আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে তাঁকে জানা—এটাই সেই দৃষ্টিভঙ্গি, যার মাধ্যমে আমরা কুরআনের বাণীকে বুঝতে এবং তার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হতে পারি। তাহলে, আল্লাহ কে?
মূল বক্তব্য
আল্লাহ সম্পর্কে আমাদের ধারণাই নির্ধারণ করে আমরা কুরআনকে কীভাবে পড়ি ও বুঝি। যদি আমরা তাঁকে কঠোর বা দূরবর্তী হিসেবে কল্পনা করি, তবে কুরআন আমাদের কাছে কেবল কঠিন বিধানসমূহের একটি গ্রন্থ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যখন আমরা তাঁকে তাঁর নিজের বর্ণনায়—পরম দয়ালু, ন্যায়পরায়ণ, মহিমান্বিত ও লালনকারী হিসেবে জানি—তখন কুরআনের আয়াতসমূহে সৌন্দর্য, উদ্দেশ্য ও মমতা উন্মোচিত হয়। তাঁর নাম ও গুণাবলীকে জানা আমাদের ওহির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করে; দায়িত্বকে ইবাদতে রূপান্তরিত করে এবং বিধানকে ভালোবাসাভিত্তিক দিকনির্দেশনায় পরিণত করে। আল্লাহ তাঁর নামসমূহের আলোকে আমাদের শিক্ষা দেন কীভাবে কুরআনের কাছে অগ্রসর হতে হয়।
কুরআন শুরুই হয়েছে আল্লাহর রহমতের ঘোষণা দিয়ে—জীবনের উদ্দেশ্য, জান্নাত-জাহান্নাম কিংবা কোনো বিধান আলোচনার পূর্বেই। সূরা আল-ফাতিহার সূচনায় আল্লাহ নিজেকে পরিচয় করিয়েছেন ‘আর-রহমান’ (সর্বব্যাপী দয়ালু) ও ‘আর-রহীম’ (বিশেষভাবে দয়াশীল) হিসেবে, এবং প্রতিটি তিলাওয়াত এই নামদ্বয় দিয়েই শুরু হয়। নবী ﷺ তাঁর সাহাবিদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আল্লাহর রহমত সন্তানের প্রতি মায়ের মমতার চেয়েও অধিক—যা প্রমাণ করে, ওহি নিজেই এক মহান দয়া ও স্নেহের প্রকাশ।
আমাদের জানানো হয়েছে যে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে ‘আল-‘আলীম’ (সর্বজ্ঞ) ও ‘আল-হাকীম’ (পরম প্রজ্ঞাময়) সত্তার পক্ষ থেকে; পাশাপাশি ‘আল-‘আজীয’ (পরাক্রমশালী) এবং ‘রব্বুল ‘আলামীন’ (সমস্ত জগতের প্রতিপালক)-এর পক্ষ থেকেও। এই নামগুলো প্রমাণ করে যে ওহি সুপরিকল্পিত, সংরক্ষিত এবং লালনময়—যেখানে রহমত ও মহিমার এক অপূর্ব ভারসাম্য বিদ্যমান।
কুরআনের প্রতিটি শব্দই ‘আল-হামীদ’ (সর্বপ্রশংসিত)-এর পরিপূর্ণতার প্রতিফলন। তাঁর সত্তা, গুণাবলী ও কার্যাবলি—সবই কৃতজ্ঞতা ও বিস্ময়ের আহ্বান জানায়। কুরআন মুমিনকে শুধু বিধান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে নয়; বরং আল্লাহর রহমত, শক্তি ও প্রশংসার ধারাবাহিক স্মরণ দ্বারা পথনির্দেশ করে।
ভূমিকা
কুরআনের কাছে আসার সময় আমরা অনেকেই আমাদের নিজস্ব প্রত্যাশা ও পূর্বধারণা সঙ্গে নিয়ে আসি। এটি স্বাভাবিক হলেও, আমরা যে এমনটি করছি—এ বিষয়টি অনুধাবন না করলে অজান্তেই আমাদের পূর্বানুমানগুলোকে আল্লাহর নাজিলকৃত পবিত্র বাণীর ওপর আরোপ করে ফেলি। ফলে কুরআনকে তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে অনুবাদ পড়ার ক্ষেত্রে—যা অবশ্যম্ভাবীভাবে এক ধরনের ব্যাখ্যা—আধুনিক পাঠক অনেক সময় বুঝতে পারেন না কেন আল্লাহ পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংসের কথা উল্লেখ করেছেন, কিংবা জাহান্নামের শাস্তির বর্ণনা দিয়েছেন। তখন আল্লাহর রহমতের সঙ্গে এসব আয়াতের সম্পর্ক কীভাবে স্থাপন করবেন, তা নিয়ে তারা দ্বিধায় পড়েন। এ কারণেই কেউ কেউ কুরআন থেকে দূরে সরে যান।
কিন্তু নবীজি ﷺ বলেছেন, “কুরআনের মানুষরাই আল্লাহর মানুষ এবং তাঁর বিশেষভাবে মনোনীত বান্দা।”১ এই হাদিস আমাদের অনুপ্রাণিত করে—আমরা আসলে কী হারাচ্ছি তা জানার জন্য। ইমাম ইবনে আল-কাইয়্যিম (রহ.) আফসোস করে বলেছেন,
যারা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা সেই নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হয় যা হৃদয়কে জীবন্ত করে তোলে এবং চোখকে নূরে উদ্ভাসিত করে।২
আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কুরআন নাজিল করেছেন। এর একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও প্রজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু কুরআন সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা অনেকাংশে নির্ভর করে আমরা আল্লাহকে কীভাবে দেখি তার ওপর। আমাদের অন্তরে গড়ে ওঠা ‘আল্লাহর ধারণা’ তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক, নিজের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিশ্বজগতের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুকেই প্রভাবিত করে।৩
যদি আমাদের মনে আল্লাহ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা থাকে, তবে আমরা কুরআনকে কেবল কঠোর বিধি-নিষেধের গ্রন্থ হিসেবেই দেখতে পারি। পক্ষান্তরে, যদি আমরা আল্লাহকে তাঁর নিজের বর্ণনা অনুযায়ী—পরম দয়ালু, ন্যায়পরায়ণ, মহিমান্বিত ও লালনকারী হিসেবে উপলব্ধি করি—তবে কুরআনের আয়াতগুলো আমাদের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন আলোকে উদ্ভাসিত হবে। তখন আমরা সেই আয়াতগুলোর মধ্যে খুঁজে পাব ভালোবাসা, শক্তি, রহমত ও প্রজ্ঞার গভীর প্রকাশ—যা হয়তো আগে আমাদের চোখে ধরা পড়েনি।
এভাবে চিন্তা করুন: আপনি যদি কোনো বিপদে পড়েন, অথবা পথ হারিয়ে ফেলেন এবং কীভাবে সঠিক পথ খুঁজে পাবেন তা না জানেন—আর এমন সময় এমন একজনের কাছ থেকে একটি বার্তা পান, যিনি আপনাকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসেন, অত্যন্ত জ্ঞানী, এবং আপনার পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত—তাহলে আপনি নিশ্চয়ই তাঁর চিঠিটি মনোযোগ দিয়ে পড়বেন।
আপনি সম্ভবত চাইবেন না যে তিনি আপনার সমস্যাগুলোকে ঢেকে বা মিষ্টি করে বলুন; বরং আপনি চাইবেন তিনি সরাসরি ও স্পষ্টভাবে কথা বলুন, যাতে আপনি আপনার সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। চিঠির কিছু বিষয় পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও, আপনি তা উপেক্ষা না করে বোঝার চেষ্টা করবেন—কারণ আপনি জানেন, চিঠির প্রতিটি কথাই আপনার কল্যাণের জন্য লেখা হয়েছে। আপনার সাহায্য দরকার, আর আপনি বিশ্বাস করেন যে এই ব্যক্তিই আপনাকে সাহায্য করবেন।
এই চিঠিটি পড়ার আপনার ভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে সেই ব্যক্তির তুলনায়, যে চিঠির লেখককে চেনে না (“আমি কেন এই চিঠির ওপর ভরসা করব?”), যে বুঝতেই পারে না তার সাহায্যের প্রয়োজন আছে বা অহংকারবশত তা স্বীকার করতে চায় না (“আমি তো নিজেই সব জানি”), কিংবা যে জানেই না কেন তাকে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে (“এই ব্যক্তি এমনভাবে কথা বলছে কেন?”)।
এ ধরনের মানুষ চিঠির ভাষায় কষ্ট পেতে পারে, বিভ্রান্ত হতে পারে, অথবা এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা এই চিঠি থেকে উপকৃত হতে পারবে না।
আল্লাহ যেকোনো উপমার থেকে অনেক ঊর্ধ্বে, কিন্তু এটিকে কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যখন আমরা আল্লাহকে সঠিকভাবে চিনতে পারি এবং তাঁর পবিত্র গ্রন্থের উদ্দেশ্য বুঝতে পারি, তখন আমরা এতে প্রশান্তি খুঁজে পাই এবং দুনিয়াতে ও আখেরাতে এর দ্বারা উপকৃত হই। কিন্তু যদি আমরা তা না বুঝি, তাহলে আমরা কুরআনের প্রতি উদাসীন হয়ে যেতে পারি, এমনকি বিরূপ মনোভাবও পোষণ করতে পারি।
যেমনটি ইমাম ইবনে আল-কাইয়্যিম উল্লেখ করেছেন, আল্লাহ আমাদের তাঁকে জানার দুইটি উপায় দিয়েছেন: প্রথমটি হলো বাহ্যিক জগতের নিদর্শনের মাধ্যমে—অর্থাৎ আসমান ও জমিনের সৃষ্টির মধ্যে তাঁর নিদর্শনসমূহ পর্যবেক্ষণ করা; এবং দ্বিতীয়টি হলো কুরআনের আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা ও সেগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করা।৪
যখন আমরা আল্লাহর নামগুলো ও তাঁর প্রকৃতি জানি, তখন সেটিই হয়ে যায় সেই দৃষ্টিকোণ, যার মাধ্যমে আমরা বিশ্বের নিদর্শনগুলো এবং কুরআনের নিদর্শনগুলো অর্থপূর্ণভাবে বুঝতে পারি।
অতএব, আমাদের প্রথম যে কাজগুলোর একটি করা উচিত—এবং এটি সবার পক্ষেই সম্ভব—তা হলো কুরআনের সাথে সম্পর্কিতভাবে আল্লাহ কে, তা জানা। যখন আমরা তা বুঝতে পারি, তখন কুরআনকে ভালোবাসা এবং এর বাণীগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করার আগ্রহ অনেক সহজ হয়ে যায়।
নিশ্চয়ই, তাদাব্বুর—অর্থাৎ গভীর চিন্তা ও মনন—এর একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি হলো সঠিক মানসিকতা নিয়ে কুরআনের কাছে আসা।৫ যদি আমাদের মানসিকতা এমন হয় যে কুরআন সেই মহান সত্তার পক্ষ থেকে প্রেরিত, যিনি আমাদের জন্য সর্বোত্তমটাই চান, যিনি আমাদের পথনির্দেশ দিতে চান এবং যিনি সর্বজ্ঞ—তবে আমরা প্রতিটি আয়াত থেকে কীভাবে উপকৃত হওয়া যায়, তা খুঁজে বের করার ব্যাপারে আরও আন্তরিক ও সচেতন হব।
এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে—আল্লাহর নামসমূহের মাধ্যমে কুরআনের কাছে কীভাবে অগ্রসর হওয়া যায় এবং তা কুরআনের বাণী গ্রহণ করার পদ্ধতিকে কীভাবে প্রভাবিত করে। যেহেতু আল্লাহ নিজেই তাঁর কিতাব নাযিলের প্রসঙ্গে তাঁর কিছু বিশেষ নাম উল্লেখ করেছেন, তাই এই প্রবন্ধে কুরআনের বাণীগুলোকে সেই নামসমূহের আলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে পাঠক কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে আরও গভীর ও জীবন্ত সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন।
আল্লাহকে প্রথমে জানা—এর মাধ্যমে কুরআনকে বোঝা
কুরআনকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের সেই মহান সত্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে, যিনি এটি নাযিল করেছেন। যেমন জেফ্রি ল্যাং বলেছেন—
কুরআনে আল্লাহর যে “সর্বোত্তম নামসমূহ” উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো মানবজীবনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত বহন করে। যেমন—আর-রহমান (পরম দয়ালু), আর-রহিম (অতিশয় করুণাময়), আল-গাফুর (অত্যন্ত ক্ষমাশীল), আল-ওয়াহহাব (অতিদানশীল), আল-ওয়াদূদ (প্রেমময়), আল-খালিক (সৃষ্টিকর্তা) ইত্যাদি নামগুলো এমন এক আল্লাহকে প্রকাশ করে, যিনি নারী ও পুরুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁদের সঙ্গে এক গভীর, ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের জন্য—যা মানুষের পরিচিত অন্যান্য সৃষ্টির সাথে সম্পর্কের চেয়েও উচ্চতর স্তরের। এটি কোনো মানসিক বা আবেগগত প্রয়োজনের কারণে নয়; বরং এটি তাঁর সত্তারই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
এ কারণেই আমরা দেখতে পাই, আন্তরিক মুমিন ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে কুরআনে বারবার ভালোবাসার বন্ধন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের ভালোবাসেন (২:১৯৫; ৩:১৩৪, ৩:১৪৮; ৫:১৩, ৫:৯৩), তাওবাকারীদের ভালোবাসেন (২:২২২), যারা নিজেদের পবিত্র রাখে তাদের ভালোবাসেন (২:২২২; ৯:১০৮), আল্লাহভীরুদের ভালোবাসেন (৩:৭৬; ৯:৪; ৯:৭), ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন (৩:১৪৬), যারা তাঁর ওপর ভরসা করে তাদের ভালোবাসেন (৩:১৫৯), ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন (৫:৪২; ৪৯:৯; ৬০:৮), এবং যারা তাঁর পথে সংগ্রাম করে তাদের ভালোবাসেন (৬১:৪)। আর তারাও প্রত্যুত্তরে আল্লাহকে ভালোবাসে।৬
কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে এই ওহী হচ্ছে তাঁর পক্ষ থেকে “নাযিলকৃত”—তানযীল। এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর বিশেষ কিছু নাম ও গুণের উল্লেখ করেন, যাতে বোঝা যায় এই বাণীর প্রেরক কে।৭ “তানযীল” শব্দের ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেয় যে কুরআন এসেছে ঊর্ধ্ব থেকে—সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী আল্লাহর কাছ থেকে। জিবরীল (আ.) এর মাধ্যমে তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে নবী মুহাম্মদ ﷺ–এর নিকট।৮ এতে কোনো পার্থিব প্রভাব নেই, কোনো অপূর্ণতাও নেই; বরং এটি এসেছে সম্পূর্ণ ঐশী পরিপূর্ণতার উৎস থেকে।
আল্লাহ আমাদের জানান যে কুরআন হচ্ছে তাঁর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত (তানযীল)—যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু, পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়, প্রশংসার যোগ্য এবং সমগ্র জগতের প্রতিপালক। এটি যেন এমন, যেমন বলা হয়—“এই চিঠিটি তোমার স্নেহশীল পিতার পক্ষ থেকে” অথবা “এই দিকনির্দেশনা এসেছে একজন অভিজ্ঞ অভিযাত্রীর কাছ থেকে।” প্রেরকের গুণাবলির এই সামান্য উল্লেখই বার্তাটি আমরা কীভাবে গ্রহণ করব, তা সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়।
একইভাবে, কুরআনকে আমাদের প্রতিপালক, স্রষ্টা ও পালনকর্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত করলে তা আমাদের জন্য ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে; আর তাঁর নির্বাচিত নামসমূহ আমাদের মনে প্রশান্তি ও আশ্বাস জাগায়। যদি কেউ আপনাকে কোনো ওষুধ দেয়, আপনি সন্দিহান হতে পারেন—যতক্ষণ না জানেন যে এটি একজন জ্ঞানী চিকিৎসকের দেয়া। আর যদি সেই প্রাজ্ঞ চিকিৎসকই আপনার স্নেহময় পিতা হন, তবে আপনি আরও বেশি স্বস্তি ও আস্থা অনুভব করবেন সেই ওষুধের প্রতি।
ফখরুদ্দীন আর-রাযী বলেন,
এই দুনিয়ার মানুষরা যেন রোগাক্রান্ত, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থ ও অভাবগ্রস্তদের মতো। কুরআনে রয়েছে অসুস্থদের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ওষুধ এবং সুস্থদের জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি। সর্বশক্তিমান আল্লাহর পক্ষ থেকে এই পৃথিবীর মানুষের ওপর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো—তাদের প্রতি কুরআনের নাযিল হওয়া।৯
আল্লাহ কে? কুরআনে আল্লাহর নাম ও গুণাবলি
রহমত (করুণা)
জীবনের উদ্দেশ্য কী, কীভাবে আমাদের জীবন যাপন করা উচিত, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রকৃতি কেমন—এইসব বার্তা দেওয়ার আগে আল্লাহ আমাদেরকে জানান তিনি কে। কিতাব পাঠ শুরু করার পূর্বেই আমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হয়, কে এই বাণী আমাদের কাছে প্রেরণ করেছেন—এ বিষয়ে কিছু মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ সত্য। এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পুরো কুরআনের জন্য একটি ভিত্তি ও সুর নির্ধারণ করে দেয়।
আল্লাহ বলেন:
পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।১০
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য—যিনি সকল জগতের প্রতিপালক।
তিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
প্রতিদান দিবসের অধিপতি।১১
প্রথম ধারণাই সাধারণত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ চাইলে তাঁর অসংখ্য নামের মধ্য থেকে যেকোনোটি দিয়ে নিজেকে আমাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে পারতেন—তাঁর সর্বশক্তিমান ও মহিমাময় সত্তার সাথে সম্পর্কিত নামগুলো, অথবা আসমান ও জমিন সৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত নামগুলো।
কিন্তু কুরআনের প্রথম তিনটি আয়াতেই তিনি একই নাম দু’বার উল্লেখ করেছেন:
আর-রহমান, আর-রহীম—পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
সূরা আল-ফাতিহা শুরু হয় এই ঘোষণার মাধ্যমে: “আল্লাহর নামে।” তখন প্রশ্ন জাগতে পারে—“আল্লাহ কে?” পরবর্তী আয়াতগুলো সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়। তিনি হচ্ছেন আর-রহমান, আর-রহীম। শুধু সূরার শুরুতেই নয়, আমরা যখনই কুরআন তিলাওয়াত শুরু করি, তখনও বিশেষভাবে এই নাম দু’টিই উচ্চারণ করি—১২ অন্য কোনো নাম নয়।
“আর-রহমান” ও “আর-রহীম”—উভয় শব্দের মূল হচ্ছে “রহমাহ”, যার অর্থ দয়া, মমতা, সহানুভূতি ও অনুকম্পা।১৩ এই রহমত বাস্তবে কেমন—তা বুঝাতে নবী ﷺ তাঁর সাহাবীদের সামনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার মাধ্যমে উদাহরণ দিয়েছিলেন। একটি যুদ্ধের পর কিছু নারী ও শিশু অবশিষ্ট ছিল। তাদের মধ্যে এক নারী তার শিশুকে বুকে নিয়ে দুধ পান করাচ্ছিল। নবী ﷺ এই দৃশ্যটি সাহাবীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের কি মনে হয়, এই নারী তার সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করবে?”সাহাবীরা বললেন, “না, কখনোই না।”
তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এই মায়ের চেয়েও অনেক বেশি দয়ালু।”১৪
একত্রে এই দুই নাম আমাদের জানায় যে আল্লাহ সর্বদা সর্বোচ্চ মাত্রায় স্নেহশীল, দয়ালু ও ক্ষমাশীল।
“আর-রহমান”—এই বিশেষ রূপে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে বোঝায় যে, তাঁর রহমত উপচে পড়া, সীমাহীন এবং তুলনাহীন।১৫
ইমাম আল-গাজ্জালী বলেন, আল্লাহর রহমত সর্বব্যাপী, যা যোগ্য ও অযোগ্য সকলকেই অন্তর্ভুক্ত করে; দুনিয়া ও আখিরাত উভয়কেই পরিবেষ্টন করে; এবং মানুষের মৌলিক প্রয়োজন, চাহিদা ও অতিরিক্ত কল্যাণসমূহকেও অন্তর্ভুক্ত করে।১৬
বাস্তব জীবনে এটি আমাদের স্মরণ করায় যে, কোনো মানব থেকে আমরা যতটা করুণা বা দয়া অনুভব করেছি, আল্লাহর করুণা তার চেয়ে অসীমভাবে অনেক বড়। এটি নবী ﷺ-এর বাক্যেও বিশেষভাবে উল্লেখিত হয়েছে:
“আল্লাহ রহমতকে একশটি অংশে ভাগ করেছেন। তিনি নিরানব্বইটি অংশ নিজ হাতে রেখেছেন এবং এক অংশ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। সেই এক অংশ থেকেই সৃষ্টিরা একে অপরের প্রতি দয়ালু, যেমন এক ঘোড়া তার সন্তানের উপর পা তুলতে ভয় পায়।”১৭
ইবনুল কাইয়্যিম সুন্দরভাবে বলেন, আল্লাহ আর-রহমান হওয়ার অর্থ, তিনি তাঁর বান্দাদের অবহেলা করেন না।১৮ তিনি আরও উল্লেখ করেন, যে ব্যক্তি আর-রহমানকে জানে, সে বুঝতে পারবে যে নবী প্রেরণ এবং ওহী নাযিল করার মাধ্যমে প্রদত্ত রহমত এমনকি বর্ষার রহমতের চেয়েও অনেক বড়, কারণ প্রথমটি কেবল দেহ নয়, হৃদয় ও আত্মাকেও জীবন্ত করে।১৯
আর-রহীম নামটি নির্দেশ করে যে এই গুণ আল্লাহর কাছে স্থায়ী ও অচল। আল্লাহ অস্থির বা ‘মুডি’ নন; তাই তাঁর গুণাবলি ও সর্বব্যাপী রহমতে রয়েছে স্থায়িত্ব ও নিশ্চয়তা।
বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহর একটি বিশেষ রহমত রয়েছে, যেমন তিনি বলেন:
“আর তিনি বিশ্বাসীদের প্রতি সর্বদা দয়ালু।”২০
কেউ তাঁকে দয়ালু হতে বাধ্য করছে না (কারণ তাঁকে বাধ্য করার কেউ নেই)। বরং আল্লাহ নিজেই বলেন, “তোমাদের প্রতিপালক নিজের ওপর রহমতকে অবধারিত করে নিয়েছেন।” ২১ অর্থাৎ, তিনি নিজ ইচ্ছাতেই তাঁর বান্দাদের জন্য এই মহান ও অসাধারণ দয়া নির্ধারণ করেছেন।
আল্লাহ নিশ্চিত করে বলেন যে-
“এটি সম্পূর্ণ দয়ালু, অতিশয় করুণাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বিধান।” (সূরা হুমাযাহ ৪১:২)
যেহেতু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি সর্বাধিক দয়ালু, তাই তিনি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন যে এই গ্রন্থটি পাঠানো হয়েছে তাঁর করুণা ও মমতার কারণে। যেন আমরা অন্ধকার থেকে আলোতে আসতে পারি, যেন আমরা তাঁকে চিনতে পারি, তাঁর ইবাদত করতে পারি এবং তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণ করতে পারি। এই কুরআন হলো করুণার প্রকাশ, যা আমাদের সর্বদয়ালু আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং আমাদেরকে তাঁর করুণার আবাসে পৌঁছে দেয়।২২ কুরআনের প্রতিটি বিষয়ই ‘রহমাহ’—অর্থাৎ আল্লাহর গভীর, ব্যাপক ও আন্তরিক যত্নের প্রতিফলন। এই গুণটি কুরআন জুড়ে বারবার গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে, আর যখন আমাদেরকে এর তিলাওয়াত শুরু করতে বলা হয় আল্লাহর এই নামগুলোর মাধ্যমে, তখন আমরা উপলব্ধি করি— এই কিতাবের প্রতিটি অক্ষরই ঐশ্বরিক করুণায় পূর্ণ।
তাই, কুরআনে বর্ণিত কাহিনীগুলো আমাদের প্রতি আন্তরিক উদ্বেগ ও কল্যাণচিন্তা থেকেই বলা হয়েছে। বিধিগুলো আমাদের উপকারের জন্য নির্ধারিত। আর সতর্কবাণী ও উপদেশগুলো এসেছে—যাতে আমরা চিরস্থায়ী কষ্ট থেকে রক্ষা পাই।
তাঁর রহমতের কারণেই তিনি কুরআন নাযিল করেছেন—সত্য উদঘাটন করতে, দূরের মানুষদের কাছে ঘনিষ্ঠ হতে সাহায্য করতে, এবং যারা আল্লাহকে খুঁজে খুঁজে তাঁকে মানে, তাদেরকে সুসংবাদ ও আশা প্রদান করতে।২৩ কুরআন হলো সেই যত্নের চিঠি যা চিন্তাশীল মানুষের জন্য প্রেরিত।
কেউ কেউ তবুও দ্বিধায় থেমে যেতে পারে। কুরআন নিঃসন্দেহে সেই সত্তার পক্ষ থেকে, যিনি আমাদের প্রতি সর্বাধিক দয়ালু, স্নেহশীল ও অনুগ্রহশীল; তবুও কিছু বিষয় আমাদের কাছে হয়তো বোধগম্য নাও হতে পারে। তাই আল্লাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—কুরআন শুধু পরম দয়ালুর পক্ষ থেকেই নয়, বরং সর্বজ্ঞ, পরম প্রজ্ঞাময় সত্তার পক্ষ থেকেও অবতীর্ণ।
জ্ঞান ও প্রজ্ঞা
কুরআনের পাঁচটি স্থানে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে এই ‘তানযীল’ (অবতরণ) এসেছে আল-‘আলীম (সর্বজ্ঞ) অথবা আল-হাকীম (পরম প্রজ্ঞাময়)-এর পক্ষ থেকে, যা তাঁর আল-‘আযীয (পরাক্রমশালী) নামের সাথে যুক্ত হয়ে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলেন:
“এই কিতাবের অবতরণ আল্লাহর পক্ষ থেকে—যিনি পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ।”২৪
“এই কিতাবের অবতরণ আল্লাহর পক্ষ থেকে—যিনি পরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।”২৫
আল-‘আলীম (সর্বজ্ঞ) তিনি, যাঁর জ্ঞান সর্বব্যাপী ও সর্বাঙ্গীন। এর মূল ধাতু ‘আইন-লাম-মীম, যা জ্ঞান, সচেতনতা ও নিশ্চিততাকে অন্তর্ভুক্ত করে। আল্লাহ আল-‘আলীম জানেন—যা আছে এবং যা হতে পারে, যা ছিল এবং যা হতে পারত, অন্তরের গোপন বিষয় এবং বাহ্যিক প্রকাশ—সবকিছুই। মানুষের কাছে যা গোপন, তাঁর কাছে তা সম্পূর্ণ প্রকাশ্য।২৬
তবুও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা এমন মানুষ দেখতে পাই, যারা অনেক কিছু জানে, কিন্তু সব সময় তীক্ষ্ণবুদ্ধি বা সঠিক বিচক্ষণতার অধিকারী নয়। কিন্তু আল্লাহ শুধু সর্বজ্ঞই নন, তিনি আল-হাকীম—পরম প্রজ্ঞাময়ও। ‘হিকমাহ’-এর একটি অর্থ হলো, কোনো কিছুকে তার যথাযথ স্থানে স্থাপন করা।২৭
যেহেতু আল্লাহ আল-হাকীম, তাই তিনি কখনোই কোনো অসুন্দর বা অনুচিত কাজে লিপ্ত হন না,২৮ এবং তাঁর প্রতিটি কাজই সুপরিমিত ও উদ্দেশ্যময়।
প্রখ্যাত তাফসীরবিদ ফখরুদ্দীন আল-রাযী উল্লেখ করেন, এই নামগুলো এখানে একত্রে এসেছে এ কারণে যে, আল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন—তিনি তাঁর শক্তি ও জ্ঞানের মাধ্যমে কুরআন অবতীর্ণ করেছেন; আর এর ভেতরে যে উপকারিতা ও মুজিজা (অলৌকিকতা) রয়েছে, তা এর প্রমাণ বহন করে।২৯
ইবন ‘আশূর আরও উল্লেখ করেন যে, যেহেতু কুরআন পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর বাণী, তাই আল্লাহ ছাড়া আর কারো পক্ষে এর অনুরূপ কিছু রচনা করার সক্ষমতা বা জ্ঞান নেই।৩০
যখন আল্লাহ আমাদের জানান যে এই কুরআন সেই সত্তার পক্ষ থেকে, যিনি অতীত ও ভবিষ্যৎ, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য—প্রতিটি বিষয়ের খুঁটিনাটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত, এবং তিনি পরম প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ—তখন তিনি আমাদের বুঝিয়ে দেন যে এই গ্রন্থের প্রতিটি বিষয়ই আমাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে কল্যাণকর।
আমরা যদি এমন কারো কাছ থেকে একটি বই পাই, যিনি আমাদের ভালোবাসেন ও আমাদের কল্যাণ চান, তবে সেই বইয়ের বিষয়বস্তু আমাদের আবেগগতভাবে তৃপ্ত করতে পারে। কিন্তু যদি আমাদের বলা হয় যে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি এই বইটি রচনা করেছেন, তাহলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই সেটিকে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অধিক গুরুত্বের সঙ্গে নেব।
আমরা সেই বইয়ের উপদেশের ওপর আস্থা রাখব, কারণ আমরা সেই মানুষের জ্ঞান ও দক্ষতার প্রতি বিশ্বাস রাখি—যদিও সে মানুষ ত্রুটিমুক্ত নয়!
যখন আমরা কুরআনের ‘রচয়িতা’ হিসেবে আল্লাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এই সত্যকে অন্তরে ধারণ করি—যখন আমরা সত্যিই উপলব্ধি করি যে কুরআন প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর বাণী—তখন আমরা বাস্তবতাকে সঠিকভাবে বুঝতে পারি। আমরা যত বেশি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করি, ততই আমাদের জীবনের অগ্রাধিকারগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, তিনি আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা আমাদের উপকারের জন্য, আর যা নিষিদ্ধ করেছেন তা আমাদের ক্ষতির কারণ। বিপদ বা সংকটে পড়লে আমরা জানি, এর সমাধান তাঁর বাণীতেই রয়েছে। যেহেতু আমরা জানি এই আয়াতগুলো সর্বজ্ঞ ও পরম প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, তাই আমরা তাঁর ওপর ভরসা করি। ফলে যেসব বিষয় আমরা বুঝতে পারি না, সেগুলোকে অস্বীকার না করে আমরা সেগুলো বুঝতে চেষ্টা করি।
আল্লাহ আমাদের স্পষ্টভাবে বলেন:
“তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করতে পারো, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আবার কোনো কিছু পছন্দ করতে পারো, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।”৩১
যখন কুরআনে বর্ণিত ইউসুফ (আ.) অবশেষে তাঁর পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হন, তখন তিনি বলেন,
“… নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়নে অতি সূক্ষ্ম কৌশলী; নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, পরম প্রজ্ঞাময়।”৩২
ইউসুফ (আ.) তখন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে তাঁর জীবনে যা কিছু ঘটেছে, সবই ছিল উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং তাঁকে সেই অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারে—একটি শিশুকে হিংসাপরায়ণ ভাইদের দ্বারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা, দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে যাওয়া, এরপর মিথ্যা অভিযোগে বহু বছর কারাগারে বন্দী থাকা—এসবের মধ্যে কোথায় করুণা ও প্রজ্ঞা?
কিন্তু বাস্তবে, এসব ঘটনাই শেষ পর্যন্ত ইউসুফ (আ.)-কে এক বিশ্বস্ত, প্রিয় এবং মর্যাদাবান ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তাঁর ধৈর্য ও তাকওয়ার কারণে আল্লাহ তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি ঘটনার মধ্যেই ছিল গভীর প্রজ্ঞা ও অপার রহমত।
যদিও ইউসুফ (আ.)-এর ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রজ্ঞা তাঁর জীবনের শেষ পার্থিব পরিণতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, কিন্তু প্রজ্ঞা কেবল এই জগতের দৃশ্যমান বিষয় বা দুনিয়াবী মানদণ্ডে মূল্যায়িত জিনিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি মদ বিক্রির মতো লাভজনক ব্যবসা পরিচালনা করে, সে হয়তো একসময় নিজেকে সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং পেশা পরিবর্তন করে। এর ফলে সে বস্তুগতভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। হয়তো তার জীবনযাত্রার মান কমে যায়, ব্যবসায়িক সম্পর্কগুলো হারিয়ে যেতে শুরু করে। এমনকি পরিবারের সদস্যরা যদি এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করে, তবে পারিবারিক সম্পর্কও ভেঙে যেতে পারে। এগুলো সবই দৃশ্যমান ক্ষতি।
কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে যা ত্যাগ করেছে, তার কারণে তার ওপর যে আত্মিক বরকত নাজিল হচ্ছে—তা কেউ জানে না। ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে সে সঠিক কাজটি করার মাধ্যমে কত ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে—তা-ও কেউ জানে না। আর তার ঈমান, আল্লাহভীতি এবং কঠিন পরিস্থিতি ও প্রলোভনের মুখে অবিচল থাকার প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে কী গোপন করে রেখেছেন—তাও কেউ কখনো জানতে পারবে না।
আল্লাহ আমাদের এসব কথাই স্মরণ করিয়ে দেন, যখন তিনি বলেন যে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে সেই সত্তার পক্ষ থেকে, যিনি সর্বজ্ঞ ও পরম প্রজ্ঞাময়।
শক্তি ও যত্ন
অবশ্যই, এই পৃথিবীতে দয়া ও জ্ঞানের গুণাবলি অত্যন্ত মূল্যবান; কিন্তু যিনি এগুলোর অধিকারী, তিনি দুর্বলও হতে পারেন। একজন দুর্বল মানুষ সহজেই পরাভূত হতে পারে, আর তার পরামর্শ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। তাই আল্লাহ জোর দিয়ে বলেন যে এই কিতাব কেবল দয়ালু ও সর্বজ্ঞের পক্ষ থেকেই নয়, বরং আল-‘আযীয (পরাক্রমশালী) এবং রব্বুল ‘আলামীন (সমস্ত জগতের প্রতিপালক)-এর পক্ষ থেকেও অবতীর্ণ।
আল্লাহ কুরআন তিলাওয়াতকারীদের স্মরণ করিয়ে দেন:
“এটি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালুর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।”৩৩
এবং, “এই কিতাবের অবতরণ আল্লাহর পক্ষ থেকে—যিনি পরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।”৩৪
কুরআনের অবতরণ (তানযীল)-এর প্রসঙ্গে আল্লাহ প্রায়ই তাঁর ‘ইজ্জাহ’ (পরাক্রম) উল্লেখ করেন,৩৫ এবং কুরআন নিজেও ‘আজীয’ (মহিমান্বিত ও অপ্রতিরোধ্য) হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।৩৬
‘ইজ্জাহ’ এমন একটি গুণ, যার মধ্যে শক্তি, মর্যাদা, অজেয়তা, মহিমা ও স্বাতন্ত্র্য একত্রিত থাকে।৩৭ আর আল-‘আযীয হলেন তিনি, যিনি অন্যদের ওপর পরাক্রমশালী, কিন্তু নিজে কখনো পরাভূত হন না; যিনি অপ্রতিরোধ্য, সর্বশক্তিমান, সম্পূর্ণ অনন্য, সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী, এবং যাকে ইচ্ছা শক্তি ও সম্মান দান করেন।৩৮
বদরের যুদ্ধের সময় মুসলিমরা সংখ্যায় অনেক কম ছিল। আল্লাহ মুমিনদের জানান যে, তিনি তাদের সাহায্যের জন্য ফেরেশতা প্রেরণ করেছিলেন, এবং মুসলিমরা সেই যুদ্ধে বিজয় লাভ করে। কিন্তু আল্লাহ আমাদের সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন:
“আর আল্লাহ এটিকে কেবল সুসংবাদ হিসেবে করেছেন, যাতে এর মাধ্যমে তোমাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; আর সাহায্য তো কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী (আযীয), প্রজ্ঞাময় (হাকীম)।” ৩৯ অতএব, শক্তি ও বিজয় ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে নয়; বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
যখন আল্লাহ আমাদের বলেন যে এই কিতাব আল-‘আযীয-এর পক্ষ থেকে, তখন তিনি আমাদের জানিয়ে দেন যে তিনি কুরআনকে পরিবর্তন বা বিকৃতির হাত থেকে সংরক্ষণ করেছেন।৪০ এটি আমাদেরকে এর চিরন্তন বার্তার প্রতি দৃঢ় আস্থা রাখতে অনুপ্রাণিত করে।৪১
এটি মানুষকে সত্য ও হিদায়াতের পথে দৃঢ়ভাবে চলতে উৎসাহিত করে, এবং অবাধ্যতা ও অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা প্রদান করে।৪২ আমরা যখন আমাদের চারপাশে অবিচার দেখি, অথবা নিজেরা দুর্বলতা অনুভব করি, তখন কুরআন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে এটি আল-‘আযীয-এর পক্ষ থেকে—ফলে আমরা এর থেকে শক্তি ও সান্ত্বনা লাভ করতে পারি।৪৩
কুরআন আমাদের দেখায়, যারা সীমালঙ্ঘন করে ও অন্যায় করে, তাদের পরিণতি কী হবে; তাদেরকে চিরদিনের জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে না। আল্লাহ আল-‘আযীয—তিনি যখন সতর্ক করেন, তখন তা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতাও তাঁর রয়েছে।
অতএব, আল্লাহর পরাক্রম মানুষের পরাক্রমের মতো নয়। মানুষ যখন ক্ষমতাশালী হয়, তখন অনেক সময় তা হঠকারীভাবে বা নিষ্ঠুরভাবে প্রকাশ করে, অন্যদের ওপর জুলুম করে। কিন্তু আল্লাহ পরম প্রজ্ঞাময়, পরম দয়ালু। তাঁর পরাক্রম প্রকাশ পায় পরিমিতভাবে, ফলাফলে থাকে পূর্ণ ন্যায়বিচার, সর্বোত্তম উদ্দেশ্যে এবং পরিপূর্ণ রহমতের সঙ্গে।
আল্লাহ আমাদের আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে কুরআন রব্বুল ‘আলামীন (সমস্ত জগতের প্রতিপালক)-এর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তিনি বলেন:
“এটি সেই কিতাবের অবতরণ, যাতে কোনো সন্দেহ নেই—সমস্ত জগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে।” ৪৪
আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন হওয়ার অর্থ হলো—তিনি সকল কিছুর স্রষ্টা ও রক্ষণাবেক্ষণকারী, সমস্ত বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক; তিনি লালন-পালনকারী,যিনি অস্তিত্ব দান করেন এবং অস্তিত্ব তুলে নেন। তিনিই একমাত্র ইলাহ, ইবাদতের যোগ্য; তিনিই প্রকৃত আশ্রয়স্থল এবং বিপদের সময় নিরাপদ আশ্রয়। প্রকৃতপক্ষে, তিনি ছাড়া কোনো প্রতিপালক নেই, এবং তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।৪৫
‘তারবিয়াহ’ শব্দটি, যা একই মূল থেকে এসেছে, লালন-পালন ও ধীরে ধীরে উন্নত করার অর্থ বহন করে। আল্লাহ আর-রব্ব হলেন সেই সত্তা, যিনি বান্দাকে এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় কোমলভাবে এগিয়ে নিয়ে যান, যতক্ষণ না সে তার নির্ধারিত পূর্ণতার লক্ষ্যে পৌঁছে যায়।৪৬
যখন আমাদের বলা হয় যে এই তানযীল রব্বুল ‘আলামীন-এর পক্ষ থেকে, তখন তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আল্লাহ কুরআনের মাধ্যমে আমাদের লালন-পালন করছেন। আমাদেরকে এই “অবতীর্ণ বাণী” দেওয়া হয়েছে সেই সত্তার পক্ষ থেকে, যিনি পৃথিবী ও সুউচ্চ আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন;৪৭ এবং তিনিই আমাদের শিক্ষা দিচ্ছেন—এই পৃথিবীতে কীভাবে সর্বোত্তমভাবে জীবন যাপন করতে হয় এবং কীভাবে তাঁর সান্নিধ্যে থেকে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য—জান্নাত—অর্জন করতে হয়।
এই দুনিয়ায় আমাদের উদ্দেশ্য কী—তা এতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে; পরীক্ষার স্বরূপ, ভালো ও মন্দের প্রকৃতি স্পষ্ট করা হয়েছে। আমাদেরকে উৎসাহিত করা হয়েছে নিম্ন প্রবৃত্তিকে দমন করে উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে; আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমাদেরকে জানানো হয়েছে, তিনি কে।
অধিকন্তু, তিনি রব্বুল ‘আলামীন—সমস্ত জগতের প্রতিপালক; তিনি শুধু কোনো নির্দিষ্ট জাতি, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ বা সামাজিক শ্রেণির প্রতিপালক নন। তিনি সকলকেই রিজিক দেন, লালন-পালন করেন; আর এই কিতাবে যা রয়েছে, তা শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, বরং আমাদের সবার জন্য অপরিহার্য দিকনির্দেশনা।
প্রশংসার যোগ্য (আল-হামীদ)
সবশেষে কুরআন সম্পর্কে আমাদের বলা হয়:
“মিথ্যা এর সামনে থেকেও আসতে পারে না, পেছন থেকেও আসতে পারে না; এটি অবতীর্ণ হয়েছে প্রজ্ঞাময় (হাকীম), সর্বপ্রশংসিত (হামীদ) সত্তার পক্ষ থেকে।”৪৮
‘হামদ’ (প্রশংসা) হলো ‘যম্ম’ (নিন্দা)-এর বিপরীত। আল-হামীদ হলেন সেই সত্তা, যিনি তাঁর সত্তা, নাম ও গুণাবলি এবং কর্মের জন্য সর্বদা প্রশংসিত।৪৯ তাঁর পক্ষ থেকে যা কিছু আসে, সবই প্রশংসার যোগ্য।
বাস্তব অর্থে এর মানে হলো—আল-হামীদ-এর পক্ষ থেকে যা কিছু আসে, তা শুধু ভালোই নয়, বরং এমন পরিপূর্ণ ও উৎকৃষ্ট, যা মানুষের মনে গভীর বিস্ময় ও মুগ্ধতার সৃষ্টি করে। আল্লাহ কুরআনে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন:
“আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর। আল্লাহই অমুখাপেক্ষী এবং সর্বপ্রশংসিত (হামীদ)।”৫০
আমরা বলি, “সমস্ত প্রশংসা (আলহামদ) আল্লাহর জন্য।” এটি কেবল ‘শুকর’ (কৃতজ্ঞতা) প্রকাশের চেয়েও ব্যাপক; কারণ ‘শুকর’ সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট অনুগ্রহ বা কাজের জন্য প্রকাশ করা হয়। কিন্তু ‘হামদ’ অন্তর্ভুক্ত করে কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা—শুধু নির্দিষ্ট নিয়ামতের জন্য নয়, বরং সেই সত্তার স্বভাবগত গুণাবলির জন্যও, যিনি প্রকৃত প্রশংসার যোগ্য।
মুহাম্মদ ﷺ তাহাজ্জুদের (রাতের নফল নামাজ) সময় দাঁড়িয়ে একটি অত্যন্ত সুন্দর দোয়া করতেন:
হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্য (লাকা আল-হামদ)। আসমানসমূহ ও জমিন এবং এদের মধ্যে যা কিছু আছে—সবকিছুর প্রতিপালক আপনি। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আসমানসমূহ ও জমিন এবং এদের মধ্যে যা কিছু আছে—সবকিছুর কর্তৃত্ব আপনারই। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আসমানসমূহ ও জমিন এবং এদের মধ্যে যা কিছু আছে—সবকিছুর নূর (আলো)। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আসমানসমূহ ও জমিনের অধিপতি। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনিই সত্য। আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য। আপনার সাথে সাক্ষাৎ সত্য। আপনার বাণী সত্য। জান্নাত সত্য এবং জাহান্নাম সত্য। নবীগণ সত্য। মুহাম্মদ ﷺ সত্য। কিয়ামত সত্য…৫১
মুহাম্মদ ﷺ সর্বদা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, বিস্ময় ও গভীর শ্রদ্ধায় নিমগ্ন থাকতেন—আর তিনি যে দোয়াটি করতেন, তাতে এই অনুভূতিগুলোরই পূর্ণ প্রকাশ রয়েছে।
এই প্রত্যাদেশ (ওহি) পরম প্রজ্ঞাময় সত্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ; তিনি আমাদেরকে সেই পথের দিকনির্দেশনা দেন, যা আমাদের জন্য কল্যাণকর। আর তিনি সর্বপ্রশংসিত, কারণ তিনি আমাদের যে নেয়ামতসমূহ দান করেন, সেগুলোর জন্য তিনি প্রশংসার যোগ্য।৫২ আল্লাহ তাঁর পরিপূর্ণতা ও মহিমার কারণে, তাঁর ন্যায়বিচার ও অনুগ্রহের জন্য সর্বপ্রশংসিত (হামীদ)। তাই তাঁর কিতাব অবশ্যই এমন উপায় ও পথনির্দেশনা প্রদান করে, যা কল্যাণ অর্জনে সহায়তা করে এবং অকল্যাণ থেকে রক্ষা করে।৫৩
আমরা যখন কুরআন তিলাওয়াত করি, তখন আমাদের নিজেদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে—যেহেতু আল্লাহ আল-হামীদ, তাই কুরআনের প্রতিটি বিষয় এমন গভীরভাবে কল্যাণকর যে, এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা করলে আমরা অনিবার্যভাবেই তাঁর প্রশংসা করতে বাধ্য হই।
যদি তা আমাদেরকে তাঁর প্রশংসায় উদ্বুদ্ধ না করে, তাহলে আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত—আমরা কী বুঝতে পারছি না? কোথায় আমাদের উপলব্ধির ঘাটতি রয়ে গেছে?
উপসংহার
আল্লাহ, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং আমাদের রূপ দিয়েছেন, তিনি আমাদেরকে তাঁর দিকে পথনির্দেশ করার জন্য একটি কিতাব প্রেরণ করেছেন। এই কাজটিই তাঁর সৃষ্টির প্রতি তাঁর যত্ন ও অনুগ্রহের প্রমাণ বহন করে। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা অনেক সময় ভুলে যাই—এই কুরআন আসলে কার পক্ষ থেকে এসেছে। ফলে আমরা এর সাথে এমনভাবে আচরণ করি, যেখানে আল্লাহর রহমত, প্রজ্ঞা ও মহিমাকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করা হয় না।
পরবর্তীবার যখন আমরা কুরআন তিলাওয়াত করব, তখন আমাদের কিছু বিষয় মনে রাখা উচিত: এই আয়াতটি কীভাবে আমার জন্য রহমত? এর মধ্যে আমার জন্য কী প্রজ্ঞা রয়েছে যা আমি শিখতে পারি? এই আয়াত বা সূরার মাধ্যমে আল্লাহ কীভাবে আমাকে পথনির্দেশ ও যত্ন করছেন?
এই প্রশ্নগুলো জান্নাতের বর্ণনাসমৃদ্ধ আয়াতগুলোর জন্য যেমন প্রযোজ্য, তেমনি জাহান্নামের বর্ণনাসমৃদ্ধ আয়াতগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একইভাবে কাহিনি ও দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রেও যেমন প্রযোজ্য, তেমনি সরাসরি আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত আয়াত—যেমন মদ্যপানের নিষেধাজ্ঞা—পড়ার সময় আল্লাহর নামসমূহ স্মরণ করলে আমরা বুঝতে পারি যে এটি কোনো যান্ত্রিক বা নিরাবেগ আদেশ নয়। বরং এটি এসেছে দয়া, যত্ন, লালন-পালন এবং দিভ্য প্রজ্ঞার উৎস থেকে।
তাঁর নামসমূহ স্মরণ করা আমাদের অন্তরে এই দৃঢ় বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে যে এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অবশ্যই প্রজ্ঞা রয়েছে; কারণ এটি এসেছে সর্বজ্ঞ ও পরম প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর বাস্তবে এটি এমন এক বিষয়, যার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত—কারণ তিনি সর্বপ্রশংসিত।
একইভাবে, যখন আমরা এমন আয়াত পড়ি যা আমাদেরকে ভীত করে, যেমন জাহান্নামের বর্ণনা, তখনও আমরা স্মরণ করতে পারি যে এই আয়াতগুলোও আল্লাহর রহমতেরই অংশ। কারণ এগুলোর বর্ণনা আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে দূরে থাকার পথ দেখায়। আসলে, কোনো ক্ষতিকর জিনিস থেকে দূরে সরে যেতে হলে, সেটি যে বিদ্যমান এবং সত্যিই ক্ষতিকর—তা জানা জরুরি।
আল্লাহ যখন আমাদের জানান যে কুরআন তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ (তানযীল), তখন আমরা স্মরণ করি—এই কুরআন এসেছে পরম দয়ালু, অতিশয় করুণাময় (আল-রহমান, আর-রহীম), সর্বজ্ঞ (আল-‘আলীম), পরম প্রজ্ঞাময় (আল-হাকীম), পরাক্রমশালী (আল-‘আযীয), সমগ্র জগতের প্রতিপালক (রব্বুল ‘আলামীন) এবং সর্বপ্রশংসিত (আল-হামীদ)-এর পক্ষ থেকে।
এই সাতটি নাম স্মরণে রেখে যখন আমরা কুরআন তিলাওয়াত করি, তখন তা আমাদেরকে আয়াতগুলোকে আল্লাহর পরিচয়ের আলোকে পড়তে সাহায্য করে। এটি আমাদেরকে কুরআনের বার্তাগুলোকে ভালোবাসা, দয়া, যত্ন, শক্তি ও প্রজ্ঞার দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে সহায়তা করে, এবং যখন আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকি তখন আমাদেরকে সান্ত্বনা দেয়।
কুরআন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সৃষ্টির জন্য চিরন্তন এক উপহার, এবং যারা এতে বিশ্বাস করে ও এর অনুসরণ করে, তাদের জন্য এটি একটি বিশেষ রহমত। যখন আমরা জানি এই কুরআন কার পক্ষ থেকে এসেছে, তখন আমরা উপলব্ধি করতে শুরু করি—এটি কত মূল্যবান, এর মাধ্যমে আমরা কত কিছু অর্জন করতে পারি, এবং এর অর্থ ও বার্তার সঙ্গে সময় কাটানো কতটা উপভোগ্য ও গভীর প্রশান্তিদায়ক।
টীকা (Notes)
১. সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস নং ২১৫; আল-আলবানীর মতে সহীহ।
২. ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন বাইন মাঞ্জিল ইয়া’কা না’বুদু ওয়া ইয়া’কা নাসতাঈন (বৈরুত: দারুল কিতাব আল-আরাবী, ১৪১৬ হিজরি / ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ), পৃ. ২৮।
৩. হাসান এলওয়ান ও উসমান উমারজি, “The Alchemy of Divine Love: How Our View of God Affects Our Faith and Happiness,” ইয়াকীন ইনস্টিটিউট, ২০২৩, https://yaqeeninstitute.org/read/paper/the-alchemy-of-divine-love-how-our-view-of-god-affects-our-faith-and-happiness
৪. ইবনুল কাইয়্যিম, আল-ফাওয়াইদ (বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ১৯৭৩), পৃ. ২০।
৫. ইউসুফ ওয়াহব ও মোহাম্মদ এলশিনাওয়ি, “Keys to Taddabur: How to Reflect Deeply on the Qur’an,” ইয়াকীন ইনস্টিটিউট, ২০২১, https://yaqeeninstitute.org/read/paper/keys-to-tadabbur-how-to-reflect-deeply-on-the-quran
৬. জেফ্রি ল্যাং, Even Angels Ask (বেল্টসভিল, এমডি: আমানা পাবলিকেশনস, ২০২১), পৃ. ২৮। জেফ্রি ল্যাং একজন মার্কিন গণিতের অধ্যাপক। তিনি ১৯৮০-এর দশকে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের উপর বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখক।
৭. কুরআন: ৩৯:১, ৪০:২, ৪১:২, ৪৬:২ এবং অন্যান্য স্থান।
৮. ফখরুদ্দীন আল-রাযী, মাফাতীহুল গাইব (তাফসির), https://tafsir.app/alrazi/39/1
৯. আল-রাযী, মাফাতীহুল গাইব (তাফসির), https://tafsir.app/alrazi/41/2
১০.এই নামগুলোর অনুবাদ বিভিন্নভাবে করা যেতে পারে। এখানে ধারাবাহিকতার জন্য “সম্পূর্ণ দয়ালু (The Entirely Merciful)” এবং “অতিশয় দয়ালু (The Especially Merciful)” হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে। তবে এগুলোর অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত—এ বিষয়টি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ (কুরআন ৪১:২)।
১১. কুরআন, সূরা আল-ফাতিহা, ১:১–৪
১২. সূরা আত-তাওবা ব্যতীত
১৩. হান্স ওয়েহর, Arabic-English Dictionary (আরবী-ইংরেজি অভিধান), (ইউরবানা, ইলিনয়: স্পোকেন ল্যাঙ্গুয়েজ সার্ভিসেস, ১৯৯৩), পৃ. ৩৮৪
১৪. সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৫৯৯৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৭৫৪
১৫. ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর ফি ‘ইলমিত তাফসীর, https://tafsir.app/zad-almaseer/1/1
১৬. আবু হামিদ আল-গাজ্জালী, আল্লাহর ৯৯টি সুন্দর নাম (Al-Maqṣad al-Asnā fī Sharḥ Asmā’ Allāh al-Ḥusnā), অনুবাদ: ডেভিড বুরেল ও নাজিহ দাহের, The Ghazali Series (কেমব্রিজ: The Islamic Texts Society, ১৯৯২), পৃ. ৫২
১৭. সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৬০০০; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৭৫২
১৮. ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন, পৃ. ৩২
১৯.ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন, পৃ. ৩২
২০. কুরআন ৩৩:৪৩
২১. কুরআন ৬:৫৪
২২. তাফসীর আস-সা’দী, https://tafsir.app/saadi/36/5
২৩. ইবন আশূর, আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর, https://tafsir.app/ibn-aashoor/36/5
২৪. কুরআন ৪০:২
২৫. কুরআন ৪৬:২
২৬. মাহের মুকাদ্দিম, আসমা’ আল্লাহ আল-হুসনা: জালালাহা ওয়া লাতায়িফ ইকতিরানিহা ওয়া থামারাতিহা ফি দাও’ আল-কিতাব ওয়াস-সুন্নাহ, ৩য় সংস্করণ (কুয়েত: আল-ইমাম আল-যাহাবী, ২০১৪), পৃ. ১৯১–৯২
২৭. ইবনুল কাইয়্যিম, শিফা’ আল-আলীল, (বৈরুত: দারুল মা‘রিফা, ১৩৯৮ হিজরি / ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ), পৃ. ১৮১
২৮. মুকাদ্দিম, আসমা’ আল্লাহ আল-হুসনা, পৃ. ১০৩
২৯.আল-রাযী, মাফাতীহুল গাইব (তাফসির), https://tafsir.app/alrazi/40/2
৩০.ইবন আশূর, আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর, https://tafsir.app/ibn-aashoor/40/3
৩১. কুরআন ২:২১৬
৩২. কুরআন ১২:১০০
৩৩. কুরআন ৩৬:৫
৩৪. কুরআন ৩৯:১
৩৫. উদাহরণস্বরূপ, কুরআন ৪০:২, ৪২:২, ৪৫:২
৩৬. কুরআন ৪১:৪১
৩৭. হান্স ওয়েহর, পৃ. ৭১৩
৩৮. মুকাদ্দিম, আসমা’ আল্লাহ আল-হুসনা, পৃ. ৬৪–৬৫
৩৯. কুরআন ৮:১০
৪০. তাফসীর আল-সা‘দী, https://tafsir.app/saadi/36/5
৪১. ইবনু আশূর, আল-তাহরীর ওয়াল-তানওয়ীর, https://tafsir.app/ibn-aashoor/39/1
৪২. ইবনু আশূর, আল-তাহরীর ওয়াল-তানওয়ীর, https://tafsir.app/ibn-aashoor/36/5
৪৩. তাফসীর আল-সা‘দী, https://tafsir.app/saadi/39/1
৪৪. কুরআন ৩২:২; এছাড়াও ৫৬:৮০; ৬৯:৪৩
৪৫. ইবনুল কাইয়্যিম, বাদায়ি‘ আল-ফাওয়ায়িদ (বৈরুত: দার আল-কিতাব আল-আরাবী, ৭০১ হিজরি), ২:২৪৭; তাফসীর আল-সা‘দী, https://tafsir.app/saadi/1/2
৪৬. মুকাদ্দিম, আসমা’ আল্লাহ আল-হুসনা, পৃ. ৩১
৪৭. কুরআন ২০:৪
৪৮. কুরআন ৪১:৪২
৪৯. মুকাদ্দিম, আসমা’ আল্লাহ আল-হুসনা, পৃ. ৯৩
৫০. কুরআন ২২:৬৪
৫১. সহীহ আল-বুখারীতে বর্ণিত একটি দীর্ঘ দোয়ার অংশ, হাদিস নং ১১২০।
৫২. আল-তাবারী, জামিʿ আল-বায়ান ʿআন তা’বীল আল-কুরআন, https://tafsir.app/tabari/41/42
৫৩. তাফসীর আল-সা‘দী, https://tafsir.app/saadi/41/42
অনুবাদ: জাকিয়া বুশরা
