ইসলামী সভ্যতায় শহরের দৃষ্টিভঙ্গি

চিন্তা ও দর্শন

শহর বললে আজ আমাদের চোখে ভেসে ওঠে উঁচু উঁচু দালানকোঠা, ব্যস্ত রাস্তাঘাট, শিল্পকারখানা—সব মিলিয়ে এক ঝলমলে, ব্যস্ত দুনিয়া; যেখানে সবাই ছুটছে নিজ নিজ গন্তব্যে; এই ছুটে চলার যেন কোনো শেষ নেই। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি—শহর আসলে কী? কেন তাকে শহর বলা হয়? আমাদের ব্যবহৃত ‘শহর’ শব্দটির উৎস কী, অর্থ কী, আর অন্যান্য সভ্যতা—বিশেষ করে ইসলামী সভ্যতা—শহরকে কেমনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে?

ইংরেজি City শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা ‘শহর’ ব্যবহার করি। কিন্তু শব্দদুটো প্রকৃতপক্ষে সমান অর্থবহ কিনা? স্থান-কালভেদে ব্যবহার ও প্রয়োগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু অর্থের পরিধি ও গভীরতাও বদলে যেতে থাকে। এই কারণে ইসলামী সভ্যতায় শহর বোঝাতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

তবে ইসলামী ঐতিহ্যে শহর বোঝাতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে—মদিনা। ‘মদিনা’ শব্দটি এসেছে দা’ইম (বা দাইয়ানাহ) শব্দ থেকে, যার প্রাথমিক অর্থ ছিল ‘লেনদেন’ বা ‘কেনাবেচা’। অর্থাৎ, প্রথমে এটি অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীতে মদিনা হয়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতার পরিভাষা।
মদিনা আর কেবল একটি নগরীর নাম থাকে না; বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয় আদব, আখলাক, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, আদালত ও সৌজন্যতাবোধসহ অসংখ্য নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ।

এদিক থেকে বর্তমান বিশ্বের City—আমরা যাকে আজ শহর বলি—সে অর্থে এতটা বিস্তৃত কিংবা সামগ্রিক নয়। কারণ ইসলামী সভ্যতার ‘শহর’ মানুষকে কেন্দ্র করে এবং মূল্যবোধের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। বিপরীতে আধুনিক ‘সিটি’—ছোট হোক বা বড়, মেট্রোপলিটন হোক বা উপশহর—মূলত একটি আইন ও প্রশাসননির্ভর কাঠামো, মানুষের সামগ্রিক কল্যাণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নয়।

আজকের দুনিয়ার “সিটি”:

আজকের দুনিয়ার সিটিগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দুটো জিনিসের ভিত্তিতে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেখলে এগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এডমিনিস্ট্রেশন বা অর্গানাইজেশনের ভিত্তিতে এবং অন্যদিকে এগুলো law & rules, অর্থাৎ আইন-কানুনের ভিত্তিতে পরিচালিত। আইন-কানুনের সাথে মূল্যবোধের একটি বড় তফাৎ আছে। যেই শহর মূল্যবোধের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় সেই শহরে আইন-কানুন থাকে না, এমন নয়। কিন্তু সেই শহরের ভিত্তি থাকে মূল্যবোধ। আর এখনকার যে সিটি সেই সিটির ভিত্তিই হলো আইন-কানুন। আইন-কানুন এমন অনেক কিছুকে সঠিক করে ফেলতে পারে, মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে যেগুলো ভুল হতে পারে। যেমন: এখনকার দিনে বাসা-বাড়িগুলোতে যেসব কাঁচ ব্যবহার করা হয়, এমন অনেক কাঁচ আছে যা তাপ নিঃসরণ করে। এখন সিটি কর্পোরেশনের আইন অনুযায়ী এই কাঁচগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু আমরা যদি মূল্যবোধের জায়গা থেকে চিন্তা করি, তাহলে এটি সঠিক না। কারণ এটির কারণে আবহাওয়া ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পশুপাখি ও কীট পতঙ্গের জীবন বিপদাপন্ন হচ্ছে। একইভাবে ভবন নির্মাণের যে বিষয়টা, আমাদের বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন ধরনের রীতিনীতি আছে বসতবাড়ি নির্মাণের। সিটি কর্পোরেশনের নিয়ম মেনে আমরা ২০ তলা বা ৫০ তলা বাড়ি বানাতে পারি, কিন্তু সেই বাড়িটি যে উচ্চতায় পৌঁছে গেল তা পাখির জন্য বা পোকামাকড়ের জন্য হুমকির কারণ হয়ে গেল। তারপর দেখা যায় এমন জায়গায় ইন্ডাস্ট্রি নির্মাণ করলাম সিটি কর্পোরেশন পারমিশন দিয়েছে, কিন্তু এটি থেকে যে বর্জ্য নিঃসরণ হলো বা গ্যাস নিঃসরণ হল তা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। কিংবা দেখা যাচ্ছে, আমি এমন একটি জায়গায় পারমানবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপন করলাম যে, আমার আশেপাশের বন ও পশুপাখি ধ্বংস হয়ে গেলো। আইন করে এটাকে সঠিক করাই যায়, কিন্তু মূল্যবোধ এটাকে সমর্থন করেনা। আরেকটা বিষয়, আমাদের বাসাবাড়িগুলোতে আজকাল জানালায় যে কাঁচগুলো ব্যবহৃত হয়, এগুলোতে রাতের বেলা যখন সূর্যের আলো থাকে না, কিন্তু বাসার ভেতর লাইট জ্বলে, তখন বাইরে থেকে ভিতরে পরিস্কার দেখা যায়। সবচেয়ে বাজে বিষয় যেটি, সেটি হচ্ছে যে আমাদের ওয়াশরুমগুলোতেও এই কাঁচগুলোই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এই বিষয়টি মানুষের প্রাইভেসিকে মারাত্মক ভাবে নষ্ট করছে। কিন্তু আমরা অহরহ ব্যবহার করছি। এগুলো হচ্ছে একটি শহর বা সভ্যতার মূল্যবোধের ঘাটতির জায়গা।
এই জায়গা থেকে ইসলামী সভ্যতা বা শহরের সাথে বর্তমান যে আধুনিক সিটি, এই সিটির একটি বড় তফাৎ আছে।

মানুষ সম্পর্কে বিভিন্ন সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি:

একটি সভ্যতায় শহরের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে—তার মূল্যবোধ, তার রীতিনীতি—এসব শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সেই সভ্যতার মানুষ–সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কারণ, একজন মানুষের যেমন দুটি দিক আছে—বাহ্যিক ও আত্মিক (রূহানী), তেমনি একটি শহরেরও থাকে দুটি রূপ—বাহ্যিক ও রূহগত। রূহসম্পন্ন মানুষ যেমন রূহসম্পন্ন শহর গড়ে তোলে, তেমনি রূহসম্পন্ন শহরও রূহসম্পন্ন মানুষকে লালন করে। একটি শহরে বসবাসকারী মানুষের রূহ, আখলাক ও মূল্যবোধ সেই শহরের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়। কাজেই, শহর ও মানুষ—এ দু’টি গভীরভাবে পরস্পর-সম্পর্কিত।

কাজেই, কোনো সভ্যতার শহর সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে—সেই সভ্যতা মানুষকে কী দৃষ্টিতে দেখে। মানুষ সম্পর্কে তাদের মৌলিক ধারণাই শহর-দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করে।

