ধর্ম কী? আমরা যখনই ‘ধর্ম’ শব্দটা শুনি, তখন আমাদের মানসপটে উপাসনারত কিংবা মূর্তি, দেব-দেবী বা পূর্বপুরুষদের প্রতি প্রার্থনারত মানুষদের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু ধর্মের সত্যিকার অর্থ শুধুমাত্র এতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ধর্মের অর্থ অনেক বেশি বিস্তৃত। যদি ধর্মকে শুধুমাত্র মূর্তি, দেব-দেবী বা পূর্বপুরুষদের প্রতি প্রার্থনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়, তবে তা হবে একটি সংকীর্ণ চিন্তা।
মনস্তাত্ত্বিক এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ম হলো এমন একটি বিশ্বদর্শন, যার মাধ্যমে একজন মানুষ তার নিজের অবস্থান ও ঈমান বা বিশ্বাস অটুট রেখেই একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বা একটি বিশেষ পদ্ধতিতে এ বিশ্বকে দেখেন। আর এর মাধ্যমে একটি আখলাকী মূলনীতি বিকশিত হয়।
আমার মতে, ধর্ম আমাদেরকে ঈমান বা বিশ্বাসের পদ্ধতিসমূহ শেখায়, যা ধর্মভীরু মানুষদেরকে জীবনের অর্থ সম্পর্কে একটি সাধারণ বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে এবং মানুষকে শেখায় কীভাবে আখলাকী সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে হয়।
ধর্মের সংখ্যা অনেক। রাসূল (স.)-এর সময়ে আহলে কিতাব, মূর্তিপূজক, পৌত্তলিক, অজ্ঞেয়বাদী, নাস্তিকরাও ছিলো। সূরা কাফিরুনের لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ )তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য এবং আমার দ্বীন আমার জন্য) আয়াতে মহান আল্লাহ তাদের বিশ্বাসকেও তাদের দ্বীন বা ধর্ম বলেছেন।
সূরা কাফিরুনে আল্লাহ বলেন-
“বলুন! হে কাফেরকূল! আমি ইবাদত করি না, তোমরা যার ইবাদত করো। এবং তোমরাও ইবাদতকারী নও, যার ইবাদত আমি করি। এবং আমি ইবাদতকারী নই, যার ইবাদত তোমরা করো। তোমরা ইবাদতকারী নও, যার ইবাদত আমি করি। তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য এবং আমার দ্বীন আমার জন্য।”
অর্থাৎ, এ দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ম হলো এ সমগ্র বিশ্ব সৃষ্টিজগৎ এবং নিজেকে দেখার উপায় বা পদ্ধতি। ধর্মের মধ্যেই রয়েছে সকল মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল সমাজই নিজ নিজ ধাঁচ অনুযায়ী এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে।
এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রশ্নগুলো হলো-
মানুষ কে?
মানুষ কোথা থেকে এসেছে?
মানুষের শেষ গন্তব্য কোথায়?
এ মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হলো?
মহাবিশ্ব চিরন্তন নাকি একদিন তা ধ্বংস হয়ে যাবে?
বিশ্বদর্শনই সে সমাজের ধর্মে পরিণত হয়। আর এ থেকেই বিকশিত হয় সে সমাজের মানুষের আখলাকী মূল্যবোধ। যদি কোনো সমাজের বিশ্বদর্শন পাল্টানো হয়, তখন অনিবার্যভাবে সে সমাজের আখলাকী মূল্যবোধও পাল্টে যায়। এ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তরই একটি সমাজের বিশ্বদর্শন গঠন করে এবং এ গঠিত
আর এ দৃষ্টিকোণ থেকে ফ্যাসিবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্তমান পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদও একেকটি ধর্ম। ধর্ম হতে পারে অধার্মিকতারও ধর্ম! তাই ধর্মকে ব্যাখ্যা করা আসলেই সহজ নয়!
এবার রূহানিয়াত বা আধ্যাত্মিকতার প্রসঙ্গে আসা যাক। রূহানিয়াত বা আধ্যাত্মিকতা কী? আর-রূহ এসেছে আর-রূহানিয়াত থেকে। কোরআনে হযরত জিবরাইল (আ.)-কে রূহ বলা হয়েছে। আল-কোরআন নিজেই রূহ। এটিই রূহানিয়াতের সর্বোচ্চ পর্যায়। কিন্তু বর্তমান আধুনিক বিশ্বে এ রূহানিয়াত বা আধ্যাত্মিকতা শব্দটির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না, যা উদ্বেগজনক।
বর্তমানে আধ্যাত্মিকতা বলতে এমন এক অনুভূতিকে বোঝানো হয়, যে অনুভূতির ফলে মনে হয় মানুষ তার নিজের সত্তা থেকে বের হয়ে ভিন্ন এক জগতে প্রবেশ করছে। এমনকি আধ্যাত্মিকতাকে যৌনতার সাথেও মিশিয়ে ফেলা হচ্ছে। আর এভাবে আধ্যাত্মিকতা একটি বিকৃত চিন্তায় পরিণত হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে উদাহরণস্বরূপ আমেরিকার বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞে স্কট প্যাক এর মতামত উল্লেখ করা যায়। তার রচিত বিখ্যাত একটি বই The Road Less Travelled। এ বইটি এতই জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে, দশ বছর ধরে এটি সেরা বইয়ের স্থান দখল করে ছিলো এবং পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য প্রায় সকল ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বইয়ে তিনি আধ্যাতিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন, এ আলোচনার জন্যই মূলত বইটি এত বিখ্যাত। অথচ এ আলোচনা পড়লে বোঝা যায়, আধ্যাত্মিকতা নিয়ে তিনিও একপেশে ভাবনা লালন করেন। তিনি আধ্যাত্মিকতাকে যৌনতার সাথে মিশিয়ে ফেলেছেন! বইয়ে তিনি লিখেছেন_ “সাইকোথেরাপি পেশার সাথে যুক্ত অনেকেই সেসব থেরাপিস্টকে তিরস্কার করে থাকেন, যারা তাদের রোগীকে সুস্থ করার প্রয়োজনে তাদের সাথে যৌন সম্পর্কেও জড়ান। আমি মনে করি, তিরস্কারকারী এসব থেরাপিস্ট যোগ্য থেরাপিস্ট নন, তারা সত্যিকারার্থে বুঝেন না যে এ রোগীরা মানসিকভাবে কতটা বিপর্যস্ত বা তাদের আসলে কী প্রয়োজন। আমার কাছে যদি কখনো এমন রোগী আসে, ভালোমতো যাচাই-বাছাই এবং নিরীক্ষণের পরে যদি আমি বুঝি যে তার আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা প্রয়োজন, তবে আমি তা-ই করবো।”
অর্থাৎ, তারা আধ্যাত্মিকতার চর্চাকে যিনার পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে!
অতঃপর আলোচ্য বিষয় মনস্তত্ত্ব। আপনি যদি মনোবিজ্ঞানীদের নিকট এর সংজ্ঞা জিজ্ঞেস করেন, তবে হয়তো একেকজন একেক ধরনের মতামত দেবেন। কেউ কেউ মনস্তত্ত্বকে তাদের চিন্তার আলোকে এক রকম ভাবেন, জীববৈজ্ঞানিক মনোবিদরা আরেক রকম শুধুমাত্র তাদের নিজেদের ক্ষেত্রের আলোকে বিবেচনা করেন। যেমন-মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষকরা ভাবেন। তাই সত্যিকারার্থে এর সংজ্ঞায়ন অতটাও সহজ নয়। আর ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর সংজ্ঞায়ন তো আরো কঠিন।
বর্তমান পশ্চিমা শক্তি আমাদের বিশ্বদর্শন পাল্টে ফেলার এক মহোৎসবে নেমেছে যেন! তারা আমাদের মনস্তাত্ত্বিক ও রূহানী বা আধ্যাত্মিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটিয়ে তাদের সৃষ্ট বিশ্বদর্শন আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। মানুষের বিশ্বদর্শন পাল্টে গেলে তার আখলাকও পাল্টে যায়, যার উদাহরণ আমরা নিজেরাই।
একটি বিশ্বদর্শন প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু পট পরিবর্তনকারী নায়ক বা প্রধান চরিত্র প্রয়োজন। পশ্চিমা বিশ্বে এমন কয়েকজন নায়ক আছেন, যারা সনাতন ধর্মগুলোকে কাজে লাগিয়ে নতুন বিশ্বদর্শনের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। ডারউইন, ফ্রয়েডসহ এ ধরনের আরও অনেক ব্যক্তিত্বের উদাহরণ দেওয়া যাবে, যারা নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন। মজার বিষয় হলো যখন আপনি তাদের বিশ্বদর্শনকে ধারণকারী মানুষ, অর্থাৎ অধর্মই যাদের ধর্ম, এমন কারো সামনে বলবেন যে আপনি ধার্মিক, আপনি খুব ভালোভাবে ধর্মের আদেশ-নিষেধ মেনে চলেন, তারা অবাক দৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকাবে। এমনভাবে তাকাবে, যেন আপনিই কাফের!
আমরা বর্তমানেও একটি পরাধীন ও দুর্বল জাতি। যখন থেকে ইউরোপীয়রা আমাদের শাসন করতে শুরু করেছিলো, তখন থেকে তাদের অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিলো আমাদের বিশ্বদর্শনের ভিত নাড়িয়ে দেওয়া। আর এক্ষেত্রে তারা বৈপ্লবিক সফলতা লাভ করেছে। আমাদের অনেকেই তাদের ঈমান হারিয়েছে, তাদের শেকড় ভুলে গিয়েছে। আমাদের মুয়ামালাতও পাল্টে গেছে। আজ উপনিবেশ পরবর্তী সময়ে এসে আমরা আরও ভয়ানক আগ্রাসনের শিকার হচ্ছি, তা হলো আখলাকী আগ্রাসন। এ আগ্রাসন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
আমরা, অর্থাৎ শোষিত শ্রেণির উপর উপনিবেশবাদী শোষক শ্রেণির মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব তীবভাবে লক্ষণীয়। সমাজে শোষিতদের উপর শোষকদের প্রভাবের ক্ষেত্রে ইবনে খালদুনের মতামত অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তার মত অনুযায়ী, শোষিত শ্রেণি তাদের অক্ষমতা ও দুর্বলতার দরুণ ক্রমান্বয়েই শোষক শ্রেণির ভুল কাজ ও অনাচারগুলোকে মেনে নিতে শুরু করে। বর্তমানেও এমনটিই ঘটছে! যেমন-ইংরেজি ভাষা। এক্ষেত্রে আমার উদাহরণ যদি দিই আমি যখন থেকে ইংরেজি বলা শুরু করেছি, তখন থেকে আমার আরবী উচ্চারণেও ইংরেজি উচ্চারণের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মনে হতো যেন একজন ইংরেজ আরবীতে কথা বলছে! এমনকি আমার বেশভূষা, আচার-আচরণেও ইংরেজ ভাব চলে আসে।
মূলত প্রতিটি ভাষার সাথেই সে জাতির সংস্কৃতির ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। যার ফলে যখন কেউ অন্য কোনো ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সে নিজের অজান্তেই সেই জাতিকে অনুকরণ করতে শুরু করে এবং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে। বর্তমানে আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের দেশগুলোতে এটি অহরহ ঘটছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিক হলো, শোষিত শ্রেণি এক সময় শোষকদের পরিচয়েই নিজেদেরকে পরিচিত করাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সিগমুন্ড ফ্রয়েড ভিন্ন চিন্তা লাললকারী হলেও এ ব্যাপারে তিনি ইবনে খালদুনের চিন্তাই গ্রহণ করে নিয়েছেন এবং একে নামকরণ করেছেন “Identification with the Aggressor”। বর্তমানে আসলে এমনটিই ঘটছে। উপনিবেশবাদীরা, যারা এক সময় আমাদের প্রকাশ্য শত্রু ছিলো, তাদের কারাগার থেকে বাহ্যিকভাবে মুক্ত হওয়ার পরে আমরা তাদের শত্রুতার কথা ভুলে গিয়ে তাদের জীবনমানকেই বেছে নিচ্ছি, তাদের মতো করে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি, তাদের প্রদত্ত বিষয়াদিকেই জীবনের বড় পাওয়া হিসেবে মনে করছি। অথচ একবারও ভাবছি না, শোষক জাতির অদৃশ্য শেকলে আমাদের হাত-পা এখনো বাঁধা পড়ে আছে! এক্ষেত্রে উন্নত তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা বলা যায়। বর্তমানে টেলিফোন, ল্যাপটপ, আইফোন, আইপ্যাড, ইন্টারনেটের ব্যবহার আমাদের জীবনকে সহজ করে তুলেছে। কিন্তু আমরা বেমালুম ভুলে গেছি যে, এসবকেও তারা আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানিয়েছে। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। তিন ভাই-বোনের একজন তার হাতের আইফোন দেখিয়ে বললো, আমি একটি আইফোনের মালিক! অন্যজন তার হাতের আইপ্যাড দেখিয়ে বললো, আর আমি আইপ্যাডের মালিক! তখন কাছে বসে পর্যবেক্ষণে থাকা তাদের বাবা রাগান্বিত স্বরে বললো, এগুলোর মালিক আমিই, আমিই তোমাদেরকে ব্যবহার করার জন্য কিনে দিয়েছি!
এসব প্রযুক্তি উপভোগ করার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। আর এটি মূলত শোষক শ্রেণির শোষণের অন্যতম হাতিয়ার। আমরা বর্তমানে আমাদেরকে শোষণকারীদের জৌলুশপূর্ণ, উন্নত তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধাময় জীবন দেখে সে জীবন পাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আর তারাও আমাদেরকে এসবের মাধ্যমে আমাদের করণীয়, দায়িত্ব, চিন্তা ভুলিয়ে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাদেরকেই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে
বসাতে দ্বিধা করছি না। তাদেরকেই ভদ্র, সভ্য জাতি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছি এবং নিজেরাও এমন হওয়ার চেষ্টা করছি। এসবের কারণে আমরা আমাদের অতীত ইতিহাস ভুলে যাচ্ছি.
তাদের নিকৃষ্ট শোষণের ইতিহাস আমরা ভুলতে বসেছি। ফলশ্রুতিতে শোষণকারী হিসেবে তাদের সাথে আমাদের যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন ছিলো এবং তাদেরকে নির্মূল করার জন্য যে প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয় ছিলো, তা ক্রমশ নাই হয়ে যাচ্ছে। এটিকে আমি বলি ‘Cultural Reciprocal Inhibition’ ।
এটির দুটি মাধ্যম রয়েছে। প্রথমটি হলো-উন্নত যোগাযোগ ও প্রযুক্তির মাধ্যমে অভ্যস্তকরণ।
এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। যখন আপনি কোনো ব্যক্তিকে দিয়ে কোনো একটি কাজ করাতে চাইবেন বা তাকে পরিবর্তন করতে চাইবেন, তখন আপনার প্রথম কাজ হবে তাকে আশ্বস্ত করা, চিন্তামুক্ত করা, তার জন্য বিষয়টি সহজ করে তোলা। এর মাধ্যমে আপনার প্রতি এবং সে বিষয়টির প্রতি তার সকল ধরনের আপত্তি বা ভীতি কেটে যাবে। তারপর তাকে ধীরে ধীরে বিষয়টির সাথে পরিচিত করিয়ে দেবেন।
যেমন ধরুন-একজন ব্যক্তির উচ্চতাভীতি আছে। বিল্ডিংয়ের একদম উপরের তলার ছাদ থেকে নিচে তাকানোতে অভ্যস্ত করতে হলে প্রথমে তাকে দোতলার ব্যালকনিতে নিয়ে যেতে হবে এবং সেখান থেকে নিচে তাকাতে বলতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে তিন তলা, চার তলাসহ উপরের তলাগুলোর ব্যলাকনিতে নিয়ে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে অভ্যস্ত করাতে হবে। এভাবে সর্বশেষে যখন তাকে ছাদে নিয়ে গিয়ে নিচে তাকাতে বলবেন, তখন দেখবেন সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এবং বিষয়টিকে সহজভাবে নিচ্ছে।
আমাদের জাতির সাথে ঠিক এমনটিই ঘটছে। আমরা সম্মোহিত রোগীর মতো তাদের উন্নত যোগাযোগ ও প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছি এবং সেই সাথে ক্রমান্বয়ে তাদের নৈতিক অবস্থান ও আদর্শ গ্রহণ করে নিচ্ছি।
দ্বিতীয় মাধ্যম হলো-মিডিয়া ও ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার। এর কুফল ভয়ানক, যার অন্যতম উদাহরণ পর্নোগ্রাফির প্রচার-প্রসার। মিডিয়া ও ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহারের খারাপ প্রভাব নিয়ে বর্তমানে স্বয়ং পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, তারা এর সমাধান নিয়ে ভাবছেন। যেমন পর্নোগ্রাফির ব্যাপারে আলবার্ট মহলার বলেন-
“পর্নোগ্রাফির নৈতিক প্রভাব এখন পর্যন্ত ভালোভাবে প্রমাণিত। পর্নোগ্রাফির থাবা আমাদের লক্ষ লক্ষ বন্ধু এবং প্রতিবেশীর জীবনে ধ্বংস ও ক্ষতি ডেকে এনেছে, বিবাহিত জীবনে ভাঙ্গন নিয়ে এসেছে, যৌনশক্তি নষ্ট করেছে, বিকৃত যৌনাচার বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং মন-মানসিকতা বিকৃত করে দিচ্ছে। অথচ এ ধ্বংসাত্মক প্রভাব সত্ত্বেও ইন্টারনেট-অর্থনীতির সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হওয়ার দরুণ পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির সংখ্যা বেড়েই চলেছে।”
পর্নোগ্রাফির প্রভাব নিয়ে পরিচালিত জরিপগুলোতে পর্নোগ্রাফির শারীরিক এবং মানসিক কুপ্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে।
পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত পুরুষরা অতিরিক্ত পুরুষত্বের ফ্যান্টাসিতে ভোগে, অন্যদিকে তাদের স্ত্রী বা সঙ্গী নারীদের প্রতিও তারা সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। অবাস্তব ও বিকৃত শারীরিক সম্পর্কের প্রতি ঝোঁক বেশি থাকে তাদের। আর এ কারণে বেশিরভাগ বিবাহিত সম্পর্কই ভেঙে যাচ্ছে। পর্নোগ্রাফি নারীদেরকে স্রেফ ভোগের পণ্য হিসেনে উপস্থাপন করছে এবং পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত মানুষ নারীদেরকে এ দৃষ্টিতেই দেখছে। পর্ন তারকাদের নিত্যনতুন অঙ্গভঙ্গি, বিকৃত যৌনাচার মানুষের মানসিকতা নষ্ট করে দিচ্ছে এবং তাদের উগ্র যৌনাসক্ত করে তুলছে, সেই সাথে পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তিও বাড়িয়ে তুলছে। ফলশ্রুতিতে পর্নোগ্রাফির ইন্ডাস্ট্রি আরো বিস্তৃত হচ্ছে। এসব ইন্ডাস্ট্রি পরিচালকদের কাজই হলো পর্নোগ্রাফির দর্শকদের চাহিদা আরও বাড়ানো, তাহলে তাদের ব্যবসার পরিধিও বৃদ্ধি পাবে।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উত্থাপন করেছে, আর তা হলো পর্নোগ্রাফি দর্শকদের বিশ্বদর্শনও বিকৃত করে দিচ্ছে!
তবে এ সকল কিছু ছাপিয়ে আমাদের বিশ্বদর্শনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো বর্তমান সমাজবিজ্ঞানের প্রভাব। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের যুবকদেরকে যে সমাজবিজ্ঞান পড়ানো হচ্ছে, তা তাদের বিশ্বদর্শনেই পরিবর্তন নিয়ে আসছে। তাদেরকে শেখানো হচ্ছে, মনোবিজ্ঞানই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী জ্ঞান। কারণ এটি মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে কথা বলে, মানুষের আচরণ নিয়ে কথা বলে। মনোবিজ্ঞান মূলত হাইব্রিড একটি জ্ঞান। অন্য সকল জ্ঞানই এ মনোবিজ্ঞানে সন্নিবেশিত। অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞানসহ অন্যান্য সকল জ্ঞানে ঘাটতি থাকলেও মনোবিজ্ঞানে কোনো ঘাটতি নেই!
অথচ মনোবিজ্ঞানের জনক এবং বোদ্ধারা মানুষ, সৃষ্টিতত্ত্ব, জীবন, মানুষের প্রকৃতি, আচরণসহ সামগ্রিক বিষয়, ধর্ম, সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছেন, তা বিকৃত ও ধ্বংসাত্মক!
আচরণবাদের জনক জন বি. ওয়াটসন মানুষ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তার Behaviorism গ্রন্থে বলেছেন-
“আমরা বিশ্বাস করি যে, মানুষ মূলত পশু-ই। অন্যান্য পশু থেকে তাকে যে বিষয়টি আলাদা করেছে, তা হলো তার ব্যবহার। মানুষ নিজেকে অন্য পশু বা প্রাণিদের সাথে শ্রেণিভুক্ত করতে চায় না। তারা স্বীকার করতে চায় যে তারা প্রাণী, কিন্তু অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে তারা ভিন্নতার দাবি রাখে। তাদের কাছে এমন কিছু আছে, যা অন্য প্রাণীদের নেই। আর এ বিষয়টিই মূল সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়টি ধর্ম, পরকাল, নীতি-নৈতিকতা বা আখলাক, মা-বাবা ও সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা, দেশের প্রতি ভালোবাসাসহ সব কিছুর সমন্বয় ঘটিয়েছে।”
সিগমুন্ড ফ্রয়েড তার Future of an illusion বইয়ে বলেছেন-
“যেখানেই ধর্মের প্রশ্ন আসে, সেখানেই মানুষের সকল ধরনের অসততা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধের আলোচনা আসে।”
অর্থাৎ ধর্মের কাজই হলো মানুষের সকল কাজকে সৎ-অসৎ এর পাল্লায় মাপা। ধর্ম সবসময়ই মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চায়, দোষী ও পাপী হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।
তিনি আরও বলেন, “দার্শনিকরা কোনো একটি শব্দের মূল অর্থ উদ্ঘাটন করার ক্ষেত্রে সে শব্দের অর্থের আর বিশেষ কিছু বাকি না থাকা পর্যন্তই গবেষণা করে যান। তারা নিজেদের জন্য তৈরি করা অস্পষ্ট বিমূর্ততাকে ‘ঈশ্বর’ নাম দিয়েছে। আর মূলত তারা এ কাজ করেছে গোটা বিশ্বের সামনে নিজেদেরকে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য। সেই সাথে তারা যেন এটি নিয়ে গর্ব করতে পারে যে, তাদের স্বীকৃত সৃষ্টিকর্তার ধারণাই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বিশুদ্ধ। অথচ তাদের সৃষ্টিকর্তা একটি অবাস্তব বিষয় ছাড়া আর কিছুই নয় এবং ধর্মীয় মতবাদ অনুসারে কোনো সর্বশক্তিমান সত্তাও নয়।”
তার মতে, সাইকো-এনালিসিসের বিজ্ঞানের কাজই হলো ধর্মের এ ধরনের সকল ভ্রান্তি উন্মোচন করা এবং দূর করা।
তারা সারা বিশ্বকে শেখাচ্ছে মনোবিজ্ঞানও একটি বিজ্ঞান। অথচ এটি বিজ্ঞান নয়, বরং এটি একটি দর্শন! ফ্রয়েড, ওয়াটসন বা অন্য কোনো সাইকোলজিস্ট, অথবা মনোবিজ্ঞানের কোনো ছাত্রই তো ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ কথা বলেননি যে, মানুষের রূহ বলতে কিছু নেই; শুধুমাত্র যৌনতার মাধ্যমেই মানুষের জন্ম হয় এবং যৌনতাই হলো প্রধান চালিকাশক্তি যা মানুষকে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়; মানব প্রকৃতি বলতে কিছু নেই, বরং পরিবেশই মানুষকে গঠন করে। তাই এটি মূলত দর্শনই!
আর এসবের মাধ্যমে তারা আমাদের মন-মানসিকতা বিগড়ে দিচ্ছে এবং আমরাও কোনো ধরনের বাছবিচার ছাড়াই তাদের খেলার পুতুলে পরিণত হচ্ছি, আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে; আমরা পরিণত হচ্ছি এক শিকড় বিহীন জাতিতে, আমাদের বিশ্বদর্শনও পাল্টে যাচ্ছে।
আমি মনে করি, বর্তমানে আমরা এ সমস্যায় গুরুতরভাবে আক্রান্ত হচ্ছি। এ সময়ে আমাদের উচিত কীভাবে এ আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় এবং কীভাবে আমাদের আখলাকী দৃষ্টিভঙ্গিকে সুরক্ষিত করা যায় তা নিয়ে ভাবা।
আমাদেরকে বিশেষ করে রেনেসাঁ পরবর্তী সময় থেকে পাশ্চাত্য বিশ্বের প্রভাব সম্পর্কে ভাবতে হবে।
তারা বরাবরই একেকটি প্রান্তিকতাকে বেছে নিয়েছে। যখন কোনো সমাজ একটি প্রান্তিকতাকে বেছে নিয়েছে, তখন তাদেরকে সংশোধন করতে গিয়ে মধ্যমপন্থাকে বেছে না নিয়ে তারা অন্য একটি প্রান্তিকতাকে বেছে নিয়েছে, যা আগের প্রান্তিকতার বিপরীত।
বর্তমানে আমরা এ ধরনের চরম প্রান্তিকতারই মুখোমুখি। উদাহরণ হিসেবে যৌনতার কথা বলা যায়, যার উপর ভিত্তি করে ফ্রয়েড তার তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। গ্রীক ও রোমানদের সময়ে সমকামিতা একটি নিষিদ্ধ বিষয় ছিলো। অতঃপর খ্রিস্টান ধর্ম আসলো এবং এ পেন্ডুলাম অন্যদিকে ঘুরে গেলো। খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করতো, যে মানুষ সকল ধরনের শারীরিক কামনা বা চাহিদা মুক্ত থাকতে পারবে এবং শারীরিক সম্পর্কে জড়াবে না, সেই শ্রেষ্ঠ। আর শারীরিক সম্পর্ক হতে হবে শুধুমাত্র বংশ বৃদ্ধি করার জন্য, আনন্দ উপভোগের আধনিক পশ্চিমা বিশ্ব যৌনতার ক্ষেত্রে নিয়ে আসে অন্য রকম চিন্তা। পেন্ডুলাম আবার জন্য নয়। এ চিন্তাও এক ধরনের প্রান্তিকতা। আর এর ফলাফলও হয়েছে ভয়ানক। তারপর বিপরীত দিকে ঘুরে যায়। পশ্চিমা বিশ্ব সমকামীতাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে শুরু করে এবং এটিকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা শুরু করে।
সে সময়ে জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট মোগাবে পশ্চিমা বিশ্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তার দেশে সমকামিতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন, কিন্তু তার পরেরদিনই তিনি আমেরিকার সিনেটরের পক্ষ থেকে চিঠি পেলেন। সিনেটর তাকে বলেছিলেন, “তুমি মানবতাবিরোধী কাজ করছো। তুমি যদি এ নিয়ম না পাল্টাও, তাহলে আমরা তোমার দেশে অর্থ সহায়তা বন্ধ করে দিবো।”
এভাবে তারা সমকামিতাকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য সকল উপায়, সকল পন্থায় প্রচেষ্টা চালায়।
আমি যখন ছাত্র ছিলাম, পঞ্চাশের দশকে, তখন সমকামিতাকে মানসিক রোগ বলা হতো। এটিকে কখনোই স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে দেখা হতো না। ষাটের দশকে, আমি যখন একটি প্রশিক্ষণের জন্য মিডলসেক্স হাসপাতালে যোগদান করি, আমার মনে আছে, দু’জন সমকামী মানুষকে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করার পরে সেই হাসপাতালে নিয়ে আসে চিকিৎসার জন্য। সে সময়ে আমার সাথে থাকা চিকিৎসকদের মধ্যে একজন ছিলেন আচরণবাদের প্রশিক্ষক। তাদেরকে দেখে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে বলছিলেন, “আমাদের পার্লামেন্ট কবে যে সমকামিতার স্বীকৃতি দিবে! তাহলে আমাদেরকে আর এসব মানুষের চিকিৎসা করতে হতো না!”
তারপর হঠাৎ করেই সত্তরের দশকে আমেরিকার হোমোসেক্সুয়াল মুভমেন্ট আমেরিকার সাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশনকে চাপ প্রয়োগ করলো হোমোসেক্সুয়ালিটি বা সমকামিতাকে হেটেরোসেক্সুয়ালিটির বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করার জন্য।
খ্রিস্টান ধর্ম যখন বিশ্ব পরিচালনায় ছিলো, তখনো সমকামিতা জঘন্যতম পাপ হিসেবে বিবেচ্য ছিলো। অথচ এখন! এটি গ্রহণযোগ্য হয়ে যাচ্ছে এবং এ অপকর্মকারীরা অনুশোচনাও বোধ করছে না।
আমাদের জানা প্রয়োজন যে, আমরা একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। আমরা বর্তমানে পুরোপুরি বিপরীত এক সংস্কৃতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। বর্তমান অবস্থা কিছুতেই স্বাভাবিক একটি অবস্থা নয়।
এ অবস্থা মোকাবেলায় আমাদের কিছু করা উচিত।
প্রথমত, আমাদের মানবসমাজকে বোঝাতে হবে, তাদের এ বিকৃত যৌনাচার জায়েয নয়, এটি আখলাক বিরুদ্ধও। এটি সকল ধর্ম এবং বিশ্বাসের বিরোধী। সমকামী কেউ যখন ভুল বুঝে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু সে যদি এটি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, সমকামিতা এমন একটি বিষয়, যার সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই বা সে যদি এটিকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে মানতে শুরু করে, তখন তা গুরুতর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান মনোবিজ্ঞান বলে সমকামিতা একটি জেনেটিক্যাল বিষয়। অথচ জীববৈজ্ঞানিক মনোবিদরা মানুষের জীন, হরমোনসহ সামগ্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন। ফলাফল হিসেবে পেয়েছেন, এটি কোনো দিক থেকেই জেনেটিক্যাল বিষয় হতে পারে না। এমনকি একজন জীববৈজ্ঞানিক এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ না রাখার জন্য একজন সমকামীর মৃত শরীর ব্যবচ্ছেদ করেও পরীক্ষা করেছেন। অর্থাৎ সমকামিতা বৈজ্ঞানিক দিক থেকেও স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
বর্তমান যুবসমাজকে বোঝানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের ক্যারিশমেটিক যুবক শ্রেণি প্রয়োজন! বর্তমান যুবসমাজ বয়স্কদের কথা শুনতে চায় না। তারা তাদের বয়সী ক্যারিশমেটিক মানুষদের কথাই শোনে এবং মানে। তাই আমাদের সমাজে রাজনৈতিক এবং অন্যান্য বিষয়ে অভিজ্ঞদের পাশাপাশি এমন এক যুবক শ্রেণি থাকা প্রয়োজন, যারা সমাজের মানুষের আখলাক বিনির্মাণে এবং উন্নয়নে কাজ করে যাবে।
আর আমার মতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় বিষয় হলো আমাদের মিডিয়া ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। পাশ্চাত্য তাদের চিন্তার প্রচার-প্রসারের জন্য মিডিয়াকে সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। এমনকি তারা শুধুমাত্র সমকামিতাকে সর্বসাধারণের মাঝে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যেই অসংখ্য সিনেমা, ডকুমেন্টারি বানিয়েছে। এক্ষেত্রে টম হ্যাঙ্কস অভিনীত একটি সিনেমার কথা বলা যায়। সেখানে এইডস আক্রান্ত হওয়া মানুষদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার প্রদানের পাশাপাশি সমকামীদেরও যে নিজেদের মতো করে জীবন পরিচালনার অধিকার আছে, সেটি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এক প্রকার সমকামিতাকেই বৈধতা প্রদান করা হয়েছে। তারা তাদের চিন্তার প্রচার-প্রসারের জন্য মিডিয়ার মাধ্যমে এভাবে কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু বিপরীতে আমরা আমাদের আখলাক বিনির্মাণ ও প্রচার-প্রসারের জন্য কী করছি?
হ্যাঁ, বর্তমানে আমাদের অনেকেই মিডিয়ায় শক্তিশালী প্রভাব রাখার জন্য কিছুটা হলেও চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু আমার মতে বর্তমান যুগের সাথে আমাদের মূলনীতিগুলোকে সম্পৃক্ত করে কিছু গল্প তৈরি করা প্রয়োজন, সিনেমা, ডকুমেন্টারি নির্মাণ করা প্রয়োজন এবং অভিনেতা ও প্রযোজক গড়ে তোলা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে আমাদের যুবসমাজ তাদের ধর্ম ও আখলাক সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারবে ও সে অনুযায়ী নিজেদেরকে গড়ে তুলতে পারবে।
আমরা যদি এখনই সচেতন না হই এবং পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, তাহলে অচিরেই আমাদের রূহানিয়াত বা আধ্যাত্মিকতা, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, আখলাক, মুয়ামালাতসহ সকল কিছু শোষক শ্রেণির ক্রীডনকে পরিণত হবে এবং আমাদের বিশ্বদর্শন, আমাদের ধর্ম, আমাদের ঈমান, আমাদের জীবনের অর্থের স্বরূপ পরিবর্তন হয়ে আমরা একটি শিকড়বিহীন জাতিতে পরিণত হবো, যা তারা চেয়েছিলো!
অনুবাদ: কাজী সালমা বিনতে সলিম
