“যখন চীনের সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীরা ৩৮ বছর বয়সী তাহির ইমিনের শরীর থেকে রক্ত নিচ্ছিলেন তখনই তার সন্দেহ হয়। তাকে বলা হয়েছিল, সরকারিভাবে সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু হৃদপিণ্ড কিংবা কিডনিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিবর্তে তার মুখের ছবি ও হাতের আঙুলের ছাপ নেয়া হয়। রেকর্ড করা হয় কণ্ঠস্বর। স্বাস্থ্যপরীক্ষায় যে কণ্ঠ রেকর্ড বা আঙুলের ছাপ নেওয়া হয় না, সেটা তাহির খুব ভালোভাবেই জানতেন।
এরপরও তিনি পরীক্ষার রিপোর্টগুলো দেখতে চান। কিন্তু তাকে রিপোর্ট দেখাতে দেওয়া হয় না। বলা হয়, তার রিপোর্ট দেখার কোনো অধিকার নেই। যদি বেশি কিছু জানার থাকে তাহলে তাকে পুলিশের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। তাহির ইমিন পুলিশের সাথে আর যোগাযোগ করেননি। কেননা ততক্ষণে তিনি বুঝে গেছেন কেন এসকল নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তার এই গল্পটা চীনের আর দশজন উইঘুর মুসলিমের মতোই। ১০ লাখের অধিক মুসলমানকে বন্দিশিবিরে আটকে রেখে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের পর এবার অন্যান্য মুসলিমদের শরীর থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছে চীনের সরকার। কিন্তু তারা এটাকে বলছে স্বাস্থ্যপরীক্ষা। তবে অবাক করা বিষয় হলো চীনের ডিএনএ সংগ্রহের কার্যক্রমে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যারা উইঘুর মুসলিমদের নির্যাতন করার বিপক্ষে কথা বলে থাকে।”
কৈশোরে গল্প-উপন্যাস বা আর্টিকেলের মাধ্যমে নির্যাতিত উইঘুরদের উপর চলমান জুলুম সম্পর্কে কিছুটা জানতাম। তবে, লেখকের কল্পনাও এত নিষ্ঠুর হতে পারে না, শোষকের জুলুম যতটা ভয়াবহ হতে পারে।
পূর্ব তুর্কিস্তানের নির্যাতিত উইঘুর মুসলিমদের প্রতিনিধি একজন ওস্তাদের ক্লাস করার সুযোগ হয়েছে ‘ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট’ -এর শিক্ষার্থী হওয়ার সুবাদে। সম্মানিত ওস্তাদ সালাহউদ্দিন কাশগরী অল্প কথায় তুলে ধরলেন তাদের নিষ্ঠুর বাস্তবতার চিত্র। কীভাবে চীন কর্তৃক তৈরিকৃত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে নারী-পুরুষ-শিশুদের উপর চলছে ভয়াবহ নির্যাতন, ধর্ষণ ও গণহত্যা। কীভাবে সেখানে মানুষের বাক-স্বাধীনতাসহ সব ধরণের স্বাধীনতা সম্পূর্ণরূপে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, এমনকি কোনো ধরণের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ।
ফিলিস্তিনে নির্যাতনের দৃশ্যগুলো আমাদের হৃদয়ে চিরচেনা বেদনাবিন্দুর মতো ধারালো আঘাত করে। প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম ঠেলে আসে রক্ত, আগুন, বিচ্ছেদ আর প্রতিরোধের গল্প। কিন্তু পৃথিবীর আরেক কোণে এমন এক জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের কান্না বহু বছর ধরে একধরনের নীরবতা আর অন্ধকারের নিচে চাপা পড়ে আছে। সেই জনগোষ্ঠীর নাম—উইঘুর। তাদের ওপর চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘন, সাংস্কৃতিক নিধন আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের খবর সচরাচর গণমাধ্যমের আলোয় উঠে আসে না। যেন তারা এক অদৃশ্য জাতি, অথচ তাদেরই ইতিহাসে রয়েছে স্বাধীনতার জন্য ধারাবাহিক সংগ্রাম।
উইঘুররা মধ্য ও পূর্ব এশিয়ায় বসবাসরত একটি তুর্কি বংশোদ্ভূত জাতিগোষ্ঠী। প্রাচীন সিল্ক রোডের ঠিক পাশে, পূর্ব তুর্কিস্তান নামের ভূমিটি ছিল তাদের মাতৃভূমি—সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ, ভাষায় অনন্য, আর ধর্মীয় পরিচয়ে ইসলামপ্রধান। আজ সেই অঞ্চলটিই “জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল” নামে চীনের একটি প্রদেশ। কিন্তু “স্বায়ত্তশাসন” শব্দটি এই অঞ্চলের বাস্তবতায় শুধু শিরোনামমাত্র; বাস্তবে যে স্বাধীনতা, যে নিরাপত্তা, যে মর্যাদা তারা একসময় ভোগ করত, তা বহু আগেই হারিয়ে গেছে।
১৮৮৪ সাল ছিল পূর্ব তুর্কিস্তানের ইতিহাসে এক নির্মম সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘ আট বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শেষে মাঞ্চু রাজবংশ এই অঞ্চলটিকে অধিগ্রহণ করে এবং নতুন নাম দেয়—“জিনজিয়াং”, যার অর্থ “নতুন সীমান্ত ভূমি”। নামকরণটাই বলে দেয়, চীনের চোখে এই অঞ্চল ছিল কেবল একটি দখল করা এলাকা, একটি ভূ-রাজনৈতিক সম্পদ।
তারপরও উইঘুরদের সংগ্রাম থেমে থাকেনি।
১৯১১ সালে মাঞ্চু সাম্রাজ্যের পতনের পর শুরু হয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। আর এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ১৯৩৩ ও ১৯৪৪ সালে দুই দফায় তারা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে—“পূর্ব তুর্কিস্তান রিপাবলিক”। কিন্তু শক্তির চক্রে ছোট জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভাগ্য যে প্রায়ই পরাধীনতার দিকে ধাবিত হয়, তা আবারও প্রমাণিত হয় ১৯৪৯ সালে। চীনের বামপন্থী সেনাদের আগ্রাসনে দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতার পতাকা ছিন্নভিন্ন হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো—উইঘুর মুসলমানদের অবস্থা গাজার চেয়েও করুণ ও মর্মান্তিক। গাজার খবর দুনিয়াবাসী জানে; সেখানে আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রবেশ করতে পারে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরাও খবর প্রচার করতে পারে। ফলে বিশ্ববাসী প্রতিবাদ জানায়, সমর্থন দেয়, ত্রাণ পাঠায়। কিন্তু চীন ১৯৪৯ সালে পূর্ব তুর্কিস্তান দখল করার পর থেকে আমরা সেখানকার প্রকৃত চিত্র আর কতটুকুই বা জানতে পারি? সেই অঞ্চল যেন এক অন্ধকার কারাগার—যেখানে বাইরের কোনো মিডিয়া প্রবেশ করতে পারে না, আবার সেখানকার মানুষও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের স্বাধীনতা পায় না। অথচ প্রতিনিয়ত সেখানে চলছে ভয়াবহ নির্যাতন, গণহত্যা আর নির্মম নিপীড়ন।
যেখানে ১৯৪৯ সালে উইঘুরসহ মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ, ১৯৮০-এর দশকেই তা নেমে আসে ৫৫ শতাংশে। বর্তমান হিসাব মতে মুসলিমদের অনুপাত ৪৬ শতাংশের কাছাকাছি। বাকি জায়গা দখল করে নিয়েছে চীনের সংখ্যাগরিষ্ঠ “হান” জনগোষ্ঠী।
১৯৯০ সালে চীন কর্তৃপক্ষ “বিদ্রোহ দমন”-এর নামে এক ভয়াবহ দাঙ্গা উসকে দেয়। এই দাঙ্গার অজুহাতে হাজারো উইঘুর যুবককে আটক, অত্যাচার ও হত্যা করা হয়।
১৯৯৭ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা গুলজা শহরের রক্তাক্ত অভিযানটি ইতিহাসে “গুলজা গণহত্যা” নামে পরিচিত হয়। চীনা বাহিনী স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষদের উপর নির্বিচার গুলি চালায়; কয়েক শত মানুষ সেদিনই মারা যায়, নিখোঁজ হয় অগণিত।
পূর্ব তুর্কিস্থান প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল ও নানা খনিজ সম্পদে ভরপুর হওয়ায় চীন সরকার কিছুতেই এই শহরটি হাত ছাড়া করতে চায় না। সুদীর্ঘ কাল যাবৎ এই এলাকায় বসবাস করে আসা উইঘুর মুসলিমদের কৌশলে উচ্ছেদ করতে চায় চীন সরকার। উইঘুরদের পৈতৃক সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে সেখানে চীনা হানদের প্রতিষ্টিত করতে সক্রিয় সহায়তা করছে দেশটির প্রশাসন। আর সেজন্য তারা বেছে নিয়েছে কঠোর দমন পীড়নের পথ। তাদের নৈতিকভাবে দুর্বল করে দিতে চীনা সরকার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে উইঘুরদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় অন্যায্য হস্তক্ষেপ করছে। সেখানে ১৮ বছরের নিচে কোনো উইঘুর বালক মসজিদে যেতে পারে না এবং ৫০ বছরের কম বয়সী কেউ প্রকাশ্যে নামাজ পড়তে পারে না। উইঘুরদের রোজা রাখাও সম্পূর্ণ নিষেধ। কেউ রোজা রাখলে তাকে রোজা ভাঙতে বাধ্য করা হয়। সীমিত কিছু ক্ষেত্র ছাড়া সব ক্ষেত্রেই কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোরআন শরীফ শিক্ষা বা শিখানোও এখানে বন্ধ। এখানে নারীদের হিজাব পড়াও নিষিদ্ধ। কোনো হিজাব পড়া নারীকে ট্যাক্সিতে উঠলে চালককে মোটা অংকের জরিমানা করা হয়। হিজাব পড়া নারীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করার ক্ষেত্রেও ডাক্তারদের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মুসলিম সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের টুপি থেকে শুরু করে সব ধরণের ইসলামিক পোশাক এখানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। চীনের কোনো নাগরিক যদি ফ্যাশনের জন্য দাড়ি রাখেন তাতে কোনো সমস্যা নেই কিন্তু কোনো উইঘুর মুসলিম যদি দাড়ি রাখেন তাহলে তাকে ধর্মীয় উগ্রপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বরং তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে হয়। নামাজ, রোজা, কিংবা ইসলামি সংস্কৃতির মৌলিক কোনো আমলও তারা আর করতে পারে না। যদি কেউ সাহস করে তা করে, কিংবা সামান্য সন্দেহের বশেও ধরা পড়ে, তবে তার গন্তব্য হয় ভয়াবহ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। আর সেই ক্যাম্প থেকে কেউ আর স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসে না। এমনকি সেখানে কেউ মৃত্যুবরণ করলেও তার লাশ পরিবারকে ফেরত দেওয়া হয় না। দ্বীনের আলো নিভিয়ে দেওয়ার জন্য যেন একের পর এক নৃশংস পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ওস্তাদ একটি শিউরে ওঠা ঘটনার বর্ণনা করলেন। এক নারীকে কেবল কোরআন শিক্ষা দেওয়ার অপরাধে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, তার পরিবার এবং প্রতিবেশীদেরও সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। (ওস্তাদ নিজে ২০১৩ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত, সেখানেই ছিলেন। বর্তমানে তিনি তুরস্কে অবস্থান করছেন।)
উইঘুরদের মধ্যে চীনা জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে মেকিং ফ্যামিলি নামে একটি ঘৃণ্য ও অভিনব পদ্ধতি চালু করে চীন। এর আওতায় উইঘুর পরিবারগুলোতে প্রতি মাসে কয়েক দিন অতিথি হয়ে থাকেন হান পুরুষরা। এ সময় পরিবারের নারীদের বাধ্য করা হয় এসব চীনা পুরুষদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে। শিক্ষা দেওয়া হয় চীনা জাতীয়তাবাদ ও কমিউনিস্ট আদর্শ।
আলোচনার শুরুতে ওস্তাদ বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের সাথে তার পরিবার এবং উইঘুরদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাথে উইঘুরদের গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। তুর্কিস্তানের কাশগর থেকে অনেক আলেম বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে এসেছেন। যেমন: ঢাকা আলিয়ায় একটি হল আছে মাওলানা আব্দুর রহমান কাশগরীর নামে, যিনি কাশগর থেকে হিজরত করে বাংলাদেশে এসেছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সৈয়দ আমির আলী, নওয়াব আব্দুল লতিফদের মতো ব্যক্তিরা তার ছাত্র ছিলেন।
মূলত, চীনের সর্ব পশ্চিমের এবং সর্ববৃহৎ প্রদেশ জিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের বসবাস। তাদের আদি নিবাস ছিল পূর্ব তুর্কিস্থানে। চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে উইঘুর মুসলিমদের বিরোধের ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। একসময় পূর্ব তুর্কিস্থান স্বাধীন ছিল। কিন্তু ১৯১১ সালে স্বাধীন তুর্কিস্থানে মাঞ্চু সাম্রাজ্যের পতনের পর সেখানে চীনা শাসন চালু হয় এবং এই অঞ্চলকে চীনের জিনজিয়াংয়ের সাথে একীভূত করা হয়। তবে সেটা স্থায়ী করতে চীনাদের বেশ বেগ পেতে হয়। চীনের সৈন্যদের বিপক্ষে উইঘুর মুসলিমরা অস্ত্র তুলে নেয় এবং ১৯৩৩ ও ১৯৪৪ সালে দুইবার তারা স্বাধীনতাও অর্জন করে।
কিন্তু চীন একেবারেই হাল ছেড়ে দেওয়া পাত্র ছিল না। ১৯৪৯ সালে চীনের কমিউনিস্টদের কাছে উইঘুররা আবারো পরাজিত হয় এবং সেখানে স্থায়ীভাবে চীনা শাসন কায়েম হয়। তবে উইঘুর সংখ্যাগরিষ্ঠ জিনজিয়াংকে স্বায়ত্ত্বশাসন প্রদান করে কমিউনিস্টরা। কিন্তু এরপরও চীন সরকার তাদের উপর প্রতিনিয়ত দমন ও নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছে।
ওস্তাদ বলেন, তুর্কিস্তানের মুসলমান বা উইঘুরদের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। চাইনিজদের থেকে উইঘুরদের সংস্কৃতি, রূহ, মূল্যবোধ, দ্বীন—সবকিছু আলাদা। কিন্তু উইঘুরদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুশাসন—সবকিছুই চীন নিষিদ্ধ করেছে। তাদের মোট জনসংখ্যা ২.৫ কোটি, যার মধ্যে ৫–৮ লক্ষ মানুষ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি। তবুও কোনোভাবেই তারা জুলুমের সাথে আপোষ করেনি। প্রতিটি উইঘুর সন্তান চীনের প্রতি প্রবল ঘৃণা নিয়ে বড় হচ্ছে।
চীনের প্রোপাগান্ডা ও মিডিয়া সন্ত্রাস বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করছে। তুর্কিস্তানের কিছু ক্ষুদ্র অঞ্চলকে সাজানো-গোছানো সিনেমার সেট বানিয়ে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করা হয় যেন কিছুই ঘটছে না সেখানে। অথচ বাস্তবে তুর্কিস্তান বিশাল এক জনপদ—যার আয়তন ফ্রান্সের থেকেও বড়। ওস্তাদ কাঁপা কণ্ঠে বললেন—
“আমার নিজের দাদীসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ওইসব কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে মারা গেছেন। আমি জানি সেখানে কী ঘটছে। আমি তেরো বছর ধরে জন্মভূমির বাইরে আছি, কিন্তু একবারও নিজের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। আমাদের একটি কলও আমাদের পরিবারের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবুও আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করছি, সন্তানদের ভাষা-সংস্কৃতি শেখাচ্ছি। আমাদের মাতৃভাষা নিষিদ্ধ হলেও আমরা তা চর্চা করছি। ক্লাসিকগুলো পড়ছি, যাতে রূহ টিকে থাকে। কিন্তু তুর্কিস্তানে এখন আর কোনো আলেম, কোনো জ্ঞান, কোনো সংস্কৃতি অবশিষ্ট নেই; সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। কোনো দেশ বা সংস্থাই আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের শত্রু সবচেয়ে ধুরন্ধর। তাদের কূটচাল সাধারণভাবে কেউ বুঝতেই পারে না। তারা জাতিসংঘের স্থায়ী কমিটির সদস্য; অর্থাৎ তারা আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে। ফিলিস্তিনের যেমন আল কাসসাম ব্রিগেড আছে, উইঘুরদের তেমন নেই। কারণ চীন তুর্কিস্তান দখলের পর সামরিক শক্তি পুরোপুরি কেড়ে নিয়েছে। বিদ্রোহ হয়েছে, কিন্তু প্রতিটি বিদ্রোহই চীন নির্মমভাবে দমন করেছে। তাদের প্রযুক্তি এমনই শক্তিশালী যে, একজন মানুষকে শনাক্ত করতে ছবি বা ডকুমেন্টেরও প্রয়োজন হয় না।”
২০১৬ সালে জিনজিয়াং প্রদেশে ‘Physicals For All’ নামে একটি স্বাস্থ্য ক্যাম্পেইন চালু করে চীন সরকার। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের মতে উইঘুরদের বারবার স্বাস্থ্যপরীক্ষার নামে তাদের ডিএনএ নমুনা, চোখের আইরিশের ছবি এবং অন্যান্য তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয়েছে। যাতে করে একজন মুসলমানও বাদ না পড়ে। চীনে উইঘুরদের এমন নির্যাতন ও ডিএনএ সংগ্রহের উদ্দেশ্য হলো তাদের উপর নজরদারি চালানো এবং ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি অনুগত করে তোলা। ডিএনএর নমুনার মাধ্যমে একজন উইঘুর মুসলিমকে খুব সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। ফলে উইঘুরদের পক্ষে আন্দোলন করা সম্ভব না। কেননা আন্দোলনে নামলে খুব সহজে সরকার তাকে চিহ্নিত করতে পারবে।
চীনের উইঘুর মুসলিমদের ডিএনএ সংগ্রহে কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ দিয়ে সহায়তা করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়ন চললেও এই বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো মতভেদ দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিএনএ সংগ্রহের সকল যন্ত্রপাতি কেনার পাশাপাশি সেখানকার বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীও নিয়োগ দিয়েছে চীন সরকার। মূলত আমেরিকার দুইটি প্রতিষ্ঠান চীনকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এদের একটি হলো ম্যাসাচুসেটসের ‘থার্মো ফিশার’, আর অন্যটি হলো সান ডিয়েগোর ‘ইলুমিনা’। চীন তাদের ডিএনএ গবেষণার কাজে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে। সিসিআইডি কনসাল্টিং নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য মতে, চীনে ডিএনএ সামগ্রীর বাজার প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে যেটা দ্বিগুণ হতে পারে। আর চীনের বিশাল এই বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে থার্মো ফিশার ও ইলুমিনা।
ল্যাবের যন্ত্রপাতি, ডিএনএ পরীক্ষার কিট থেকে শুরু করে ডিএনএ ম্যাপিং প্রযুক্তি, সবই যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই কোম্পানি থেকে আমদানি করছে চীন। আর এর মাধ্যমে বিপুল অর্থ আয় করছে থার্মো ফিশার ও ইলুমিনা। ২০১৭ সালে মোট ২০.৯ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে থার্মোফিশার, যার ১০ ভাগই এসেছে চীন থেকে। তাদের প্রায় ৫,০০০ কর্মী বর্তমানে চীনে নিয়োজিত রয়েছে। যারা প্রত্যক্ষভাবে চীনকে সহায়তা করে যাচ্ছে। এর ফলে তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা হচ্ছে কিন্তু সেটা খুবই স্বল্প পরিসরে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন—“উম্মত হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা হলো আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারি না। আশপাশের মধ্য এশিয়ার দেশগুলো, পাকিস্তান, এমনকি তুরস্কও চীনকে ভালো করেই জানে। কিন্তু দিনশেষে সবাই অর্থনৈতিকভাবে চীনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে।”
চীনের শক্তির মূল রহস্য তাদের অর্থনীতি। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে—চায়না পণ্য বয়কট।
চীনের শক্তিমত্তার কথা উল্লেখ করে ওস্তাদ বললেন—
“তবে আমরা বিশ্বাস করি, চীন যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহ তার চেয়েও বড়। জালিমরা ধ্বংস হবেই। বেলুন ফুলতে ফুলতে যেমন এক সময় ফেটে যায়, চীনও একদিন ভেতর থেকে ধ্বংস হয়ে যাবে।”
তিনি আরও বললেন—“যেহেতু আমরা মুসলিম, তাই আমরা হতাশ হই না। আমরা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকি। কারণ, আমরা আমাদের সবকিছু আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেছি। মুসলিম না হলে এই নির্যাতনের মুখে পূর্ব তুর্কিস্তানের প্রত্যেকটা মানুষ আত্মহত্যা করত। কিন্তু আমরা ঈমানের শক্তিতে টিকে আছি। আমাদের মধ্যে আল্লাহ, রাসুল ও ঈমানের মৌলিক বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের সাথে পূর্বপুরুষদের দোয়া আছে। যারা আমাদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে তারা কাফের, আর আমরা ঈমানের কারণে আজও টিকে আছি।”
পুরো ক্লাসজুড়ে আমার ভেতরে তীব্র অসহায়ত্ব আর হতাশা জমা হচ্ছিল। কোথায় চীন—প্রযুক্তি, অর্থনীতি, ক্ষমতার দিক থেকে শীর্ষে; আর কোথায় আমাদের অসহায় উইঘুর ভাই-বোনেরা! কিন্তু তখনই মনে হলো, তাদের ঈমানি শক্তি আসলেই কতটা প্রবল।
একদিন তাদের এই ঈমানি শক্তির সামনেই চীনের সমস্ত পরাক্রম ধসে পড়বে, ইনশাআল্লাহ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—জুলুম কখনো চিরস্থায়ী হয় না। পৃথিবীর কোনো ক্ষমতা, যশ, প্রতিপত্তিও চিরস্থায়ী নয়। এজন্য আমাদের নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। আমরা কি নির্যাতিত উইঘুরদের সাথে থাকব, নাকি জুলুমকে পুঁজি করে অহংকারে দাঁড়িয়ে থাকা চীনের সাথে???
আল্লাহর কাছে অফুরন্ত শুকরিয়া, তিনি আমাকে ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে এমন একটি ক্লাস করার তাওফিক দিয়েছেন। একজন উইঘুর মুসলিম ওস্তাদের নিকট থেকে সেখানকার বাস্তবতা শোনার সুযোগ দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ, এই অভিজ্ঞতা আমার হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে, চিন্তাকে নতুনভাবে জাগ্রত করেছে।
ইনশাআল্লাহ, একদিন নিপীড়িত সকল মুসলিম মুক্তি পাবে—এটাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