এখন আমরা যদি ইসলামী সভ্যতার দিকে তাকাই, ইসলাম মানুষকে জন্মগতভাবে নিষ্পাপ হিসেবে দেখে। তাছাড়া এটি মানুষকে বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণার দিকে ধাবিত করে না। মানুষের রূহ এবং আধ্যাত্মিকতাকে স্বীকার করে। এটি মানুষের আকল কে স্বীকার করে। এটি মানুষের জীবনকে দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে না, বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতে না, বরং দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে দেখে। এই দায়িত্ববোধের সম্পর্ক আবার আমানতের ভিত্তিতে। এই দায়িত্ববোধের সাথে সৃষ্টিশীলতার সম্পর্ক রয়েছে, গড়ার সম্পর্ক আছে। পাশাপাশি, এখানে যেহেতু সবকিছু ইহজাগতিক না, ফলে এখানে মূল্যবোধের একটি বিষয় আছে। তারপর আরেকটি বিষয় হচ্ছে এটি মানুষকে একত্রিত করতে বা সংঘবদ্ধ করতে চায়। আমরা যদি ইসলামের বিধান গুলো দেখি, চাইলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নামাজকে ঘরে পড়ার বিধান দিতে পারতেন। কিন্তু সেটি না দিয়ে নামাজ এর জন্য মসজিদে যাওয়ার প্রতি বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কারণ এটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। একত্রিত হওয়া, মানুষের মধ্যে একটি সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার মাধ্যম। যাকাতের বিধান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের যা কিছু আছে এর চূড়ান্ত মালিক আমরা না বা এর আমরা একক অধিকারী না। যাকাতকে বলে দেয়া হয়েছে অন্যের হক। এটি কিন্তু এভাবে বলা হয়নি যে, দিলে তোমার সওয়াব হবে। বলা হয়েছে এটি অন্যদের হক। তারপর আসে হজ্জের প্রসঙ্গ। হজ্জের মাধ্যমে গোটা মুসলিম উম্মাহ একত্রিত হয়। এছাড়া রমজান মাসে রোজা রাখতে আল্লাহ এমনিতেই বলতে পারতেন। সেহেরী, ইফতারের মতো সাংস্কৃতিক বিষয় গুলোতে জোর না দিলেও পারতেন। কিন্তু এগুলোর প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে মানুষ একত্রিত হয়, একে অন্যের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে; একটি শক্তিশালী বন্ধন ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে সভ্যতা এগিয়ে যায়। ইসলামের শিক্ষা হলো, শুধুমাত্র নিজের জন্য বেঁচে থাকার জন্য মানুষের জন্ম হয়নি। প্রতিবেশীর হক, আত্মীয়-স্বজনের হক, দরিদ্রদের হক এসব বিষয়ে আল্লাহর রাসুল (স.) যে পরিমাণ কঠোর হুঁশিয়ারি করেছেন, এ পরিমাণ কঠোর ভাষা, এমনকি ইবাদতের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেননি। এই জায়গা থেকে ইসলাম মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, একত্রিত হওয়ার পারস্পারিক সম্পর্কের যে বিষয়টি, তাতে বারবার তাগিদ দেয়। প্রফেসর নাজমুদ্দিন এবারকানের একটি সুন্দর কথা আছে। উনি বলেছিলেন যে, “আমাদের কেউ তার নিজের জন্য বাঁচবে না, প্রত্যেকে বাঁচবে তার ভাইয়ের জন্য। এভাবে যখন প্রতিটি মানুষই তার অপর ভাইয়ের জন্য বেঁচে থাকবে, তখন আমরা সবাই বেঁচে থাকবো।” এটি আসলে মানুষের সমাজ-সভ্যতার বাস্তবতা খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে। অন্যান্য সভ্যতা মানুষকে একতাবদ্ধ হওয়ার দিকে ধাবিত করে না। তারপরও অন্যরা একতাবদ্ধ হয়েই জীবন-যাপন করে। তাহলে এ বিষয়টা কোথা থেকে এলো। এই জায়গা থেকে পাশ্চাত্য সভ্যতা মানুষের এই একতাবদ্ধ হওয়ার বিষয়টিকে মানুষের স্বভাবগত বা ফিতরাত মনে করেনা। তারা মনে করে যে, সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা— এটি মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে করে, বাধ্য হয়ে করে। এটি তার ফিতরাতগত বিষয় না।

অন্যদিকে ইসলামী সভ্যতা মনে করে থাকে যে, মানুষ যে একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস করে এটি তার ফিতরাতি বৈশিষ্ট্য। তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করার জন্য। আল ফারাবির মতে, “মানুষ সৃষ্টিগতভাবে সভ্য।”
পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য একে অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে, একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে টিকে থাকার জন্য, সমাজ, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এক্ষেত্রে আখলাকী মানদন্ড যেটি দেওয়া হয়েছে, তা হলো অপর ভাইকে নিজের উপরে প্রাধান্য দেয়া। এই আখলাককে ধরা হয়েছে আখলাকের সর্বোচ্চ মানদন্ড। আর সাধারণ আখলাক বলা হয়েছে— আমি যা পরবো, আমি যা করবো, আমি নিজের জন্য যেটি চাইবো, আমার অপর ভাইয়ের জন্যও সেটি চাইবো।

অপরদিকে, আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতা মনে করে যে, মূলগতভাবে মানুষের সাথে পশুর কোন পার্থক্য নেই। পশুদের যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য আছে, মানুষের বৈশিষ্ট্য সেগুলোই। পরবর্তীতে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সে আজকের এই অবস্থায় এসেছে। যেহেতু মানুষ পশুদের মতই ছিল— পশুদের যেমন জীবনচক্র হলো খাওয়া এবং বংশ রক্ষা করা, মানুষের জীবন আগে সেরকমই ছিল। মানুষও পশুদের মতো হিংস্র ছিল এবং পরস্পরকে হিংসা করত। মানুষের স্বভাব ছিল যুদ্ধ করা। যুদ্ধটাই মানুষের স্বভাবের মধ্যে ছিল। পরবর্তীতে মানুষ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রয়োজনের তাগিদে এ অবস্থায় এসেছে, সমাজবদ্ধ প্রাণী হয়েছে। আবার তাদের মধ্যে কোন কোন দার্শনিকরা এমনও মনে করে থাকেন যে এই বিবর্তনটা হয়ে আরও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আগে তো মানুষ হিংস্র ছিল তবুও একটি সিস্টেম ছিল। এখন মানুষ শুধু বিশৃঙ্খলা করে। এটাও তাদের অনেক দার্শনিকরা বলে থাকেন। ম্যানডেভিলের “ফেবল অব দ্য বিজ” উপন্যাসটিতেও আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গিটি দেখতে পাই। যদিও তাদের দার্শনিকদের মধ্যে আবার অ্যারিস্টটল মানুষকে রাজনৈতিক প্রাণী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

কিন্তু, ইসলামী সভ্যতা মানুষকে এসমস্ত বিতর্কের অনেক ঊর্ধ্বে রাখে। ইসলামী সভ্যতার আলেমগণ বলেন, “মানুষ ফিতরাতগতভাবে সভ্য।” এরপর আসে মূল্যবোধের বিষয়। মূল্যবোধের জায়গা থেকে মুসলমানদের জন্য মূল্যবোধের সর্বোচ্চ চূড়া আসমাউল হুসনা। আসমাউল হুসনায় উপনীত হওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু সেটা হচ্ছে আমাদের মূল্যবোধের মানদন্ড। সে জায়গা থেকে ইসলাম মানুষকে একটি সুউচ্চ মূল্যবোধের দিকে ধাবিত করে। যেটি আর কোন সভ্যতায় নেই।

শহরের মাকাসিদ:
শহর প্রতিষ্ঠার যে মাকাসিদ, সেটিকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
● হক/ অধিকার:
-সৃষ্টিগতগত হক
-সমাজ ও মানুষের মধ্যকার হক
-অন্যান্য সৃষ্টির হক
● আদালত/ সামাজিক ভারসাম্য:
-মহাবিশ্বের সবকিছুর মধ্যে
-সামাজিক ভিত্তি হিসেবে

হক বা অধিকারের প্রসঙ্গে যদি আসি, তবে সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ কিছু হকের অধিকারী। একজন মানুষ যখন জন্মগ্রহণ করে, তখনই সে কিছু জন্মগত অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে আসে। এর জন্য তার অন্য কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। আমরা সাধারণত যে মৌলিক অধিকারের কথা জানি: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষা—মানুষ জন্মগতভাবেই এগুলোর হকদার। এখানে কোনো লজিক, কোনো রুলস-রেগুলেশন খাটেনা। মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ইসলামী সভ্যতা কখনোই এসব মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে কোন ধরনের বৈষম্যকে স্বীকৃতি দেয় না।

ইসলামী সভ্যতা আমাদের বলে—প্রতিটি মানবসন্তান যেদিন জন্মগ্রহণ করে, যেদিন সে পৃথিবীতে প্রথম নিঃশ্বাস নেয়, ঠিক সেদিন থেকেই সে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মর্যাদা, সম্মান ও মৌলিক চাহিদার চারটি বিষয়ে পূর্ণ অধিকার নিয়ে আগমন করে। কেউ যদি এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তবে যারা এই অধিকারগুলো উপভোগ করছে, তারাই আসলে অন্যদের হক আদায় করছেনা—অর্থাৎ আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য আমরা সঠিকভাবে পালন করছি না।

এখান থেকেই আসে মানুষের পারস্পরিক হক এবং সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যকার হক। আমরা জানি, প্রতিটি মানুষ পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ; একে অন্যের ওপর তার হক রয়েছে। আমি একজন মানুষ হলে, আমার পাশের মানুষটির প্রতি আমার দায়বদ্ধতা আছে; আমি যদি একটি পরিবার হই, তবে পাশের পরিবারের প্রতিও দায়বদ্ধতা আছে; গ্রামের মানুষ হলে পাশের গ্রামের প্রতি; আর একটি দেশের নাগরিক হলে পাশের দেশের মানুষের প্রতিও আমার দায়িত্ব রয়েছে। এভাবে পুরো উম্মাহর প্রতিই আমরা দায়বদ্ধ।

এই চিন্তা থেকেই আজ যখন ফিলিস্তিনে যুদ্ধ চলছে, তখন আমরাও দায়বদ্ধ; ফিলিস্তিনের শিশুরা যখন অনাহারে মৃত্যুবরণ করছে, তার জন্যও আমরা দায়বদ্ধ। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানুষ যখন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ-সংঘাতে মানুষ যখন নিঃস্ব, অনাহারী, আশ্রয়হীন—সেখানেও আমাদের দায় রয়েছে। একইভাবে, আমার শহরের ফুটপাতে যে মানুষটি ঘুমায়, সেও আমার ওপর হক রাখে। আমার পাড়া-প্রতিবেশী যদি অভুক্ত ঘুমায়, আর আমি পেট ভরে আহার করে শুয়ে পড়ি—তবে আমি কঠিনভাবে দায়বদ্ধ। কারণ আল্লাহর রাসূল (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন—”যে ব্যক্তি পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে, সে প্রকৃত মুমিন নয়।”

এখানে “প্রতিবেশী” শব্দটি প্রতীকী। মানে, আমি মানুষ হিসেবে আমার পাশের মানুষ প্রতিবেশী; পরিবার হিসেবে পাশের পরিবার; গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে পাশের গ্রামের বাসিন্দা। এই হক শুধু মানুষের প্রতি মানুষের নয়, অন্যান্য সৃষ্টির প্রতিও হক রয়েছে। অন্যান্য সৃষ্টিও মানুষের কাছে অধিকার রাখে। ইসলামী সভ্যতা আমাদের সেই হকগুলোর কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের এমন শহর গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো সৃষ্টির হক নষ্ট হবে না।

আমি যদি একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করি, আর তাতে পাখির জীবন বিপদাপন্ন হয়—তা গ্রহণযোগ্য নয়। আমি যদি একটি পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র নির্মাণ করি, যা মানুষের উপকারে আসে কিন্তু বন-জঙ্গল ধ্বংস হয়ে যায়—এটিও ইসলামী সভ্যতার দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। কোনো ডেইরি ফার্মে পশুর প্রতি অমানবিক আচরণ করা—ইসলাম তা অনুমোদন করে না। আবার এমনভাবে বাড়িঘর করা, যাতে প্রতিবেশির কষ্ট হয়, এটিও গ্রহণযোগ্য নয়।।

ইতিহাসে দেখা যায়—ইসলামী সভ্যতার নগরগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হতো, যাতে পশুপাখি, পোকামাকড়—সকল সৃষ্টিই বিবেচনায় থাকে। দেয়ালগুলোতে পাখির বাসা রাখার ব্যবস্থা থাকত; ভবনগুলোকে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি নির্মাণ করা হতো না যাতে পাখির ক্ষতি না হয়। বিভিন্ন স্থানে পশুপাখির জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা রাখা হতো। কোনো স্থাপনা নির্মাণের সময় আশপাশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, সৃষ্টির হক—সবই বিবেচনা করা হতো। বাড়িগুলো এমনভাবে নির্মিত হতো যেন তাতে পাড়া-প্রতিবেশীর কোন অসুবিধা না হয়।

এই যে অন্যের হক—এই অধিকার আদায়ের পন্থা হচ্ছে মারহামাত। এটি আইন নয়; এটি দয়ার নীতি, রহম-এর নীতি। মারহামাতের সর্বোচ্চ উপমা আল্লাহ নিজেই। তিনি রহমশীল; দয়া ও ভালোবাসা দিয়ে আমাদেরকে রহমতের চাদরে আচ্ছাদিত রাখেন। আমরা মানুষ হিসেবে তাঁর রহমতের এক লক্ষ ভাগের এক ভাগও অর্জন করতে পারব না, কিন্তু তিনি চান—আমরা যেন তাঁর বান্দাদের প্রতিও রহমশীল হই।

একজন মা তাঁর সন্তানকে যেমন অতিশয় ভালোবাসেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাদের এর থেকেও বেশি ভালোবাসেন। তাই যখন বান্দা একে অন্যের প্রতি জুলুম করে, আল্লাহ ভীষণ রেগে যান! শুধু মানুষের প্রতিই নয়, প্রত্যেক সৃষ্টির প্রতিই আল্লাহর ভালোবাসা আছে। কোনো সৃষ্টির ওপর জুলুম হলে আল্লাহ তা অপছন্দ করেন। আমরা জানি, আল্লাহ বলেছেন, তিনি নিজের হক—ইবাদত-বন্দেগীর হক—মাফ করবেন; কিন্তু বান্দা যদি অপর বান্দার হক নষ্ট করে, তা তিনি মাফ করবেন না।

এরপর আসে দ্বিতীয় বিষয়—আদালত। একটি সভ্যতার মূল স্তম্ভই হলো আদালত। আদালত ছাড়া কোনো শহরের ভিত্তি থাকে না। ইসলামী সভ্যতার সব বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকলেও, যদি আদালত প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে সেই সভ্যতা কখনোই ইসলামী সভ্যতা হতে পারে না। কারণ এর ভিত্তি আদালত ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর দাঁড়াতে হবে।

মহাবিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় সবকিছুর মধ্যেই নিখুঁত এক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত। সূর্য-চন্দ্রের গতিপথ, গ্রহসমূহের কক্ষপথ, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা—সবই একটি নির্দিষ্ট নিয়মে চলমান। পশুপাখি আদালতের নীতি মানে না, কারণ তাদের সে আকল নেই। কিন্তু মহাবিশ্ব আল্লাহ প্রতিষ্ঠিত ভারসাম্যের নিয়মে চলে।

তদ্রুপ, মানুষের শহরও আদালতের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। শাসক ও জনগণের সম্পর্ক আদালতভিত্তিক না হলে তা কখনোই ইসলামী সভ্যতা হতে পারে না। পাশ্চাত্য সভ্যতায় সুন্দর নীতি, আইন, রুলস-রেগুলেশন, মানবাধিকার—সবই আছে—যা দিয়ে একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। কিন্তু সেখানে আদালত অনুপস্থিত। কাফের শাসক হওয়ার চেয়েও বড় সমস্যা হলো—সভ্যতার ভিত্তি আদালতের ওপর দাঁড়িয়ে নেই।
তাই ইসলামী সভ্যতার সামাজিক ভিত্তি যদি কিছু হয়, তবে তা অবশ্যই– আদালতের প্রতিষ্ঠা।

শহর, সভ্যতা ও রাষ্ট্র: ইয়াসরিব থেকে মদিনা

ইতোপূর্বে আমরা মানুষের একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস করা নিয়ে কথা বলেছি। একজন মানুষ থেকে মানবতা হয়ে ওঠা; এই হয়ে ওঠার যে জার্নিটা এর মধ্যে কিছু বিষয় আছে। যেমন মানুষ শহর গড়ে তোলে, শহর থেকে একসময় রাষ্ট্র হয়, রাষ্ট্র থেকে সভ্যতা হয়। এরপর সেই সভ্যতা কিছু প্রস্তাবনা হাজির করে। এভাবে যখন একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সেই সভ্যতাও নতুন নতুন শহর গড়ে তোলে। আমরা যদি দেখি যে, অনেক শহরকে কেন্দ্র করে সভ্যতা হয়েছে। যেমন ইসলামী সভ্যতার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম মদিনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাকে কেন্দ্র করে ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এথেন্স শহরকে কেন্দ্র করে গ্রীক সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রোমকে কেন্দ্র করে রোমান সভ্যতা হয়েছে। এভাবে কিছু শহর রয়েছে, যা সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। আবার অধিকাংশ শহর সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা এখন প্রথমে এমন একটি শহরের কথা বলব, যে শহর ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছে। সে শহর হচ্ছে মদিনা।

মদিনাকে বলা হয় সিটি স্টেট। কারন মদিনা শহর প্রথমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এই শহরকে কেন্দ্র করে ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা যদি দেখি আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতা প্রতিষ্ঠার পেছনে অনেকগুলো চুক্তি ছিল, চিন্তা ছিল, সংবিধান ছিল। তেমনিভাবে মদিনাকে কেন্দ্র করে যে সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই সভ্যতারও কিছু মিসাক ছিলো।
আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতা যে সমস্ত চুক্তির ভিত্তিতে হয়েছে, সেগুলো হলো: ম্যাগনাকার্টা, ১২১৫; বিল অব রাইট, ১৬৮৯; ডিক্লারেশন অব ইউনাইটেড স্টেট, ১৭৭৬; ফারসি বিপ্লব পরবর্তী চুক্তি, ১৭৮৯; ইউনিভার্সিটি ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস, ১৯৪৮ ইত্যাদি।

