ইসলামী সভ্যতায় শহরের দৃষ্টিভঙ্গি

চিন্তা ও দর্শন

শহর বললে আজ আমাদের চোখে ভেসে ওঠে উঁচু উঁচু দালানকোঠা, ব্যস্ত রাস্তাঘাট, শিল্পকারখানা—সব মিলিয়ে এক ঝলমলে, ব্যস্ত দুনিয়া। যেখানে সবাই ছুটছে নিজ নিজ গন্তব্যে; এই ছুটে চলার যেন কোনো শেষ নেই। কিন্তু আমরা কি কখনো থেমে ভেবেছি—শহর আসলে কী? কেন তাকে শহর বলা হয়? আমাদের ব্যবহৃত ‘শহর’ শব্দটির উৎস কী, অর্থ কী, আর অন্যান্য সভ্যতা—বিশেষ করে ইসলামী সভ্যতা—শহরকে কেমনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে?

ইংরেজির City শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা ‘শহর’ ব্যবহার করি। কিন্তু শব্দ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থের পরিধি ও গভীরতাও বদলে যেতে থাকে। এই কারণে ইসলামী সভ্যতায় শহর বোঝাতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

এর মধ্যে একটি শব্দ—‘শহর’, যা এসেছে ‘মাশহূর’ থেকে। মাশহূর শব্দের অর্থ ‘প্রসিদ্ধ’। কোথাও বলা হয়, এটি এসেছে তাশহীর মূলশব্দ থেকে, যা যাযাবরদের জীবনব্যবস্থা বুঝাতে ব্যবহৃত হতো।

তবে ইসলামী ঐতিহ্যে শহর বোঝাতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে—মদিনা। ‘মদিনা’ শব্দটি এসেছে দা’ইম (বা দাইয়ানাহ) শব্দ থেকে, যার প্রাথমিক অর্থ ছিল ‘লেনদেন’ বা ‘কেনাবেচা’। অর্থাৎ, প্রথমে এটি অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীতে মদিনা হয়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতার পরিভাষা।

মদিনা আর কেবল একটি নগরীর নাম থাকে না; বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয় আদব, আখলাক, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, ন্যায়বোধ ও সৌজন্যতাবোধ—অসংখ্য নৈতিক ও মানবিক মূল্য।

এদিক থেকে বর্তমান বিশ্বের City—আমরা যাকে আজ শহর বলি—সে অর্থে এতটা বিস্তৃত কিংবা সামগ্রিক নয়। কারণ ইসলামী সভ্যতার ‘শহর’ মানুষকে কেন্দ্র করে এবং মূল্যবোধের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। বিপরীতে আধুনিক ‘সিটি’—ছোট হোক বা বড়, মেট্রোপলিটন হোক বা উপশহর—মূলত একটি আইন ও প্রশাসননির্ভর কাঠামো, মানুষের নৈতিক কল্যাণকে কেন্দ্র করে গড়া নয়।

আজকের দুনিয়ার “সিটি”:

এই সিটিগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দুটো জিনিসের ভিত্তিতে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেখলে এগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এডমিনিস্ট্রেশন বা অর্গানাইজেশনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং অন্যদিকে এগুলো law & rules অর্থাৎ আইন-কানুনের ভিত্তিতে পরিচালিত। আইন-কানুনের সাথে মূল্যবোধের একটি বড় তফাৎ আছে। যেই শহর মূল্যবোধের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় সেই শহরে আইন-কানুন থাকে না, এমন নয়। কিন্তু সেই শহরের ভিত্তি থাকে মূল্যবোধ। আর এখনকার যে সিটি সেই সিটির ভিত্তিটা থাকে আইন-কানুন। আইন-কানুন এমন অনেক কিছুকে সঠিক করে ফেলতে পারে মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে যেগুলো ভুল হতে পারে। যেমন: এখনকার দিনে বাসা বাড়িগুলোতে যেসব গ্লাস ব্যবহার করা হয়, এমন অনেক কাঁচ আছে যা তাপ নিঃসরণ করে। এখন সিটি কর্পোরেশনের আইন অনুযায়ী এই কাঁচগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু আমরা যদি মূল্যবোধের জায়গা থেকে চিন্তা করি তাহলে এটি সঠিক না। কারণ এটির কারণে আবহাওয়া ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পশুপাখি ও কীট পতঙ্গের জীবন বিপদাপন্ন হচ্ছে। একইভাবে ভবন নির্মাণের যে বিষয়টা, আমাদের বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন ধরনের রুলস রেগুলেশন আছে বসতবাড়ি নির্মাণের। সিটি কর্পোরেশনের নিয়ম মেনে আমরা ২০ তলা বা ৫০ তলা বাড়ি বানাবো কিন্তু সেই বাড়িটি যে উচ্চতায় পৌঁছে গেল তা পাখির জন্য বা পোকামাকড়ের জন্য হুমকির কারণ হয়ে গেল। তারপর দেখা যায় এমন জায়গায় ইন্ডাস্ট্রি নির্মাণ করলাম সিটি কর্পোরেশন পারমিশন দিয়েছে, কিন্তু এটি থেকে যে বর্জ্য নিঃসরণ হলো বা গ্যাস নিঃসরণ হল তা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। দেখা যাচ্ছে, আমি এমন একটি জায়গায় পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করলাম আমার আশেপাশের বন ও পশুপাখি ধ্বংস হয়ে গেলো। আইন করে এটাকে সঠিক করাই যায় কিন্তু মূল্যবোধ এটাকে সমর্থন করেনা।  আরেকটা বিষয়, আমাদের বাসাবাড়িগুলোতে আজকাল জানালায় যে  কাঁচগুলো ব্যবহৃত হয়, এগুলোতে রাতের বেলা যখন সূর্যের আলো থাকে না, কিন্তু বাসার ভেতর লাইট জ্বলে তখন বাইরে থেকে ভিতরে পরিস্কার দেখা যায়। সবচেয়ে বাজে বিষয় যেটি সেটি হচ্ছে যে আমাদের ওয়াশরুমগুলোতেও এই কাঁচগুলোই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এই জিনিসটা মানুষের প্রাইভেসিকে মারাত্মক ভাবে নষ্ট করছে। কিন্তু আমরা অহরহ ব্যবহার করছি। এগুলো হচ্ছে একটি শহর বা সভ্যতার মূল্যবোধের ঘাটতির জায়গা।

এই জায়গা থেকে ইসলামী সভ্যতা বা শহরের সাথে বর্তমান যে আধুনিক সিটি, এই সিটির একটি বড় তফাৎ আছে।

মানুষ সম্পর্কে বিভিন্ন সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি:

একটি শহরের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে—তার মূল্যবোধ, তার নীতি, তার গঠনতন্ত্র—এসব শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সেই শহর যে সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত, সেই সভ্যতার মানুষ–সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কারণ যেমন একজন মানুষের দুটি দিক আছে—বাহ্যিক ও আত্মিক (রূহানী), তেমনি একটি শহরেরও থাকে দুটি রূপ—দেহগত ও রূহগত। রূহসম্পন্ন মানুষ যেমন রূহসম্পন্ন শহর গড়ে তোলে, তেমনি রূহসম্পন্ন শহরও রূহসম্পন্ন মানুষকে লালন করে। মানুষের আত্মিকতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শহরের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়—এ দু’টি গভীরভাবে পরস্পর-সম্পর্কিত।

সেই কারণে কোনো সভ্যতার শহর সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে—সেই সভ্যতা মানুষকে কী দৃষ্টিতে দেখে। মানুষ সম্পর্কে তাদের মৌলিক ধারণাই শহর-দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করে।

খ্রিস্টান সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি : আদি পাপের ধারণা

খ্রিস্টধর্মে মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা বিদ্যমান, তা হল ‘আদি পাপ’ (Original Sin)। এই বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষ জন্মগতভাবে পাপী। তাই তার জীবনের মূল সাধনা হলো পাপমুক্তির প্রচেষ্টা—নিজেকে মুক্ত করা, নিস্তার লাভ করা। ফলে এই পৃথিবীতে নতুন কিছু নির্মাণ কিংবা ইতিবাচক ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তা এখানে ততটা গুরুত্ব পায় না; জীবনকে মূলত মুক্তির যাত্রা হিসেবেই দেখা হয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজ ও সভ্যতা গঠনের চেয়ে ব্যক্তিগত মুক্তিকে বেশি কেন্দ্র করে।

ইহুদি সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি : শ্রেষ্ঠত্ববোধ ও প্রমিসড ল্যান্ড

ইহুদিদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি—একটি নির্বাচিত সম্প্রদায়। তাদের রয়েছে প্রমিসড ল্যান্ড–এর প্রতিশ্রুতি। এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ তাদেরকে নিজেদের গণ্ডির ভেতরে আবদ্ধ রাখে।

এই মানসিক কাঠামোতে সমগ্র মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা তাদের দৃষ্টিভঙ্গির অন্তর্ভুক্ত নয়, কারণ তাদের কার্যপরিধি প্রধানত নিজেদের জাতি ও প্রতিশ্রুত ভূমিকে ঘিরে সীমাবদ্ধ।

হিন্দু সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি

হিন্দুধর্মে জীবনের একটি মৌলিক ধারণা হলো—মানুষ পৃথিবীতে এসেছে দুঃখ ভোগ করতে। এই জীবনের কষ্ট পেরিয়ে পরবর্তী জন্মে ভালো অবস্থানে পৌঁছানো যাবে—এমন বিশ্বাস থেকেই পুনর্জন্মের ধারণা দৃঢ়।

ফলে পৃথিবীকে সুন্দর করার প্রচেষ্টা বা মানবসভ্যতা গড়ে তোলার প্রেরণা এই দৃষ্টিভঙ্গিতে অতটা উপস্থিত নয়।

আরেকটি বড় দিক হলো কঠোর শ্রেণীবিভাজন—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। শ্রেণিভেদ এতটাই প্রবল যে নিম্নবর্ণের মানুষকে মানুষের মর্যাদাও দেওয়া হয় না; অচ্ছুত, অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত। এমনকি অতীতে নিম্নবর্ণের মানুষ যদি ব্রাহ্মণের বাড়ির সামনে দিয়ে হাঁটত, তাহলে গোবরজল ছিটিয়ে ‘পবিত্র’ করার রেওয়াজ ছিল—আজও কিছু অঞ্চলে তার অবশিষ্ট দেখা যায়।

এ ধরনের কাঠামো মানবিক ঐক্য বা ন্যায়ভিত্তিক শহর–সভ্যতা গঠনে সহায়ক নয়।

বৌদ্ধ সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি :

বৌদ্ধধর্মের অন্যতম লক্ষ্য নির্বাণ—অর্থাৎ সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধ্যানে একাগ্র হওয়া। এখানে সমাজের সঙ্গে সক্রিয় সম্পৃক্ততার চেয়ে ব্যক্তিগত মুক্তি ও ধ্যানকে কেন্দ্র করা হয়। ফলে এই ধারণা সমাজ, সভ্যতা বা রাষ্ট্র নির্মাণের প্রেরণাকে উৎসাহিত করে না।

গ্রীক সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি :

প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা ছিল দেবতাকেন্দ্রিক কিন্তু প্রকৃতিতে ছিল বস্তুবাদী। মানবজীবনের উদ্দেশ্য ও সাধনা ছিল মূলত ভোগ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য ও বস্তুনির্ভর উৎকর্ষের উপর। ফলে সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পৃথিবীমুখী আগ্রহ, রূহ বা আত্মিকতা নয়।

তার বিপরীতে আমরা যদি ইসলামী সভ্যতার দিকে তাকাই, ইসলাম মানুষকে জন্মগতভাবে নিষ্পাপ হিসেবে দেখে থাকে।  ইসলামে আদি পাপ বলে কোন ধারণা নাই। এখানে প্রত্যেকটা মানুষ জন্মগতভাবে নিষ্পাপ। তাছাড়া এটি মানুষকে বস্তুবাদী ধ্যান,ধারণার দিকে ধাবিত করে না। মানুষের রূহ এবং আধ্যাত্মিকতাকে স্বীকার করে। এটি মানুষের আকল কে স্বীকার করে। এটি মানুষের জীবনকে দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে না, বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতে না, বরং দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে দেখে। এই দায়িত্ববোধের সম্পর্ক আবার আমানতের ভিত্তিতে। এই দায়িত্ববোধের সাথে সৃষ্টিশীলতার সম্পর্ক রয়েছে, গড়ার সম্পর্ক আছে। এখানে যেহেতু সবকিছু, ইহজাগতিক না, ফলে এখানে মূল্যবোধের একটি বিষয় আছে। তারপর আরেকটি বিষয় হচ্ছে এটি মানুষকে একত্রিত করতে বা সংঘবদ্ধ করতে চায়। আমরা যদি ইসলামের বিধান গুলো দেখি, চাইলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নামাজকে ঘরে পড়ার বিধান দিতে পারতেন। কিন্তু সেটি না দিয়ে নামাজ এর জন্য মসজিদে যাওয়ার প্রতি বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কারণ এটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। একত্রিত হওয়া, মানুষের মধ্যে একটি সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার মাধ্যম। যাকাতের বিধান হচ্ছে, এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের যা কিছু আছে এর চূড়ান্ত মালিক আমরা না বা এর আমরা একক অধিকারী না এবং যাকাতকে বলে দেয়া হয়েছে অন্যের হক। এটি কিন্তু এভাবে বলা হয়নি দিলে তোমার সওয়াব হবে। তুমি চাইলে দিতে পারো এরকম কিন্তু বলা হয়নি। বলা হয়েছে এটি অন্যদের হক। তারপর হজের বিষয়। হজের মাধ্যমে গোটা মুসলিম উম্মাহ একত্রিত হয়। এছাড়া রমজান মাসে সেহরি, ইফতার । রোজা রাখতে আল্লাহ এমনিতেই বলতে পারতেন। সেহেরী, ইফতারের মতো সাংস্কৃতিক বিষয় গুলোতে জোর না দিলেও পারতেন। কিন্তু এগুলোর প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। যাতে মানুষ একত্রিত হয় একে অন্যের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে। একটি শক্তিশালী বন্ধন ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে সভ্যতা এগিয়ে যায় । যেহেতু এই পৃথিবীতে সব কিছুকে আমাদের  মাধ্যমে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। যার ফলে ইসলাম মানুষকে এভাবে ট্রেইন আপ করে। শুধুমাত্র নিজের জন্য বেঁচে থাকার মানুষের জন্ম হয়নি। প্রতিবেশীর হক, আত্মীয়-স্বজনের হক , দরিদ্রদের হক এসব বিষয় আল্লাহর রাসুল যে পরিমাণ কঠোর হুঁশিয়ারি করেছেন। এ পরিমাণ কঠোর ভাষা, এমনকি ইবাদতের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেননি। এই জায়গা থেকে ইসলাম মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, একত্রিত হওয়ার পারস্পারিক সম্পর্কের যে বিষয়টি তাতে বারবার তাগিদ দেয়। প্রফেসর নাজমুদ্দিন এবারকানের একটি সুন্দর কথা আছে। উনি বলেছিলেন যে, “আমাদের কেউ তার নিজের জন্য বাচবে না, প্রত্যেককে বাঁচবে তার নিজের ভাইয়ের জন্য। এভাবে যখন প্রতিটি মানুষই তার অপর ভাইয়ের জন্য বেঁচে থাকবে, তখন আমরা সবাই বেঁচে থাকবো।” এটি আসলে মানুষের সমাজ সভ্যতার বাস্তবতা খুব সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করে। অন্যান্য সভ্যতা মানুষকে একতাবদ্ধ হওয়ার দিকে ধাবিত করে না। তারপরও অন্যরা একতাবদ্ধ হয়েই জীবন যাপন করে। তাহলে এ বিষয়টা কোথা থেকে এলো। এই জায়গা থেকে পাশ্চাত্য সভ্যতা মানুষের এই একতাবদ্ধ হওয়ার বিষয়টিকে মানুষের স্বভাবগত বা ফিতরাত মনে করে না। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা মনে করে যে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা এটি মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে করে, বাধ্য হয়ে করে। এটি তার ফিতরাতগত বিষয় না। সেই জায়গা থেকে তাদের দুইটি মৌলিক বিষয় আছে।

অন্যদিকে ইসলামী সভ্যতা মনে করে থাকে যে মানুষ যে একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস করে এটি তার ফিতরাতি বৈশিষ্ট্য। তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করার জন্য। আল ফারাবির মতে, “মানুষ সৃষ্টিগতভাবে সভ্য।”

পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য একে অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে, একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে টিকে থাকার জন্য, সমাজ সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এক্ষেত্রে আখলাকী মানদন্ড যেটি দেওয়া হয়েছে। নিজের ভাইকে নিজের উপরে অর্থাৎ নিজের চাইতে অন্যকে বেশি প্রায়োরিটি দিবো। এই আখলাককে ধরা হয়েছে আখলাকের সর্বোচ্চ মানদন্ড। আর সাধারণ আখলাক বলা হয়েছে আমি যা পরবো, আমি যা করব, আমি নিজের জন্য যেটি চাইবো, আমার অপর ভাইয়ের জন্যও সেটি চাইবো।

আজকের পাশ্চাত্য মনে করে যে, মূলগতভাবে মানুষের সাথে পশুর কোন পার্থক্য নেই। পশুদের যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য আছে, মানুষের বৈশিষ্ট্য সেগুলোই। পরবর্তীতে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের এই অবস্থায় এসেছে। যেহেতু মানুষ পশুদের মতই ছিল পশুদের যেমন জীবন-যাপন,খাওয়া এবং বংশ রক্ষা করা। মানুষের জীবন আগে সেরকমই ছিল। মানুষও পশুদের মতো হিংস্র ছিল এবং পরস্পরকে একে অপরকে হিংসা করত। মানুষের স্বভাব ছিল যুদ্ধ করা। যুদ্ধটাই হচ্ছে মানুষের ন্যাচারের মধ্যে ছিল। পরবর্তীতে মানুষ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রয়োজনের তাগিদে এ অবস্থায় এসেছে সমাজবদ্ধ প্রাণী হয়েছে। আবার তাদের মধ্যে কোন কোন দার্শনিকরা এমনও মনে করে থাকেন যে এই বিবর্তনটা হয়ে আরও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আগে তো মানুষ হিংস্র ছিল তবুও একটি সিস্টেম ছিল। এখন মানুষ শুধু বিশৃঙ্খলা করে। এটাও তাদের অনেক দার্শনিকরা বলে থাকেন। “ম্যানডেভিলের ফেবল অব দ্য বিজ” উপন্যাসটিতেও আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গিটি দেখতে পাই। যদিও তাদের দার্শনিকদের মধ্যে আবার অ্যারিস্টটল মানুষকে রাজনৈতিক প্রাণী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পরবর্তীতে এনলাইটেনমেন্ট-এর যে দার্শনিকরা ছিল, যেমন কান্ট রাজনীতির সাথে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করেছে। এই চিন্তাটা মোটামুটি মানুষকে জ্ঞানের দিকে ধাবিত করে। যদিও সেই জ্ঞান ও চিন্তা ইসলামী সভ্যতার চিন্তানুযায়ী অনেক বেশি সংকীর্ণ। ইসলামী সভ্যতার দাবি হচ্ছে মানুষ ফিতরাতের মাধ্যমে সভ্যতা গড়ে তুলবে, শহর গড়ে তুলবে।

এরপর আসে মূল্যবোধের বিষয়। মূল্যবোধের জায়গা থেকে মুসলমানদের জন্য মূল্যবোধের সর্বোচ্চ চূড়া আসমাউল হুসনা। আসমাউল হুসনা কি আমরা সবাই জানি। আসমাউল হুসনায় উপনীত হওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু সেটা হচ্ছে আমাদের মূল্যবোধের মানদন্ড। সে জায়গা থেকে ইসলাম মানুষকে একটি সুউচ্চ মূল্যবোধের দিকে ধাবিত করে। যেটি আর কোন সভ্যতায় নেই।

শহর, সভ্যতা ও রাষ্ট্র:

ইতোপূর্বে আমরা মানুষের একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস করা নিয়ে কথা বলেছি। একজন মানুষ থেকে একটি মানবতা হয়ে ওঠা; এই যে হয়ে ওঠার যে জার্নিটা এর মধ্যে কিছু বিষয় আছে। যেমন মানুষ শহর গড়ে তোলে, শহর থেকে একসময় রাষ্ট্র হয়, রাষ্ট্র থেকে সভ্যতা হয়। এরপর সেই সভ্যতা কিছু প্রস্তাবনা হাজির করে। এভাবে যখন একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সেই সভ্যতা ও নতুন নতুন শহর গড়ে তোলে। আমরা যদি দেখি যে, শহরকে কেন্দ্র করে সভ্যতা হয়েছে। যেমন ইসলামী সভ্যতার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম মদিনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাকে কেন্দ্র করে ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এথেন্স শহরকে কেন্দ্র করে গ্রীক সভ্যতা হয়েছে। রোমকে কেন্দ্র করে রোমান সভ্যতা হয়েছে। এভাবে কিছু শহর রয়েছে যা সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। আবার অধিকাংশ শহর সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা এখন প্রথমে এমন একটি শহরের কথা বলব যে শহর ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছে। সে শহরটা হচ্ছে মদিনা।

মদিনাকে বলা হয় সিটি স্টেট। কারন মদিনা শহর প্রথমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এই শহরকে কেন্দ্র করে সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা যদি দেখি আজকের  পাশ্চাত্য সভ্যতা প্রতিষ্ঠার পেছনে অনেকগুলো চুক্তি ছিল, চিন্তা ছিল, সংবিধান ছিল। তেমনিভাবে মদিনাকে  কেন্দ্র করে যে সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই সভ্যতার জন্য কি ধরনের চুক্তি ছিল?

আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতা যে সমস্ত চুক্তির ভিত্তিতে হয়েছে:

  • ম্যাগনাকার্টা, ১২১৫
  • বিল অব রাইট, ১৬৮৯
  • ডিক্লারেশন অব ইউনাইটেড স্টেট, ১৭৭৬
  • ফারসি বিপ্লব পরবর্তী চুক্তি, ১৭৮৯
  • ইউনিভার্সিটি ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস, ১৯৪৮

ইসলামী সভ্যতার ক্ষেত্রে এরকম চুক্তি না থাকলেও দুইটি গুরুত্বপূর্ণ মিসাক আছে। প্রথমটি হলো: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর লেখা মদিনা সনদ (৬২২ খ্রী) ইসলামী সভ্যতার প্রথম সনদ। সংবিধান বলে থাকে। দ্বিতীয়টি হলো: রাসূলে কারীম (সা.) এর শেষ সময়ের দিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ভাষণটি—অর্থাৎ  বিদায় হজের ভাষণ (৬৩২ খ্রী), প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন।

পাশ্চাত্য সভ্যতার চুক্তি ও ইসলামী সভ্যতার মিসাকের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হচ্ছে পাশ্চাত্যের যে সমস্ত চুক্তিগুলো, যে সংবিধানগুলো আছে। এগুলো মোটাদাগে মানুষের অধিকারকে সংরক্ষণ করে না। অল্প কিছু মানুষের অধিকার কে সংরক্ষণ করে। প্রতিটি চুক্তি নির্দিষ্ট একটি মানুষের বা নির্দিষ্ট একটি শ্রেণীর, নির্দিষ্ট একটি অংশের অধিকারকে , ক্ষমতাকে বা আধিপত্যকে সংরক্ষণ করেছে। মানবতার বা সামগ্রিকভাবে মানুষের অধিকার এর  সংরক্ষণ করেনি। এজন্য পাশ্চাত্য সভ্যতার চুক্তি গুলোকে বলা যায় যে তাদের নির্ধারিত অ্যারিস্টোক্র্যাটের অধিকার সংরক্ষণের চুক্তি। কিন্তু আমরা যদি ইসলামী সভ্যতার মিসাক দেখি সেখানে অ্যারিস্টোক্র্যাট এর কথা বলতে চাই, সমগ্র মানবতাই তাহলে অ্যারিস্টোক্র্যাট। কারণ গোটা মানবতার অধিকারকে এই দুইটা মিসাক সংরক্ষণ করেছে। যেমন: মদিনা সনদে ৪৭ টা ধারা আছে। এখানে তৎকালীন মদিনায় যতগুলো গোত্র ছিল, যতগুলো ধর্ম ছিল, যত শ্রেণীর মানুষ ছিল প্রত্যেকের অধিকারকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি একটি করে গোত্রের নাম লেখা হয়েছে। একটি একটি করে ধর্মের নাম লেখা হয়েছে। লিখে লিখে বলা হয়েছে যে অমুকের অধিকার এভাবে সংরক্ষিত থাকবে। যদি এই গোত্রের মানুষ অপরাধ করে তাহলে এভাবে বিচার দেওয়া হবে। এভাবে প্রতিটি মানুষের মূল্যকে বিচার করা হয়েছে।

এরপর যদি আমরা বিদায় হজের ভাষণের দিকে তাকাই, সে সময় মোটামুটি ইসলাম সমগ্র জাজেরাতুল আরবে শক্ত করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সেখানে রাসুল (সা.) যে কথাগুলো বলেছেন সেগুলো উম্মতের জন্য ওসিয়ত হিসাবে আছে। এখানে তিনি বলেছেন “সমগ্র মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই, আজ থেকে বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব বিলুপ্ত করা হলো। আরবের উপর অনারবের এবং অনারবের উপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই। জাহিলি যুগের সকল ধরনের ভেদাভেদ আমি আমার পায়ের নিচে পিষে ফেলেছি। তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সদব্যবহার করো।  অন্যায় এবং অবিচার করো না। মনে রেখো ক্রীতদাস-দাসীরা ও আল্লাহর বান্দা, তাদের উপর জুলুম করো না।  একজনের অপরাধের জন্য কখনো আপনজনকে শাস্তি দিও না। খবরদার ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। একে অন্যের সম্পদ অন্যায় ভাবে হস্তগত করবে না। অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করবে না। সর্বশেষ বলেছেন আমি কোরআন এবং হাদিসকে তোমাদের কাছে আমানত হিসেবে রেখে যাচ্ছি। এ দু’টো তোমরা সংরক্ষণ করবে।” এভাবে আমরা যদি দেখি এর মধ্য দিয়ে তিনি গোটা মানব জাতির অধিকারকে এমনভাবে সংরক্ষণ করে গেছেন এবং অধিকার এবং মর্যাদাকে সংরক্ষণ করার জন্য যে বিষয়গুলো প্রয়োজন তিনি প্রত্যেকটা বিষয়ে নজর দিয়েছেন। ক্রীতদাস দাসীদের কথাও তিনি সুন্দর করে স্পষ্টভাবে বলে গেছেন। প্রত্যেকের অধিকারের কথা মর্যাদার কথা বলেছেন। এই দু’টো–অর্থাৎ, একটি ভাষণ ও অপরটি সনদ ইসলামী সভ্যতার সংবিধান বা মিসাক। যার ফলে ইসলামী সভ্যতার সব সময় পাঁচটি জিনিসকে অবশ্যই সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ পাঁচটি জিনিসকে ইসলামিক শরীয়তের মূল পাঁচটি বিষয়।

শরীয়তের পাঁচটি বিষয়:

  • মানবসত্তা বা নফস এর সংরক্ষণ
  • চিন্তার/ আকলের স্বাধীনতা
  • বিশ্বাসের আলোকে বসবাসের স্বাধীনতা
  • বংশ রক্ষার স্বাধীনতা
  • সম্পদের সংরক্ষণ

মদিনা সনদ ও বিদায় হজের ভাষণে একইসাথে শরীয়তের পাঁচটি মূলনীতির বাস্তবায়ন বলা যায়। যার ফলে ইসলামী সভ্যতা সব সময় এই পাঁচটি মূলনীতির আলোকে পরিচালিত হয়েছে এবং ইসলামী সভ্যতার যে শহর গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই মূলনীতির আলোকে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়েছে।

শহরের মাকাসিদ:

শহর প্রতিষ্ঠার যে মাকাসিদ, সেটিকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

  • হক/ অধিকার
  • সৃষ্টিগতগত হক
  • সমাজ ও মানুষের মধ্যকার হক
  • অন্যান্য সৃষ্টির হক
  • আদালত/ সামাজিক ভারসাম্য
  • মহাবিশ্বের সবকিছুর মধ্যে
  • সামাজিক ভিত্তি হিসেবে

হক বা অধিকারের প্রসঙ্গে যদি আসি, তবে কিছু হক সৃষ্টিগতভাবেই মানুষের অন্তর্ভুক্ত। একজন মানুষ যখন জন্মগ্রহণ করে, তখনই সে কিছু জন্মগত অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে আসে। এর জন্য তার অন্য কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। আমরা সাধারণত যে মৌলিক অধিকারের কথা জানি: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষা—মানুষ জন্মগতভাবেই এগুলোর হকদার। এখানে কোনো লজিক, কোনো রুলস-রেগুলেশন খাটে না।

কিন্তু আমরা বলতে পারি না—“আমি পড়াশোনা করেছি, চাকরি করি, তাই সুন্দর জীবনযাপন আমার অধিকার।” আবার ফুটপাতে থাকা একজন মানুষও বলতে পারে না যে, “আমি যেহেতু পড়াশোনা করিনি, তাই ভালো থাকার অধিকার আমার নেই।” রাষ্ট্রের আইন কিংবা নীতিমালা হয়তো এ ধরনের পার্থক্যের সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ইসলামী সভ্যতা কখনোই এ ধরনের বৈষম্যকে স্বীকৃতি দেয় না।

ইসলামী সভ্যতা আমাদের বলে—প্রতিটি মানবসন্তান যেদিন জন্মগ্রহণ করে, যেদিন সে পৃথিবীতে প্রথম নিঃশ্বাস নেয়, ঠিক সেদিন থেকেই সে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মর্যাদা, সম্মান ও মৌলিক চাহিদার চারটি বিষয়ে পূর্ণ অধিকার নিয়ে আগমন করে। কেউ যদি এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তবে আমরা যারা এই অধিকারগুলো উপভোগ করছি, তারাই আসলে অন্যদের হক আদায় করছি না—অর্থাৎ আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য আমরা সঠিকভাবে পালন করছি না।

এখান থেকেই আসে মানুষের পারস্পরিক হক—সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যকার হক। আমরা জানি, প্রতিটি মানুষ পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ; একে অন্যের ওপর তার হক রয়েছে। আমি একজন মানুষ হলে, আমার পাশের মানুষটির প্রতি আমার দায়বদ্ধতা আছে; আমি যদি একটি পরিবার হই, তবে পাশের পরিবারের প্রতিও দায়বদ্ধতা আছে; গ্রামের মানুষ হলে পাশের গ্রামের প্রতি; আর একটি দেশের নাগরিক হলে পাশের দেশের মানুষের প্রতিও আমার দায়িত্ব রয়েছে। এভাবে পুরো উম্মাহর প্রতিই আমরা দায়বদ্ধ।

এই চিন্তা থেকেই আজ যখন ফিলিস্তিনে যুদ্ধ চলছে, তখন আমরাও দায়বদ্ধ; ফিলিস্তিনের শিশুরা যখন অনাহারে মৃত্যুবরণ করছে, তার জন্যও আমরা দায়বদ্ধ। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানুষ যখন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ-সংঘাতে মানুষ যখন নিঃস্ব, অনাহারী, আশ্রয়হীন—সেখানেও আমাদের দায় রয়েছে। একইভাবে, আমার শহরের ফুটপাতে যে মানুষটি ঘুমায়, সেও আমার ওপর হক রাখে। আমার পাড়া-প্রতিবেশী যদি অভুক্ত ঘুমায়, আর আমি পেট ভরে আহার করে শুয়ে পড়ি—তবে আমি কঠিনভাবে দায়বদ্ধ। কারণ আল্লাহর রাসূল (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন—যে ব্যক্তি পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে, সে প্রকৃত মুমিন নয়।

এখানে “প্রতিবেশী” শব্দটি প্রতীকী। মানে, আমি মানুষ হিসেবে আমার পাশের মানুষ প্রতিবেশী; পরিবার হিসেবে পাশের পরিবার; গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে পাশের গ্রামের বাসিন্দা। এই হক শুধু মানুষের প্রতি মানুষের নয়, অন্যান্য সৃষ্টির প্রতিও হক রয়েছে। অন্যান্য সৃষ্টিও মানুষের কাছে অধিকার রাখে। ইসলামী সভ্যতা আমাদের সেই হকগুলোর কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের এমন শহর গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো সৃষ্টির হক নষ্ট হবে না।

আমি যদি একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করি, আর তাতে পাখিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়—তা গ্রহণযোগ্য নয়। আমি যদি একটি পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণ করি, যা মানুষের উপকারে আসে কিন্তু বন-জঙ্গল ধ্বংস হয়ে যায়—এটিও ইসলামী সভ্যতার দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। কোনো ডেইরি ফার্মে পশুর প্রতি অমানবিক আচরণ করা—ইসলাম তা অনুমোদন করে না।

ইতিহাসে দেখা যায়—ইসলামী সভ্যতার নগরগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হতো যাতে পশুপাখি, পোকামাকড়—সকল সৃষ্টিই বিবেচনায় থাকে। জানালাগুলোতে পাখির বাসা রাখার ব্যবস্থা থাকত; ভবনগুলোকে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি নির্মাণ করা হতো না যাতে পাখির ক্ষতি না হয়। বিভিন্ন স্থানে পশুপাখির জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা রাখা হতো। কোনো স্থাপনা নির্মাণের সময় আশপাশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, সৃষ্টির হক—সবই বিবেচনা করা হতো।

এই যে অন্যের হক—এই অধিকার আদায়ের পন্থা হচ্ছে মারহামাত। এটি আইন নয়; এটি দয়ার নীতি, রহম-এর নীতি। মারহামাতের সর্বোচ্চ উপমা আল্লাহ নিজেই। তিনি রহমশীল; দয়া ও ভালোবাসা দিয়ে আমাদেরকে রহমতের চাদরে আচ্ছাদিত রাখেন। আমরা মানুষ হিসেবে তাঁর রহমতের এক লক্ষ ভাগের এক ভাগও অর্জন করতে পারব না, কিন্তু তিনি চান—আমরা যেন তাঁর বান্দাদের প্রতিও রহমতশীল হই।

একজন মা তাঁর সন্তানকে যেমন অতিশয় ভালোবাসেন—এক সন্তান অন্য সন্তানকে একটু মারলেও মায়ের মন তা সহ্য করতে পারে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাদের প্রতি এর থেকেও বেশি ভালোবাসেন। তাই যখন বান্দা একে অন্যের প্রতি জুলুম করে, আল্লাহ কতটাই না রেগে যান! শুধু মানুষের প্রতিই নয়, প্রত্যেক সৃষ্টির প্রতিই আল্লাহর ভালোবাসা আছে। কোনো সৃষ্টির ওপর জুলুম হলে আল্লাহ তা অপছন্দ করেন। আমরা জানি, আল্লাহ বলেছেন, তিনি নিজের হক—ইবাদত-বন্দেগীর হক—মাফ করবেন; কিন্তু বান্দা যদি অপর বান্দার হক নষ্ট করে, তা তিনি মাফ করবেন না।

এরপর আসে দ্বিতীয় বিষয়—আদালত। একটি সভ্যতার মূল স্তম্ভই হলো আদালত। আদালত ছাড়া কোনো শহরের ভিত্তি থাকে না। ইসলামী সভ্যতার সব বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকলেও, যদি আদালত প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে সেই সভ্যতা কখনোই ইসলামী সভ্যতা হতে পারে না। কারণ এর ভিত্তি আদালত ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর দাঁড়াতে হবে।

মহাবিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় সবকিছুর মধ্যেই নিখুঁত এক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত। সূর্য-চন্দ্রের গতিপথ, গ্রহসমূহের কক্ষপথ, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা—সবই একটি নির্দিষ্ট নিয়মে চলমান। পশুপাখি আদালতের নীতি মানে না, কারণ তাদের সে আকল নেই। কিন্তু মহাবিশ্ব আল্লাহ প্রতিষ্ঠিত ভারসাম্যের নিয়মে চলে।

মানুষের শহরও তাই আদালতের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। শাসক ও জনগণের সম্পর্ক আদালতভিত্তিক না হলে তা কখনোই ইসলামী সভ্যতা হতে পারে না। পাশ্চাত্য সভ্যতায় সুন্দর নীতি, আইন, রুলস-রেগুলেশন, মানবাধিকার—সবই আছে—যা দিয়ে একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। কিন্তু সেখানে আদালতের নীতি—দিব্য ন্যায়বিচারের ভিত্তি—অনুপস্থিত। কাফের শাসক হওয়া বড় সমস্যা নয়; সমস্যার মূল কারণ—সভ্যতার ভিত্তি আদালতের ওপর দাঁড়িয়ে নেই।

তাই ইসলামী সভ্যতার সামাজিক ভিত্তি যদি কিছু হয়, তবে তা অবশ্যই– আদালতের প্রতিষ্ঠা।

শহরের বৈশিষ্ট্য: রূহসম্পন্ন শহরের ক্ষেত্রে ইবনে খালদুন চারটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন।

  • শান্তি ও নিরাপত্তা
  • মাফসাদাত প্রতিরোধ ও মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা
  • সুরক্ষিত অবস্থান
  • বসবাসযোগ্য পরিবেশ

ইসলামী সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহর নিয়ে আমরা আলোচনা করবো। এবং দেখবো যে, এই শহরগুলোতে কীভাবে এসকল বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে।

ইয়াসরিব থেকে মদিনা:

ইসলামী সভ্যিতার প্রতিষ্ঠিত প্রথম শহর মদিনা। মদিনা শহরে শরিয়তের পাঁচটি মূলনীতিকে সংরক্ষণ করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।  মদিনা শহর মুসলমানদের একটি তৈরি করা শহর। সেখানে আগে থেকে লোকালয় ছিল, যার নাম ছিল ইয়াসরিব। সেই ইয়াসরিব কে আল্লাহর রাসূল (সা.)  যখন মদিনায় পরিবর্তন করলেন, সেখানে দুই ধরনের পরিবর্তন হলো। প্রথমত, শহরের রূহের পরিবর্তন হলো। শরীয়তের পাঁচটি মূলনীতির বাস্তবায়নের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন রূহি পরিবর্তন এর মধ্যে পড়ে।

শুধু ইয়াসরিবে না, গোটা জাজিরাতুল আরব ছিলো গোত্র ভিত্তিক, অসংখ্য গোত্রে বিভক্ত ছিল এবং সে সময় তাদের মধ্যে ছিলো বংশ মর্যাদার লড়াই। বংশগত বিরোধ এবং গোত্রের সাথে অপর গোত্রের সংঘাত সংঘর্ষ লড়াই এটি নিয়মিত বিষয় ছিল। একটি গোত্র ভিত্তিক সমাজকে তিনি ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে শহর ভিত্তিক সভ্যতায় রূপান্তর করলেন।  মদিনা সনদের মাধ্যমে করলেন। মদিনা সনদে যেহেতু প্রত্যেকের অধিকার আলাদা আলাদা ভাবে বলা হয়েছে। প্রত্যেকের দায়িত্ব-কর্তব্য অবস্থান, এ শহরে এই সভ্যতায় কেমন হবে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মুহাজিরদের সাথে আনসারদের তিনি একটি ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করলেন। মুহাজিরদের সাথে আনসারদের এই ভ্রাতৃত্ব স্থাপন পৃথিবীর ইতিহাসে এর দ্বিতীয় কোন দৃষ্টান্ত নেই। একদিকে মুহাজিররা মক্কা থেকে তাদের পরিবার-পরিজন, জন্মভূমি, আত্মীয়-স্বজন,পুরানো স্মৃতি, ঘর বাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য ফেলে মদিনায় চলে এলেন আল্লাহর রাসূল (সা.) এর সাথে। আবার অন্যদিকে আনসাররা নিজেদের ভূমি, নিজেদের বাড়িঘর, পরিবার সবকিছু মুহাজিরের সাথে ভাগ করে নিলেন। এমনকি যাদের একাধিক স্ত্রী ছিল তাদের স্ত্রীদেরও তালাক দিয়ে দিলেন মুজাহিরদের জন্য। ইসলাম গ্রহণ করার কারণে অনেক সাহাবীদের সাথে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল। কারো হয়তো স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করেছে স্বামী করেনি। স্বামী গ্রহণ করেছে স্ত্রী করেনি।  কারো সন্তান ইসলাম গ্রহণ করেছে বাবা-মা করেনি। বাবা মা মেনে নেয়নি সন্তানকে ত্যাজ্য করে দিয়েছে। কারো এক ভাই করেছে আর এক ভাই করেনি। শুধু তারা জন্মভূমি ছেড়ে আসেনি পেছনে অনেক সম্পর্ক , স্মৃতি ও সম্পদ অনেক কিছু তাদের ছেড়ে যেতে হয়েছে। অনেকের অনেক বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল, সেগুলো ফেলে চলে এসেছে। অনেক কিছু ত্যাগ করে তারা এসেছে। আবার আনসাররাও তাদের জন্য যে ত্যাগ করেছে– তাও পৃথিবীর ইতিহাসে একইভাবে বিরল।

মুজাহির ও আনসারদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ভিন্নতাও ছিল। যেহেতু এখানে বিভিন্ন ধর্মের ও গোত্রের মানুষ ছিল, তাই সবার মধ্যে সাংস্কৃতিক দূরত্ব ছিল। এমনকি বিশ্বাসের ভিন্নতা ছিল। বিভিন্ন ভাষার মানুষও সেখানে একত্রিত হয়েছিল। এই সমস্ত মানুষকে একই সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিমূলক সম্পর্কের মধ্যে নিয়ে আসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহিষ্ণুতা এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা–এগুলো ছিল ইয়াসরিব থেকে মদিনায় পরিবর্তিত হওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন বা  রূহি পরিবর্তনের মধ্যে অন্যতম।

এরপর আসে মানুষের জীবনযাপনের পরিবর্তন। বাহ্যিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, পুরো ইয়াসরিবের কাঠামোই পরিবর্তন হয়ে গেল। মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা করা হলো এবং এটিকে এই শহরের সেন্টার বানানো হলো। মদিনার যে আবহাওয়া ছিল উৎপাদন বা আয়ের যে উৎস ছিল সেগুলোর আলোকে উৎপাদন ও আয়ের ক্ষেত্রকে বিকশিত করা হলো। এই আবহাওয়ার আলোকে একটি নিজাম প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলো। যেহেতু মসজিদে নববীকে সেন্টার করা হলো তাই রাস্তাগুলোকে নতুন করে ডাইমেনশন দিতে হলো। সমস্ত রাস্তাকে মসজিদের নববী মুখী করা হলো। এটি শুধু মসজিদ ছিল না, ছিল সামাজিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু,  ভ্রাতৃত্ব ভালোবাসা ও জ্ঞান-চর্চার কেন্দ্রবিন্দু–সমগ্র মদিনার মানুষের মিলন মেলা। এখানে মক্কার মুহাজিররা ছাড়াও অন্যান্য অঞ্চলের লোকেরা ও আসতে থাকল। ইসলামী সভ্যতা যখন বিকাশিত হলো তখন অন্যান্য অঞ্চল থেকে মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানতে আসত। ফলে এটি ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ শহরে রূপান্তর হওয়া শুরু করল। এ শহরের বাহ্যিক কাঠামোর দিকে যদি আমরা দেখি এর কেন্দ্রে ছিল মসজিদ , মসজিদের সবচেয়ে কাছাকাছি ছিল প্রশাসনিক ভবনগুলো, পরবর্তী যে ইসলামী সভ্যতার শহরগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই মডেল অনুসরণ করে হয়েছে। হয়তোবা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে , বিস্তৃতি বেড়েছে  কিন্তু এই মডেলটাই মূল করা হয়েছে। কেন্দ্রে থাকবে মসজিদ এরপর প্রশাসনিক ভবন গুলো। প্রথমে শুধু রাষ্ট্রভবন ছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনিক ভবন, অন্যান্য ভবন নির্মাণ হলো। তারপর বাজার , শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এরপরে মানুষের বসবাসের যে বাড়িঘর, সেসব তৈরী হলো। মূল সড়কগুলোকে মসজিদ পর্যন্ত বিস্তৃত করা হতো। পরবর্তীতে অন্যান্য শহরগুলো মূল সড়কের সাথে কানেক্টেড করা।

যেহেতু এটি মরুভূমি এলাকা ছিল তাই পানির সুব্যবস্থা করার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এভাবে শহরের বাহ্যিক কাঠামোর পরিবর্তন হলো। আল ফারাবি বলেছেন, “ মানুষ তার আখলাকি কামালিয়াত (পরিপূর্ণতা) শহরের মাধ্যমেই লাভ করে”। একটি শহর প্রতিষ্ঠা না হলে ইসলাম মানুষের কাছে যা কিছু চায় মানুষকে যে মানে দেখতে চায় ,যে মূল্যবোধে দেখতে চায়, যে ধরনের আখলাক সম্পন্ন হওয়া শহর ছাড়া সম্ভব না। আল্লাহর রাসূলের (সা.) মাক্কী জীবনের যে ১৩ বছর ছিল সেখানেও কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সা.)  এই জিনিসটার জন্য সংগ্রাম করেছেন। এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি যে মানুষগুলো তৈরি করেছেন তারাই পরবর্তীতে এসে মদিনায় একটি শহর গড়ে তোলেন। রাসুলের (সা.) সমগ্র জীবনের যে সংগ্রাম ছিল মানুষের অধিকার, মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করা। সেই মর্যাদা পূর্ণভাবে মানুষ যদি বাঁচতে চায় তার জন্য একটি শহর প্রয়োজন। ইসলাম মানুষকে মর্যাদা যে জায়গাটা দেখায় তা বনে জঙ্গলে সম্ভব না। আবার একদম গ্রামে গঞ্জেও সম্ভব না। সেই মর্যাদা সেই অধিকার সেই কর্ম ব্যবস্থা সেই দায়িত্ববোধ। এগুলো শহরের মাধ্যমেই বিকাশিত হওয়া সম্ভব।

উন্নয়নের মডেল শহর: কূফা ও বসরা

আমরা জানি যে, হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর সময় মুসলমানরা পারস্য বিজয় করে। পারস্য বিজয়ের পরে সেখানে মুসলমানরা প্রথমে মাদায়েন শহরে বসবাস করতে থাকে। এ মাদায়েন শহরে কিছুদিন বসবাসের পরে দেখা গেল যে সেখানে বেশ কিছু সমস্য হচ্ছে। সেখানকার আবহাওয়ার সাথে সাহাবীরা মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। তাদের চামড়া খসখসে হতে শুরু করে। তারা অসুস্থ হয়ে যেতে শুরু করে। তাছাড়া মাদায়েনে প্রচুর পরিমাণে মশা ছিল। এ খবর সে সময়ে পারস্যের সেনাপতি ছিলেন সাদ বিন আবু আক্কাস (রা.)। তিনি হযরত উমর (রা.) এর কাছে খবর পাঠালেন। তখন উমর (রা.) বললেন, “তোমরা খোঁজ নাও, এখানে কোন এলাকাগুলো মানুষের বসবাসের জন্য উপযোগী হবে। জল এবং স্থল উভয় দিকটা খেয়াল রাখবে। চেষ্টা করবে তৃণলতা ঘেরা একটি অঞ্চল খুঁজে বের করার জন্য।” তিনি এখানে দুজন সাহাবীকে পাঠালেন একজন হচ্ছে সালমান ফারসি (রাঃ) আরেকজন হযরত হুযাইফা (রা.) । উনারা একটু সময় নিয়ে গোটা বিজিত পারস্য অঞ্চল ঘুরলেন। ঘুরার পরে উনারা দুটো জায়গাকে নির্দিষ্ট করলেন। একটি হচ্ছে দজলা নদীর তীরে বসরা আরেকটা হচ্ছে ফোরাত নদীর তীরে কুফা।

এখানে কয়েকটা বিষয় তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন: নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো উর্বর হয়। উর্বর হলে ফসলের উৎপাদন ভালো হয় ,পশু পাখির চারণভূমি হিসেবে ভালো হয়। যার ফলে মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক যে প্রয়োজন–খাদ্য তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। খাদ্যের চাইতেও যেটি বেশি প্রয়োজন হয় তা হচ্ছে পানি। পানির চাহিদাটাও নদীর কারণে পূরণ করা সম্ভব হয়। আবার, যোগাযোগের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হচ্ছে জল পথে যাতায়াত। নদী পথগুলো বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

আমরা জানি গোটা মানবতাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শিখিয়েছে ইসলামী সভ্যতা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটা হচ্ছে পানি। এর মধ্যে দজলার বিশেষত্ব ছিল সেখানে বন্দর ছিল। যার ফলে বসরা মুসলমানদের বন্দর নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর সময় কুফা রাজধানী হিসেবে স্থানান্তরিত হয়েছিল।

এরপর কুফা ও বসরা শহরকে ডিজাইন করার জন্য আবুল হায়াজ ইবনে মালিক নামক একজনকে উমর (রা.) দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। তিনি খুব সুন্দর করে এই দুইটা শহর ডিজাইন করেন। মূলত মদিনার যে মডেল ছিল সেন্টারে থাকবে মসজিদ তারপর থাকবে কুফা ও বসরার যিনি শাসক হবেন তাদের বাসস্থান। তাদের বাসভবনের সাথে মসজিদের রাস্তা সরাসরি ছিল। এরপর ছিল রাজস্ব বিভাগের ভবন। পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা বিভাগের ভবন তৈরী করা হয় এর পাশে। এরপর বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরী করা হয়। গোটা কুফাকে অসংখ্য সাব জোনে ভাগ করা হয়। সারা শহরে মোট ১৫টি মূল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল। এই সবগুলো ছিল প্রায় ৪০ গজ করে প্রশস্ত। অন্যান্য সড়কগুলো ছিল বিশ থেকে ত্রিশ গজ প্রশস্ত। মানুষের বাসা বাড়ি বা গলির যে রাস্তাগুলো ছিল, সেগুলোও ছিল সাত গজ প্রশস্ত। এই প্রশস্ততার বিষয়টি করা হয়েছিল খুব কঠোরভাবে বজায় রাখা হয়েছিল, যাতে মানুষের আলো-বাতাসের কোন সমস্যা না হয়। আমাদের আজকের ঢাকা শহরের বিশেষ করে যে সমস্যাটা হয় বাসা বাড়ির মাঝখানে কোন গ্যাপ থাকে না। জানালা আছে ঠিকই কিন্তু এই জানালার কোন কার্যকরিতা নাই। জানালা খুললে না আসে আলো, না আসে বাতাস। যদি আপনি ঢাকা শহরে একদিন বের না হোন তাহলে আকাশ দেখা জুটবে না।

কুফার সেন্ট্রাল মসজিদ এর সাথে যুক্ত এই ১৫ টি মূল সড়ক দিয়ে সম্পূর্ণ শহরকে সাব জোনে ভাগ করা হয়েছে। শহরগুলোর প্রতিটি সাবজোনে একটি করে কেন্দ্রীয় মসজিদ, মাঝখানে ছিল কুফার কেন্দ্রীয় মসজিদ। এই কুফার যে কেন্দ্রীয় মসজিদে সময় ২০০ হাত চওড়া বারান্দা ছিল। প্রথমে এটি খেজুর পাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে উমর (রা.) এর জীবদ্দশায় এটি পাকা করা হয়। সমস্ত শহরের সবগুলো বাড়ি ঘর পাকা ভবন ছিল। কারণ মাঝখানে একবার শহরে আগুন লাগে। আগুনের হাত থেকে মানুষকে নিরাপদ করার জন্য, সকল বাড়ি ও মসজিদ পাকা করা হয়।

কূফা ও বসরা ছাড়াও উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর সময় অনেকগুলো শহর নির্মাণ হয়েছে। যেমন: বিলাদে শামে দামেস্ক, মিশরে ফুসতাত শহর, এগুলো তখনই নির্মাণ হয়েছে।

কুফা ও বসরায় ইবনে খালদুন এর বর্ণিত সবগুলো বৈশিষ্ট্যি সংরক্ষিত হয়েছে। আমরা শুরুতেই যেটা দেখেছিলাম সেটা হচ্ছে আবহাওয়া। তারপর নিরাপত্তার বিষয়ে যদি দেখি, এর জন্য সর্বপ্রথম যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ। মানুষ যদি ভালো না হয়, তাহলে যত আইন-কানুন, নিয়ম-শৃঙ্খলা করা হোক না কেন সেখানে সর্বদাই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। এই মানুষ তৈরী করার জন্যই আল্লাহর রাসূল ২৩ বছর ধরে সংগ্রাম করেছেন। এই সংগ্রামের ফলে এমন মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরি হয়। আমরা জানি আল্লাহর রাসূলের সাহাবীরা কিভাবে নিজে না খেয়ে অন্যকে খেতে দিয়েছেন। নিজে না পরে অন্যকে পরতে দিয়েছেন। তিন দিন অভুক্ত থেকে খেতে বসছেন এর মধ্যে কেউ এসে খাবার চেয়েছেন তাকে নিজের খাবারটা দিয়ে দিয়েছেন। অন্য যেকোন বিষয় নিজের উপর তার অপর ভাইকে প্রাধান্য দিয়েছেন। অন্যায়, অপরাধ প্রবণতা এগুলো থেকে তারা কিভাবে দূরে সরে গিয়েছেন। এটি আমরা খুব ভালো করেই জানি। যে মানুষ নিজের উপর তার ভাইকে প্রায়রিটি দিতে পারে তার পক্ষে অন্যায় করা ,অপরাধ করা খুবই দুরুহ্ বিষয়। মাফসাদাত প্রতিরোধ ও মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা করার জন্য সর্বপ্রথম যে বিষয়টা সেটা হচ্ছে মানুষ গড়া। মানুষ গড়ার কাজটা আল্লাহর রাসূল ২৩ বছর ধরেই করে গেছেন। যার ফলে তিনি যে উচ্চ মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ রেখে গেছেন তাদের দ্বারাই মদিনার ঐতিহ্যকে ধারণ করে রূহ সম্পন্ন অসংখ্য শহর নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। শান্তি নিরাপত্তা সুশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে আরেকটা যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তা হচ্ছে অর্থনীতি। অভাব অনটন মানুষকে অপরাধ প্রবণতার দিকে নিয়ে যায়। আমরা দেখি আজ মানুষ ক্ষুধার  কষ্টে পতিতা বৃত্তি কে বেছে নেয়। ক্ষুধার কষ্ট নিজেরটা সহ্য করে নিলেও বাবা-মা হিসেবে সন্তানেরটা সহ্য করে নেয়া খুবই কষ্টকর বিষয়। সবাই তো আল্লাহর রাসূলের (সা.)  সাহাবীর মত উচ্চ মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ হবে না। যার কারণে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য রাসুলে কারিম (সা.)  নিজেও চেষ্টা করেছেন। তার জীবদ্দশায় তিনি মদিনাতে  উৎপাদন ও বাণিজ্য সমৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু অর্থনৈতিক মডেল  আজকের দুনিয়ায়ও  অনুসরণীয় মডেল। তিনি তার খেলাফত অধীনস্থ সমগ্র এলাকায় জরিপ করছিলেন– কোন অঞ্চল কৃষির জন্য পারফেক্ট, কোন অঞ্চল চারণ ভূমির জন্য পারফেক্ট, কোন অঞ্চলগুলোতে উৎপাদন সম্ভব না। প্রত্যেকটা ধরে ধরে এমনভাবে তালিকা করলেন যে কোথায় কত বর্গফুট জমিতে কোন ফসল উৎপাদন করা যাবে। কৃষকদের সুযোগ-সুবিধা  দিলেন। কৃষি জমি গুলোকে যেন কেউ নষ্ট করতে না পারে তার জন্য যে বিধি-বিধান দিলেন। এরপর ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসারের জন্য অন্যান্য শহরের সাথে যোগাযোগ, সম্পর্ক কেমন হবে সেটিও নির্ধারণ করে দিলেন। সারা পৃথিবীতে যেভাবে মুসলমানদের বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়তে লাগলো।

এর মাধ্যমে যেটা হলো, যেই মদিনায় ক্ষুধার কষ্টে মানুষ বুকে পিঠে পাথর বেঁধে ঘুরে বেড়াতো–সেই মদিনায় একটি সময় পর যাকাত দেওয়ার মত মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু যে ধারার সৃষ্টি করলেন পরবর্তীতে ইসলামী সভ্যতায় সবসময় এর প্রচলন বিদ্যমান ছিল।

ইসলামী সভ্যতা যেখানে গিয়েছে সেখানে একটি সমৃদ্ধির জীবন দিয়েছে। আমরা উসমানী খেলাফতে নিয়ে পড়েছি, একজন যাকাত দাতা অনেক ঘুরে ঘুরে কোন ধরনের দরিদ্র মানুষ না পেয়ে তারপর সে একটি গাছের নিচে তার যাকাতের সম্পদ ঝুলিয়ে রেখে লিখে গেছে, “হে দরিদ্র! অনেক খুঁজেও আমি তোমাকে পেলাম না। তুমি যদি কোথাও থেকে থাকো তোমার যদি কিছু প্রয়োজন হয় এখান থেকে নিয়ে নিও।” দরিদ্র মানুষ পাওয়া তখন এতটাই দুরূহ হয়ে পড়েছিল।

তবে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও মূল্যবোধ থাকার পরেও কিছু মানুষ অপরাধপ্রবণ হবেই। এ অপরাধগুলোকে প্রতিহত করার জন্য  তখন আইন ও দন্ডবিধির প্রয়োজন। এই ব্যবস্থাও ইসলামী সভ্যতা করেছিল।  ট্রাফিক পুলিশের যে ব্যবস্থা এটাও ইসলামী সভ্যতার অবদান। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জান মালের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে আল্লাহর রাসূল (সা.) যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন, অচিরে এমন হবে যে সান’আ থেকে হাদরা মাউত পর্যন্ত একজন মানুষ একাকী হেঁটে যাবে। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাবে না। মেষপালক বাঘ ছাড়া আর অন্য কিছুর জন্য নিজের পশু নিয়ে ভয় পাবেনা। পরবর্তীতে সাহাবীরা বলেছিলেন যে রাসূল (সা.) যেটা বলেছেন তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। তার মানে সেখানে সত্যিকার অর্থেই শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

আরেকটি বিষয় হলো, অবকাঠামোর নির্মাণের ক্ষেত্রেও মানুষের জানমালের নিরপত্তার বিষয়টি লক্ষ্য রাখা হতো। ইসলামী সভ্যতার যেকোন শহর ও স্থাপত্য নির্মাণের সময় নিরাপত্তাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। একারণে অবকাঠামোগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হতো, যেন সেগুলো টেকসই হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষম হয়৷ প্রতিটি অঞ্চলের আবহাওয়া ও ভূমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণের উপাদান ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা হতো।

শান্তি ও নিরাপত্তার মডেল : বায়তুল মাকদিস

ইসলামী সভ্যতার সবগুলো শহর মদিনার ঐতিহ্যকে ধারণ করে। বায়তুল মাকদিস নিয়ে নির্দিষ্টভাবে আলোচনা করার কারণ হলো এটি নিয়ে এখন অনেক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু যখন বাইতুল মাকদিস জয় করলেন। এখানে তিনি যে বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিলেন।

  • শান্তি ও সংহতি,
  • নিরাপত্তা,
  • সাংস্কৃতিক বৈচিত্র সংরক্ষণ,
  • মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা।

এখানে তিনি যে নিয়ম-কানুন করলেন এটি শুধুমাত্র শাসক শ্রেণীর জন্য না, বরং সবার জন্য। অন্য ধর্মের অধিকার সংরক্ষণের ব্যাপারে এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। আমরা সবাই জানি পাদ্রী সাফোনিয়াস এর সাথে যখন উমর (রা.) চার্চ পরিদর্শনে যান, সেখানে যখন নামাজের সময় হয়ে যায় তাকে যখন নামাজ পড়তে বলা হলো তখন তিনি নামাজ পড়েননি। কারণ বলেন আমার মৃত্যুর পর দেখা যাবে যে আমার মুসলমান ভাইরা দাবি করবেন এখানে আমাদের খলিফা নামাজ পড়েছেন এই জায়গাটা আমাদের। এখানে তিনি খ্রিস্টানদের অধিকার রক্ষার জন্য অন্যান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ইংরেজ ঐতিহাসিক কারেন্ট আনইনস্ট্রম বলেছিলেন যে, “বায়তুল মাকদিসে মুসলমানরা এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন যেখানে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানরা একসাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে শুরু করতে সক্ষম হয়েছে।”  যেহেতু বায়তুল মাকদিস এর প্রতি সকল মুসলমানদের আলাদা একটি ধর্মীয় আবেগ কাজ করে। কেননা এটি মুসলমানদের কাছে এটি অসংখ্য কারণে পবিত্র। মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাসের অংশ এটি। আবার খ্রিস্টানরাও যেহেতু মূসা (আ.) কারণে এই জায়গাটা তাদের বলে মনে করে। সেজন্য এই জায়গায় শান্তি ও সংহতির মধ্য দিয়ে সকল মানুষ যেন বসবাস করতে পারে–এজন্য বিশেষ করে উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এ বিষয়গুলো সামনে রেখে শহরের নিজাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আধুনিক শহর ব্যবস্থার মডেল : কর্ডোভা

কর্ডোভা, গ্রানাডা সহ আন্দালুসিয়ার  শহরগুলো ইউরোপের বুকে সে সময় (৭৫০-৮০০খ্রী.) প্রতিষ্ঠিত শহর, যে সময়ে ইউরোপের মানুষ পানির ব্যবহার জানতো না। আলোর ব্যবহার জানত না। আন্দালুসিয়ায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম শহর কর্ডোভা। সে সময় (৭০০/ ৮০০ শতাব্দীতে) শুধুমাত্র কর্ডোভা শহরে ৮০০ টা স্কুল ছিল, ৯০০ শত হাম্মামখানা। একটি মাত্র শহরে ৯০০ হাম্মামখানা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে  কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল সেই সময়! ৫০ টি হাসপাতাল ছিল এবং এই হাসপাতালগুলো অত্যাধুনিক ছিল। ইউরোপের একজন পর্যটক অসুস্থ হওয়ার কারণে আন্দালুসিয়ার একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিল। সে যখন ফিরে গেল তখন বলল আন্দালুসিয়ার হাসপাতালগুলো এরকম যে মানুষ শখ করে অসুস্থ হবে। ইসলামী সভ্যতায় হাসপাতালগুলো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অপারেশন করত সাধারণত নাপিতরা। এবং তারা মনে করতো অপারেশনের যে পোশাক, তা পরিবর্তন করতে হয় না। সারা জীবন একই পোশাক পড়তে হয়। অপারেশনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার যে বিষয়গুলো, হাসপাতাল পরিষ্কার রাখা–এ কনসেপ্ট গুলো ইসলামী সভ্যতার কনসেপ্ট।

এছাড়া কর্ডভায় ৭০ টি লাইব্রেরি ছিল। উল্লেখযোগ্য প্রাসাদ এর মধ্যে ছিলো আজ জাহারা প্রাসাদ। এই প্রাসাদের আসে-পাশে সুসজ্জিত বাগান ছিল, অসংখ্য ঝরনা ছিল। সেখানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, ট্রাফিক ব্যবস্থা এগুলো ছিল। এমনকি একজন পর্যটক বলেছিলেন, “সে সময় কর্ডভা শহরে রাতের বেলা ১০ মাইল রাস্তা একজন চাইলে নির্বিঘ্নে সরল রৈখিক ভাবে হাঁটতে পারবে।” অর্থাৎ রাস্তাগুলো রাতের বেলায় এত আলোকিত থাকতো, এরকম মসৃণ ও নিরাপদ রাস্তা ছিলো। সেইসময় রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের ব্যবস্থার প্রবর্তকও ছিল মুসলমানরা। অথচ ২০২৫ সালে এসে আমাদের অনেক রাস্তাঘাটে অন্ধকার থাকে। গোয়াদেল কুইবারের নদীর উপরে উঠা সেতু সে’সময় মুসলমানরা প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রচুর পরিমাণে কৃত্রিম হ্রদ, জলাশয়, চৌবাচ্চা স্থাপন করেছিল।

এভাবে গোটা আন্দালুসিয়ায় সে’সময় আশিটি ফার্স্ট ক্লাস শহর ছিল। আরো তিনশোটি মিউনিসিপাল শহর ছিল। তাছাড়া গ্রাম-গঞ্জ, মফস্বল এসবের কোন হিসাব নেই। যেমন আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ শহর মালাগা। যার সাথে সারা পৃথিবীর বাণিজ্য ছিল। গ্রানাডা আন্দালুসিয়ার সর্বশেষ রাজধানী। যেখান থেকে আন্দালুসিয় সভ্যতার শেষ সূর্য অস্ত গিয়েছে। গ্রানাডার আল হামরা প্রাসাদকে বলা হতো মানুষের সৃষ্টিশীলতার এবং সৌন্দর্যের ও রুচিবোধের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। এটি আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের তাজমহলের ক্ষেত্রেও বলা যায়। কারণ, তাজমহল বিশাল একটি কমপ্লেক্স। এখানে বাগান আছে ঝর্ণা আছে। কবরকে কেন্দ্র করে হলেও পরবর্তীতে একটি বিস্তৃত কমপ্লেক্স হয়। যাই হোক, সেই আল হামরার ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ অধ্যায় মধ্যে একটা। কারণ খ্রিস্টান বাহিনী এই সভ্যতাকে এমন করুণভাবে ধ্বংস করেছে, মুসলমানদের সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত করেছে। এরপর মসজিদগুলোকে গির্জায় পরিণত করা হয়েছে। যার ফলে এই সভ্যতার নিদর্শনগুলো খুঁজে পাওয়া , সংরক্ষণ করা বা দেখা এখন সবচাইতে কঠিন। আল হামরার প্রাসাদের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে রিসেন্টলি খুব ভালো ভিডিও হয়েছে। আশ্চর্য হয়ে গেছে গোটা বিশ্ব। এত বছর আগে কিভাবে তারা পেরেছে ওয়াটার চ্যানেল সৃষ্টি করতে! গোয়াদাল কুইভার নদী থেকে যে পানির লাইনটা এনেছে, সেটিকে সমগ্র প্রাসাদে ওয়াটার চ্যানেল সৃষ্টি করা হয়েছে। পানির ফোয়ারা রাখা হয়েছে। হাম্মামখানা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা জায়গায় পানির চ্যানেল এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে । এটি অনেকগুলো প্রয়োজনীয়তা কে সামনে রেখে করা হয়েছিল–সৌন্দর্য বর্ধন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, মানুষের পানির প্রয়োজনীয়তা পূরণ। বিষয়কে সামনে রেখে আল হামরার ওয়াটার চ্যানেল তৈরি করা হয়েছে। সে’সময় আন্দালুসিয়ায় রুম গুলোকে শীত তাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল। এক ধরনের পাইপের মাধ্যমে গরম বাতাস নিষ্কাশন করা যেত। যার ফলে রুমের ভেতরে ঠান্ডা থাকতো আবার শীতকালে গরম বাতাস সংরক্ষণ করে রুমগুলোকে গরম রাখা হতো। একইভাবে পানিকেও সেম। এখন আমরা যে এসি ও গিজার ব্যবহার করি। সেগুলোরই পুরানা ভার্সন বলা যায়। এটি আমি বাংলাদেশে দেখেছিলাম শাহ এনেয়াতুল্লা মাজারে। সেখানে শাহ সুজের একটি বিশ্রামাগার ছিল। সেখানে দেখেছিলাম। হাম্মাম খানার পানি গরম করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ছিল। এ ছিল আন্দালুসিয়ার শহর গুলো। আন্দালুসিয়ায় সভ্যতার কথা বলছিলাম। এগুলো এমনি এমনি তৈরি হয়নি এগুলোর পিছনে মানুষ ছিল। আবার যখন এরকম সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হলো সেখান থেকেও কিন্তু মানুষ গড়ে উঠলো । যার কারনে আমরা যদি আন্দালুসিয়ের বিখ্যাত মানুষ এর নাম পড়তে যাই। এমন শ’খানেক বিখ্যাত মানুষের নাম পড়তে পারব যাদের নাম শুনলেই আপনারা চিনবেন ইবনে খাতিব, ইবেন হাসান , ইবনে আল হায়সান,আল মুজাফফর, ইবনে রুশত,ইবনে মায়মুন, ইবনে আরবী, ইবেন বাজ্জা, ইবনে তোফায়েল, ইবনে খালদুন, ইবনে ইদ্রিসি, আল মাজিনি, আল মাজারিতি, ইবনে আফলা, আল বিতরুসি । নারীদের মধ্যে ছিল কর্ডোভায় লুবানা, সুলতানা আয়শা। এরকম অসংখ্য নারীর নাম পাওয়া যায় একেক জন একেকটা ফিন্ডে।  বেশি দেখা যায় সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। কর্ডোভা কিন্তু সংস্কৃতির জায়গাগুলো অনেক সমৃদ্ধি ছিল। কর্ডোভা ও সমগ্র আন্দালুসিয়া শহর জুড়ে শুধুমাত্র প্রায় ১৫টির মত মিউজিকের আলাদা আলাদা ইন্সট্রুমেন্ট ছিল এবং কবিতার অনেকগুলো ধারা ছিল। আন্দালুসিয়ায় সে’সময় সাহিত্যের ও মিউজকের অসংখ্য ধারা ছিল। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও অনেক এগিয়ে ছিল। এগুলো আলোচনার জন্য আরও বড় কলেবর প্রয়োজন।

জ্ঞানের কেন্দ্র : বাগদাদ

বাগদাদ কে বলা হয় এমন একটি শহর, যেটি মদিনার ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করে। বাগদাদকে একই সাথে বলা হয়, মদিনাতুস সালাম বা শান্তির শহর। তৎকালীন বিশ্বের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক জ্ঞানের কেন্দ্র ছিল এটি। মুসলমানদের বলা হয়ে থাকে জ্ঞানের কেন্দ্র বাগদাদ। এখানে বিশেষ করে খলিফা মামুনের সময় বায়তুল হিকমা কে কেন্দ্র করে সারা পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞানকে একত্র করা হয়েছিল। বাগদাদে বায়তুল হিকমার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো অনুবাদ আন্দোলন। অর্থাৎ তৎকালীন বিশ্বে এমন কোন জ্ঞান ছিল না যেটা বায়তুল হিকমাতে অনুবাদ করা হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে গ্রীক সভ্যতার দেড়শ’ বছরের যত অর্জন আছে–এরিস্টটল থেকে শুরু করে সবাইকে ব্যাখ্যা করা ও অনুবাদ করা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়া, এগুলো বায়তুল হিকমাতে হয়েছে। এরপর আমাদের ভারতবর্ষে গণিতের জন্য বিখ্যাত ছিল আর্যভট্ট । এদের যে জ্ঞানের সোর্স গুলো ছিল এগুলোর অনুবাদ, পৃথিবীতে পারস্য সভ্যতার যে জ্ঞানগুলো ছিল, মোট কথা–সারা পৃথিবীতে যেখানে যে জ্ঞান ছিল সেগুলোকে বায়তুল হিকমাতে এনে অনুবাদ করা হতো । বিশেষ করে খলিফা মামুন নিজেই যেহেতু বড় স্কলার ছিলেন, তিনি আমন্ত্রণ করে সব পণ্ডিত, জ্ঞানী ও আলেমদের বায়তুল হিকমাতে নিয়ে আসতেন। পণ্ডিত, জ্ঞানী ও আলেমদের জন্যও সবচাইতে সম্মানজনক ছিল এই বায়তুল হিকমায় কাজ করা ও গবেষণা করা। যেরকম এখন আমরা অক্সফোর্ডে যেতে পারলে মনে করি জাতে উঠে গেছি। তখনকার দুনিয়ায় বায়তুল হিকমাতে কাজ করাটা ছিল সবচাইতে সম্মানজনক। যেমন আমরা আল-ফারাবির কথা বলেছিলাম তিনি ২০ বছর বায়তুল হিকমাতে ছিলেন। সেখানে বসেই তিনি “মাদিনাতুল ফাদিলা” লিখেছিলেন। আল কিন্দি , মুসা আল খাওয়ারিজমী তার “কিতাবুল যাবার” এখানে বসে লিখেছেন। এরপর আল কিন্দি ক্রিপ্টো গ্রাফি আবিষ্কার করেছেন এখান থেকে। আল জাজারি ছিলেন , আবু জাফের ইবনে মুসা ছিলেন। বাগদাদ শহরকে কেন্দ্র করে অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত স্কলার উঠে এসেছেন। এ বাগদাদের অবস্থাও ছিল অনেকটা আন্দালুসিয়ার মতো। এরকম পরিচিত নাম বিজ্ঞানী হিসেবে, দার্শনিক হিসেবে, পদার্থ বিজ্ঞান,  জ্যোতির্বিদ হিসেবে এরকম অন্তত ২০-৩০ টা নাম এক টানে বলে দেওয়া যাবে। যারা বাগদাদে বসে জ্ঞানচর্চা করেছেন। পৃথিবর সর্বপ্রথম মানচিত্রও এখানে বসে বানানো হয়েছিল। পৃথিবীর আকার-আকৃতি এখানকার বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করেছিলেন।

ইসলামী সভ্যতা আমাদের এমন অসংখ্য শহর উপহার দিয়েছে। আব্বাসী খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ, সাফাভীদের রাজধানী ইসফাহান, মাওয়ারুন নাহর এর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সমরকন্দ, ফাতেমী খেলাফত এর রাজধানী কায়ারো, উসমানী খেলাফতের রাজধানী ইস্তাম্বুল। উসমানীদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র ছিল কোনিয়া। আমাদের ভারতীয় সালতানাতে  যদি দেখি ভারতের রাজধানী দিল্লি, বাংলার রাজধানী ঢাকা। এরকম অসংখ্য শহর ইসলামী সভ্যতা আমাদের উপহার দিয়েছিল।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বর্তমান সভ্যতায় মদিনার ঐতিহ্যকে ধারণ করার তৌফিক দান করুন। আমাদের যে শহরগুলো আছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সোনারগাঁও, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এগুলোকে আবারো সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার তৌফিক দান করুন। সেই আখলাক ও আধ্যাত্মিকতা আদালত দিয়ে শহরগুলো প্রতিষ্ঠিত হোক। একই রকম সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা আমাদের শহরগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হোক। সেই শহরকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে ধরনের মানুষ প্রয়োজন, আমাদের একেক জনকে আল্লাহর রাব্বুল আলামিন সেই ধরনের মানুষ হবার প্রচেষ্টাকারী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করুন।

সোর্স:

Pivot Cities in the Rise and Fall of Civilisations- Ahmet Davutolu

শহরের রূহ- হাসান আল ফেরদৌস

উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের মুসলমানদের ইতিহাস- ড. এম আব্দুল কাদের ও ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান

আব্বাসী খেলাফতের ইতিহাস- ড. মাহবুবুর রহমান

আরব জাতির ইতিহাস- সৈয়দ আমির আলী

মুসলিম স্থাপত্য ও প্রত্নতত্ত্বের বিকাশ- প্রফেসর মো আব্দুল করিম, ড. মো আবুল কালাম

ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট এর কোর্স-ইসলামী সভ্যতার শহর ব্যবিস্থা (ওস্তাদ ইউসুফ ইয়ালানিজ)

মসজিদে আকসাকে মুক্ত করার কৌশলগত পরিকল্পনা- আব্দুল ফাত্তাহ আল ওয়াইসি

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *