১.
একদিন এক তরুণী, যাকে বেশ বিচলিত ও উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছিল, মহানবী (সা.)-এর দরবারে এসে নিবেদন করলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা আমার প্রতি চরম অবিচার করেছেন।”
“তোমার পিতা কী করেছেন?” রাসূল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন।
তরুণী উত্তর দিলেন: “তাঁর এক ভাতিজা আছে। আমার অনুমতি না নিয়েই তিনি আমাকে তার সাথে বিয়ে দিয়েছেন।”
মহানবী (সা.) বললেন: “যদি তাই হয়, তবে তোমার পিতা যা করেছেন তা মেনে নাও এবং তোমার চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী হিসেবে জীবন অতিবাহিত করো।”
তরুণী বললেন: “আমি আমার চাচাতো ভাইকে পছন্দ করি না। যাকে পছন্দ করি না, তার স্ত্রী হিসেবে আমি কীভাবে থাকব?”
রাসূল (সা.) উত্তরে বললেন: “তবে কোনো সমস্যা নেই। তুমি যদি তাকে অপছন্দ করো, তবে তুমি তোমার পছন্দমতো অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে বেছে নিতে পারো।”
তখন তরুণীটি বললেন: “প্রকৃতপক্ষে আমি তাকেই অনেক পছন্দ করি এবং অন্য কাউকেও চাই না। আমি অন্য কারো স্ত্রী হতেও ইচ্ছুক নই। কিন্তু যেহেতু আমার বাবা আমার অনুমতি না নিয়েই বিয়ের আয়োজন করেছিলেন, তাই আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি। আমি চেয়েছিলাম আপনার মুখ থেকে এই সত্যটি শুনতে। আমি চেয়েছিলাম দুনিয়ার সব নারী জানুক যে, পিতাদের আর তাদের খেয়ালখুশিমতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং যাকে ইচ্ছা তার কাছে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার কোনো নিরঙ্কুশ সিদ্ধান্তের অধিকার নেই।”
এই ঘটনাটি প্রখ্যাত ফকিহগণ (আইনবিদ) তাঁদের গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, যার মধ্যে শহীদ সানি-র ‘মাসালিক’ এবং ‘জাওয়াহিরুল কালাম’ উল্লেখযোগ্য। ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবরা তৎকালীন অন্যান্য জাতির মতোই মনে করত যে, তাদের কন্যা, বোন এমনকি কখনো কখনো মায়েদের ওপরও তাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে। তারা স্বামী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারীর অধিকার স্বীকার করত না; এই অধিকারটি ছিল শুধুমাত্র বাবা বা ভাইদের, আর তাদের অনুপস্থিতিতে চাচাদের। এমনকি পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সম্ভাব্য পিতারা তাঁদের কন্যা জন্ম নেওয়ার আগেই বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিতেন। একজন ব্যক্তি অন্য একজনের সাথে এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হতে পারতেন যে, যদি তার কোনো কন্যা সন্তান জন্ম নেয়, তবে বড় হওয়ার পর সে ওই ব্যক্তির স্ত্রী হবে।
২.
একবার বিদায় হজের সময় মহানবী (সা.) সওয়ারিতে চড়ে যাচ্ছিলেন এবং তাঁর হাতে একটি চাবুক ছিল। পথে এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলল: “আমার একটি অভিযোগ আছে।”
রাসুল (স) বললেন, “হ্যাঁ, বলো কী ব্যাপার?”
সে বলল: “বহু বছর আগে, জাহেলিয়াতের যুগে, তারিক ইবনে মুরকা’আ এবং আমি এক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তার একটি বর্শার প্রয়োজন হলো এবং সে চিৎকার করে বলল-‘এমন কেউ কি আছে যে আমাকে একটি বর্শা দেবে এবং বিনিময়ে পুরষ্কার নেবে?’ আমি তার কাছে গেলাম এবং পুরষ্কারের কথা জানতে চাইলাম। সে বলল, তার ঘরে প্রথম যে কন্যা সন্তানটি জন্মাবে, সে তাকে আমার জন্য লালন-পালন করবে (অর্থাৎ বড় হলে আমার সাথে বিয়ে দেবে)। তারপর অনেক বছর পার হয়ে গেছে। সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে জানলাম যে, তার ঘরে এখন এক বিবাহযোগ্য কন্যা রয়েছে। আমি তার কাছে গিয়ে প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিলাম। কিন্তু সে তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং নতুন করে ‘মোহরানা’ দাবি করছে। এখন আমি আপনার কাছে জানতে এসেছি যে, সে ঠিক বলছে নাকি আমি?”
মহানবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন: “মেয়েটির বয়স কত?”
লোকটি উত্তর দিল: “মেয়েটি এখন পূর্ণ বয়স্কা। এমনকি তার চুলে পাকও ধরেছে।”
রাসূল (সা.) বললেন: “যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করো, তবে তুমি বা তারিক, কেউই সঠিক নও। তুমি তোমার নিজের কাজে যাও এবং মেয়েটিকে তার মতো থাকতে দাও।”
এই জবাবে লোকটি স্তম্ভিত হয়ে গেল এবং বেশ কিছুক্ষণ রাসূলের দিকে তাকিয়ে রইল। সে অবাক হয়ে ভাবছিল এটি কেমন রায়! এমনকি সে যদি মেয়ের বাবাকে নতুন করে মোহরানা দেয় এবং বাবা স্বেচ্ছায় তার মেয়েকে দান করে, তবুও এই চুক্তি বৈধ হবে না।
তার অবাক চাহনি দেখে মহানবী (সা.) বললেন: “চিন্তা করো না। আমি তোমাকে যেভাবে বলেছি সেভাবে করলে তোমার বা তোমার বন্ধু তারিক—কারো পক্ষ থেকেই কোনো অন্যায় হবে না।”
৩.
ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবে ‘শিগার’ (Shighar) নামক এক প্রকার বিবাহ প্রচলিত ছিল, যা ছিল মূলত কন্যাদের ওপর পিতাদের নিরঙ্কুশ ও একচ্ছত্র আধিপত্যের একটি চরম বহিঃপ্রকাশ। এই প্রথা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি তার কন্যাকে অন্য একজনের সাথে বিয়ে দিতেন এই শর্তে যে, দ্বিতীয় ব্যক্তিটিও তার কন্যাকে প্রথম ব্যক্তির সাথে বিয়ে দেবে। এই ধরণের বিয়েতে কোনো পক্ষই কোনো মোহরানা পেত না। ইসলাম এই অমানবিক প্রথাটি বিলুপ্ত করে। এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, মহানবী (সা.) তাঁর কন্যা ফাতেমা জাহরা (সা.)-এর স্বামী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।
তিনি তাঁর অন্যান্য কন্যাদেরও বিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু কখনোই তাঁদের এই স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করেননি। আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) যখন ফাতেমা (সা.)-এর পাণিপ্রার্থী হয়ে রাসুলের কাছে এলেন, তখন রাসুল (সা.) জানালেন যে, ইতিপূর্বে আরও অনেকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল। তিনি সেই প্রস্তাবগুলো ফাতেমার কাছে পেশ করেছিলেন, কিন্তু ফাতেমা অসম্মতি জানিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তবে নবীজী আলীকে আশ্বস্ত করলেন যে, তিনি তাঁর প্রস্তাবটিও ফাতেমার কাছে পৌঁছে দেবেন।
রাসুল (সা.) তাঁর প্রিয়তমা কন্যার কাছে গিয়ে আলীর মনের ইচ্ছার কথা জানালেন। এবার ফাতেমা মুখ ফিরিয়ে নিলেন না, বরং চুপ করে রইলেন; যা ছিল তাঁর মৌন সম্মতির লক্ষণ। রাসুল (সা.) যখন কক্ষ থেকে বের হলেন, তখন তিনি অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন এবং উচ্চকণ্ঠে বললেন, “আল্লাহু আকবার!”
৪.
ইসলাম নারীজাতির এক মহান সেবা করেছে। এটি কেবল পিতাদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বেরই অবসান ঘটায়নি, বরং নারীকে দিয়েছে স্বাধীনতা, স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব এবং চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধিকার। ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে নারীর প্রাকৃতিক অধিকার (Natural Rights) স্বীকার করে নিয়েছে। তবে ইসলামের গৃহীত পদক্ষেপের সাথে পাশ্চাত্যে যা ঘটছে বা যা অন্যেরা অনুসরণ করছে, তার মধ্যে দুটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে:
প্রথমত: এটি নারী ও পুরুষের মনস্তত্ত্ব বা জেন্ডার সাইকোলজির সাথে সম্পর্কিত। এই বিষয়ে ইসলাম এমন সব অলৌকিক ও বিস্ময়কর সত্য উন্মোচন করেছে যা আমরা পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আলোচনা করব।
দ্বিতীয়ত: ইসলাম নারীকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছে এবং তাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয়, ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনতা দিয়েছে সত্য; কিন্তু এটি তাকে পুরুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বা হৃদয়ে বিদ্বেষ পোষণ করতে প্ররোচিত করেনি।
নারীর মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের এই আন্দোলনটি ছিল একটি White Movement বা শ্বেত আন্দোলন। এটি কালো, লাল, নীল বা বেগুনি—কোনো উগ্র আদর্শের রঙে রঞ্জিত ছিল না। এটি পিতাদের প্রতি কন্যাদের কিংবা স্বামীদের প্রতি স্ত্রীদের যে শ্রদ্ধা ও সম্মান রয়েছে, তাতে আঘাত হানেনি। এই আন্দোলন পারিবারিক জীবনের ভিত্তি নষ্ট করেনি এবং নারীদের তাদের পিতা ও স্বামীদের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সন্দিহান করে তোলেনি। এটি সেইসব অবিবাহিত পুরুষদের সুযোগ করে দেয়নি, যারা সবসময় নারীদের প্রলুব্ধ করার অপেক্ষায় থাকে।
এই আন্দোলন স্ত্রীদের তাদের স্বামীদের কাছ থেকে কিংবা কন্যাদের তাদের মা-বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ভোগবাদী করপোরেট হর্তাকর্তা বা অর্থবিত্তের মালিকদের হাতে তুলে দেয়নি। ইসলাম এমন কিছু করেনি যার ফলে আজ সমুদ্রের ওপারের দেশগুলোতে পবিত্র পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার হাহাকার শোনা যাচ্ছে। সেখানে পিতৃসুলভ নিরাপত্তা আজ বিলুপ্ত। ক্রমবর্ধমান ভ্রূণহত্যা, গর্ভপাত, ৪০ শতাংশ অবৈধ সন্তান এবং এমন সব নবজাতক যাদের পিতার পরিচয় জানা নেই কিংবা যাদের মায়েরা তাদের দায় নিতে চান না—এমন সব সামাজিক অবক্ষয় মোকাবিলায় তারা আজ দিশেহারা। এই শিশুরা যেহেতু বৈধ বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে জন্ম নেয়নি, তাই মায়েরা তাদের বিভিন্ন সামাজিক সংস্থায় রেখে আসেন এবং পরবর্তীতে আর কখনোই তাদের খোঁজ নেন না।
নিঃসন্দেহে, আমাদের দেশেও নারী মুক্তির একটি আন্দোলনের প্রয়োজন রয়েছে। তবে আমাদের যা প্রয়োজন তা হলো একটি পরিচ্ছন্ন ‘ইসলামি শ্বেত আন্দোলন’, ইউরোপীয় ঘরানার কোনো অন্ধকার ও কলুষিত আন্দোলন নয়।
৫.
একজন কুমারী মেয়ের প্রথম বিবাহের ক্ষেত্রে পিতার সম্মতি বা অনুমতি কতটুকু অপরিহার্য বা পিতার অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত এই বিষয়টি গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু বিষয় একেবারেই অবিসংবাদিত বা প্রশ্নাতীত। যেমন-
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: নারী ও পুরুষ উভয়ই অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন। প্রতিটি সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তার নিজস্ব সম্পত্তির ওপর পূর্ণ অধিকার রাখেন, যদি তিনি মানসিকভাবে পরিপক্ক হন এবং নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে সক্ষম হন। এক্ষেত্রে পিতা, মাতা, স্বামী কিংবা ভাই, কারো হস্তক্ষেপ বা তদারকি করার কোনো ক্ষমতা নেই।
বিবাহের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা: প্রাপ্তবয়স্ক ও পরিপক্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে বিবাহের বিষয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে এবং অন্য কারো এতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। একইভাবে, যে নারীর আগে একবার বিয়ে হয়েছে এবং বর্তমানে স্বামী নেই (বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা), তিনিও নিজের বিয়ের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীন।
তবে, যে কুমারী (Maiden) নারী প্রথমবারের মতো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাচ্ছেন, তাঁর বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। এটি নিঃসন্দেহে প্রমাণিত যে, কোনো পিতাই তাঁর কুমারী কন্যাকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করতে বাধ্য করতে পারেন না। আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি যে, মহানবী (সা.) সেই মেয়েটিকে কী বলেছিলেন যাকে তার বাবা সম্মতি ছাড়াই বিয়ে দিয়েছিলেন। রাসুল (সা.) বলেছিলেন যে, সে যদি খুশি না থাকে তবে সে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারে।
কিন্তু ফকিহ বা আইনবিদদের মধ্যে এই বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে যে, একজন কুমারী মেয়ে কি তাঁর পিতার সম্মতি ছাড়াই বিবাহের চুক্তি বা ‘আকদ’ করতে পারেন? এবং তাঁর বিবাহের বৈধতা কি কোনোভাবে পিতার সম্মতির ওপর নির্ভরশীল?
আরেকটি বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই: যদি কোনো পিতা কোনো সংগত কারণ ছাড়াই মেয়ের বিয়েতে সম্মতি দিতে অস্বীকার করেন, তবে তিনি তাঁর অধিকার হারাবেন। ফকিহগণ এ বিষয়ে একমত যে, এমন পরিস্থিতিতে মেয়েটি তাঁর নিজের পছন্দমতো যে কাউকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
তবে সাধারণভাবে একজন কুমারী মেয়ের বিবাহের বৈধতা তাঁর পিতার সম্মতির ওপর নির্ভর করে কি না, সে বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। অধিকাংশ ফকিহ, বিশেষ করে পরবর্তী যুগের আইনবিদগণ মনে করেন যে, এটি বাধ্যতামূলক নয়। তবে এখনো কিছু আলেম আছেন যারা মনে করেন যে পিতার সম্মতি প্রয়োজন।
যেহেতু এটি একটি বিতর্কিত বা মতপার্থক্যের বিষয়, তাই কেবল তাত্ত্বিক ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এর সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়। বরং একে সামাজিক দৃষ্টিকোণ (Social Point of View) থেকেও আলোচনা করা প্রয়োজন।
৬.
কুমারী মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে পিতার অনুমতি বা সম্মতির যে নিয়ম রয়েছে, তার ভিত্তি এটি নয় যে, মেয়েদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতা ছেলেদের চেয়ে কম। যদি বিষয়টি তাই হতো, তবে ইতিপূর্বে বিবাহিতা ১৬ বছরের এক তরুণী (যাকে নিজের বিয়ের সিদ্ধান্তের জন্য পিতার অনুমতি নিতে হয় না) এবং ১৭ বছরের এক অবিবাহিতা কুমারী মেয়ের (যাকে কিছু ফকিহ-র মতে অনুমতি নিতে হয়) মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না। তদুপরি, ইসলাম যদি মেয়েদের অপরিণত মনে করত, তবে তাদের অর্থ ও সম্পত্তি সংক্রান্ত স্বাধীন লেনদেনকে কখনোই বৈধতা দিত না। সুতরাং আইনি যুক্তির বাইরেও এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন রয়েছে যা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
এটি নারীর অপরিণত মানসিকতা বা বুদ্ধিবৃত্তিক অযোগ্যতার কোনো প্রশ্ন নয়। বরং এটি নারী ও পুরুষের মনস্তত্ত্বের একটি বিশেষ দিকের সাথে সম্পর্কিত। সেটি হলো—পুরুষের প্রলুব্ধ করার প্রবৃত্তি এবং পুরুষের আনুগত্য ও সত্যবাদিতার প্রতি নারীর সরল বিশ্বাস বা অতি-বিশ্বাসপ্রবণতা।
পুরুষের অন্বেষা কাম, আর নারীর অন্বেষা প্রেম। পুরুষ তার যৌন তাড়না দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত হয়; অন্যদিকে মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নারীর নিজের আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ ও গোপন করার ক্ষমতা অনেক বেশি। প্রেমের সুর, আন্তরিকতা এবং বিশ্বস্ততার মাধুর্যই নারীকে বশীভূত করে এবং তাকে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করে। নারীর এই ‘সরল বিশ্বাস’ বলতে ঠিক এটিই বুঝানো হয়েছে।
যতক্ষণ একজন নারী কুমারী থাকেন এবং পুরুষদের সম্পর্কে তাঁর কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকে না, ততক্ষণ তিনি খুব সহজেই পুরুষের প্রেমের অভিনয়ে প্রলুব্ধ হতে পারেন। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী প্রফেসর রিক (Reeck) বলেন, “একজন পুরুষ একজন নারীকে যে শ্রেষ্ঠ বাক্যটি বলতে পারেন তা হলো—’প্রিয়তমা, আমি তোমাকে ভালোবাসি’।” তিনি আরও বলেন, একজন নারীর সৌভাগ্য হলো একজন পুরুষের হৃদয় জয় করা এবং সারা জীবনের জন্য তা ধরে রাখা।
মহানবী (সা.), divine psychologist, ১৪০০ বছর আগেই এই সত্যটি স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন: “কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীকে বলে যে সে তাকে ভালোবাসে, তবে নারীটি তা কখনোই ভোলে না।”
যেসব পুরুষ নারীদের প্রলুব্ধ করতে চায়, তারা নারীসুলভ এই অনুভূতির পূর্ণ সুযোগ নেয়। ‘আমি তোমার জন্য মরে যাচ্ছি’—এই জাতীয় শব্দগুলোই সেইসব সরল মেয়েদের ভুল পথে চালিত করার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার, যাদের পুরুষদের সম্পর্কে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।
এই কারণেই এটি অত্যন্ত জরুরি যে, যে মেয়ের পুরুষদের সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তিনি বিবাহের চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার আগে অবশ্যই তাঁর পিতার সাথে পরামর্শ করবেন এবং তাঁর অনুমতি নেবেন। পিতারা পুরুষদের মানসিকতা সম্পর্কে ভালো জানেন এবং হাতেগোনা দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁরা সবসময় তাঁদের কন্যার মঙ্গল কামনা করেন। এক্ষেত্রে আইন কোনোভাবেই নারীকে ছোট করেনি, বরং তার স্বার্থ সুরক্ষায় এক অনন্য পদক্ষেপ নিয়েছে। মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে পিতার সম্মতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি তোলা আর ‘কেন ছেলেদের ক্ষেত্রে পিতা বা মাতার অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়নি’, এই প্রশ্ন তোলা সমান অযৌক্তিক।
আমি অবাক হয়ে ভাবি, যেসব মানুষ প্রতিদিন তরুণ-তরুণীদের অবাধ প্রেমের কুফল ও সামাজিক বিপর্যয়গুলো দেখছেন, তাঁরা এখনো কীভাবে মেয়েদের তাদের অভিভাবকের উপদেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে কিংবা উদাসীন থাকতে পরামর্শ দেন!
আমাদের দৃষ্টিতে, এই আচরণটি মূলত তাদের এক ধরণের যোগসাজশ, যারা একদিকে নারীর প্রতি সহানুভূতি দেখায় আর অন্যদিকে তাদের প্রলুব্ধ করার অপেক্ষায় থাকে। প্রথম পক্ষ দ্বিতীয় পক্ষের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয় এবং তাদের কাজকে সহজ করে তোলে।
বিবাহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিরঙ্কুশ অধিকার মেয়েদেরই। তবে এর বৈধতা পিতার সম্মতির ওপর নির্ভরশীল, যদি না পিতা কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে কিংবা ব্যক্তিগত অযোগ্যতার কারণে সেই অনুমতি প্রদানে অস্বীকৃতি জানান। এমন একটি নিয়মে কী ভুল থাকতে পারে? একে কি মানুষের মৌলিক স্বাধীনতার পরিপন্থী বলা যায়? এটি মূলত অনভিজ্ঞ মেয়েদের স্বার্থ রক্ষার একটি সতর্কতা এবং পুরুষের প্রকৃতি সম্পর্কে এক ধরণের সতর্কতামূলক সংশয় মাত্র।
এদিক থেকে ইসলামি আইনের বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি তোলা যায় না। বরং যা আপত্তিকর, তা হলো মুসলিম সমাজের প্রচলিত কিছু কুপ্রথা। অধিকাংশ পিতা এখনো মনে করেন যে তাঁদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব রয়েছে এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ সন্তানদের বাবা বা জীবনসঙ্গী নির্বাচনে যদি কোনো মেয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করে, তবে তারা একে নারীর লজ্জাশীলতার পরিপন্থী মনে করেন। তাঁরা মেয়েদের বৌদ্ধিক পরিপক্কতার (Intellectual Maturity) দিকে নজর দেন না, যা ইসলামি আইন অনুযায়ী একটি অপরিহার্য শর্ত। মেয়েদের পরিপক্ক হওয়ার আগেই যেসব বিয়ে দেওয়া হয়, তার অনেকগুলোই আইনিভাবে অবৈধ ও বাতিল। সাধারণত মেয়েটি পরিপক্ক কি না সে বিষয়ে কোনো খোঁজ নেওয়া হয় না এবং কেবল বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোকেই (Puberty) যথেষ্ট মনে করা হয়। অথচ মহান ফকিহগণ মেয়েদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতা পরীক্ষার বিষয়ে অনেক কিছু লিখেছেন। কোনো কোনো ফকিহ তো ধর্মীয় ও তাত্ত্বিক পরিপক্কতাকেও বিয়ের শর্ত হিসেবে গণ্য করেছেন। তাঁদের মতে, কেবল সেইসব মেয়েরাই বিয়ের যোগ্য যারা ধর্মের মূলনীতিগুলো যুক্তি ও প্রমাণসহ বোঝেন। দুর্ভাগ্যবশত, অধিকাংশ অভিভাবক এবং যারা বিয়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন, তারা এই শর্তগুলো পালন করেন না।
এটি উল্লেখযোগ্য যে, পুরোনো দিনের সকল কাবিননামায় বা বিয়ের দলিলে বর ও কনের নামের সাথে ‘প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক এবং পরিপক্ক’ (Adult, Sane and Mature) শব্দগুলো যুক্ত থাকত। যা হোক, শিয়া আইন (Shi’ite law) অনুযায়ী, একজন নারী যিনি প্রাপ্তবয়স্ক ও পরিপক্ক এবং ইতিপূর্বে একবার বিবাহিতা হয়েছেন, তাঁর ক্ষেত্রে পিতার সম্মতির কোনো প্রয়োজন নেই।
অনুবাদ: শাহাদা নূর তামিমা
