বাংলা ভাষার শেকড়, সংগ্রাম ও আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশ রাজনীতি ও অর্থনীতি সাহিত্য ও সংস্কৃতি

বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যে দেশের নাম সরাসরি ভাষা ও জাতিসত্তার নামের সাথে সংযুক্ত। এই বাংলা ভাষাই সর্বপ্রথম আমাদেরকে শিখিয়েছে- কীভাবে আন্দোলন করে নিজেদের অধিকার আদায় করতে হয়, যার পথপরিক্রমায় একাত্তরে স্বাধীন একটি দেশের সূচনা হয়। এই ভাষা-আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই উপনিবেশ উত্তর সময়ে আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু করেছি। 

ইতিহাসে আমরা নানাভাবে নিজেদের আত্মপরিচয় খুঁজেছি। ইতিহাসের নানান ঘটনার বাঁকে বাঁকে কঠিন সব আঘাতে জর্জরিত হয়ে শক্তিশালী এক জাতি হিসেবে গড়ে উঠেছি, এভাবেই গড়ে উঠেছে আমাদের পরিচয়। ১৯৫২ সালের  ২১ ফেব্রুয়ারী, বাংলা ভাষার অধিকারের দাবিতে রাজপথ রঞ্জিত করে দেওয়া রক্তে আমরা নিজেদের অনন্য পরিচয় পেয়েছি। আমরা জেনেছি, বাংলা ভাষার বাইরে আমাদের জীবন নেই। 

আমরা যাকে জেনে এসেছি ভাষাদিবস হিসেবে, বিশ্ব এখন তাকে চিনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের আবেগ, এতো ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধা দেখে বিস্মিত হয়ে যান বিদেশিরা। ভাষার জন্য এই যে বাঁধভাঙা আবেগ আমাদের, তার জন্য নিরেট কাজ কতটা করতে পেরেছি আমরা? আমরা তার পরের প্রজন্ম কি সেই ভাষার মান রক্ষা করতে পেরেছি? পারলেও বা কতটুকু? এ পর্যায়ে এসে অনেকেই অনেক সফলতা তুলে ধরবেন। সফলতা আছে বৈকি, কিন্তু আপামর জনসাধারণের আচরণে যদি সেটা প্রকাশ না পায়, সেটার মূল্য কতটুকু বজায় থাকে সেটাও দেখার বিষয়। ইদানীং আবার বাংলা ভাষাকে নিয়ে উদ্ভুত সকল সমস্যার মূলে একমাত্র পাকিস্তানি শাসনামল এবং পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক উর্দু ভাষার আধিপত্যকেই দায়ী করা হয়। এমনকি স্বাধীনতার পরে যেসব লেখনী প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো পড়লেও আমরা ভাষাকেন্দ্রিক মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ‘৫২ এর ভাষা আন্দোলনকেই বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা কি আদতে সেটাই বলে?

ভাষা যেকোনো সভ্যতার একটি মৌলিক উপাদান—তা অনস্বীকার্য। ভাষার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ধ্যান-ধারণা, চিন্তা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তরিত হয়। ফলে ভাষা কেবল সংস্কৃতির অংশ নয়, বরং সভ্যতার বিনির্মাণের অন্যতম প্রধান উপাদান। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভাষা যেমন সভ্যতা নির্মাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জন্যও ছিল একটি প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার।

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের সময়ে প্রায় ১৮০টিরও বেশি ভাষা ও প্রায় সাড়ে পাঁচশো উপভাষা বিদ্যমান ছিল। কিন্তু উপনিবেশবাদীরা সেই ভাষাগুলোকে দমিয়ে দিয়ে ইংরেজিকে চাপিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, এই উপমহাদেশের মানুষ হঠাৎ করেই ভাষাহীন হয়ে পড়ে, তাদের সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানগত প্রবাহ ব্যাহত হয়। ভাষাকে দমন করা মানেই একটি জাতিকে অন্ধকারে নিক্ষেপ করা।

এই কারণেই উপমহাদেশে ভাষা নিয়ে সংগ্রাম হয়েছে, রক্ত ঝরেছে। অথচ ভাষা তো যুদ্ধের উপকরণ নয়—এটি তো সাগরের মতো, যা নানা জলধারার সাথে মিশে প্রবাহিত হয়, সমৃদ্ধ হয়, নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

বাংলা ভাষা অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ একটি ভাষা। বাংলা ভাষা মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা। বৌদ্ধ যুগ থেকে শুরু করে ইসলামী সভ্যতার সময় পর্যন্ত এর বিকাশ হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে উপনিবেশ আমলে বাংলা ভাষাকে সংকীর্ণ করার চেষ্টা হয়েছে। এসময় বলা হলো এর উৎপত্তি সংস্কৃত থেকে, এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এর বৈচিত্র্যময় বিকাশকে সংকুচিত করা হলো। ভাষাকে সংকীর্ণ করা মানে সভ্যতার বিকাশকেও সংকীর্ণ করা।

ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষার যে সংস্কার করানো হয় সেখানে সংস্কৃত পণ্ডিতেরা মোড়লের ভূমিকায় ছিলেন এবং তাঁরা বাংলা ভাষায় প্রায় ষাট ভাগ সংস্কৃত শব্দের কৃত্রিম প্রবেশ ঘটান। অন্যদিকে সাহিত্য চর্চায় মুসলমান কর্তৃক উন্নীত বাংলা ভাষাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া হয়, যার প্রমাণ বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র, শরৎচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের লেখাগুলোয় দেখা যায়। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে বাঙালি মুসলমানরা নিজেদের প্রায়শ্চিত্ত না করে উল্টা বাংলা ভাষার উপর গোসা করেন এবং দ্বীনে ইসলাম ও বাংলা ভাষাকে সাংঘর্ষিক সম্পর্ক ঠেলে দেন। কিন্তু বাংলা ভাষার উত্থান ও বিকাশের ইতিহাসে আমরা এই দ্বন্দ্বের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি পাই না। বরং মুসলমান শাসকগণ বাংলা ভাষার এতদূর পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন যে বাংলা ভাষা সেই সময় সংহতি প্রতিষ্ঠার গুরুভার বহন করতে সক্ষম হয়েছিল। এর আগে সেনদের সময়ে আমজনতার ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষা ছোটলোকদের ভাষা হিসাবে তাচ্ছিল্যের শিকার হয়েছে। মুসলমান শাসকেরা ইসলামের মূল্যবোধকে সামনে রেখে আমজনতার মুখের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে রাজদরবারে নিয়ে যান। বাংলা ভাষার জন্য তৎকালীন দুনিয়ায় সবচেয়ে নজিরবিহীন সম্মাননা হচ্ছে- সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি রচনা করেন। রাজনৈতিক ভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রের নামকরণ করেন- শাহী বাংগালাহ।

পরবর্তীতে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এই রাষ্ট্রকে সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির শিখরে পৌঁছিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষায় অনুমোদন দেন, যা বাংলাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। মুসলমানদের শাসন আমলেই রামায়ণ, মহাভারত অনুবাদ হয়। দৌলত কাজী, মহাকবি আলাওলরা বাংলা ভাষায় কবিতা লিখে অমর কীর্তি লাভ করতে পেরেছিলেন। মুসলমান কবিদের  পাশাপাশি হিন্দু কবিরাও সমানভাবে বরং আরো বেশি কাব্য চর্চা করেছেন এবং বিষয়বস্তু হিসেবে নিজেদের ধর্ম, পুরাণ বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা ও উৎসাহ পেয়েছিলেন। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে মুসলমান শাসকগণ এতদূর ভূমিকা পালন করেছেন যে, একথা বললে অত্যুক্তি হবে না- মুসলমান শাসকগণ এ অঞ্চলে না এলে বাংলা ভাষা সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে এভবে বিকশিত হয়ে উঠতে পারতো না, উপরন্তু বাংলা ভাষা অস্তিত্বের সংকটে তলিয়ে যেতে পারতো। সুতরাং এ সময়ে এসে বাংলা ভাষা ও দ্বীনকে সাংঘর্ষিক রূপে বিবেচনা করা মুসলমানদের ইতিহাস বিমুখতাকে স্পষ্ট করে তোলে। মুসলিম শাসকগণ এ অঞ্চলে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই মসজিদের মুদ্রালিপি থেকে শুরু করে সকল স্থানেই আরবি, ফারসিকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, বাংলা ভাষাকেও একইভাবে ব্যবহার করেছেন। তাদের সীলমোহর, স্বাক্ষর, বিভিন্ন অংশ জুড়েই থাকত বাংলা ভাষার সরকারি ব্যবহার। অফিস-আদালত, প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিচারালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রেজিস্ট্রিকরণ, ব্যক্তিগত কাজকর্ম, প্রজার সাথে সুলতানের কথোপকথন, নবাব, সুবেদার বা দেওয়ানদের দরবারেও বাংলা ভাষায় সকল কিছু পেশ করা যেত। বাংলা ভাষাকে নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের তৈরিকৃত।

কিন্তু, একদল অন্ধ সংস্কৃতভক্ত বাংলা ভাষার মধ্যে প্রচলিত আরবী ফারসী শব্দগুলিকে বিদেশী শব্দ বলে বর্জন করতে চান। যখন সংস্কৃত ভাষা হোরা, কেন্দ্র, জামিত্র, দীনার প্রভৃতি গ্রীক শব্দ এবং ইক্কবাল, ইন্দুরার, মুকাবিলা প্রভৃতি আরবী শব্দ গ্রহণ করেছে, তখন বাংলা ভাষার বেলায় আপত্তি কেন? ঐ সকল আরবী-ফারসী শব্দ বাংলা ভাষার অস্থিমজ্জাগত হয়ে গেছে। ভাষা হতে এগুলোকে তাড়ানো সহজ ব্যাপার হবে না। দোয়াত, কলম, কাগজ, জামা, কামিজ, কমর, বগল প্রভৃতি এবং আইন, আদালতে প্রচলিত সর্ব্বসাধারণের সহজবোধ্য হাজার খানিক শব্দ ত্যাগ করে নতুন শব্দ গড়লে তা নামের জোরে পুস্তকে চলতে পারে বটে, কিন্তু তা ভাষায় চলিবে না। বাংলা ভাষায় আরবী, ফারসী, তুরকী, ইংরাজি, ফরাসী, পর্তুগীজ প্রভৃতি যেকোনো ভাষার শব্দ বেমালুম খাপ খেয়ে গেছে। তারা নিজেদের দখলী স্বত্ববলে বাংলা ভাষায় থাকবে, তাড়াইতে গেলে জুলুম করা হবে।

ভাষার একটা রূহ থাকে। বৃটিশরা ক্ষমতায় এসেই সুবা বাংলা/বাংলা সালতানাতে’র বাংলা ভাষাকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ হিন্দুত্ববাদী ঐতিহাসিকগণ, ভাষাতাত্ত্বিকদের দিয়ে আগ্রাসন চালিয়েছে, সংস্কৃতায়ন করে ইসলামী পরিভাষাকে শেষ করেছে। আবার এ পরিভাষাগুলোকে বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রদের মতো প্রভাবশালী সাহিত্যিকদের মাধ্যমে মানুষের মন ও মননে পৌঁছে দিয়েছে। আজ তাই পাশ্চাত্য ও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বুঝাপড়া আমরা বুঝতে পারি না, লাল ব্রাক্ষ্মণদের ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতার মানেও জানি না!

একইভাবে আরবি, ফার্সির মতোই মুসলিমদের হাতে গড়া বৈশ্বিক ভাষা ‘উসমানী ভাষাকেও কামাল পাশাদের মতো পশ্চিমা আজ্ঞাবহ সেক্যুলার শাসকেরা ল্যাটিন শব্দ দিয়ে শেষ করেছে! এই পরিভাষা ও বয়ান-ই পাল্টে দেয় মূল বিষয়কে! পাল্টে দেয় চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে! যেমন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনে কেউ শহীদ হলো, মিডিয়া নিউজ করলো জায়নবাদী ইজরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একজন জঙ্গী নিহত! অর্থ, উদ্দেশ্য, সবই পালটে গেল। এইজন্য মূল তথ্যের সাথে পরিভাষা, বয়ান বুঝা বেশি জরুরী। রাজনীতির গলি দিয়ে কারা এই বয়ান, এই পরিভাষা তৈরি করলো, কেন করলো— সেটা জানাও আবশ্যক। অর্থাৎ, ভাষা ও পরিভাষা জাতির ভিত্তি নির্মাণে, ইতিহাসের সংযোগে ও চিন্তার বাহন হিসেবে কর্মরত থাকে।

ভাষা ও পরিভাষা হচ্ছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির মৌলিক উপাদান; শ্রেষ্ঠত্বের হাতিয়ার। রাজনৈতিক বুঝাপড়া-তে ভাষার রাজনীতি তাই এতোটা গুরুত্ববহ। অন্যথায় কখনোই নিজেদের স্বকীয়তা রক্ষা করে সামনে অগ্ররসর হওয়া সম্ভব না। কেননা, শেকড়বিহীন কোনো গাছ কখনোই দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের স্বরূপটা তাহলে কেমন?

একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় যে, এখন বাংলাদেশের কোনো চ্যানেলে বা কোনো মিডিয়াতে কখনোই এই কথা বলা হয় না যে- অমুকের লাশ আজ গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হলো বা বায়তুল মোকাররমে জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। বরং বলা হয় যে, অমুকের মরদেহটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। লাশ হচ্ছে সাংস্কৃতিক বা আমার নিজস্ব আইডেন্টিটির অর্থাৎ বাঙালি মুসলিমদের শব্দ। লাশকে বিতাড়িত করে মরদেহ ঢুকাচ্ছি, মরদেহ ইংরেজি ডেড-বডির বাংলারূপ। যেহেতু কলকাতায় বিশেষ কারণে তারা লাশ শব্দ ব্যবহার করে না, তাদের নিজস্বতা রক্ষা করার জন্য এটা দোষের কোন কিছু নয়। কলকাতার লোকেরা যদি তার নিজস্ব ভাষাকে রক্ষা করতে চায় সেটাতে দোষ বা দোষের কিছু নেই। কিন্তু দোষ হচ্ছে তখন, যখন আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে ফেলে রেখে ওইটাকে গলার মালা হিসেবে পড়িয়ে নিই। আমাদের সাহিত্যের পাতা থেকে লাশগুলো আজ বিতাড়িত হয়ে মরদেহ হয়ে গেছে।

এই যে সংবাদপত্রের ভাষা, মিডিয়ার ভাষা বা আমাদের নিজেদের ভাষা—সবক্ষেত্রেই পানি বিতাড়িত হয়েছে। সেখানে জল ঢুকে গেছে। জল এবং পানি একই জিনিস বুঝায়, এটার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্যটা হল সাংস্কৃতিক। ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান থেকে শুরু করে আসাম পর্যন্ত এই দেড়শ কোটি মানুষের সবাই সকাল বিকাল রাত্রি দুপুরে পানি পান করে। শুধুমাত্র কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের চার-পাঁচ কোটি হিন্দুরা জল পান করে। এটার মধ্যেও দোষের কিছু নেই, তারা তাদের নিজস্বতা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। সেজন্য তারা পানি শব্দকে পরিহার করে। আমরা এই দেড়শ কোটি মানুষের সাথে সামঞ্জস্য না রেখে আমরা এই জলের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। এখন মরহুম শব্দের ব্যবহার উঠিয়ে বলা হয় প্রয়াত। কিন্তু এটাও আমাদের সংস্কৃতি নয়। এটা ধর্মীয় বিভাজন নয়, সুস্পষ্টত এটা একটা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এরকম অসংখ্য ভাষাগত আগ্রাসনে আমরা বর্তমান সময়ে কম্পমান।

বাংলা ভাষা নিজস্ব ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ ইতিহাস বহন করে। এটি বহুভাষার শব্দভাণ্ডারকে ধারণ করে একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ভাষায় পরিণত হয়েছে। ফলে উপমহাদেশীয় সভ্যতা মানুষের চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু যখন বাইরের কোনো ভাষা বা সংস্কৃতি জোর করে আমদানি করা হয়, তখন সভ্যতার বিকাশ ব্যাহত হয়, পিছিয়ে যায়। আমরা উপনিবেশিক সময়ে এর বাস্তব অভিজ্ঞতা পেয়েছি। উপনিবেশবাদ আমাদের অগ্রযাত্রা এগিয়ে দেয়নি; বরং পিছিয়ে দিয়েছে। কারণ তারা আমাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে দমন করে বাইরের ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়েছিল। ফলে আমাদের সভ্যতার বিকাশ স্থবির হয়ে পড়েছিল।

বাংলা ভাষা জনসংখ্যার দিক থেকে, ইতিহাসের দিক থেকে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা, আমাদের জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। এজন্য ঢাকাও শুধুমাত্র বাংলাদেশের রাজধানী নয়, একটি দেশের প্রধান শহর নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা ‘বাংলা ভাষা’র রাজধানী। এই অঞ্চলে মানুষের আশা, জীবন-সংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা, গৌরবগাঁথার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বাংলা ভাষা আমাদের সামনে সর্বদাই দীপ্তিমান। নদীমাতৃক বাংলায় চিরসবুজ প্রান্তর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিম উম্মাহর অধ্যুষিত বিভিন্ন দেশে এই বাংলা ভাষা সগৌরবে এই অঞ্চলের প্রাণসত্তার প্রতিনিধিত্ব করে।

শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি সবক্ষেত্রেই বর্তমানে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম একটি সমৃদ্ধশালী দেশ চীনেও ১৯৫০ সালের পূর্বে চায়না ভাষার সাথে সাথে অন্যান্য ভাষারও বেশ আধিপত্য ছিল। কিন্তু চীন তাদের সমাজ, রাষ্ট্র, সামাজিক শক্তিকে যথোপযুক্ত কাজে লাগিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেয় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সবকিছুকে বন্ধ করে দিয়ে হলেও অধ্যাপক, সাহিত্যিক, অনুবাদক নিযুক্ত করে বই-পুস্তক, লেখনী সকল কিছুকে নিজস্ব ভাষায় অনুদিত করার, প্রকাশ করার। প্রথম কয়েক বছরেই হাজার হাজার চীনা সাহিত্য অনুদিত হয়, নিজস্ব ভাষায় লিখিত হয়। ফলশ্রুতিতে তারা তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে চাইনিজ ভাষায়, নিজেদের রূপরেখার আলোকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। জাপানেও একই কাজ করা হয়েছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে তুরস্কে ঐতিহ্যবাহী উসমানী ভাষা পরিবর্তনের বিপজ্জনক ফলাফলটা তারা দেরিতে হলেও উপলব্ধি করে। এজন্য আধুনিক তার্কিশ ভাষাতে এভাবেই পূর্বের সকল জ্ঞান অনুবাদ করার প্রয়াস চালানো হয়। আজ সকল ধরনের জ্ঞানভাণ্ডার, সাহিত্য, চিন্তা তার্কিশরা তাদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ করতে পারে, চর্চা করতে পারে। চীন, জাপান ও তুরস্ক যদি করতে পারে, তাহলে আমরা কেনো পারবো না?

যেখানে বর্তমানে মাতৃভাষা হিসেবে বিশ্ব-ভাষা তালিকায় বাংলার অবস্থান পঞ্চম এবং বহুল ব্যবহৃত ভাষা হিসেবে এর অবস্থান সপ্তম। বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটিরও অধিক মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। এদের মধ্যে ২৬ কোটিরও বেশি বাংলা ভাষাভাষীর বসবাস বাংলাদেশ ও ভারতে। বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী বাকি ৪ কোটিরও বেশি মানুষ ছড়িয়ে আছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবুও কেনো আমরা পারবো না?

আমরা জানি যে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান কথ্য ও লেখ্য ভাষা বাংলা। বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংঙ্গীত রচিত হয়েছে বাংলা ভাষাতেই।

বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা বাংলা এবং এদেশের ৯৮.৯% মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকে। ১৯৮৭ সালের ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস, আদালত, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল জবাব ও অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে এবং যদি কোন ব্যক্তি বাংলাভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তা হলে সে আবেদন বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, গবেষণা ও প্রচারের জন্য ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষার এত বিস্তৃত প্রচার ও প্রসারের কারণেই এর শব্দ ও সাহিত্য ভাণ্ডার এত সমৃদ্ধ। সেই সাথে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর ভাষাও এটি। ইউনেস্কো ২০১০ সালে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বাংলাকে। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাহিত্যের প্রায় সবকটি শাখাতেই বাংলা ভাষা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বাংলার বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন আঞ্চলিক ও উপভাষা বাংলা ভাষাকে প্রাণবন্ত ও গতিশীলতা দান করেছে। একইসাথে বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলা ভাষার এত বিস্তৃত পরিসর এর সমৃদ্ধি ও সর্বব্যাপী গুরুত্বের দিকেই ইঙ্গিত করে। পুরো পৃথিবীতে ৪৫ কোটিরও বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে এবং বাংলা বর্তমান দুনিয়ার অন্যতম একটি প্রভাবশালী ভাষা।

তাই, বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে অন্যান্য ভাষার সামনে হীনমন্যতায় ভোগার কোন সুযোগই নেই। অতীতের সোনালী প্রেরণাকে সামনে রেখে, বাংলা ভাষাকে ভিত্তি করে অগ্রসর হলে নতুনভাবে একটি সমৃদ্ধ অবস্থানে পৌঁছা সম্ভব। কেননা, বাংলা অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবে বাংলা ভাষা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের জায়গা। একইসাথে তা আমাদের অগ্রসরতার সবচেয়ে বড় সোপানও বটে। মুসলমানিত্ব মজবুত করতে বাংলা ভাষাকে এড়িয়ে চলে নয়; বরং আঁকড়ে ধরাই যৌক্তিক।

যেখানে ছোট্ট হিব্রু ভাষার গত ৬ হাজার বছরে কোনো অস্তিত্ব ছিল না, সেখানে তারা নিজেদেরকে নতুন করে জাগরিত করে আন্তর্জাতিক ভাষাতে পরিণত করতে পেরেছে; আবার আজ থেকে দেড়শ বছর আগেও হিন্দি ভাষার কোনো অস্তিত্ব ছিল না, সেই হিন্দি ভাষা কি উপমহাদেশে নেতৃত্ব দিচ্ছে না? শেক্সপিয়ার একাই ইংরেজি ভাষাকে দাঁড় করিয়েছে, অথচ সেই সময় মহাকবি আলাওল বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক সম্মানের স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। অতএব, আমরাও বাংলা ভাষার সম্মানকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে পারব, ইনশাআল্লাহ্।

তাই আজ যখন আমরা আবার সভ্যতার আলাপ করি, সভ্যতার পুনর্জাগরণের কথা বলি, তখন অবশ্যই আমাদেরকে আমাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। একইসাথে আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ঐশ্বর্য, আমাদের চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস এবং আমাদের দীন—এসবকেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেগুলোর উপর ভিত্তি করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।

সুতরাং বুঝা যায়, এ সকল আলাপ উপেক্ষিত থাকার কারণও আমাদের কাছে অস্পষ্ট নয়। আর এই উপেক্ষা থেকেই সমস্যার সূচনা হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ব্রিটিশদের হাত থেকে এই উপমহাদেশকে রক্ষা করা হয়, যাদের কাফনবিহীন দাফন হয়েছিল এ বাংলায়। এরপর হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ রক্তার্জিত স্বাধীনতা এনে দিয়েছে এই বাংলাকে। আমরা পেয়েছি আমাদের নিজস্ব মাতৃভূমি ‘বাংলাদেশ’। সেই দেশকে সার্বজনীন করে তুলতে এদেশের ছাত্রসমাজ, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবীগণ সকল স্তরের মানুষকে বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে ধরা উচিত, যাতে করে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই বাংলা ভাষায় জ্ঞানার্জন করতে পারে এবং বাংলা ভাষাতেই খুলে যায় মানুষের সার্বিক বিকাশের এক অবরুদ্ধ দ্বার। কিন্তু আমাদের সমাজ, রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন- অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা গণিত সকল বিষয়ের পাঠদানই হচ্ছে ইংরেজিতে, যেগুলোর বাংলা পাঠ্যবই সকলের সামনে হাজির করার প্রয়োজনীয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। এমনকি আইন-আদালত-প্রশাসনেও বাংলা কোনো যেন আজ উপেক্ষিত।

আমাদের এই ভাষাকে, আমাদের সাহিত্যকে আমাদের নিজেদেরকেই বহন করার দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা আমাদের সুবিশাল ইসলামী সভ্যতা, আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতির মুক্তির সাথে সংযোগ স্থাপণ করে আমাদের মাটি, আমাদের মানুষ ও আমাদের বাংলা ভাষার সাথে সমন্বয় করে এমন একটি সুবিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার, জ্ঞানের ভাণ্ডার তৈরি করতে হবে, এমন সকল চিন্তা ও মূলনীতি সামনে হাজির করতে হবে, এমনসব কাব্য ও ইশতেহার আনতে হবে, যেগুলো দিয়ে আমরা আবার বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরতে পারবো। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

তথ্যসূত্র :

০১. শিউলিমালা জার্নাল : ভাষা নিয়ে ভাবনা ও ভাষার রাজনীতি – মুহসিনা বিনতি মুসলিম 

০২. শিউলিমালা জার্নাল : সভ্যতার বিনির্মাণে ভাষার ভূমিকা – মিমি বিনতে ওয়ালিদ 

০৩. রোয়াক : জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা ‘বাংলা’ – হাসান আল ফিরদাউস 

০৪. রোয়াক : বাংলা ভাষা ও জাতীয় জাগরণে কবি কাজী নজরুল ইসলাম – আবদুল হাই শিকদার

০৫. প্রাচীন বাঙ্গালা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, দীনেশচন্দ্র সেন, দিব্যপ্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫।

০৬. বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, মুহাম্মদ মতিউর রহমান, ইসলামিক সেন্টার, ফেব্রুয়ারি ২০০২।

০৭. বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ, মোহাম্মদ আজম, আদর্শ প্রকাশন, মে ২০১৪।

০৮. ইসলাম প্রচারে বাংলা ভাষা, সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী, অনুবাদ: মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ, রোয়াক ব্লগ।

০৯. বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নেয়ার ভাবনা, ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব।

১০. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ড. এম এ রহিম, অনুবাদ: মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বাংলা একাডেমি, জুন ২০০৮।

১১. বঙ্গ বাঙ্গালা বাঙ্গালী, ফাহমিদ উর রহমান, মক্তব প্রকাশন, নভেম্বর ২০২১।

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *