বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েল; আরব শাসনব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতি

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিত্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি

আরব ভূখণ্ডে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী প্রকল্প: শিকড়, উদ্দেশ্য ও পরিণতি

গত চল্লিশ বছর (১৯৮৩–২০২৩) ধরে দীর্ঘ গবেষণা ও নথি-পর্যালোচনার পর আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, আরব অঞ্চল এক সুপরিকল্পিত পশ্চিমা সম্প্রসারণবাদী, কৌশলগত ও ঔপনিবেশিক প্রকল্পের সম্মুখীন। এ বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় ব্রিটিশ সরকারের প্রকাশিত নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে, যা লন্ডনের পাবলিক রেকর্ড অফিসে সংরক্ষিত রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকের প্রথমার্ধে কয়েক বছর ধরে আমি এসব নথি অধ্যয়ন করার সুযোগ লাভ করি।

এই ঔপনিবেশিক প্রকল্পের সূচনা উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ব্রিটেনে কিছু খ্রিস্টান ধর্মযাজকের উদ্যোগে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার তা আনুষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। এর প্রথম সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৮৩৮ সালে পবিত্র ভূমি বায়তুল মাকদিসে (আল-কুদস) ব্রিটিশ কনস্যুলেট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। উল্লেখযোগ্য যে, ১৮৯৭ সালে জায়নবাদী আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের বহু পূর্বেই ১৮৪০ সাল নাগাদব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা এই পরিকল্পনাকে কৌশলগতভাবে গ্রহণ করেছিল। বর্তমানে এ প্রকল্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হচ্ছে।

এই আলোচনাকে সুসংগঠিত করার জন্য প্রবন্ধটি চার ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে।

প্রথম অংশে আরব অঞ্চলে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক প্রকল্পের শিকড় ও ভিত্তি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

দ্বিতীয় অংশে প্রকল্পটির দুটি প্রধান উপাদান—‘বাফার রাষ্ট্র’ (ইসরায়েল) এবং আরব অঞ্চলের শাসনব্যবস্থা—আলোচিত হয়েছে।

তৃতীয় অংশে এ প্রকল্পের উদ্দেশ্যসমূহ চিহ্নিত করে তাদের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

চতুর্থ ও শেষ অংশে ‘বাফার রাষ্ট্র’-এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

আরব অঞ্চলে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক প্রকল্পের শিকড়

আরব ভূখণ্ডে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী নীতির মূল লক্ষ্য ছিল একটি “ফরেন হিউম্যান ব্যারিয়ার” বা বহিরাগত মানবপ্রাচীর স্থাপন করা—যা পরবর্তীকালে ‘বাফার রাষ্ট্র’ নামে পরিচিত হয় এবং আজকের ইসরায়েল রাষ্ট্রে রূপ নেয়। এটি লেভান্ত অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে অবস্থিত, যা ভৌগোলিকভাবে মিশরের সঙ্গে সংযুক্ত। এর কৌশলগত অবস্থান এমন যে, এ অঞ্চলে কোনো বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে তা আরব বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্য (ওয়াহদাতুল আরব) প্রতিহত করতে সক্ষম।

আমার গবেষণাগ্রন্থ The Roots of the Palestinian Issue (১৯৯১) এবং প্রবন্ধ Britain’s Role in Establishing the Jewish State: 1840–1948 (২০০২)-এ আমি প্রমাণসহ দেখিয়েছি যে, আরব অঞ্চলে তথাকথিত ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ কেবল জায়নবাদী আন্দোলনের প্রকল্প ছিল না; বরং তার বহু আগেই এটি একটি সুপরিকল্পিত পশ্চিমা ঔপনিবেশিক কর্মসূচি হিসেবে রূপ নিতে শুরু করেছিল। ব্রিটেন ইহুদিদের “জাতীয় আবাসভূমি” প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে কৌশলে ব্যবহার করে নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়ন করেছে। লক্ষ্য ছিল আরব ভূখণ্ড ও তার প্রাকৃতিক সম্পদের উপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

অর্থাৎ, তথাকথিত ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ ছিল পশ্চিমা কৌশলগত পরিকল্পনার একটি ধাপ—চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়।

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটেনের কিছু খ্রিস্টান ধর্মযাজক তাওরাতের প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে ইহুদিদের পবিত্র ভূমিতে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানান। এই ধর্মীয় আবেগ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক রূপ লাভ করে। ১৮৩৮ সালে উইলিয়াম ইয়াং-এর নেতৃত্বে বায়তুল মাকদিসে ব্রিটিশ কনস্যুলেট প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা ছিল উসমানীয় খিলাফতের অধীনে প্রথম পশ্চিমা খ্রিস্টান কনস্যুলেট।

উসমানীয়দের প্রদত্ত তথাকথিত “বিদেশি বিশেষাধিকার”-এর সুযোগ নিয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। ফ্রান্স ল্যাটিন ও ক্যাথলিকদের, রাশিয়া গ্রিক অর্থোডক্সদের সুরক্ষা দেয়। এর পাল্টা জবাবে ব্রিটেন দ্রুজ, আর্মেনীয়, প্রোটেস্ট্যান্ট এবং সিরিয়ার ইহুদিদের ওপর নিজেদের সুরক্ষা ঘোষণা করে। ব্রিটিশ ডেপুটি কনসুলের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, সে সময় বায়তুল মাকদিস, গ্যালিলি, সাফেদ ও তিবেরিয়াসে বসবাসকারী ইহুদির সংখ্যা ছিল মাত্র ৯,৭০০ জনের মতো।

মিশরকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল

ব্রিটিশ নীতির আরেকটি মৌলিক ভিত্তি ছিল মিশরকে লেভান্ত অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করা। ১৮৪০ সালের ১৫ জুলাই লন্ডনে ব্রিটেনসহ প্রধান শক্তিগুলো এক চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে মিশরকে তার বর্তমান সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয়। এটি ছিল আরব ভূখণ্ড খণ্ডিত করার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এর উদ্দেশ্য ছিল সুস্পষ্ট—

  • আরব ভূমিকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত রাখা,
  • ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করা,
  • এবং পবিত্র ভূমিতে ভবিষ্যৎ ‘বাফার রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও আরব বিভাজন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উপনিবেশবাদীরা আরব ভূখণ্ডকে ছোট ছোট ভৌগোলিক এককে বিভক্ত করতে সক্ষম হয়। ১৯১৬ সালে শরীফ হুসেন বিপ্লব ঘোষণা করলেও একই বছরে ব্রিটেন ও ফ্রান্স সাইকস-পিকো চুক্তির মাধ্যমে আরব ভূমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। ফলে আরব ঐক্যের স্বপ্ন কার্যত ভেঙে পড়ে।

১৯২১ সালে চার্চিলের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ট্রান্সজর্ডান আমিরাত প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ফিলিস্তিন থেকে আলাদা করা হয়। পরবর্তীতে ফিলিস্তিন ও ট্রান্সজর্ডানকে সিরিয়া ও লেবানন থেকে পৃথক করা হয়। ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে ফিলিস্তিনের আয়তন নির্ধারণ করা হয় ২৭,০০৯ বর্গকিলোমিটার। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল এ ভূখণ্ডের ৭৭ শতাংশ দখল করে এবং ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে অবশিষ্ট অংশও অধিকৃত করে নেয়।

ভূখণ্ড বিভাজনের পাশাপাশি আরেকটি কৌশল প্রয়োগ করা হয়—প্রতিটি অঞ্চলের জন্য আলাদা ঐতিহাসিক পরিচয় নির্মাণ। পরিকল্পিত প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও ইতিহাস পুনর্লিখনের মাধ্যমে অঞ্চলগুলোকে তাদের নিজস্ব প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। মিশরে “ফারাওবাদ” পুনরুজ্জীবিত হয়, যা পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের মাধ্যমে প্রচারিত হয়।

ফলে আরব ঐক্যের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে। মিশরের বহু রাজনৈতিক দল স্থানীয় জাতীয়তাবাদে সীমাবদ্ধ থাকে এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে উদাসীনতা প্রদর্শন করে। জায়নবাদী বসতি স্থাপন প্রকল্প সম্পর্কে তাদের সচেতনতা ছিল সীমিত।

একটি ‘রাজ্য’ এবং একটি ‘রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল, যে যুদ্ধ ছয় বছর স্থায়ী হয় (১৯৩৯–১৯৪৫)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়—

১) ১৯৪৬ সালের ২৫ মে ট্রান্সজর্ডান আমিরাতকে একটি রাজ্যে রূপান্তর করা এবং ‘হাশেমাইট কিংডম অব জর্ডান’ প্রতিষ্ঠা; এবং

২) ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা, যা আমিরাতটি রাজ্যে পরিণত হওয়ার ঠিক দুই বছর পর ঘটে।

উপলব্ধ তথ্যের আলোকে সুস্পষ্ট যে, জর্ডানীয় শাসনব্যবস্থার জন্য একটি নির্দিষ্ট কার্যকরী ভূমিকা পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন ট্রান্সজর্ডান আমিরাত সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে এর স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিকে একটি রাজ্যে রূপান্তর করা হয়—যা ‘শরীফ’ হুসেইন বিন আলির পুত্রদের ভূমিকা, সহযোগিতা ও ব্রিটিশদের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য আরেকটি “পুরস্কার” হিসেবে প্রতীয়মান হয়। এর প্রাথমিক ভূমিকা হলো—১৯৪৮ সালে ‘বাফার রাষ্ট্র/ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার পর থেকে তার সীমানা রক্ষা ও পাহারা দেওয়া। জর্ডান অধিকৃত প্যালেস্টাইনের সঙ্গে দীর্ঘতম সীমানা (প্রায় ৩৫০ কিমি) ভাগ করে—এবং পবিত্র ভূমি বায়তুল মাকদিস মুক্ত করার জন্য আরব ও মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়াকে কার্যত বাধাগ্রস্ত করে।

১৯২১ সাল থেকে জর্ডান পশ্চিমা শিবিরের নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় রেখে চলেছে—প্রথমে ব্রিটেনের প্রভাববলয়ে এবং বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবে। ফলে এটি এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে গড়ে ওঠে। নানাবিধ কারণে জর্ডান আরব অঞ্চলে ঔপনিবেশিক নীতি বাস্তবায়ন করেছে এবং করে চলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো—এই কৃত্রিম রাষ্ট্রের গুরুতর দুর্বলতা ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামো; পাশাপাশি অব্যাহত বাণিজ্য ঘাটতি ও বাজেট ঘাটতি। এই ঘাটতি প্রথমে আমিরাত প্রতিষ্ঠার সময় ব্রিটেন দ্বারা সমর্থিত ছিল এবং পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলোর সহায়তায় টিকে থাকে। আরও লক্ষণীয় যে, আরব অঞ্চলে কোনো সংকট বা বিপর্যয় ঘটলে জর্ডানের অর্থনীতি সাধারণত সমৃদ্ধি লাভ করে। উপরন্তু, আরব অঞ্চল যখনই কোনো সংকট বা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে, তখনই এর অর্থনীতি ‘সমৃদ্ধি লাভের’ প্রবণতা দেখিয়েছে।

‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার পর আরব অঞ্চলে একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়; যার মধ্যে সিরিয়ায় সামরিক অভ্যুত্থান শুরু হয় হুসনি আল-জাইমের অভ্যুত্থান দিয়ে ১৯৪৯ সালে, যা ১৯৭০ সালে হাফেজ আল-আসাদের অভ্যুত্থান পর্যন্ত চলেছিল। এছাড়া ১৯৫২ সালে মিসরে, ১৯৫৮ সালে ইরাকে, ১৯৬২ সালে ইয়েমেনে, এবং ১৯৬৯ সালে লিবিয়ায় অভ্যুত্থান ঘটে।

এছাড়াও, ব্রিটেন তার কৌশলগত স্বার্থ অর্জনের জন্য এই অঞ্চলে বিভিন্ন সত্তা ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল; যার মধ্যে ছিল আল-নাহিয়ান পরিবারের নেতৃত্বে সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), আল-খলিফা পরিবারের নেতৃত্বে বাহরাইন রাষ্ট্র, এবং আল-থানি পরিবারের নেতৃত্বে কাতার রাষ্ট্র—১৯৭১ সালে। এই শাসনব্যবস্থাগুলিকে কুয়েতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল-নাফিসি “The desert organization of power” বলে অভিহিত করেছেন—বিশেষত এটি আল-সৌদ (সৌদি আরব), আল-নাহিয়ান ও আল-মাকতুম (UAE), আল-খলিফা (বাহরাইন), এবং “মরুভূমি ক্ষমতার সংগঠনের” অন্যান্য অংশকে অন্তর্ভুক্ত করে।

এই অঞ্চলের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে প্রাধান্য বিস্তার করছে আরব রাষ্ট্রগুলির আচার-আচরণ বা নীতি এবং প্রধান/পরাশক্তির হাত থেকে তাদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা; যেমন ইসলামের আবির্ভাবের আগে প্রাক-ইসলামিক যুগে আরবরা সংগঠিত ছিল।

আরব অঞ্চলে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক প্রকল্পের উদ্দেশ্যসমূহ

এই পশ্চিমা উপনিবেশবাদী প্রকল্পের যে লক্ষ্যসমূহ ছিল এবং এখনও রয়েছে, তা নিম্নরূপ—

১) ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’-কে সুরক্ষা দেওয়া এবং তার অস্তিত্ব নিশ্চিত করা।

২) আরব অঞ্চলে বিভাজন ও অনৈক্যের অবস্থা বজায় রাখা, এবং দেশগুলির মধ্যে কোনো বাস্তব ঐক্য গড়ে উঠতে না দেওয়া।

৩) আরব অঞ্চলের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করা।

৪) আরব অঞ্চল এবং মুসলিম প্রাচ্যে কোনো মুসলিম শক্তির উত্থান প্রতিরোধ করা।

৫) এই অঞ্চলে কোনো সুন্নি মুসলিম বিপ্লবের উত্থান প্রতিরোধ করা।

এই লক্ষ্যগুলি কি আজও প্রাসঙ্গিক? নিম্নলিখিত প্রমাণসমূহ নিশ্চিত করে যে আরব অঞ্চলে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক প্রকল্পের মূল কার্যকরী ভূমিকা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

প্রথমত, ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার ৬০ বছর পর ২০০৮ সালে, ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন, লন্ডনের ফিনচলিতে অবস্থিত একটি ইহুদি সিনাগগে (২০০৮ সালের ৮ মে অনুষ্ঠিত) ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষে তার বিখ্যাত বক্তব্য প্রদান করেন। ওই বক্তব্যে তিনি বলেন যে, “ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাফল্য।”

দ্বিতীয়ত, বেলফোর ঘোষণা জারির একশ বছর পরও ২০১৭ সালের দিকে ব্রিটিশ সরকার তার অবস্থানে অনড় ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন। বরং তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে “মহামান্য সরকার (বেলফোর ঘোষণার জন্য) ক্ষমা চাওয়ার কোনো ইচ্ছা রাখে না,” এবং তাদের ভূমিকার জন্য গর্বও প্রকাশ করে বলেন যে “আমরা ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনে আমাদের ভূমিকার জন্য গর্বিত”। তিনি এই গর্বকে জাস্টিফাই করেন এ দাবি করে যে, যেখানে ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেই ভূমির সঙ্গে তাদের “দৃঢ় ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক” রয়েছে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, “যে ভূমির সঙ্গে ইহুদিদের দৃঢ় ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক রয়েছে সেখানে তাদের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা করা ছিল সঠিক ও নৈতিক পদক্ষেপ, বিশেষত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের ওপর সংঘটিত নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে।”

তৃতীয়ত, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৬ থেকে ২০০৪) এবং ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ ত্রয়ী: বুশ, ব্লেয়ার, আজনার—এর অন্যতম পক্ষ হোসে মারিয়া আজনার, ২০১০ সালের ১৭ জুন দ্য টাইমস অফ লন্ডন (পৃষ্ঠা ৩১)-এ “Support Israel: if it goes down …we all go down.” (ইসরায়েলকে সমর্থন করুন: যদি এটি ডুবে যায়… তবে আমরা সবাই ডুবে যাব) শিরোনামে একটি নিবন্ধ লেখেন। এতে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে “ইসরায়েল হলো পশ্চিমের একটি অপরিহার্য অংশ,” যা পশ্চিমের ভাগ্যকে ইসরায়েলের ভাগ্যের সাথে যুক্ত করে। তিনি যুক্তি দেন যে, এর ‘পতন’ ঘটলে ‘পশ্চিমের পতন’ হবে। তিনি ইসরায়েলকে এভাবে বর্ণনা করেন—

“একটি অস্থির অঞ্চলে, যা সর্বদা বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে এটি আমাদের প্রথম প্রতিরক্ষা-রেখা; এমন একটি অঞ্চল যা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর আমাদের অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধের এটিই সম্মুখ সমরাঙ্গন। যদি এর পতন ঘটে, তবে আমাদের সবারই পতন হবে… ইসরায়েল মূলত পাশ্চাত্যের একটি মৌলিক অংশ এবং এর ‘জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান’ (ইহুদি-খ্রিস্টান) ঐতিহ্যের কারণেই দেশটি আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছে। যদি সেই ঐতিহ্যের ইহুদি অংশটুকুকে সরিয়ে ফেলা হয় এবং ইসরায়েল হারিয়ে যায়, তবে আমরাও হারিয়ে যাব। আর আমরা চাই বা না চাই, আমাদের ভাগ্য একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।”

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ৩১ মে প্যারিসে জায়নবাদী দখলদার বাহিনী গাজা উপত্যকায় অবরোধ ভাঙতে যাওয়ার পথে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ফ্রিডম ফ্লোটিলা (তুর্কি জাহাজ মাভি মারমারা) আক্রমণ করেছিল; এবং ‘ফ্রেন্ডস অফ ইসরায়েল ইনিশিয়েটিভ’ ঘোষিত হয়; একই বছরের জুলাই মাসে এর যুক্তরাজ্য শাখা খোলা হয়।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘দ্য জিউইশ ক্রনিকল’ পত্রিকা ২৩ জুলাই ২০১০ তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায় যে, ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স (পার্লামেন্ট)-এ অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হোসে মারিয়া আজনার বলেন—

“ইসরায়েলের অধিকারহানি রোধ করা কেবল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই নয়, বরং ইসরায়েল এবং সমস্ত পশ্চিমা দেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসরায়েল পতিত হলে, আমরাও সবাই তার সঙ্গে পতিত হব।”

আজনার ছাড়াও এই উদ্যোগ গ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন: জন বোল্টন—জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন জাতিসংঘের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এবং ট্রাম্প প্রশাসনে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা; মার্সেলো পেরা—ইতালীয় সিনেটের সাবেক প্রেসিডেন্ট; এবং অ্যান্ড্রু রবার্টস—একজন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ।

দখলকৃত ভূমিতে এই তথাকথিত ‘বাফার স্টেট’-এর দুর্নীতি ও প্রভাব যখন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পৌঁছে যায়, তখন তাকে রক্ষার উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগটি গ্রহণ করা হয়। ফ্রিডম ফ্লোটিলার জাহাজ থেকে শেখ রায়েদ সালাহ এই রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডকে “মূর্খতা ও ঔদ্ধত্যে পরিপূর্ণ” বলে বর্ণনা করেন এবং মন্তব্য করেন যে, এ ধরনের আচরণ অনিবার্যভাবে অপ্রত্যাশিত পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।

চতুর্থত, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন (৮১ বছর বয়সী), একজন ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক; যিনি ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (১৯৬৫) এবং আইনে ডক্টরেট (১৯৬৮) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি ছয়বার মার্কিন সিনেটে পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন (১৯৭৩–২০০৯) এবং প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অধীনে দুই মেয়াদে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন (২০০৯–২০১৭)। তার স্ত্রী একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক এবং তার জীবনে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। তার বিদেশী সম্পর্ক এবং জাতীয় নিরাপত্তায় ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে; এবং তার রাজনৈতিক ইতিহাস তথাকথিত ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’–এর প্রতি নিঃশর্ত ও পরম সমর্থন দ্বারা চিহ্নিত।

১) ১৯৮৬ সালে, তিনি বলেছিলেন: “যদি ইসরায়েলের অস্তিত্ব না থাকত, তবে আমেরিকান স্বার্থ রক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েল আবিষ্কার করতে হতো।” তিনি এই কথাটি একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করেছেন; যার মধ্যে ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি বলেন: “আপনারা অনেকেই আমার কাছ থেকে আগে শুনেছেন, যদি একটি ইসরায়েল না থাকত, তবে আমাদের একটি আবিষ্কার করতে হতো।”

২) ২০০৭ সালে, তিনি বলেছিলেন: “ইসরায়েল হলো মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় শক্তি। ইসরায়েল ছাড়া বিশ্বে আমাদের পরিস্থিতি কল্পনা করুন। কতগুলি যুদ্ধজাহাজ থাকত? কত সৈন্য মোতায়েন করা হতো?”

৩) ২০১৭ সালে, যখন তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন তিনি বলেন: “আমার বাবা আমাকে বলেছিলেন: “জায়নবাদী হওয়ার জন্য তোমাকে ইহুদি হতে হবে না। যেমন আমি। সারা বিশ্বের ইহুদিদের নিরাপত্তার জন্য ইসরায়েল একটি অপরিহার্য রাষ্ট্র।” তিনি ২০০৭ সালে (শালোম টিভিকে) একই ধরনের একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন: “আমি একজন জায়নবাদী। জায়নবাদী হওয়ার জন্য তোমাকে ইহুদি হতে হবে না।” তিনি এই নিয়ে গর্বও করেন যে তার মেয়ে একজন ইহুদি পুরুষকে এবং তার ছেলে একজন ইহুদি মহিলাকে বিয়ে করেছেন।

জায়নবাদী সংবাদপত্র মা’আরিভ (Maariv) ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি বাইডেনের দলের শীর্ষ ইহুদি সদস্যদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের স্বামীও ইহুদি। বাইডেন প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন—মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (আইন)-এর একজন স্নাতক, ও একজন স্কলার। এছাড়াও, তার স্ত্রী ইভান, যিনি ওবামা প্রশাসনে কাজ করেছিলেন এবং বাইডেন প্রশাসনেও কাজ করছেন। ব্লিঙ্কেন ২০০২ সালের জুন মাসে দ্য ওয়াশিংটন কোয়ার্টার্লি-তে ‘Winning the War of Ideas’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। একটি ইহুদি এবং গভীরভাবে জায়নবাদী পরিবার থেকে আসা ব্লিঙ্কেন বিশ্বাস করেন যে সামরিক শক্তি ছাড়া কূটনীতি কার্যকর হতে পারেনা। তিনি ওবামা প্রশাসনে বাইডেনের সাথে কাজ করেছিলেন এবং ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন ও দখলদারিত্বকে সমর্থন করেন।

ব্লিঙ্কেন বাইডেনের কাছে ইরাককে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে: কুর্দি, সুন্নি এবং শিয়াতে বিভক্ত করার একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিলেন; কিন্তু প্রস্তাবটি মার্কিন কংগ্রেস কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। তিনি ওবামার আমলে সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি প্রণয়নকারী প্রধান ব্যক্তিদের অন্যতম একজন ছিলেন। এটি জানা যায় যে, তিনি এবং বাইডেন ‘বয়কট ডিভেস্টমেন্ট এন্ড স্যাংশনস’ (বিডিএস) আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। তিনি ২০২১ সালের ১৯ জানুয়ারি মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির সামনে নিশ্চিত করেছিলেন যে, বাইডেন প্রশাসন পবিত্র শহর বায়ত আল-মাকদিস-এ মার্কিন দূতাবাস রাখবে এবং ‘ইসরায়েল’-এর নিরাপত্তার প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিটি পবিত্র এবং অলঙ্ঘনীয় একটি প্রতিশ্রুতি।

বাস্তবেও, মার্কিন সিনেট ২০২১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পবিত্র শহর বায়ত আল-মাকদিস-এ মার্কিন দূতাবাস রাখার পক্ষে overwhelming-ভাবে (৯৭ ভোটে ৩) ভোট দিয়েছিল। এর আগে, ব্লিঙ্কেন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রশংসা করেছিলেন—‘বাফার রাষ্ট্র/ইসরায়েল’-এর সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য।

অতএব, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন–এর পটভূমি, অভিজ্ঞতা, বক্তব্য এবং তার প্রশাসনের নিয়োগসমূহ ইঙ্গিত করে যে, আমরা এমন একটি সময়ের মুখোমুখি হচ্ছি—যা পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর শাসনামলের তুলনায় আঞ্চলিকভাবে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক প্রকল্পকে সমর্থনের ক্ষেত্রে আরও বেশি বিপজ্জনক এবং অধিক কার্যকর হতে পারে। এই সময়পর্বটি আদর্শগত ও পদ্ধতিগত—উভয় দিক থেকেই কৌশলগত ভিত্তির ওপর নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

এখানে স্মরণযোগ্য যে, বিশ্বব্যাপী—বিশেষত এই অঞ্চল ও মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অংশে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও নীতির মৌলিক ভিত্তি হলো তার স্বার্থ। যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ অর্জনের লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্ন ও সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করে; আর এই অঞ্চলে সেই স্বার্থের কেন্দ্রে রয়েছে নিজস্ব কর্তৃত্ব সুরক্ষিত করা, তার প্রধান ও পছন্দের মিত্র—অর্থাৎ তার কৌশলগত প্রকল্প ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’ এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এছাড়াও, অর্থনৈতিকভাবে আরব অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করা, বিশেষত আরব তেলের ওপর এক্সেস নিশ্চিত করা এবং অধীনস্থ ও প্রভাবাধীন রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে আরব অঞ্চলে বিভাজন ও ঐক্যহীনতার অবস্থা বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো আরব বা মুসলিম আঞ্চলিক শক্তির উত্থান রোধ করতে চায়, যা আরব ও মুসলিম ঐক্যের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতে পারে।

ফলস্বরূপ, ব্রিটেনের কাছ থেকে নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্রই আমাদের আরব অঞ্চলে সংঘটিত প্রায় সকল বিপর্যয়ের মূল কারণ ও মৌলিক উৎসে পরিণত হয়েছে; বিশেষত প্রথম পর্যায়ে (পবিত্র ভূমি), দ্বিতীয় পর্যায়ে (মিসর, লেভান্ট ও সাইপ্রাস) এবং তৃতীয় পর্যায়ে (ইরাক, তুরস্ক ও হেজাজ)।

যুক্তরাষ্ট্রে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা প্রশাসনগুলো সবচেয়ে বেশি যে ভয় পায়, তা হলো—২০১০ সাল থেকে গত তেরো বছর ধরে আরব অঞ্চলে চলমান আন্দোলনসমূহ, বিশেষত মিসর, সিরিয়া ও ইরাকে—যা কোনো এক পর্যায়ে ‘সুন্নি মুসলিম বিপ্লবে’ রূপ নিতে পারে। এই আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র আরব শাসনব্যবস্থাগুলোকে পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে একটি নতুন প্রতিবিপ্লবী পর্যায় শুরু করার দিকে কাজ করেছে; যার নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। এর লক্ষ্য হলো তথাকথিত ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’–কে আরব অঞ্চলের নেতৃত্বশীল শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, যাতে এটি আরব আঞ্চলিক ব্যবস্থার ভেতরে একটি রাজনৈতিক উপস্থিতি লাভ করে—কেবল একটি বহিরাগত ও আরোপিত সত্তা হিসেবে না থাকে। ২০২০ সাল থেকে, একাধিক আরব শাসনব্যবস্থার সাথে তথাকথিত ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’–এর প্রকাশ্য স্বাভাবিকীকরণ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য গতি লক্ষ্য করছি।

বাফার স্টেট/ইসরায়েল-এর ভবিষ্যৎ

‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার (১৯৪৮–২০১৮) সত্তর বছর পর আরব অঞ্চলে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক প্রকল্পের এই অংশটির আসন্ন পতন সম্পর্কে বিভিন্ন অনুমান করা হচ্ছে। এই রাষ্ট্রটিকে পশ্চিমা ব্যবস্থা তার কৌশলগত স্বার্থ হাসিলের জন্য এই অঞ্চলের প্রধান অংশে রোপণ ও লালন-পালন করেছিল। এই প্রকল্পের প্রতিনিধিত্ব করছে ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’ এবং এর সাথে গঠনগতভাবে (organically) যুক্ত আরব দেশগুলোর মিত্র সরকারগুলো।

২০১৮ সালে ইসরায়েল তার অষ্টম দশকে পদার্পণ করেছে—যেটিকে এই রাষ্ট্রের ‘মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় (expiration date)’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ‘বাফার রাষ্ট্র/ইসরায়েল’–এর জন্য পশ্চিমা ঔপনিবেশিক কৌশলের প্রয়োজনীয়তা ৭৫ থেকে ৮০ বছর স্থায়ী হবে বলে অনুমান করা হয়—একটি ‘ক্যান্সার’ হিসাবে পবিত্র ভূমিতে সফলভাবে প্রতিষ্ঠার সময় থেকে। যখন এটি ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিভাজন প্রস্তাব পাস করাতে সফল হয়েছিল এবং ১৯৪৮ সালে তাদের রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছিল। এই সময়ের পরে ‘বাফার রাষ্ট্র/ইসরায়েল’–এর আর কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। এই অনুমান অনুসারে, এই রাষ্ট্রের জীবনকালে মাত্র কয়েক বছর বাকি আছে।

পশ্চিমা উপনিবেশিক প্রকল্পের এই অংশ, ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’ বর্তমানে তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং তার চক্রসমূহ সম্পন্ন করেছে। এটি তার মেয়াদ শেষ হওয়ার এবং অদূর ভবিষ্যতে চূড়ান্ত পতনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর আগে বা এর সমসাময়িক সময়ে, সেই সব আরব শাসনব্যবস্থার অবসান বা পতন ঘটবে যেগুলো এই প্রকল্পের সঙ্গে গঠনগতভাবে যুক্ত ছিল, বিশেষ করে জর্ডানের শাসনব্যবস্থা এবং কিছু আরব রাষ্ট্রের; বিশেষত তথাকথিত ‘ডেজার্ট অর্গানাইজেশন অফ পাওয়ার’ (‘মরুভূমি ক্ষমতার সংগঠন’)–এর অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলো। আল্লাহ চাহেন তো, এই সবকিছুই লেভান্ট (বিশেষত সিরিয়া এবং জর্ডান), ইরাক এবং মিশরকে—অত্যাচার, দাসত্ব, দুর্নীতি এবং নির্ভরশীল আরব শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তির দিকে নিয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

গবেষক যখন সম্প্রতি আমাদের ওপর নেমে আসা বিপর্যয়গুলোর দিকে গভীরভাবে দৃষ্টি দেন, তখন তার সামনে নিম্নলিখিত সমীকরণটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

১। আমাদের প্রথম ‘নাকবা’ (বিপর্যয়) ঘটে ১৯১৭ সালে, যখন ব্রিটিশ সরকার ১৮৪০ সালের আগ থেকেই শুরু করা তাদের সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে বিখ্যাত বেলফোর ঘোষণা জারি করে। যার মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি ‘জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড দখল করে। এই ইহুদি জাতীয় আবাসভূমি গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ব্রিটেন, ফ্রান্সের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে, নিজের নির্ধারিত ভৌগোলিক সীমারেখা অনুযায়ী ফিলিস্তিনকে বৃহত্তর লেভান্ট অঞ্চল থেকে আলাদা করে। এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন ও সহায়তা করেন শরীফ হুসাইন বিন আলী, যিনি আরব নেতৃত্ব এবং খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। তিনি উসমানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে তা করেন। এভাবেই ব্রিটেন হয়ে ওঠে “বিপর্যয় ও ব্যাধির মূল… এবং সাপের মাথা,” যেমনটি শহীদ শায়খ ইজ্জুদ্দিন আল-কাসসাম বলেছিলেন।

২. আমাদের দ্বিতীয় (নাকবা) বিপর্যয় ঘটেছিল ১৯৪৭/১৯৪৮ সালে, আমাদের প্রথম বিপর্যয়ের ৩০ বছর পরে। ব্রিটিশ সরকার পূর্ববর্তী ত্রিশ বছর (১৯১৭–১৯৪৭) ধরে তার নিবিড় প্রচেষ্টার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটায়—‘বাফার রাষ্ট্র/ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার জন্য মৌলিক পূর্বশর্তসমূহ আরোপ করে। জাতিসংঘে বিষয়টি উপস্থাপনের মাধ্যমে এটি করা হয়, যেখানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিন বিভাজনের একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। এর ফলস্বরূপ ফিলিস্তিনের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি ভূখণ্ড ২০,৭০০ বর্গকিলোমিটার (৭৭ শতাংশ), যার মধ্যে পবিত্র নগরী বায়তুল মুকাদ্দাস–এর ৮৫.৪ শতাংশ এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেগুলোকে দখল করা হয় এবং ফিলিস্তিনের সেই অংশগুলোতে ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দখলের ফলে বেশ কয়েকটি সমস্যার সৃষ্টি হয়, যার মধ্যে প্রধান ছিল ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংকট এবং ফিলিস্তিনিদের ডায়াসপোরা \ প্রবাস।

৩. আমাদের তৃতীয় (নাকবা) বিপর্যয় ছিল ১৯৬৭ সালে, আমাদের দ্বিতীয় বিপর্যয়ের ২০ বছর পরে এবং আমাদের প্রথম বিপর্যয়ের ৫০ বছর পরে। এই সময়ে ‘বাফার রাষ্ট্র/ইসরায়েল’ প্যালেস্টাইনের জন্য মনোনীত বাকি ভূমি দখল সম্পন্ন করেছিল; যার মধ্যে আল-আকসা মসজিদ এবং পবিত্র শহর বায়ত আল-মাকদিস–এর বাকি অংশ (১৪.৬ শতাংশ), পাশাপাশি সিনাই উপদ্বীপ এবং সৌদি দ্বীপপুঞ্জ (সানাফির ও তিরান), এবং গোলান মালভূমি—যা একে একে এক করুণ-প্রহসন হিসেবে বর্ণিত হয়। এই ঘটনা ছিল এক গুরুতর পশ্চাদপসরণ; যার ফলে ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’ দখলকৃত ভূখণ্ডগুলোতে তার উপস্থিতি আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয় এবং অঞ্চলটিতে একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তার উত্থানের সূচনা ঘটে।

সংক্ষেপে বলা যায়, আমাদের প্রথম ‘নাকবা’ (বিপর্যয়) (১৯১৭) প্রতিফলিত হয়েছিল আরব অঞ্চলে পশ্চিমা উপনিবেশিক দখলদারিত্বের মাধ্যমে—লেভান্ট অঞ্চলকে বিভক্ত করা, তাকে বিভিন্ন অংশে আলাদা করে ফেলা এবং উপনিবেশিক শক্তিগুলোর মধ্যে দখল ভাগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে—যার উদ্দেশ্য ছিল একটি ‘বিদেশি মানবিক প্রাচীর ও বাফার’ প্রতিষ্ঠা করা। ত্রিশ বছর পর (৩০), আমাদের দ্বিতীয় ‘নাকবা’ (১৯৪৭/৪৮) সংঘটিত হয় ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’–এর দখল ও প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এরপর আরও বিশ বছর পর (২০), আমাদের তৃতীয় ‘নাকবা’ (১৯৬৭) প্রকাশ পায় ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’–এর বিস্তার ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে। প্রথম ও তৃতীয় বিপর্যয়ের মধ্যবর্তী সময়কাল ছিল অর্ধশতাব্দী/৫০ বছর (৩০ + ২০): ১৯১৭ + ৩০ = ১৯৪৭ + ২০ = ১৯৬৭।

এই বিপর্যয়গুলোর পর থেকেই আমাদের অঞ্চলে পশ্চিমা উপনিবেশিক প্রকল্পের প্রথম অংশ—‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’—এর অবসানের জন্য ক্ষণগণনা শুরু হয়। তৃতীয় বিপর্যয়ের (১৯৬৭) বিশ বছর পর দখলকৃত পবিত্র ভূমির ভেতরে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয় প্রথম ইন্তিফাদা (১৯৮৭) প্রাদুর্ভাবের মাধ্যমে; যা পবিত্র ভূমিতে ধৈর্যশীল ও অবিচল মানুষের শিরায় শিরায় প্রবাহিত ইসলামী চেতনা দ্বারা উদ্দীপ্ত ছিল। এই সময়েই, ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর মাসে, ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন (হামাস) প্রতিষ্ঠিত ও সূচিত হয়। এই আন্দোলনের উৎপত্তি মুসলিম ব্রাদারহুড থেকে; যারা ১৯২৮ সালে শহীদ ইমাম হাসান আল-বান্না–র হাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ফিলিস্তিন প্রশ্নকে মুসলিম উম্মাহর কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।

প্রথম ইন্তিফাদা (১৯৮৭) এবং এর ধারাবাহিক ঘটনাবলি একে অপরের ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যায় এবং ক্রমবর্ধমান ও বিকাশমান একটি আন্দোলনের রূপ নেয়; যা রাজনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই—পবিত্র ভূমির ভেতরে ও বাইরে—এই ঘটনাবলির একটি বাস্তব, স্বাভাবিক ও অনিবার্য পরিণতিতে পরিণত হয়। অভ্যন্তরে আমাদের জনগণই ছিল অগ্রভাগে; যারা জিহাদের শিখা প্রজ্বলিত রেখেছিল যতক্ষণ না আরব জনগণ, বিশেষত পবিত্র ভূমিকে ঘিরে থাকা দেশগুলোর জনগণ, তাদের জালিম, দুর্নীতিগ্রস্ত ও দাসত্বকারী শাসকদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবি জানাতে শুরু করে। আমাদের অঞ্চলে পরিবর্তন ও পুনর্জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে কিছু লক্ষণ তখনই দৃশ্যমান হতে শুরু করে (১৯৬৭ + ২০ = ১৯৮৭)।

মূল প্রশ্ন: চক্র কি পূর্ণ হতে যাচ্ছে?

প্রশ্ন হলো—প্রথম ইন্তিফাদার (১৯৮৭) সূচনার ৩০ বছর পর, আমাদের তৃতীয় বিপর্যয়ের (১৯৬৭) ৫০ বছর পরে এবং প্রথম বিপর্যয়ের (১৯১৭) ১০০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমাদের অঞ্চলে পশ্চিমা উপনিবেশিক প্রকল্পের প্রথম অংশ, যা ‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’–এর মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করে, তবে কি তার পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করতে যাচ্ছে? আমরা কি ২০১৭/২০১৮ সাল থেকে এমন ক্রমবর্ধমান, বজ্রনিনাদ সদৃশ ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করছি, যা আমাদের অঞ্চলকে শক্তভাবে আঘাত হানবে এমন এক আসন্ন ভূমিকম্পের পথ প্রশস্ত করছে—যা ১৯৪৭ সালের পূর্ববর্তী ভূমিকম্প-পর্বের সমাপ্তি টানবে?

আমাদের প্রথম বিপর্যয় ১৯১৭ (যাকে বলা হয়: ভূমিকম্প-পূর্ব ইঙ্গিত) পথ তৈরি করেছিল দ্বিতীয় বিপর্যয়ের জন্য; যা ১৯৪৭ সালে (যাকে বলা হয়: মূল ভূমিকম্প) আমাদের ওপর প্রচণ্ডভাবে আঘাত হানে। এরপর ১৯৬৭ সালের তৃতীয় বিপর্যয় ছিল সেই ভূমিকম্পের বিধ্বংসী পরাঘাত (Post-Earthquake)। ১৯৪৭ সালের এই ভূমিকম্প আমাদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়, আমাদের এতটাই দুর্বল করে তোলে যে তা সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকেও হতবুদ্ধি করে দেয় এবং প্রজ্ঞাবানদেরও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে ফেলে। এটি ছিল এক অভূতপূর্ব পশ্চাদপসরণ।

সংক্ষেপে, সংখ্যার ভাষায়,

i. ১৯১৭ (প্রথম বিপর্যয়—ভূমিকম্প-পূর্ব ইঙ্গিত) + ৩০ বছর = ১৯৪৭ (দ্বিতীয় বিপর্যয়—মূল ভূমিকম্প) + ২০ বছর = ১৯৬৭ (তৃতীয় বিপর্যয়—ভূমিকম্পের পরাঘাত)।

ii. ১৯৬৭ (তৃতীয় বিপর্যয়) + ২০ বছর = ১৯৮৭ (প্রথম ইন্তিফাদা) ৩০ বছর = ২০১৭/ভবিষ্যৎ (ক্রমবর্ধমান বজ্রনিনাদ সদৃশ ঘটনাবলি—এক আসন্ন ভূমিকম্পের পথপ্রস্তুতি?!)

যদি এই সমীকরণ সঠিক হয়, তবে আমরা একটি আসন্ন ভূমিকম্প থেকে মাত্র কয়েক বছর দূরে অবস্থান করছি। এর আগে থাকবে ক্রমবর্ধমান, বজ্রনিনাদসদৃশ ঘটনাবলি—যার সূচনা হয়েছে ২০১৭/২০১৮ সাল থেকে এবং যা প্রতি বছর তীব্রতর হয়ে অবশেষে ভূমিকম্প সংঘটনের মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে। এর অর্থ হলো, ২০১৭/২০১৮ সাল থেকে আমরা যে সময় অতিক্রম করছি, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাবলির সময়—যা আসন্ন ভূমিকম্পের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই সম্ভাব্য ভূমিকম্প আমাদের অঞ্চলে গভীর প্রভাব ফেলবে এবং একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে আমাদের অঞ্চলের রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক মানচিত্র নতুনভাবে অঙ্কন করবে।

‘বাফার স্টেট/ইসরায়েল’ এবং কিছু আরব রাষ্ট্র আঞ্চলিক রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে বিলুপ্ত হবে; আর কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রগুলো এমন স্থিতিশীলতা অর্জন করবে, যা ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির সুযোগ সৃষ্টি করবে। মুসলমানরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বাস্তব ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবং বায়তুল মুকাদ্দাস ও এর আল-আকসা মসজিদ–এর ভবিষ্যৎ, পাশাপাশি আমাদের উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখবে। ‘বারাকার কেন্দ্র’—বায়তুল মাকদিস (পবিত্র ভূমি) থেকে, আল্লাহর ইচ্ছায়—যিনি ‘আল-ফাত্তাহ, আল-আলীম’—দ্বিতীয় বৈশ্বিক ইসলামী পুনর্জাগরণ এবং আসন্ন বৈশ্বিক ইসলামী বিজয়ের সূচনা হবে; যাতে ইসলাম ও সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতের সূর্য আবারও পৃথিবীর বুকে উদিত হতে পারে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি, তা একটি বৈশ্বিক যুদ্ধের সূচনা—গণহত্যা, গণবিধ্বংস, জাতিগত নিধন এবং গাজা উপত্যকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ—যার নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন প্রশাসন, যুক্তরাজ্য সরকার এবং অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্ট্র। এটি প্রকাশ পেয়েছে গাজা উপত্যকার বিরুদ্ধে তাদের স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির পূর্ণ সক্ষমতা ও শক্তি নিয়ে একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে। তদুপরি, আহত ও বিপর্যস্ত গাজা উপত্যকায় সংঘটিত এসব অপরাধের ব্যাপারে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নীরবতা—যা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে যে:

(১) গাজা উপত্যকায় সংঘটিত সব যুদ্ধাপরাধের পথ প্রশস্ত করার জন্য মার্কিন প্রশাসন, যুক্তরাজ্য সরকার ও অন্যান্য পশ্চিমা সরকার সম্পূর্ণভাবে দায়ী; গাজার রক্ত যেমন ইসরায়েলের হাতে, তেমনি তাদের হাতেও।

(২) ইসরায়েল কোনো রাষ্ট্র নয়; এটি আরব অঞ্চলে একটি পশ্চিমা উপনিবেশিক প্রকল্প।

পরিশেষে, এটি নিছকই এক কঠিন পরীক্ষা—উম্মাহর প্রকৃত মুক্তি ও পুনর্জন্মের জন্য এক বেদনাদায়ক সময়। এই সময়কাল আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ইতিহাসের এক অত্যন্ত সংকটময় পর্যায়কে চিহ্নিত করে।

অনুবাদ: জোবায়দা জাফরিন সুবহা

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *