উপমহাদেশে নারী ব্যক্তিত্ব ও তাদের সামাজিক জীবন

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিত্ব চিন্তা ও দর্শন সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ইতিহাসের প্রারম্ভ থেকেই নারীরা সভ্যতা বিনির্মাণের মূর্ত প্রতীক। সৃষ্টির শুরু থেকে নারীদের মর্যাদা, অধিকার ও অবদানের পটভূমি স্পষ্ট। শিক্ষা-দীক্ষা থেকে শুরু করে পেশাদারিত্বে নারীদের পদচারণা ছিল প্রাণোচ্ছ্বল। নববী যুগ থেকেই নারীরা জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি পারিবারিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে ইতিহাসের কালক্রমে মুসলিম নারীদের সামাজিক জীবনে ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা কম হয়েছে। খাদিজা (রা) ছিলেন একজন প্রভাবশালী সামাজিক ব্যক্তিত্ব, কিন্তু পরবর্তী ব্যাখ্যায় তার ভূমিকা চাপা পড়ে যায়। আবার, আয়েশা (রা) কেবল হাদীসের শিক্ষক হিসেবে পরিচিত হলেও, তিনি ছিলেন ফকিহ, ইতিহাসবিদ, চিকিৎসাবিদ এবং খোলাফায়ে রাশেদার সময়ে খলিফাদের অন্যতম উপদেষ্টা। আলী (রা) এর সময় তার রাজনৈতিক ভূমিকা নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এমন বহু নারী সাহাবি ছিলেন যারা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ফাতিমা বিনতে আলি, হাম্বলি মাযহাবের পণ্ডিত, সমসাময়িক আলেমদের কাছে শিক্ষা গ্রহণের উৎস ছিলেন। ফাতিমা বিনতে কায়েস ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ ও আইনবিশেষজ্ঞ নারী। শিফা বিনতে আবদুল্লাহ ছিলেন প্রখ্যাত আইনবিদ, যাকে উমর (রা) ইসলামী আদালতে বিভিন্ন দায়িত্ব অর্পণ করেন। ইমামদের সময়কাল, খলিফাদের শাসনকাল এবং সালতানাতের সময়ে নারীদের অবদান ছিল চেতনাদীপ্ত।

জয়নব আল গাজ্জালী এবং মরিয়ম জামিলা যেমন গড়ে উঠেছিলেন, তেমনি মহীয়সী নারীদের থেকে জন্ম নিয়েছে সালাউদ্দিন আযিউবি, ফাতিহ সুলতানদের মতো বীর মুজাহিদরা। যুগের পর যুগ, এমন নারীরা সভ্যতা বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

ইসলাম মধ্যপ্রাচ্যকে পরিগ্রহ করার পর, মুসলিম নারীদের জীবনে এক ধরনের ভিন্নতা আসে। তুরস্কের সেলজুক, মামলুকি রাষ্ট্র এবং উসমানীয় খেলাফতের সময় নারীদের পুরুষদের সমমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা লেখাপড়া ছাড়াও পুরুষদের মতো বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত হয়ে সমাজ গঠনে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। উসমানী খেলাফতের শুরুর সময় মুসলিম নারীরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন। সুলতানদের মেয়ে বা মায়েরাও রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। নারীরা তখন দেশের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন, বিশেষত শহরের তুলনায় গ্রামীণ নারীরা বেশি স্বাধীন ছিলেন। তারা পুরুষের সাথে কৃষিকাজ, ফসল তোলা এবং অন্যান্য কাজে অংশগ্রহণ করতেন।

উসমানীয়দের সময়, নারীরা বেশি সুযোগ-সুবিধা লাভ করেন এবং তাদের কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। নারী শিক্ষায় প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করতেন। নারীদের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হওয়ার ফলে, যেমন শিক্ষক, ব্যবসায়ী, নার্স, গাইনী, সুরকার, লেখক, সাংবাদিক ইত্যাদি পেশায় তারা দক্ষতা অর্জন করেন।

অবশেষে, ইতিহাসে মুসলিম নারীরা জ্ঞান, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে আলাদা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। তারা বিবাহ, ডিভোর্স, জ্ঞান, সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের নারীদের তুলনায় অগ্রগামী ছিলেন। তবে কালক্রমে, নারীদের এ অবদান সাহিত্যে সেভাবে জায়গা পায়নি।

সাধারণভাবে, নারীদের অগ্রযাত্রায় কিছু বাধা ছিল:
নারীরা পুরুষদের উপর নির্ভরশীল ছিল।
সাধারণভাবে মুসলিম নারীরা পর্দার আড়ালে থাকতেন।
নারীদের উচ্চশিক্ষা সাধারণত সমাজের উচ্চস্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং তাদের কার্যক্রম ছিল পরিবার ও সংসারের কাজের মধ্যে।
নারীদের আর্থিক সক্ষমতা ছিল না যা বিশিষ্ট ব্যক্তি গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য।
নারীরা গৃহকর্মের দিকে ঝুঁকে পড়তেন বা বাধ্য হতেন।

তবে, বাংলার মুসলিম শাসনামলে কিছু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী ছিলেন, যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন। তারা সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং আর্দশবোধের মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করেছিলেন। একদিকে, হিন্দু নারীদের জন্য কঠোর প্রতিবন্ধকতা ছিল, যেমন তারা সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন এবং বাল্যবিবাহ ও কৌলিন্য প্রথার কারণে তারা অসহায় হয়ে পড়তেন।

অপরদিকে, মুসলিম নারীদের অবস্থা অনেক ভালো ছিল, তারা সমাজের বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করতেন এবং পুরুষদের সাথে সমানভাবে কাজ করতেন। মোঘল সালতানাতের সময়ে নারীদের প্রভাব ছিল বিশেষত সামাজিক কাজে। তারা সংগীত, ধনুকবিদ্যা, পুথিগত বিদ্যা সহ অন্যান্য বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন।

এভাবে, মুসলিম নারীরা সমাজে মর্যাদাসম্পন্ন একটি পদে নিজেদের অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন, যা তাদের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

নবাব মুর্শিদকুল খানের মেয়ে জিন্নাতুন্নেসা প্রশাসনের কাজে বিরাট অবদান রেখেছিলেন। নবাব আলিবর্দী খানের বেগম, শরফুন্নেসাও ছিলেন একজন সংস্কৃতিসম্পন্না ও গুণবতী নারী। তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তার পদচারণার গভীর ছাপ রেখে গিয়েছেন। শাসন কার্য পরিচালনায় সব থেকে বেশি সহযোগী ছিলেন তিনি এবং নবাবের সকল কাজের উপদেষ্টা হিসেবে বিরল ছিলেন। মারাঠা অভিযানের মধ্যে দিয়ে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে শরফুন্নেসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে জানা যায়। শুধু তাই নয়, নবাবের প্রশাসনে তার গভীর প্রভাব ছিল। সিরাজউদ্দৌলার সময়েও তার প্রভাব অব্যাহত ছিল। বলা চলে, শরফুন্নসা সেসময় নারী সমাজের আদর্শ ছিলেন। অসংখ্য অনাথ মেয়েকে তিনি প্রতিপালন করতেন এবং শিক্ষা দীক্ষায় পরিপূর্ণ করে উপযুক্ত সময়ে তাদের বিবাহ দিতেন।

মোগল হেরেমের রমণীকুলের মধ্যে নানা কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন বাবর-কন্যা গুলবদন বেগম, সম্রাজ্ঞী নূরজাহান, শাহজাহান মহিষী মমতাজ মহল, দারাশিকোর স্ত্রী নাদিরা বেগম, আওরঙ্গজেব-কন্যা কবি জেবুন্নিসা, শাজাহান-কন্যা রওশন আরা, শাজাহান-দুহিতা জাহানারা এবং বাহাদুর শাহ জাফরের স্ত্রী জিনাত মহল। তবে প্রায় সকলেই নানা কারণে ও যোগ্যতায় আলোচিত-বিখ্যাত হলেও নূরজাহান, জাহানারা এবং জেবুন্নিসার ইতিহাস অন্য সকলের চেয়ে আলাদা এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

নূরজাহান বা ‘জগতের আলো’ নামে খ্যাত এই মোঘল রমণী কেবল ভারতবর্ষ বা মোঘল ইতিহাসেই নয়, বিশ্ব ইতিহাসেরও এক বিস্ময়কর নারী-ব্যক্তিত্ব। পৃথিবীর ইতিহাসে তার সমকক্ষ খুব কম নারীরই দেখা পাওয়া যায়। মোগল প্রশাসন ও কীর্তিতে নূরজাহানের অবদান অনস্বীকার্য। তার ভ্রাতুষ্পুত্রী মমতাজ মহল বিশ্ববিস্ময় তাজমহলে চিরশায়িতা। দৌহিত্রী বেগম জাহানারা মোঘল ইতিহাসে কল্যাণময়ীর উজ্জ্বল-প্রতীক। তার অধস্থন বংশধর আওরঙ্গজেব কন্যা জেবুন্নিসা ললিতকলায় অবদানের জন্য চিরনন্দিতা।

নূরজাহানের কাব্য-প্রতিভা স্বরচিত ফারসি কবিতার বই দিওয়ানে মাকফি তে লিপিবদ্ধ, যা তার উচ্চতর কবি পরিচয়কেও অন্যান্য দক্ষতার পাশাপাশি তুলে ধরে। স্বামী জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তিনি মাঝে মাঝে স্বরচিত কবিতায় বাক্যালাপ করতেন, যাকে বলা হয় ‘নাজ’ ও ‘নাখরা’। আবার এককভাবে স্বরচিত কাব্যপাঠ বা ‘মুশায়েরা’ তাঁর সময় থেকেই উপমহাদেশের সাহিতাঙ্গনে বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরবর্তীকালে এই মুশায়েরা উত্তর ভারতের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব-অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যা এখন পর্যন্ত প্রচলিত রয়েছে। নূরজাহানের নিজস্ব-ব্যক্তিগত পাঠাগার ছিল। সম্রাজ্ঞী হওয়ার পূর্বে তাঁর আপন হস্তাক্ষর মির্জা কামরানের দিওয়ান-এর প্রথম পাতায় পাওয়া যায়।

পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনি একজন চতুর রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। নূরজাহান আসলেই কত ক্ষমতাবান এবং মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন, তার প্রমাণ তিনি জীবনকালে এবং মৃত্যুর পরেও রেখে গেছেন। সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ও সুগভীর কূটনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক স্মরণীয় নাম।

মোঘল সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ বাবরের নানীও ছিলেন একজন অসামান্য ব্যক্তিত্ব। মোঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে দেখা গেছে, সিংহাসনের উত্তরাধিকারী পুরুষদের একেকজনের দৃঢ় ব্যক্তিত্বের দিগ্বিজয়ী সম্রাট হয়ে ওঠা কিংবা তাদের মানস তৈরি অথবা পেছন থেকে তাদের পরিচালনায় ছিলেন কোন একজন অসামান্য নারী, যারা বুদ্ধিমত্তা এবং বিচক্ষনতার মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন অগাধ শ্রদ্ধা আর বিপুল প্রভাব। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী ও বুদ্ধিমতী একজন নারী। তার পরামর্শেই বেশিরভাগ কাজ করা হতো।

মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর, নিজের স্মৃতিকথা বাবরনামা-তে তার নানী সম্পর্কে এমন কথা বলেছেন। ওই বইয়ের মুখবন্ধে বলা হয়েছে, ১৪৯৪ সালে বাবরের পিতার মৃত্যুর পর বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এহসান দৌলত বেগম, বাবরের পথপ্রদর্শক ও সাহায্যকারী হিসেবে পাশে ছিলেন। প্রকৃত ক্ষমতা এবং কার্য পরিচালনার ভার তার হাতে ছিল।

বাবরের স্ত্রী মাহাম বেগম ছিলেন শক্তিশালী ও প্রাণোচ্ছল নারী, এবং ধারণা করা হয় বাবর তাকে কখনো কোনো কিছু করতে নিষেধ করেননি। মাহাম বেগম সুশিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী এবং বড় মনের অধিকারী ছিলেন।

সম্রাট হুমায়ুনের বোন গুলবদন বেগম হুমায়ুন নামা লিখেছিলেন। মাহাম বেগম, গুলবদনকে দেখাশোনা করতেন এবং তিনিই তাকে পড়ালেখা শিখিয়েছেন। যখন হুমায়ুনকে বাদাখশানের গভর্নর হিসেবে প্রথম দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন তার প্রশিক্ষণের সময় মাহাম বেগম পুত্রের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। হুমায়ুনকে রাজ সিংহাসনের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তুলতে মাহাম বেগমের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। লেখক রুবি লাল, ব্রিটিশ লেখক এএস বেভারিজকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, “স্ত্রী এবং রানী দুটি ভূমিকায়, মাহাম বেগমকে প্রজ্ঞা, মর্যাদা এবং কর্তৃত্বের সমন্বয়ে একজন বিচক্ষণ নারী বলে মনে করা হতো যিনি তার সন্তানদের নানা ধরণের পরামর্শ এবং নির্দেশনা দিতে পছন্দ করেন। নেতৃত্ব দেওয়া এবং তার পরিবারের নাম ও সম্মান বজায় রাখাকে তিনি তার কর্তব্য বলে মনে করতেন।”

এর বাইরে রাজনৈতিক বিষয়ে হামিদা বানু বেগমের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মোঘল ভারতে রাজবংশের নারীদের অনেক আইনি অধিকার এবং অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। তাদের ডিক্রি বা ফরমান জারি, সংকেত দেওয়া বা পরোয়ানা দেয়াসহ নানা ধরণের সরকারি নথি জারি করার ক্ষমতা ছিল।

এভাবে, মোঘল সাম্রাজ্যের নারীরা তাদের ক্ষমতা ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অর্জন করেছিলেন।

এহসান দৌলত বেগম ছিলেন মেজাজি ও কৌশলী, অত্যন্ত দূরদর্শী ও বুদ্ধিমতী। তার পরামর্শেই বেশিরভাগ কাজ করা হতো। মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর তার স্মৃতিকথা বাবরনামাতে তার নানি সম্পর্কে এমন কথা বলেছেন। বইটির মুখবন্ধে বলা হয়েছে, ১৪৯৪ সালে বাবরের পিতার মৃত্যুর পর বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এহসান দৌলত বেগম বাবরের পথপ্রদর্শক ও সাহায্যকারী হিসেবে পাশে ছিলেন। প্রকৃত ক্ষমতা এবং কার্য পরিচালনার ভার তার হাতে ছিল।

মাহম আনগা: ‘আনগা’ শব্দটি তুর্কি, যার অর্থ স্নেহময়ী ধাত্রী, যিনি মায়ের স্নেহ দিয়ে অন্যের সন্তানকে লালন করেন। মাহম আনগা মায়ের স্নেহ দিয়ে বড় করে তুলেছিলেন আকবরকে। বুদ্ধিমতী ও শিক্ষিত হিসেবে তুরস্কের মেয়ে মাহমের নাম ছিল ব্যাপক। যুদ্ধবিদ্যা ও দিল্লির সিংহাসন পরিচালনার জন্য আর্থিক এবং প্রশাসনিক নানা বিষয়ে জ্ঞানার্জনে তিনি নিজেকে সবসময় ব্যস্ত রাখতেন। এর বাইরে নানা বিষয়ে জ্ঞানার্জনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। মোঘল পরিবারের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, তার পরিচালন শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার কারণে মাহম আনগা চিরকাল মোঘল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

সেলিমা বেগম: বাদশা আকবরের ফুফাতো বোন, যিনি একসাথে আকবরের চতুর্থ স্ত্রী ছিলেন এবং মোঘল হেরেমের রাজকন্যা থেকে সুলতানা হয়ে যান। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তিনি তার স্বামী ও সৎ ছেলে জাহাঙ্গীরের শাসনামলে মোঘল দরবারে অনেক বড় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। এছাড়াও ইতিহাস তাকে স্মরণ করে একজন ধার্মিক, উচ্চ শিক্ষিত, রুচিসম্পন্ন, অত্যন্ত প্রতিভাবান, বুদ্ধিদীপ্ত, সুদক্ষ, বিদুষী মহিলা হিসেবে। তার অসাধারণ প্রজ্ঞার জন্য তাকে ‘যুগের খাদিজা’ (খাদিজা-উজ-জামানি) নামে ডাকা হতো। তিনি তার কাজ ও আচরণের মাধ্যমে নিজেকে একজন উচ্চ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, বুদ্ধিদীপ্ত নারী হিসেবে উপস্থাপন করে গিয়েছেন।

বি-আম্মা: যিনি এই উপমহাদেশের সচেতন নারীদের, বিশেষত মুসলিম নারীদের জন্য এক উজ্জ্বল উপমা। তিনি এমন একজন নারী, যিনি ছিলেন খেলাফত আন্দোলন এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন নেত্রী। আবাদি বানু বেগম, ‘বি আম্মা’ হিসেবেই অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি পরিপূর্ণ পর্দার ভিতরে থেকেও জীবন যাপন করতেন, তবে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করা থেকে নিজেকে অব্যাহতি দেননি। খেলাফত আন্দোলনের সময় তিনি নারীদের সভায় একত্রিত করে ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা বুঝানোর চেষ্টা করতেন। তিনি সর্বদা হিন্দু-মুসলিমদের মাঝে একতা জাগিয়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন, যা তাদেরকে অভিন্ন শত্রু সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশদের বিরুদ্ধে এক কাতারে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সর্বশেষ, তিনি আমাদের মাঝে একটি সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন রেখে গিয়েছিলেন।

সুলতানি আমলে সমাজে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েই প্রতিটি নারীরই উচ্চ মর্যাদা ছিল। অভিজাত মুসলমান এবং সামন্তশ্রেণির হিন্দু নারীদের মধ্যে পর্দা প্রথা বিদ্যমান থাকলেও তারা শৌখিন ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য শিক্ষাদীক্ষার চর্চা করতো। হিন্দু সমাজে সতীদাহ, বাল্যবিবাহ এবং জওহরব্রত প্রথা প্রচলিত ছিল। এতদসত্ত্বেও সমাজে তাহজীব-তমদ্দুন তথা সংগীত ও নাচ-গানের চর্চা বিদ্যমান ছিল।

মোঘল সম্রাট হুমায়ুনের স্ত্রী হামিদা বানু বেগম, সুলতানা রাজিয়া থেকে শুরু করে এমন অনেক প্রভাবশালী নারীদের ইতিহাস আমাদের জানা। মুসলিম সালতানাতের আদী থেকে বিভিন্ন সময়ের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাদের সামাজিক জীবনে ভূমিকা শক্তিশালী ছিল।

নারীরা জীবনের সকল ক্ষেত্রেই পুরুষের সঙ্গে সমানাধিকার ভোগ করেছে। পতঞ্জলি বা কাত্যায়ণের মতো প্রাচীন ভারতীয় বৈয়াকরণের লেখা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, আদি বৈদিক যুগে নারীরা শিক্ষিত ছিলেন। ঋক বেদের শ্লোক থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, নারীরা পরিণত বয়সে বিবাহ করতেন এবং সম্ভবত স্বয়ম্ভরা নামক প্রথায় নিজের স্বামী নির্বাচনের বা গান্ধর্ব বিবাহ নামক প্রথায় সহবাসের স্বাধীনতা তাদের ছিল। তবে ধর্মীয় দিক বিবেচনায় বেশ প্রতিবন্ধকতাও ছিল। এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রথা চালু হওয়ার কারণে নারীদের প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে আড়াল করে রাখা হতো। এভাবে উপমহাদেশের শুরু থেকে ব্রিটিশ সময়কাল পর্যন্ত নারীদের সামাজিক ভূমিকা তুলনামূলক ভালো ছিল। তবে ব্রিটিশ শোষণের সময়কাল থেকে সম্পূর্ণ বদলে যায় এই রূপরেখা। টানা দু’শ বছরের শাসনে পরাধীনতার গ্লানিতে ছেয়ে যায় গোটা উপমহাদেশ। তবে এই পরাধীনতার জিঞ্জির ভাঙার সংগ্রামে তিতুমীর, টিপু সুলতান, মজনু শাহদের পাশাপাশি বি আম্মা, জিনাত মহল, জোলেখা বেগম, রাজিয়া খাতুনদের মতো ব্যক্তিত্বরা যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন।

বর্তমান অবস্থা: ভারতে নারীরা এখন শিক্ষা, ক্রীড়া, রাজনীতি, গণমাধ্যম, শিল্প ও সংস্কৃতি, সেবা খাত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে পূর্ণরূপে অংশগ্রহণ করছেন। ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালন করা নারী প্রধানমন্ত্রী, যিনি একটানা পনের বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তাঁকেও ইতিহাসের পাতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।

নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের উন্নতির প্রধান কারণ হচ্ছে সাক্ষরতা। ১৯৯২-৯৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে মাত্র ৯.২% পরিবার নারীদের দ্বারা চালিত হয়। তবে, দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারগুলির প্রায় ৩৫% নারীদের পরিচালনাধীন। গ্রামীণ ভারতে কৃষি এবং কৃষিসংক্রান্ত শিল্প খাতে শ্রমিকদের ৮৯.৫% নারী। সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ক্ষেত্রে মোট শ্রমিকের মোটামুটি শতকরা ৫৫% থেকে ৬৬% নারী। ১৯৯১ সালের বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে দুধ উৎপাদন শিল্পে নিযুক্ত কর্মীদের ৯৪% নারী। অরণ্যভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্পে নিযুক্ত কর্মীদের ৫১% মহিলা।

ব্রিটিশ শোষণের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত নারীদের সামাজিক জীবনের ক্ষেত্রে দু’ধরণের প্রান্তিকতা দেখা যায়। এক, নসকে প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্নকারী ডগমেটিজম। দুই, পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী চিন্তা। অর্থাৎ এক শ্রেণী পুরোপুরি পাশ্চাত্যের আদলে গড়ে উঠছে, আরেক শ্রেণী ওরিয়েন্টালিস্টদের তৈরিকৃত হাদীসের ব্যাখ্যায় নিজেদের গন্ডিবদ্ধ করে রাখছেন। যেখানে সমাজের আলেম শ্রেণী এই অবস্থায় উপনীত হতে বাধ্য করছেন।

যে মুসলিম নারীরা মুহাদ্দিস, ফকিহ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, ব্যবসা, নার্সিং, যুদ্ধে সহযোগিতাসহ সমাজের ৪৯% অবদান রেখেছিলেন, সেটা সময়ের কালক্রমে এসে সম্পূর্ণ বিপরীত কীভাবে হলো!

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি যে, ওরিয়েন্টালিস্টরা কীভাবে আমাদের কুরআন সুন্নাহর ব্যাখ্যা নিজেদের মত করে বাতলে দিল। হ্যাঁ, যখন ইসলামী সভ্যতার পতনের পর পুরো বিশ্ব তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন মুসলিমদের জ্ঞানের সকল ভান্ডারকে কপিরাইট করে নিজেদের চিন্তার আলোকে ইসলামী জ্ঞান তৈরি করেন। অবাক লাগলেও সত্য যে, প্রায় ৩০০ এর উপরে তারা হাদিসের গ্রন্থ রচনা করেন। সবকিছু থেকে মূল উসূলকে সরিয়ে তাদের মেথোডলজির আলোকে বিন্যাস করে। পুরো দুনিয়ায় তাদের চিন্তাকে ছড়িয়ে দেয়ার এটাই ছিল সবচেয়ে বড় মাধ্যম। সভ্যতার পতন পরবর্তী সময়ে তারাই সর্বপ্রথম বর্তমান সময়ে বিদ্যমান মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে। ততক্ষণে সকলে নানান বেকায়দায় পড়ে অধঃপতন ও স্থবিরতার মধ্যে নিপতিত হয়। বর্তমান যে শিক্ষাব্যবস্থা, এর সম্পূর্ণ সিলেবাস তাদেরই হাতেগড়া এমনকি ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহেও সেই সিলেবাসের আলোকেই পাঠ্যদান চলছে। জ্ঞানগত ও চিন্তাগত ভিত্তিকে সমুলে ধ্বংস করে মুসলিমদের তৈরিকৃত যত ইনস্টিটিউট ছিল সবগুলোকে মাটির নিচে গেঁড়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, লক্ষ লক্ষ আলেম উলামাকেও হত্যা করেছে। অর্থাৎ তাদের মিশন ও ভিশন মুসলিমদের ইতিহাসবিহীন জাতিতে পরিণত করা। তারপরও আমরা তাদের এই ইতিহাস না জেনে আজ পর্যন্ত কোনো গঠনমূলক আলোচনা সামনে আনতে পারিনি।

তাহলে মূলকথায় আসা যাক। যেখানে ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ী রহ., বুখারী উনাদের মতো বড় মাপের ব্যক্তিদের উস্তাজ ছিলেন নারী। যে সালাউদ্দিন আইয়ুবির মতো যোদ্ধাদের গল্প শুনি, সেসব মুজাহিদ, জ্ঞানের বিপ্লবী, ঈমানী চেতনার ভিত্তির কারিগর এই নারী, সেই নারীদের দায়িত্ববোধ এতটা সংকীর্ণ হলো কীভাবে!

এই অবস্থার মূল কারণ উসূলবীহিনতা। প্রেক্ষাপট ছাড়া কুরআনের মূল টেক্সট, উসূলবিহীন হাদিসের টেক্সট নির্ভর হওয়ায় মূলত এই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। একটু চিন্তা করলেই তো বুঝা যায়, নারী হতে হলে সে আগে অবশ্যই ইনসান। তাহলে একজন ইনসানের উপর দায়িত্ববোধ কী শুধু তাকে ঘিরেই হওয়া উচিত? না, এই যে সৃষ্টিজগত, এর সাথে সম্পৃক্ত সকল কিছুর উপর হওয়া উচিত। এই প্রান্তিকতা যখন ইবাদত, যিকির, খেদমতে লিপ্ত থাকার কথা বলছে, তখন এই যে নিজের পাশের প্রতিবেশীর ঘরে খাবার নেই, যে ভাতের অভাবে নিজের বোনই পতিতাবৃত্তিতে লিপ্ত, নিজের সমাজে কৃষক, নগরায়নের দুর্ঘটনার স্বীকার, বিকৃত অর্থব্যবস্থার দরুন মানুষের করুণ অবস্থা, এসবের জন্য কি শুধু পুরুষ দায়ী থাকবে! এসবের জন্য কি শুধু পুরুষদের জবাবদিহি করতে হবে! নিরাপত্তাহীন মেয়েদের জন্য কি পুরুষরাই দায়ী হবে!

একটি পরিবার যেমন নারী-পুরুষ মিলে গঠিত হয়, তেমনি একটি সমাজও উভয়ের হাতে গড়া ফসল। যদি এক পক্ষ বাদ পড়ে, সেই সমাজ কখনো টিকে থাকতে পারে না।

একজন বৃদ্ধ মহিলাকে দেয়া রাসুল (স) এর হাদিস মোতাবেক যখন সব নারীকে আবদ্ধ করা হচ্ছে, তখন ঐ হাদিসের প্রেক্ষাপট কি শুধুমাত্র ঐ বৃদ্ধের জন্য ছিল না, সেটির মাকসাদ না জেনে সবার উপর প্রয়োগ করা হচ্ছে। কুরআন, সুন্নাত, হাদিস, ফিকহ এসব কখনো ব্যক্তিগত সমাধান দিয়েছে, কখনো সময় বা যুগের আলোকে সমাধান দিয়েছে, কখনো অঞ্চলভিত্তিক সমাধান দিয়েছে, কখনো বিশ্বজনীন সমাধান বা হুকুম দিয়েছে, আবার কখনো আদাত বা অভ্যাসগত সমাধান দিয়েছে। এখন এসবের পার্থক্য না বুঝে সবকিছু ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঠেলে দেয়া কি আদৌ ইসলামের শিক্ষা হতে পারে!

নিজ পরিবারের অবক্ষয়, নিজ সমাজ, জাতি, উম্মাহ, বিশ্বের দুরাবস্থা, এসবের জবাবদিহিতা থেকে বাঁচার উপায় কী? এর জবাব কারা দিবে? যদি গোটা দুনিয়ার সামাজিক অবস্থান পুরুষদের উপরেই ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে কেনো সত্যিকার মুক্তি, মানুষের মর্যাদা, সৃষ্টিজগতের আমানতদারিতা রক্ষা হচ্ছে না? জাতির শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা দিনের পর দিন অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে কেন?

কোনো কুরআন কিংবা সীরাতের পাতায় কিংবা ইসলামী সভ্যতা চলাকালীন সময়ে এই প্রান্তিকতার ছাপ দেখা যায়নি। মূলত এক শোষণের মাধ্যমে এই প্রান্তিকতার সৃষ্টি হয়েছে।

নারীদের সামাজিক কার্যক্রম এখনও বহাল আছে, তবে সেই সামাজিকতায় আখলাকি রূহ নেই। জাতির অসাবধানতার একটি মর্মান্তিক অধ্যায় হলো এটি, কারণ মুসলিম দাবী করা বড় অংশ এই সামাজিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন। আর ইসলামকে ধারণ না করা এমন একটি বড় অংশের মাঝে এই সামাজিকতা বিদ্যমান। তারা চিন্তা করে মানুষের মুক্তির জন্য, কল্যাণের জন্য, সমাজের কলুষতা বিলুপ্তির জন্য, দেশ বা জাতির ভবিষ্যতের কথা বলে থাকে, কিন্তু এই চিন্তাটুকু প্রতিফলিত হয় না ইসলাম ধারণকারীদের মাঝে। যেমন: গার্মেন্টস নারী বা কলকারখানায় কর্মরত নারী বা গ্রামীণ নারীদের চিত্র একটু কল্পনা করলে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন আমাদের থেকে। তাদের ক্ষেত্রে ইসলাম কী বলে? আবার অন্যদিকে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এ দায়বদ্ধতা কার? এগুলো মূলত নারীদের সামাজিক সংকট। কারণ, মানুষ গঠনকারী, প্রজন্ম গঠনকারী যেমন নারী, তেমনি সমাজ বিনির্মাণেও নারীদের অবদান সেরকম। ইসলামী সভ্যতা পতনের পর থেকে নারীদের পশ্চাপদে রাখা, ধর্মীয় ডগমেটিজমের ফলে যে বিভাজন, তার ইলাহী ইরাদার সঠিক বুঝাপড়া আজ আমাদের নেই। সমগ্র মানবতার প্রসূতি নারীদেরকে আজ ভোগের সামগ্রী হিসেবে উপস্থাপন করে পুরো মানবতাকে কলঙ্কিত করা হচ্ছে। নিজেদের অধঃপতিত, নিষ্পত্তিত, জরাজীর্ণ, দিশাহীন, চেতনাবিহীন সত্তা হিসেবে বিরাজ থাকার যে বিষয়গুলো, তার অন্যতম কারণ এটি।

নববী যুগ থেকে শুরু করে ইসলামী সভ্যতা চলাকালীন সময়ে নারীদের সামাজিক জীবন একরকম স্থিতিশীল ছিল বলা যায়। আর এটি সবচেয়ে বেশি বিকাশ লাভ করে গোটা সাড়ে ৭০০ শত বছর উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতার সময়কালে। ব্রিটিশ শোষণের মাধ্যমে এর ভাঙন দেখা যায়। তখন থেকে নারীদের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় বিভাজনের প্রেক্ষিতে এই সামাজিক জীবনযাপনের গতি মন্থর হয়ে আসে। যখন দু’শত ব্রিটিশ শোষণের ফলে পুরো উপমহাদেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন, সেই সময়েও বেশ কিছু নারী মনীষী উঠে আসেন, যারা একসাথে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, জাতীয় অঙ্গনে বীরত্ব ও সাহসিকতার উজ্জ্বল নজির স্থাপন করেন। লালবিবি, বি আম্মা, জীনাত মহল, রওশন আরা, জোবেদা খাতুন চৌধুরী, নিশাতুন্নিসা বেগম, হযরত মহল, জামালুন্নিসা, বেগম দৌলত উৎ নেসা, হোসনে আরা, রওশন আরা, সুফিয়া বিবি, শামসুন্নেসা, ফাতিমা জিন্নাহ, বেগম শামসুন্নাহার, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, গওহরজান, নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী প্রমুখ নারী ব্যক্তিত্ব সেই সময় জ্ঞান ও মুক্তির আন্দোলনে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। প্রত্যেকের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, তারা বহুমুখী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও মুসলিম নারীদের জীবন উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে গিয়েছেন। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে তাঁরা দেখিয়ে গিয়েছেন, তারা কাদের উত্তরসূরি। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাদের ইতিহাস চর্চা আমরা করি না।

অবশ্য এই ইতিহাস আমাদের নিকট চাপা পড়েছে, যেন নারীদের কোনো অবদান ছিল না কোনো কর্ম পরিচালনায়।

আজকের সময়ে এসেও দেখা যায়, বাংলা অঞ্চল বাদে তার আশেপাশের প্রতিবেশী দেশসমূহ ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া দেশজুড়ে নারীদের সামাজিক কাজসমূহ দেখা যায়। কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই বা কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। প্রতিবন্ধকতার কথা আসলে বাংলা অঞ্চলের কথা আসে। যদিও ইসলামকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ না করা এমন নারীদের মাঝে এই দিকটা বেশ প্রচলিত থাকলেও, পূর্ণাঙ্গ মুসলিম দাবীকৃত সমাজে এর প্রচলন নেই বললেই চলে। এই যে নিরাপত্তার ভয়, আদালতহীন ব্যবস্থা, টিনএজদের ভয়াবহ পথ বেছে নেয়া, দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অনটন, সুসাইড—এসকল কিছুর দায় কার উপর বর্তায়! এই সামাজিক সংকট মোকাবেলায় পুরুষ শ্রেণীর যতটুকু কর্তব্য, নারী সমাজেরও ততটুকুই কর্তব্য।

যেমন বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের কাজে নারীরা জড়িত। অনেক সময় তারা ফসল উৎপাদনে মাঠে যেমন কাজ করেন, তেমনি মাঠের বাইরে উৎপাদন কাজে প্রধান ভূমিকা রাখেন।

উন্নয়ন কর্মীরা বলছেন, প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি নারী বিভিন্ন ধরনের কৃষি উৎপাদনের সাথে সরাসরি জড়িত। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক অবদানের মূল্যায়ন বা স্বীকৃতি তারা পাচ্ছেন না। এমনই প্রেক্ষাপটে আজ উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস।

বাংলাদেশের নারীদের একটি বড় অংশ বাস করেন গ্রামে। কৃষিকাজ ও শিল্পে তারা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উবিনীগের প্রধান ফরিদা আখতার বলেন, কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ কাজ নারীরা সরাসরি করছেন, তবে মূল্যায়ন নেই। যার ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের কুটির শিল্প, তাঁত শিল্প, বস্ত্র শিল্প, পাটশিল্প সহ নানা গ্রামীণ শিল্পের প্রচলন।

এভাবে, নারীরা সমাজ গঠনে এবং সামাজিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও তাদের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে না, এবং এটি একটি বড় সমস্যা যা সমাধান করা জরুরি।

এদিকে উন্নয়নের নামে চাকা ঘুরাচ্ছেন শ্রমজীবী নারীরা, অন্যদিকে এই সামাজিক সংকট নারীদের আজ ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমে যেতে বাধ্য করেছে। কখনো বৃদ্ধাশ্রমে, আবার কখনো জীবনের চাহিদা পূরণে অক্ষম হয়ে মানসিক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, নারীর বস্তুবাদ ও পুঁজিবাদ তো ক্ষতি করছেই। এগুলোর সমাধান কী হতে পারে?

কুরআন সুন্নাহর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। এই দায়িত্ববোধ উভয়ের উপরেই বর্তায়। যদি উসূলী দৃষ্টিকোণ থেকে বলি, তাহলে ইমামে আযম আবু হানিফার একটি মূলনীতি হলো, “যেখানেই মাসলাহাত পাওয়া যাবে, সেটাই আল্লাহর শরিয়ত”। তাহলে এই শরিয়ত সকল কল্যাণকর বিষয়কে উৎসাহ দিয়ে আল্লাহর বিধানের সাথে সম্পৃক্ত করে। তাহলে এই সামাজিক কর্মকাণ্ডের মতো একটা কল্যাণকর বিষয়কে কীভাবে বাদ রাখা যায়! পুঁজিবাদ ও কমিউনিজমের উপর ভর করে বর্তমানের যে ভোগবাদী, বস্তুবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতা দেখা যায়, এ সভ্যতার অধীনে মানবজাতি আজ আদালত, ইনসাফ, মারহামাত থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত। যার ফলস্বরূপ নারীদের কেবল মাংসপিণ্ড হিসেবে দেখা হয় এবং পতিতালয় বৃদ্ধি এখন পেশায় পরিণত হয়ে পড়েছে।

এই নারীদের সামাজিক অবস্থান, অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার আদলে এই সংকট মোকাবেলারিং জন্য করণীয় হলো:

  • সর্বপ্রথম একজন ইনসান হিসেবে আল্লাহর খলিফা হিসেবে এই দুনিয়ার, মানবতার আমানতদারি হিসেবে নিজেকে চেনা ও চিন্তা করা।
  • তাওহীদের শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে ইখলাস ও আখলাকের সমন্বয়ে নিজেদের গড়ে তুলে মানুষের জন্য কাজ করা।
  • ইসলামের মৌলিক উৎস উসূলের আলোকে সকল সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা।
  • জ্ঞানগত ও চিন্তাগত ভিত্তিকে মজবুত করে অপব্যাখ্যার ছোবল থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের বিশুদ্ধভাবে জানা এবং নিজের দায়িত্ববোধ বুঝতে সক্ষম হওয়া।
  • সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠায় ন্যায়ভিত্তিক সিস্টেম ব্যবস্থা, অসহায় মানুষদের ভাগ্য পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকটে পতিতাবৃত্তি বেছে নেয়া মানুষদের জন্য, নিজ ঘরোনার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগান্তি মেয়ে ও নারীদের জন্য নারী সমাজকে জাগতেই হবে।
  • নারী পুরুষ আলাদা সৃষ্টি নয়, বরং এক আত্মা থেকে সৃষ্ট মানব হিসেবে মানবাধিকার কর্মকাণ্ড বিনির্মাণ করতে হবে।
  • পারিবারিক থেকে সামাজিক পর্যায়, সামাজিক থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের একটি শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে হবে।
  • দ্বীন ইসলামের যে দাবি, মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে প্রকৃত সত্য, সর্বোত্তম সুন্দর, সর্বোচ্চ কল্যাণ দিয়ে পরিপূর্ণ করা, সেই দাবি পূরণের লক্ষ্যে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।
  • নারীদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা এবং তারা যেন সমাজে অবদান রাখতে পারে, সে লক্ষ্যে সুষ্ঠু ও পবিত্র পরিবেশ তৈরি করা।
  • সমাজ সমস্যা সমাধানের জন্য নারীদের আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলা, যারা সমাজের সামনে উদাহরণস্বরূপ ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রস্ফুটিত হবে।

সর্বোপরি, জাতির বিবেক ও স্পন্দন হওয়ার জন্য নিজেদেরকে আখলাক ও আধ্যাত্মিকতা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। নিজেদের প্রকৃত অবস্থান, প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হলে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস সম্বন্ধেও জানতে হবে। আত্মপরিচয় উপলব্ধির প্রয়োজনে গবেষণা করতে হবে।

এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে আমাদের মহান মুজাদ্দিন আল্লামা ইকবাল বলেছেন:

“জীবন ও সমাজ গঠনেও থাকবে নারীদের বিশেষ ভূমিকা। পর্দার (প্রান্তিকতামুক্ত) ভিতরে থেকেও আপন কর্মে ও প্রতিভা দ্বারা তিনি ভূমিকা রাখবেন জীবন ও সমাজ গঠনে। মাতৃজাতি হলো সকল সম্ভাবনার আমানতদার। সকল বিপ্লবী বৈশিষ্ট্যের উৎস। তারা যেনো নজর দেন জাতির ভাগ্য নির্মাণে এবং জাতীর বেদনার সন্ধ্যাকে পরিণত করেন বসন্তের ভোরে। উম্মাহর নারীগণই এই যুগের প্রত্যাশার আলো। এই কলুষিত যুগে তারাই পারেন জাতির সম্পদকে নিরাপদ রাখতে এবং প্রজন্মের মাঝে ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা-বিস্তারের মাধ্যমে উম্মাহর ঐক্যের ভূমি সুজলা-সুফলা রাখতে। তারা যেনো যুগের অবক্ষয় সম্পর্কে সচেতন হন।”

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *