমরা অর্থ সৃষ্টির চেষ্টা করি। যেকোন অর্থই সৃষ্টি করা যায়- যাই পাওয়া যাকনা কেন।
- Absurdism- কোন অর্থ খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বিশৃঙ্খলার মধ্যেই আমরা আনন্দ খুঁজে পেতে পারি।
- Nihilism/ ধ্বংসবাদ- আলবার্ট কামু বলেন, একমাত্র সিরিয়াস দার্শনিক প্রশ্ন হচ্ছে ‘আত্মহত্যা’। “অর্থহীন জীবন কি যাপন করার যোগ্য?”
এখন কেউ যদি এথেইজমকেও গ্রহণ করে, তাহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে প্রায়োগিকতা এবং এর বিকল্প কী হতে পারে সেটি। কিন্তু আপনি কী করতে যাচ্ছেন সেটি বিবেচনার আগেই আপনাকে মাথায় নিতে হবে আপনি আপনার জ্ঞানের মধ্যে কোন মূল্যবোধটিকে রাখতে চাচ্ছেন যে অনুসারে এই তিনটির যেকোন একটিকে আপনি গ্রহন করবেন। অতএব মূল্যবোধ-মুক্ত কোন জ্ঞান নেই।
এগনস্টিসিজম : স্রষ্টা আছেন কি নেই আমরা জানিনা
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন দাঁড়ায় স্রষ্টা আছে কি নেই সেটা খুঁজে বের করা। এখন আমাদের সমস্ত মনযোগ এই প্রশ্নের উপর দিতে হবে। কেননা এর জবাবের উপর নির্ভর করছে আমাদের কীভাবে জীবন-যাপন করা উচিত। এখন এর জন্য প্রচুর কাল্পনিক পন্থা আছে। এটি নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্কও আছে। দেইস্টরাও স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে অনেক যুক্তি-তর্ক পেশ করেন। আবার এগনস্টিকরা তাদের মতের পক্ষে প্রচুর যুক্তি পেশ করেন যে এটি মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয় এবং স্রষ্টাকে ছাড়াই আমরা বেঁচে থাকতে পারি, স্রষ্টা থাকুক বা না থাকুক তাতে কী এসে যায়। এই সবগুলোই যুক্তি-তর্ক। কিন্তু একজন এগনস্টিক ব্যক্তিকে এইসবগুলো বিতর্ক নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে এবং এগুলোর মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনা করতে হবে, এবং একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। এই বিষয়ে এরকম অনিশ্চিত জ্ঞান নিয়ে আসলে বেঁচে থাকা যায়না। কিন্তু আধুনিক শিক্ষায় সে সুযোগটি নেই। আধুনিক শিক্ষা এই প্রশ্নটি নিয়ে একেবারেই কাজ করেনা।
Deism/ একেশ্বরবাদ : স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে
শেষ মতবাদটি হলো স্রষ্টা আছেন। এখন, যদি স্রষ্টা থেকে থাকেন, তাহলে মহাবিশ্ব তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং এই সৃষ্টির পেছনে নিশ্চয়ই তার কোন উদ্দেশ্য ছিলো। একইভাবে মানুষকেও তিনি সৃষ্টি করেছেন এবং তার পেছনেও তার কোন উদ্দেশ্য ছিলো। সুতরাং, শেষ বিচারের দিন সফল হতে হলে আমাদেরকে সেই উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হবে।
এখানে আমি যে পয়েন্টে দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাই, সেটি হলো আপনাকে তিনটি মতবাদের যেকোন একটি গ্রহণ করতে হবে এবং এই তিনটির কোনটিই বস্তুনিষ্ট বা মূল্যবোধ-শূন্য নয়। প্রত্যেকটি মতবাদেরই নিজস্ব মূল্যবোধসমূহ রয়েছে। অতএব, পাশ্চাত্যের বস্তুনিষ্ট মূল্যবোধ বিহীন জ্ঞানের ধারনা ভুল।
এখন এই তিনটি মতবাদেরই জ্ঞানের ক্ষেত্রে নিজস্ব অগ্রাধিকার আছেঃ
- নাস্তিকরা ক্ষমতা, আনন্দ এবং মুনাফা/ লাভের জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করে। পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞান এবং অর্থনীতি এটিই সরবরাহ করে থাকে।
- এগনস্টিকরা স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানার জন্য জ্ঞান অর্জন করতে হয়। যেমনটা ইব্রাহীম (আ.) এর দোয়ায় ফুটে উঠেছে, “ইয়া রব! আপনি যদি পথ না দেখান তাহলে নিঃসন্দেহে আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো।” অর্থাৎ তিনি এখানে আল্লাহর কাছে পথনির্দেশ চাচ্ছেন, তার অস্তিত্বের ব্যাপারে।
- যদি আপনি স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসী হন, তাহলে আপনাকে ধর্মগুলো নিয়ে পড়াশুনা করতে হবে, যাতে আপনি সত্য ধর্ম খুঁজে পেতে পারেন। এইদিকে আমি আর বেশি আলাপ বাড়াবোনা। যেহেতু আমরা সবাই এখানে মুসলিম, তার মানে আমরা সবাই এই অনুসন্ধান শেষ করে এই উপসংহারে উপনীত হয়েছি যে, ইসলামই সত্য দ্বীন। এবং সেক্ষেত্রে আমাদেরকে আখেরাতের সফলতার জন্য জ্ঞান সাধনা করতে হবে।
মূল যুদ্ধক্ষেত্র : জ্ঞান
আল্লাহর প্রেরিত ওহী শুরু হয়েছে ‘ইক্বরা-পড়ো’ এই শব্দের মাধ্যমে এবং পরবর্তী আয়াতগুলোতে তিনি ওয়াদা করেছেন যে, তিনি মানুষকে অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন জ্ঞান দান করবেন। সত্যিকারার্থে এই জ্ঞান পৃথিবীতে বিপ্লব সাধন করেছে। কিন্তু মনে হচ্ছে যেন, এটি তার সেই ক্ষমতা আজ হারিয়ে ফেলেছে, কেননা মুসলিমরা আজ সবক্ষেত্রে পশ্চাদপদ এবং মূর্খ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একথাটি সত্য নয়। এখন এটি যে সত্য নয়, সেটি প্রমাণ করতে হলে আমাদেরকে এই জ্ঞানের যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে হবে। আমাদেরকে প্রমাণ করে দিতে হবে যে, পশ্চিমা জ্ঞান নিম্নমানের। তাই, কুরআন, সুন্নাহর উপর ভিত্তি করে উৎকৃষ্ট জ্ঞান আমাদের সামনে নিয়ে আসতে হবে। আমরা আজ এটি করতে ব্যর্থ হচ্ছি। কিন্তু এটি আমাদের করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো কীভাবে?
আল-গাজ্জালী প্রজেক্ট :
আজকে আমরা যে সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, ইমাম গাজ্জালি তার সময়ে ঠিক একই সমস্যার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। মুতাযিলারা বলছিলো যে, জ্ঞানের উৎস হিসেবে গ্রীক দর্শন কুরআন এবং সুন্নাহর মতোই একইরকম নির্ভরযোগ্য ও নির্ভেজাল। আমি গাজ্জালি প্রজেক্টে তিনটি ধাপ বর্ণনা করেছি যেগুলো তিনি এই সমস্যা মোকাবেলায় পর্যায়ক্রমে অনুসরণ করেছেন:
১) সন্দেহ থেকে মুক্তি : তিনি তার একটি গ্রন্থে বলেছেন যে, আমাদেরকে স্রষ্টায় বিশ্বাস করতে হবে, এবং আপনি কারণ বা যুক্তি দিয়ে এটি অর্জন করতে পারবেননা। এটি আপনার ক্বলবের নূর থেকে উদ্ভাসিত হতে হবে। আপনাকে জ্ঞানের দরজায় পৌঁছাতে হলে আল্লাহর হেদায়াতের নূরের কাছে নিজের হৃদয় সঁপে দিতে হবে।
২) দ্বিতীয় ধাপটি হলো দার্শনিকদের পশ্চিমা সম্মোহন থেকে বেরিয়ে আসা। যদিও আপাতদৃষ্টিতে পশ্চিমা শিক্ষাকে খুবই চমকপ্রদ, দীপ্তিমান ও চিত্তাকর্ষক মনে হয়, এটি শুধুমাত্র বাহিরের চাকচিক্য। এর ভেতরটা একদম ফাঁকা। ভালো করে দেখলে আপনি দেখতে পাবেন যে এর ভেতরটা একদম পঁচে গেছে।
৩) তৃতীয় ধাপ হলো কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে জ্ঞানের পুনর্গঠন। এবং এক্ষেত্রে ইসলামী ধ্যান-ধারণার আলোকে সমাজ বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা- অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক, পরিবেশগত, শিক্ষা এবং বিচারসংক্রান্ত জ্ঞানের পুনর্গঠন প্রয়োজন। এটিই হল গাজ্জালী প্রজেক্টের লক্ষ্য। যেহেতু পাশ্চাত্য তার নিজের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে এগুলো দাঁড় করিয়েছে, তারা যে এটিকে সার্বজনীন দাবী করে, তা আসলে ভুল। সুতরাং আমাদেরকে আমাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও থিওরির উপর ভিত্তি করে নিজস্ব সমাজবিজ্ঞান দাঁড় করাতে হবে।
সমাজবিজ্ঞানকে আমাদের সম্পূর্ণরূপে পুনর্গঠন করতে হবে, কেননা বর্তমান সমাজবিজ্ঞান পুরোপুরি ইউরোপীয় সমাজের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে সাজানো, যা ইসলামী সমাজে প্রয়োগযোগ্য নয়।
কীভাবে সমাজবিজ্ঞান[5] পুনর্গঠন করতে হবে, ইসলামী অর্থনৈতিক ইস্টিটিউশনগুলো কেমন হবে[6], ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরন[7] কীভাবে সম্ভব এই বিষয়গুলোর উপর আমি কিছু রিসোর্স উল্লেখ করেছি প্রবন্ধের শেষে। এছাড়া ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে আমার একটি বই[8] আছে যেখানে আমি পুঁজিবাদী অর্থনীতির সাথে ইসলামী অর্থনীতির তুলনামূলক আলোচনা করেছি। তবে এগুলো শুধু আমার লেকচার বা বই। এছাড়াও আরও অনেকে এই বিষয়ে অসাধারণ কাজ করেছেন। যেমন, Islamic Psychology মানুষের ইসলামী মডেল কেমন হবে, এর উপর অনেক কাজ করেছে, যার মধ্যে আছে ক্বালব, নফস, রুহ এবং আকলের পুনর্গঠন। এটি আমাদেরকে মনোবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিবে, যা পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলাদা।
স্যার রোনাল্ড ফিশার এর সৃষ্টি করা পরিসংখ্যান গত ১০০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এর ভিত্তিগুলো ভুল। কেননা স্যার রোনাল্ড ফিশার তার থিওরিগুলো পজিটিভিস্ট ধ্যান-ধারনার উপর ভিত্তি করে দিয়েছেন। মূলত পরিসংখ্যানে দুটি মৌলিক ধারণা আছে Probability (সম্ভাবনা) ও Causality (কার্যকারণ) এবং এর কোনটিই পর্যবেক্ষণযোগ্য নয়। যেমন, Probability বলে যে, আপনি একটি কয়েন নিক্ষেপ করলে এটিতে যদি হেড আসে, একইরকম সম্ভাবনা টেল আসারও রয়েছে। কিন্তু যেটি আসেনি, সেটি আপনি পর্যবেক্ষণ করতে পারেননা। একারনে Frequency Theory অর্থহীন এবং ভুল একটি থিওরি। একইভাবে বেইজিয়ান থিওরিও অনেকটাই ভুল, কেননা দুটোতেই সম্ভাবনার পর্যবেক্ষণযোগ্য দিকের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই পর্যবেক্ষণযোগ্য নয়। একইভাবে Causality ও স্বাভাবিকভাবেই পর্যবেক্ষণযোগ্য নয়। এজন্য প্রচলিত পরিসংখ্যান Causality’র সঠিক সংজ্ঞা দিতে পারেনা। যদি আমরা Probability এবং Causality’র সঠিক সংজ্ঞায়ন করতে যাই, তাহলে পরিসংখ্যান এর পুরো ধারণাই বদলে যায়। আমি আমার একটি আলোচনায় সেটিও দেখাবার চেষ্টা করেছি।[9]
সুতরাং, আমার পুরো আলোচনার সারাংশ আমরা এভাবে করতে পারি :
গত কয়েক শতক ধরে পাশ্চাত্য জ্ঞানের যে কাঠামো দাঁড় করিয়েছে তা একটি বিষাক্ত পাটাতনের উপর এবং স্রষ্টা, পরকাল ও বিচার দিবসকে প্রত্যাখ্যানের উপর ভিত্তি করে।
আমাদেরকে ইসলামী মূল্যবোধের পাটাতনের উপর আবার নতুন করে জ্ঞানের পুনর্গঠন করতে হবে। জ্ঞানের ইসলামীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে কাজটি ইতোমধ্যে শুরু হলেও পশ্চিমা জ্ঞানের উত্তরাধিকারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে তা স্থবির হয়ে গেছে।[10] পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে কুরআনী ভিত্তির উপর জ্ঞানের পুনর্গঠনের পরিবর্তে তারা পশ্চিমা জ্ঞান যেখানে আছে, সেখান থেকে শুরু করেছে। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু আমাদের হারানো সম্পদ জ্ঞান, আর পশ্চিমাদের হাতে এখন জ্ঞান আছে, কেননা আমরা সেখান থেকেই শুরু করি। কিন্তু সমস্যা হলো পাশ্চাত্যের কাছে যা আছে, তা প্রকৃতপক্ষে জ্ঞান নয়, মূর্খতা। তাই আমাদের অবশ্যই এটিকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আমাদের অর্থনীতিবিদরাও এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। পাশ্চাত্যের যে জ্ঞান তা এথেইস্টদের চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত, এজন্য তাদের অর্থনীতি হলো দুনিয়ার আনন্দ এবং মুনাফাকে বৃদ্ধি করার জন্য। যেটি ইসলামের শিক্ষার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
সবশেষে একটি দোয়ার মাধ্যমে আমি শেষ করতে চাই,
“ইয়া আল্লাহ! আমার ইবাদাত, আমার জিহাদ, আমার হায়াত এবং মৃত্যু সবকিছু শুধু আপনার জন্য। আমাদের দোয়াগুলো কবুল করুন, আমাদের ক্বালবকে আপনার হেদায়াতের নূর দিয়ে আলোকিত করুন, এবং আমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসুন।”
প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: আমাদের দেশে ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে যে কোর্সগুলো শেখানো হয়, সেখানে প্রচলিত পুঁজিবাদী এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে কিভাবে ইসলামীকরণ করা হবে মূলত তা নিয়েই আলোচনা করা হয়। যেটি একটি বড় সমস্যার সৃষ্টি করছে। এক্ষেত্রে আপনার মতামত কী? দ্বিতীয়ত আমরা যদি এগুলো পরিবর্তন করতে চাই তাহলে আমাদের সামনে দুটি পন্থা আছে : ক্ষমতাসীন চেয়ারগুলোতে বসা অথবা আমাদের পড়াশুনা, লেখালেখি, আলোচনা এসবের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা। কেউ যদি চেয়ারে বসেও হঠাৎ করে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করে, তাহলেও কিন্তু তার বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী? কীভাবে আমরা পরিবর্তনের দিকে যাওয়া উচিত?
উত্তর: এটি করতে হবে সুনির্দিষ্ট কৌশলের মাধ্যমে। আমরা জ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি বিপ্লব ঘটাতে চাচ্ছি। এই বিপ্লবের ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান লোকরা আপনাকে বাধা দিবেই। কারণ বলা হয়ে থাকে, Knowledge is Power. বর্তমানে ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখে আধুনিক জ্ঞান। আরেকটা বিষয় হলো ইসলামী অর্থনীতির ক্ষেত্রে যদি আপনি বিপ্লব ঘটাতে চান, তাহলে আপনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হবে বিদ্যমান ইসলামী অর্থনীতিবিদগণ। বিখ্যাত পদার্থবিদ ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক একটি বিপ্লব চেয়েছিলেন এবং তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। আইনস্টাইন তার বিরোধীতা করেন। এবং অন্য সব বিজ্ঞানীরাও তার বিরোধীতা করেন। এক পর্যায়ে তিনি সবাইকে বুঝানোর প্রচেষ্টা বাদ দিয়ে দেন এবং বলেন যে, “পদার্থবিজ্ঞান এর অগ্রগতি হবে একটি যুগের অবসানের পর; যখন এই বৃদ্ধ লোকগুলো মারা যাবে, কেবল তখনই আমরা নতুন কিছু পাবো।” আমিও গত ২০ বছর ধরে এই কথাগুলো বলে যাচ্ছি যে, আমাদেরকে প্রচলিত অর্থনীতিকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে। মানুষ যেহেতু স্বাভাবিকভাবে ধার্মিক এবং তারা বাস্তবতাকে মানতে চায়না। এটি সত্য যে, এই মুহূর্তে পুঁজিবাদকে পুরোপুরি বাদ দেয়া সম্ভব না। কারণ এর তত্ত্বগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এর গাণিতিক এবং কম্পিউটেশনাল কারণে এটিকে খুব গৌরবোজ্জ্বল মনে হয়। তাই সচেতন তরুণদের জন্য আমার পরামর্শ হলো, নিজের ডিগ্রিটা যতটা সম্ভব ভালোভাবে সম্পন্ন করো। আমার অনেক ছাত্র আছে, যারা সবার সাথে তর্ক করে এই বলে যে প্রচলিত থিওরিগুলো সব ভুল, এগুলো অকজো, পড়ে কোন লাভ নেই। এবং এতে করে লোকেরা খুবই মর্মাহত হয়। এরকম হাঙ্গামা করার দরকার নেই। মনে রাখবে, পি এইচ ডি হলো কিছু কাগজমাত্র। মানুষ মনে করে একটি পিএইচডি করা মানেই জ্ঞানের জগতে ভূমিকা রাখা৷ আসলে সেরকম কিছু নয়। এজন্য এর পেছনে অতিরিক্ত সাধনার প্রয়োজন নেই। সাধারণভাবে পিএইচডি টা সম্পন্ন করো। তারপর নিজের বিপ্লবের জন্য নেমে পড়ো। এছাড়া আমি বয়স্কদেরও বলার চেষ্টা করি, যদিও কেউ শুনতে চায়না, তারুণ্য খুবই আকর্ষণীয়।
থমাস কুইন বৈজ্ঞানিক বিপ্লব নিয়েও একই ধরণের কথা বলেছেন, “যখন বৈজ্ঞানিক বিপ্লব এর প্রশ্ন আসে, বয়স্ক মানুষরা কখনো সেটিতে পরিবর্তনকারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়না। বিপ্লব বৃদ্ধ মানুষদের পরিবর্তনের মাধ্যমে হয়না, বিপ্লব তখনই হয় যখন যুবকরা দেখে যে এই নতুন ধারণা তাদের সামনে গবেষণার প্রশস্ত দুয়ার উন্মোচন করবে।” এবং এটিই বাস্তব। একটি অর্থনৈতিক বিপ্লবের প্রশ্ন যদি আসে, তাহলে আপনি সেক্ষেত্রে কী করবেন? আপনি একটি আমেরিকান আর্টিকেল নিয়ে, সেখানে যদি কোথাও সুদের উল্লেখ পান, সেটিকে পরিবর্তন করেন৷ এভাবেই থিসিসগুলো করা হচ্ছে। যদি আপনি নতুন কিছু করতে চান, আপনি হয়তো খুব জটিল গাণিতিক হিসেব-নিকেশ করে কিছু একটি দেখানোর চেষ্টা করবেন, কিন্তু দিনশেষে আপনি সেই নিও-ক্লাসিক্যাল ধারারই অনুসারী রয়ে যাবেন। কিন্তু আপনি যদি আমার ধারণাটিকে গ্রহণ করেন তাহলে ঠিক আছে। ধরে নিতে হবে, আপনি একদম শূন্যে আছেন, অর্থনীতির কিছুই জানেননা। আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তি হচ্ছে প্রতিযোগিতা (Competition), উপযোগিতার সর্বাধিকায়ন (Utility maximization); যাকে একথায় লোভ বলা যায়, ব্যক্তিত্ববাদ (Individualism) এবং Hedonism. এর মাধ্যমে কীভাবে আমরা কুরআন নির্দেশিত উদারতার ভিত্তিতে একটি সমাজ বিনির্মাণ করতে পারবো। সামাজিক দায়িত্ববোধ একটি ফরযে কিফায়া- আপনাকে একে অন্যের খেয়াল রাখতে হবে। দুনিয়ার আনন্দের পরিবর্তে আখিরাতের কল্যাণ এর জন্য কাজ করতে হবে। আল্লাহ কুরআনে বলেন, “তোমরা তোমাদের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি দান করে দাও।” এটি আসলে এক হিসেবে utility minimization. এর মাধ্যমে মানুষ তার নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে৷ অর্থাৎ ইসলামী অর্থনীতির সব কিছুই ভিন্ন। এইসব মূলনীতির আলোকে একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবকিছু নতুন করে করতে হবে৷ নতুন করে গবেষণা করতে হবে। অনেক জায়গা আছে কাজ করার। ১৯৭০ এর দশক থেকে ইসলামী অর্থনীতিবিদরা নতুন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েমের জন্য কাজ করতে শুরু করেছে এবং তাদের অগ্রগতি এক কথায় শূন্য। অন্যদিকে সত্তর এর দশক থেকে আমরা Behavioural Economics, Environmental Economics, Chaos theory, Agent-based modeling, modern monetary theory এরকম অসংখ্য নতুন নতুন তত্ত্ব ও ধারণার মুখোমুখি হয়েছি এবং সফলভাবে গোঁড়ামির মোকাবেলা হয়েছে। কিন্তু ইসলামী অর্থনীতি কেবল অন্ধভাবে তাদের অনুকরণ করে গেছে। আমাদের সামনে একটি নতুন দুনিয়া আছে, প্রতিনিয়ত অসংখ্য নতুন দরজা খুলে যাচ্ছে, টগবগে যুবকরা আছে যারা দুনিয়াকে জয় করতে সক্ষম, তাদের সামনে নতুন ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ আছে। জ্ঞান অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাতিয়ার। আল্লাহ বেদুইনদের এই জ্ঞান দান করেছিলেন এবং তারা গোটা দুনিয়া জয় করেছে।৷ আজকেও আমাদের সামনে সেই সুযোগ আছে। কিন্তু মুসলমানরা কুরআনের কাছে নির্দেশনা খোঁজার পরিবর্তে পাশ্চাত্যের কাছে খুঁজছে। এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
২য় প্রশ্ন: পৃথিবীর কর্তৃত্ব মুসলমানদের কাছ থেকে অন্যদের কাছে যাওয়ার আগে, যেমন: ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের দুশ বছরের শোষণ এর পূর্বে এখানে অর্থনীতি থেকে সবকিছুর একটি গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস ছিলো, অন্যান্য অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রেও এটি সত্য। এখন সবার অর্থনীতিই আই এম এফ বা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে জিম্মি। যার ফলে তারা নিজেদের মধ্যে কোন অর্থনৈতিক জোট গঠন করতে পারছেনা। এক্ষেত্রে সমাধান কী?
উত্তর: আপনি একইসাথে তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। যদি ব্যবহারিক সমস্যার কথা আগে ধরি, সুদভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থার প্রতি আমাদের দাসত্ব হলো মূলত জ্ঞানগত ব্যর্থতার কারণে। তারা আমাদের একটি ভুল অর্থনৈতিক থিওরি পড়িয়েছে যাতে বলা হয়েছে অগ্রগতির জন্য আমাদের অবশ্যই ঋণ নিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে এটি সত্যের একেবারেই বিপরীত। আমাদেরকে স্বয়ংসম্পূর্ন অর্থনীতি দাঁড় করাতে হবে যাতে আমাদের কারও কাছ থেকে কোনকিছু ধার করতে না হয়। অথচ থিওরি আমাদের comparative advantage (তুলনামূলক সুবিধা) এর কথা বলে। আপনাকে নিজের সুবিধার জন্য কাজ করতে এবং অন্যের সুবিধার জন্য আমদানি করতে বলে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। কিন্তু যতদিন আমরা এসব থিওরি বিশ্বাস করবো ততদিন আমরা দাসই থেকে যাবো, কেননা আমরা আমদানি নির্ভর থাকবো, আমদানির জন্য আবার আমাদের ঋণ নিতে হবে, সেক্ষেত্রে আমরা আই এমএফকে আমাদের সামনে পাব এবং সে ঋণের বিনিময়ে আমাদের উপর তার শর্তাবলী চাপিয়ে দিবে। এসব ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের জ্ঞানের পুনর্গঠন করতে হবে। যেহেতু আমাদেরকে ভুলভাল থিওরি দিয়েই দাসত্বের শেকল পরানো হচ্ছে।
তাত্ত্বিক সমস্যা নিয়ে বলতে গেলে, মূল সমস্যা হলো সমাজবিজ্ঞান। বিদ্যমান যে সমাজবিজ্ঞান আছে সেটি একটি প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। সমাজবিজ্ঞান শব্দটি আজকে ভৌত বিজ্ঞানের কোন শাখা বলে প্রতীয়মান হয় আমাদের কাছে। অথচ, মহাকর্ষের নীতি পড়ার পর কেউ ইসলামী মহাকর্ষের নীতি নিয়ে কাজ করতে যাবেনা, তার প্রয়োজন নেই। এটি সবার জন্য সমান। কিন্তু আপনি যদি চাহিদা এবং যোগানের কথা বলেন এটির নীতি সবজায়গায় এক হবেনা। The Law of Supply and Demand মূলত দাম নির্ধারনের জন্য ব্যবহৃত একটি থিওরি এবং একটি ভুল থিওরি। আমাদের এটিও প্রত্যাখ্যান করতে হবে, আমাদেরকে বুঝতে হবে অর্থনীতি আসলে কী। আমাদেরকে পাশ্চাত্যের ধোঁকাবাজিকে অন্তর্চক্ষু দিয়ে দেখতে হবে। এটি আসলে কোন সমাজবিজ্ঞান নয়, বরং ইউরোপীয় ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত কিছু শিক্ষা। তাদের অভিজ্ঞতা আফ্রিকা, চায়না বা ইসলামী বিশ্বে প্রয়োগযোগ্য নয়। তারা এটিকে কীভাবে সার্বজনীন বলতে পারে! তাদের জনগণ বলে থাকে পাশ্চাত্য সমাজ হলো বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সমাজ। বাকী সবাই শিশু। তাদের ভাষ্যমতে আমরা শিশু এবং যখন আমরা বড় হব তখন তাদের মত হবো। এজন্য তাদের সভ্যতার নীতিগুলো সবার উপর তারা প্রয়োগ করছে। এটি খুবই হাস্যকর। এজন্য আমাদের নিজস্ব সমাজবিজ্ঞান দাঁড় করাতে হবে। এবং সে সমাজবিজ্ঞান আমাদের বলে দিবে কীভাবে রাজনীতি, অর্থনীতি এগুলো পরিচালিত হবে। আজকে আমরা সারা মুসলিম বিশ্ব- আমাদেরতো গণতন্ত্র নেই, আমাদের মুক্ত বাজার নেই, ইত্যাদি বলে বলে মায়াকান্না করছি। আমরা একইসাথে সেইসবও চাই যার গুণকীর্তি পাশ্চাত্য করে, আবার কুরআনে যা আছে, তাও চাই। এটি খুবই আহম্মকী এবং এর ফলাফল হল দাসত্ব। এজন্য জ্ঞানের বি-উপনিবেশায়ন আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। দুঃখজনকভাবে যে কয়েকজন ব্যক্তি এটি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেছিলেন তাদের বেশিরভাগও উত্তর-আধুনিক থিওরেটিক্যাল দেয়ালে আটকে গেছেন। পুঁজিবাদি ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমের দিকে যেতে হবে; এমন চিন্তা সঠিক নয়। আমাদের কুরআনের ভিত্তির উপর দাঁড়াতে হবে, পশ্চিমা ধারাগুলোর মধ্যে যেকোন একটি বেছে নেওয়াটা সমাধান নয়। পাশ্চাত্যের সমাজবিজ্ঞান গড়ে উঠে খ্রীস্টবাদকে প্রত্যাখ্যান করে একটি সমাজকে গঠন করার ভিত্তি হিসেবে। এক অর্থে সমাজবিজ্ঞান একটি দ্বীন যা খ্রিস্টবাদকে প্রতিস্থাপন করেছে। আমাদেরতো নিজস্ব দ্বীন আছে, যেখানে ফিকাহর মত সমৃদ্ধ একটি জ্ঞান আছে। আমাদের ফিকহের গ্রন্থসমূহে সবকিছু লেখা আছে। আমাদের শুধু শিখতে হবে আধুনিক সময়ের সমস্যাসমূহ সমাধানে কিভাবে সেগুলোকে কাজে লাগানো যায়। কিন্তু এই কাজটি কেউ করছেনা। আমাদের উলামাগণ তাদের নিজস্ব ফিল্ডে পশ্চিমা স্কলারদের সাথে লড়াই করার মতো পারদর্শী হয়ে উঠেননি। এটি আমাদের শিখতে হবে।
৩য় প্রশ্ন : কেন আমরা ইসলামী অর্থনীতি শব্দটি ব্যাবহার করছি? এটি কি মুসলিম/ অমুসলিম নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য নয়?
উত্তর : এটি অন্টলোজির বিষয়, ইউরোপীয়রা বিশ্বাস করে স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই। মৃত্যুর পর আপনি ধূলা হয়ে যাবেন। তাই প্রত্যেকের উচিত নিজের জন্য যা প্রয়োজন তাই করা। তারা ভবিষ্যত প্রজন্ম নিয়ে বা অন্য কারও সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ভাবেনা। তাদের কাছে আমানতের ধারণা নেই। অন্যদিকে ইসলামী অর্থনীতি আল্লাহ এবং আখেরাতের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে আপনাকে অন্যের কথা ভাবতে হবে, পৃথিবীকে আমানত হিসেবে দেখতে হবে এবং এটিকে যথাযথ সংরক্ষনের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এজন্য যারা স্রষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের সাথে ইসলামের মৌলিক ভিত্তিতেই পার্থক্য বিরাজমান। আপনি যদি পশ্চিমাদের বলেন ভদ্র হতে, তারা বলবে ‘কেন?’ এই পৃথিবীটা একটি জঙ্গল, আমরা সবাই পশু। নিজের প্রয়োজনে আমি তোমার গলা কেটে দিতে পারি, তুমি আমার গলা কেটে দিতে পারো। জীবন হলো Survival of fittest. তাদের অর্থনীতি profit maximization এর জন্য। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তারা ইসলামী অর্থনীতিকে গ্রহণ করবেনা। এজন্য ইসলামী অর্থনীতি কেবল এমন একটি সমাজেই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, যেখানে ইসলামী আখলাক ও মূল্যবোধসমূহ প্রতিষ্ঠিত আছে। বিশ্বনবী এমন একটি সমাজে এসেছিলেন যেখানে মানুষ একে অন্যকে হত্যা করতো; তাদের কন্যাসন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলতো। ইসলাম তাদের মধ্যে এমন পরিবর্তন সাধন করলো যে, মানুষতো বটেই সাহাবীরা পশু-পাখির ব্যাপারে পর্যন্ত যত্নশীল হয়ে গেলেন। রাসুল (স.) তার সাহাবীদের উটের পিঠে অতিরিক্ত বোঝা চাপাতে পর্যন্ত নিষেধ করেছেন। তিনি এমন একটি সমাজ বিনির্মাণ করেছিলেন যেখানে সাহাবিরা নিজের চেয়েও অন্যকে অগ্রাধিকার দিতেন। নিজে ক্ষুধার্ত থেকে অন্যকে খাওয়াতেন, নিজের প্রিয় জিনিসটা দান করে দিতেন। সেই সমাজেই ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এজন্য ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়নের জন্য আগে ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ লাগবে।
[1] Islam & the World: The Rise and Decline of the Muslims and its Effect on Mankind, Syed Abul Hasan Ali Nadawi
[2] Emergence of Logical Positivism: http://bit.ly/azelp
[3] টমাস ব্যাবিংটন এডওয়ার্ড মেকলে ছিলেন একাধারে লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্কের আইন সচিব এবং ‘কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’ – এর সভাপতি । তিনি প্রাচ্যশিক্ষার পরিবর্তে এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিষয়ে যে বিখ্যাত প্রস্তাব পেশ করেন ( ১৮৩৫ খ্রি. ২ ফেব্রুয়ারি ) তা ‘মেকলে মিনিটস’ বা ‘মেকলে মিনিট‘ নামে পরিচিত।
[4] A Dazzle of Western Knowledge: http://bit.ly/AZdazzle
[5] Uloom-ul-umran: An Islamic Alternative to western Social Sciences http://bit.ly/AZUUU
[6] Building Genuine Islamic Financial Institutions: http://bit.ly/bgifi
Islamic Monetary Policy: http://bit.ly/AZRiba1
[7] How to Launch an Islamic Revival: http://bit.ly/azlir
[8] Islamic Economics: a Polar Opposite of Capitalist Economics
[9] Real Statistics: A Radical Approach: http://bit.ly/AZRealStats
[10] Islamization of Knowledge – An Islamic WorldView: http://bit.ly/cie1iok
অনুবাদ : নাজিয়া তাসনিম
