মানবজীবনের অস্তিত্বকে বজায় রেখে সামাজিক জীবনমান নিশ্চিত করার জন্য সর্বপ্রথম যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো মানুষের খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মানুষের অস্তিত্ব বরাবরই খাদ্যের উপর নির্ভরশীল। মানবতার মুক্তি ও কল্যাণের অনন্য অভিপ্রায়কে সামনে রেখে দুনিয়ার বুকে ইসলামের আগমন ঘটেছিল। আর তার অপরিহার্য দাবি হিসেবে ইসলামী সভ্যতার প্রতিটি যুগেই মানুষের অন্যান্য সকল মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি খাদ্যের নিরাপত্তার প্রতি সুলতানগণ সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তাদের নিরলস প্রচেষ্টা, যুগোপযোগী চিন্তা, অঞ্চলভেদে ভূমি ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং আখলাকী মূল্যবোধের উপর খাদ্য উৎপাদন এবং এর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে তারা এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হয়েছিলেন।
ইসলামী সভ্যতায় খাদ্যের সংকট, দুর্ভিক্ষ, অনিরাপত্তার নজির নেই বললেই চলে। ইতিহাসে কিছু কিছু সময়কালকে খাদ্যোৎপাদনের সংকটকালীন সময় বলে মনে হলেও সেগুলোর অধিকাংশই ঘটেছিল খরা বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। যুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাবে নয়। ইতিহাসের সুনিপুণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মুসলমানরা যেখানেই গিয়েছে, সেখানেই তারা কৃষির বিস্তার ঘটিয়েছে এবং তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোকে সেই অঞ্চলের মানুষদের যোগ্য ও দক্ষ করে তুলেছেন। ফলশ্রুতিতে সকলের ঐক্যবদ্ধ কাজ ও সহযোগিতার মাধ্যমেই মসলিমরা কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করে তুলতে পেরেছিলেন। তবে, ইসলামী সভ্যতার পতনের পর কৃষি খাতের সামগ্রিক উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় মুসলিম দেশসমূহের প্রচেষ্টাগত ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার ফলস্বরূপ পুরো মুসলিম উম্মাহ প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মুখে পতিত হয়।
খাদ্য উৎপাদন এবং নিরাপত্তা:
খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খাদ্য উৎপাদন মূলত বিভিন্ন ফসল, প্রাণিসম্পদ, মৎস্যসম্পদ ইত্যাদির উৎপাদন বা পালন প্রক্রিয়াকে ইঙ্গিত করে। আর খাদ্য নিরাপত্তা বলতে খাবারের সহজলভ্যতা, বেঁচে থাকার জন্য খাবার সরবরাহের অধিকার এবং এর ব্যবহারবিধিকে বুঝানো হয়। সমগ্র বিশ্বে অধিকাংশ খাবার যোগানের উৎস হচ্ছে এই কৃষি খাত যা একইসাথে বস্ত্রের চাহিদাও পূরণ করছে। যেমন: তুলা, পশম, চামড়া এ সবই কৃষিজাত পণ্য। তবে খাদ্য সংগ্রহ ও উৎপাদনের পদ্ধতি সময়ের সাথে সাথে রূপ বদলায়। যেমন, কৃষিকেন্দ্রিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ কৃষি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে।
বর্তমানে পৃথিবীকে প্রায় ৯ বিলিয়ন জনগণের খাদ্যচাহিদা পূরণের চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে এবং ধারণা করা হচ্ছে আগামী ৪০ বছর এই বৈশ্বিক খাদ্য চাহিদা বাড়তেই থাকবে। যার দরুন ভূমি, পানি, শক্তি প্রভৃতি সরবরাহ এবং সংরক্ষণ উভয়ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতার হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সাথে শিল্পায়নের অজুহাতে প্রকৃতির ওপর বৈরী আচরণও যুক্ত হয়েছে। প্রকৃতিকে অনুকূলে নেওয়ার এ নিকৃষ্টতর প্রতিযোগিতার প্রভাবে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক গতিবিধি হারিয়ে ফেলছে, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা। তবে খাদ্য উৎপাদনে আরেকটি বড় হুমকি রয়েছে, তা হলো জলবায়ুর যথেচ্ছ পরিবর্তন। কিন্তু এক্ষেত্রে আশার কথা হচ্ছে, খাদ্যের সঠিক উৎপাদন ও ন্যায়ভিত্তিক বণ্টননীতি নিশ্চিত করা গেলে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব। একটি পরিসংখ্যানের রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ খাদ্য অপচয় হচ্ছে, তা দিয়ে পৃথিবীর সকল ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব যেটি সব থেকে অবাক করা বিষয়। অর্থাৎ পৃথিবীতে বসবাসকারী সব মানুষের ক্ষুধা নিবারণের জন্য যে পরিমাণ খাদ্য প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি খাদ্য উৎপাদনে সক্ষম বর্তমান পৃথিবী।
সমগ্র বিশ্বে দীর্ঘকালীন খাদ্য সংকটের ভুক্তভোগী মানুষের সঠিক সংখ্যা ২০১৪ সালে হিসাবকৃত ৭৭৫ মিলিয়ন থেকে ২০১৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭৭ মিলিয়নে। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা বেড়ে আনুমানিক ৮১৫ মিলিয়নে পৌঁছেছে। এছাড়াও, ২০১০-১১ সালে হঠাৎ খাদ্যমূল্যের বৃদ্ধির কারণে ৪৪ মিলিয়ন মানুষ ১.২৫ ডলার দৈনিক আয় নিয়ে চরম দারিদ্র্যসীমার মধ্যে জীবনযাপন করেছে। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি হলো, বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করা যা ২০৫০ সালে দাঁড়াতে পারে প্রায় ১০ বিলিয়ন। ২০৫০ সাল অবধি আরও ২ বিলিয়ন মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটাতে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ আরও ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গবেষণাধর্মী বিষয় হওয়ায় তা নিশ্চিত করতে পুষ্টি, মাটি এবং পানি ব্যবস্থাপনা, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য উৎপাদন, ক্ষুদ্র পরিসরে খাদ্য উৎপাদকের উৎপাদনশীলতা ও আয়, খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার নমনীয়তা এবং জীববৈচিত্র্য ও জেনেটিক টেকনোলজির টেকসই ব্যবহার প্রভৃতি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিস্তৃতভাবে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরেকটি যে উদ্বেগের বিষয় রয়েছে তা হলো খাদ্য উৎপাদনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগ যেমন, উচ্চ তাপমাত্রা, খরা, বন্যা প্রভৃতির প্রভাবে উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাবে এবং স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদিত খাদ্য সামগ্রীর দাম বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ আফ্রিকা এবং এশিয়ার কয়েক মিলিয়ন মানুষ অনাহারে থাকবে। এ বিষয়ে “দ্য অবজার্ভার” পত্রিকায় প্রকাশিত খ্যাতনামা বিজ্ঞানীগণ বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কারণে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় পরিণত হবে। পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি দরিদ্রদের জন্য গুরুতর পরিস্থিতি বয়ে আনবে। উপরন্ত মৌলিক খাদ্যসামগ্রীর উপর মানুষের প্রাপ্য অধিকার পূরণে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি-গবেষণা পরামর্শক পরিষদের পরিচালক, ফ্র্যাঙ্ক রেগসবারম্যান বলেন, “জলবায়ুর পরিবর্তন পৃথিবীর প্রত্যাশিত কৃষি উৎপাদনকে নির্মূল করে দেবে।”
খাইরি আমালের করা ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, ইসলামী সহযোগী সংস্থা (OIC) এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেষ্টা সত্ত্বেও এই সকল দেশের খাদ্য অনিরাপত্তা এবং অপুষ্টি বেড়ে দিনদিন আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাই এই দেশগুলোর খাদ্য উৎপাদন ও সুরক্ষা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি উন্নত করতে আরও বেশি আন্তরিক পদক্ষেপ নেওয়া এবং সেগুলো বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা খুবই জরুরি।
ইসলামী সভ্যতা:
ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাসূল (স.)-এর কর্মসূচিগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জাযিরাতুল আরব এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে রাসূল (স.)-এর মৃত্যুর পর খোলাফায়ে রাশেদার সময়কালে সিরিয়া, মিশর, ইরাক এবং পারস্যের বিভিন্ন অংশ বিজিত হয়। ফলে ইসলাম খুব দ্রুতই একটি বৃহৎ এবং বৈচিত্র্যময় সভ্যতা হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমে আন্দালুসিয়া এবং পূর্ব দিকে ভারত পর্যন্ত মুসলিম সালতানাতের সীমানা সম্প্রসারিত হয়। উল্লেখ্য, সপ্তম ও অষ্টম শতকে তিনটি মহাদেশে ইসলামের যে বিস্তার ঘটেছিল, এর ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতা পাওয়া যায় সেই সময়ে উৎপন্ন নতুন ফসলের সহজাত সম্প্রসারণে।
আব্বাসীয় খিলাফতের সময় আলেমগণ গ্রিক সভ্যতাসহ সকল সভ্যতার উপর জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণ করেন এবং অন্যান্য সকল শাখা যেমন- দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, কৃষি ইত্যাদিতে অবদান রেখেছিলেন। উমাইয়া খেলাফত ৫,০০০,০০০ বর্গমাইল (১৩,০০০,০০০ বর্গ কি.মি) জুড়ে বিস্তৃত ছিল যা এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যগুলোর একটি এবং সীমান্তবর্তী দেশের সংখ্যাধিক্যে পঞ্চম। এত বৃহৎ আয়তনের একটি সাম্রাজ্যে ছিল না কোনো ক্ষুধা কিংবা অনাহার যেটি নিঃসন্দেহে অসাধারণ এক দৃষ্টান্ত। জনসংখ্যা এবং ভৌগোলিক সীমা এত বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও উমাইয়াগণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ মুসলিম উম্মাহর ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ লোক চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অনাহার, অপুষ্টি, এবং অর্থনৈতিক শোষণের শিকার। তাদের এই সমস্যা সমাধানের জন্য খাদ্য উৎপাদন এবং খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে গ্রহণ করাই উপযুক্ত পদক্ষেপ হবে বলে মনে করি।
খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থায়ী খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে ইসলামী পন্থা:
পবিত্র আল-কোরআনকে বিস্তারিতভাবে অধ্যয়ন করলে বুঝা যায়, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য নিরাপত্তাসহ মানুষের জীবনের সাথে সংগতিপূর্ণ সকল পন্থা ও ব্যবস্থাপনাকে ইসলাম কতটা নিখুঁতভাবে পেশ করেছে। খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমন্বয় বজায় রাখতে ইসলামী রাষ্ট্র আন্তঃসংযুক্ত তিনটি বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির প্রস্তাবনা দেয়। এই বিভাগগুলো হলো, মুসলিম কোষাগার বিভাগ, খাদ্য সংরক্ষণ বিভাগ, সামাজিক কার্যসংক্রান্ত বিভাগ। এই তিনটি বিভাগ মুসলিম শুরা পরিষদ দ্বারা পরিচালিত হবে।
খাদ্য উৎপাদনে ইসলামী পুরস্কার (সাদকায়ে যারিয়াহ):
রাসূল (স.) বলেছেন, “বৃক্ষ রোপণ হলো এমন একটি কাজ যা মানুষের মৃত্যুর পরও সাদকায়ে যারিয়াহ হিসেবে জারি থাকে।” অর্থাৎ ইসলামে কৃষিকাজ ও খাদ্য উৎপাদনকে সাদকায়ে যারিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খাদ্য নিরাপত্তার সন্ধান করা ইসলামে ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচিত এবং এ বিষয়ের সাথে ইসলাম বা ঈমানের সম্পর্ক কী, কতটুকু সে মর্মে কয়েকটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যাক-
সূরা আল বাকারার ৫৭ ও ১৭২ নং আয়াতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে উপযুক্ত ও স্বাস্থ্যকর খাবার বাছাই করা পূর্বক আহার করার আদেশ দিয়েছেন।
সূরা আল ইসরা এর ২৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, “অপচয়কারী শয়তানের ভাই।” আবার সূরা আর রহমান এর ৮ নং আয়াতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে অতিরিক্ত খরচ না করতে বা ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার না করারও আদেশ দিয়েছেন। সেই মোতাবেক খাদ্যের অপচয় করা বা অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
◆ রাসূল (স.) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা চাও কারণ অন্য কেউ কখনো সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।” (ইমাম আহমদ সূত্রে বর্ণিত: সহীহ আল জামে)
◆ রাসূল (স.) আরও বলেছেন, “নিজ হাতে উপার্জন করা খাবারের থেকে উত্তম খাবার আর কিছু নেই। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খাবার খেতেন।”(সহীহ বুখারী)
একজন ব্যক্তির সুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ভালো অর্থাৎ সুষম খাবার যথেষ্ট পরিমাণে খেতে পারা। তাই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন একজন মুসলিমের ঈমান ও ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইসলামী সভ্যতায় খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা:
ইসলামী সভ্যতার বিভিন্ন সময় অর্থাৎ, রাসূল (স.)-এর সময়কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মুসলিমগণ ‘খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা’ বাস্তবায়নে কীভাবে চর্চা চালিয়ে গিয়েছেন সে অভিজ্ঞতাসমূহ এই অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হলো।
* রাসূল (স.)-এর সময়ে কৃষি (৫৭০-৬৩২ খ্রিস্টাব্দ): ইসলামপূর্ব যুগে জাযিরাতুল
আরবের মধ্যবর্তী অঞ্চলের আরবগণ কৃষির ব্যপারে তেমন মনোযোগী ছিলেন না। তাঁরা তাদের প্রয়োজনীয় কৃষি ও খাদ্য পণ্য, ব্যবসা এবং অন্যান্য পণ্য ব্যবসায়িক সূত্রে পেয়ে যেতেন। পাম গাছ ছিল তাদের নিকট সবচেয়ে মূল্যবান। কারণ এগুলো মরুদ্যানে বালুর টিলার মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেড়ে ওঠে এবং খুব কম পানি ও পরিশ্রমেই অনেক ভালো ফল দেয়।
মরুভূমির ভৌগোলিক প্রকৃতির জন্য, আরবীয় উপদ্বীপের জনগণকে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হতে হতো। এই সময়ে অনাহারী মানুষ পাতা, কুকুরসহ অন্যান্য প্রাণীর গোশত খেয়ে জীবন ধারণ করতে বাধ্য হতো। ফলে সোমালিয়া, ইয়েমেন ও অন্যান্য অঞ্চলের মানুষদের ওপর আরবীয় উপদ্বীপের অনাহারী মানুষদের যাকাত দেওয়ার ফতোয়া জারি করা হয়।
রাসূল (স.)-এর সময়ে খাদ্য উৎপাদনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়:
১. কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য রাসূল (স.) লোহিত সাগর ও পাহাড়ের মধ্যকার বৃহৎ জমি বেলাল আল মুজনিকে দিয়ে দেন। রাসূল (স.)-এর অনেক সাহাবী এ জমিতে কৃ ষিকাজ করতেন। মদীনা বাগান এবং খামারের জন্য বিখ্যাত ছিল। রাসূল (স.) তাঁর আরও অনেক সাহাবীদের এই বিশাল ভূমি চাষাবাদ ও ব্যবসা করার জন্য দেন। তাঁদের মধ্যে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ও উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে খায়বার ও রাবিয়া আল আসলামির মূল্যবান ভূমি দেয়া হয়েছিল।
২. রাসূল (স.)-এর সময়ে প্রথম দিকের মুসলিমগণ মুজারায় চুক্তির অধীনে চাষাবাদ করতেন। একজন মুসলিম তার নিজ জমি অন্য একজন মুসলিমকে চাষ করতে দিতেন যেন সে বীজ, সেচ ও জমির যত্নের দায়িত্ব পালন করে এবং মৌসুম শেষে জমির মালিককে ফসলের এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ প্রদান করে।
৩. মক্কা ও মদীনার বাজারসহ অন্যান্য ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে “আমিল আলা শুকর মুহতাসিব” (স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কর্মকর্তার ন্যায়) নামের একজনকে নিযুক্ত করা হয়। এই পদটি জাহেলি যুগেও বিদ্যমান থাকায় এটি বেশ সম্মানজনক পদ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। একজন মুহতাসিবের দায়িত্ব হলো বাজার পর্যবেক্ষণ করা এবং বাজার পরিচালনায় শৃঙ্খলা (ভোক্তা সুরক্ষা ও ন্যায্যতা এবং পণ্যের ন্যায্যতা ও মান) নিশ্চিত করা, নিয়ম ভঙ্গ, অমত কিংবা অভিযোগের ক্ষেত্রে শরীয়ত অনুযায়ী সঠিক বিচার প্রদান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এই মুহতাসিব পদ এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, সরাসরি রাষ্ট্র কর্তৃক এই পদে ব্যক্তি নিযুক্ত করার জন্য নির্বাচন করা হতো। শহরের জন্য মুহতাসিব পদ উনিশ শতক পর্যন্তও চালু ছিল।
* খোলাফায়ে রাশেদার সময়ে কৃষি (৬৩২-৬৬১ খ্রিস্টাব্দে) খোলাফায়ে রাশেদার সময়কালেও তাঁরা রাসূল (স.)-এর সময় ব্যবহৃত পন্থা অবলম্বন করেন। কৃষি জমির উর্বরতা বাড়াতে, তাঁরা জনগণকে জমি প্রদান করতেন চাষাবাদ করার জন্য। পাশাপাশি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য কিছু নতুন পন্থা অবলম্বন করেন। তিনি ঘোষণা করেন, “তোমরা চাষাবাদ করো আল্লাহর জন্য, মৃত জমিনকে সজীব করে তুলো।” মৃত জমি বলতে এমন জমিকে বুঝায় যা আগে চাষাবাদের জন্য ব্যবহৃত হয়নি, যা রাষ্ট্র অথবা কোন মৃত ব্যক্তির মালিকানাধীন ছিল এবং অন্য কেউ তা দাবি করেনি। আর এভাবে অনেকেই মৃত জমি চাষবাদ করতো। উমর (রা.)-এর পর উসমান (রা.) ও আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)ও তাই করেছেন।
উমর (রা.)-এর সময়ে একবার ইসলামী রাষ্ট্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয় এবং এই বছরকে ইতিহাসে বলা হয় আর-রেমাদাহ। হিজরী ১৮ সালে আরবীয় উপদ্বীপের মানুষ তীব্র দারিদ্য, অনাহার ও খরায় ভোগে। ক্ষুধা তীব আকার ধারণ করলে গহপালিত পশুও মারা যায়। চারিদিকে চরম দুর্ভিক্ষ দেখা যায়। এই দুর্ভিক্ষ ছিল প্লেগের সাথে সম্পর্কিত। মানুষ মরুঅঞ্চল থেকে শহরের দিকে দ্রুত সরে আসে এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকে। তখন তারা খলিফার কাছে সমাধান বা সাহায্য চাইতে আসেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী আল রেমাদাহের বছরে ২৫০০০ এর মতো মানুষ মারা যায়। এই দুঃসময় মোকাবিলায় ওমর (রা.) পাঁচটি পদক্ষেপ নেন। সেগুলো হলো-
তিনি নিজেকে একজন রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি নিজে আগে খেতেন না, অন্য সকলের খাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন।
আল রেমাদাহের বছরে তিনি অভিবাসীদের জন্য শরণার্থী শিবির প্রতিষ্ঠা করেন ও বিভিন্ন সেবা প্রদানের মাধ্যমে তাদের সহায়তা করেন।
* তিনি মিশরের মতো আর যেসব দেশ দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হয়নি, সেসব দেশের কাছে সহায়তা চান।
* বৃষ্টি হওয়া ও খরা শেষ হওয়ার জন্য তিনি নিজে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন এবং সকলকে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে বলতেন।
* এসময়ে তিনি মানুষকে জরিমানা ও কর আদায় থেকে অব্যাহতি দেন। একইসাথে শাস্তির আইনসমূহ রহিত করেন। (যা ইসলামী সভ্যতার ১২০০ বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য)।
এছাড়াও উমর (রা.) কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেন-
জমি আবাদ ও উন্নয়ন করতে মানুষকে জমি প্রদান করেন।
কৃষির উন্নয়নের জন্য কৃষি কর চালু করেন।
কৃষির উন্নয়নে যাকাত তহবিলের ব্যবস্থা করেন।
সংকটের সময় আটার সমপরিমাণে দ্রব্য বিতরণ নিশ্চিত করেন এবং কৌশলে আটার ব্যাংক স্থাপন করেন আটা মজুদ করার জন্য।
♦ তিনি দরিদ শ্রেণির সাথে পরামর্শ করে বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠা করেন যা ছিল দরিদ অভাবগ্রস্ত, বয়োঃবৃদ্ধ, অনাথ, বিধবা ও প্রতিবন্ধী সকল মানুষের জন্য একটি সার্বজনীন কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান।
দুর্ভিক্ষের বছর ব্যতিত উমর (রা.) তাঁর খিলাফতকালে দারিদ্র্য নির্মূল করতে পেরেছিলেন এবং মানুষ সে সময় সম্পূর্ণ ক্ষুধা ও অভাবমুক্ত অবস্থায় বসবাস করতে পেরেছিল।
* উমাইয়া খিলাফতে কৃষি (৬৬১-৭৫০ খ্রিস্টাব্দ): উমাইয়া যুগ ছিল কৃষি উন্নয়নের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুগ। উদাহরণস্বরূপ, এ সময়ে তায়েফে সেচ ও উৎপাদন কাজের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ৭০টি পানির বাঁধ ছিল। উমাইয়া যুগে কর ও যাকাত সংগ্রহের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে জমি নিরীক্ষার নির্দেশ ছিল। তারা পানির খাল নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, নর্দমা মেরামত ও কৃষকদের পতিত জমিতে উৎপাদন ও উন্নয়নে উৎসাহিত করতো। এর ফলে শস্য, তুলা ও আখ ছাড়াও আঙুর, জলপাই ও পামের মতো ফলের ফলনও বৃদ্ধি পায়।
উমাইয়া খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রা.) একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালু করেন যা দরিদ্র, অভাবগ্রস্ত মানুষদের খাদ্য সংস্থানে নিবেদিত ছিল। তিনি কৃষকদের উৎসাহিত করতে ও জমিতে চাষের পরিমাণ বাড়াতে ঋণ প্রদান করেন। পরিশেষে সাধারণভাবে বলা যায়, সীমিত কিছু দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধা ও অনাহারের ঘটনা ছাড়া উমাইয়া যুগে খাদ্যের উৎপাদন ছিল প্রচুর এবং সকল স্থানের সকল মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তাও ছিল আশানুরূপ।
* আব্বাসীয় খিলাফত (৭৫০-৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ): আব্বাসীয় যুগের প্রথম দিকের খলিফাগণ কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতেন। তারা খাল খনন ও উন্নয়ন, জলপ্রণালী, সেতু ও সহজে পানি প্রবাহের জন্য খিলান তৈরিতে ছিলেন সক্রিয়। আব্বাসীয় খিলাফতের উর্বর জমিসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর মধ্যকার জমি। আব্বাসীয়গণ উদ্ভিদের ধরণ ও তা চাষাবাদে মাটির কার্যকারিতা নিয়ে অধ্যয়ন করতেন এবং উদ্ভিদের ধরণভেদে ভিন্ন ভিন্ন সার ব্যবহার করতেন। এমনকি এই সময়ে এসে আব্বাসীয় খলিফাগণ কৃষকদের ওপর করও কমিয়ে দেন।
আব্বাসীয় যুগেই কৃষিতে প্রথম জ্ঞান, যন্ত্রপাতি ও পদ্ধতির সমন্বিত ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বৈজ্ঞানিক চাষাবাদের ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। অষ্টম থেকে পনেরো শতকে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যবর্তী স্পেন, উত্তর আফ্রিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে কৃ মিক্ষেত্রে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়। তারা পশুচালিত সেচের কাজে ইরানি-পানি চক্রের ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তুলে।
ইসলামী সভ্যতায় আব্বাসীয় খলিফাদের সময়ে পৃথিবীর সেরা সেচ পরিকল্পনা ও পানির নেটওয়ার্ক নির্মাণ করা হয়েছিল যা এখনো আধুনিক পানি প্রকৌশলীদের মুগ্ধ করে। আল মামুনের যুগে কৃষি থেকে প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সম্পদ (খারাজ কর) প্রায় ৩,০৯০ (তিন হাজার নব্বই) মিলিয়নে পৌঁছায়। এ থেকেই অনুধাবন করা যায়, আব্বাসীয় যুগে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও খাদ্য নিরাপত্তা কত দূর এগিয়ে ছিল। উমাইয়া যুগের মতো আব্বাসী যুগেও কিছু স্থানে সীমিত দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধা ও অনাহারের ঘটনা ব্যতীত খাদ্য উৎপাদন ছিল পর্যাপ্ত এবং খাদ্য নিরাপত্তা ছিল সর্বোচ্চ।
* আন্দালুসিয়া, আইবেরিয়া অঞ্চলে কৃষি (৭১১-১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ): বলা হয়ে থাকে, আন্দালুসিয়ার কৃষিই হলো ইসলামের স্বর্ণযুগ। কৃষিক্ষেত্রে এখানেই সবচেয়ে বেশি উন্নতি সাধিত হয়েছিল। মুসলিম বিজ্ঞানীগণ আল আন্দালুস সহ অন্যান্য অনেক জায়গায় উৎপাদন পদ্ধতি, রোপণের কৌশল, চারা কলম করার বিভিন্ন কৌশল, নতুন সেচ ব্যবস্থা, জমি বিলির পরিকল্পনা, রোপণ আবর্তনের জন্য কৃষি পঞ্জিকা তৈরি, বিভিন্ন ধরনের মাটির ধরন ও তার ব্যবহার, জমি পুনরুদ্ধারের পদ্ধতি এবং উদ্ভিদ বিজ্ঞানের প্রসারণ প্রভৃতি বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত বিষয়ের ধারণা প্রদান করে অবদান রেখেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, ইবনে বাসসাল, ইবনুল আওয়াম, ইবনে হাজ্জাহ আল আসবিলি, ইবনে হাওকালসহ আরো অনেকে।
মুসলিম অভিবাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে তারা আইবেরিয়ান উপদ্বীপে সবচেয়ে অনুর্বর জমিকে নিবিড় কৃষি কাজের উপযোগী জমিতে রূপান্তর করে। এভাবেই তারা দক্ষিণ ইউরোপে দীর্ঘ মেয়াদী কষি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে বর্তমানেও আইবেরীয় উপদ্বীপে ব্যবহৃত সবচেয়ে বড় সেচ সোপান ব্যবস্থাটি উৎপাদনশীল অর্ধ শুষ্ক এলাকায় অবস্থিত।
সেচের যন্ত্র নির্মাণ পদ্ধতি ছিল একটি জটিল ব্যপার। তারা সোপানের স্থানে গাছপালা পুড়িয়ে পরিষ্কার করে এবং তেল দিয়ে সোপানগুলো পর্ণ করে। সেচ পদ্ধতি এবং চাষের কাজে উদ্ভাবনী প্রচেষ্টার মাধ্যমে দন্ত্রন ফসল প্রচলন করে। একেকটি প্রদেশের কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ ও মান বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থার ভিত্তিতে একেক রকম ছিল।
বলা যায়, আন্দালুসিয়ার কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে মুসলিমদের অবদান অপরিসীম। আর এ কৃষি অগ্রগতিই দেশের উন্নতি ও বিকাশ এবং খাদ্য সুরক্ষার দিকে পরিচালিত করে পথ প্রদর্শনী ভূমিকা রেখেছে। সর্বোপরি, কৃষির এই যুগান্তকারী পরিবর্তনে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।
* ভারত ও মধ্য এশিয়ায় মুসলিম শাসনকালে কষি (১০০১-১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ): ভারতীয় উপমহাদেশ ও মধ্য এশিয়ার মুসলিম জনসংখ্যা ছিল বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যার ৫০.৬% । সারা বিশ্বে ১৬০ কোটির মধ্যে ৮০ কোটি ৮৯ লাখ)। তাই অর্থনীতিতে বিশেষ করে ক ষিতে এ অঞ্চলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
* ভারতীয় উপমহাদেশে কৃষি : এ অঞ্চলে সুফিগণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের মাঝে কৃষি চর্চাকে জনপ্রিয় করে তুলেন এবং এর মাধ্যমে এখানে মুসলিম জনসংখ্যার ঘনত্বও বৃদ্ধি পায়। সুফীগণ সেচের কাজে ইরানি চাকা প্রযুক্তি (প্রাচীন ভারতে এটি ‘জল যন্ত্র’ নামে প্রচলিত ছিল) চালু করেন, যা এখানকার মানুষকে এই অঞ্চলের শুষ্ক ভূমি চাষাবাদ করতে সাহায্য করে। ফলে কৃষির ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। একইসাথে ইসলামেরও প্রচার ও প্রসার ঘটতে থাকে এবং কয়েক প্রজন্ম পর তাদের উত্তরাধিকারগণ ইসলাম গ্রহণ করতে থাকেন। এভাবে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ বছরের ব্যবধানে বিরাট সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটে। বাংলায় ব-দ্বীপের নদী তার প্রবাহ পথ পরিবর্তন করে পশ্চিমের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে।
মুসলিমদের চাকার মাধ্যমে চালু করা সেচ প্রযুক্তি ও খাল খননের ফলে উত্তর ভারতে কৃষির উন্নয়ন ঘটতে থাকে। মুসলিম শাসনামলে সমগ্র ভারতবর্ষ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণে খাদ্যশস্য ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করে।
কিন্তু বর্তমানে ভারতের কৃষি উৎপাদন, এর জনসংখ্যার (মুসলিম ও অমুসলিম) খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত নয়। আর এ শস্য উৎপাদনে ঘাটতির ফলেই ভারতে খাদ্য নিরাপত্তার পতন ঘটে। সুসমৃদ্ধ অবস্থান থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের এ অবস্থায় অবনমনের মূল কারণ ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। ব্রিটিশদের ভয়াবহ শোষণ ও জুলুমের ফলে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।
* আইয়ুবীয় সালতানাতে কৃষি (১১৭১-১২৫৪ খ্রিস্টাব্দ): আইয়ুবীয় সুলতানগণ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ফসলী জমিতে সেচ কাজ সহজতর করতে সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে খাল খনন করা হয়। এছাড়াও তারা সেচের জন্য Water wheel ব্যবহারে সফল হন। স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউরোপীয়দের আখের বিশাল চাহিদা মেটাতে আখ চাষ করার জন্য সরকারিভাবে উৎসাহিত করা হতো। তাদের বেশ কিছু উদ্ভিদ ক্রুসেডারদের মাধ্যমে ইউরোপে চালান হয়। যেমন: তিল, কারব, বাজরা, ধান, লেবু, তরমুজ, খুবানি (এপ্রিকট) এবং পেঁয়াজ (শ্যালট)।
আইয়ুবীয় শাসনামল ছিল মিশরীয় কৃষি সমৃদ্ধির যুগ। এখান থেকে গম অনেক সময় হিজাজ অঞ্চল ও সিরিয়ায় রপ্তানি করা হতো। ইয়েমেনের কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে আইয়ুবীয় সুলতানগণ অঞ্চলটির উর্বরতা, মাটি, বৈচিত্র্যময় আবহাওয়া এবং পানির প্রাচুর্যের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানুষের সাহায্যের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার করে।
* মামলুকী সালতানাতে কৃষি (১২৫০-১৫১৭ খ্রিস্টাব্দ): মামলুকী সালতানাতের অর্থনীতিতে রাজস্বের মূল উৎস ছিল কষি। মিশর, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে মামলুকদের রপ্তানিকৃত অধিকাংশ পণ্যই ছিল কৃষিজাত। এছাড়াও চিনি ও বস্ত্র শিল্পের উৎপাদন যথ ক্রিমে আখ ও তুলার মতো কৃষিজাত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রতিটি কৃষি পণ্যের ওপর রাষ্ট্র কর্তৃক কর আরোপ করা হতো।
বিভিন্ন কারণে মামলুকদের খাদ্য উৎপাদনের কেন্দ্রীকরণ আওতা ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার তুলনায় মিশরে তুলনামূলকভাবে আরো ব্যাপক ছিল। এগুলোর অন্যতম কারণ হলো, মিশরে সকল কৃষিকাজের জন্য মূল সেচের উৎস ছিল একটিই আর সেটি হলো নীল নদ। আবার সেচের পরিমাণ ও অধিকারও নদের প্লাবনের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যেখানে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে সেচের বহুবিধ উৎস ছিল। এর মধ্যে প্রধান ছিল বৃষ্টির পানি (Rainfed Irrigation)। আর এভাবেই স্থানীয়দের মাঝে সেচের পরিমাণ ও অধিকার নির্ধারণ হতো।
মামলুকদের প্রাদেশিক ও জেলা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব ছিল জনশূন্য অঞ্চগুলোকে পুনরায় জনপূর্ণ করা, ভূমিকে বেদুইনদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা, অনুর্বর জমিতে উৎপাদন বৃদ্ধি করা (উদাহরণস্বরূপ, সেচের ব্যবস্থা সচল রাখা ও বিস্তৃত করা) এবং তুলনামূলক নিচু আবাদি জমি চাষ করায় আরও মনোযোগ দেয়া। মামলুক খলিফাগণ সেখানে দরিদ্র মানুষদের টিকিয়ে রাখা ও তাদের খাদ্য, শিক্ষা এবং চিকিৎসার চাহিদা মেটানোর উপর জোর দিয়েছিলেন।
* উসমানীয় খিলাফতে কৃষি (১৫১৭-১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ): উসমানীয় খিলাফতের বাসিন্দারা খাদ্য এবং শিল্পোৎপাদনে স্বচ্ছলতা অর্জন করেছিল। অতএব, উসমানীয় সুলতানদের দ্বারা । নিয়ন্ত্রিত প্রদেশ সমূহ ১৬ শতকের মাঝামাঝি থেকে ১৮ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা উপভোগ করেছে।
উসমানীয়রা বৃহৎ রেলপথের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। এর ফলে সমগ্র রাজ্যে কৃষি উৎপাদন, বণ্টন ও খাদ্যশস্যের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পায়। তারা সুবিশাল উর্বর কৃষি ভূমি নিয়ন্ত্রণ করতো। লেভান্টের বিস্তৃত সমভূমি, ডান্ডি নদীর অববাহিকা, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকা, নীল উপত্যকা, এশিয়ার ক্ষুদ্র সমভূমি ও উত্তর আফ্রিকা ছিল তাদের ভূমির অন্তর্ভুক্ত। এই সকল অঞ্চল উর্বর ভূমি, পানির প্রাচুর্য ও প্রচুর উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। কৃষি উৎপাদনও ছিল বৈচিত্র্যময়। প্রাণী ও উদ্ভিদের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি রেশম, উল ও সাবানের শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে।
উসমানীয় খিলাফত তাদের সৈন্যদের পর্যাপ্ত খাবার ও বস্ত্র নিশ্চিত করতো। যার ফলে উসমানীদের সমৃদ্ধ কৃষি তাদের সামরিক শক্তির সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রেও প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছিল।
* মুঘল সালতানাতে কৃষি (১৫২৬-১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ): মুঘল সালতানাতের সম্মিলিত সম্পদ কৃষি শুল্কের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মুঘল শাসনাধীনে ভারতীয় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে রপ্তানি। মুঘল শাসকগণ সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে সেচ-ব্যবস্থা তৈরির জন্য অর্থায়ন করেন, যার ফলে অনেক বেশি ফলন হয় ও রাজস্ব বৃদ্ধি পায় । ফলস্বরূপ কৃষি উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পায়। গম, ধান, বার্লির মতো বিভিন্ন ধরনের শস্য ছাড়াও তুলা, নীল, আফিমের মতো বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের ফলন হতো।
ভারতীয় অঞ্চলে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন করে ভারতীয় উপমহাদেশকে উৎপাদনের দিক দিয়ে পৃথিবীর শীর্ষে নিয়ে যায় মুঘলরা। মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও বৃটিশদের শোষণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বেশির ভাগ উন্নয়ন, খাদ্য প্রাপ্তি ও সার্বিকভাবে অর্থনীতির অধঃপতন ঘটে।
* খিলাফতের পতন পরবর্তী সময় (১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ- বর্তমান) : আরব অঞ্চলে ১৯৭
মিলিয়ন হেক্টর আবাদি জমি থাকলেও সম্প্রতি মাত্র ৮০ মিলিয়ন হেক্টর জমি চাষ করা হয় যা মোট আবাদি জমির মাত্র ৪০%। কৃষি উৎপাদনের মধ্যে প্রায় ২৩% মৌসুমি ফসল ও ৪.৯% স্থায়ী ফসল। আরব অঞ্চলের শ্রমিকদের মাত্র ২৩% কৃষিতে নিযুক্ত। তবে গ্রামীণ এলাকা থেকে শহরে অভিবাসনের ফলে এই সংখ্যাটিও প্রতিনিয়ত কমছে। সাতটি দেশ (আলজেরিয়া, মিশর, ইরাক, মরক্কো, সুদান, সিরিয়া ও তিউনিসিয়া) আরবের কৃষির জিডিপিতে অবদান রাখছে যার পরিমাণ ২০০৮ সালে ছিল প্রায় ৮৫%।
সুদান হতে পারত আরবের গুরুত্বপূর্ণ শস্য উৎপাদনকারী প্রধান অঞ্চল। তবে তা না হয়ে ভূমি বিবাদ ও উচ্চ খাদ্য মূল্য দেশটিকে চরম দারিদ্র্য সীমায় ঠেলে দিয়েছে। সুদানের আছে ২০০ মিলিয়ন একরের বিশ্বের সবচেয়ে উর্বর কৃষি ভূমি ও নদী, ভূ-গর্ভস্থ পানি, বৃষ্টির মতো প্রচুর পানি সম্পদ। সোমালিয়া ও সুদানের মতো কিছু আরব অঞ্চলীয় দেশের জাতীয় আয়ের মূল উৎস কৃষি খাত। আবার এমন কিছু দেশ এই অঞ্চলে রয়েছে যাদের কৃষি খাত থেকে আয় কম আসছে।
উল্লিখিত উপাত্তগুলো উৎপাদন হ্রাসের দিকে ইঙ্গিত করে। সব ধরনের শস্যের ক্ষেত্রেই আমদানির পরিমাণ ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বেড়েই চলেছে। চারটি প্রধান শস্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতার হার ছিল প্রায় ৩৩% যা খুবই উদ্বেগজনক। প্রধান শস্য পণ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতার হার ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। রপ্তানিকৃত শস্য পণ্যের পরিমাণ নগণ্য। উৎপাদন ও ভোগের চাহিদার মধ্যকার ব্যবধান আমদানিকৃত শস্য ও পণ্য দ্বারা পূরণ করা হতো যা আরব অঞ্চলকে পরনির্ভরশীল করে তুলে। সরবরাহকারীরা এই নির্ভরশীলতাকে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করে। ক্ষুদ্র খামার সমূহের ওপর নির্ভরতার কারণে অ-শস্য পণ্যের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতার শতকরার হার তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। কন্দ (tuber), মূল (root), ডাল, সবজি ও ফলের উৎপাদন আরব অঞ্চলে অনেক বেশি বা আমদানির দ্বিগুণ। তবে চিনি, তেল ও চর্বির ক্ষেত্রে উৎপাদনের চিত্র পুরোই উল্টো।
উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বের ৬% জনগণ বসবাস করেন এবং এই অঞ্চল থেকেই বিশ্বের মোট ক্রয়কৃত গমের এক-তৃতীয়াংশ বিক্রয় করা হয়। বিশ্বে উৎপাদিত মোট গমের অর্ধেকই উৎপাদিত হয় ৫টি দেশে (ভারত, রাশিয়া, চীন ,যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন) বিশ্ব ব্যাংক এবং বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০০৯ সালে প্রকাশিত যৌথ বিবরণ অনুযায়ী, আরব দেশগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় গম আমদানিকারক। কাজেই খাদ্যের ভোগ ও উৎপাদনের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনতে আরব অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যকার সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে।
বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) ২০১৪ সালের অক্টোবরে মধ্যপ্রাচ্যকে এমন একমাত্র অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে যেখানে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। অতএব বলা যায়, সংশোধনের জন্য সম্মিলিত পদ্ধতি অনুসরণে ব্যর্থতাই সামগ্রিক ব্যর্থতার কারণ। সেচ পদ্ধতি, মূল্য নির্ধারণ ও অর্থায়ন নীতি প্রস্তাবিত পুনর্গঠনের সমন্বিত পন্থার অন্তর্ভুক্ত।
খাদ্য উৎপাদনে এগিয়ে থাকার ওপর ভিত্তি করে পাঁচটি মসলিম দেশকে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হচ্ছে, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, পাকিস্তান ও ইরান। সকল মুসলিম রাষ্ট্রের এই পাঁচটি দেশের খাদ্য চাহিদা ও উৎপাদন, খাদ্য স্থানান্তর ও একে অপরের মাঝে খাদ্য বিনিময় এর ক্ষেত্রে সমন্বয় করে যথাসম্ভব খাদ্য নিরাপত্তা হাসিল করা প্রয়োজন।
একটি প্রতিবেদন ESCWA (পশ্চিম এশীয় পাঁচটি দেশ) অঞ্চলে বিদ্যমান বহুমুখী বিবাদ ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ওপর আলোকপাত করে। সম্প্রতি আরব দেশগুলোর ৪০%-৯০% আমদানির হারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী সবচেয়ে বেশি। আরব বিশ্ব খাদ্যসামগ্রীর শীর্ষ আমদানিকারক এবং এই আমদানির খরচ ২০১১ সালে ৫৬ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০৫০ সালে ১৫০ মিলিয়ন ডলার হয়ে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অতএব, মুসলিম দেশগুলোর মৌলিক কর্মপন্থা ও বর্তমান সময়ের প্রথম কৌশল হওয়া প্রয়োজন-
১. খাদ্য আমদানি কমানো।
২ স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্ভিক্ষ নিয়ন্ত্রণযোগ্য করতে করণীয়:
১. খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কারণগুলোকে বিবেচনায় এনে দ্রুত সমাধানের জন্য কাজ করা।
২. মুসলিম নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়ে পদ্ধতিগতভাবে কাজ করার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনের জন্য পানি সংরক্ষণ।
৩. যতক্ষণ না খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে খরা ও বন্যার প্রভাব কমিয়ে আনতে মানুষকে ব্যাপকভাবে কাজ করে যাওয়ার তাগিদ দেয়া।
উল্লিখিত এই পর্যালোচনা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়।
সমগ্র ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস দেখলে সুলতানদের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে সফলতা ও ইতিবাচক মনোভাব দেখতে পাওয়া যায়। কারণ এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্বন্ধে আল কোরআন এবং রাসূল (স.)-এর সুন্নতের মধ্যে উল্লেখ হয়েছিল।
* মুসলিম দেশ সমূহে সুচিন্তিত উপায়ে ব্যাপক খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিকল্পনা ও প্রয়োগ নিশ্চিত করণ এবং সময় ও স্থান অনুযায়ী সম্পর্ণভাবে প্রয়োগ করে রক্ষণাবেক্ষণ করা উচিত।
বিভিন্ন মুসলিম শাসনামলের খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কিত সংগৃহীত তথ্য বেশিরভাগ সময়ে খাদ্যের সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী মূল্যের দিকে ইঙ্গিত করে। ক্ষেত্র বিশেষে ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ ছিল, তবে তা খুবই কম।
খাদ্য উৎপাদন, বিতরণ ও দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা কমাতে কৌশলগত দিক দিয়ে এখনো অনেক উন্নয়নের প্রয়োজন। তবে মানুষের চাহিদা মেটানো ও অধিকারকে মূল্যায়ন করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিম দেশগুলোতে খাদ্য আমদানি কমানো ও আঞ্চলিক খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা মৌলিক নীতি ও কৌশল প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
মুসলিম বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মাঝে রাজনৈতিক সমন্বয় ও সমন্বিত ব্যবসা, খাদ্য পণ্য স্থানান্তর হওয়া প্রয়োজন।
মুসলিমদের খাদ্য সংরক্ষণ ও বেহিসাবী ব্যয়ের প্রতি নিরুৎসাহিত করে তাদের এ বিষয়ে জ্ঞান ও সচেতনতা তৈরি করা অতীব জরুরি।
দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ওমর ইবনুল খাত্তাব তাঁর খিলাফতে যেসব পন্থা অবলম্বন করেছেন তা ইসলামের ইতিহাসে অনুসরণীয় সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
ক্ষুধা মোকাবিলা ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষকে সাহায্যের জন্য মুসলিম তহবিল বা দানের সহায়তায় অতিথিশালা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা হলো আরেকটি উপযুক্ত, সফল ও অনুসরণীয় উদাহরণ।
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্ভিক্ষ নিয়ন্ত্রণযোগ্য করতে এর কারণগুলোকে বিবেচনায় মুসলিম নেতৃবৃন্দকে সচেষ্ট হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ঐক্যবদ্ধভাবে একটি মেথডে কাজ করার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনের জন্য পানি সংরক্ষণ, খরা ও বন্যার প্রভাব কমিয়ে আনা প্রয়োজন। সামগ্রিকভাবে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, একটি রাষ্ট্র যেসকল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাঁর মধ্যে অন্যতম গুরুত্ববহ খাত হচ্ছে কৃষি। ইসলামী সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসকাল পর্যালোচনা করলে আমরা এ বিষয়ের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ দেখতে পাই। তাই সন্দেহাতীতভাবে স্পষ্ট যে, খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য ব্যবস্থাপনায় মানব ইতিহাসে ইসলামী সভ্যতাই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং অনন্য দৃষ্টান্ত।
অনুবাদ : নওরীন নবী
