বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের সমাজকে আজ যে প্রশ্নগুলো সবচেয়ে বেশি তাড়িয়ে বেড়ায়—জীবনমানে এত পতন কেন? অর্থনীতি বারবার ধসে পড়ে কেন? কেন প্রতিবছর লাখ লাখ সার্টিফিকেটধারী তরুণ বের হয়েও অর্থনীতির চিত্র বদলায় না? কেন কর্মহীনতার ভয়াবহ সুনামি? কেন জ্ঞানের স্বাদ না পেয়ে তরুণেরা বিদেশমুখী?—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের হাঁটতে হয় শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর ইতিহাসের দিকে।
এই অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা শুধু দুর্বল নয়—এটি মূলত উপনিবেশিক নির্মাণ, এবং সেই নির্মাণের কেন্দ্রে রয়েছে একটি দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল। যে কৌশলের উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞানকে খণ্ডিত করা, মানুষকে দক্ষতার দিক থেকে অক্ষম করে রাখা, এবং সামগ্রিক চিন্তার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে “একাডেমিক দাসত্ব” প্রতিষ্ঠা করা।
১. সার্টিফিকেটের স্রোত, কর্মসংস্থানের মরুভূমি
আমাদের সমাজে শিক্ষার চিত্রটা যেন এক বিশাল বৈপরীত্যের খেলা। প্রতি বছর অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি কলেজ ও ইনস্টিটিউট মিলিয়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থী বের হয়—তাদের হাতে সার্টিফিকেট থাকে, কিছু ক্ষেত্রে একাধিক সার্টিফিকেট থাকে—কিন্তু এই সার্টিফিকেট যেন নিয়তির এক অদৃশ্য দরজা খুলতে পারছে না। চাকরি নেই, কাজ নেই, দক্ষতার বাজার নেই, উৎপাদনের সুযোগ নেই।
এখানে মূল সমস্যাটা ব্যক্তির নয়, বরং সেই শিক্ষাব্যবস্থার, যা ব্যক্তিকে দক্ষ মানুষ নয়—প্যাকেজড পণ্য হিসেবে তৈরি করছে।
শিক্ষার্থী চার বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, আরো দুই বছর মাস্টার্স করে, কোচিং করে, সার্ভিস কোর্স করে—কিন্তু জানে না কীভাবে একটি ব্যবসা শুরু করতে হয়, কীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়, কীভাবে গবেষণা করতে হয়, এমনকি নিজের বিষয়টিকেই বাস্তবে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। জ্ঞান থাকে বইয়ের পাতায়, আর দক্ষতা মরে যায় বাস্তবতার জঙ্গলে।
ফলাফল?
শিক্ষার্থীরা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করে।
এ অঞ্চলটাকেই তখন মনে হয় কর্মসংস্থানের মরুভূমি।
বিদেশে চাকরির খোঁজ, অভিবাসনের আকাঙ্ক্ষা, “এ দেশে ভবিষ্যৎ নেই”—এই কথাগুলো যেন নিয়মিত প্রার্থনার মতো ব্যবহৃত হয়।
এ সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি কাঠামোগত জ্ঞান সঙ্কট।
একটি শিক্ষা ব্যবস্থা যখন নিজ দেশের সমস্যার বদলে অন্য অঞ্চলের সমস্যার সমাধান শেখায়, তখন সেই শিক্ষার্থী নিজের সমাজে মূল্য তৈরি করতে পারে না—সে পারে অন্যদেশে গিয়ে কাজ করতে।
সার্টিফিকেট থাকা সত্ত্বেও দক্ষতা না থাকা তাই কোনো রহস্য নয়—এ হলো উপনিবেশিক শিক্ষার নকশার সরাসরি ফলাফল।
দিন শেষে তরুণেরা মনে করে, শিক্ষা যেন একটি বড় “স্ক্যাম”—জীবনের সাথে সম্পর্কহীন, চাকরির সাথে সম্পর্কহীন, দক্ষতার সাথে সম্পর্কহীন।
২. ব্রিটিশ একাডেমিক সিস্টেম: জ্ঞানের বিভাজন, বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা এবং উপনিবেশিক কৌশল
এ অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার শিকড় খুঁড়তে গেলে আমরা পৌঁছে যাই ব্রিটিশ উপনিবেশিক যুগে—যেখানে শিক্ষা ছিল রাজনৈতিক উপকরণ, চিন্তাকে খণ্ডিত করার অস্ত্র।
ইউরোপ জানতো—
যে জাতি নিজের জ্ঞানচর্চা নিজের মতো করে করতে পারে, সে জাতি কখনো দাস হয়ে থাকতে চায় না।
এই সত্য খুব প্রাচীন, এবং প্রতিটি সাম্রাজ্যই এ সত্য জানে।
তাই ব্রিটিশরা এই অঞ্চলে যে শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করলো, তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরির জন্য ছিল না—বরং প্রশাসনিক দাস তৈরি করার জন্য।
এমন দাস, যে নিজেকে “শিক্ষিত” মনে করবে, কিন্তু চিন্তার গভীরে সে আসলে নির্ভরশীল ও অক্ষম।
এই শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল জ্ঞানকে ভেঙে ফেলা।
আগে ইসলামী সভ্যতা ছিল সমন্বিত জ্ঞানের প্রতীক—
ফিকহ, দর্শন, ক্যালকুলাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, আকিদা, সাহিত্য—সব এক ধারে পড়তো একজন মানুষ; সে ছিল পূর্ণমানব, holistic human.
কিন্তু ব্রিটিশরা এটি ভেঙে দিল কয়েকটি খণ্ডে:
— বিজ্ঞান আলাদা
— কলা আলাদা
— ধর্ম আলাদা
— প্রকৌশলীর সাথে সমাজবিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই
— জীববিজ্ঞানীর সাথে দর্শনের কোনো সম্পর্ক নেই
— আইনজীবীর সাথে ইতিহাসের কোনো মিল নেই
—অর্থনীতিবিদের সাথে আখলাকের কোনো যোগাযোগ নেই
এই বিচ্ছিন্ন জ্ঞানব্যবস্থা মানুষের মানসিক জগতেও বিভাজন তৈরি করে।
মানুষ জানে অনেক কিছু—কিন্তু কিছুই পুরোপুরি জানে না।
সে জানে তার বিষয়ের কয়েকটি তত্ত্ব—কিন্তু জানে না জীবনের তত্ত্ব।
ব্রিটিশরা জানতো, পূর্ণাঙ্গ মানুষ মানেই বিপ্লবী মানুষ।
অর্ধেক মানুষ মানেই অনুগত মানুষ।
শুধু তাই নয়—
প্রেস আবিষ্কারের পর তারা একটি আরো সূক্ষ্ম কৌশল চালু করলো:
জ্ঞান অর্জন মানে বই পড়া।
বই হলো সর্বশেষ সত্য।
উস্তাদ বা শিক্ষককে সরিয়ে জ্ঞানকে ডেড ম্যাটারে পরিণত করা হলো। ফলে মানুষ মুখস্থ করলো মৃত জ্ঞান—যার বাস্তবতার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।
এই পুরো পরিকল্পনা ছিল এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সামাজিক ইঞ্জিনিয়ারিং—যার উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে দমন করা নয়—বরং জনগণ যেন নিজেরা নিজেদের দমন করে।
এ কারণে আজও আমাদের শিক্ষব্যবস্থা পশ্চিমা জ্ঞান ব্যবহার করে, পশ্চিমা তত্ত্ব মুখস্থ করায়, পশ্চিমা পরিভাষাকে সত্যের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে।
ফলে আমরা নিজেদের সমাজকে বুঝতে চেষ্টা করি অন্য একটি সভ্যতার চোখ দিয়ে—এবং সেটাই সৃষ্টি করে জ্ঞানগত অক্ষমতা।
৩. জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) ও তত্ত্ববিদ্যা (Ontology): কে ঠিক করে আমরা কী জানবো?
এ প্রশ্নটাই আসলে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার কেন্দ্রবিন্দু।
একজন মানুষ কী জানবে, কী শেখাকে “জ্ঞান” বলে বিবেচনা করা হবে, কোন বিষয়কে মূল্যবান মনে করা হবে—এসবই নির্ধারণ করে তার চিন্তার কাঠামো, দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরবর্তীতে তার সমাজের পরিণতি।
পশ্চিমা একাডেমিক ব্যবস্থা যেভাবে পুরো পৃথিবীর উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে, তার মূল কারণ যুদ্ধ বা অর্থনীতি নয়—বরং জ্ঞানতাত্ত্বিক কর্তৃত্ব (epistemic authority)।
যখন কোনো সভ্যতা ঠিক করে দেয় কোনটি “বিজ্ঞান”, কোনটি “দর্শন”, কোনটি “সত্য”, কোন বিষয়কে “বৈজ্ঞানিক” বলে গণ্য করা হবে, তখন সেই সভ্যতা ধীরে ধীরে বাকিদের চিন্তার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
আমরা আজ যে পদার্থবিজ্ঞান পড়ি, যে সমাজবিজ্ঞান পড়ি, যে অর্থনীতি পড়ি—তা মূলত ইউরোপীয় সমস্যার উত্তর খুঁজতে তৈরি তত্ত্ব।
তাদের সমাজে শিল্পবিপ্লব হয়েছিল—তাই শ্রমবাজার তত্ত্ব তৈরি হলো।
তাদের মধ্যে চার্চ-রাষ্ট্র দ্বন্দ্ব ছিল—তাই ধর্ম ও বিজ্ঞানের বিচ্ছেদ তৈরি হলো।
তাদের রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস ভিন্ন—তাই নাগরিকত্ব, গণতন্ত্র, রেনেসাঁ—সবই তাদের অভিজ্ঞতার ফল।
কিন্তু আমরা এসব মুখস্থ করি যেন সেটাই আমাদের ইতিহাস। আমরা যে জ্ঞান শিখি, তা অন্যদের সমস্যার সমাধান করে। আমাদের অর্থনীতি, সমাজ, জলবায়ু, প্রযুক্তি, কৃষি, শিল্প—সবকিছুই আলাদা।
কিন্তু আমরা যে তত্ত্ব শিখি তা হলো:
— ব্রিটিশ শিল্পবিপ্লবের অর্থনীতি
— ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক তত্ত্ব
— জার্মান দার্শনিকদের যুক্তিতর্ক
— আমেরিকান ব্যবসায়িক মডেল
— ইউরোপীয় সমাজবিজ্ঞানের ধারণা
এগুলো তাদের সমাজের ইতিহাস, তাদের অভিজ্ঞতা, তাদের সংকট সমাধানের জন্য তৈরি।
কিন্তু আমরা সেগুলো মুখস্থ করে নিজেদের সমস্যার ওপর বসাতে চাই।
এটা ঠিক যেন অন্যের প্রেসক্রিপশন দিয়ে নিজের রোগ সারাতে চাওয়া।
ফলাফল?
চাকরি বাজারে অপ্রয়োজনীয় দক্ষতা, সমাজে অকার্যকর জ্ঞান।
আমরা নিজেদের সমস্যা নিজেদের দৃষ্টিতে দেখি না।
দীর্ঘদিন পর বুঝতে পারি—আমরা অন্য কারও জন্য তৈরি তত্ত্ব দিয়ে নিজের সমাজ মূল্যায়ন করছি, যা স্বভাবতই ব্যর্থ হতে বাধ্য।
এখানেই তত্ত্ববিদ্যা (ontology) প্রবেশ করে।
এই শাখা জিজ্ঞেস করে:
“মানুষ কাকে জ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি দেবে? কোন বিষয়টিকে পৃথিবীর মৌলিক বাস্তবতা হিসেবে দেখবে?”
ইসলামী সভ্যতা এখানে দৃঢ় অবস্থান রাখে—
জ্ঞান শুধু বস্তুগত সত্য নয়; নৈতিক, আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও সৃষ্টিকর্তাকেন্দ্রিক সত্যও জ্ঞানের অংশ। সুতরাং এখানে আল্লাহর অস্তিত্ব, কিয়ামতের ধারণা, আখলাক—এসবও বাস্তবতার অংশ।
কিন্তু পাশ্চাত্য বলল—
“যা পরীক্ষাগারে ধরা যায় না, তা সত্য নয়।” এর ফলে ধর্মীয় জ্ঞান, আধ্যাত্মিক জ্ঞান, আখলাক—সবকিছুকে সরিয়ে দেওয়া হলো এবং এক নতুন ধরনের “জ্ঞান একনায়কতন্ত্র” প্রতিষ্ঠিত হলো।
আমাদেরকে শেখানো হলো—
“ইউরোপীয় জ্ঞানই সত্য।”
“তাদের ইতিহাসই মানবতার ইতিহাস।”
“তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই আধুনিকতার দৃষ্টিভঙ্গি।”
পাশ্চাত্য আজও চায় না মুসলিম সমাজ নিজেদের দর্শন, জ্ঞানতত্ত্ব ও চিন্তার কাঠামো তৈরি করুক।
কারণ যেদিন মুসলিমরা নিজেদের epistemology ও ontology ফিরে পাবে—সেদিনই উপনিবেশের শেষ ধাপ—মস্তিষ্কের উপনিবেশ—ভেঙে যাবে।
৪. রেনেসাঁর পুনর্গল্প: ইউরোপের উত্থান
যখন ইউরোপ রেনেসাঁর গল্প বলে, তারা নিজেদেরকে হঠাৎ করে আলোকিত হয়ে ওঠা, স্বাধীনভাবে চিন্তা আবিষ্কার করা, বিজ্ঞানের জন্ম দেওয়া এক সভ্যতা হিসেবে তুলে ধরে।
কিন্তু ইতিহাস—বিশেষত মুসলিম ইতিহাস—এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
রেনেসাঁর আগে ইউরোপ ছিল গভীর অজ্ঞতার অন্ধকারে।
তাদের মেডিসিন, গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা—সবই ছিল বিশৃঙ্খল ও অপরিণত। যে সময়ে ইউরোপ অন্ধকারে, সেই সময়ে বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো, কর্ডোভা ছিল বিশ্বজ্ঞানচর্চার রাজধানী।
আরবি ছিল বিশ্বের “লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা”—যেভাবে আজ ইংরেজি।
ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, ইবনে হাইথাম, ইমাম গাজ্জালী, আল-জাওহারি—এরা শুধু মুসলিম দার্শনিক নন; বিশ্বসভ্যতার স্থপতি।
ইউরোপ রেনেসাঁ শুরুই করেছিল দুটি বিশাল দরজা খুলে—
প্রথম দরজা: ইসলামী অনুবাদ আন্দোলন থেকে জ্ঞান আহরণ। ক্রুসেডাররা ও পরবর্তীতে স্পেনের খ্রিস্টান শক্তি মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল দখল করার পর দেখে—এখানে বিশাল গ্রন্থাগার, গবেষণা কেন্দ্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান কেন্দ্র, গণিত চর্চা—সবই বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত। তারা সেগুলো লুট করে, অনুবাদ করে, নিজেদের নামে চালায়।
যে গ্রিক গ্রন্থগুলি আজ আমরা “বহুল প্রচারিত ক্লাসিক” হিসেবে জানি, তাদের অধিকাংশই সংরক্ষিত ছিল মুসলিম আলেমদের হাত ধরে। ইউরোপ সেটাই নিজের সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলো।
দ্বিতীয় দরজা: রাষ্ট্র পরিচালনা ও সামরিক কৌশল, মুসলিমদের কাছ থেকে নেওয়া উসমানী সালতানাত ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সংগঠিত ও শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। তাদের সেনাদল, প্রশাসন, আদালত, বাণিজ্যব্যবস্থা—এসবই সুন্নাহ ও মুসলিম ইতিহাসের ওপর দাঁড়ানো। ইউরোপ এই ব্যবস্থাকে অধ্যয়ন করল, নকল করল ও আধুনিকীকরণের নামে নিজেদের সংস্করণ তৈরি করল।
এরপর তারা রেনেসাঁর নামে একটি নতুন গল্প বানালো—
“মানুষই সব।”
“স্রষ্টার কোনো ভূমিকা নেই।”
“বস্তুই সত্য।”
এই দর্শন মুসলিম সভ্যতার প্রতিপাদ্য ছিল না—তাই এটি ছিল মূলত ইসলামী সত্য-দর্শনকে পরোক্ষভাবে আক্রমণ।
ইউরোপ ধর্মকে সরিয়ে ফেলেনি; বরং রোমানদের মতো ব্যবসায়িক স্বার্থে ধরে রেখেছে। কিন্তু ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানের ধারাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছে—যাতে মুসলিমরা নিজেদেরই জ্ঞানকে ভুলে যায়।
যখন উসমানী সালতানাত দুর্বল হলো, তখন ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডাচ কোম্পানি—অর্থনৈতিক উপনিবেশকে রাজনৈতিক উপনিবেশে রূপ দিল। এবং এখানেই আধুনিক দক্ষিণ এশীয় শিক্ষাব্যবস্থার জন্ম–একটি ব্যবস্থা, যা তৈরি হয়েছিল আমাদের উন্নতির জন্য নয়—
বরং উপনিবেশের চাকা সচল রাখার জন্য।
৫. ইসলামী জ্ঞানব্যবস্থা: সমন্বিত, পূর্ণাঙ্গ ও প্রাণবন্ত সভ্যতার মেরুদণ্ড
ইসলামী সভ্যতাকে বুঝতে গেলে আমাদের প্রথমেই বুঝতে হবে—ইসলামে জ্ঞান কোনো সময়ই “খণ্ডিত” ছিল না। জ্ঞান ছিল সামগ্রিক, প্রাণবন্ত, বাস্তবমুখী এবং আধ্যাত্মিকতার সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত।
যে সভ্যতা ওহীকে কেন্দ্র করে দাঁড়ায়, সেখানে জ্ঞান কখনোই নিছক “তথ্য” হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে মানবিকতা, উদ্দেশ্য, নৈতিকতা, বিজ্ঞান—সবকিছুর সমন্বয়।
ইসলামে জ্ঞান দুই ধরণের:
১. نافع علم — উপকারী জ্ঞান
২. غير نافع علم — অপকারী জ্ঞান
এই শ্রেণিবিভাগ কোনো সেকেলে ধারণা নয়; বরং জ্ঞানের উদ্দেশ্যই হলো—মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
অপরদিকে আধুনিক পশ্চিমা জ্ঞানের উদ্দেশ্য—
মুনাফা, উৎপাদন, অর্থনীতি, সামরিক শক্তি এবং ভৌত ক্ষমতার বিস্তার।
এখানে জ্ঞান আখলাক ছাড়াই চলতে পারে।
সামরিক প্রযুক্তি যত প্রাণ নিক, বিজ্ঞানের আপত্তি নেই।
কিন্তু ইসলামী সভ্যতা বলেছিল—
“জ্ঞান যদি মানবতার বিপরীত হয়, তবে সে জ্ঞান জ্ঞান নয়।”
ইসলামী জ্ঞানব্যবস্থা ছিল “Holistic”—সমগ্রবাদী।
একজন মুসলিম আলেম কিংবা চিন্তাবিদ শুধু তার নিজের বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকতেন না। তাদের ছিল বহু ক্ষেত্রের দক্ষতা।
— ইবনে সিনা একইসাথে চিকিৎসক, দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ
— ইবনে রুশদ একইসাথে ন্যায়শাস্ত্রবিদ, দার্শনিক, ফকিহ
— ইবনে হাইথাম একইসাথে অপটিক্সের জনক, গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী
— ইমাম গাজ্জালী একই সময়ে দর্শন, ফিকহ, আকিদা, নৈতিকতা—সবকিছুর সংযোগকারী
— আল-জাবির রসায়নবিদ, কিন্তু একইসাথে দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ
— আল-খাওয়ারিজমি গণিতবিদ, ভূগোলবিদ, জ্যোতির্বিদ—যার নামে “অ্যালগরিদম”
এটাই ছিল ইসলামী সভ্যতার শক্তি। যে সভ্যতা এত সমন্বিত ছিল—তারা শক্তিশালী ছিল শুধু রাজনীতিতে নয়, বরং জ্ঞানব্যবস্থায়। আর যে সভ্যতা সমন্বিত জ্ঞান হারায়, সে সভ্যতা ভেঙে পড়ে।
আরবি ছিল জ্ঞানের ভাষা (Lingua Franca)
রেনেসাঁর আগ পর্যন্ত পৃথিবীর বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, মেডিসিনের ভাষা ছিল আরবি। ইউরোপীয়রা গ্রিক দার্শনিকদের অনেক লেখাই জানতো না—কারণ সেগুলোর মূল কপি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মুসলিম পণ্ডিতরা সেগুলো অনুবাদ করে, সংরক্ষণ করে, ব্যাখ্যা করে একটি নতুন দুনিয়া গড়ে তুলেছিল।
ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় বিভাজন ছিল না
— বিজ্ঞান ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না
— ধর্ম সমাজবিজ্ঞান থেকে আলাদা ছিল না
— দর্শন আত্মিকতা থেকে আলাদা ছিল না
— আখলাক আইন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না
— মানববিদ্যা গণিত থেকে অনাত্মীয় ছিল না
জ্ঞান ছিল এক নদী—শাখা-প্রশাখা ছিল অনেক, কিন্তু উৎস ছিল এক। ফলে একজন মানুষ তৈরি হতো মানবিকতা, নৈতিকতা, যুক্তিবোধ, কল্পনাশক্তি, এবং বাস্তব দক্ষতার সমন্বয়ে। এই ব্যবস্থার আলো নিভে গেলে শুরু হলো আমাদের পতন।
৬. উপনিবেশিক কোম্পানি সভ্যতার উত্থান ও শিক্ষায় সিস্টেমিক পরিবর্তনের সূচনা
মুসলিম সভ্যতা যখন সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিল—ইউরোপ তখন একটি নতুন শক্তি তৈরি করছিল: ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি—নাম ব্যবসা, কাজ ছিল রাষ্ট্র পরিচালনা।
এই কোম্পানিগুলো সেনাবাহিনী চালাত, কর নিত, যুদ্ধ করত, কূটনীতি করত।
এদের লক্ষ্য ছিল দুইটি:
১. সম্পদ আহরণ
২. জনগণকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে রাখা
এই নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল—শিক্ষা।
উসমানী খিলাফতের পতন: মুসলিম দুনিয়ার একাডেমিক শূন্যতা
যখন উসমানী খিলাফত দুর্বল হতে থাকে, তখন মুসলিম দুনিয়ায় শিক্ষার কেন্দ্রগুলো গ্রাস করে—
— অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
— সাম্রাজ্যিক দুর্বলতা
— ইউরোপীয় সামরিক আধিপত্য
— এবং “মর্ডানাইজেশন” নামে পশ্চিমা সংস্কৃতি অনুকরণের প্রবণতা।
ফলে ইসলামী জ্ঞানব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ভেঙে গেল।
এ অঞ্চলের শিক্ষাকে তারা পরিণত করল:
— মুখস্থ
— পরীক্ষাভিত্তিক সাফল্য
— দক্ষতাহীন সার্টিফিকেট
— বিচ্ছিন্ন জ্ঞান
— বাস্তবতাবিমুখ বিজ্ঞান
এই শিক্ষা জীবনের জন্য নয়—বরং অফিসিয়াল কর্মচারী তৈরি করার জন্য।
তাদের প্রয়োজন ছিল এমন মানুষ—
— যারা নিজেরা চিন্তা করবে না
— যারা নিজের ঐতিহ্য ভুলে যাবে
— যারা শাসকদের ভাষায় চিন্তা করবে
— যারা নিজেদের সমস্যার বদলে ব্রিটিশ সমস্যার সমাধান শিখবে
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যারা নিজেদেরকে “অপূর্ণ” মনে করবে।
এমন মানুষই সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
ফলে মুসলিম বিশ্বের শিক্ষায় প্রবেশ করল একটি ধূসর মেঘ—
যেখানে জ্ঞান ছিল, কিন্তু আলো ছিল না;
চিন্তা ছিল, কিন্তু দিকনির্দেশনা ছিল না;
সার্টিফিকেট ছিল, কিন্তু সমাজে তার প্রয়োগ ছিল না।
ফলে:
— সমন্বিত জ্ঞান হারাল
— গবেষণা থেমে গেল
— দর্শন অচল হলো
— উস্তাদ-শিক্ষার্থী সম্পর্ক ভেঙে পড়ল
এবং সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো মুসলিমরা নিজেদের জ্ঞানকে সন্দেহ করতে শুরু করল। এই ক্ষতিই আজও আমাদের বহন করতে হচ্ছে।
আমরা যদি সত্যিই মুক্ত হতে চাই—
রাজনৈতিক স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও যথেষ্ট নয়।
সবচেয়ে জরুরি হলো—বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা।
কারণ যে জাতি অন্যের চিন্তায় চিন্তা করে, সে জাতি কখনোই নিজের ভাগ্য লিখতে পারে না। তাই আমাদের সামনে তিনটি মহান দায়িত্ব।
হাকীকতের সন্ধানে ফিরে যাওয়া–
ইসলাম শিক্ষা দিয়েছে, “জ্ঞান এমন হতে হবে যা মানুষ ও সমাজের উপকারে আসে।”
যে জাতি হাকীকত অন্বেষণ করে—সেই জাতির ওপর অন্য কারও প্রভাব স্থায়ী হতে পারে না।