ইসলামী সভ্যতার ক্ষেত্রেও দুইটি গুরুত্বপূর্ণ মিসাক আছে। প্রথমটি হলো: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর লেখা মদিনা সনদ (৬২২ খ্রী), যেটিকে ইসলামী সভ্যতার প্রথম সনদ বা সংবিধান বলা হয়। দ্বিতীয়টি হলো: রাসূলে কারীম (সা.) এর শেষ সময়ের দিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ভাষণটি—অর্থাৎ বিদায় হজের ভাষণ (৬৩২ খ্রী), প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন।

পাশ্চাত্য সভ্যতার চুক্তি ও ইসলামী সভ্যতার মিসাকের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হচ্ছে পাশ্চাত্যের যে সমস্ত চুক্তিগুলো বা যে সংবিধানগুলো আছে, এগুলো মোটাদাগে সকল মানুষের অধিকারকে সংরক্ষণ করেনা। অল্প কিছু মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করে। প্রতিটি চুক্তি নির্দিষ্ট একটি মানুষের বা নির্দিষ্ট একটি শ্রেণীর, নির্দিষ্ট একটি অংশের অধিকারকে, ক্ষমতাকে বা আধিপত্যকে সংরক্ষণ করেছে। মানবতার বা সামগ্রিকভাবে মানুষের অধিকার এর সংরক্ষণ করেনি। এজন্য পাশ্চাত্য সভ্যতার চুক্তিগুলোকে বলা যায় যে, তাদের নির্ধারিত অ্যারিস্টোক্র্যাটের অধিকার সংরক্ষণের চুক্তি। কিন্তু আমরা যদি ইসলামী সভ্যতার মিসাক দেখি, সেখানে অ্যারিস্টোক্র্যাট এর কথা বলতে চাই, এই মিসাকের দৃষ্টিতে সমগ্র মানবতাই তাহলে অ্যারিস্টোক্র্যাট। কারণ গোটা মানবতার অধিকারকেই এই দুটি মিসাক সংরক্ষণ করেছে। যেমন: মদিনা সনদে ৪৭ টা ধারা আছে। এখানে তৎকালীন মদিনায় যতগুলো গোত্র ছিল, যতগুলো ধর্ম ছিল, যত শ্রেণীর মানুষ ছিল প্রত্যেকের অধিকারকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি একটি করে গোত্রের নাম লেখা হয়েছে। একটি একটি করে ধর্মের নাম লেখা হয়েছে। লিখে লিখে বলা হয়েছে যে অমুকের অধিকার এভাবে সংরক্ষিত থাকবে। যদি এই গোত্রের মানুষ অপরাধ করে তাহলে এভাবে বিচার দেওয়া হবে। এভাবে প্রতিটি মানুষের মূল্যকে বিচার করা হয়েছে।

এরপর যদি আমরা বিদায় হজের ভাষণের দিকে তাকাই, সেখানে রাসূল (সা.) যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলো উম্মতের জন্য ওসিয়ত হিসাবে আছে। এখানে তিনি বলেছেন, “সকল মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই, আজ থেকে বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব বিলুপ্ত করা হলো। আরবের উপর অনারবের এবং অনারবের উপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই। জাহিলি যুগের সকল ধরনের ভেদাভেদ আমি আমার পায়ের নিচে পিষে ফেলেছি। তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সদব্যবহার করো। অন্যায় এবং অবিচার করো না। মনে রেখো ক্রীতদাস-দাসীরা ও আল্লাহর বান্দা, তাদের উপর জুলুম করো না। একজনের অপরাধের জন্য কখনো অপরজনকে শাস্তি দিও না। খবরদার! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। একে অন্যের সম্পদ অন্যায় ভাবে হস্তগত করবে না। অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করবে না।” সর্বশেষ বলেছেন, “আমি কোরআন এবং হাদিসকে তোমাদের কাছে আমানত হিসেবে রেখে যাচ্ছি। এ দু’টো তোমরা সংরক্ষণ করবে।” এভাবে তিনি গোটা মানব জাতির অধিকারকে সংরক্ষণ করে গেছেন এবং অধিকার এবং মর্যাদাকে সংরক্ষণ করার জন্য যে বিষয়গুলো প্রয়োজন তিনি প্রত্যেকটা বিষয়ে নজর দিয়েছেন। যার ফলে ইসলামী সভ্যতায় সব সময় পাঁচটি জিনিসকে অবশ্যই সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ পাঁচটি জিনিসকে ইমাম গাজ্জালি ইসলামী শরীয়তের মূল পাঁচটি বিষয় বলে অভিহিত করেছেন। এগুলো হলো:
● মানবসত্তা বা নফস এর সংরক্ষণ
● চিন্তার/ আকলের স্বাধীনতা
● বিশ্বাসের আলোকে বসবাসের স্বাধীনতা
● বংশ রক্ষার স্বাধীনতা
● সম্পদের সংরক্ষণ

মদিনা সনদ ও বিদায় হজ্জের ভাষণকে একইসাথে শরীয়তের পাঁচটি মূলনীতির বাস্তবায়ন বলা যায়। যার ফলে ইসলামী সভ্যতা সব সময় এই পাঁচটি মূলনীতির আলোকে পরিচালিত হয়েছে এবং ইসলামী সভ্যতার যে শহর গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই মূলনীতির আলোকে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়েছে।

ইসলামী সভ্যতার প্রতিষ্ঠিত প্রথম শহর মদিনা। মদিনা শহর শরিয়তের পাঁচটি মূলনীতিকে সংরক্ষণ করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মদিনা শহর মুসলমানদের একটি তৈরি করা শহর। সেখানে আগে থেকে লোকালয় ছিল, যার নাম ছিল ইয়াসরিব। সেই ইয়াসরিব কে আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন মদিনায় পরিবর্তন করলেন, সেখানে দুই ধরনের পরিবর্তন হলো। প্রথমত, শহরের রূহের পরিবর্তন হলো। শরীয়তের পাঁচটি মূলনীতির বাস্তবায়নের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন রূহী পরিবর্তন এর মধ্যে পড়ে।

প্রাক ইসলাম যুগে শুধু ইয়াসরিব না, গোটা জাজিরাতুল আরব ছিলো গোত্র ভিত্তিক। বংশগত বিরোধ এবং এক গোত্রের সাথে অপর গোত্রের সংঘাত-সংঘর্ষ সেখানে নিয়মিত বিষয় ছিল। একটি গোত্রভিত্তিক সমাজকে তিনি ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে শহর ভিত্তিক সভ্যতায় রূপান্তর করলেন। মুহাজিরদের সাথে আনসারদের একটি ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করলেন। মুহাজিরদের সাথে আনসারদের যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন, পৃথিবীর ইতিহাসে এর দ্বিতীয় কোন দৃষ্টান্ত নেই। একদিকে মুহাজিররা মক্কা থেকে তাদের পরিবার-পরিজন, জন্মভূমি, আত্মীয়-স্বজন, পুরানো স্মৃতি, ঘর-বাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য ফেলে মদিনায় চলে এলেন আল্লাহর রাসূল (সা.) এর সাথে। আবার অন্যদিকে আনসাররা নিজেদের ভূমি, নিজেদের বাড়িঘর, পরিবার সবকিছু মুহাজিরের সাথে ভাগ করে নিলেন। এমনকি যাদের একাধিক স্ত্রী ছিল তাদের স্ত্রীদেরও তালাক দিয়ে দিলেন মুজাহিরদের জন্য। ইসলাম গ্রহণ করার কারণে অনেক সাহাবীদের সাথে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল। কারো হয়তো স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করেছে, স্বামী করেনি। স্বামী গ্রহণ করেছে, স্ত্রী করেনি। কারো সন্তান ইসলাম গ্রহণ করেছে, বাবা-মা করেনি। বাবা মা মেনে নেয়নি, সন্তানকে ত্যাজ্য করে দিয়েছে। কারো এক ভাই করেছে আর এক ভাই করেনি। ফলে মুহাজিররা শুধু জন্মভূমি ছেড়ে আসেনি; পেছনে অনেক সম্পর্ক, অনেক স্মৃতি ও ধন-সম্পদ তাদের ছেড়ে যেতে হয়েছে। আবার আনসাররাও তাদের জন্য যে ত্যাগ করেছে– তাও পৃথিবীর ইতিহাসে একইভাবে বিরল।

মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ভিন্নতাও ছিল। যেহেতু এখানে বিভিন্ন ধর্মের ও গোত্রের মানুষ ছিল, তাই সবার মধ্যে সাংস্কৃতিক দূরত্ব ছিল, বিশ্বাসের ভিন্নতা ছিল। বিভিন্ন ভাষার মানুষও সেখানে একত্রিত হয়েছিল। এইসকল মানুষকে একই সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিমূলক সম্পর্কের মধ্যে নিয়ে আসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহিষ্ণুতা নিশ্চিত করা–এগুলো ছিল ইয়াসরিব থেকে মদিনায় পরিবর্তিত হওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন বা রূহী পরিবর্তনের মধ্যে অন্যতম।

এরপর আসে মানুষের জীবনযাপনের পরিবর্তন। বাহ্যিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, পুরো ইয়াসরিবের কাঠামোই পরিবর্তন হয়ে গেল। মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা করা হলো এবং এটিকে এই শহরের কেন্দ্র বানানো হলো। মদিনার যে আবহাওয়া ছিল, উৎপাদন বা আয়ের যে উৎস ছিল সেগুলোর আলোকে উৎপাদন ও আয়ের ক্ষেত্রকে বিকশিত করা হলো। যেহেতু এটি মরুভূমি এলাকা ছিল, তাই পানির সুব্যবস্থা করার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
এই আবহাওয়ার আলোকে একটি নিজাম প্রতিষ্ঠা করা হলো। যেহেতু মসজিদে নববীকে সেন্টার করা হলো তাই রাস্তাগুলোকে নতুন করে ডাইমেনশন দিতে হলো। মূল সড়কগুলোকে মসজিদে নববীমুখী করা হলো। মসজিদে নববী শুধু মসজিদ ছিল না, ছিল সামাজিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু, ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও জ্ঞান-চর্চার কেন্দ্রবিন্দু–সমগ্র মদিনার মানুষের মিলন মেলা। এখানে মক্কার মুহাজিররা ছাড়াও অন্যান্য অঞ্চলের লোকেরা ও আসতে থাকল। ফলে এটি ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ শহরে রূপান্তর হওয়া শুরু করল। এ শহরের বাহ্যিক কাঠামোর দিকে যদি আমরা দেখি এর কেন্দ্রে ছিল মসজিদ, মসজিদের সবচেয়ে কাছাকাছি ছিল প্রশাসনিক ভবনগুলো, পরবর্তীতে ইসলামী সভ্যতার যে শহরগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই মডেল অনুসরণ করে হয়েছে। হয়তোবা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, বিস্তৃতি বেড়েছে কিন্তু এই মডেলটাই মূল ধরা হয়েছে। কেন্দ্রে থাকবে মসজিদ এরপর প্রশাসনিক ভবন গুলো। প্রথমে শুধু রাষ্ট্রভবন ছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনিক ভবনসহ অন্যান্য ভবন নির্মাণ হলো। তারপর বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এরপরে মানুষের বসবাসের বাড়িঘর তৈরী হলো। মূল সড়কগুলোকে মসজিদ পর্যন্ত বিস্তৃত করা হতো। পরবর্তীতে অন্যান্য শহরগুলো মূল সড়কের সাথে সংযুক্ত করা হতো।

আল ফারাবি বলেছেন, “মানুষ তার আখলাকি কামালিয়াত (পরিপূর্ণতা) শহরের মাধ্যমেই লাভ করে”। একটি শহর প্রতিষ্ঠা না হলে ইসলাম মানুষের কাছে যা কিছু চায়, মানুষকে যে মানে দেখতে চায় ,যে মূল্যবোধে দেখতে চায়, সে ধরনের আখলাক ও মূল্যবোধসম্পন্ন হওয়া সম্ভব না। আল্লাহর রাসূলের (সা.) মাক্কী জীবনের যে ১৩ বছর ছিল সেখানেও কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সা.) এই জিনিসটার জন্য সংগ্রাম করেছেন। এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি যে মানুষগুলো তৈরি করেছেন তারাই পরবর্তীতে এসে মদিনায় একটি শহর গড়ে তোলেন। রাসুলের (সা.) সমগ্র জীবনের যে সংগ্রাম ছিল মানুষের অধিকার, মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করা; সেই মর্যাদাপূর্ণভাবে মানুষ যদি বাঁচতে চায়, তার জন্য একটি শহর প্রয়োজন। ইসলাম মানুষকে মর্যাদার যে জায়গাটা দেখায় তা বনে জঙ্গলে সম্ভব না। আবার একদম গ্রামে-গঞ্জেও সম্ভব না। সেই মর্যাদা, সেই অধিকার, সেই কর্মব্যবস্থা, সেই দায়িত্ববোধ— এগুলো শহরের মাধ্যমেই বিকাশিত হওয়া সম্ভব।
একারণে, রূহসম্পন্ন শহরের ক্ষেত্রে ইবনে খালদুন চারটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, যে শহরে মানুষ পূর্ণ অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবে:
● শান্তি ও নিরাপত্তা
● মাফসাদাত প্রতিরোধ ও মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা
● সুরক্ষিত অবস্থান
● বসবাসযোগ্য পরিবেশ
এসকল বৈশিষ্ট্যই মদিনাকে শহরে পরিণত করেছে।

এপর্যায়ে ইসলামী সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহর নিয়ে আমরা আলোচনা করবো এবং দেখবো যে, এই শহরগুলোতে কীভাবে এসকল বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে।

উন্নয়নের মডেল শহর: কূফা ও বসরা

আমরা জানি যে, হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর সময় মুসলমানরা পারস্য বিজয় করে। পারস্য বিজয়ের পরে সেখানে মুসলমানরা প্রথমে মাদায়েন শহরে বসবাস করতে থাকে। এ মাদায়েন শহরে কিছুদিন বসবাসের পরে দেখা গেল যে, সেখানে বেশ কিছু সমস্য হচ্ছে। সেখানকার আবহাওয়ার সাথে সাহাবীরা মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। তাদের চামড়া খসখসে হতে শুরু করে। তারা অসুস্থ হয়ে যেতে শুরু করেন। তাছাড়া মাদায়েনে প্রচুর পরিমাণে মশা ছিল। ফলে, তৎকালীন পারস্যের গভর্নর সা’দ বিন আবু আক্কাস (রা.) খলিফা উমর (রা.) এর কাছে খবর পাঠালেন। তখন উমর (রা.) বললেন, “তোমরা খোঁজ নাও, এখানে কোন এলাকাগুলো মানুষের বসবাসের জন্য উপযোগী হবে। জল এবং স্থল উভয় দিকটা খেয়াল রাখবে। চেষ্টা করবে তৃণলতা ঘেরা একটি অঞ্চল খুঁজে বের করার জন্য।” এবং তিনি দুজন সাহাবীকে পাঠালেন; একজন সালমান ফারসি (রা.), আরেকজন হযরত হুযাইফা (রা.) । তাঁরা কিছুদিন সময় নিয়ে গোটা বিজিত পারস্য অঞ্চল ঘুরলেন। দেখেশুনে দুটো জায়গাকে নির্দিষ্ট করলেন। একটি হচ্ছে দজলা নদীর তীরে বসরা আরেকটা হচ্ছে ফোরাত নদীর তীরে কূফা।
এখানে কয়েকটা বিষয় তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন: নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর আবহাওয়া ভালো হয়, মাটিও সাধারনত উর্বর হয়। ফলে সেখানে ফসলের উৎপাদন ভালো হয়, পশু-পাখির চারণভূমি হিসেবে ভালো হয়। যার ফলে মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক যে প্রয়োজন–খাদ্য তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। খাদ্যের চাইতেও যেটি বেশি প্রয়োজন হয় তা হচ্ছে পানি। পানির চাহিদাটাও নদীর কারণে পূরণ করা সম্ভব হয়। আবার, যোগাযোগের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হচ্ছে জল পথে যাতায়াত। নদী পথগুলো বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি গোটা মানবতাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শিখিয়েছে ইসলামী সভ্যতা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটাও পানি। তাছাড়া, দজলার বিশেষত্ব ছিল সেখানে বন্দর ছিল। যার ফলে বসরা মুসলমানদের বন্দর নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর সময় কূফাকে ইসলামী খেলাফতের রাজধানী করা হয়েছিল।

স্থান নির্বাচন সম্পন্ন হলে কূফা ও বসরা শহরকে ডিজাইন করার জন্য আবুল হায়াজ ইবনে মালিক নামক একজনকে উমর (রা.) দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। তিনি খুব সুন্দর করে এই দুইটা শহর ডিজাইন করেন। মূলত মদিনার যে মডেল ছিল— সে অনুযায়ী কেন্দ্রে মসজিদ তারপর শহরের গভর্নর/ শাসকদের বাসস্থান নির্মাণ করা হয়। তাদের বাসভবনের সাথে মসজিদের রাস্তা সরাসরি যুক্ত ছিল। এরপর ছিল রাজস্ব বিভাগের ভবন। পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা বিভাগের ভবন তৈরী করা হয় এর পাশে। এরপর বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরী করা হয়। নদীর সাথে সংযুক্ত করে অসংখ্য খাল খনন করে পানির প্রবাহকে সমগ্র শহরে বিস্তৃত করে দেয়া হয়।
মোট ১৫টি মূল সড়ক এর মাধ্যমে কূফাকে প্রায় ষোলোটি সাবজোনে ভাগ করা হয়েছিলো। এই সড়কগুলো ছিল প্রায় ৪০ গজ করে প্রশস্ত। মূল সড়কগুলোর সাথে যুক্ত অন্যান্য সড়কগুলো ছিল বিশ থেকে ত্রিশ গজ প্রশস্ত। মানুষের বাসা বাড়ি বা গলির যে রাস্তাগুলো ছিল, সেগুলোও ছিল অন্তত সাত গজ প্রশস্ত। এই প্রশস্ততার বিষয়টি খুব কঠোরভাবে বজায় রাখা হয়েছিল, যাতে মানুষের আলো-বাতাসের কোন সমস্যা না হয়।
২০০ হাত চওড়া বারান্দাবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় মসজিদ ছাড়াও শহরগুলোর প্রতিটি সাবজোনে একটি করে মসজিদ ছিলো। প্রথমে এগুলো খেজুর পাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে উমর (রা.) এর জীবদ্দশায়ই পাকা করা হয়। মূলত, একবার শহরে আগুন লাগে। তার পরপরই আগুনের হাত থেকে মানুষকে নিরাপদ করার জন্য, সকল বাড়ি ও মসজিদ পাকা করা হয়।

এখানে লক্ষ্য করলে দেখবো যে, কূফা ও বসরায় ইবনে খালদুন এর বর্ণিত শহরের সবগুলো বৈশিষ্ট্যই সংরক্ষিত হয়েছে। আমরা শুরুতেই যেটা দেখেছিলাম সেটা হচ্ছে আবহাওয়া ও বসবাসযোগ্য পরিবেশ। তারপর নিরাপত্তার বিষয়ে যদি দেখি, এর জন্য সর্বপ্রথম যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ। মানুষ যদি ভালো না হয়, তাহলে যত আইন-কানুন, নিয়ম-শৃঙ্খলা করা হোক না কেন সেখানে সর্বদাই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। এই মানুষ তৈরী করার জন্যই আল্লাহর রাসূল ২৩ বছর ধরে সংগ্রাম করেছেন। এই সংগ্রামের ফলে এমন মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরি হয়, যাদের দ্বারা মদিনা, কূফা, বসরা শান্তি ও নিরাপত্তার নগরীতে পরিণত হয়। আমরা জানি আল্লাহর রাসূলের সাহাবীরা কিভাবে নিজে না খেয়ে অন্যকে খেতে দিয়েছেন, নিজে না পরে অন্যকে পরতে দিয়েছেন। তিন দিন অভুক্ত থেকে খেতে বসছেন, এর মধ্যে কেউ এসে খাবার চাইলে তাকে নিজের খাবারটা দিয়ে দিয়েছেন। এভাবে যেকোন বিষয়ে নিজের উপর তার অপর ভাইকে প্রাধান্য দিয়েছেন। অন্যায়, অপরাধ প্রবণতা এগুলো থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গিয়েছেন। যে মানুষ নিজের উপর তার ভাইকে অগ্রাধিকার দিতে পারে তার পক্ষে অন্যায় করা, অপরাধ করা খুবই দুরুহ বিষয়। মাফসাদাত প্রতিরোধ ও মাসলাহাত প্রতিষ্ঠা করার জন্যও সর্বপ্রথম যে বিষয়টা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে মানুষ গড়া। মানুষ গড়ার কাজটা আল্লাহর রাসূল ২৩ বছর ধরেই করে গেছেন। যার ফলে তিনি যে উচ্চ মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ রেখে গেছেন তাদের দ্বারাই মদিনার ঐতিহ্যকে ধারণ করে রূহ সম্পন্ন অসংখ্য শহর নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। শান্তি, নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে আরেকটা যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তা হচ্ছে অর্থনীতি। অভাব-অনটন মানুষকে অপরাধ প্রবণতার দিকে নিয়ে যায়। আমরা দেখি আজ মানুষ ক্ষুধার কষ্টে পতিতাবৃত্তি কে বেছে নেয়। ক্ষুধার কষ্ট নিজেরটা সহ্য করে নিলেও বাবা-মা হিসেবে সন্তানেরটা সহ্য করে নেয়া খুবই কষ্টকর বিষয়। সবাইতো আল্লাহর রাসূলের (সা.) সাহাবীর মত উচ্চ মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ হবে না। যার কারণে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য রাসূলে কারিম (সা.) নিজেও চেষ্টা করেছেন। তার জীবদ্দশায় তিনি মদিনাতে উৎপাদন ও বাণিজ্যের সমৃদ্ধির জন্য কাজ করেছেন। পরবর্তীতে বিশেষ করে উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর অর্থনৈতিক মডেল আজকের দুনিয়ায়ও অনুসরণীয় মডেল। তিনি তার খেলাফত অধীনস্থ সমগ্র এলাকায় জরিপ করছিলেন– কোন অঞ্চল কৃষির জন্য উপযুক্ত, কোন অঞ্চল চারণ ভূমির জন্য উপযুক্ত, কোন অঞ্চলগুলোতে উৎপাদন সম্ভব না। এমনকি কোথায় কত বর্গফুট জমিতে কোন ফসল উৎপাদন করা যাবে, এভাবে জরিপ করলেন। পূর্বেই আমরা খাল খননের কথা বলেছি। তার উপর, কৃষকদের প্রচুর সুযোগ-সুবিধা দিলেন। কৃষি জমি গুলোকে যেন কেউ নষ্ট করতে না পারে তার জন্য যে বিধি-বিধান দিলেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসারের জন্য অন্যান্য শহরের সাথে যোগাযোগ, সম্পর্ক কেমন হবে সেটিও নির্ধারণ করে দিলেন। বাণিজ্য পথগুলোর নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা নিলেন। ফলে সারা পৃথিবীতে মুসলমানদের বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়তে লাগলো।

এর মাধ্যমে যেটা হলো, যেই মদিনায় ক্ষুধার কষ্টে মানুষ বুকে-পিঠে পাথর বেঁধে ঘুরে বেড়াতো–সেই মদিনায় একটা সময় পর যাকাত দেওয়ার মত মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু যে ধারার সৃষ্টি করলেন পরবর্তীতে ইসলামী সভ্যতায় সবসময় এর ধারাবাহিকতা বিদ্যমান ছিল।

ইসলামী সভ্যতা যেখানে গিয়েছে সেখানেই মানুষকে একটি সমৃদ্ধ জীবন উপহার দিয়েছে। উসমানী খেলাফতকালীন সময়ের একটা ঘটনা এভাবে প্রচলজত ছিলো: একজন যাকাত দাতা অনেক ঘুরে ঘুরে কোন ধরনের দরিদ্র মানুষ না পেয়ে অবশেষে একটি গাছের নিচে তার যাকাতের সম্পদ ঝুলিয়ে রেখে লিখে গেছে, “হে দরিদ্র! অনেক খুঁজেও আমি তোমাকে পেলাম না। তুমি যদি কোথাও থেকে থাকো, তোমার যদি কিছু প্রয়োজন হয় এখান থেকে নিয়ে নিও।” দরিদ্র মানুষ পাওয়া তখন এতটাই দুরূহ হয়ে পড়েছিল।

তবে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও মূল্যবোধ থাকার পরেও কিছু মানুষ অপরাধপ্রবণ হবেই। এ অপরাধগুলোকে প্রতিহত করার জন্য তখন আইন ও দন্ডবিধির প্রয়োজন। এই ব্যবস্থাও ইসলামী সভ্যতা করেছিল। ট্রাফিক পুলিশের যে ব্যবস্থা এটাও ইসলামী সভ্যতার অবদান। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জান মালের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। তাছাড়া, বিচার ব্যবস্থা ছিলো স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের কাছে জিম্মি ছিলোনা। আল্লাহর রাসূল (সা.) যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন— “অচিরে এমন হবে যে, সান’আ থেকে হাদরা মাউত পর্যন্ত একজন মানুষ একাকী হেঁটে যাবে, অথচ সে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাবে না। মেষপালক বাঘ ছাড়া আর অন্য কিছুর জন্য নিজের পশু নিয়ে ভয় পাবেনা।” পরবর্তীতে সাহাবীরা বলেছিলেন যে, রাসূল (সা.) যেটা বলেছেন তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। তার মানে সেখানে সত্যিকার অর্থেই শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

আরেকটি বিষয় হলো, অবকাঠামোর নির্মাণের ক্ষেত্রেও মানুষের জান-মালের নিরপত্তার বিষয়টি লক্ষ্য রাখা হতো। ইসলামী সভ্যতার যেকোন শহর ও স্থাপত্য নির্মাণের সময় নিরাপত্তাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। একারণে অবকাঠামোগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হতো, যেন সেগুলো টেকসই হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষম হয়৷ প্রতিটি অঞ্চলের আবহাওয়া ও ভূমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণের উপাদান ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা হতো।

শান্তি ও নিরাপত্তার মডেল : বায়তুল মাকদিস

ইসলামী সভ্যতার সবগুলো শহরই মদিনার ঐতিহ্যকে ধারণ করে শান্তি ও নিরপত্তার নগরী হয়ে উঠেছিলো। তবে বায়তুল মাকদিস নিয়ে নির্দিষ্টভাবে আলোচনা করার কারণ হলো এটি নিয়ে এখন অনেক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।
উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু যখন বাইতুল মাকদিস জয় করলেন, এখানে তিনি যে বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিলেন, তা হলো:
● শান্তি ও সংহতি,
● নিরাপত্তা,
● সাংস্কৃতিক বৈচিত্র সংরক্ষণ,
● মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা।

এখানে তিনি যে আইন-কানুন করলেন, সেগুলো শুধুমাত্র শাসক শ্রেণীর জন্য না, বরং সবার জন্য। অন্য ধর্মের অধিকার সংরক্ষণের ব্যাপারে এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। আমরা সবাই জানি পাদ্রী সাফোনিয়াস এর সাথে যখন উমর (রা.) চার্চ পরিদর্শনে যান, সেখানে নামাজের সময় হয়ে গেলে তাঁকে নামাজ পড়তে বলা হলে তিনি নামাজ পড়েননি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমার মৃত্যুর পর দেখা যাবে যে আমার মুসলমান ভাইরা দাবি করবেন এখানে আমাদের খলিফা নামাজ পড়েছেন, তাই এই জায়গাটা আমাদের। এখানে তিনি খ্রিস্টানদের অধিকার রক্ষার জন্য অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ইংরেজ ঐতিহাসিক কারেন্ট আইনস্ট্রম বলেছিলেন যে, “বায়তুল মাকদিসে মুসলমানরা এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানরা একসাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে সক্ষম হয়েছে।” যেহেতু বায়তুল মাকদিস এর প্রতি সকল মুসলমানদের আলাদা একটি ধর্মীয় আবেগ কাজ করে। কেননা, মুসলমানদের কাছে এটি অসংখ্য কারণে পবিত্র। মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাসের অংশ এটি। আবার খ্রিস্টানরাও যেহেতু মূসা (আ.) এর কারণে এই জায়গাটা তাদের বলে মনে করে, এই জায়গায় শান্তি ও সংহতির মধ্য দিয়ে সকল মানুষ যেন বসবাস করতে পারে–এজন্য বিশেষ করে উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এ বিষয়গুলো সামনে রেখে শহরের নিজাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আধুনিক শহর ব্যবস্থার মডেল : কর্ডোভা

কর্ডোভা, গ্রানাডা সহ আন্দালুসিয়ার শহরগুলো ইউরোপের বুকে সে সময় (৭৫০-৮০০খ্রী.) প্রতিষ্ঠিত শহর, যে সময়ে ইউরোপের মানুষ পানির ব্যবহার জানতো না, আলোর ব্যবহার জানত না। আন্দালুসিয়ায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম শহর কর্ডোভা। সে সময় (৭০০/ ৮০০ শতাব্দীতে) শুধুমাত্র কর্ডোভা শহরে ৮০০ টি স্কুল, ৯০০ টি হাম্মামখানা, ৫০ টি হাসপাতাল ছিল। এই হাসপাতালগুলো এতটাই অত্যাধুনিক ছিল যে, ইউরোপের একজন পর্যটক অসুস্থ হওয়ার কারণে আন্দালুসিয়ার একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিল। সে ফিরে গিয়ে বলেছিল— আন্দালুসিয়ার হাসপাতালগুলো এরকম যে, মানুষ শখ করে অসুস্থ হতে চাইবে। ইসলামী সভ্যতার হাসপাতালগুলো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অপারেশন করতো সাধারণত নাপিতরা এবং মনে করা হতো যে, অপারেশনের যে পোশাক, তা পরিবর্তন করতে হয় না, সারা জীবন একই পোশাক পরতে হয়। চিকিৎসা ও অপারেশনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, হাসপাতাল পরিষ্কার রাখা–এ ধারণাগুলো ইসলামী সভ্যতার অবদান।

এছাড়া কর্ডোভায় ৭০ টি লাইব্রেরি ছিল। উল্লেখযোগ্য প্রাসাদ এর মধ্যে ছিলো আজ জাহারা প্রাসাদ। এই প্রাসাদের আশে-পাশে সুসজ্জিত বাগান ছিল, অসংখ্য ঝরনা ছিল। সেখানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা এগুলো বিদ্যমান ছিল। গোয়াদেল কুইভার নদীর উপর সেতু মুসলমানরা বানিয়েছিলো। সারা শহরে প্রচুর পরিমাণে কৃত্রিম হ্রদ, জলাশয়, চৌবাচ্চা স্থাপন করেছিল।
এমনকি একজন পর্যটক বলেছিলেন, “সে সময় কেউ চাইলে কর্ডোভা শহরে রাতের বেলা ১০ মাইল রাস্তা নির্বিঘ্নে সরল রৈখিক ভাবে হাঁটতে পারতো।” এ থেকে বুঝা যায়, রাস্তাগুলো রাতের বেলায় কী পরিমাণ আলোকিত থাকতো, কীরকম মসৃণ ও নিরাপদ রাস্তা ছিলো। রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের ব্যবস্থার প্রবর্তকও ছিল মুসলমানরা। অথচ ২০২৫ সালে এসেও আমাদের অনেক রাস্তাঘাট অন্ধকার থাকে।
এভাবে গোটা আন্দালুসিয়ায় সে’সময় আশিটি ফার্স্ট ক্লাস শহর ছিল। আরো তিনশোটি মিউনিসিপাল শহর ছিল। যেমন আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ শহর মালাগা-আন্দালুসিয়ার প্রধান বাণিজ্য নগরী, যার সাথে সারা পৃথিবীর বাণিজ্য ছিল। গ্রানাডা আন্দালুসিয়ার সর্বশেষ রাজধানী, যেখান থেকে আন্দালুসীয় সভ্যতার শেষ সূর্য অস্ত গিয়েছে। গ্রানাডার আল হামরা প্রাসাদকে বলা হতো “মানুষের সৃষ্টিশীলতার এবং সৌন্দর্যের ও রুচিবোধের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ”। সেই আল হামরার ইতিহাস ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ অধ্যায়ের মধ্যেও একটা। কারণ খ্রিস্টান বাহিনী এই শহর ও সভ্যতাকে করুণভাবে ধ্বংস করেছে, মুসলমানদের সম্পূর্ণরূপে সেখান থেকে বিতাড়িত করেছে। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এরপর মসজিদগুলোকে গির্জায় পরিণত করা হয়েছে। যার ফলে এই সভ্যতার নিদর্শনগুলো খুঁজে পাওয়া, সংরক্ষণ করা বা দেখা এখন সবচাইতে কঠিন। তা সত্ত্বেও, আল হামরার প্রাসাদের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে তৈরীকৃত একটি ডকুমেন্টারি নিয়ে সম্প্রতি সারা দুনিয়ায় তোলপাড় হয়ে গেছে। আশ্চর্য হয়ে গেছে গোটা বিশ্ব। এত বছর আগে কিভাবে তারা পেরেছে এরকম জটিল ওয়াটার চ্যানেল সৃষ্টি করতে! গোয়াদাল কুইভার নদী থেকে আনা পানির লাইনটা থেকে সমগ্র প্রাসাদে ওয়াটার চ্যানেল সৃষ্টি করা হয়েছে। অসংখ্য পানির ফোয়ারা রাখা হয়েছে। হাম্মামখানা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা জায়গায় অসাধারণভাবে পানির চ্যানেল সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি অনেকগুলো প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখে করা হয়েছিল–সৌন্দর্য বর্ধন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, মানুষের পানির চাহিদা পূরণ। সে’সময় আল হামরার কক্ষ গুলোতে শীততাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল। এক ধরনের পাইপের মাধ্যমে গরম বাতাস নিষ্কাশন করা যেত। যার ফলে রুমের ভেতরে ঠান্ডা থাকতো আবার শীতকালে গরম বাতাস সংরক্ষণ করে রুমগুলোকে গরম রাখা হতো। একইভাবে হাম্মামখানায় স্বয়ংক্রিয় গরম পানির ব্যবস্থা ছিলো। এখন আমরা যে এসি ও গিজার ব্যবহার করি, সেগুলোরই প্রাচীন ভার্সন বলা যায়। এটি আমি বাংলাদেশে দেখেছিলাম শাহ এনেয়াতুল্লাহর মাজারে। সেখানে শাহ সুজার একটি বিশ্রামাগার ছিল, যেটিতে হাম্মাম খানার পানি গরম করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ছিল।
এ যে আন্দালুসিয়ার শহরগুলো— এগুলো এমনি এমনি তৈরি হয়নি, এগুলোর পিছনে মানুষ ছিল। আবার যখন এরকম সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হলো সেখান থেকেও কিন্তু অসংখ্য মানুষ গড়ে উঠলো। যার কারনে আমরা যদি আন্দালুসিয়ের বিখ্যাত মানুষ এর নাম বলতে যাই, এমন শ’খানেক বিখ্যাত মানুষের নাম একটানে বলতে পারব, যাদের নাম শুনলেই যেকেউ চিনবে: ইবনে খাতিব, ইবেন হাসান, ইবনে আল হায়সান, আল মুজাফফর, ইবনে রুশদ, ইবনে মায়মুন, ইবনে আরাবী, ইবেন বাজ্জা, ইবনে তোফায়েল, ইবনে খালদুন, ইবনে ইদ্রিসি, আল মাজিনি, আল মাজারিতি, ইবনে আফলা, আল বিতরুসি। নারীদের মধ্যে ছিল কর্ডোভার লুবানা, সুলতানা আয়শা, ফাতিমা আল মাজারিতি। এরকম অসংখ্য নারীর নাম পাওয়া যায়—যাদের একেক জন একেকটা ফিন্ডে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে স্মরণীয় হয়েছেন। নারীদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। কর্ডোভা কিন্তু সংস্কৃতির দিক থেকেও অনেক সমৃদ্ধ ছিল। কর্ডোভা ও সমগ্র আন্দালুসিয়া জুড়ে প্রায় ১৫টির মত মিউজিকের আলাদা আলাদা ইন্সট্রুমেন্ট প্রচলিত ছিল এবং কবিতার অনেকগুলো ধারা ছিল। আন্দালুসিয়ায় সে’সময় সাহিত্যের ও মিউজকের অসংখ্য আঞ্চলিক ধারাও ছিল। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এ সভ্যতা অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু, এগুলো বিস্তারিত আলোচনার জন্য আরও বড় কলেবর প্রয়োজন। এখানে আলোচনা দীর্ঘ করতে চাচ্ছিনা।

জ্ঞানের কেন্দ্র : বাগদাদ

বাগদাদকে বলা হয় এমন একটি শহর, যেটি মদিনার লিগেসি/ ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করে। বাগদাদকে একই সাথে জ্ঞানের নগরী বলা হয়, আবার মদিনাতুস সালাম বা শান্তির শহরও বলা হয়। মূলত, তৎকালীন বিশ্বের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানের কেন্দ্র ছিল এটি। এখানে বিশেষ করে খলিফা মামুনের সময় বায়তুল হিকমা কে কেন্দ্র করে সারা পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞানকে একত্রিত করা হয়েছিল। বাগদাদে বায়তুল হিকমার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো অনুবাদ আন্দোলন। বলা হয়ে থাকে, তৎকালীন দুনিয়ার এমন কোন জ্ঞান ছিল না, যেটা বায়তুল হিকমাতে অনুবাদ করা হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে গ্রীক সভ্যতার দেড়শ’ বছরের যত অর্জন আছে–এরিস্টটল থেকে শুরু করে সবাইকে ব্যাখ্যা করা ও অনুবাদ করা, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়া, এগুলো বায়তুল হিকমাতে হয়েছে। ভারতবর্ষ যেহেতু গণিতের জন্য বিখ্যাত ছিল, আর্যভট্ট থেকে শুরু করে ভারতীয় গণিতজ্ঞদের কাজগুলোও সেখানে অনূদিত হয়েছে। একইভাবে পারস্য সভ্যতা থেকে শুরু করে, মোট কথা– সারা পৃথিবীতে যেখানে যে জ্ঞান ছিল সেগুলোকে বায়তুল হিকমাতে এনে অনুবাদ করা হতো। এগুলোর ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ, সংকলন ও সংরক্ষণ এবং পরবর্তী গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হয়েছিলো। বাগদাদকেন্দ্রিক এই জ্ঞানের আন্দোলন গোটা মানবসভ্যতাকে কয়েকশ বছর এগিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে খলিফা মামুন নিজেই যেহেতু বড় স্কলার ছিলেন, তিনি আমন্ত্রণ করে সারা পৃথিবীর সব পণ্ডিত, জ্ঞানী ও আলেমদের বায়তুল হিকমাতে নিয়ে আসতেন। পণ্ডিত, জ্ঞানী ও আলেমদের জন্যও সবচাইতে সম্মানজনক ছিল এই বায়তুল হিকমায় কাজ করা ও গবেষণা করা। যেমন: আল-ফারাবি ২০ বছর বায়তুল হিকমাতে ছিলেন। সেখানে বসেই তিনি “মাদিনাতুল ফাদিলা” লিখেছিলেন। মুসা আল খাওয়ারিজমী তার “কিতাবুল যাবার” এখানে বসে লিখেছেন। এরপর আল কিন্দি ক্রিপ্টোগ্রাফি আবিষ্কার করেছেন এখান থেকে। আল জাজারি ছিলেন, আবু জাফের ইবনে মুসা ছিলেন। বাগদাদ শহরকে কেন্দ্র করে অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত স্কলার উঠে এসেছেন। এভাবে নামকরা দার্শনিক, পদার্থ বিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ, ভুগোলবিদ এরকম অন্তত ৫০ টা নাম এক টানে বলে দেওয়া যাবে, যারা বাগদাদে বসে জ্ঞানচর্চা করেছেন। পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানচিত্রও এখানে বসে বানানো হয়েছিল। পৃথিবীর আকার-আকৃতি এখানকার বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করেছিলেন। শুধু বাগদাদের জ্ঞান-চর্চার ইতিহাস নিয়ে পাতার পর পাতা লেখা যাবে।

শুদু বাগদাদ নয়, শুধু কূফা নয়, মদিনা নয়; ইসলামী সভ্যতা আমাদের এমন অসংখ্য শহর উপহার দিয়েছে। সাফাভীদের রাজধানী ইসফাহান, মাওয়ারাউন নাহর এর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সমরকন্দ, ফাতেমী খেলাফত এর রাজধানী কায়ারো, উসমানী খেলাফতের রাজধানী ইস্তাম্বুল, উসমানীদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র কোনিয়া, আফগানিস্তানের কাবুল-কান্দাহার, মোঘলদের রাজধানী দিল্লি, বাংলার রাজধানী ঢাকা, সোনারগাঁও, মুর্শিদাবাদ— এরকম অসংখ্য শহর ইসলামী সভ্যতা আমাদের উপহার দিয়েছিল।
সেই গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতার উত্তরসূরী হিসেবে আবারও সভ্যতার পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখি আমরা। আমাদের যে শহরগুলো আছে— ঢাকা, চট্টগ্রাম, সোনারগাঁও, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এগুলোকে আবারো সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি। সেই আখলাক ও আধ্যাত্মিকতা, সেই আদালত দিয়ে আমাদের শহরগুলো প্রতিষ্ঠিত হোক। একই রকম সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা আমাদের শহরগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হোক। সেই শহরকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে ধরনের মানুষ প্রয়োজন, আমাদের একেক জনকে আল্লাহর রাব্বুল আলামিন সেই ধরনের মানুষ হবার প্রচেষ্টাকারী হিসেবে কবুল করুন।

সোর্স:
● Pivot Cities in the Rise and Fall of Civilisations- Ahmet Davutolu
● শহরের রূহ- হাসান আল ফেরদৌস
● উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের মুসলমানদের ইতিহাস- ড. এম আব্দুল কাদের ও ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান
● আব্বাসী খেলাফতের ইতিহাস- ড. মাহবুবুর রহমান
● আরব জাতির ইতিহাস- সৈয়দ আমির আলী
● মুসলিম স্থাপত্য ও প্রত্নতত্ত্বের বিকাশ- প্রফেসর মো আব্দুল করিম, ড. মো আবুল কালাম
● ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট এর কোর্স-ইসলামী সভ্যতার শহর ব্যবস্থা (ওস্তাদ ইউসুফ ইয়ালানিজ)
● মসজিদে আকসাকে মুক্ত করার কৌশলগত পরিকল্পনা- আব্দুল ফাত্তাহ আল ওয়াইসি

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *