সৈয়দ নকীব আল আত্তাস

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিত্ব

একবিংশ শতাব্দীর এই অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে সর্বত্রই আমরা খুঁজে পাই আশাহীনতার ভয়াল থাবা৷ মুসলমানরা যেন আজ এক অন্য দুনিয়ায় বসবাসরত। তাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, শিক্ষার দর্শনের মাঝে দেখা দিয়েছে বিকৃতি। পরাজয় বরণ করে তারা যেন পাশ্চাত্যের নাগপাশে সভ্যতার অবরুদ্ধ হওয়াকে মেনে নিয়েছে নীরবে।

  বহমান এই সময়ের বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? এইযে আমাদের আশপাশে এত ধরনের সংকট, তবুও আমাদের সেই কুয়ার বাসিন্দা হয়েই পড়ে থাকা কেন?

  আমরা যদি সমগ্র পৃথিবীর শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দেখতে পাবো এই সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটি পাশ্চাত্যের এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এই সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করছে কিছু কেরানি, যারা বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতায় ভুগছে। এই শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সমাজ, সভ্যতা, মানুষ হচ্ছে কলুষিত।

 মোটাদাগে, জ্ঞান এমন এক বিষয়, যা একটি সভ্যতার পট পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম। মুসলমানদের মাঝে আজ এই জ্ঞানেরই দৈন্য দশা। জ্ঞানগত চ্যালেঞ্জ সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা নেই। তবুও এই অন্ধকারে আলোর মশাল হাতে নিয়ে এগিয়ে এসেছেন কিছু বিপ্লবী। বর্তমান পৃথিবীতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা জ্ঞানের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সর্বপ্রথম মুসলিম জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সেই বিপ্লবী দলেরই একজন; বাহাসা জনগোষ্ঠীর অন্যতম মুখপাত্র সৈয়দ নকীব আল আত্তাস।

  মুসলিম জনপদ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের কথা আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আমাদের চোখে ভাসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ। এটি হয়তো এ কারণেই যে, ইসলামের উত্থান ও উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। কিন্তু ‘রাত্রি যত গভীর হয়, প্রভাত তত এগিয়ে আসে’- প্রবাদবাক্যের সাথে একীভূত হয়ে ইসলামের উৎসস্থল থেকে বহুদূরে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাহাসা জনগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে মুসলিম সংস্কৃতিকে ধারণ করেছে তীব্র ভালোবাসার সহিত। উৎস থেকে বহু দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও তারা ভোলেনি নিজেদের শেকড়। মুসলিম পরিচয়কে আঁকড়ে রেখেছে অনন্য সব বৈশিষ্ট্য ধারণের মাধ্যমে।

 প্রদীপ থেকে অনেক দূরত্বের পরও যারা এভাবে নিজেদেরকে আলোকিত করেছেন, তারা প্রধানতঃ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুরে বসবাস করেন। এদের বড় একটি অংশ মুসলমান।

  ইসলামকে তারা শুধু ধারণই করেননি। বরঞ্চ এটি নিয়ে যে তাদের মনোজগতে চিন্তার ঝড় বয়ে গেছে, তা তাদের কিছু ব্যক্তিত্বের লেখনী পড়লেই অনুধাবন করা যায়। নকীব আল আত্তাস তাদেরই একজন।

 এক বাক্যে সৈয়দ নকীব আল আত্তাসের পরিচয় দিতে গেলে বলা যায়, তিনি একাধারে একজন গবেষক, লেখক, চিন্তক, শিক্ষক ও সংগঠক৷ জীবনের এক পর্যায়ে তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। পর্যটক হিসেবেও তিনি পৃথিবীর বেশকিছু দেশ বিশেষত উত্তর আফ্রিকা ও স্পেন ভ্রমণ করেন। এই সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব মুসলিম উম্মাহর খিদমতে তার সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন।

 আধুনিককালে ইসলামী চিন্তা, বিশেষত ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রে নকীব আল আত্তাসের অবদান খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এক্ষেত্রে সৈয়দ আলী আশরাফ ও ইসমাঈল রাজী আল ফারুকীর চেয়ে তার অবদান কোনো অংশেই কম নয়।

   নকীব আল আত্তাস ইসলামী শিক্ষাকে নতুন একটি শব্দ দ্বারা সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, ‘আদব’ শব্দটি এক্ষেত্রে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য। এই শব্দটির তাৎপর্য ব্যাখা করে তিনি এটি দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে ইসলামী ঐতিহ্যে আদব মানে হচ্ছে একইসাথে জ্ঞান ও কর্ম। অথচ ‘আদব’ বলতে আমরা কেবল লৌকিক ভদ্রতাসূচক আচরণকেই বুঝিয়ে থাকি। কিন্তু আল আত্তাসের লেখনীতে ‘আদব’ শব্দটি বারবার এসেছে এবং তিনি তার সমগ্র চিন্তাকে এই শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য প্রকাশ করেছেন। এই একটি শব্দকে তিনি একইসাথে জ্ঞান, নৈতিকতা, ইনসাফ ও সমাজ অর্থেও ব্যবহার করেছেন। তার কাছে ‘আদব’ শব্দটি এত গুরুত্ববহ হওয়ার কারণ হলো- তিনি মনে করেন ইসলামী শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য আখলাক সম্পন্ন মানুষ তৈরি, রাষ্ট্রের জন্য নিবেদিতপ্রাণ নাগরিক তৈরি করা নয়। কথাটি আমরা পুনরায় পড়ি! কী কঠিন একটি কথা তিনি দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করেছেন। বর্তমানের আয়নায় আমরা এই কথার বিপরীত প্রকাশই কি দেখতে পাই না? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কেবলমাত্র রাষ্ট্রের সেবা করার জন্য রুহানী শক্তি বর্জিত কিছু রোবট তৈরি করছে, যারা জাগতিক উন্নতিকেই জীবনের সর্বস্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে।

  আল আত্তাসের মতে, আদব হলো শিক্ষার সমর্থক। মানুষের রুহের দুটি প্রকৃতি – ন্যায়ানুগ আত্মা পাশবিক আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং এভাবেই মানুষ নিজেকে নিজের প্রেক্ষাপটে স্থাপন করবে এবং সৃষ্টির এই ধারাকে রক্ষা করে নিজের প্রতি আদব পালন করবে।

  ১৯৯৫ সালে নকীব আল আত্তাস তার যুগান্তকারী কর্ম ‘Prolegomena to the Metaphysics of Islam: An Exposition of the Fundamental Elements of the World view of Islam’ লেখেন। এখানে তিনি ইসলামী বিশ্বদর্শনের রূপরেখার পাশাপাশি আদব সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়-

 “আদব এর তাৎপর্য হচ্ছে জ্ঞান; এ জ্ঞান প্রজ্ঞা (হিকমাহ) থেকে উৎসারিত; জ্ঞান অন্বেষণের লক্ষও এতে প্রকাশ পাচ্ছে; এটি আত্মার অভ্যন্তরীণ ও বহির্মুখীকাণ্ডও বটে যা নৈতিক মূল্যবোধ ও নিষ্ঠার ফলশ্রুতি। আর এর উৎস ধারা দর্শনও নয়, বিজ্ঞানও নয়, বরং প্রত্যাদিষ্ট সত্য যা ধর্ম থেকে প্রবাহিত হয়।”

  অর্থাৎ আল আত্তাস এখানে আদবের উৎস হিসেবে ওহী বা আল্লাহ প্রদত্ত বাণীর কথা উল্লেখ করেছেন। ওহীর অনুপস্থিতি মানে যে মানব শৃঙ্খলার চরম বিপর্যয়, সেটিও তার কথায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বর্তমানে আমাদের দৈন্যদশার কারণও যে আদবের অভাব, সেটিও আমরা তার কথা থেকেই অনুধাবন করতে পারি।

  একটি সাক্ষাৎকারে তিনি শায়েখ হামজা ইউসুফকে বলেন, “আমার কাছে আদবের সংজ্ঞা হলো এমন- ‘ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যে কাজ করাকে আদব বলে’। এখানে ‘ন্যায়’ বলতে আমি বুঝাচ্ছি সকল ভালো গুণাবলীর সমষ্টিকে। ন্যায় হলো সকল ভালো গুণাবলীর সমষ্টি, তাই এটি সকল ভালো গুণাবলীর শীর্ষে অবস্থান করে।

যখন আমরা প্রতিটি বস্তুকে তার উপযুক্ত স্থানে হক-ভাবে রাখার জ্ঞান অর্জন করতে পারবো, তখন আমাদের প্রজ্ঞা অর্জিত হবে। আর যখন আমাদের প্রজ্ঞার দ্বারা আমরা কোনো কাজ করতে পারি, তখন সে কাজটাকে আদব বলা হয়। আর যখন আমরা আদবের সাথে কোনো কাজ করতে পারি, তখন আদল বা ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।

এখানে সারকথা হলো, প্রজ্ঞার সাহায্যে প্রতিটি ব্যক্তি ও বস্তুকে তার উপযুক্ত স্থান দেয়ার যে আদব ইসলামে অতীতে ছিলো, তা এখন মুসলিম বিশ্ব থেকে হারিয়ে গেছে। ফলে এখন আর ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না। আর, এ কারণেই আমি বলেছি, বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের সমস্যা হলো আদবের সঙ্কট।”

  তার মতে, আদবের অসংগতির কারণে জ্ঞানের ক্ষেত্রে দুর্নীতির উদ্ভব হয়, যার ফলে মিথ্যা ও কপট নেতাদের জন্ম হয়। এতে করে সত্যিকার নেতৃত্বকে স্বীকার করার ক্ষমতাও বিনষ্ট হয়ে যায়। এই পরিস্থিতির একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক অরাজকতা। ফলে সঠিক সিদ্ধান্তগুলো অন্ধকারেই ঢাকা পড়ে যায়, সৃষ্টি হয় নানাবিধ মেকি সমস্যার।

  শিক্ষাজীবনে মালয় অঞ্চলের বিখ্যাত সুফী ও বুদ্ধিজীবীদের উপর কাজ করতে যেয়ে তিনি কিছুটা সুফিবাদ দ্বারা প্রভাবিত হন। এ কারণে আদবকে তিনি নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। পৃথিবীতে আসার আগে রুহানী জগতে সব মানুষের আত্মা আল্লাহকে রব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আল্লাহর সাথে মানুষের এই চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আদব হচ্ছে এই চুক্তির বরখেলাপ না করা।

  ইসলামকে নিছক একটি ধর্ম মনে করলে বিরাট ভুল করা হবে। অথচ এই ভুলটিই আমরা অহরহ করে থাকি। আল আত্তাসের মতে ইসলাম একটি ওহী ভিত্তিক সভ্যতা। কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতা এর বিপরীত। তাদের জ্ঞানের ভিত্তি হচ্ছে ধর্মহীন যুক্তিবাদ। তাদের বিশ্বদর্শন, বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান আজ মুসলিমদের গ্রাস করেছে৷ অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। আল আত্তাস চমৎকারভাবে এই অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন-

  “আমার মতে এ বিষয়টির উপর গুরুত্বারোপ করা উচিত যে জ্ঞান নিরপেক্ষ নয়। বরং একে কোনো একটি স্বভাব বা বৈশিষ্ট্য ও বিষয়াদি দিয়ে মনের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া যায় যা তখন জ্ঞানের মুখোশ ধারণ করে উপস্থিত হয়। বস্তুত একে সামগ্রিকভাবে গ্রহণ করা হয়, সত্য জ্ঞান হিসেবে নয়। বরং রঙিন চশমা বা কাচের ভেতর দিয়ে এর প্রকাশ ঘটে। এ জ্ঞানের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠা সভ্যতার বিশ্বদর্শন, বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান ও মনোবৃত্তিক ধারণা বর্তমানে নিজস্ব সংগঠন ও প্রচারের প্রধান ভূমিকা পালন করছে। যা নির্মিত ও প্রচারিত হয়েছে তা হচ্ছে উক্ত সভ্যতার স্বভাব ও ব্যক্তিত্ব বিশিষ্ট জ্ঞান। এ জ্ঞানকে এমন চাতুর্য ও ছদ্মবেশের সাথে তুলে ধরা হয়েছে যে, অসচেতন লোকেরা মনে করবে তাই বাস্তব জ্ঞান।”

   পশ্চিমা সভ্যতার অন্যতম প্রভাবশালী দর্শন হলো ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেকুলারাইজেশন। এটিকেই তারা স্বতন্ত্র ধর্ম হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। এর ভয়াল থাবা গ্রাস করেছে মুসলমানদের সংস্কৃতি, রাজনীতি, আইন, অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, বিনোদনসহ সবকিছু। তাদের লক্ষ্য এমন এক পৃথিবী গড়া, যেখানে ধর্ম ও পরকালীন বিশ্বাসের কোনো প্রভাব থাকবে না। তারা হবে স্বাধীন, লাগামছাড়া।

  মুসলিম সমাজও আজ নিজ গতিপথ থেকে সরে গিয়ে পশ্চিমা সভ্যতার বিশ্বাস ও মূল্যবোধ অনুসরণ করতে শুরু করেছে। একইসাথে তারা এটি সমাজের অন্য অংশের উপর জোরপূর্বক চাপিয়েও দিতে চায়। মূলত, তারা চায় নিজেদের চিন্তার মাঝে ইসলামকে বন্দী করতে।

   কিন্তু ইসলাম এই ধরনের সংকীর্ণতা, পরিবর্তন, উন্নতি ও প্রগতিকে অনুমোদন দেয় না। বরঞ্চ ইসলামের নিকট প্রগতির অর্থ হচ্ছে রাসূল (সা) এর দেখানো ইসলামের মৌলিক রূপের দিকে প্রত্যাবর্তন।

  বর্তমান মুসলিম সমাজের এই অধঃপতনের পেছনে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন নকীব আল আত্তাস। কেননা, এই শিক্ষাব্যবস্থা কেবলমাত্র বৈষয়িক উদ্দেশ্যে নিবেদিত; যা মানুষকে বিশ্ব মানবতা নিয়ে ভাবতে শেখায় না, মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে না, বরঞ্চ আত্মকেন্দ্রিক হিসেবে গড়ে তোলে। এ কারণে আল আত্তাস মুসলিম সমাজের পচন রোধের উপায় হিসেবে decolonization- বি উপনিবেশীকরণ এবং de-westernization- অপশ্চিমীকরণের কথা বলেছেন। এর পদ্ধতি হিসেবে তিনি ‘জ্ঞানের ইসলামীকরণ’ তত্ত্বের উদ্ভব ঘটিয়েছেন। এই তত্ত্বের মূলকথা হলো: মন, শরীর ও আত্মার ইসলামীকরণ এবং মুসলমানের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে এই আদলে নির্মাণ করা।

  ইসলাম মনে করে সকল জ্ঞানের উৎস আল্লাহ তা’য়ালা এবং এটিই হবে শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা প্রদানে অক্ষম। এ কারণে আল আত্তাস শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামীকরণের উপর জোর দিয়েছেন। এক্ষেত্রে ভাষাগত দিকেও ছিল তার তীক্ষ্ম দৃষ্টি।

   ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টি দিলে আমাদের চোখে পড়ে মুসলিম জাতি সমূহের ভাষার শক্তি! তারা তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করেই শাসন করেছিল অর্ধ দুনিয়া। সেসব ভাষাগুলোতে বিদ্যমান অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দকে বর্তমানে বিকৃত করা হয়েছে এবং অযথাই অপরিচিত বিদেশি শব্দ এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে যা আমাদের পিছিয়ে পড়ারই নামান্তর। 

  এছাড়াও বর্তমানে ইংরেজির আধিপত্যের ভিড়ে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মাতৃভাষাকে বুদ্ধিবৃত্তি ও জ্ঞান চর্চার ভাষা হিসেবে নির্মাণের ক্ষেত্রে আল আত্তাস একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপনে সক্ষম হয়েছেন। তিনি মালয় ভাষাকে মালয়েশিয়ার জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে মুসলিম জাতির নিকট এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন যে, নিজস্ব ভাষাকে শক্তিশালী করার এটিই সময়।

  শুধু সমস্যা চিহ্নিতকরণ নয়, বরং সমাধানের নতুন দুয়ার উন্মোচনে নকীব আল আত্তাসের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিক্ষা ব্যবস্থাকে পশ্চিমা প্রভাব থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে জ্ঞানের ইসলামী করণের একটি মৌলিক নীতিও তিনি হাজির করেছেন। সেটি হলো:
১. ইসলামী প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব।
২. ইসলামী প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে বুঝা।
৩. ইসলামী জ্ঞানের ভাষা আরবির উপর দক্ষতা।
৪. ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, সংস্কৃতি, সভ্যতা, ইসলামী জ্ঞানের দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক রূপ ও পটভূমি এবং বিশ্ব ইতিহাস হিসেবে ইসলাম অধ্যয়ন।

 অথচ আজ যদি আমরা নিজেদের জীবন, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রের প্রতি লক্ষ্য করি তবে এই মূলনীতির ছিঁটেফোঁটাও কোথাও খুঁজে পাই না। আমরা আজ নীল সাদা জগতে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করি, অথচ ইসলাম কীভাবে একেকটি ধর্মকে সংজ্ঞায়িত করেছে, তা জানার চেষ্টাও করি না। পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা তো আমাদের মাথাব্যথার আরেক কারণ৷ অথচ সেই সভ্যতার বিরুদ্ধে বাহ্যিকভাবে আমরা কঠোর প্রতিবাদ জানালেও নিজেদের মন, মস্তিষ্ক সঁপে দিয়েছি তাদেরই পায়ের নিচে। তাদের মূল উদ্দেশ্য, ইসলামী সভ্যতার বিরুদ্ধে তাদের উত্থানের ইতিহাস, ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে কেবলমাত্র ইসলাম বিদ্বেষের স্বরূপ আমরা কখনোই অনুধাবন করতে পারব না যতক্ষণ না আমরা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের সভ্যতা, সংস্কৃতির আগাগোড়া যাচাইয়ে নামবো। আর তখনই প্রয়োজন হবে আরবি ভাষার। একটি ভাষা যে কতখানি শক্তিশালী হতে পারে, তা আরবী ভাষার মাঝে পরিপূর্ণ ডুব না দিলে কখনোই অনুধাবন করা যাবে না। ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, সংস্কৃতি, সভ্যতা প্রভৃতি বিষয় সবচেয়ে গভীরতম ধারণা লুকায়িত এই ভাষার মাঝেই৷ তাই প্রয়োজন আরবী ভাষার উপর প্রখর দক্ষতা। আর জ্ঞানের ইসলামীকরণের জন্য এসবের পাশপাশি প্রয়োজন ইসলামী জ্ঞানের দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক রূপ এবং বিশ্ব ইতিহাস হিসেবে ইসলামের অধ্যয়ন। কী চমৎকার একটি চিন্তা! বিশ্ব ইতিহাস হিসেবে আমরা কি কখনো ইসলামকে অধ্যয়ন করেছি? সমগ্র মহাবিশ্বের ইতিহাসই যে ইসলামের ইতিহাস, সেভাবেই বা ভেবেছি কখনো? উত্তর আসবে, ‘না’। অথচ নকীব আল আত্তাস এই বিশ্বের ইতিহাসকে ইসলামের আয়নায় দেখতে বলেছেন আমাদের। এরই ছাঁচে ঢেলে সাজাতে বলেছেন শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পশ্চিমা প্রভাব থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে তার প্রদত্ত এই নীতি প্রকৃতপক্ষেই উম্মাহর জন্য পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার এক আলোকজ্জ্বল হাতিয়ার।

কেবল একাডেমিক ক্ষেত্রই নয়, ময়দানে কাজ করতেও তিনি কখনো কুণ্ঠাবোধ করেননি। ১৯৮৭ সালে তিনি কুয়ালালামপুরে International Institute of Islamic Thought and Civilization (ISTAC) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেন।

 আল আত্তাস এ পর্যন্ত ইংরেজি ও মালয় উভয় ভাষাতেই সর্বমোট ২৬ টি বই লিখেছেন। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য –

 ১. Rangkaian Ruba’yat

 ২. Some Aspects of Sufism as Understood and Practised Among the Malays

 ৩. Raniri and the Wujudiyah of 17th Century Acheh

 ৪. Preliminary Statement on a General Theory of the Islamization of the Malay-Indonesian Archipelago

 ৫. Prolegomena to the Metaphysics of Islam: An Exposition of the Fundamental Elements of the World view of Islam

   নকীব আল আত্তাসের সৃষ্টিশীল জীবনের ধারাবর্ণনা পড়লে শিহরিত হতে হয়। একজন ব্যক্তি, যিনি তার সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন উম্মাহর কল্যাণে; অথচ আমরা অনেকে আজও তাকে চিনি না, জানি না। তিনি আমাদের হতাশাগ্রস্ত জীবনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন, দেখিয়েছেন পাশ্চাত্যকে মোকাবেলা করার পথ। তার চিন্তার সাথে পরিচিত হওয়ার পর এই আমাদেরই কাজ হলো এ চিন্তার চর্চা এবং বাস্তবায়ন।

  উম্মাহর এই সংকটকালীন সময়ে এ ধরায় পদার্পণ করুক হাজারো নকীব আল আত্তাস। তাদের চিন্তা ও কর্মে সুশোভিত হোক ইসলামের প্রতিটি অঙ্গন।

 গ্রন্থঋণ:

 ১. Prolegomena to the Metaphysics of Islam: An Exposition of the Fundamental Elements of the World view of Islam, Syed Muhammad Naquib al-Attas

 ২. উত্তর আধুনিক মুসলিম মন, ফাহমিদুর রহমান

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *