তালাল আসাদের সেকুলার চিন্তা: ধর্ম, আধুনিকতা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক রূপান্তর

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিত্ব চিন্তা ও দর্শন

“Secularism doesn’t simply separate from politics, it also redefine what religion is.”
— তালাল আসাদ

অর্থাৎ, সেকুলারিজমের কার্যকারিতা কেবল ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক করে দেওয়াই নয়; বরং সে ধর্মের ধারণাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত ও পুনর্গঠিত করতে উদ্যোগী হয়। আধুনিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা যখন নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করে, তখন সে ধর্মের প্রকৃতি, তার সীমা, তার চর্চা—সবকিছুকেই একটি নতুন ব্যাখ্যার কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করতে চায়।

এই গভীর বিশ্লেষণের অন্যতম প্রধান চিন্তানায়ক হলেন তালাল আসাদ, আধুনিক নৃবিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্ব-বিষয়ক আলোচনার এক প্রজ্ঞাসম্পন্ন মুখ।

তালাল আসাদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে তার বংশপরিচয় স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সামনে আসে। তার পিতা মোহাম্মদ আসাদ ছিলেন একজন বিশিষ্ট মুসলিম চিন্তাবিদ, যিনি ইসলামী সভ্যতা ও বিশ্বদর্শনে গভীর তাত্ত্বিক অবদান রেখে “The Road to Mecca” নামক খ্যাতিমান গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন। সেই মহান চিন্তাবিদের পুত্র তালাল আসাদ, যদিও তার পিতার মতো ইসলামী ধর্মতত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাকার হননি, তবুও তিনি এক ভিন্নধারার দৃষ্টিতে ধর্ম, আধুনিকতা ও সমাজ—এসবকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যা করেছেন এবং সম্পূর্ণ একাডেমিক পন্থায় তা বিশ্লেষণ করেছেন।

১৯৩২ সালে সৌদি আরবে জন্মগ্রহণ করা তালাল আসাদের শৈশবকাল মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে কেটেছে। তার বাবা চেয়েছিলেন তিনি আর্কিটেকচার নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করুন, কিন্তু তালাল আসাদ মনোনিবেশ করেন নৃবিজ্ঞানে; এবং এই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে তার চিন্তার জগৎকে নতুন মাত্রা প্রদান করে। তিনি ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরোতে নৃবিজ্ঞানে ভর্তি হন এবং পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এবং ৯৯ বছর বয়সে তিনি এখনো জীবন্ত জ্ঞানের এক আলোকবর্তিকা।

নৃবিজ্ঞানীরা সাধারণত বিভিন্ন মানব-সমাজে নির্দিষ্ট সময় কাটিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা সম্পন্ন করেন, যাকে ethnographic fieldwork বলা হয়। তালাল আসাদও এ ধরনের ফিল্ডওয়ার্ক সম্পন্ন করেছেন—উত্তর সুদানে, মিশরে এবং আরও বিভিন্ন অঞ্চলে। তবে তার খ্যাতির মূল কারণ কেবল নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণা নয়; বরং তিনি ছিলেন একজন গভীরমতি চিন্তাবিদ ও তাত্ত্বিক। তিনি তার লেখনীতে সরাসরি মূল্যায়ন করেননি যে “এটা ভালো” বা “এটা খারাপ”—বরং দেখিয়েছেন বিভিন্ন ঐতিহাসিক ধাপে কীভাবে ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি ও আধুনিকতা পরিবর্তিত হয়েছে, এবং কোন শক্তিগুলো সেই পরিবর্তনকে চালিত করেছে।

বাংলাদেশে তালাল আসাদের চিন্তাধারা খুব বেশি আগে প্রবেশ করেনি। মূলত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের দুই অধ্যাপক—রেহনুমা আহমেদ এবং মানস চৌধুরী—তালাল আসাদের ধারণাগুলোকে বাংলাদেশি একাডেমিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করে তুলেছেন। তাঁরা তার তত্ত্ব, আলোচনা ও গবেষণার দিগন্তকে এখানে নতুনভাবে উন্মোচন করেন।

তালাল আসাদের গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে—

ধর্ম কীভাবে গঠিত হয়,

ঔপনিবেশিকতা ও আধুনিকতা ধর্মীয় চর্চা ও প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে প্রভাবিত করে,

এবং ধর্ম ও সেকুলারিজমের পারস্পরিক সম্পর্ক।

তার বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো Genealogies of Religion—যেখানে তিনি দেখিয়েছেন ধর্ম আসলে ইতিহাসের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়।

এবং আজকের আলোচ্য গ্রন্থ Formations of the Secular—যেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন সেকুলারিজমের উত্থান কীভাবে ঘটেছে এবং এর রাজনৈতিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক (epistemological) কাঠামো আসলে কী।

তালাল আসাদের বুদ্ধিবৃত্তিক  দক্ষতার ক্ষেত্র অত্যন্ত বিস্তৃত—সেকুলারিজম, ধর্ম, সভ্যতা (civilization), ঐতিহ্য (tradition)—এসব বিষয় তিনি গভীর নিরীক্ষণের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন। তার আলোচনায় সেকুলারিজম কেবল একটি রাজনৈতিক ধারণা নয়, বরং এটি এমন এক জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো যা মানুষের জীবনবোধ, ধর্মবোধ এবং সামাজিক কাঠামোকে পুনর্গঠিত করে।

এখন Formations of the Secular গ্রন্থে প্রবেশের আগে শিরোনামটির তাৎপর্য নিয়ে কিছুটা ভাবা যায়। “Formation” শব্দটি বোঝায়—কোনো কিছুর গঠন, নির্মাণ বা সেই মানসিক কাঠামো যার মাধ্যমে আমরা কোনো ধারণাকে বুঝি।

তাহলে Formation of the Secular বলতে বুঝি—সেকুলার ধারণাটি কীভাবে গঠিত হলো, কোন ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও শক্তি এটি সৃষ্টি করল, এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি কোথায়।

তালাল আসাদ তার লেখনীতে দেখিয়েছেন যে সেকুলারিজম কেবল ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করে না—বরং ধর্মকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতা রাখে। আধুনিক রাষ্ট্র ধর্মের উপর ‘নিয়ন্ত্রণাধীন সংজ্ঞা’ আরোপ করে, এবং এই প্রক্রিয়া ধর্মীয় চর্চার রূপ, ভাষা, প্রতিষ্ঠান—সবকিছুকে নতুনভাবে নির্মাণ করে।

ফরমেশন হচ্ছে এমন কিছু কনসেপ্ট, যেটা দিয়ে সেকুলার যে একটি ধারণা বা ‘সেকুলার’ নামক একটি জ্ঞান–ক্যাটাগরি বুঝতে পারি। এই বইতে আসলে কোনো সরল ইতিহাস বিবরণ নেই; বরং সেকুলারিজমের পেছনে যে এপিস্টেমোলজিক্যাল অ্যাড্যাপশনগুলো আছে, সেইগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এবং পুরো বইতে তিনি অনেকগুলো শক্তিশালী প্রশ্ন উত্থাপন করেন। এসব প্রশ্নের তিনি সব সময় উত্তর দেন—তা নয়; বরং প্রশ্নের মাধ্যমে ভাবনার পরিসর উন্মুক্ত করে দেন।

এখন পুরো বইয়ের আলোচনায় কিছু পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। আমরা জানি, একাডেমিক রচনায় সাধারণত যে গবেষণা-পেপার প্রকাশিত হয়, সেখানে বলা থাকে কোন পদ্ধতিতে গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। তালাল আসাদও তার গ্রন্থে একটি সুনির্দিষ্ট আলোচনার পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন—

এটাকে বলা হয় পোস্ট–স্ট্রাকচারিজম,

এবং যে পদ্ধতিতে তিনি ব্যাখ্যা করেন—এটাকে বলে জিনিয়োলজি। এ ছাড়া তিনি যে ধারণাগুলো সামনে আনেন, সেগুলো নন–এস্যেন্সিয়ালিস্ট পদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

এখন এই পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে ছোট করে কিছু জানা প্রয়োজন—যাতে সামনে এগোলে আলোচনাগুলো বুঝতে সুবিধা হবে।

পোস্ট–স্ট্রাকচারিজমের বৈশিষ্ট্য

নৃবিজ্ঞান থেকে তাত্ত্বিক ধারা পর্যন্ত একাডেমিয়াতে বিভিন্ন স্কুল রয়েছে—ইভোলিউশনারি স্কুল, বিভাজন তত্ত্ব, মার্কসিস্ট স্কুল, স্ট্রাকচারালিস্ট পদ্ধতি এবং পরবর্তীতে পোস্ট–স্ট্রাকচারালিস্ট স্কুল।

পোস্ট–স্ট্রাকচারালিজম—অর্থাৎ, পোস্ট–কাঠামোবাদ—মূলত জ্ঞান (knowledge) এবং ক্ষমতা (power) সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করে। তারা প্রচলিত ব্যাখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, এবং বিশেষভাবে বাইনারি ধারণাগুলোকে অস্বীকার করে। বাইনারি নিয়ে আমরা সামনেই বিস্তারিত আলোচনা করব।

জিনিয়োলজির কাজ

জিনিয়োলজি দেখায়—

কোনো একটি কনসেপ্ট কীভাবে ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করল,

এর পদ্ধতি কী ছিল,

আগে কেমন ছিল,

কীভাবে এর বিবর্তন ঘটল,

এবং কোন কোন ঘটনার ভেতর দিয়ে সেই ধারণাটি নির্মিত হলো।

এটাই জিনিয়োলজি পদ্ধতির মূল কাজ।

নন–এস্যেন্সিয়ালিস্ট পদ্ধতি

এ্যাসেন্স মানে নির্যাস; নন–এস্যেন্সিয়ালিস্ট মানে সেই নির্যাসবাদী ধারণার বিপরীত।

যারা বলে—একটি বৈশিষ্ট্য দেখে পুরো সমাজ বা জনগোষ্ঠীকে বোঝা যায়—নন–এস্যেন্সিয়ালিস্টরা এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করে।

যেমন বলা হয়—

“ভাত রান্না হয়েছে কি না—একটি দানাই বলে দেয়।”

এ পদ্ধতিতে বলা হয়—একটি গ্রুপের একটিমাত্র বৈশিষ্ট্য দেখে পুরো গ্রুপকে বিচার করা যায়।

এই পদ্ধতির বিপরীতে নন–এস্যেন্সিয়ালিস্টরা দাঁড়ান।

তারা বলে—

নোয়াখালীর মানুষ এমন,

বরিশালের মানুষ ঝগড়া করে,

কালো মানুষরা এমন,

মুসলমানরা জঙ্গি—

এভাবে একক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে বিশ্লেষণ করা ভুল।

Formation of the Secular: বইয়ের মূল আলোচনা

এই আলোচনা বাংলাদেশের অনেকেই চেনেন—জমিউল হাসান স্যারও এটি নিয়ে কথা বলেছেন; ফলে তার আলোচনার সাথে কিছু সামঞ্জস্য থাকবেই, যেহেতু দুজনেই একই বই নিয়ে আলোচনা করেছেন।

Formation of the Secular বইটি তিন ভাগে বিভক্ত—

1. The Secular

2. Secularism

3. Secularization

তালাল আসাদ বলেন—এ তিনটি পৃথক কনসেপ্ট হলেও পরস্পরের সাথে আন্তঃনির্ভরশীল।

The Secular

The secular—এখানে ‘the’ বসিয়ে একটি সমকালীন জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্যাটাগরি তৈরি করা হয়েছে।

যেমন—the political, the religion।

তেমনি, the secular হলো এমন একটি জ্ঞান-পদ্ধতি, যা সেকুলারিজম কীভাবে তৈরি হয় তার তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রকাশ করে। সেজন্য একে বলা হয় জ্ঞানপদ্ধতিগত ক্যাটাগরি (epistemic category)।

এ অংশে anthropology-তে secularism, agency ও pain, torture—এ সব বিষয়ও আলোচিত হয়েছে।

Secularism: চিন্তার জগতের রূপান্তর

সেকুলারিজম হলো এমন একটি মানসিক ও দার্শনিক কাঠামো, যার মাধ্যমে মানুষ দুনিয়াকে দেখে।

সেকুলিজমের মূল ভিত্তিতে রয়েছে the secular-এর তত্ত্ব—যা আধুনিক চিন্তার জগৎকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে।

এর ফলে—

ধর্মীয় চিন্তায় নতুন প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে,

এথিক্স নতুনভাবে চিন্তা করা হয়েছে,

বিশ্বাস ও আত্মপরিচয় নিয়ে নতুন আলোচনা জন্ম নিয়েছে।

সেকুলারিজম কেবল চিন্তার জগৎ নয়—এটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প, একটি গভর্নমেন্টাল টেকনিক। রাষ্ট্র এটি জাতিরাষ্ট্রে প্রয়োগ করে। যদিও একে আমরা একটি রিজিয়ন-প্রকল্প হিসেবেও দেখতে পারি, কিন্তু বাস্তবে এর দ্বারা আমরা নিয়ন্ত্রিতও হই। এর মাধ্যমে আধুনিক ন্যাশন-স্টেট গঠিত হতে পারে।

বাইনারি তৈরির অভ্যাস

ধর্ম নিয়ে কথা বলতে গেলেই অনেকে বলে—

“সব জায়গায় ধর্ম আনা কেন?”

এটাই সেই দুই কাজ—

১) separation, এবং

২) binary তৈরি করা।

একটি জিনিসকে আরেকটির বিপরীতে দাঁড় করানো। যেমন—

Law বনাম Ethics

Religion বনাম Science

Public বনাম Private

এই বাইনারিগুলো পোস্টমডার্ন যুগের আগের সমাজে এত স্পষ্ট ছিল না।

দ্বীন ও দুনিয়া: একটি সেকুলার প্রোডাক্ট

আমরা শুনি—দ্বীনি জ্ঞান ও দুনিয়াবি জ্ঞান।

এই বিভাজনও আসলে একটি সেকুলার নির্মাণ।

দ্বীন ও দুনিয়াকে আলাদা করে দেখা, আলাদা জ্ঞান হিসেবে বিভক্ত করা—এগুলো আধুনিক সেকুলার বাইনারি।

প্রিমর্ডান সমাজে এ রকম পৃথকীকরণ ছিল না।

ফিকাহশাস্ত্রে—law ও ethics একসাথে আলোচনা হতো; কোনো অংশকে আলাদা করে দেখা হতো না।

মিথ ও ইতিহাসের বিভক্তি

সেকুলারিজম myth ও historyকেও আলাদা করেছে।

ইতিহাসে একসময় গল্প, কাহিনী, কাব্য—সবকিছুই ছিল।

যা ন্যাচারাল নয়, যা সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যার বাইরে—তাকে বলা হলো supernatural immersion, অর্থাৎ মিথ।

কিন্তু যখন সেকুলারিজম ইতিহাস লেখা শুরু করল—তখন factual accuracy খোঁজা শুরু হলো।

মিথকে ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া হলো।

ইতিহাস হলো শুধুমাত্র সেই অংশ—যেটাকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

সেকুলারিজমের গঠন তাই কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটমান প্রক্রিয়া নয়—এটি জ্ঞান, সত্য, ধর্ম, ইতিহাস, নৈতিকতা—সবকিছুকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার একটি গভীর প্রকল্প।

তালাল আসাদ এই পরিবর্তনগুলোর জিনিয়োলজি উন্মোচন করেছেন—কীভাবে এসব ধারণা তৈরি হলো, কীভাবে শক্তি ও জ্ঞানের সম্পর্ক এতে কাজ করেছে, এবং কীভাবে আধুনিক মানুষ তার দৃষ্টি, বোধ ও পরিচয়—সবকিছু নতুনভাবে নির্মাণ করতে বাধ্য হয়েছে।

আমাদের এই আধুনিক জীবনের অনিবার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেকুলার হিস্ট্রি। আমরা আজ যে ইতিহাস শিখি—তার বিপুল অংশই সেকুলার হিস্ট্রি থেকে আগত। তালাল আসাদ বলেন—এ প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না যে তারা কোনো পরম সত্য (ultimate truth) উপস্থাপন করবে বা মানুষের সামনে কোনো শক্তিশালী বিকল্প ধারণা তৈরি করবে।

এখানে একটি উদাহরণ—হযরত মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর ঘটনা। আমরা জানি, মুসা (আ.) আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন, এমনকি আল্লাহকে দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন। এসবই অবৈজ্ঞানিক নয়, বরং আল্লাহর কুদরতের প্রকাশ; কিন্তু এগুলোকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় ধরা সম্ভব নয়।

সেকুলার হিস্ট্রি, যা সেকুলারিজমেরই একটি সম্প্রসারণ এসে বলে:

এগুলো মিথ। গল্প। কাহিনী।

এগুলো ইতিহাসের অংশ হতে পারে না।

কিন্তু প্রিমর্ডান সমাজে এই বিচ্ছেদ ছিল না। মানুষের ইতিহাস—বার্তা, কাব্য, আশ্চর্য ঘটনা—সব মিলেই ছিল সামগ্রিক। কোরআনে অসংখ্য ঘটনা, উপাখ্যান, ভবিষ্যদ্বাণী, জান্নাত–জাহান্নামের বর্ণনা আছে, যেগুলোকে আজকের বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সেকুলার ইতিহাস এসবকেই ‘মিথ’ ঘোষণা করে, কারণ সেগুলো বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষার আওতায় আসে না।

সেকুলারিজম ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যেও পৃথক রেখা এঁকে দেয়।

কোরআন আসলে একটি ধর্মীয় গ্রন্থ, কিন্তু একইসাথে তা—

জীবনযাপনের বিধান,

সামাজিক ব্যবস্থা,

নৈতিক শিক্ষাবোধ,

মানুষের ইতিহাস,

এবং সৃষ্টিজগত সম্পর্কে জ্ঞানের উৎস।

প্রাচীন সমাজ কখনো বলেনি—“কোরআন শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ”, কিংবা “এটি শুধুই আধ্যাত্মিক গ্রন্থ।” কোরআন ছিল পূর্ণাঙ্গ, সমন্বিত নির্দেশনা।

কিন্তু সেকুলারিজম এসে বলে—

“ধর্ম এক জিনিস, বিজ্ঞান আরেক জিনিস।”

যেমন দ্বীন ও দুনিয়ার বিচ্ছেদও সেকুলার চিন্তারই উপজাত।

পাবলিক ও প্রাইভেট: সেকুলারিজমের বাইনারি নির্মাণ

এরপর সেকুলারিজম যে বাইনারিটি তৈরি করে—তা হলো পাবলিক ও প্রাইভেট।

তালাল আসাদ বলেন—এ দুইটি যেন একে অপরের ছোঁয়া না লাগে—এভাবে একটি কঠোর রেখা তৈরি করা হয়েছে।

পাবলিক স্পেয়ারে রাখা হয়েছে—

রাজনীতি,

প্রশাসন,

রাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি।

আর প্রাইভেট স্পেয়ারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে—ধর্ম।

উদাহরণ—

রাজনীতি নিয়ে আপনি প্রকাশ্যে কথা বলতে পারেন;

কিন্তু ধর্ম নিয়ে কথা বলা ব্যক্তিগত পরিসরের বিষয়, পাবলিক নয়—এটাই সেকুলার আদর্শ বলে।

তালাল আসাদ এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন—

যদি রাজনীতি পাবলিক স্পেয়ার হয় এবং ধর্ম প্রাইভেট—

তাহলে রাজনীতি যখন প্রাইভেট জীবনে হস্তক্ষেপ করে, সেটা বৈধ হয় কীভাবে?

রাষ্ট্র যখন ঠিক করে দেয় কোনটা ধর্ম, কোনটা কালচার, কী পালনযোগ্য—তখন ধর্ম কেন প্রাইভেট হয়ে থাকবে?

ধর্মের পাবলিক আলোচনা নিষিদ্ধ, কিন্তু রাজনীতি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—এই বৈপরীত্যের দিকেই আসাদ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

পবিত্রতা ও অপবিত্রতার বাইনারি

সেকুলারিজম পবিত্রতা ও অপবিত্রতাকেও বাইনারি করে।

তালাল আসাদ এখানে এডোনিস নামক আরবের একজন বিখ্যাত পোস্ট–মডার্ন কবির উদাহরণ তুলে ধরেন।

এডোনিস বলেন—

“আমি আল্লাহ বা খোদায় বিশ্বাস করি না। আমার কাছে মানুষই গড। মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই।”

তালাল আসাদ এখানে প্রশ্ন তোলেন—

যদি মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ হয়, তবে তাকে ‘গড’ বলা মানুষেরই একধরনের দেবতাকরণ নয় কি?

অর্থাৎ মানুষকে আবার একটি সুপারন্যাচারাল শক্তির পর্যায়ে উন্নীত করা হচ্ছে।

ধর্ম তো এক সুপারন্যাচারাল শক্তির কথাই বলে।

এডোনিস নিজেকে ধর্মের বাইরে রাখতে চাইলেও, মানুষকে ঈশ্বরতুল্য বানিয়ে আদতে সে ধর্মের আরেক ক্যাটাগরিতেই পড়ে যায়—এই কথাই বলেন আসাদ।

তালাল আসাদ এটিকে বলেন—

“Migration of the Holy”—

অর্থাৎ পবিত্রতার স্থানান্তর।

আগে পবিত্রতার ধারণা ছিল ধর্মকেন্দ্রিক, এখন তা মানুষ–কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে।

সেকুলারিজমের আত্ম-সংজ্ঞা

এতক্ষণ আমরা বিভিন্ন বাইনারি নিয়ে আলোচনা করলাম।

এবার আসাদ বলেন—

সেকুলারিজম নিজেকে সবসময় গ্রাউন্ড বা বেস হিসেবে দাঁড় করায়।

অর্থাৎ—

ধর্ম, নৈতিকতা, ইতিহাস, বিজ্ঞান—সবকিছুই যেন সেকুলার মাপকাঠি দিয়ে যাচাই করতে হবে।

সেকুলারিজম নিজেকে মানদণ্ড বানিয়ে অন্য সবকিছুকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে বিচার করতে চায়।

সেকুলারিজম নিজেকে কেবল ধর্ম থেকে রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার একটি কাঠামো হিসেবেই উপস্থাপন করে না; বরং একই সঙ্গে ধর্মের প্রকৃতি, ধর্মের সংজ্ঞা ও ধর্মের কার্যকারিতা সম্পর্কে একটি নতুন ব্যাখ্যাও প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তালাল আসাদের বিখ্যাত উক্তি—

“Secularism doesn’t simply separate from politics, it also redefines what religion is.”

অর্থাৎ সেকুলারিজম শুধু ধর্ম থেকে রাজনীতিকে বিচ্ছিন্নই করে না, বরং ধর্ম কী—এমন এক নতুন ধারণা মানুষের মনে স্থাপন করে।

আজকের আধুনিক জীবনধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ—সেকুলার হিস্ট্রি। আমরা ইতিহাসকে একটি ধর্মহীন, “বস্তুনিষ্ঠ” কাঠামো থেকে পড়ি। কিন্তু তালাল আসাদ বলেন, এই ইতিহাস রচনার উদ্দেশ্য কখনোই নিছক সত্য উপস্থাপন করা নয়; বরং একটি শক্তিশালী আদর্শ সমাজে প্রতিষ্ঠা করা।

এখানে তিনি উদাহরণ দেন—

মুসা (আ.)-এর আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা, আল্লাহকে দেখার আকাঙ্ক্ষা, বা জান্নাত-জাহান্নামের অস্তিত্ব—এসব বাস্তবতাকে সেকুলার ইতিহাস “মিথ” হিসেবে চিহ্নিত করে। কারণ আধুনিক বিজ্ঞান এগুলো ব্যাখ্যা করতে পারে না। অথচ পূর্বআধুনিক সভ্যতাগুলো ধর্মীয় কাহিনিকেও “ইতিহাস” হিসেবে গণ্য করত। কোরআন একটি সামগ্রিক গ্রন্থ—যেখানে ধর্মীয় বিধান, নৈতিকতা, দুনিয়ার জীবনব্যবস্থা, এমনকি বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিতও আছে। ইসলামী সভ্যতা কখনো ধর্ম ও বিজ্ঞানের আলাদা পরিচয় তৈরি করেনি। কিন্তু সেকুলারিজম এসে একটি কঠোর বাইনারি তৈরি করল—

ধর্ম এক জিনিস, বিজ্ঞান আরেক জিনিস; ধর্ম এক জগৎ, দুনিয়া আরেক জগৎ।

এভাবে সেকুলার চিন্তা দীন ও দুনিয়াকে দুই ভিন্ন ময়দানে ভাগ করে দেয়। সেকুলারিজমের আরেকটি বড় কাজ—ধর্মকে প্রাইভেট স্পিয়ারে ঠেলে দেওয়া।

রাজনীতি, আইন, অর্থনীতি—এগুলো পাবলিক।

আর ধর্ম—ব্যক্তিগত বিষয়।

এখানে তালাল আসাদ প্রশ্ন তোলেন—

ধর্ম যদি প্রাইভেট হয়, তবে রাষ্ট্র কীভাবে মানুষের ধর্মানুশীলনে নিয়ম আরোপ করতে পারে?

রাষ্ট্র যদি ঠিক করে দেয় কী ধর্ম, কী সংস্কৃতি—তবে ধর্ম কেন ব্যক্তিগত ব্যাপার? ধর্মকে প্রাইভেটে পাঠানো—সেকুলারিজমের অন্যতম কৌশল।

পবিত্র ও অপবিত্র : পবিত্রতার অভিবাসন

তালাল আসাদ এরপর পবিত্রতা-অপবিত্রতার ধারণা বিশ্লেষণ করেন। আধুনিকতা বলছে—মানুষই সর্বোচ্চ। বিখ্যাত আরব কবি আদোনিস যেমন বলেন—

“মানুষই আমার ঈশ্বর, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই।”

আসাদ প্রশ্ন করেন—

যদি মানুষই সর্বোচ্চ হয়, তবে আপনি মানুষকে দেবতার আসনে বসিয়ে ফেললেন না?

অর্থাৎ পবিত্রতার কেন্দ্র পূর্বে ছিল ধর্মে, আর এখন তা স্থানান্তর হয়ে মানুষকেন্দ্রিক হয়েছে। তালাল আসাদ একে বলেন—

Migration of the Holy – পবিত্রতার স্থানান্তর।

সেকুলারিজম দাবি করে—

ইনসাইড (সেক্যুলার জগৎ) = সত্য

আউটসাইড (ধর্ম) = অলীক চেতনা বা false consciousness।

মার্কসবাদীরা যেমন বলেন—

ফলস কনশাসনেস = বাস্তবতার বিকৃত উপলব্ধি।

ধর্ম আবার একটি আদর্শ প্রচার করে, তাই ধর্ম একটি ফলস কনশাসনেস।

আর সেকুলারিজম—ট্রু কনশাসনেস।

এভাবে সেকুলারিজম নিজেকে ঈশ্বরের স্থানে বসায়। পূর্বে সমাজ ছিল ধর্মকেন্দ্রিক; এখন সমাজ রাষ্ট্রকেন্দ্রিক।

আর রাষ্ট্রের মূল আকিদা—সেকুলারিজম।

ওয়াইল হাল্লাক এই প্রক্রিয়াকে বলেন—

“The murder of God by the State.”

অর্থাৎ রাষ্ট্র ধীরে ধীরে খোদার জায়গা দখল করে নেয়।

কালচার কে ঠিক করে? ধর্ম কে সংজ্ঞায়িত করে?—সেকুলারিজমই সিদ্ধান্ত নেয়

সেকুলার রাষ্ট্র নিজেই ঠিক করে—

কোনটি কালচার হবে, কোনটি ধর্ম হবে;

কোনটি পাবলিক, কোনটি প্রাইভেট;

কী বলা যাবে, কতটুকু বলা যাবে, কোথায় থামতে হবে।

ইতালির ক্রস ও ফ্রান্সের হিজাব—এই দুই কেস স্টাডি তালাল আসাদ তুলে ধরেন।

ইতালির ক্রস : ধর্ম → সংস্কৃতি

ইতালির পাবলিক স্পেসে ক্রস ব্যবহার নিয়ে মামলা হলে আদালত রায় দেয়—

ক্রস কালচার, তাই গ্রহণযোগ্য।

ফ্রান্সের হিজাব : ধর্ম → নিষিদ্ধ

ফ্রান্স বলে—

হিজাব ধর্মীয় প্রতীক, তাই পাবলিক স্পেসে নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশেও একই প্রক্রিয়া, একসময় লাল-সাদা শাড়ি “বাঙালি কালচার” ছিল; কিন্তু হিজাব, দাড়ি—ধর্মীয়।

সেকুলার চিন্তা নিজেই ঠিক করে দিল—কোনটি সংস্কৃতি, কোনটি ধর্ম।

এভাবেই সেকুলারিজম ধর্মকে তার নিজের সংজ্ঞায় ক্যাটাগরাইজ করে—

কোনটি “অথেন্টিক ধর্ম”, কোনটি “সঠিক ইসলাম”, কোনটি “সংস্কৃতি”—এসব সিদ্ধান্তও সে নিজেই নেয়। এবং এভাবে সে নিজেকে পরিচয় করায় যে—আমি হচ্ছি মূল ভিত্তি (ground), এবং আমার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই সব ধারণার জন্ম হবে।

এভাবে সেকুলারিজম নিজেকে পরিচয় করায়—“আমি হচ্ছি মূল ভিত্তি, আমি হচ্ছি গ্রাউন্ড; এবং আমার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই সমস্ত কনসেপ্ট, অর্থ, মূল্যবোধ ও সত্যের উৎপত্তি হবে।” সুতরাং সেকুলারিজম ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করে দেয়—কোনটি ইনসাইডে থাকবে আর কোনটি আউটসাইডে।

এই সিদ্ধান্তে নিয়ম হয়—ধর্ম হচ্ছে আউটসাইড, এবং ধর্মকে কখনোই সেকুলার পরিসর বা সেকুলার পরিমণ্ডলে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না।

আমরা আজ কথায় কথায় বলি—“সব বিষয়ে ধর্ম আনা যাবে না।”

এর অর্থই হলো—ধর্ম আউটসাইড, আর আমরা যে কথাবার্তা বলছি—সেটিই নাকি ইনসাইড, সেটিই নাকি স্বাভাবিক। ধর্মীয় বক্তব্য নাকি কখনোই পাবলিক পরিসরে যায় না—এটাই সেকুলারিজমের আদেশ।

কে ঠিক করে দেয়?

সেকুলারিজমই নির্ধারণ করে দেয়।

তালাল আসাদ তাই বলেন—

“The inside doesn’t hold the outside.”

যে জিনিস আউটসাইড হিসেবে ক্যাটাগরাইজ করা হয়েছে, ইনসাইডের চোখে সেটার জন্য কোনো জায়গা নেই, কোনো গ্রহণযোগ্যতাও নেই।

সেকুলারিজম বলে—ইনসাইডের বাইরে যা কিছু, সবই হচ্ছে consciousness অথবা অলীক চৈতন্য।

এখন এই consciousness-কে তারা আবার দুই ভাগে ভাঙে—

1. True consciousness – সেকুলারিজমের দৃষ্টিতে সত্য চেতনা

2. False consciousness – ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা এভাবে চিহ্নিত করে

এই ধারণাটি মার্কসবাদী ঐতিহ্যে বেশি পাওয়া যায়। মার্কস এবং এঙ্গেলস ব্যাখ্যা করেছেন—

যদি কেউ একটি নির্দিষ্ট আদর্শ দিয়ে সমগ্র বিশ্বকে দেখে, তবে জগতের সামগ্রিকতা তার কাছে অধরা থাকে—অর্থ বিকৃত হয়ে যায়।

ধর্ম যেহেতু একটি নির্দিষ্ট আদর্শ দেয়, তাই সেকুলার চোখে ধর্ম হচ্ছে false consciousness।

আর সেকুলারিজম—true consciousness, কারণ সে দাবি করে তার দৃষ্টিভঙ্গিই নাকি “বাস্তবতার নিরেট সত্য”।

এভাবেই সেকুলারিজম তার ফাংশন পরিচালনা করে—

সে ঈশ্বরের জায়গা দখল করে নেয়।

আগে যেখানে মানুষের চিন্তার ভিত্তি ছিল ঈমান, ওয়াহি, আখলাক ও ঐশী প্রজ্ঞা—সেখানে এখন ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে ন্যাশনাল স্টেট, যার আকীদাই হচ্ছে সেকুলারিজম।

এই তত্ত্বকে বিস্তৃত করেছেন সাবা মাহমুদ ও ওয়াইল হাল্লাক—যারা এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক।

ওয়াইল হাল্লাক রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের ভাষায় বলেন—

“Secularism is the murder of God by the State.”

অর্থাৎ সেকুলারিজম খোদার আসনটিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়ে হত্যা করে—নিজেই সেখানে অধিষ্ঠিত হয়।

এই নিয়মগুলো আমরা অবচেতনে মানি, সম্মান করি, অনুসরণ করি—যেন এক অদৃশ্য ইবাদত।

যে ধর্মীয় দিকগুলো লিবারাল সেকুলার মানসিকতার সঙ্গে মিলে যায়—রাষ্ট্র সেগুলো প্রচার করে।

যেগুলো মেলে না—তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় প্রাইভেটের অন্ধকারে।

এভাবেই রাষ্ট্র “অথেন্টিক ধর্ম” নির্ধারণ করে দেয়—

“এটাই সত্য ধর্ম, এভাবেই মানতে হবে। নইলে সেটা হবে জঙ্গি/কট্টর/অসহিষ্ণু ইসলাম।” এ থেকেই জন্ম নেয় “সফট ইসলাম”—একটি বিশুদ্ধ সেকুলার প্রকল্প।

রাষ্ট্র এবং কিছু তাত্ত্বিক ঠিক করে দেয়—কোনটা সফট ইসলাম, কোনটা হার্ড ইসলাম, কোনটা গ্রহণযোগ্য, কোনটা বর্জনীয়

কিন্তু ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে—বহু মাজহাব পাশাপাশি ছিল। কেউ কাউকে খারিজ করত না, অপমান করত না, সহনশীলতা ছিল স্বাভাবিক। সফট ইসলাম–প্রজেক্ট আসার পর থেকেই শুরু হয়—খারিজ, বাতিল, অসহিষ্ণুতা, দ্বন্দ্ব, আত্মিক সংকোচ। এটাই সেকুলার আধিপত্যের একটি সুক্ষ প্রক্রিয়া।

এখন আসি বইয়ের পরবর্তী আলোচনা—Thinking about Agency and Pain.

পেইন = ব্যথা, যন্ত্রণা

এজেন্সি = নিজের ইচ্ছায় কিছু করা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা

তালাল আসাদ বলেন—

পেইন সবসময় এজেন্সিকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। কিন্তু প্রি-মর্ডান যুগ ও পোস্ট-মর্ডানে এর ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

প্রি-মর্ডান যুগে পেইন মানে ছিল এক অর্থপূর্ণ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়া। প্রাচীন যুগে ব্যথা ছিল—আত্মশুদ্ধির পথ, আল্লাহর পরীক্ষা, পাপ মোচনের সুযোগ, রহমতের বার্তা, রুহানির অভিজ্ঞতা। একজন বিপদে পড়লে ভাবত—“আল্লাহ আমাকে পরীক্ষা করছেন।” “হয়তো সামনে বড় বিপদ ছিল—আল্লাহ এভাবে বাঁচালেন।” “হয়তো কোনো গুনাহ হয়েছে—এ ব্যথা আমাকে ভালো করবে।”

মাওলানা রুমি বলেন—

“This pain you feel are messengers. Listen to them.”

তুমি যতক্ষণ পেইন অনুভব করছ—জেনে নাও তুমি খোদার রহমতের ভেতর আছো।

বাচ্চা জন্ম দেওয়া—অত্যন্ত কষ্টকর, কিন্তু তা হলো স্বেচ্ছায় নেওয়া পেইন—একটি এজেন্সি। শহীদ হওয়া, নিজের শরীরকে কষ্ট দেওয়া—কোনো কোনো সময় রুহানির অভিজ্ঞতার জন্যই।

কিন্তু পোস্ট-মর্ডান যুগে পেইন মানেই শুধুই খারাপ বস্তু। আজকের সেকুলার যুগে—পেইন মানে খারাপ, পেইন মানে অসহনীয়, পেইন মানে দ্রুত দূর করতে হবে

পেটে ব্যথা—ট্যাবলেট।

মাথা ব্যথা—ট্যাবলেট।

কোনো অভিজ্ঞতা, কোনো শেখা, কোনো আত্মশুদ্ধি নেই।

পেইন = কেবল দূরীকরণ।

সেকুলার রাষ্ট্র দাবি করেছিল—ধর্মে টর্চার আছে এবং সেকুলারিজম সেখান থেকে মুক্তি দেবে। এখানে কোনো পেইন থাকবে না। কোনো সহিংসতা থাকবে না

কিন্তু তালাল আসাদ দেখান—সেকুলার রাষ্ট্র নতুন ধরণের টর্চার তৈরি করেছে। গুয়ানতানামো বে—সেটারই একটি ভয়ংকর উদাহরণ।

মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে ভেঙে ফেলার মতো যন্ত্রণা—

যাতে সে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে না পারে।

এজেন্সি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। প্রি-মর্ডান যুগে যন্ত্রণা মানুষকে শুদ্ধ করত। পোস্ট-মর্ডান যুগে যন্ত্রণা ব্যক্তিত্ব ধ্বংস করে। সেকুলার রাষ্ট্র কয়েক ধরনের সহিংসতাকে অদৃশ্য করে রাখে—মানুষ যেন না দেখে, অথবা দেখে—কিন্তু গ্রহণ করে নেয়। যেমন—কর্পোরেট খাদ্যশিল্পে পশু নির্যাতন, বড় বড় কোম্পানির উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ভয়াবহ সহিংসতা–এগুলো স্বাভাবিক। কিন্তু কোরবানির সময় একে বলা হয়—ভায়োলেন্স। অতএব, সেকুলার রাষ্ট্র ঠিক করে দেয়—কোন ভায়োলেন্স গ্রহণযোগ্য, কোনটি অগ্রহণযোগ্য, কোনটি নেগেটিভ, কোনটি “সংস্কৃতি”, কোনটি “ধর্মীয় সহিংসতা”

রাষ্ট্র গঠনের সময় যেসব ভায়োলেন্স হয়েছে—বিশ্বযুদ্ধ, উপনিবেশবাদ, গণহত্যা; এসবকে কখনো নেগেটিভ ভায়োলেন্স বলা হয় না।কিন্তু ধর্মীয় আচারের ক্ষুদ্রতম বিষয়কেও ভয়ঙ্কর সহিংসতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এভাবেই “দ্য সেকুলার” অধ্যায়ের শেষ অংশে তালাল আসাদ দেখান—সেকুলারিজম কেবল ধারণা নয়, এটি একটি শাসনব্যবস্থা ও একটি ক্ষমতা; যে ক্ষমতা ধর্মকে আউটসাইডারে পরিণত করে এবং মানুষকে true–false consciousness-এ ভাগ করে কালচার–ধর্ম নির্ধারণ করে, পেইনের অর্থ বদলে দেয়, এবং আধুনিক রাষ্ট্রকে ঈশ্বরের আসনে বসায়

এতদ্বারা “দ্য সেকুলার” অংশের আলোচনা শেষ হলো।

এবার আমরা প্রবেশ করি সেকুলারিজম অধ্যায়ে। এই অংশে তিনটি প্রধান আলোচ্য বিষয় রয়েছে। প্রথমত, “Reading the ‘Human’ through Human Rights”—অর্থাৎ মানবাধিকার ধারণার ভেতর দিয়ে মানুষকে কিভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

তালাল আসাদ এখানে একগুচ্ছ গভীর প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন—আজকের দুনিয়ায় হিউম্যান রাইটস বা মানবাধিকার এক অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শক্তিশালী আদর্শ। মানবাধিকার বলতেই আমরা বুঝি, সকল মানুষ সমান; সবার মৌলিক অধিকার আছে; প্রত্যেকের মানবতাকে সম্মান জানানো আবশ্যক।

কিন্তু তালাল আসাদ প্রশ্ন করেন—মানবাধিকার ধারণা কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে?

তার মতে, মানবাধিকার ধারণাটি পশ্চিমের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকেই উৎপন্ন; তাই পশ্চিমই ঠিক করে দেয়—

কে প্রকৃত “মানুষ”,

কে “কম মানুষ”,

আর কে “সমস্যাজনক মানুষ”।

পশ্চিমা মূল্যবোধ, সেকুলারিজম এবং ন্যাশনাল স্টেট–এই আদর্শের অনুসারীদেরকে পশ্চিম পূর্ণ মানব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু যারা এই আদর্শের বাইরে—তাদেরকে তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ হিসেবে বা ‘সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি দেখান—

প্রাচ্যের কোনো দেশে যুদ্ধ লাগলেই পশ্চিম হঠাৎ মানবাধিকার রক্ষার কথা বলতে শুরু করে। সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে; বলে—ওরা অমানবিক, ওদেরকে আমাদের মতো সভ্য হতে হবে।

কিন্তু একই সময়ে—

গুয়ানতানামো বে-তে যখন ভয়াবহ নির্যাতন চলছে,

ইসরাইলের হাতে ফিলিস্তিনে যখন নির্মম অত্যাচার, গণহত্যা ঘটছে তখন মানবাধিকার নিয়ে তাদের আর কোনো উচ্চবাচ্য থাকে না।

তালাল আসাদ বলেন—

মানবাধিকার আসলে নিরপেক্ষ কোনো ধারণা নয়।

বরং এটি একটি রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত টুল, যার মাধ্যমে পশ্চিম কখনো মানবতাকে রক্ষা করার নামে কাজ করে, আবার কখনো চুপ হয়ে থাকে নিজের ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে।

পরবর্তী আলোচনায় তালাল আসাদ ইউরোপে মুসলমানদের অবস্থান নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন—ইউরোপ মুসলমানদেরকে শুধু ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে দেখে না। বরং তাদেরকে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে।

ইউরোপীয় সেকুলার রাষ্ট্র দাবি করে—

“আমরা সব ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষ।” কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তারা মুসলমানদেরকে সবসময় Other, অর্থাৎ “অন্য” হিসেবে দেখে।

Other—এই ধারণাটিকে তিনি ব্যাখ্যা করেন এভাবে:

Other সবসময় power–এর সাথে সম্পর্কিত। ধনী মানুষের ছেলে একজন রিকশাওয়ালার ছেলেকে দেখে—

“সে আমার মতো নয়, সে নিচের শ্রেণি”—এই ভাবেই। কিন্তু রিকশাওয়ালার ছেলে কখনো ধনীর ছেলেকে “অন্য” হিসেবে দেখে না। বরং সে ভাবে—“আমি যদি তার মতো হতে পারতাম!”

পশ্চিমও একইভাবে নিজেদেরকে ‘আদর্শ’, ‘উচ্চ’, ‘সভ্য’ হিসেবে নির্ধারণ করে, আর মুসলমানদেরকে—

নিচু,

অসভ্য,

সমস্যা,

হিসেবে চিহ্নিত করে।

ইউরোপের দৃষ্টিতে সেকুলারিজম কখনো মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণভাবে মেনে নিতে চায় না। মুসলিম পরিচয়কে তারা সবসময় একটি রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।

তালাল আসাদ বলেন—ইউরোপিরা ইতিহাসকে তিন ভাগে ভাগ করে—

১. আদিম যুগ,

২. বর্বর যুগ (ধর্মীয় বর্বরতা),

৩. রেনেসাঁ–এনলাইটমেন্ট–সেকুলারিজম–সভ্য যুগ।

এটাই তারা “বিশ্বের ইতিহাস” হিসেবে দাবি করে।

কিন্তু ইসলামী ইতিহাস তো মোটেও এরকম নয়।

ইউরোপ যখন মধ্যযুগ পার করছিল মুসলিম সভ্যতা তখন জ্ঞানের শীর্ষে, আলোকোজ্জ্বল সংস্কৃতির উন্মেষে, সর্বোচ্চ অগ্রগতিতে ছিল। এই দুই ইতিহাস আলাদা—একটিকে অন্যটির মানদণ্ডে বিচার করা অন্যায়। কিন্তু ইউরোপ মুসলিমদেরকে সবসময় নিজেদের ইতিহাসের চোখে দেখে, ফলে মুসলমান সবসময় Other।

সেকুলারিজম, ন্যাশনাল স্টেট এবং পরিবার

শেষ আলোচ্য বিষয়—

সেকুলারিজম, ন্যাশনাল স্টেট ও ধর্মের সম্পর্ক।

এই পুরো বইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে—ন্যাশনাল স্টেট।

ন্যাশনাল স্টেটের কাছে পরিবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারা পরিবারকে মূল্যায়ন করে, কিন্তু তার পরিসরকে সবসময় সংকুচিত রাখতে চায়। সেকুলার রাষ্ট্র সবসময় নির্দিষ্ট ধরনের পরিবারকে আদর্শ বলে প্রচার করে–এক ছেলে, এক মেয়ের বিবাহ, নিউক্লিয়ার পরিবার।

এই আদর্শের বাইরে কোনো পরিবারকে তারা স্বীকৃতি দেয় না।

সেকুলার রাষ্ট্র পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় কেন?

কারণ—

সেকুলার রাষ্ট্রের কাজ—ল (Law) বা আইনের ওপর ভিত্তি করে গড়া।

আর পরিবারের কাজ—Ethics বা নৈতিকতার ওপর দাঁড়ানো।

সুতরাং—

পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে নৈতিকতাকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

এভাবে রাষ্ট্র নিজের মানদণ্ডে নৈতিকতা তৈরি করে এবং মানুষের ব্যক্তিগত, ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনকে পরিচালনা করতে থাকে।

এই আলোচনাগুলো আমাদের সামনে নতুনভাবে প্রশ্ন তোলে—

মানবতা, অধিকার, স্বাধীনতা—এসব ধারণার পেছনে কোন শক্তি কাজ করছে?

আর একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *