উপমহাদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশ

পৃথিবীর যে কোন অংশে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা চালানো প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা থেকে শুরু করে সমষ্টিগতভাবে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তির পক্ষে এক বিশেষ দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে ইসলামে বিবেচিত হয়েছে। মহানবী (স.) বিদায় হজ্বে বলেছেন: “হে আমার উম্মতগণ, যারা এখানে সমবেত হয়েছ, তারা অনুপস্থিত মুসলমানদের কাছে আমার উপদেশ পৌঁছে দেবে; যারা অনুপস্থিত তাদেরকে আমার উপদেশের কথা বলবে।” মহানবী (স.)-এর এই নির্দেশ সাহাবা কিরাম থেকে শুরু করে পরবর্তী অনুসারীগণ পালন করার চেষ্টা করেছেন। মহানবী (স.)-এর ওফাতের পর ইসলাম প্রচার ও প্রসারের ধারা তাঁর নির্দেশিত পথে মুসলমানগণ অব্যাহত না রাখলে ইসলাম কেবলই আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তো এবং বিশ্বের দিক-দিগন্তে ইসলামের বিজয় কেতন উড়ত না।

দ্বীনে মুবিন ইসলাম ‘শিক্ষা’ ও ‘ধর্ম’—এই দু’টি অনিবার্য বিষয়ের মাঝে এমন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন স্থাপন করেছে, যা কখনো পৃথকসত্তায় বিভক্ত হতে পারে না। মহানবী (সা.)-এর যুগের ইতিহাসেও স্পষ্ট দেখা যায় তিনি শিক্ষাকে কতটুকু গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এর প্রসারে কত গভীরভাবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। ইসলামের স্হাপনালগ্ন থেকেই তিনি দীক্ষা-ধারার সুসংহত নিয়ম চালু করেন। সাফা পর্বতের নিকটবর্তী ‘দারুল আরকাম’ ছিল মুসলমানদের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র, আর এখানকার প্রথম শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)।

হিজরতের আড়াই বছরের কিছু আগে বদরের যুদ্ধে যখন মক্কার সত্তরজন মুশরিক বন্দী হলো এবং তারা মুক্তিপণের অর্থজোগাড়ে অক্ষম প্রমাণিত হলো—তখন নবী করীম (সা.) মানবতার এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাদের মুক্তিপণ হিসেবে মদীনার দশজন করে ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া শেখানোর বিধান দিলেন।

তৎকালীন ‘সুফ্ফা’ ছিল মসজিদে নববীর সংলগ্ন এক পবিত্র স্থান। এটিই তখন মাদ্রাসা, আবাসন ও ছাত্রাবাস—সব কিছুর সমন্বিত কেন্দ্র। দূরদূরান্ত থেকে আগত তালিবে-ইলম এবং স্থানীয় গরিব ছাত্ররা এখানে অবস্থান করে জ্ঞানার্জন করতেন। এখানে পবিত্র কুরআন, তাফসীর, ফিকহ ও দ্বীনি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা শিক্ষা দেওয়া হতো। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)-ই। সুফ্ফায় অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের খাদ্য-পানাহার, বাসস্থান এবং দেখাশোনার দায়িত্বও তিনি নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.), হযরত মু’আয ইবনে জাবাল (রা.), হযরত আবু জর গিফারি (রা.)—এমন অসংখ্য মনীষী এখানকার ছাত্র ছিলেন।

স্থানীয় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দূরবর্তী অঞ্চল থেকেও মানুষ এসে এখানে জ্ঞান লাভ করত এবং পরবর্তীতে নিজ নিজ আবাসভূমিতে ফিরে গিয়ে সেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিত। এভাবে সুফ্ফা ধীরে ধীরে ইসলামের কেন্দ্রীয় শিক্ষাপীঠে পরিণত হয়। প্রয়োজনবোধে এখানকার ছাত্রদেরকে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো যাতে তারা কুরআন, হাদীস এবং ধর্মীয় জ্ঞান মানুষের মাঝে প্রচার করতে পারে।

ইসলাম যখন মদীনাতুল মুনাওয়ারা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত হলো এবং ভিন্ন দেশের ও নগরীর মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আগমন করল, তখন তাদের জন্য সংগঠিত শিক্ষা-ব্যবস্থা তৈরি করার প্রয়োজন দেখা দিল। নবী (সা.)-এর নির্দেশে প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ এলাকায় থেকে সুন্নাহ ও হাদীসের জ্ঞান আহরণ করবে—এই নীতি গৃহীত হয়। এ কাজ দুইভাবে সম্পন্ন হতো:

(১) নবী (সা.)-এর পক্ষ থেকে শিক্ষাবিদদের বড় বড় কেন্দ্রে প্রেরণ করা হতো,

(২) অথবা প্রাদেশিক গভর্নরদেরকে নির্দেশ দেওয়া হতো যেন তারা স্থানীয়ভাবে শিক্ষার অনুকূল ব্যবস্থা করেন।

খোলাফায়ে রাশেদার যুগে জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনীয়তা ও মহিমা আরও বেড়ে যায়। তাঁদের সামনে ছিল নবী (সা.)-এর দৃষ্টান্তময় জীবনধারা এবং সেই অমর বাণী—“একটি আয়াত হলেও অন্যকে শিক্ষা দাও।” এই নির্দেশ মুসলমানদের দায়িত্ববোধকে অসীমভাবে বাড়িয়ে দেয়। মহানবী (সা.) ভয় প্রকাশ করেছিলেন—যদি তাঁর উম্মত শিক্ষা প্রচারের দায়িত্বে গাফেল হয়ে পড়ে, তবে পূর্ববর্তী কওমগুলোর মতো তারাও পথভ্রষ্ট ও শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। পবিত্র কুরআনে যেসব জাতির শাস্তির বিবরণ আছে, তা তাদের সতর্ক করার জন্যই যথেষ্ট বলে তিনি মনে করতেন।

মুসলমানরা যখন এই বাংলাদেশ–পাক–ভারত উপমহাদেশে আগমন শুরু করল, তখন এখানকার অধিবাসীরাও তাদের জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত রইল না। আরব ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত মুসলমানরা এদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল এবং মসজিদ-মাদ্রাসায় দ্বীনি শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশে ভূমিকা রাখল। লক্ষ্যণীয় বিষয়—তখনকার মুসলিম আলেমদের জন্য বিশাল অট্টালিকা, বিলাসী আসবাব কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ উপদেষ্টা পরিষদের প্রয়োজন ছিল না। মসজিদই ছিল তাদের মাদ্রাসা, আর খোলা জমিনই ছিল পাঠশালার চৌকি ও টেবিল। পরবর্তীকালে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে শহর-বন্দর-গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এসব আলেমরা মক্তব-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। পৃথিবীর এই অংশে প্রথম মাদ্রাসা কবে ও কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয় তা নির্ধারণ কঠিন। তবে ‘তারিখে ফিরিশতা’–র বর্ণনা অনুসারে ধারণা করা হয়, সুলতান নাসিরুদ্দীন কুবাচা মুলতানে প্রথম মাদ্রাসার ভবন নির্মাণ করেন, যেখানে হযরত শায়খ বাহাউদ্দীন জাকারিয়া (রহ.) (জ. ৫৭৭ হি.)-এর মতো মনীষীরা শিক্ষা লাভ করেন।

ইসলামের প্রথম দেড়শত বছর, অর্থাৎ প্রায় ১৪৫ হিজরি পর্যন্ত মুসলমানরা বই-রচনা শুরু করেননি। তখনকার শিক্ষা-পদ্ধতি ছিল আরবদের স্বাভাবিক সরল জীবনধারার প্রতিফলন—জ্ঞান মুখস্থ করা, আলোচনা, পর্যালোচনা এবং ‘সনদ’ ও ‘রিওয়ায়েত’-এর মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ। এক শতাব্দীর মধ্যেই মুসলিম সমাজে সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়; একইসঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাও সুশৃঙ্খলভাবে বিস্তৃত হয়। এ সময় জ্ঞানের প্রতিটি শাখা বিকশিত হয়ে উচ্চ শিখরে পৌঁছায়। উসূল, মাকাসিদ প্রভৃতি নতুন শাস্ত্র উদ্ভাবিত হয়; পাশাপাশি ফিকহ, অভিধান, তাফসীর, আখলাক, ইতিহাস, মিরাস বণ্টন—এসবও পূর্ণতা লাভ করে।

জ্ঞানচর্চার এই প্রসারের সাথে সাথে বিজ্ঞানক্ষেত্রেও সূচনা ঘটে নানাধরনের বিপ্লবাত্মক আবিষ্কারের। দর্শন, কালাম ও মানতিক বিজ্ঞানে শক্ত ভিত্তি রচিত হয়। অভ্যন্তরীণ নানা গোলযোগ সত্ত্বেও পরবর্তী যুগগুলোতে শিক্ষাবিস্তারে এমন তুলনাহীন অবদান দেখা যায়, যা বিস্ময়কর ও হৃদয়গ্রাহী।

টাইগ্রিস হতে সিন্ধু পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্র বিস্তৃত হলো। আরবদের বিজয়যাত্রা কিছুটা থমকে এলো, এবং বিজিত অঞ্চলগুলিতে শাসন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কাজ চলল পুরোদমে। আরবের মরুভূমি থেকে মানুষ বিভিন্ন দেশে গিয়ে বসতি স্থাপন করল; বহুজাতি মানুষের মিলনে রাষ্ট্র আরও বৈচিত্র্যময় হলো। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় মুসলমানরা নতুনভাবে শিক্ষাব্যবস্থা গঠন করতে বাধ্য হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তৃত সম্ভার তখন ছিল আরবীভাষায়—

এর পরে দেখা যায়, জ্ঞানানুশীলন ও জ্ঞানের আদান-প্রদান আশ্চর্য রকম দ্রুতগতি লাভ করল। মার্ভ, হিরাত, নিশাপুর, বোখারা, পারস্য, বাগদাদ, মিসর, সিরিয়া এবং স্পেনের নগরীগুলো জ্ঞানের উজ্জ্বল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। সেসব বিদ্যালয় কার্যকারিতা ও ফলপ্রসূতায় আজকের বহু প্রতিষ্ঠানের চেয়েও উন্নত ছিল। মসজিদ, খানকাহ, এবং আলেমদের নিজ গৃহ—এসবই ছিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র। সে যুগের শিক্ষিতের হার সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য নেই, তবে তাবাকাত, জীবনীগ্রন্থ, রিজালশাস্ত্র ও অনুবাদগ্রন্থের পরিমাণ দেখে তা অনুমান করা যায়।

দুঃখের বিষয়—অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, স্পেনের ইনকুইজিশন এবং তাতারদের ধ্বংসলীলার ফলে মুসলমানদের জ্ঞানসম্পদের হাজার ভাগের একভাগও টিকে নেই। বহু গুণী ব্যক্তির নাম ইতিহাস থেকে মুছে গেছে। তবুও প্রতিটি যুগে হাজার হাজার পণ্ডিত ও মুজতাহিদের নাম আমরা জানতে পারি। শুধু সমকালীন বিখ্যাত পণ্ডিতদের তালিকা সংগ্রহ করলেই সে যুগের শিক্ষিতের হার সহজেই নির্ণীত হতে পারে।

ড. স্প্রেঙ্গারের অভিমত—আসমাউর রিজাল গ্রন্থগুলিতে প্রায় পাঁচ লক্ষ পণ্ডিতের নাম পাওয়া যায়। এদের পেছনে থাকা সাধারণ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যাও ছিল বিপুল—এ অনুমান করা কঠিন নয়।

তৎকালের শিক্ষাদান-পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায় যে, একজন উস্তাদের হালাকায় শত শত নয়, বরং হাজার হাজার তালিবে-ইলম জড়ো হতেন। আবূ তাকি (মৃ. ২৫১ হিজরি) তাঁর তাবাকাতে উল্লেখ করেন—

“কোনো কোনো হালকায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য দশ হাজারের বেশি দোয়াত সঞ্চিত থাকত। ছাত্ররা সেখানে বসে হাদীস লিপিবদ্ধ করত। সেই সময় দুই শতাধিক আলেম ‘ইমাম’ উপাধিতে ভূষিত ছিলেন—যারা ইজতিহাদ ও ফতোয়া প্রদানে পূর্ণ সক্ষমতা রাখতেন।”

খতীব বাগদাদী বর্ণনা করেছেন—তিনি আল্লামা আবু হামিদ ইসফারাইনীর হালকায় অংশ নিতেন; সেখানে সাত শত শিক্ষার্থী উপস্থিত হতো। কিতাবুল মায়ানীর পাঠ চলাকালে আশেপাশে শুধু কার্যীর সংখ্যাই ছিল আশিজন। আর রশীউদ্দীন নিশাপুরীর হালকার উপস্থিতদের মধ্যে চার শত ছিলেন উত্তীর্ণ পণ্ডিত।

বসরার জামে মসজিদে ইমাম বুখারীর হালকায় সহস্রাধিক মুহাদ্দিস, ফকীহ, হাফেজ ও নৈয়ায়িক একত্রে উপস্থিত থাকতেন। ইমাম বুখারীর নিকট থেকে সহীহ বুখারীর সনদ গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় নব্বই হাজার—এ এক বিস্ময়কর পরিমাণ। এ রকম অগণিত উদাহরণ রয়েছে, যার হিসাব নিরূপণ করা দুরূহ। প্রতিটি জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যেই তখন শিক্ষা দ্রুত প্রসার লাভ করেছিল; গ্রন্থকার, শাস্ত্রকার ও নানা শাখার পণ্ডিতের সংখ্যা ছিল অসংখ্য। এদের কারো পিতা ছিলেন দরজি, কেউ মুচি, কেউবা তাঁতি; কারো পূর্বপুরুষ ছিলেন ময়রাফেরত, বাবুর্চি কিংবা কর্মকার। আমীর-ওমরাহদের প্রাসাদও তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের দীপ্ত আলোকছটায় উজ্জ্বল। বিস্ময়ের বিষয়—আরবী ভাষা-অলংকারের প্রবর্তক, ফকীহ ও কবি আবু নওয়াস কিংবা বাশশারের সমসাময়িক ইবনেুল-আস মুতেফ আব্বাসী (মৃ. ২৯৬ হি.)—যাদের একজন দেশশাসক ছিলেন—তাঁরাই ছিলেন আরব কবিতার শেষ দিকের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। আবার দার্শনিক ইবনেে সিনা ও নাসিরুদ্দীন তুসী ছিলেন উচ্চপদস্থ মন্ত্রীত্বের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।

সেদিন যে শিক্ষাপদ্ধতি প্রচলিত ছিল, সভ্য বিশ্বের বহু দেশে আজও তার রূপান্তরিত ধারা অনুসৃত হচ্ছে। ‘ইমলা’–ই ছিল লেকচারের আদিরূপ। শিক্ষক কুরসিতে বা উঁচু মঞ্চে বসে উপস্থাপিত বিষয়ের মৌখিক আলোচনা করতেন। শিক্ষার্থীরা দোয়াত-কলম হাতে উপস্থিত হয়ে উস্তাদের কথা শব্দে-শব্দে লিপিবদ্ধ করতেন; এভাবেই একেকটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রস্তুত হতো, যাকে বলা হতো ‘আমালী’। বিন, দোয়াঈদ, সায়ানাব প্রভৃতি গ্রন্থ এই আমালী ধারার অন্তর্গত। কোনো হালকায় শ্রোতার সংখ্যা বেশি হলে উস্তাদের সামনে দু’একজন জ্ঞানী ব্যক্তি দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য উচ্চস্বরে পুনরাবৃত্তি করতেন, যাতে দূরের শ্রোতারাও স্পষ্ট শুনতে পান; তাদের বলা হতো ‘মুসতামলী’।

শিক্ষা কেবল কোরআন-হাদীসেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাগদাদে এরিস্টটলের যুক্তিবিদ্যার উস্তাদ আবু বিশর মুতীর হালকায়ও শত শত শিক্ষার্থী সমবেত হতেন। মহান দার্শনিক আল-ফারাবীও সে হালকায় উপস্থিত থাকতেন এবং সেখান থেকেই এরিস্টটলের যুক্তিবিদ্যার শত শত পৃষ্ঠা নিজহাতে পুনর্লিখন করেছিলেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য সুদূর দেশ ভ্রমণ করা এবং বিশিষ্ট পণ্ডিতদের সান্নিধ্যে অবস্থান করে জ্ঞানের পরিপক্বতা অর্জন করা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে যুগের কোনো শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত এমন নেই যিনি জ্ঞান-অন্বেষণে দুই-চারশত মাইল পথ অতিক্রম করেননি। আজ ভ্রমণের প্রয়োজন না পড়লেও সে যুগে এ ছিল অকল্পনীয়। বাগদাদ, নিশাপুর, কর্ডোভার মতো জ্ঞানকেন্দ্রে সব শাস্ত্রের পণ্ডিত উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও সেখানকার আলেমরা পূর্ব-পশ্চিমের বহু দেশ সফর করতেন। স্পেন থেকে মিসর, সিরিয়া ও বাগদাদ যেতেন এবং আবার সেসব অঞ্চল থেকে স্পেনে ফিরতেন। আল্লামা মাকরীজীর ইতিহাসের বড় একটি অংশই এ ধরনের ভ্রমণকারী পণ্ডিতদের বিবরণে পূর্ণ।

যে উৎসাহ ও উদ্যম নিয়ে মুসলমানরা সে যুগে জ্ঞান-সাধনায় দেশ-দেশান্তর ভ্রমণ করেছেন, মানবসভ্যতার ইতিহাসে তার তুলনা পাওয়া যায় না।

সেদিন মুশায়ারা ও তর্ক-আলোচনায় অংশগ্রহণ করাও জ্ঞানার্জনের অপরিহার্য অঙ্গ বলে বিবেচিত হতো। বড় শহরগুলোতে মুশায়ারার নির্দিষ্ট স্থান ও সময় ছিল। অনেক সময় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাসভবনেও এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। পণ্ডিত ও শিক্ষার্থীরা সমানভাবে এসব জলসায় যোগ দিতেন। ফিকাহ, সাহিত্য, ব্যাকরণ প্রভৃতির জন্য পৃথক আলোচনা সভা—অর্থাৎ আধুনিক ভাষায় ‘সেমিনার’—আয়োজিত হতো। জ্ঞানসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতো এবং শেষ রায় দেওয়ার জন্য কোনো শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতকে নিযুক্ত করা হতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ন্যায়-সত্যই ছিল এসব আলোচনার উদ্দেশ্য। প্রতিটি বৈঠক বই পাঠের চেয়েও অধিক ফলপ্রসূ হতো। পাঠ্য শেষ হলে উস্তাদ শিক্ষার্থীদের লিখিত সনদ প্রদান করতেন, যাতে তাদের দক্ষতার পরিচয়ও অঙ্কিত থাকত এবং শিক্ষা দানের অনুমতিও দেওয়া হতো। সেই সনদে ‘তিলসান’ আলেমদের বিশেষ কালো পোশাক পরিধানেরও অনুমতি অন্তর্ভুক্ত থাকত, যা এখন কী না সারা বিশ্বে স্নাতক অর্জন করার পরে পরা হয়।

শিক্ষা বিস্তারের কারণসমূহ

১. প্রথমত, শিক্ষা তখন ধর্মীয় জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছিল। কোরআন ও হাদীস আরবীতে হওয়ায় নাহু, সরফ, অভিধান, ব্যাখ্যা, রিজাল—সবই ধর্মীয় শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত ধরা হতো। দর্শন ও কালামও শাস্ত্র হিসেবে মর্যাদা পায়। ফলে প্রায় সব জ্ঞানই তখন শিক্ষার অঙ্গ হয়ে ওঠে।

ইসলামের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ জাতিগোষ্ঠী—যারা আরবদের মতো সাহসী, উদ্যমী, আত্মবিশ্বাসী—তারা যে বিষয়ে মন দিত, তাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করত—এটাই স্বাভাবিক।

আরব ব্যতীত অন্যান্য জাতিও ইসলাম গ্রহণের পর জ্ঞানচর্চায় আরবদেরও ছাড়িয়ে যায়। তাই অনেক শাস্ত্রের ইমাম ও উস্তাদ আজমী ছিলেন—এই বিষয়ে ইবনেে খালদুন তাঁর ‘মুকাদ্দিমা’র একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করেছেন।

২. দ্বিতীয়ত, শিক্ষা কেবল মসজিদ বা ব্যক্তিগত বিদ্যালয়ে সীমিত ছিল না। উযীর, সেনাধ্যক্ষ, শাসক—সব শ্রেণির শিক্ষিত ব্যক্তিই জ্ঞানচর্চা ও বিতরণে যুক্ত ছিলেন। মন্ত্রীত্বের ব্যস্ততার মাঝেও ইবনেে সিনার দরবারে শিক্ষার্থীদের ভিড় জমত।

৩. তৃতীয়ত, শিক্ষার ক্ষেত্রে ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা। নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রমের বাধ্যবাধকতা ছিল না। যে কেউ যে কোনো বিষয়ে শিক্ষালাভ করতে পারত। আমীর-ওমরাহ ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা ছিলেন শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক। সাধারণ রইসদের দরবারেও কবি-সাহিত্যিক ও জ্ঞানীগুণী উপস্থিত থাকতেন এবং বিনিময়ে তাঁদের কোনো কাজ করতে হতো না; বেতন পেতেন যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে। ফলে জ্ঞান-অর্জনের প্রতিযোগিতা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটে মাদরাসা গড়ে ওঠে। যদিও পাঠ্যবিষয়ে বিশেষ পরিবর্তন হয়নি, তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় থাকায় শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে। পরে উসমানীয় আমলে নীতিমালা কঠোর হয়; দেশভেদে শিক্ষাকালের মেয়াদ স্থির হয়ে পড়ে। ইলকা—অর্থাৎ বক্তৃতা প্রদানের প্রথা—ক্রমে লোপ পায়। হাফেজ মঈনুদ্দীন ইরাকী অষ্টম হিজরী শতকে তা পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করলেও সফল হননি।

শিক্ষায় ধর্মীয় প্রভাব

ইসলামী জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিস্ময়কর দান হলো—প্রাচীন আরবি ভাষার সংরক্ষণ। যে ভাষাটি বহু শতাব্দী ধরে আরবের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ভাষা ছিল না, সে ভাষা টিকে রইল শুধু দুই মহাগ্রন্থ—কুরআন ও হাদীসের কারণে। পারস্য ও খোরাসানে যখন ফারসি রাজভাষার মর্যাদা পায়, তখন আরবি বহু অঞ্চলে প্রচলন হারায়। আব্বাসীয় খিলাফতের শেষ যুগে রাষ্ট্রীয় শক্তি বাগদাদকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে; প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় সেলজুকদের হাতে, যারা ভাষা ও বংশে আরব ছিলেন না। মিসর ও সিরিয়ায় আইউবী, নূরী ও চরাকেস প্রশাসন—সবই অনারব শাসকগোষ্ঠী।

ফলে মূল আরবভূমিতেও ধীরে ধীরে প্রাচীন আরবি কথ্যজীবন থেকে সরে যায়। কুরআন ও হাদীসই হয়ে ওঠে সেই প্রাচীন ভাষার একমাত্র আশ্রয়স্থল।

কিন্তু এই পক্ষপাতপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমরা আধুনিক আরবিকে প্রয়োজনমতো অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি—এ এক ধরনের বেদনাদায়ক ঘাটতি। প্রায় ছয় শত বছর আগে আরবি ভাষা ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়; নতুন শব্দ, নতুন বাক্যরীতি, নতুন স্বরচিহ্ন—সবকিছুই ভিন্ন ধাঁচে রূপ নেয়। প্রচলিত ‘নাহু’ এ যুগের আরবি বোঝার জন্য অপ্রতুল হয়ে পড়ে। নতুন রীতিতে কাসীদা, খুতবা, সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার সৃষ্টি হয়—যা ইরাব যোগ করে পড়লে অনেক কিছুই অর্থহীন মনে হয়।

দুর্ভাগ্য এই যে, এই নতুন আরবির পরিভাষা ও শব্দার্থ বোঝার জন্য মুসলিম সমাজকে খ্রিস্টান গবেষকদের অভিধানধার্য্য করতে হয়। পিটার্সের মুহীতুল মুহীত কিংবা লেইনের বিখ্যাত অভিধান এই অভাব পূরণে প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়ায়—যা নিঃসন্দেহে লজ্জাকর।

ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও জ্ঞানচর্চার অঞ্চলভেদ

ইসলামী সভ্যতার বিস্তৃত ভূখণ্ড নানা জাতি, নানা স্বভাব ও ভিন্ন পরিবেশকে এক সূত্রে বেঁধেছিল। কুরআন ও সুন্নাহ সর্বত্র জ্ঞানের আলো জ্বেলেছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি দেশে তা প্রতিফলিত হয়েছে নিজস্ব স্বভাব-রুচি অনুযায়ী।

ইরানে যুক্তিবিজ্ঞান ও দার্শনিক অন্বেষা অধিক বিকশিত হয়;

মিসর ও সিরিয়ায় হাদীস, ফিকহ ও রিজালশাস্ত্রের চর্চা বিশেষ গুরুত্ব পায়;

অন্যদিকে আন্দালুসে কবিতা, ভাষা ও ইতিহাস ছিল প্রধান অনুরাগের বিষয়। স্পেনের শিক্ষায় অল্প বয়স থেকেই বালকদের কুরআনের পাশাপাশি কবিতা, রূপক, উপমা শেখানো হতো।

ভূগোল, জাতি ও মেজাজের এই বৈচিত্র্য একেক অঞ্চলের জ্ঞানধারাকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দেয়। ইরানের আবেগ-প্রবণ ও সূক্ষ্মদৃষ্টি দর্শনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে; মিসর-সিরিয়ার মুখস্থ করার দক্ষতা তাদেরকে হাদীস ও রিজালের পথে উৎকর্ষ দেয়; আর আন্দালুসের আরবগণ কবিতায় সর্বোচ্চ সাফল্য আনেন। আলে-হামদানের শাসনে সিরিয়াতেও কাব্যচর্চার উজ্জ্বলতা দেখা যায়।

ইসলামী ভূখণ্ডে ক্ষমতার পরিবর্তন অনেক সময় জ্ঞানের পক্ষে আশীর্বাদে পরিণত হয়েছিল। প্রতিটি নতুন সরকার পূর্ববর্তী সরকারের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা-উদ্যোগগুলোকে বাড়িয়ে নিত; ওয়াকফের সম্পদ রাষ্ট্রের কাছে অর্পণযোগ্য ছিল না বলে জ্ঞানচর্চার ভিত্তি অপরিবর্তিত থাকত। হালাকু খাঁন বাগদাদ ধ্বংস করেও ওয়াকফে হস্তক্ষেপ করতে পারেনি—তুসীর ব্যবস্থাপনায় এগুলো অক্ষত ছিল। নানা রাজবংশ জ্ঞানচর্চার প্রতিযোগিতায় উদারতা দেখাত—যদিও পাঠ্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব রাজনৈতিক সমস্যার সঙ্গে অসংগত ছিল।

মাদরাসায় ধর্মীয় প্রভাব

সব মাদরাসাই মাযহাবভিত্তিক ছিল। নিযামিয়া দারুল উলুম ছিল কেবল শাফিয়ীদের জন্য; তাফরীয়ায় চার মাযহাবের শিক্ষাই থাকত, তবে পাঠ্যক্রম ছিল পৃথক এবং শিক্ষকরাও ছিলেন স্বতন্ত্র।

চতুর্থ হিজরী শতাব্দী থেকেই মাযহাবের বুনিয়াদ মজবুত হয় এবং সমাজেও তা প্রতিষ্ঠা পায়। যদিও শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর মতে মাযহাবের প্রচলন ৪র্থ শতকের পর। সেদিনের যুগ ছিল ব্যক্তিগত তাকলীদের যুগ; ফলে ইজতিহাদের স্বাধীনতাও অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস পায়।

শিক্ষা বিস্তারের পথে অন্তরায় সৃষ্টি হয় নাহু, সরফ, মানতিক প্রভৃতি আনুষাঙ্গিক বিষয়ে অতিরিক্ত মনোযোগের কারণে। এতে মূল জ্ঞান অর্জনের সময় কমে যেত। পাশাপাশি গ্রন্থসংখ্যা বৃদ্ধি ও সেগুলো পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় জটিলতা বাড়ে।

মুঘল আমলের শেষদিকে এসে উপমহাদেশের মাদরাসাগুলোতে ব্যাকরণিক খুঁটিনাটিতে শিক্ষা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, ফলে যোগ্য আলেমের অভাব দেখা দেয়।

দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা শিক্ষাও নানা স্থানে বাধাগ্রস্ত হয়। আব্বাসীয় খলীফা মুতাওয়াক্কিল দর্শনগ্রন্থ বিক্রি নিষিদ্ধ করেন; ইবনে রুশদকে দর্শনচর্চার অভিযোগে বন্দী করা হয়; উসমানীয় আমলে দর্শনশাস্ত্র পাঠ নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়; সুয়ূতী যুক্তিবিদ্যা নিষিদ্ধ প্রমাণে আলাদা গ্রন্থ রচনা করেন; ইবনে তাইমিয়া খলীফাকে দর্শনচর্চার ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করেন।

স্পেনে যদিও অভিজাত শ্রেণি দর্শনের পক্ষপাতী ছিলেন, তবুও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় স্বাধীনভাবে দর্শনশিক্ষা দেওয়া হতো না।

উপমহাদেশে ইসলামী শিক্ষার সূচনা

মক্কা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ইসলাম ছোট কিছু নিবেদিতপ্রাণ সাহাবির হাত ধরে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে প্রসারিত হয়। নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর সময়ে এই শিক্ষাদর্শনা আরব জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং খুলাফায়ে রাশেদিন ও পরবর্তী যুগে এটি পৃথিবীর বহু অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। উমাইয়া খলিফাদের সময়ে (৭০৫–৭১৫ খ্রি.) সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে মুসলমানরা ভারতের সিন্ধু ও মুলতান অঞ্চল দখল করে ইসলামী শাসন প্রবর্তন করেন। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ধারার প্রথম পর্যায় এ সময় থেকেই গণ্য করা যায়। গজনীর সুলতান মাহমুদের (৯৯৭-১০৩০ খ্রি.) সতেরবার ভারত অভিযান এই উপমহাদেশে মুসলমানদের সংস্পর্শের দ্বিতীয় পর্যায় বলে বিবেচনা করা যায়। এ পর্যায়ে ভারতের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে মুসলমানদের আগমনের প্রভাব পড়েছিলো। ভারতের পূর্বদিকে কনৌজ এবং দক্ষিণদিকে গুজরাটের সোমনাথ পর্যন্ত সুলতান মাহমুদের অভিযান পরিচালিত হওয়ায়, এসব অঞ্চলের জনগণ মুসলিম সংস্কৃতি ও জীবনধারার সাথে পরিচিতি লাভ করার সুযোগ পায়। এরপর ঘুর বংশের মুইজ-উদ-দীন মুহাম্মদ বিন সাম (মুহাম্মদ ঘুরী) ১১৯২ খ্রিষ্টাব্দে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে চৌহানবংশের পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করে ভারতবর্ষে প্রাথমিকভাবে স্থায়ীভাবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এই ধারাবাহিকতায় ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি বাংলার বরেন্দ্রভূমি বা লক্ষ্মাবতীতে সামরিক অভিযান চালিয়ে বাংলায় মুসলিম শাসনের স্থায়ী ভিত্তি স্থাপন করেন।

এ উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলার সাথে তাঁদের কার্যকর কোনও সংযোগ সাধিত হয়নি। তৃতীয় পর্যায়ে তুর্কী সামরিক অভিযান বাংলার বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়ে এখানে স্থায়িভাবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা পরবর্তীকালে বাংলায় স্বাধীন সালতানাতের গোড়াপত্তন করে।

বখতিয়ার খলজীর বিজয়ের পূর্বেই যে মুসলমানরা বাংলাদেশের সংস্পর্শে এসেছিলো তার আরো বহু উল্লেখ পাওয়া যায়। বাগদাদের বিখ্যাত খলীফা হারুন-অর-রশীদের ১৭২ হিজরীর (৭৮৮ খ্রি.) একটি মুদ্রা (দিরহাম বা রৌপ্য মুদ্রা) বর্তমান নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে (সোমপুর বিহার) বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসস্তুপের মধ্যে পাওয়া গেছে। কুমিল্লার ময়নামতির ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও কিছু আরবী মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। কীভাবে এই আরবীয় মুদ্রাগুলো বাংলায় এল? এর পিছনে জোরালো যুক্তি এই যে, এই মুদ্রাগুলো আরব বণিক অথবা ধর্ম প্রচারকগণ খিস্টীয় অষ্টম অথবা নবম শতকে বাংলায় আনয়ন করেন।

তাই বলা যায়, বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের সাথে আরবের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল সুপ্রাচীন। সপ্তম শতকে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির যে নবজাগরণ আরবে ঘটে, তার প্রভাব এই ভূখণ্ডেও পৌঁছে। হযরত ওমর, ওসমান, আলী ও মুয়াবিয়ার (রা.) শাসনামলে সাহাবীদের আগমন এবং পরবর্তীতে তাবিয়ীদের আগমন—এ সবই ইসলামী শিক্ষা প্রচারের ঐতিহাসিক নিদর্শন। ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয় যে, মুসলমানরা বঙ্গদেশে প্রবেশের আগে থেকেই ব্যবসা ও বাণিজ্যের মাধ্যমে এই অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। সপ্তম শতাব্দীর দিকে আরবের ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম, আরাকান ও বার্মায় যাতায়াত করতেন এবং সেখানকার উপকূলীয় অঞ্চলে ইসলামের প্রচার চালাতেন। ফলে বঙ্গভূমির সাথে ইসলামের পরিচয় ক্রমশ গড়ে ওঠে। এই পরিচয়ের একটি প্রমাণ হলো চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় প্রচুর আরবি শব্দের সংযোজন।

মুহাম্মদ বিন কাসিম তাঁদের জন্য মসজিদ নির্মাণ ও চার হাজার পরিবারের আবাসের ব্যবস্থা করেন। আরব বণিকেরা তখন চীন ও পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত বাণিজ্য বিস্তার করেছিলেন—আরব বাণিজ্যের এ ছিল স্বর্ণযুগ।

তবকাত-ই-নাসিরীর মীনহাজ-ই-সিরাজ বলেন যে, বখতিয়ার খলজী যখন আঠারজন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে নদীয়ায় পৌঁছান, তখন (তাঁর পিছনে মূল বাহিনী ছিলো) স্থানীয় লোকেরা তাঁর দলকে ঘোড়া ব্যবসায়ী বলে মনে করেছিলো। তাঁরা যে এদের শহর দখল করার অভিপ্রায়ে এসেছে, এ সন্দেহ তাদের মনে উদ্রেকই হয়নি। এতে ধারণা হয় যে, মুসলমান ব্যবসায়ীগণ বখতিয়ারের বিজয় পূর্ব যুগেও বাংলায় আগমন করতেন। মীনহাজ-ই-সিরাজ আরো লিখেছেন যে, বখতিয়ার খলজী বাংলাদেশে অনেকগুলো মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাহ নির্মাণ করেন। এতে ধারণা হয় যে, বখতিয়ার খলজী কর্তৃক লক্ষ্মণাবর্তী বিজয়ের পর্বেই কতিপয় মুসলিম সাধক এদেশে ইসলাম প্রচার কার্যে নিয়োজিত ছিলেন এবং এজন্য খানকা নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিলো। এটি বাংলায় ইসলাম প্রচারের ধারায় প্রারম্ভিক পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলায় ইসলাম প্রচারের ধারার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে এবং এ পর্যায়ে মুসলিম শাসক ও সুলতানদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, মাদরাসা ও খানকা গড়ে উঠেছে। আগেই বলা হয়েছে যে, বখতিয়ার খলজী বাংলার লক্ষ্মণাবতী শাসন প্রতিষ্ঠার পর সে স্থানে এবং তাঁর বিজিত ভূখণ্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রে মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাহ্ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর (খলজী) প্রশাসকগণও এই নীতি অনুসরণ করেন। বাংলার পরবর্তী স্বাধীন সুলতানদের আমলে এ কার্যক্রম অধিক গুরুত্বসহকারে বাস্তবায়িত হয়েছে। আবিষ্কৃত শিলালিপি ও লিখিত সূত্র থেকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি মাদরাসা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় (পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকায় এখানে শুধু নাম উল্লেখ করা হয়েছে)। হুগলী জেলার ত্রিবেনীতে সুলতান রুকন-উদ-দীন কায়কাউসের শাসনামলে (১২৯১-১৩০১ খ্রি.) ১২৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত একটি মাদরাসা এবং শামস-উদ-দীন ফিরুজ শাহের শাসনামলে (১৩০১-১৩২২ খ্রি.) ১৩১৩ খ্রিস্টাব্দে ঐ একই স্থানে দারুল খায়রাত নামে অপর একটি মাদরাসা।১০ ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (সাতগাঁ অঞ্চল নামে পরিচিত) শিক্ষার দীপশিখা জ্বালিয়ে জনগণের কাছে ইসলামের শাশ্বত বাণী প্রচার অব্যাহত রেখেছিলো। অনুরূপভাবে বাংলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে (লক্ষ্মৌতি অঞ্চল নামে পরিচিত) ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে প্রতিষ্ঠিত মহিসুন (পঞ্চদশ শতকে বারবকাবাদ নামে পরিচিতি পায়) মাদরাসা জালাল-উদ-দীন মুহাম্মদ শাহের (গণেশের পুত্র) শাসনামলে (১৪১৫-১৪৩২ খ্রি.) ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সুলতানগঞ্জ মাদরাসাস, সুলতান আলা-উদ-দীন হোসেন শাহের শাসনামলে (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রি.) লক্ষ্মৌতির দারসবাড়িতে নির্মিত দারসবাড়ি মাদরাসা এবং সপ্তদশ শতকের গোড়ায় অথবা ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে প্রতিষ্ঠিত বাঘা মাদরাসা অত্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলার পূর্বাঞ্চলও (সোনারগাঁ অঞ্চল নামে পরিচিত) পিছিয়ে ছিলো না। তবে ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে সোনারগাঁ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর্বে ঐ অঞ্চলে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো কি-না সে সম্পর্কে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। কোন কোন অসমর্থিত সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুসলমান বসতি গড়ে ওঠার পরে সেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মক্তব-মাদরাসা গড়ে উঠেছিলো।১৮ এই মত সন্দেহাতীত নয়। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারী সাহায্যে পরিচালিত হতো। ছাত্রগণ বিনাখরচে পড়াশুনার সুযোগ পেতো। উলামা-মাশায়েখ এবং শিক্ষকগণ মদদ-ই-মাশ হিসেবে ইক্কা ও লাখেরাজ ভূমি লাভ করতেন। এমনিভাবে জনগণের মধ্যে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের ব্যাপক কার্যক্রম গৃহীত হয়েছিলো। বাংলার শাসক ও স্বাধীন সুলতানগণ শিক্ষা বিস্তার ও ইসলামের প্রচারের ক্ষেত্রে যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য।

বাংলায় ইসলাম প্রচারের ধারায় তৃতীয় পর্যায়ে প্রসিদ্ধ ওয়াইজ ও হক্কানী আলেমগণের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ত্রয়োদশ শতকের মধ্যভাগে মহিসুন মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা তাকী-উদ-দীন আল-আরাবী এবং ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে সোনারগাঁ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা শরফ-উদ-দীন আবু তাওয়ামা ইসলামী শিক্ষাদানে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছিলেন। এছাড়া যেসব আলেম তাঁদের বক্তৃতা দ্বারা জনগণকে প্রভাবিত করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ত্রয়োদশ শতকের প্রারম্ভে আলা-উদ-দীন আলী মর্দান খলজীর শাসনামলের কাজী রুকন-উদ-দীন সমরকন্দী এবং গিয়াস-উদ-দীন ইওয়াজ খলজীর শাসনামলে পারস্যের অধিবাসী জামাল-উদ-দীন এর পুত্র ইমামজাদা জালাল-উদ-দীন এর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলায় ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার প্রারম্ভিককাল থেকে ওয়াইজ ও হক্কানী আলেমগণ যে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।

বখতিয়ার খলজীর বিজয়ের ফলে বাংলাদেশে একটি স্বাস্থ্যবান, সাহসী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নতুন জাতি গঠিত হয়। মুসলিম বিজয়ের পূর্বে বাংলার সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা (বৌদ্ধ, জৈন এবং অন্ত্যজ শ্রেণি) ব্রাহ্মণ্যবাদ ও বর্ণবাদ হিন্দুদের নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়েছিলো।

হিজরী ৯৩ সনে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু জয় করলে মুলতান, মনসূরা, আলোর, দেবল, সিন্দান, কুসদার, কান্দারীল প্রভৃতিতে আরব উপনিবেশ গড়ে ওঠে। তাঁর সঙ্গে থাকা হাজারো বীর সেনার মধ্যেও ছিলেন বহু কুরআন-হাদীস বিশারদ, যাদের নির্দেশ ছিল নতুন অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষা বিস্তার করা। এর ফলে উপমহাদেশে ইসলামী জ্ঞানচর্চার দ্রুত প্রসার ঘটে।

ইবনে বতুতার বর্ণনায় দেখা যায়, চতুর্দশ শতকে উপমহাদেশে ইসলামী শিক্ষার এমন প্রসার ঘটে যে শুধুমাত্র কেরালার হনাবানে মেয়ে শিশুদের জন্য ১৩টি ও ছেলেদের জন্য ২৩টি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল; মেয়েরা ছিল ‘হাফিজা’। আলাউদ্দীন খিলজীর আমলে হাদীসবিদ ছিল অল্পসংখ্যক; অধিকাংশই ফিকহ অধ্যয়ন করতেন বিচারপতির দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে।

উপমহাদেশে জ্ঞানীর আগমন ও শিক্ষার বিকাশ

মুসলিম বিজয়ের সাথে সাথে অসংখ্য আলেম, সুফি ও পণ্ডিত উপমহাদেশে আগমন করেন এবং এই ভূখণ্ডের জ্ঞান-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেন। দিল্লী জয়ের পর বাদশাহী দরবার যেমন নতুন রূপ পেল, তেমনি প্রতিষ্ঠিত হলো আলেমদের জ্ঞানচর্চার মহফিল।

হযরত শরফুদ্দীন আবূ তাওয়ামা (রহ.) ইলতুতমিশের আমলে দিল্লী আসেন ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। পরে সোনারগাঁয়ে এসে আরেকটি বিশাল শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলেন, যেখানে বহু মহান ব্যক্তিত্ব অধ্যয়ন করেছেন—যেমন হযরত শরফুদ্দীন ইয়াহইয়া মনিরী।

সিকান্দার লোদীর যুগে শায়খ আবদুল্লাহ তলবনী ও মাওলানা আজীযুল্লাহর আগমনে উপমহাদেশে মানতিক ও কালামের নতুন জোয়ার ওঠে। বাদশাহ নিজে তাঁদের ক্লাসে বসতেন—যা শিক্ষা ও শিক্ষকের প্রতি শাসকের গভীর শ্রদ্ধার দৃষ্টান্ত।

মুহাম্মদ (সা.)-এর হাদিসে নির্দেশিত হয়েছে, “প্রত্যেক মুসলমানের জন্য পুরুষ-ও নারী উভয়ের ওপর বিদ্যা অর্জন ফরজ।” শাসক মুসলমানরা জিতেছে এমন অঞ্চলে শিক্ষার প্রসারকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ মিনহাজ-ই-সিরাজের বর্ণনা অনুসারে, বখতিয়ারের বাংলা বিজয়ের পর শাসক ও সুলতানরা মাদরাসা, মসজিদ ও খানকা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষার সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছিলেন।

প্রাপ্ত শিলালিপি ও লিখিত উৎস থেকে জানা যায়, বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাদরাসা স্থাপিত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, হুগলির ত্রিবেণীতে সুলতান রুকন-উদ-দীন কায়কাউস (১২৯১–১৩০১ খ্রি.) শাসনামলে ১২৯৮ খ্রিষ্টাব্দে একটি মাদরাসা স্থাপন করা হয়। পরবর্তীকালে শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৩০১–১৩২২ খ্রি.) ‘দারুল খয়রাত’ নামে আরও একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতগাঁ অঞ্চলে এই মাদরাসাগুলি ইসলামের জ্ঞান ও শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে লখনৌতি অঞ্চলে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মহিসুন মাদরাসা স্থাপিত হয়, যা পঞ্চদশ শতাব্দীতে বরবকাবাদ নামে পরিচিতি লাভ করে। মাওলানা তাকী-উদ-দীনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই মাদরাসা ছিল প্রাথমিক স্থাপিত ব্যক্তিগত উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্ডিত ও শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করত।

রাজশাহী অঞ্চলের উদাহরণেও শিক্ষার বিস্তার স্পষ্ট। গোদাগাড়ীর কেল্লা বারুইপাড়া এলাকায় জালাল-উদ-দীন মুহাম্মদ শাহের শাসনামলে (১৪১৫–১৪৩২ খ্রি.) ১৪৩২ খ্রিষ্টাব্দে সুলতানগঞ্জ মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে লাখনৌতির দরসবাড়িতে দুটি মনোরম মাদরাসা নির্মিত হয়। বাঘা মাদরাসা, যা ১৬–১৭ শতকের দিকে প্রতিষ্ঠিত, ইংরেজ আমল পর্যন্ত প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতিতেই কার্যকর ছিল। পূর্ব বাংলার সোনারগাঁওও পিছিয়ে ছিল না; ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধে মাওলানা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা খানকা ও শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন। তিনি হানাফি ফিকাহ ও মুহাদ্দিস ছিলেন এবং সাধারণ বিজ্ঞান, রসায়ন, প্রকৃতিবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। রংপুর অঞ্চলেও বখতিয়ার খলজির আমলে কয়েকটি মাদরাসা স্থাপিত হয়েছিল। চট্টগ্রামে বিপুলসংখ্যক পণ্ডিত ও কবির উপস্থিতি থাকলেও মাদরাসা প্রতিষ্ঠার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ধারা

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ইলম বা বিদ্যা শিক্ষা করা ফরয বা অবশ্য কর্তব্য বলে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বিদ্যা শিক্ষার প্রতি এত গুরুত্ব দিতেন যে, বদরের যুদ্ধের পরে শিক্ষিত বন্দীদের মুক্তিপণ হিসেবে মদীনার ছেলেদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিয়োগ করেন। যে সকল বন্দী লেখাপড়া জানতো হযরত তাদেরকে বাদ দেন, ‘তোমরা প্রত্যেকে মদিনার দশজন বালককে লেখাপড়া শিক্ষা দাও, এটাই তোমাদের মুক্তিপণ’।

মহানবী (স.) আরো বলেছেন, ‘চীন দেশে হলেও বিদ্যা অর্জন করো।’ মুসলমান শাসকগন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ জয় করেছেন এবং বিজিত দেশে শিক্ষা বিস্তারের প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। বাংলাদেশেও বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান শাসক ও উলামা সম্প্রদায় বিদ্য শিক্ষার ব্যবস্থাদি করেছেন। প্রথম মুসলমান বঙ্গবিজয়ী ইখতিয়ার-উদ-দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী সম্পর্কে ঐতিহাসিক মীনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর বিখ্যাত তবকাত-ই-নাসিরী গ্রন্থে বলেন, “যখন মোহাম্মদ বখতিয়ার ঐ রাজ্য অধিকার করেন, তখন তিনি নদীয়া নগর ধ্বংস করেন এবং লক্ষ্মৌতি নামক স্থানে রাজধানী স্থাপন করেন। সেই রাজ্যের চতুষ্পার্শ্বর অঞ্চল তিনি অধিকার করেন এবং প্রত্যেক অঞ্চলে খুধা ও মুদ্রা প্রচলন করেন এবং ঐ অঞ্চলসমূহে (অসংখ্য) মসজিদ, মাদরাসা ও উপাসনালয় তাঁর ও তাঁর আমিরদের প্রচেষ্টায় এ নির্দেশে দ্রুত ও সুন্দরভাবে নির্মিত হয়।” সুলতান গিয়াস উদ্দীন ইওয়াজ খলজী সম্পর্কে গ্রীনহাজ বলেন, “তাঁর বদৌলতে সে রাজ্যের (বাংলা) যে বহু কল্যাণ সাধিত হয়েছিলো তারা নিদর্শন বিদ্যমান আছে। তিনি বহু ইবাদতখানা ও মসজিদ নির্মাণ করেন। উলামা, শেখ ও সৈয়দদের মধ্যে যাঁরা বিশিষ্ট তিনি তাঁদেরকে ভাতা প্রদান করতেন।”

মহিসুন মাদরাসা

বাংলায় মুসলিম শাসনামলের গোড়ার দিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে যেসব মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তার মধ্যে মহিসুনে মাওলানা তাকী-উদ-দীন আরাবীর মাদরাসা প্রাচীনতম। বর্তমান নওগাঁ জেলার ধামইরহাট থানাভুক্ত চৌঘাট মৌজাস্থ মহিসুন (পঞ্চদশ শতকে বারবকাবাদ) এখন মাইগঞ্জ নামে পরিচিত। মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর মৃত্যুর পর তাঁর অধীনস্থ একজন উচ্চপদস্থ আমীর, মুহাম্মদ শীরান খলজী দিল্লীর সৈন্যদের সঙ্গে মুকাবিলা করে ব্যর্থ হয়ে তাঁর ইক্কা মহিসুনে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং কিছুদিন স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেন। তাঁর কবর সেখানে আছে। ঐ সময় থেকেই মহিসুন মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। মাওলানা তাকী-উদ-দীন আরাবী এই জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র পরিচালনা করেন। নামেই মনে হয় মাওলানা তাকী-উদ-দীন আরাবী মূলত আরবের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্য-খ্যাতি ও আলোচনাচক্রের সুনাম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্ডিত ও ছাত্রদের আকৃষ্ট করতো। বিহারের মানের শরীফের বিখ্যাত সুফী মখদুম শায়খ শরফ-উদ-দীন ইয়াহিয়া মানেরীর পিতা শায়খ ইয়াহিয়া মানেরী মাওলানা তাকী-উদ-দীন আরাবীর কাছে মহিসুন শিক্ষাকেন্দ্রে জ্ঞান অর্জন করেন। এ তথ্য মখদুম শায়খ শরফ-উদ-দীন ইয়াহিয়া মানেরীর জ্ঞাতিভ্রাতা শাহ শোয়েব কর্তৃক রচিত ‘মানাকিব-আল-আসফিয়া’ থেকে জানা যায়। আরো জানা যায়, শায়খ ইয়াহিয়া মানেরী ১২৯১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। এতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, ত্রয়োদশ শতকের মধ্যভাগে মহিসুনে উচ্চ শিক্ষার একটি কেন্দ্র ছিলো। সোহরাওয়ার্দী তরীকার অনেক সুফী এই মহিসুনে সমাহিত আছেন। এ তথ্য জৌনপুরের বিখ্যাত দরবেশ আশরাফ সিমনানীর লেখা চিঠি থেকে জানা যায়। এই সূত্র ধরে বলা যায়, ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে মহিসুন সুফী-দরবেশদের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো।

সোনারগাঁ মাদরাসা

অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী মাওলানা শরফউদ্দীন আবু তাওয়ামার অধীনে সোনারগাঁ ত্রয়োদশ শতকের শেষার্ধে একটি ইসলামী শিক্ষার পাদপীঠরূপে গড়ে ওঠে। মাওলানা শরফউদ্দীন আবু তাওয়ামা বোখারায় জন্মগ্রহণ করেন এবং খোরাসানে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি তার পূত চরিত্র ও অগাধ পান্ডিত্যের জন্য সমগ্র পশ্চিম এশিয়া ও ভারতে সুপরিচিত ছিলেন। হানাফী ফিকহ শাস্ত্রবিদ ও মুহাদ্দিস মাওলানা আবু তাওয়ামা ইসলাম বিষয়ক জ্ঞানে এবং সাধারণ বিজ্ঞানে, যেমন রসায়নবিদ্যা, প্রকৃতিবিজ্ঞান ও যাদুবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের বিরাট খ্যাতি নিয়ে তিনি দিল্লীতে আগমন করেন এবং সকল শ্রেণির মানুষের

উপর প্রভাব বিস্তার করেন ও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। কিন্তু তিনি তদানীন্তন সুলতানের (গিয়াস উদ্দীন বলবন ১২৬৬-১২৮৭ খ্রি.) ঈর্ষার দরুন তদীয় ভ্রাতা মাওলানা হাফিজ জইনউদ্দীন ও পরিবার-পরিজনসহ বাংলায় আসতে বাধ্য হন। পথে তিনি কিছু দিনের জন্যে মানেরে অবস্থান করেন। মাওলানা আবু তাওয়ামার অগাধ পাণ্ডিত্য তরুণ শরফউদ্দীন এহিয়া মানেরীকে তাঁর প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করে এবং আবু তাওয়ামার অধীনে জানলাভের উদগ্র বাসনা নিয়ে এহিয়া মানেরী সোনারগাঁয়ের পথে মাওলানার সঙ্গী হন। মাওলানা আবু তাওয়ামা সোনারগাঁয়ে বসতি স্থাপন করেন এবং সেখানে খানকাহ্ ও শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। সুফী ও পণ্ডিত হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার ফলে ভারতের সর্বত্র থেকে বহুশিষ্য ও ছাত্র তাঁর কাছে আগমন করেন। ঐ যুগের এই বিখ্যাত পণ্ডিতের অধীনে ধর্মতত্ত্ব ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষার অনুশীলন করা হতো। এর ফলে সোনারগাঁ শুধু বঙ্গদেশেই নয়, সমগ্র ভারতেও শিক্ষার একটি প্রদীপ্ত কেন্দ্রের মর্যাদা লাভ করে। এখান থেকে বহু বিখ্যাত পীর-দরবেশ ও পণ্ডিত ব্যক্তির আবির্ভাব হয়। খ্যাতনামা সুফী-পণ্ডিত মখদুম শরফউদ্দীন এহিয়া মানেরী ছিলেন মাওলানা আবু তাওয়ামার সোনারগাঁ শিক্ষা কেন্দ্রের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। ত্রয়োদশ শতকের শেষপাদে শিক্ষাকেন্দ্ররূপে সোনারগাঁ বাংলাদেশের গৌরব ছিলো। মাওলানা আবু তাওয়ামা ও মাওলানা শরফউদ্দীন মানেরী একইভাবে বাংলার মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গৌরব ছিলেন। বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক কৃতিত্বের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবু তাওয়ামা ৭০০ হিজরী (১৩০০ খ্রিস্টাব্দে) ইন্তিকাল করেন এবং সোনারগাঁয়ে সমাহিত হন। এ তথ্য জৈনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কীকে লেখা (জৈনপুরের) দরবেশ আশরাফ সিমনানীর চিঠি থেকে জানা যায়।

সোনারগাঁ বাংলার প্রসিদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্ররূপে এর বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের ঐতিহ্য অব্যাহত রাখে। পান্ডুয়ার বিখ্যাত সুফী ও পণ্ডিত শেখ আলাউল হক তাঁর নির্বাসনের সময়ে দু’বছর এখানে অবস্থান করেন। একইভাবে তাঁর পৌত্র শেখ বদর-ই-ইসলাম এবং প্রপৌত্র শেখ জাহিদী তাঁদের নির্বাসনকাল এখানে অবস্থান করেন।২৬ প্রসিদ্ধ দরবেশ ও বিদ্বান ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে স্বভাবতই সোনারগাঁয়ে ইসলামী শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার উদ্দীপনা অব্যাহত থাকে। এতে দেখা যায় যে, সোনারগাঁয় মাওলানা শরফউদ্দীন আবু তাওয়ামার বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য ষোড়শ শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো।

হযরত পান্ডুয়া

নানা কারণে পান্ডুয়া এ উপমহাদেশে শিক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ স্থানটি আধ্যাত্মিক জীবনের একটি বিখ্যাত কেন্দ্র ছিলো। শেখ জালাল উদ্দীন তাবরিজী, শেখ আখি সিরাজ উদ্দীন উসমান, শেখ আলাউল হক, শেখ নূর কুতুবুল আলম, শেখ জাহিদ ও অন্যান্য আরও বহু সুফী পণ্ডিত, উলামা ও শিক্ষকদের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক কার্যাবলির কেন্দ্র ছিলো এই পাওয়া। সুলতান ইলিয়াস শাহ, জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ শাহ, রুকন উদ্দীন বারবক শাহ, শামসউদ্দীন ইউসুফ শাহ ও জালাল উদ্দীন ফতেহ শাহের মত শিক্ষিত ও জ্ঞানী মুসলমান শাসকদের রাজধানীও ছিলো এ পাণ্ডুয়া। এঁরা সকলেই শিক্ষা ও বিদ্বান ব্যক্তিদের পষ্ঠপোষক ছিলেন। খ্যাতনামা পীর-দরবেশগণ ইসলামী জ্ঞানে খ্যাতিসম্পন্ন ছিলেন এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যে শিক্ষাকে আবশ্যক মনে করতেন। ফলে পান্ডুয়ায় তাঁদের খানকাসমূহ স্বভাবতই ধর্মীয় আলোচনা ও ইসলাম বিষয়ক জ্ঞান কেন্দ্রের পাদপীঠরূপে গড়ে ওঠে। সুলতানগণ ও অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা খানকাগুলোর জন্যে আর্থিক সাহায্য করতেন। ধর্মানুসন্ধানকারী ব্যক্তিগণ পীর-দরবেশদের এই খানকাহগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হন এবং সুফীদের ধর্মোপদেশ শ্রবণ করেন। হযরত নূর কুত্ব আলম পান্ডুয়ায় একটি বড় মাদরাসা ও একটি চিকিৎসালয় নির্মাণ করেন। সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিষ্কর ভূমি দান করেন।

পান্ডুয়া বাংলার শিক্ষা সংস্কৃতির একটি বিরাট ঐতিহ্য সৃষ্টি করে। শেখ আলাউল হক ঐ – যুগের একজন প্রসিদ্ধ বিদ্বান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সমগ্র উত্তর ভারতে তাঁর বিদ্যাবত্তা ও গভীর পাণ্ডিত্যের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর পুত্র আজম খান, নূর কুতুবুল আলম এবং – পৌত্ররাও তাঁদের অধ্যাত্মবাদ ও বিদ্যাবত্তার জন্য খ্যাতিমান ছিলেন। নূর কুতুবুল আলমের পৌত্র শেখ জাহিদ তাঁর পূত-চরিত্র ও ধর্ম বিজ্ঞান বিষয়ে পারদর্শিতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এই প্রসিদ্ধ পরিবার ছাড়াও পাণ্ডুয়ায় আরো বহু সুফী-দরবেশ ও ওলেমা ছিলেন, যাঁরা তাঁদের বিদ্যাবত্তা ও পাণ্ডিত্যের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। শেখ বদরুল ইসলাম ও হযরত বদর আলম ঐ যুগের খ্যাতনামা পণ্ডিত ছিলেন। পাণ্ডুয়ার এই আধ্যাত্মিক শিক্ষাকেন্দ্রের খ্যাতি জ্ঞানান্বেষণকারীদের বহু দূর দেশ থেকেও আকৃষ্ট করেছিলো। এই কেন্দ্র থেকে কয়েকজন প্রসিদ্ধ পীর-দরবেশ ও পণ্ডিত ব্যক্তি আবির্ভূত হন, যাঁরা এ উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে খুব উচ্চস্থান লাভে সমর্থ হয়েছিলেন। মীর সৈয়দ আশরাফ সিমনানী মুসলমানদের জীবনে, বিশেষ করে জৈনপুরে একটি গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী ছিলেন। তিনি আলাউল হকের শিষ্য এবং পান্ডুয়ার আধ্যাত্মিক শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষার্থী ছিলেন। শেখ হোসেন যুক্কর পোষ এবং শেখ নাসিব উদ্দীন মানিকপুরীও পাণ্ডুয়া শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষার্থী ছিলেন। সুফী পণ্ডিত শেখ হুসাম উদ্দীন মানিকপুরী, লাহোরের শেখ – কাফু ও শেখ শামসউদ্দীন তাহির একইভাবে পাণ্ডুয়ার বিশিষ্ট বাঙালি সিদ্ধপুরুষ হযরত নূর কুতুবুল আলমের কাছে জ্ঞানার্জন করেন।

রঙ্গপুর (রংপুর)

ইতিহাসবিদ ‘ফিরিস্তা’-এর মত অনুসারে রংপুর মুসলিম বিজয়ের সময় থেকে মুসলমানদের শিক্ষাকেন্দ্র ছিলো। প্রথম বাংলা বিজয়ের কথা বলতে গিয়ে ফিরিস্তা লিখেছেন, “দার সরহদে বাঙালা দর এও ওবে শাহরে নওদীয়া শাহরে মওসুম বে-রঙ্গপুরে বেনা কারদা, দারুল মুল্ক খুদ সাক্ত: ওয়া মাসাজিদ ওয়া মাদারেসাহ ওয়া খানকাহ দার আঁ শাহর

বিলায়েতে বাজায়ে মুয়ারেদে কুফফার বা রামে শুআরে ইসলাম বা রওনকে ওয়া বেওয়া ‘তামাম তাঁরী ওয়া তাজাল্লি গারদা নিদ।” অর্থাৎ বাংলার সীমান্তে নদীয়া শহরের বদলে রংপুর নামে একটি নতুন শহর (বখতিয়ার খলজী) বানালেন এবং এটি হলো তাঁর খোদ রাজধানী। মসজিদ, মাদরাসা এবং খানকাসমূহ অবিশ্বাসীদের উপাসনালয়ের স্থানে নির্মিত হলো এবং খলজী (বখতিয়ার খলজী) সেগুলোকে যথাসম্ভব ইসলামী রীতিতে সুশোভিত করার চেষ্টা করলেন।” তবে ফিরিস্তাকে সমর্থনের এ রকম কোনও সমসাময়িক প্রমাণ নেই যে, মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী রংপুরে তাঁর রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মীনহাজের বর্ণনা থেকে, দেবকোট খলজী পরবর্তী লক্ষ্মৌতি রাজ্যের রাজধানী ছিলো বলে ধরে নেয়া যেতে পারে, বিশেষত তাঁর তিব্বত অভিযান থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে। মীনহাজের বর্ণনা থেকে আরো জানা যায়, হোসাম উদ্দীন-ই-ওয়াজ খলজী লাখনৌতি নগরে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন (১২২৭ খ্রি.)।

যদিও ফিরিস্তার সাক্ষ্য অনুসারে রংপুরকে লক্ষ্মৌতি রাজ্যের রাজধানী হিসেবে গ্রহণ করা যায় না, তথাপি এটা সম্ভব যে, বখতিয়ার খলজী কর্তৃক সেখানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। লক্ষ্মৌতি নামটি কেবল রাজধানীর জন্যই নয়, বরং সমগ্র উত্তরবঙ্গ অর্থে ব্যবহৃত হতো। এভাবে রংপুরও লক্ষ্মৌতির অন্তর্ভুক্ত। মীনহাজের বর্ণনামতে বখতিয়ার খলজী ও তাঁর আমির-ওমরাহ কর্তৃক লক্ষ্মৌতিতে (সমগ্র এলাকায়) একাধিক মাদরাসা স্থাপনের বিষয় উল্লিখিত হয়েছে। এতে অনুমিত হয় যে, ঐ সময়ে রংপুরেও একটি মাদরাসা স্থাপিত হয়েছিলো। স্বাধীন সুলতানী আমল থেকে মুঘল আমল পর্যন্ত ঘোড়াঘাট একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ও ফৌজদার বা বিভাগীয় সেনানায়কদের সদর দপ্তর ছিলো। মুজাহিদ যোদ্ধা শাহ ইসমাইল গাজীর সঙ্গে সম্বন্ধ থাকায় ঘোড়াঘাট (রংপুর নামেও পরিচিত) বিশেষ স্মরণীয় হয়ে আছে; তিনি সুলতান রুকন উদ্দীন বারবক শাহের (১৪৫৯-‘৭৪ খ্রি.) শাসনামলে ঐ স্থানের সেনাপতি ছিলেন। শহীদ হওয়ার পর তিনি ঘোড়াঘাটে সমাধিস্থ হন। তাঁর সমাধিসৌধ পরবর্তীতে লোকের তীর্থস্থানে পরিণত হয়। কাজেই এটা খুবই সম্ভব যে, সেখানকার মুসলমান পরিবারগুলোর প্রয়োজনার্থে এই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।

চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে কোনো কোনো গবেষক পণ্ডিত অনুমান করেন যে, সমুদ্র বন্দর হিসেবে এর গুরুত্বের কারণে মুসলিম বসতি স্থাপনের সময় থেকে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিলো। পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম মুসলিম শাসনাধীনে এলেও সামরিক ও শাসনতান্ত্রিক দিক থেকে সে যুগে চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিলো। উচ্চ পর্যায়ের একজন সেনাপতি এর শাসনকর্তা নিযুক্ত হতেন। একটি সমৃদ্ধ মুসলিম জনসংখ্যা ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী অধ্যুষিত বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামে নিশ্চয়ই মাদরাসা অত্যাবশ্যক ছিলো। সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের প্রমাণাদি থেকে জানা যায় যে, শাসনকর্তা ও রাজকর্মচারিগণ উচ্চ শিক্ষিত ও সংস্কৃতিসম্পন্ন লোক ছিলেন। পরাগল খান ও তদীয় পুত্র ছটি খান হিন্দু শিক্ষা সংস্কৃতি সম্বন্ধেও আগ্রহ প্রদর্শন করেছেন। তাঁরা তাঁদের দরবারে সাহিত্যসভা করতেন এবং সংস্কৃত ভাষা থেকে মহাভারতের বাংলা অনুবাদে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো।

অধিকন্তু, চট্টগ্রামে বিপুলসংখ্যক পণ্ডিত ও কবিদের আবির্ভাব ঘটে। এ প্রসঙ্গে দৌলত উল্লিব, বাহরাম খান, সৈয়দ সুলতান, মুজাম্মিল, দৌলত কাজী ও আলাওলের নাম বিশেষভাবে স্মরণ করা যেতে পারে। বাংলা ভাষায় রচিত তাঁদের কাব্যগ্রন্থাবলিতে আরবী, ফার্সি সাহিত্য ও ইসলামী বিষয়াদিতে তাঁদের গভীর জ্ঞান প্রতিফলিত হয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যেতে পারে যে, মুসলমান আমলে চট্টগ্রাম শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল ছিলো।

বাঘা

বর্তমানে রাজশাহী জেলার অন্তর্গত বাঘা থানা সদরের বাঘা গ্রামটি মুসলিম শাসনামলে শিক্ষার একটি প্রাণবন্ত কেন্দ্র ছিলো। বাগদাদের অধিবাসী শাহ দাওলার (প্রকৃত নাম শাহ মুয়াজ্জম দানিশমন্দ) বসতি স্থাপন ও সেখানে তাঁর খানকাহ প্রতিষ্ঠার ফলে বাঘা গ্রাম প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে।

৯৩০ হিজরী/১৫২৩-২৪ খ্রিস্টাব্দের তারিখযুক্ত একটি উৎকীর্ণ শিলালিপি অনুসারে, সুলতান নসরত শাহ (১৫১৯-৩১ খ্রি.) বাঘায় একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।০০ বাংলার জনৈক দিওয়ান আবুল হাসানের সেবক ও সঙ্গী আবদুল লতিফ ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে স্থানটি পরিদর্শন করেন। তিনি সেখানে একজন বৃদ্ধ দরবেশকে দেখতে পান- যাকে তিনি ‘হাওদা মিয়া’

(প্রকৃত নাম হামিদ দানিশমন্দ) নামে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “হাওদা মিয়া প্রায় একশত বছরের বৃদ্ধ। তিনি একটি মাদরাসা পরিচালনা করেন; সেখানে তাঁর বংশধর ও শিক্ষার্থীগণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত রয়েছেন। কুঁড়েঘর ও মাটির দেওয়াল-বিশিষ্ট গৃহে মাদরাসাটি পরিচালিত। খানকাহ্ ও মাদরাসার ব্যয় নির্বাহের জন্য হাওদা মিয়াকে গ্রামের চতুষ্পার্শ্বস্থ জমি দান করা হয়েছে।” এতে দেখা যায় যে, বাঘার মাদরাসাটি ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে, আনুমানিক সুলতান নসরত শাহের সময় থেকে চলে আসছিলো। অতঃপর গ্রামটি এত বেশি উন্নত হয় যে, একটি বড় ধরনের মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। সুলতান নাসির উদ্দীন নসরত শাহ মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি কসবা হিসেবে এর প্রশাসনিক গুরুত্ব বৃদ্ধি করেন। উল্লেখ্য, এর গুরুত্ব কেবল খানকাহ ও মাদরাসা থাকার জন্যই বেড়ে গিয়েছিলো। মাদরাসার জ্ঞানান্বেষণকারীদের গভীর অনুরাগ ও সেখানকার শান্তিপূর্ণ জীবনের প্রশংসা করে আবদুল লতিফ আরো লিখেছেন, “এ শান্তিপূর্ণ নিরাপদ স্থানের অধিবাসীরা কত সুখী, কত ভাগ্যবান এই বনভূমির বাসিন্দা; কারণ অন্য লোকদের সঙ্গে এদের কোন সম্বন্ধ নেই কিংবা তাঁদের সঙ্গে অন্য লোকদেরও কোনও কিছু করার নেই। ” বাঘা মাদরাসা এদেশে ইংরেজ আমল পর্যন্ত প্রাচীন পদ্ধতিতেই চালু ছিলো। এডওয়ার্ড এডাম ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলার প্রাচীন শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে রিপোর্ট তৈরির সময় বাঘায় যান এবং মাদরাসা সম্পর্কে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট লেখেন। এডাম তাঁর রিপোর্ট মাদরাসাটিকে বহুদিনের একটি বৃত্তিভোগী প্রতিষ্ঠান বলে উল্লেখ করেন। মাদরাসায় ফার্সি এবং আরবী উভয় ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো। ফার্সি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন নিসার আলী, বয়স প্রায় ষাট বছর। তাঁর মাসিক বেতন ছিলো আট টাকা।

তাছাড়া তিনি থাকা, খাওয়া, ধোপা খরচ, ব্যক্তিগত খরচ মাদরাসা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পেতেন। এবং প্রধান প্রধান ধর্মীয় উৎসবের সময় উপহারাদি পেতেন। আরবী শিক্ষক ছিলেন আবদুল আজীম, বয়স প্রায় পঞ্চাশ। তাঁর মাসিক বেতন ছিলো চল্লিশ টাকা এবং তিনিও ফার্সি শিক্ষকের মত অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পেতেন। ফার্সি বিভাগে ৪৮ জন ছাত্র ছিলো। ছাত্ররা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে থাকা, খাওয়া, পোশাক, ধোপা খরচ এবং কাগজ-কলম ইত্যাদি পেত। ফার্সি বিভাগে ছাত্ররা অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে কোরআন পাঠ এবং পন্দনামা, আমদনামা, গুলিস্তান, বোস্তান, ইউসুফ-জোলেখা, জামি-উল-কওয়ানীন, ইনশা-ই-ইয়ার মুহাম্মদ, সিকান্দরনামা, বাহার দানিশ এবং আবুল ফজল রচিত পুস্তকগুলো পাঠ করতো। আরবী বিভাগে ছাত্র ছিলো মাত্র সাতজন। আরবী বিভাগের ছাত্ররাও ফার্সি বিভাগের ছাত্রদের মত সকল সুযোগ সুবিধা পেতো। আরবী বিভাগের পাঠ্য বই-এর মধ্যে ছিলো মিজান মুনশায়েব, সরফমীর, তসরীফ-ই-মে’ তামেল এবং শরহ-ই-মে’ তামেল।

অতএব বাঘা মাদরাসা একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠান ছিলো। ছাত্র-শিক্ষক সকলে মাদরাসা চত্বরে থাকতো। মনে করা দরকার যে, বাঘা পরিবার দু’বার লাখেরাজ সম্পত্তি লাভ করেন। প্রথমবার দান করেন গৌড়ের জনৈক সুলতান, দ্বিতীয়বার দান করেন যুবরাজ শাহজাহান। এর উদেশ্য ছিলো নিম্নরূপ: (ক) ঐ পরিবারের ভরণ-পোষণ, (খ) জনগণের ধর্মীয় কাজের ব্যবস্থা বা মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং মুসলমানদের ধর্মীয় উপাসনা এবং ধর্মীয় উৎসব পালন, (গ) মুসলিম সুফী-সাধক এবং গরীব-দুঃখীদের আতিথেয়তা এবং (ঘ) মাদরাসার রক্ষণাবেক্ষণ করা। বাঘা পরিবারের বিশাল লাখেরাজ ভূ-সম্পত্তি (২২+৪২টি মৌজা) মদদ-ই-মাআশ (জীবিকার সাহায্য) রূপে পরিচিত ছিলো। ইংরেজ সরকার বাঘার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত না করে বহাল রাখেন।

বাঘার এই প্রসিদ্ধ মাদরাসায় কোরআন, হাদীস ও ফিকাহসহ ইসলামী অভিজ্ঞানের সকল বিষয়ের উপর পাঠদান করা হতো। এখানে ইলমে তাজবীদ ও কোরআন মজীদ হিফজ করারও ব্যবস্থা ছিলো। কেবল বাংলা নয়, বরং বাংলার বাইরের শিক্ষার্থীরা বাঘার মাদরাসায় ইলমে দীনের পাঠ সমাপ্ত করে উচ্চতর শিক্ষার সনদ নিয়ে স্বদেশে ফিরে গিয়ে ইসলামের প্রচার এবং ইলমের চর্চায় নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখতেন। প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামী অভিজ্ঞানে খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব মাওলানা শের আলী এই মাদরাসায় প্রধান মুদাররিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁর পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বাঘাতেই কবরস্থ হন। এছাড়া দু’জন ইরানী শিক্ষকের কবরও সেখানে রয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, দেশ-বিদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষিত পণ্ডিত ব্যক্তিগণ এই মাদরাসায় শিক্ষকতার জন্য আমন্ত্রিত হতেন। শিলালিপি সূত্রে প্রাপ্ত বাংলার মাদরাসাগুলোর পরিচয় নিম্নে তুলে ধরা হলো:

ত্রিবেণী (সাতগাঁ)

শিলালিপি সূত্রে যে সব মাদরাসার কথা জানা যায় তার মধ্যে সাতগাঁয়ের ত্রিবেণীতে (ফিরোজাবাদ নামে পরিচিত) নির্মিত মাদরাসা দু’টি প্রাচীনতম। ৬৯৮ হিজরীতে (১২৯৮ খ্রিস্টাব্দে) সুলতান রুকন উদ্দীন কায়কাউসের শাসনামলে (১২৯১-১৩০১ খ্রিস্টাব্দে) উৎকীর্ণ একটি শিলালিপিতে দেখা যায়, ঐ সময়ে বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের হুগলী জেলার অন্তর্গত ত্রিবেণীতে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ঐ একই স্থানে ৭১৩ হিজরীতে (১৩১৩ খ্রিস্টাব্দে) সুলতান শামস উদ্দীন ফিরোজ শাহের শাসনামলে (১৩০১-১৩৩২ খ্রিস্টাব্দে) উৎকীর্ণ আর একটি শিলালিপিতেও একটি মাদরাসা স্থাপনের কথা উল্লেখ আছে। বর্তমান রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানাধীন সুলতানগঞ্জ স্থানটি রাজশাহী শহর যেতে পশ্চিম দিকে প্রায় ৩২ কিঃ মিঃ দূরত্বে রাজশাহী-নওয়াবগঞ্জ পাকা সড়কের পশ্চিম ধারে অবস্থিত। এই স্থানকে জাহানাবাদ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। বাংলার সুলতানী আমলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিট ছিলো।

সুলতানগঞ্জ একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যা এর ধ্বংসস্তূপ থেকে অনুমান করা যায়। স্থানটি স্থানীয়ভাবে ‘কেল্লা বারুইপাড়া’ নামে পরিচিত। এখানে সুলতান জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ শাহ (রাজা গণেশের পুত্র) কর্তৃক নির্মিত একটি মাদরাসার কথা জানা যায়। এই সুলতানের ৮৩৫ হিজরীর (১৪৩১/৩২ খ্রিস্টাব্দ) সুলতানগঞ্জ শিলালিপিতে একটি মসজিদ নির্মাণের তথ্য পরিবেশিত হয়েছে। কিন্তু শিলালিপির ভাষা দৃষ্টে আধুনিক পণ্ডিত মনে করেন যে, এই মসজিদ সংলগ্ন একটি মাদরাসাও ছিলো এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু এবং শেষ হয়েছিলো আমীর জালাল-উদ্দনিয়া-ওয়াদ্দীন আবুল মুজাফফর মুহাম্মদ শাহ সুলতানের আমলে। তাঁর সাম্রাজ্য দীর্ঘস্থায়ী হোক। এই মহৎ কাজের নির্মাণকারী ছিলেন সুলতানের বিশেষ প্রিয়ভাজন, দশজন পানি সরবরাহকারীদের নেতা মালিক সদরুল মিল্লাত ওয়াদ্দীন। তাঁর আয় বৃদ্ধি হোক। তিনি এই ইমারতের নির্মাণ কাজ ৮৩৫ হিজরীর (১৪৩২ খ্রিস্টাব্দ) জমাদিউল আউয়াল মাসের ৫ তারিখ রবিবারে শুরু করেছিলেন। এখানে যদিও মসজিদ নির্মাণের কথা স্পষ্ট বলা হয়েছে, শিলালিপির ভাষায় মনে হয় যে, মসজিদের সঙ্গে মাদরাসাও সংযুক্ত ছিলো। মসজিদ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতের সঙ্গে সঙ্গে মাদরাসা বা বিদ্যা শিক্ষা সংক্রান্ত মহানবী (স.)-এর হাদীসও উল্লেখ করা হয়েছে। এ শিলালিপিতে আরো দু’টি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত হাদীসে তালিব-উল-ইল্যু বা বিদ্যা শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থ ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে, যার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, মসজিদ সংলগ্ন মাদরাসাখানি আবাসিক প্রতিষ্ঠানরূপে নির্মাণ করা হয়। দ্বিতীয়ত এই প্রতিষ্ঠানকে ‘খয়রাত’ বলা হয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট করে বলা যায় যে, মাদরাসা নির্মাণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়াও জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন রাখা হয়েছে, যাতে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের অর্থানুকূল্যে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও শিক্ষার্থীদের জন্য মাদরাসা গড়ে উঠতে পারে।

দারসবাড়ীর দু’টি মাদরাসা (লক্ষ্মৌতি)

বাংলার মুসলিম বিজয়ের সময় থেকে, গৌড় নামে পরিচিত লক্ষ্মৌতি মুসলিম শিক্ষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে উন্নীত হয়। লক্ষ্মৌতি অঞ্চলে ওমরপুর গ্রামের সন্নিকটে দরসবাড়ী নামক স্থানের আশেপাশের ধ্বংসস্তূপ হতে সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ) মাদরাসা নির্মাণ সম্পর্কিত দু’টি শিলালিপি উদ্ধার করা হয়েছে। শিলালিপি দুটিতে উল্লিখিত মাদরাসার স্থান শনাক্তকরণ সহজসাধ্য নয়। তবে দারসবাড়ী মসজিদের পূর্বপাশে যে ধ্বংসপ্রাপ্ত ইমারতের নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে তাকে একটি প্রকাণ্ড মাদরাসা কমপ্লেক্স হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ‘দারসবাড়ী’ নামের অর্থই পাঠশালা। মাদরাসা নির্মাণ ‘সম্পর্কিত দু’টি শিলালিপির তারিখ যথাক্রমে ৯০৭হিজরী (১৫০২ খ্রিস্টাব্দ) এবং ৯০৯ হিজরী (১৫০৩ খ্রিস্টাব্দ)। ৯০৯ হিজরীর শিলালিপিটি মাদরাসা কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তুপে পাওয়া গেছে এবং সে কারণে ৯০৯ হিজরীর শিলালিপিটি দরসবাড়ী মাদরাসার শিলালিপি হতে পারে।

তৎকালীন শিক্ষক ও আলেমদের প্রতি মর্যাদা

মাদরাসাকে দার-উল-খয়রাত বা বিনা-উল-খয়রাত বলা হতো। কেননা, রাষ্ট্রীয় ভূ-সম্পত্তি মঞ্জুরির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দানশীল লোকেরাও মাদরাসার জন্য এবং বিশেষ করে ছাত্র-শিক্ষকের জন্য ভূমি দান বা অর্থব্যয় করতেন। বিশেষ করে জাফর খানের ত্রিবেণী মাদরাসার শিলালিপিতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এতে বলা হয়েছে যে, কাজী নাসির মুহাম্মদ তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ব্যয় করেন। বাঘাস্থ হাওদা মিয়া মদদ-ই-মাশ হিসেবে প্রচুর ভূ-সম্পত্তি লাভ করেন। কথিত আছে যে, তাঁর বংশধররা ২২টি গ্রাম ওয়াক্ত হিসেবে লাভ করেন, আবার কারো কারো মতে, তাঁরা ৪২টি গ্রাম মদদ-ই-মাশ হিসেবে লাভ করেন। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে এডাম তাঁর শিক্ষা সংক্রান্ত রিপোর্টে বলেন, “কসবা বাঘায় অবস্থিত মাদরাসাটি বহুদিনের একটি বৃত্তিভোগী প্রতিষ্ঠান। প্রতীয়মান হয় সম্পত্তিটার প্রথমত দুটি অংশ ছিলো, যা দুটি পৃথক বছরে একটি সনদে মাদরাসাকে মদদ-ই-মাশ রূপে পূর্ব পদ ও ভূমিদানের স্বীকৃতি দেয়া হয় পৃথক সরকারী মঞ্জুরির দ্বারা প্রদান করা হয়েছিলো। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বের উনিশতম এবং যাকে শাহজাহানের সনদটি দেয়া হয়েছিলো সেই শেখ আবদুল ওহাবকে মাওলানা উপাধি প্রদান করা হয়।” অনুরূপ মহিসুন (চতুর্দশ শতাব্দীতে বারবকাবাদ নামে পরিচিত। মাদরাসাটিতেও প্রচুর ভূ-সম্পত্তি দান করা হয়েছিলো। কোনো কোনো সূত্রে জানা যায় যে, মহিসুনের (স্থানীয়ভাবে মাইগঞ্জ নামে পরিচিত) মসজিদ, মাদরাসা এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২৭৫০ বিঘা লাখেরাজ ভূমি অনুদান হিসেবে মুসলিম শাসন আমল থেকে চলে আসছিলো, এমনকি তা উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত চালু ছিলো। ২ বিটিশ শাসন আমলে ক্রমান্বয়ে তা রদ হয়ে যায়। মহিসুন দরগার বর্তমান সম্পত্তির সামান্যতম অংশ তিনি খাদিমদার সূত্রে এখনও ভোগদখল করে যাচ্ছেন। ব্রিটিশ সরকারের লাখেরাজ বাজেযাপ্তির বিবরণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে মুসলিম শাসন আমলে ধর্মীয় ও শিক্ষাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মপ্রাণ ও বিদ্বান ব্যক্তিদের নামে অসংখ্য নিষ্কর জমির ব্যবস্থা ছিলো। এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট করে বলা যায় যে, মুসলিম শাসন আমলে বাংলার উচ্চতর শিক্ষার মাদরাসাসমূহ পূর্ণ সরকারী অনুদানে পরিচালিত হয়েছে এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যাবতীয় খরচ মুসলিম প্রশাসন বহন করেছে।

সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের দারসবাড়ী মাদরাসার শিলালিপিতে আলেমদের অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, এমন কি আলেমদের আশ্রয়দানকারী এবং আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধাশীলদের আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। মীনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর তবকাত-ই-নাসিরীতে আলিম, শেখ এবং সৈয়দ প্রমুখ আহল-ই-খাইরকে বৃত্তি ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মুসলিম শাসন আমলে, বিশেষ করে দিল্লী এবং বাংলার সুলতানী আমলে আলিম, শেখ এবং সৈয়দ অর্থাৎ আহল-ই-খাইর বা আহল-ই-ফজল-এর লোকেরা অত্যন্ত সম্মানের পাত্র ছিলেন এবং তাঁরা ছিলেন সমাজের উচ্চ স্তরের লোক। তাঁরা আহল-ই-সাদাত বা আহল-ই- কলম নামে ও আহল-ই-কলম-এর সৈয়দগণ টুপি পরতেন, তাঁদেরকে ‘কুলাহদারান’ বলা হতো; আলেমগণ দস্তার বা পাগড়ি পরতেন, তাঁদেরকে বলা হতো ‘দস্তার বন্দান’। সুফীরাও দস্তার পরতেন, কারণ তাঁরাও ছিলেন আলেম: তখনকার দিনে শরীয়তে পারদর্শী না হলে সাধারণত সুফীরা খেলাফতনামা বা ইজাজতনামা দিতেন না। আলেমগণ তখন অত্যন্ত মর্যাদাশীল এবং সম্মানের পাত্র ছিলেন, কারণ তাঁরা ছিলেন আইনের প্রবক্তা। সুলতানগণ বিভিন্ন বিষয়ের সমাধানের জন্য তাঁদের শরণাপন্ন হতেন। সদর, সদর-উস-সুদূর, কাজী, শেখ-উল-ইসলাম, শিক্ষকতা, ইমামত এবং খিতাবতের সমুদয় পদ তাঁরাই অধিকার করতেন। বিভিন্ন শিলালিপিতে আলেমদের যে সম্মান ও মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, তা সারা মুসলমান শাসন আমলে আলেমদের উ মর্যাদা এবং সম্মানের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। শিক্ষক ও আলেমদের প্রতি সে যুগে এক গভীর সামাজিক শ্রদ্ধা প্রবাহিত হতো। আল্লামা জামালউদ্দীন মযী, আবদুল আযীম আরদবীলী প্রমুখ দিল্লীতে আগমনে বাদশাহদের অগাধ সম্মান লাভ করেন। মুহাম্মদ তুঘলকের দরবারে মূল্যবান হাদীস বর্ণনা করলে বাদশাহ স্বয়ং দাঁড়িয়ে সোনার তশতরীতে হাজার হাজার দিনার উপহার দিতেন—যা আজও বিস্ময়ের বিষয়।

তখনকার দিনে শরীয়তে পারদর্শী না হলে সাধারণত সুফীরা খেলাফতনামা বা ইজাজতনামা দিতেন না। আলেমগণ তখন অত্যন্ত মর্যাদাশীল এবং সম্মানের পাত্র ছিলেন, কারণ তাঁরা ছিলেন আইনের প্রবক্তা। সুলতানগণ বিভিন্ন বিষয়ের সমাধানের জন্য তাঁদের শরণাপন্ন হতেন। সদর, সদর-উস-সুদূর, কাজী, শেখ-উল-ইসলাম, শিক্ষকতা, ইমামত এবং খিতাবতের সমুদয় পদ তাঁরাই অধিকার করতেন। বিভিন্ন শিলালিপিতে আলেমদের যে সম্মান ও মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, তা সারা মুসলমান শাসন আমলে আলেমদের উচ্চ মর্যাদা এবং সম্মানের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

কুরআন শিক্ষা

উপমহাদেশে ইসলাম আগমনের পর শিক্ষার প্রথম স্তরই ছিল—কুরআন শিক্ষা। যাঁরা কুরআন শেখাতেন তাঁদের বলা হতো মুক্রী। তাঁদের সম্মান ছিল অত্যুচ্চ। এমনকি হিন্দু দাসও ইসলাম গ্রহণের পর কুরআন পাঠে দক্ষ হয়ে সম্মানিত শিক্ষক হয়ে উঠতেন। বর্ণভেদ, জাতপাতের দেয়াল ইসলামী শিক্ষার সামনে ভেঙে পড়ত। সাত কিরাতের বিশারদ হওয়াও তাঁদের জন্য অসম্ভব ছিল না।

আরবি ও ফারসি ভাষা শিক্ষা

কুরআনের পর শিক্ষার্থীদের ফারসি ভাষায় দীক্ষা দেওয়া হতো, কারণ তখন ফারসি ছিল সরকারী প্রশাসন ও উচ্চশ্রেণীর কথ্যভাষা। সাধারণ মানুষও ফারসি সাহিত্য সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিল—যার উদাহরণ দিল্লীর বাজীকরদের তামাশায় সাদী, হাফিয, আনোয়ারী বা সালমান সাউতীর কিতাব তুলে দেখানোর কথন।

ফারসির পরই শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করতো আরবি শিক্ষার স্তরে। নাহু, সরফ, ফিকহ, উসূলে ফিকহ, মানতিক, কালাম, তাসাউফ—হতো তাঁদের সম্পূর্ণ শিক্ষাক্রমের প্রধান অঙ্গ। বাংলার উসমান সিরাজের দিল্লী যাত্রা—এই আরবি শিক্ষার প্রতি তীব্র অনুরাগের প্রতীক।

ফার্সী ভাষার শিক্ষাবিস্তারের কারণ

মুসলিম শাসনকালে প্রশাসন, আদালত, প্রাথমিক শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই ফার্সী ছিল প্রধান ভাষা। ফলে ফার্সী শেখা তখন সকলের জন্য কার্যত অপরিহার্য হয়ে ওঠে। মুসলমানদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বসুলভ মেলামেশা, রাজদরবারের মুক্ত পরিবেশ—এসব মিলেই হিন্দুরাও দ্রুত ফার্সী আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়। এবং কিছুদিনের মধ্যেই মুসলমানদের সমপর্যায়ে সাহিত্য-ইতিহাস-জীবনী-অভিধান রচনায় অসামান্য কৃতিত্ব দেখায়।

হিন্দু লেখকদের ফার্সী রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

ইতিহাসে: লুবুত তাওয়ারীখ, তারিখে শাহানে হিন্দ, খুলাসাতুল হিন্দ…

জীবনীতে: তাযকিরাতুল উমারা, হাদীকায়ে হিন্দ…

অভিধানে: গাঞ্জেলুগাত, মীর আশরুর…

এ ছাড়াও বহু গ্রন্থের রচয়িতা তাঁরা।

এই সফলতার পেছনে ছিল একমাত্র কারণ—ভাষাভাষীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা ও দৈনন্দিন যোগাযোগ। আর এ কারণেই ভাষাটি অল্প সময়ে সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রথম যুগে হিন্দু শিশুদের জন্য ফারসি অক্ষর শেখা ছিল অত্যন্ত দুরূহ। কারণ আর্যভাষাগুলোর নিয়ম অনুযায়ী লেখার সূত্রপাত হয় বাম দিক থেকে, অথচ ফারসি লিপিতে লিখতে হয় ডান দিক থেকে বাম দিকে। তাদের দীর্ঘদিনের স্বভাববিরোধী এ পরিবর্তন শিশুদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যার উপশমে সম্রাট আকবর এক অভিনব পদ্ধতি প্রবর্তন করেন—প্রথমে শিশুকে একক বর্ণ ও অব্যয় চিহ্নের সঙ্গে পরিচয় করানো হবে; পরে শিখানো হবে ইরাব বা স্বরচিহ্ন; এরপর সংযুক্ত অব্যয়। ধাপে ধাপে ছোট বাক্য থেকে শুরু করে শ্লোক, কবিতার পঙ্‌ক্তি, দীর্ঘ বাক্য ইত্যাদির চর্চার মাধ্যমে তাদের পাঠ ও লেখার দক্ষতা বাড়ানোই ছিল উদ্দেশ্য। আইন-এ-আকবরী গ্রন্থে এই পদ্ধতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা আছে।

এই শিক্ষাপদ্ধতি কতটা ফলপ্রসূ হয়েছিল, তা আকবরের সভাসদ আবুল ফজল সরাসরি উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়, এই ‘স্বর্গোদ্ধত নীতি’র কারণে মক্তবগুলো নতুন প্রাণ পায়, মাদ্রাসাগুলোও হয়ে ওঠে কর্মচঞ্চল। সে সময় ফারসিতে যে বিষয়সমূহ পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল—তা বিস্তৃত ও বিচিত্র: আখলাক (নৈতিকতা), অঙ্ক ও গণনার পদ্ধতি, কৃষিবিদ্যা, নির্মাণ ও প্রকৌশল, নক্ষত্রজ্ঞান, শরীরচর্চা, গার্হস্থ্য ও নগরপরিচালনা, চিকিৎসা, তর্ক, মনোবিজ্ঞান, ব্যায়াম বিদ্যা, ঈশ্বরতত্ত্ব ইত্যাদি।

শিক্ষাকালীন সময়েও শিশুদের নির্দিষ্ট বিরতি বা ছুটি দিত। তবে ছুটির মধ্যেও যাতে তারা শেখা বিষয় ভুলে না যায়, সে জন্য বয়োজ্যেষ্ঠরা ও শিক্ষকরা অবসর সময়ে তাদের সঙ্গে বসে চর্চার পুনরালোচনা করাতেন। ফলে কঠিন পাঠও তাদের স্মৃতির বাইরে চলে যেত না।

উপমহাদেশের জ্ঞানচর্চা ও তার সীমাবদ্ধতা

তৎকালীন সময়ের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত ধর্মীয় রীতিনীতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিল। সেই কারণে হিন্দু ও মুসলমান—দুটি প্রধান সম্প্রদায়ের নিজস্ব আচার, বিশ্বাস ও জীবনপদ্ধতি শিক্ষাব্যবস্থার গঠন ও প্রসারে প্রভাব ফেলে। মুসলমানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল মক্তব ও মাদরাসা, আর হিন্দুদের ক্ষেত্রে তা টোল বা পাঠশালা নামে পরিচিত ছিল।

মুসলমান সমাজে জ্ঞানার্জন শুধু ব্যক্তিগত প্রয়াস নয়, এটি ধর্মীয় কর্তব্য এবং সামাজিক মর্যাদার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হত। ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষা সাধারণত মসজিদ সংলগ্ন মক্তবে শুরু হতো। গ্রামপুলিশ প্রায় প্রত্যেক মসজিদেই এই মক্তব কার্যক্রম চলত। মুসলমান পরিবারের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ প্রায়শই বাধ্যতামূলক ছিল। উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারে সাধারণ রীতি অনুসারে চার বছর, চার মাস ও চার দিনে শিশুদের শিক্ষা শুরু করা হতো। সেই উপলক্ষে বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা—‘বিসমিল্লাহ-খানি’—রাখা হতো, যেখানে শিশুকে কুরআনের কিছু অংশ পাঠ করানো হতো বা অন্তত ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণ শেখানো হতো। অনুষ্ঠানে পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী মিষ্টান্ন বা ভূরিভোজের আয়োজন করা হতো।

মুক্ত মসজিদ বা মক্তবগুলোতে ইমাম শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের ইসলামের মৌলিক নীতি ও আনুষঙ্গিক আচরণ সম্পর্কে পাঠ দিতেন। কেবল ধর্মীয় জ্ঞানই নয়, ওজু, নামাজ এবং সহশিক্ষার প্রথাও এখানে প্রচলিত ছিল। কুরআন, হাদিস ও ফিকাহ—এই তিনটি বিষয়ের মৌলিক জ্ঞান প্রাথমিক শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। শিক্ষার্থীরা মুখস্থ পাঠ ও উচ্চারণের ব্যায়াম করত, যা তাদের দৈনন্দিন নামাজ ও মুনাজাতে প্রয়োজন হতো।

লিখন ও কলার প্রতি আগ্রহী ছাত্রদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ছিল—তাদের ওস্তাদ বা শিক্ষকের কাছে শিক্ষানবিশ হিসেবে প্রেরণ করা হতো। তৎকালীন বাংলার মুসলিম শিক্ষার্থীদের তিনটি ভাষায় পারদর্শী হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল—আরবি, ফারসি ও বাংলা। প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম ধাপে ফারসিতে নাম, পরবর্তীতে আরবি এবং তারপর বাংলা ভাষায় পাঠ্যসূচি চলত। বাংলা, যেহেতু বহু মুসলমানের মাতৃভাষা, তা শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাচ্ছিল, এবং বিদেশী মুসলিম শাসকরাও বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও প্রসারে ভূমিকা রাখছিলেন।

প্রাথমিক শিক্ষার পর শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করত প্রাগ্রসর বা মাধ্যমিক পর্যায়ে। মক্তব প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করলেও, মাদরাসা উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। এই স্তরে পাঠ্যক্রম আরও বিস্তৃত, বিশ্লেষণধর্মী এবং শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি বিকাশে সহায়ক হতো। শিক্ষার এই ধারাবাহিক কাঠামো প্রাচীন বাংলার মুসলিম সমাজকে শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষায় নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ও সমৃদ্ধ করেছিল।

প্রাথমিক শিক্ষার পরে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করত উচ্চতর পর্যায়ে, যা মূলত মাদরাসার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। এই স্তরে শিক্ষার বিষয়বস্তু ধর্মীয় শিক্ষার সীমা ছাড়িয়ে সাধারণ ও লোকায়ত জ্ঞান পর্যন্ত প্রসারিত হতো। কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যামূলক আলোচনা প্রাগ্রসর শিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ ছিল। এর বাইরে যুক্তিবিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র, জ্যামিতি (হান্দাসা), চিকিৎসাশাস্ত্র, আল-কেমি বা প্রাথমিক রসায়ন, জ্যোতিশাস্ত্র, ইতিহাস এবং অন্যান্য বিষয়ও পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত থাকত।

সম্রাট আকবরের দরবারি ঐতিহাসিক আবুল ফজল উল্লেখ করেছেন, “প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই নীতিশাস্ত্র, গণিত, কৃষি, পরিমাপশাস্ত্র, জ্যামিতি, জ্যোতিষশাস্ত্র, চরিত্র নির্ণয়বিদ্যা, উচ্চতর অঙ্কশাস্ত্র, গার্হস্থ্যবিদ্যা, সরকারি আইনকানুন, চিকিৎসাবিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা ইত্যাদি শিখা উচিত; প্রতিটি বিষয় ক্রমে আয়ত্ত করা যেতে পারে।” যদিও আবুল ফজলের বর্ণনা মোঘল আমলের, তবে বাংলার মাদরাসাসমূহেও অনুরূপ বিষয়সমূহ পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে ধারণা করা যায়। তবে শিক্ষার্থীরা বাধ্য ছিলেন না সব বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে; নিজের আগ্রহ অনুযায়ী এক বা একাধিক বিষয়ে অধ্যয়ন করতে পারতেন।

প্রথম শ্রেণির উচ্চতর শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ত্রিবেণী, দরসবাড়ী, হযরতপাড়ুয়া, মহিসুন, বাঘা এবং সোনারগাঁও। শিলালিপি ও লিখিত উৎসের ভিত্তিতে ধারণা করা যায়, এসব মাদরাসা আবাসিক ছিল—শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হতো।

উচ্চতর শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে কখনও কখনও ঐচ্ছিক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হতো। যেমন—তীরচালনা ও যুদ্ধকৌশলবিদ্যা, যা মুহাম্মদ বুদাই রচিত হিদায়াত আর-রামী-এর মাধ্যমে প্রমাণিত। এছাড়া ক্যালিগ্রাফি বা লিপিকলা শিক্ষার অংশ হিসেবেও পড়ানো হতো।

মাদরাসাগুলোর কার্যক্রম চলত বাংলার মুসলিম শাসকদের আর্থিক অনুদান এবং প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়। লিপি ও প্রাসঙ্গিক গ্রন্থে দেখা যায়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নগদ অনুদান বরাদ্দ করা হতো এবং শিক্ষার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা হতো।

বাংলার মাদরাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রমে আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতি ও পাঠ্যতালিকা অনুসৃত হয়েছিল। আরবি ও ফারসি ভাষার ওপর পূর্ণ দখল ছাড়া শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করতে পারত না; তাই এই দুটি ভাষার উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হতো। শিক্ষার্থীদের জন্য ফারসি গ্রন্থ যেমন—পান্দনামাহ, গুলিস্তাঁ, বোস্তাঁ অধ্যয়ন বাধ্যতামূলক ছিল। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বিষয়ও ফারসিতে প্রকাশ করতে শেখানো হতো। এছাড়া সাহিত্যিক কাহিনি যেমন—ইউসুফ-জোলেখা, লাইলি-মজনু, সিকান্দারনামাহ এবং আলেকজান্ডারের বিজয় ইতিহাস পড়ানো হতো।

তবে মুসলিম শাসকরা কখনও বাংলা ভাষার শিক্ষাকে অবহেলা করেননি। বরং অনেকে বাংলা সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহিত করেছিলেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে হুসেন শাহের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সুলতানি যুগে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা তাই একদিকে অবৈতনিক ছিল, অন্যদিকে সকল স্তরের শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত। প্রাথমিক মক্তব থেকে উচ্চতর মাদরাসা পর্যন্ত শিক্ষার জন্য ছাত্রদের কোনো বেতন বা অর্থ প্রদান বাধ্যতামূলক ছিল না। মুসলিম শাসক ও সমৃদ্ধ অভিজাতরা করমুক্ত জমি প্রদান করতেন, যার আয় থেকে মসজিদ, মক্তব, টোল এবং মাদরাসার পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ হতো। শিক্ষার্থীর যোগ্যতা যাচাই এবং সনদ প্রদানের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ওপর ছিল; রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো পরীক্ষা বা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ত না। সুতরাং, শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষকের নির্দেশ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতেই জ্ঞানার্জন করত—এটি শিক্ষার সততা ও গুণমান নিশ্চিত করত।

মাদরাসা স্থাপত্য সাধারণত ধর্মীয় সংকলন বা Religious Complex হিসেবে গড়ে উঠত। এর মধ্যে মসজিদ, মাদরাসা, খানকা, সরাইখানা বা মুসাফিরখানা, মাজার বা মাকবারা অন্তর্ভুক্ত থাকত। মসজিদে ইবাদত, মাদরাসায় পঠন-পাঠন, খানকায় আধ্যাত্মিক সাধনা এবং সরাইখানায় পর্যটক বা শিক্ষার্থী থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত হতো। এসব স্থাপত্য কেবল শিক্ষার কেন্দ্রই নয়, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনচর্চারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হত।

মুসলিম শাসনের আগমনের আগে হিন্দু শিক্ষাব্যবস্থা প্রধানত ব্রাহ্মণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। মুসলিম শাসকগণ এই সীমাবদ্ধতা ভেঙে নিম্নবর্গের হিন্দুদেরও শিক্ষার সুযোগ প্রদান করতেন। শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রদত্ত করমুক্ত জমি শুধু মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যই নয়, হিন্দুদের মাদ্রাসা ও টোলের জন্যও বরাদ্দ করা হতো। যদিও মক্তব বা পাঠশালার জন্য এমন জমি বরাদ্দ থাকত না, তা শিক্ষালাভের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করত না। প্রাথমিক শিক্ষার পর্যায়ে সবাই সমানভাবে সুযোগ পেত এবং পরবর্তী উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইচ্ছুক শিক্ষার্থী টোল বা মাদরাসায় প্রবেশ করতে পারত।

সুলতানি যুগে শিক্ষার এই সমন্বিত ব্যবস্থা সমাজের সকল স্তরের জন্য ছিল উন্মুক্ত। ব্রাহ্মণদের একাধিকাধিপত্য দূর করে শিক্ষার আলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে লাখেরাজ সম্পত্তি দিয়ে অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ধর্মীয় শিক্ষা ও জাগতিক বিদ্যার সমন্বয় শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে প্রতিপাদ্য ছিল—একজন শিক্ষার্থীকে আধ্যাত্মিক ও জাগতিকভাবে সুশিক্ষিত, আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।

বর্তমান কালে আমরা তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা দেখতে পাই। তবে সেই সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ শিক্ষাব্যবস্থা ছিল যুগোপযোগী এবং প্রশংসনীয়। শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া, ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞানের সমন্বয় এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এর বিস্তার—এগুলোই সুলতানি যুগের শিক্ষাব্যবস্থার অনন্য কৃতিত্ব ও বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু, বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান উপমহাদেশে শিক্ষাচর্চার বড় দুর্বলতা ছিল অন্ধ অনুসরণ। পূর্ববর্তী বিদ্বানদের মতামত থেকে বিচ্যুত হওয়া যেন অপরাধ। এই অনুসরণ-নীতির কারণে নতুন পদ্ধতি, নতুন ভাষাশৈলী কিংবা গবেষণার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই উপেক্ষিত হতো।

আল্লামা ফয়জী যখন নোক্তা-বিহীন অক্ষরে সাওয়াতিউল ইলহাম রচনা করেন, তৎকালীন বিদ্বানদের একাংশ এটিকে বিদ‘আত বলে আক্রমণ করেন। উত্তরে ফয়জী যুক্তি দেন—কুরআন ও কালিমাও তো নোক্তা ছাড়া ছিল; তা হলে এগুলোকেও কি বিদ‘আত বলতে হবে?

এই ফয়জী ছিলেন সম্রাট আকবরের নবরত্নদের একজন।

মুসলমান জাতি যখন ইতিহাসের ময়দানে প্রবেশ করে, তাদের হাতে একই সঙ্গে ছিল কুরআনের আলো ও বিজয়ের সামর্থ্য। যে ভূখণ্ডে তারা গিয়েছেন, সেখানে জ্ঞান, সভ্যতা ও নৈতিকতার নবযুগ সূচিত হয়েছে। স্পেন, মাগরিব, মিশর, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো—সব জায়গায় শিক্ষা-দীক্ষা ও সংস্কৃতি নব আভায় উদ্ভাসিত হয়েছে। ইরান জ্ঞানের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে।

সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের যুগে মিশর-ভারত যোগাযোগ স্থাপিত হয়; বলা হয় শুধু দিল্লীতে অন্তত এক হাজার মাদরাসা ছিল—একটি বাদে সবই হানাফি সম্প্রদায়ের। আলমগীর সবচেয়ে বেশি অনুদান দিয়েছেন বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর শিক্ষা-কার্যক্রমে—এটিও এক বিস্ময়।

বাংলায় ইংরেজ শিক্ষানীতির প্রভাব

পলাশীর বিপর্যয়ের পর সিরাজ উদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল পাল্টে যায়। ক্ষমতাচ্যুতির সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের আর্থসামাজিক জীবন, শিক্ষা ও সংস্কৃতির জগৎেও ধীরে ধীরে অবনতি শুরু হয়। শুরু হয় প্রায় দুই শতাব্দীর দীর্ঘ পরাধীনতার ইতিহাস। প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরে ব্রিটিশ শাসন পুরো দেশ দখলে নেয়। এই প্রবন্ধে পরবর্তী ব্রিটিশ আমলের শিক্ষানীতি এবং তার ফলে বাংলার মুসলমানদের ওপর উদ্ভূত প্রভাবের ওপর দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে।

তবে তার আগে সুলতানি (১২০৩–১৫৭৭) ও মুঘলআমলের (১৫৭৭–১৭৫৭) প্রেক্ষাপট স্মরণ করা প্রয়োজন। এই দীর্ঘ পাঁচ শতকের শাসনামলে এখানকার শিক্ষা ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। অভিজাত পরিবারগুলো ঘরে শিক্ষকের ব্যবস্থা রাখত, এবং এমনকি দরিদ্র পরিবারের শিশুরাও সেসব শিক্ষকের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জনের সুযোগ পেত। মুসলমান সমাজে জ্ঞানার্জন ছিল সম্মান, ধর্মীয় কর্তব্য ও সামাজিক উন্নতির একটি ধাপ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও সক্রিয় ছিল—সদর-ই-জাহান নামে বিশেষ এক পদ ছিল, যারা ইমাম, আলেম, কাজি, মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য লাখেরাজ জমি প্রদান ও তত্ত্বাবধান করতেন।

সুলতানি আমলে কুরআন-হাদিসের পাশাপাশি ভূগোল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা পড়ানো হতো। মুঘলআমলে এই পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। মেয়ে শিক্ষারও সুযোগ বাড়ে। আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরী–তে লিখেছেন, একজন শিশুকে নীতি, অঙ্ক, কৃষি, পরিমাপবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতিষ, গার্হস্থ্যবিদ্যা, রাষ্ট্রনীতি, চিকিৎসা, তর্ক, যুক্তি, ইতিহাসসহ অনেক বিষয়ে পারদর্শী হওয়া উচিত। তখনকার শিক্ষার প্রসার এমন ছিল যে ইংরেজ শ্লিম্যান মন্তব্য করেছিলেন—একজন তরুণ মুসলমান অনর্গল সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো, হিপোক্রেটিস, গ্যালেন কিংবা ইবনেে সিনা সম্পর্কে আলোচনা করতে পারে।

পলাশীর পর এই পুরোনো ব্যবস্থার ওপর আঘাত আসে। রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে সাথে আর্থিক ভিত্তিও ভেঙে পড়ে। লাখেরাজ জমি বাজেয়াপ্ত, স্থায়ী বন্দোবস্তের মতো নীতির কারণে বহু মাদ্রাসা-মক্তব বন্ধ হয়ে যায়। জ্ঞানার্জনের যে অর্থনৈতিক অবকাঠামো মুসলমানদের ধরে রেখেছিল, তা এক ধাক্কায় বিলুপ্ত হয়।

ইংরেজদের প্রথম যুগে শিক্ষার প্রতি তেমন মনোযোগ ছিল না। পরে নিজেদের প্রশাসনিক প্রয়োজনেই তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজাতে শুরু করে। ইংরেজি শিক্ষা, কয়েকটি কলেজ স্থাপন, শিক্ষায় ‘ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিওরি’ প্রবর্তন ইত্যাদি পদক্ষেপ নেয়। তবে তাদের নীতি হিন্দু সমাজের জন্য অনেক সুযোগ তৈরি করলেও মুসলমানদের ক্ষেত্রে তা প্রায় উল্টো ফল বয়ে আনে। প্রশাসনিক অবিশ্বাস, রাজনৈতিক সন্দেহ এবং অতীত শাসকগোষ্ঠী হওয়ায় ব্রিটিশরা মুসলমানদেরকে দূরে ঠেলে রাখে।

১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টে শিক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবে অর্থ বরাদ্দ যায় প্রধানত হিন্দু কলেজ ও সংস্কৃত কলেজে। মুসলমানদের জন্য তেমন কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফারসির জায়গায় ইংরেজিকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা (১৮৩৫) মুসলমানদের চাকরির ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। তারা ইংরেজিকে বিদেশি ভাষা বলেই আপত্তি করেনি; তাদের ভয় ছিল—এই শিক্ষার আড়ালে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে।

এই বৈষম্যমূলক নীতির কারণে মুসলমান সমাজ শিক্ষায় দ্রুত পিছিয়ে পড়ে, এবং দীর্ঘসময়ের জন্য তাদের জ্ঞানচর্চা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সমাজজীবনে স্থবিরতা দেখা দেয়।

পরিস্থিতির ক্রমাবনতি দেখে অবশেষে সরকার নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে বাধ্য হয়। তারা ঘোষণা দেয়—ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ক্ষুণ্ণ করার কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই। কিন্তু মুসলমান সমাজ এ ঘোষণায় তাৎক্ষণিক আশ্বস্ত হয়নি। অধ্যাপক মোহাম্মদ আজিজুল হক এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন—মুসলমানদের কাছে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ মানেই ছিল তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপদ্ধতির বদলে এক বিদেশি ব্যবস্থার কাছে নীরব আত্মসমর্পণ। তাঁর মতে, যে শিক্ষাব্যবস্থা এককালে বৈজ্ঞানিক শক্তি ও সাহিত্যিক মর্যাদায় বিশ্বমণ্ডলে সমাদৃত হয়েছিল, সেটিকে অস্বীকার করে নতুন ব্যবস্থার অধীন হওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল না।

১৮৩৭ সালের ডেসপাচের প্রতিক্রিয়ায় সমকালীন ‘মাসিক মুহাম্মদী’ পত্রিকায় লেখা হয়—এই একটি আইনের কলমের আঘাতে মুসলমান সমাজের মেরুদণ্ড এমনভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল যে, তারা আর কখনো পুরোপুরি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।

উক্ত রেজুল্যুশনে সরকারি বৃত্তি ব্যবস্থাও বাতিল করা হয়। এর তীব্র প্রতিবাদে মুসলমানরা কোম্পানি সরকারকে দ্বিতীয়বারের মতো স্মারকলিপি পেশ করেন। মাদ্রাসার অধিকাংশ ছাত্রই দারিদ্র্যসীমায় বাস করত; সরকারি বৃত্তি ছাড়া তাদের শিক্ষাজীবন টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব ছিল। মুসলমানদের দাবির সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও একমত হন। তারাও বৃত্তি বাতিলের বিরোধিতা করে স্মারকলিপি দেন। তবে তারা ইংরেজিকরণ বা ইংরেজিকে সরকারি ভাষা করার প্রশ্নে আপত্তি তোলে না; তারা শুধু চান সংস্কৃত কলেজের পূর্বের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা বহাল থাকুক—কারণ ব্রাহ্মণ্যবাদী ঐতিহ্যে ‘বিশুদ্ধ বাঙালিত্ব’ বলে তারা সংস্কৃত চর্চাকেই মুখ্য মনে করত।

হিন্দু সমাজে দীর্ঘদিন ব্রাহ্মণদের মধ্যেই ধর্মীয় শিক্ষা সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার সূত্রপাত হতেই সেই বৃত্ত ভেঙে হিন্দু সমাজের বৃহত্তর অংশে শিক্ষার প্রসার ঘটে। মুসলমানদের সমাজে এমন কোনো বর্ণগত বাধা ছিল না—সবাই জ্ঞান অর্জনকে ধর্মীয় কর্তব্য মনে করত। আর ফারসি ভাষা ছিল সেই ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান বাহন।

এ সময় সরকার আরেকটি গুরুতর অন্যায় করে বসে—মহসিন ফান্ডের অপব্যবহার। যে তহবিল মুসলমানদের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল, ৭ মার্চ ১৮৩৫ সালের রেজুল্যুশনে তা এমনভাবে বণ্টন করা হয় যাতে সুবিধা ভোগ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। এই ফান্ডের অর্থে ১৮১৭ সালে হুগলি মাদরাসা এবং ১৮৩৬ সালে হুগলি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল—কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুটি এমন এলাকায় স্থাপিত হয় যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা ছিল নগণ্য। পরবর্তীকালে মুসলমান ছাত্রদের বৃত্তির জন্য অতিরিক্ত অর্থ সুপারিশ করলে ড. ওয়াইজ-এর প্রস্তাব ম্যাকলে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে বাতিল করেন। ফলে মহসিন ফান্ড মুসলমানদের প্রকৃত উপকারে আসেনি; বরং উপকৃত হন হিন্দু ছাত্র ও শিক্ষকেরাই।

পরবর্তী সময়ে সরকার আরও কিছু উদ্যোগ নেয় শিক্ষাবিস্তারের লক্ষ্যে। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাতেও নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। ১৮৪৪ সালে প্রত্যেক জেলায় বাংলা স্কুল স্থাপনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাতে বাংলা–বিহার–উড়িষ্যার ৩৬টি জেলায় মোট ১০১টি বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। তবে আগের ক্ষত এখনো সারেনি বলে এসব স্কুলেও মুসলমানরা সংখ্যায় খুবই কম; হিন্দুরাই বেশি উপকৃত হয়।

১৮৫৪ সালের শিক্ষানীতিতে প্রাদেশিক শিক্ষা বিভাগ গঠন, কলকাতা–বোম্বাই–মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়। ওই বছরই হিন্দু কলেজের নাম বদলে ‘প্রেসিডেন্সি কলেজ’ রাখা হয় এবং বহু দশক পর তা সকল সম্প্রদায়ের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

কোম্পানির একশ বছরের শাসনকাল জুড়ে শিক্ষাক্ষেত্রে যে নীতিগুলো বাস্তবায়িত হয়, তার বেশিরভাগই ছিল মুসলমানদের প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বৈষম্যমূলক। তাদের অর্থনৈতিক ভিত ধ্বংস করে দেওয়া হয়, আঘাত করা হয় ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের দ্রুত অবনতি তাই ছিল অনিবার্য ফল।

এডামের রিপোর্টে এই চিত্র আরও স্পষ্ট। ১৮৩৮ সালে মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, বীরভূম, ত্রিহুত ও দক্ষিণ বিহারের আরবি–ফারসি বিদ্যালয়ে হিন্দু ছাত্র ছিল ২,০৯৬ জন, আর মুসলমান ছাত্র ১০,৫৫৮ জন। কিন্তু বাংলা বিদ্যালয়ে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। মুর্শিদাবাদে ৯৯৮ হিন্দুর বিপরীতে মুসলমান মাত্র ৬২ জন; বর্ধমানে ১২,৪০৮ জন হিন্দুর পাশে ৭৬৯ মুসলমান; বীরভূমে ৬,১২৫ হিন্দুর সামনে মাত্র ২৩২ মুসলমান। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়।

১৮৪১ সালে স্কুল–কলেজে মোট ৪,০৩৪ জন ছাত্রের মধ্যে মুসলমান ছিল মাত্র ৭৫১ জন। ১৮৪৬ সালে ৪,৫৩৭ জন ছাত্রের মধ্যে মুসলমান ছিল ৬০৬ জন। ঢাকায় ২৬৩ জন ছাত্রের মধ্যে মুসলমান মাত্র ১৮ জন। ১৮৫০–৫১ সালে ৪,৬৭৪ ছাত্রের মধ্যে মুসলমান ৭৯৬ জন; ঢাকার ৩৮৩ জন ছাত্রের মধ্যে মুসলমান ২৯ জন। ১৮৫৫–৫৬ সালে ৭,২১৬ জন ছাত্রের মধ্যে মুসলমান ৭৩১ জন; ঢাকার ৭৫৫ জন ছাত্রের মধ্যে মাত্র ২৪ জন মুসলমান। এই পরিসংখ্যান একাই মুসলমান সমাজের শিক্ষাবঞ্চনার গভীরতা তুলে ধরে।

মুসলমানদের শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতার পেছনে নানা কারণ কাজ করেছে—ইংরেজ আগমনের আগে তারা ছিল শাসকশ্রেণি; ক্ষমতা হারানোর আঘাত, বিদ্রোহী মনোভাব, ইংরেজদের সন্দেহ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, লাখেরাজ জমির বাজেয়াপ্তকরণ, ওয়াকফের ক্ষতি, বৃত্তির বিলোপ—সব মিলিয়ে তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতির ভিত্তি ধসে পড়ে। আরও বড় কারণ ছিল—ইংরেজ শিক্ষানীতি ধর্মীয় শিক্ষাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে; খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষায় আগ্রহ হারায়। অন্যদিকে হিন্দু সমাজের ভদ্রলোক শ্রেণি ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে দ্রুত অগ্রসর হয়।

অনেকে মুসলমানদের এ পশ্চাৎপদতার দায় পুরোপুরি তাদের ওপর চাপাতে চান এবং ইংরেজি শেখা হারাম এমন ফতোয়াকে তুলে ধরেন। কিন্তু কোন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এসব প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তা তারা বিবেচনায় আনেন না—এভাবে তারা ইংরেজদের প্রকৃত ত্রুটিগুলো আড়াল করতেই সচেষ্ট হন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি প্রয়োগ করে নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিল—হিন্দুদের প্রতি সুবিধা প্রদান এবং মুসলমানদের দুর্বল করে ফেলাই ছিল তাদের প্রধান কৌশল। ঐতিহ্য ভেঙে, অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করে, এবং ধর্মীয় শিক্ষাকে অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করার মাধ্যমে তারা মুসলমান সমাজকে এমন দুরবস্থায় ঠেলে দেয়, যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে তাদের বহু দশক লেগে যায়।

গ্রন্থ সহায়িকা:

১. বাঙলানামা (১ম সংখ্যা) : ইংরেজ শিক্ষানীতি ও বাংলার মুসলিম সমাজে কোম্পানি আমল- আবদুল্লাহ আল মাহমুদ

২. মিহওয়ার (৩য় সংখ্যা) : মুসলিম সভ্যতায় শিক্ষাপদ্ধতি- আল্লামা শিবলী নোমানী (অনুবাদ: নূরুদ্দীন আহমদ)

৩. বাংলাদেশ-পাক-ভারত উপমহাদেশে মুসলিম শাসনামলের শিক্ষা, প্রথম খণ্ড, ১ম সংখ্যা, জানুয়ারী-ডিসেম্বর, ২০০৬, ড. এ. বি. এম. হাবিবুর রহমান চৌধুরী

৪. বাঙলানামা (১ম সংখ্যা) : সুলতানী আমলে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা : প্রাথমিক আলাপ- মিনহাজুল আরেফিন

৫. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস- ড. এম এ রহিম

৬. মিহওয়ার (৮ম সংখ্যা) : সুলতানী আমলে শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস- প্রফেসর ড. আব্দুল করিম

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *