বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মিডিয়ার বিবর্তন: প্রসঙ্গত সোশ্যাল মিডিয়া ও তার প্রভাব

বাংলাদেশ

মানুষের যোগাযোগের ইতিহাস মূলত সভ্যতার ইতিহাসেরই প্রতিফলন। যখন প্রাচীন মানুষ গুহার দেয়ালে চিত্র এঁকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করত, তখনই শুরু হয়েছিল মানব সমাজে “মিডিয়া”–র জন্ম। অর্থাৎ, মিডিয়া হল তথ্য, ধারণা ও সংস্কৃতি বিনিময়ের মাধ্যম, যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জ্ঞানের প্রবাহ ঘটায়। মৌখিক বার্তা থেকে মুদ্রণযন্ত্র, রেডিও থেকে টেলিভিশন, আর টেলিভিশন থেকে আজকের স্মার্টফোন—প্রতিটি ধাপে মিডিয়া শুধু প্রযুক্তিগত নয়, সাংস্কৃতিক বিপ্লবও ঘটিয়েছে।

বিশ্ব ইতিহাসে মিডিয়ার প্রভাব সর্বজনীন ও গভীর। মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পর ইউরোপে যে জ্ঞানের বিস্ফোরণ ঘটেছিল—তাকে বলা হয় Printing Revolution—যা পরোক্ষভাবে রেনেসাঁস ও গণতন্ত্রের বীজ রোপণ করে। একইভাবে, বিংশ শতাব্দীর রেডিও ও টেলিভিশন বিশ্বকে “গ্লোবাল ভিলেজে” পরিণত করে, যেমনটি কানাডীয় দার্শনিক মার্শাল ম্যাকলুহান বলেছিলেন—“The medium is the message.” অর্থাৎ, তথ্যের বাহনই মানুষের চিন্তাকে রূপ দেয়।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই বার্তাকে আরও বাস্তব করে তুলেছে। এখন খবর আর কেবল সংবাদপত্রের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; তা টিকটকের ভিডিও, ফেসবুক পোস্ট বা ইউটিউবের শর্টসেও ছড়িয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে। তথ্যের এই গতি মানুষের জীবন, মনস্তত্ত্ব ও সমাজকে এমনভাবে বদলে দিচ্ছে যা মানব ইতিহাসে নজিরবিহীন।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের বাইরে নয়। স্বাধীনতার পর টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়ার হাত ধরে যে মিডিয়া সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল, তা এখন এক অভূতপূর্ব ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত ২০০০ সালের পর ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন প্রযুক্তির বিস্তারে বাংলাদেশের মিডিয়া দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। সংবাদ, বিনোদন, মতামত—সবকিছু এখন হাতের মুঠোয়, স্ক্রিনের আকারে।

এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের মিডিয়ার বিবর্তন এখন শুধু প্রযুক্তির ইতিহাস নয়, বরং এক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক পরিবর্তনের গল্প। টেলিভিশন থেকে ইউটিউব, পত্রিকা থেকে ফেসবুক নিউজফিড—সবখানেই প্রতিফলিত হচ্ছে সময়ের চিন্তা, বাণিজ্যের প্রভাব, আর মানুষের পরিবর্তিত মনস্তত্ত্ব।

গ্লোবালাইজেশনের ফলে বাংলাদেশে মিডিয়ার বিস্ফোরণ ঘটে মূলত ২০০০ সালের পর থেকে। প্রথমদিকে মিডিয়া হিসেবে টেলিভিশন ছিল বিনোদন ও সংবাদ দুয়েরই মাধ্যম—সাম্প্রতিক খবর, নাটক, সংগীত, রাজনীতি, খেলাধুলা—সব একসাথে পাওয়া যেত একটি চ্যানেলে। কিন্তু ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার সেই ধারা বদলে দেয়।

বাংলাদেশে ২০২৫ সালের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় মানুষের সংখ্যা ৫ কোটিরও বেশি, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ ব্যবহারকারী দৈনিক সংবাদ জানতে নয়, বরং সময় কাটানো, বিনোদন নেওয়া এবং ভাইরাল কনটেন্টে অংশগ্রহণের জন্য যুক্ত থাকে। গবেষণা বলছে, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর এক বড় অংশ বর্তমানে খবর পড়ার পরিবর্তে “রিল”, “স্টোরি”, “শর্টস” বা “মিম”–এর মাধ্যমে তথ্য জানতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

গবেষক ড্যানিয়েল বেল তাঁর “The Cultural Contradictions of Capitalism” গ্রন্থে লিখেছিলেন—“মিডিয়া সভ্যতাকে জানায় না, বরং যা মানুষ জানতে চায়, তাই দেখায়।” বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি যেন এই উক্তির বাস্তব প্রতিফলন।

এই পরিস্থিতিকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন “attention economy”—অর্থাৎ, যার হাতে মানুষের মনোযোগ আছে, তার হাতেই ক্ষমতা।

মিডিয়া এই প্রবণতাকেই ব্যবহার করছে। টেলিভিশন থেকে ইউটিউব পর্যন্ত, প্রত্যেকে জানে—মানুষ যত আবেগী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তত বেশি “এনগেজমেন্ট” হবে। আর সেই এনগেজমেন্টই বিজ্ঞাপনদাতা টানে, অর্থাৎ টাকায় রূপ নেয়। ফলে সাংবাদিকতার মৌলিক উদ্দেশ্য—ঘটনার কারণ, প্রেক্ষাপট ও সত্য অনুসন্ধান—পিছিয়ে পড়েছে “কীভাবে ভাইরাল করা যায়” এই বাণিজ্যিক ভাবনার কাছে। ফলে সংবাদ পরিবেশন ধীরে ধীরে আবেগনির্ভর হয়ে পড়ছে। সাংবাদিকতার মৌলিক প্রশ্ন “কেন ঘটল?” এর পরিবর্তে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে “কীভাবে দেখলে বেশি ভাইরাল হবে?”

এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মানুষের চিন্তার গঠনে। তথ্য এখন এত বেশি ও এত দ্রুত প্রবাহিত হয় যে মানুষ ক্রমশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি “information overload”—অর্থাৎ, এত বেশি তথ্যের স্রোত যে, কোনটি সত্য, কোনটি প্রাসঙ্গিক, আর কোনটি গুজব—তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে গেছে। মিডিয়া নির্ভরতার ফলে নিজের অভিজ্ঞতা, প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ কিংবা বিবেক ব্যবহারের মাধ্যমে ঘটনা যাচাইয়ের প্রবণতা হারাচ্ছে।

মিডিয়ার এই বিবর্তনের ফলে “তথ্য” আজ একধরনের ভোগ্যপণ্যে পরিণত হয়েছে—যা যত দ্রুত পাওয়া যায়, তত আকর্ষণীয়। মানুষ এখন আর তথ্যের গভীরতা চায় না; চায় চমক, গতি, নাটকীয়তা। আর এই চাহিদার জবাবেই গড়ে উঠেছে “ক্লিকবেইট সংস্কৃতি”—যেখানে খবরের মান নয়, ভিউ ও লাইক-সংখ্যাই হয়ে উঠেছে সাফল্যের মাপকাঠি।

এর ফলে বাঙালি সমাজ এখন একধরনের media-mediated reality তে বসবাস করছে, যেখানে বাস্তব সত্য নয়, বরং যা বেশি প্রচারিত সেটিই সত্য বলে বিবেচিত হয় । এবং যেভাবে সংবাদ দেখা বা শেয়ার করা হচ্ছে, তাতে সত্যের অনুসন্ধান নয়—আবেগের প্রতিক্রিয়া প্রাধান্য পাচ্ছে। একটি দুর্ঘটনা ঘটলে অনেকে সাহায্যের চেয়ে আগে খবরটি শেয়ার করেন; কোনো রাজনৈতিক বিতর্কে অংশগ্রহণের আগে তথ্য যাচাইয়ের চেয়ে পক্ষ নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এই মানসিক প্রবণতাকে মনোবিজ্ঞানে বলা হচ্ছে  “instant emotional validation”—অর্থাৎ নিজের আবেগকে সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করে মানসিক স্বস্তি নেওয়া।

এই প্রবণতার পেছনে আছে একাধিক কারণ। প্রথমত, বর্তমান মিডিয়া শিল্প মূলত বিজ্ঞাপন নির্ভর। ফলে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি দর্শক বা পাঠক টানতে চায়, আর তাই তারা বেছে নেয় সহজ, উত্তেজনামূলক ও চটকদার বিষয়। টেলিভিশন সংবাদে রেটিং বাড়ানোর জন্য, কিংবা অনলাইন নিউজ পোর্টালে ক্লিক বাড়ানোর জন্য এমন শিরোনাম তৈরি করা হয় যা তাৎক্ষণিক মনোযোগ আকর্ষণ করবে, কিন্তু সবসময় তা তথ্যসমৃদ্ধ হবে না। দ্বিতীয়ত, সমাজের মানসিক চাপপূর্ণ জীবনে মানুষ বিনোদনকেই আশ্রয় হিসেবে নেয়। ফলে “গুরুত্বপূর্ণ খবর” প্রায়ই চাপসৃষ্টিকারী হিসেবে গণ্য হয়, আর “হালকা খবর” বা গসিপ দেখা হয় মানসিক প্রশান্তির উৎস হিসেবে। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে সাজানো, যাতে ব্যবহারকারী বারবার সেই ধরনের কনটেন্টই দেখতে পান যা তাকে বেশি আকৃষ্ট করে।

অ্যালগরিদমের এই ক্ষমতা এমনভাবে কাজ করে যে, আপনি যত নির্দিষ্ট ধরনের কনটেন্ট দেখবেন, তত সেই ধরনের খবরই সামনে আসবে। ফলে একজন দর্শক ধীরে ধীরে একধরনের echo chamberএ বন্দি হয়ে যান।  এর ফলে তথ্যের বৃত্তটি আরও সংকুচিত হয়, এবং ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পরিবর্তে তুচ্ছ বিষয়েই মনোযোগী হয়ে পড়ে। এছাড়াও এতে মতামতের বহুমাত্রিকতা নষ্ট হয়, সমাজ বিভাজিত হয়।  

এই পরিবর্তনের মধ্যে আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিনোদনের নামে স্বস্তা কনটেন্টের উত্থান। টেলিভিশনের রিয়েলিটি শো, ইউটিউবের “প্র্যাংক ভিডিও”, কিংবা ফেসবুকের তথাকথিত ‘ফানি’ ক্লিপ—এসব এখন লাখো মানুষের দৈনন্দিন বিনোদনের উপাদান। অনেক সময় অশালীন, উস্কানিমূলক বা ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণকারী বিষয়ও “বিনোদন” হিসেবে প্রচারিত হচ্ছে।

একই সাথে দেখা যাচ্ছে বিনোদনের নামে তথ্য বিকৃতির প্রবণতা। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা বা রাষ্ট্রীয় নীতি-বিষয়ক বিশ্লেষণের পরিবর্তে খুব দ্রুত, চটপটে শিরোনাম ও শর্ট ভিডিও—যেমন তারকার বিবাহ, ঝগড়া, গসিপ, ট্রেন্ডিং চ্যালেঞ্জ কিংবা কোনো টকশো কিংবা সেমিনারের বিতর্কিত অংশ- এই ধরনের কন্টেন্ট দর্শকের সামনে সুস্বাদু (mouth-watering) হিসেবে প্যাকেজ করা হয়। “জানেন কি?”, “দেখুন কী হলো”, “অবিশ্বাস্য!”, “ক্লিক করুন” — এমন শব্দ দিয়ে শিরোনাম দেওয়া হয়, যা মানুষকে দ্রুত আর্কষিত করে।  

“ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা” আজকের বাংলাদেশি সমাজে নতুন এক মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। কেউ সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও আপলোড করছে সামান্য জনপ্রিয়তা পাওয়ার আশায়; কেউবা বিতর্কিত মন্তব্য করে আলোচনায় থাকতে চায়। এই ভাইরাল সংস্কৃতি একদিকে আত্মপ্রকাশের সুযোগ তৈরি করলেও, অন্যদিকে তা জন্ম দিয়েছে এক “তাৎক্ষণিক স্বীকৃতির মানসিকতা”—যেখানে ‘লাইক’ ও ‘শেয়ার’ই হয়ে উঠেছে আত্মমূল্যায়নের মাপকাঠি। ফলে ব্যক্তি ও সমাজ ধীরে ধীরে এক ধরনের ভার্চুয়াল কৃত্রিমতায় বন্দি হয়ে পড়ছে। বুদ্ধিবৃত্তির চেয়ে বেশি আকর্ষিত হচ্ছে এসকল স্বস্তা বিনোদনের প্রতি।  এসব কনটেন্ট যত বেশি ‘ভিউ’ পায়, ততই সেগুলোর উৎপাদন বাড়ছে—আর ধীরে ধীরে সমাজের নান্দনিক বোধ ও রুচি পিছিয়ে পড়ছে। এর প্রভাব শুধু বিনোদনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের সহানুভূতি, ধৈর্য ও বিশ্লেষণক্ষমতাকেও ক্ষয় করছে।

এই রুচির অবক্ষয়ের ফলে সমাজে নীরব এক মানসিক সংকট তৈরি হচ্ছে। মানুষ এখন দ্রুত উত্তেজিত হয়, দ্রুত হতাশ হয়, দ্রুত বিরক্ত হয়। স্ক্রল সংস্কৃতিতে বন্দি তরুণ প্রজন্মের এটেনশন স্প্যান এতই কম হয়ে গিয়েছে যে বই পড়া, বিশ্লেষণমূলক চিন্তা করা বা দীর্ঘ আলোচনা শোনা—এসব ধৈর্যের কাজের প্রতি আগ্রহ ক্রমেই কমছে। ফলে, প্রচলিত মিডিয়া—বিশেষ করে টেলিভিশন, প্রিন্ট পত্রিকা ও বই—এর প্রাসঙ্গিকতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। টিভির খবরের আগে মানুষ ফেসবুক বা ইউটিউব শর্টেই দেখে নিচ্ছে “ব্রেকিং নিউজ”; বই পড়ার পরিবর্তে দেখা যাচ্ছে বুক সামারি ভিডিও। এক অর্থে, দ্রুততার এই প্রতিযোগিতায় গভীরতা হারাচ্ছে। সমাজে একধরনের “তাৎক্ষণিক উত্তেজনা সংস্কৃতি” (instant gratification culture) গড়ে উঠেছে—শুধু তাদের মনোযোগ নষ্ট করছে না, বরং চিন্তার গভীরতাকেও ক্ষয় করছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন বা মূল্যবোধের জায়গায় ক্রমশই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

তবে মিডিয়ার প্রভাব শুধু তথ্য প্রবাহেই সীমিত নয়; এটি মানুষের মানসিক অবস্থার ওপরও গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএসএমএমইউ–এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিব্যবহার তরুণদের মধ্যে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও আত্মসম্মানহীনতা বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে “ফোমো” বা “Fear of Missing Out”—যেখানে মানুষ মনে করে, যদি সব খবর বা আপডেট না জানে তবে সে পিছিয়ে পড়বে। এই মানসিক চাপ মানুষকে ক্রমাগত স্ক্রল করতে বাধ্য করছে, ফলে তথ্য গ্রহণের চেয়ে তথ্যের আসক্তি তৈরি হচ্ছে।

এই ডিজিটাল আসক্তির ফলেই টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়া তাদের পুরনো প্রভাব হারাচ্ছে। এক সময়ের জনপ্রিয় সংবাদপত্র ও বইয়ের জায়গা দখল করছে মোবাইল স্ক্রিন। তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১২ কোটি, যার ৯৫ শতাংশই মোবাইল ব্যবহারকারী। অর্থাৎ, অধিকাংশ মানুষ এখন তথ্য সংগ্রহ করছে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা অনলাইন নিউজ পোর্টাল থেকে। এই প্রেক্ষাপটে টেলিভিশন ও সংবাদপত্র অনেকাংশে তাদের “প্রাথমিক মাধ্যম” হিসেবে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে, যদিও তারা এখনও গভীর বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও বিশদ বিশ্লেষণে নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছে।

তবু এর মধ্যে একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এর স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন, যা মূলত সামাজিক ন্যায্যতা ও সরকারি নিয়োগ কোটা ইস্যুতে গড়ে উঠেছিল, তার প্রাথমিক সংগঠন এবং প্রচার পুরোপুরি নির্ভর করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর। আন্দোলনের বার্তা, স্লোগান, ভিডিও ও চিত্র ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা কয়েক দিনের মধ্যেই সারাদেশে জনসমর্থন তৈরি করে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, মিডিয়া এখন শুধু প্রতিবেদন তৈরির নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের চালিকা শক্তি হিসেবেও কাজ করছে।

মিডিয়া এখন জনগণকে আরও অংশগ্রহণমূলক করে তুলছে। আগে যেখানে সংবাদ প্রবাহ ছিল একমুখী—সম্পাদক থেকে পাঠকের দিকে—এখন সেখানে মানুষ নিজেই কনটেন্ট নির্মাতা। নাগরিক সাংবাদিকতা, ইউটিউব নিউজ, ব্লগ, পডকাস্ট—সব মিলিয়ে আজকের বাংলাদেশে প্রতিটি মানুষই সম্ভাব্য সংবাদদাতা।

ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ভ্লগ, ইনস্টাগ্রাম রিলস—সব মিলে সংবাদ পরিবেশনের গণতন্ত্র যেন নিজের অজান্তেই বিকেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে। একদিকে এটি ইতিবাচক—কারণ মানুষ এখন সহজে নিজের অভিজ্ঞতা ও সত্য তুলে ধরতে পারছে; কিন্তু সেই সঙ্গে প্রশ্নও উঠে—কে তথ্য যাচাই করবে, কে দায়বদ্ধ থাকবে, আর কে সত্য নির্ধারণ করবে?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অনলাইন স্পেসে ভুয়া খবর বা বিকৃত তথ্যের পরিমাণ বেড়েছে, বিশেষত রাজনৈতিক ঘটনাবলির সময়। “Rumor Scanner Bangladesh” নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ২০২৩–২৪ সালেই প্রায় চার হাজারের বেশি ভুয়া খবর শনাক্ত করেছে। এগুলোর একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে, যেখানে তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনও গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশের মিডিয়া আজ এক জটিল দ্বন্দ্বে দাঁড়িয়ে আছে—একদিকে অবাধ স্বাধীনতা ও প্রযুক্তির সুবিধা, অন্যদিকে তথ্য বিকৃতি ও সামাজিক বিভাজনের ঝুঁকি। বাস্তবতা হলো, মিডিয়া এখন আর শুধু কোনো তথ্যের বাহন নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক প্রকৌশল। মানুষের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণেও মিডিয়া প্রভাব বিস্তার করছে। কিন্তু এই প্রভাব যেন কেবল বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা, নৈতিক সাংবাদিকতা এবং জনগণের ডিজিটাল সাক্ষরতা।

অবশেষে বলা যায়, মিডিয়া এখন বাংলাদেশের সমাজে এক অনিবার্য বাস্তবতা। এটি মানুষের চিন্তায়, সংস্কৃতিতে, ভাষায় এবং অভ্যাসে গভীর ছাপ ফেলেছে। মিডিয়া যেমন জনগণকে জাগিয়ে তুলতে পারে, তেমনি তাদের বিভ্রান্তও করতে পারে। সেই কারণে আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি সচেতন সমাজ—যেখানে মিডিয়া হবে জ্ঞান ও ন্যায়ের সহায়ক, আর জনগণ হবে সচেতন গ্রাহক, যারা জানে কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, কোনটি নয়। তথ্যের এই অতল যুগে সেই সচেতনতাই হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মিডিয়া সংস্কৃতির প্রকৃত ভিত্তি।

sources:

A cognitive behaviour data analysis on the use of social media in global south context focusing on Bangladesh by Shashwata Sourav Roy Samya, MD. Shaleh Islam Tonmoy & MD. Forhad Rabbi

Manufacturing Legitimacy: Media Ownership and the Framing of the July 2024 Uprising in Bangladesh by Zahedur Rahman Arman, Md Mahbbat Ali ,Jamal Uddin ,Didarul Islam Manik ,Umar Hyder and Tariquil Islam

Associations between social media addiction, social media fatigue, fear of missing out, and sleep quality among university students in Bangladesh: a cross-sectional study by Moinur Rahman, Md. Fajla Rabby, Md. Rayhan Kabir, Rezwana Anjum,

A Study on Media Influence on Public Policy in Bangladesh: Investment Climate Perspective BY MRDI

Impact of Mass Media in Creating Political Concern in Bangladesh Mortuza Ahmmed, International University of Business, Agriculture and Technology, Bangladesh

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *