মুসলিম সভ্যতার আজকের অন্যতম বৃহত্তম সংকট—আমাদের অস্তিত্বের সংকট, যা মূলত আমাদের নগর ও বাস্তুসংস্থান বা শহুরে পরিসরের রূপান্তরের সঙ্গে জড়িত।
তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা সহজ নয়। কারণ তত্ত্ব হল এমন একটি কাঠামো, যা বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেকে বাস্তবতার বাইরে সরিয়ে নেয়, যেন আমরা দূর থেকে সবকিছু স্পষ্টভাবে দেখতে পারি। এরপর সেই তত্ত্বের নিজস্ব নীতি ও ধারণার সাহায্যে আমরা বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করি, বিন্যস্ত করি এবং বোঝার চেষ্টা করি। এই মানসিক শৃঙ্খলা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা—যেমন আধুনিক সমাজবিজ্ঞান বলে—ভবিষ্যৎ কিছুটা পূর্বানুমান করার চেষ্টা করি, যাতে আমরা নিয়ন্ত্রণের কিছুটা ক্ষমতা অর্জন করতে পারি। কারণ আমরা জানি, পূর্বানুমান করতে পারলেই আমরা ইতিহাসকে আমাদের ইচ্ছামতো পরিচালিত করতে পারি; আর মানুষ আজ মনে করে, সে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। আমরা যেন এক নতুন হোমো দেউস, এই পৃথিবীর ‘দেবতা’।
কিন্তু সভ্যতার ধারণা নিয়ে এমন মনোভাব গভীর সমস্যা সৃষ্টি করে। “সভ্যতা” শব্দটি যেমন জটিল, তেমনই “মুসলিম সভ্যতার তত্ত্বায়ন”ও দ্ব্যর্থক ও বিতর্কিত। এটি কোনো প্রাচীন ধারণা নয়; বরং ঔপনিবেশিক যুগে উদ্ভূত, যখন ‘বর্বর’ ও ‘সভ্য’ এই বিভাজন তৈরি করা হয়েছিল। এখান থেকেই জন্ম নেয় সেই “সভ্য করার মিশন”—যদি তুমি সর্বোচ্চ সভ্যতার প্রতিনিধি হও, তবে অন্যদের সভ্য করার দায়িত্ব তোমার; প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ, নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা—সবকিছু বৈধ হয়ে ওঠে।
তাই সভ্যতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এটিকে ভেঙে কিছু নির্দিষ্ট ধারণায় ভাগ করাই যুক্তিসঙ্গত। আমরা এমন কোনো বিমূর্ত ধারণা গ্রহণ করতে পারি না, যার দ্বারা বাস্তবের সঙ্গে কোনো সংযোগ হয় না। তাই সভ্যতার আলোচনায় আমরা সাধারণত এটিকে চারটি অংশে ভাগ করি—সভ্যতা, নগর, নাগরিত্ব এবং নাগরিক-পরিসর। এই অংশগুলো মিলিত হয়ে সভ্যতার সামগ্রিক রূপ নির্ধারণ করে।
নগর বা শহরকে আমরা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সমাজ বর্বর জীবন থেকে উত্তরণ করেছে নগর প্রতিষ্ঠা ও সভ্যতার বিস্তারের মাধ্যমে। একটি সভ্যতা গড়ে উঠলে তার বিস্তৃতির প্রয়োজন হয়, মূলত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি অর্জনের জন্য। ফলে একের পর এক নগর যুক্ত হয় বৃহত্তর একটি ব্যবস্থার সঙ্গে। সভ্যতা ও রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো সীমানা—বিস্তার মানে সীমানা প্রসারিত হওয়া; পতনের সঙ্গে সেই সীমানা সঙ্কুচিত হয়। অর্থাৎ সভ্যতা কোনো স্থির রূপ নয়; উত্থান ও পতনের ধারাবাহিকতা এতে বিদ্যমান। পতন আমরা হঠাৎ দেখি; তার আগমন বোঝা প্রায় অসম্ভব।
যে সামাজিক ব্যবস্থার ছায়াতলে আমরা বসবাস করি, তার স্থায়িত্বে আমাদের আস্থা থাকে। কিছু সমস্যা থাকলেও মনে হয় সব ঠিক আছে—এবং হঠাৎই সব ভেঙে পড়ে। প্রাচীর ধ্বসে যায়, নতুন একটি ব্যবস্থা জন্ম নেয়। এই দুই ব্যবস্থার মধ্যবর্তী সন্ধিক্ষণ—যেখানে একটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায় আর অন্যটি জন্ম নেয়—আমরা সাধারণত উপলব্ধি করতে পারি না। কারণ পুরনো ব্যবস্থার ধারণা এখনও আমাদের চিন্তায় প্রভাব ফেলে, ফলে আগত পরিবর্তনকে আমরা স্বীকার করতে দেরি করি।
যারা আরব বসন্ত বা অনুরূপ সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন, তারা এই সত্যের সঙ্গে পরিচিত। পরিবর্তনগুলো দ্রুত ঘটতে থাকে, এবং পরবর্তীতে একটি নতুন বাস্তবতা আবির্ভূত হয়—যা আসলে বহুদিন ধরে গড়ে উঠছিল। যাদের সূচক-চিহ্ন বোঝার ক্ষমতা আছে, তারা বলতে পারে—কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে; যদিও তারা নির্দিষ্টভাবে তা পূর্বানুমান করতে পারে না।
তাই সভ্যতা নিয়ে কথা বলতে গেলে—আমরা কী বোঝাই? আর ইসলামী সভ্যতা, বিশেষ করে ইসলামী আধুনিক সভ্যতা—আমরা কীভাবে তা আলোচনা করব? আপনি বলতে পারেন—একটি ইসলামী নাগরিকতার ধরণ কেমন হয়। আপনি বলতে পারেন—রূপান্তরের কথাও।
আধুনিক যুগে আমাদের কোনো পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সভ্যতা নেই; আমাদের আছে মুসলিম উম্মাহ। আর আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে আমাদের সৌজন্যবোধ, আমাদের সভ্যতা, আমাদের সহাবস্থানের ধরণকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়। যে ইসলামী নগরগুলোর কথা আমরা স্মরণ করি, সেই নগরগুলো বহুবার রূপ পরিবর্তন করেছে। আমরা সুন্দর মসজিদ, ঐতিহ্যবাহী বাজার, সরু গলি নিয়ে কথা বলি। কিন্তু যখন আপনি বাসাকশেহিরের মতো আধুনিক শহরে যান, মসজিদগুলো না থাকলে আপনি বুঝতেই পারবেন না আপনি কোথায় আছেন। মনে হবে, আপনি যে কোনো আধুনিক নগরে উপস্থিত। গগনচুম্বী অট্টালিকা, বিশাল বাজার, সুপারমার্কেট, দোকানপাট—সবকিছুই আপনাকে একটি সাধারণ আধুনিক শহরের অভিজ্ঞতা দেবে। যদি সূচালো মিনারগুলো না থাকত, তবে আপনি জানতেই পারতেন না এটি কোন মুসলিম নগর।
নগর পরিবর্তিত হয়েছে। এবং মুসলিম সভ্যতার আজকের অন্যতম বৃহৎ সংকট—মানবসমাজে আমাদের উপস্থিতির সংকট। আমরা আধুনিক পরিসরে বসবাস করছি; ইসলামী নগরে নয়। নগর বিকৃত ও খণ্ডিত হয়ে গেছে। এমনকি “নগর” শব্দের অর্থও পাল্টে গেছে।
একটি নগর তার অধিবাসীদের মালিকানায় থাকে। তা একটি উদ্দেশ্য নিয়ে নির্মিত হয়। তার নিজস্ব সামাজিক বুনন থাকে। তার নিজস্ব আচরণবিধি থাকে। কিন্তু উপনিবেশবাদ, এরপর বিশ্বায়ন—এসব প্রক্রিয়ার ফলে এসব ধারা অনেক পরিবর্তিত হয়েছে।
তাহলে মুসলিম সৌজন্যবোধ, মুসলিম নাগরিকতা, বলে আমরা কী বুঝি? যদি আমরা মুসলিম সৌজন্যতার কথা বলতে চাই, তবে শ্রেষ্ঠ পথগুলো কী হতে পারে?
আমি “উম্মাহর ঐক্য” প্রসঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে পারি। আমাদের মনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি কাজ করে যে আমরা সবাই এক, সবাই একই। কিন্তু ঐক্য মানে অভিন্নতা নয়। এর অর্থ এই নয় যে, আমরা দেখতে একই রকম। সত্তর ও আশির দশকের ইসলামী পুনর্জাগরণের সময় আমরা ভাবতাম আমরা সবাই এক। আমরা গান গাইতাম: “উই আর ওয়ান উম্মাহ।” এখন সেই গানটি শুনলে মনে হয়—এ কী? কেন?
বিশ্বমানচিত্রে নানা জাতি রয়েছে। আমাদের একটি মিশন আছে—কিন্তু তা প্রাধান্য বিস্তারের মিশন নয়। আমরা আধিপত্য চাই না; আমরা চাই আমাদের মিশন পূরণ করতে—আমানত রক্ষা করতে, এবং শাহাদাহ পালন করতে।
এই মিশন উপলব্ধির সঙ্গে আছে অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজন। বৈচিত্র্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ভবিষ্যতের কোনো মুসলিম সভ্যতা কল্পনা করতে চাইলে আপনাকে ভাবতে হবে—উম্মাহর ভেতরের বৈচিত্র্য কীভাবে পরিচালিত হবে, এবং উম্মাহর অন্তর্গত অঞ্চলে বসবাসরত অমুসলিমদের বৈচিত্র্য কীভাবে সমন্বিত হবে।
যারা মালয়েশিয়া থেকে আসেন, তারা চীনা ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশের সঙ্গে বসবাস করেন। মালয়েশিয়া একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ। আরব বিশ্বে প্রধান রাজনৈতিক সমস্যাগুলো সংখ্যালঘুদের ঘিরে—কুর্দ, বারবার (আমাজিঘ), কপ্ট—যা-ই বলেন।
আপনি কীভাবে এগুলো নাগরিকতা ও সভ্য-আচরণের ভিত্তিতে পরিচালনা করবেন—এমন নাগরিকতা যা অপরিহার্যভাবে উদার-নৈতিক নয়? আমাদের ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন উদাহরণ রয়েছে, যেমন উসমানীয় সালতানাত মিল্লেত ব্যবস্থা।
আমরা যখন ঐক্যের আহ্বান জানাই—যেমন মার্কস বলেছিলেন, “বিশ্বের শ্রমিকগণ, এক হও”—তখন শ্রমিকরাও নানা পটভূমি থেকে এসেছেন—গ্রামীণ, শহুরে, শিল্পাঞ্চলীয়। এই জটিলতাকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।
সভ্যতা, সৌজন্যতা এবং আমাদের নগর নিয়ে কথা বলতে গেলে—২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ নগরে বসবাস করবে। নগর আমাদের বিশ্ববোধ গড়ে দেয়। শহুরে জীবন—খুবই উত্তর-আধুনিক। আপনি নানা নগরে গেলে শপিং মলে ঢুকলে দেখবেন কসমেটিক্স ডানদিকে, পরে পোশাক, দ্বিতীয় তলায় অন্যান্য দোকান, আর ফুড কোর্ট ওপরে বা বেজমেন্টে। আপনাকে যদি কোনো মলের ভেতর রাখা হয়, আপনি বুঝতেই পারবেন না আপনি ইস্তাম্বুলে, না দুবাইয়ে।
আমাদের বস্তুজগত গঠিত হয়েছে এমন কিছুর দ্বারা, যা ইসলামী নয়। আমরা কীভাবে এটিকে ইসলামী করব, যখন এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ?
সভ্যতা-তত্ত্বের সমস্যা হলো—এগুলো ম্যাক্রো; দীর্ঘ সময়জুড়ে বিস্তৃত এবং সর্বজনীন। কিন্তু যদি আমরা ইসলামী নাগরিকতা এবং আমাদের নগর নিয়ে ভাবতে চাই, তবে আমাদের দৈনন্দিন পরিসরে ফিরে যেতে হবে। দৈনন্দিন রূপ পরিবর্তন হলে জিনিস ভেঙে পড়ে। এবং কখনো কখনো এই পরিবর্তন শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক নয়; এটি বস্তুগতও।
দৈনন্দিন জীবনে আমাদের মূল্যবোধ এখন প্রভাবিত হয় সিমেন্ট, অবকাঠামো, এবং নগর-পরিকল্পনার দ্বারা। নগরের কিছু এলাকায় আপনি হাঁটতেই পারবেন না—এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যে আপনাকে যানবাহনেই চড়তেই হবে।
ইস্তাম্বুলের সেতু—নতুন সেতুটির কথাই ধরুন। আমি হাঁটার ইচ্ছা পোষণ করতাম। কিন্তু তারা বলল, “না, এখানে হাঁটা নিষেধ। এটি কেবল যানবাহনের জন্য।” আপনি পাশে হাঁটতে পারবেন কেবল তখন, যখন কোনো গাড়িতে বসে দেখবেন কেউ বৈদ্যুতিক তার মেরামত করছে। কিন্তু আপনি নিজে হাঁটতে পারবেন না।
অর্থাৎ, নগর আপনার চলাচলের গতিপথও পরিকল্পনা করে দেয়।
আর আপনি যে গতিতে চলবেন—যেমন ইউরেশিয়া টানেল। আপনি অর্থ পরিশোধ করেন, যাতে ১২ মিনিটে শহরের অন্য পারে পৌঁছাতে পারেন, কিংবা তারও কম সময়ে। কিন্তু তা-ও কেবল আপনি অর্থ দিতে পারলেই। তাই যারা সামর্থ্যহীন, তারা ধীরে চলে; যারা পারে, তারা দ্রুত চলে। অতএব, সময়ও পণ্য হয়ে গেছে।
এই নগরেই আমরা বাস করি—এবং এ-ই আমাদের সৌজন্যবোধ, পারস্পরিক আচরণ, দৈনন্দিন অভ্যাস গড়ে তোলে। আর এই অভ্যাসগুলোর সংমিশ্রণই আমরা সভ্যতা বলে ডাকি।
এটি এখন অত্যন্ত সংকর—কারণ আমাদের আধুনিক ইসলামী সভ্যতা জড়িয়ে আছে পাশ্চাত্য, ঔপনিবেশিক, পুঁজিবাদী, বৈশ্বিক—যে নামই দিন—ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে।
সুতরাং এখানে বড় একটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
১. কীভাবে সচেতনতা গড়ে তুলবেন—কোনটি প্রকৃত অর্থে ইসলামী,
২. কোনটি ইসলামী নয়, এবং
৩. কোনটি প্রতিকূল—অর্থাৎ কোনটি আপনার মূল্যবোধকে ক্ষয় করে।
আপনি কীভাবে আপনার জীবনধারা রূপান্তর করবেন?
কীভাবে এমন মানুষের সঙ্গে সেতুবন্ধন করবেন, যাদের সঙ্গে আপনার চিন্তা-দর্শনের মিল আছে, যাতে একত্রে দৈনন্দিন জীবনের চিন্তাভাবনা ও জীবনাচরণ বদলানো যায়?
এটাই সভ্যতা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আবার, আমরা যখন সভ্যতা নিয়ে কথা বলি, তখন সাধারণত ইতিহাস ও ভূগোল—বৃহৎ মানচিত্র, দীর্ঘ সময়, উত্থান-পতন, ধারাবাহিকতা-পরিবর্তন, কালপর্ব—এসবই আলোচনা করি।
কিন্তু আমরা যেভাবে এখন বাস করছি, তার সঙ্গে এটি খুব সঙ্গত নয়—কারণ ইসলামী সভ্যতা শেষ হয়ে যায়নি, আর পাশ্চাত্য আধিপত্যশীল সভ্যতা বাস্তব। আমরা যেন মাঝামাঝি আটকে আছি—এক মুহূর্ত এখানে, আরেক মুহূর্ত সেখানে।
কেন আমাদের সভ্যতা-অনুধাবনকে দৈনন্দিন জীবনে ফিরিয়ে আনা জরুরি?
কারণ আল্লাহ তায়ালা আমাদের আদেশ দিয়েছেন চলতে, দেখতে, পর্যবেক্ষণ করতে এবং চিন্তা করতে।
আর মহান আল্লাহ পাক বহু আয়াতে বলেছেন—দেখা মানে শুধু সামনের দিকে তাকানো নয়, পেছনের দিকেও তাকানো। কুরআনের দৃষ্টিতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—জীবনের বহু ক্ষেত্রে আন্তঃসম্পৃক্ত। আমাদের তা স্বীকার করতেই হবে।
মরক্কোর দার্শনিক আবদুর রহমান—আপনাদের অনেকেই নিশ্চয়ই তাকে চেনেন—আল্লাহ যে দায়িত্ব আমাদের দিয়েছেন, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং ভিন্ন ভিন্ন ধারণা উপস্থাপন করেছেন। আমি আল-ক্বাফ ধারণাটিও যুক্ত করতে পছন্দ করি।
আমরা সাধারণ সামাজিক সূত্র নিয়ে কথা বলি; আল-‘আলামুশ-শাহাদাহ নিয়ে কথা বলি; কিন্তু মুলক ও মালাকূতের ধারণা নিয়ে আমরা যথেষ্ট কথা বলি না—কুরআনে যা দু’বার এসেছে। এটি ইঙ্গিত করে নিয়ম-নীতিকে—ব্যবস্থাসমূহকে।
আমাদের ধারণা এমন—যেহেতু আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, সেহেতু ব্যবস্থা কমবেশি একই—মাইক্রো বা ম্যাক্রো, ক্ষুদ্র বা বৃহৎ। এবং হ্যাঁ, ব্যবস্থাসমূহের মধ্যে একটি সুতোয় বাঁধা সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন ব্যবস্থা প্রকৃতিগত দিক থেকেও ভিন্ন। এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমাদের অবস্থান বোঝা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বৃহৎ স্তর। কিন্তু এর প্রতিফলন দৈনন্দিন জীবনেও পড়ে—কারণ আপনি সদা-চলমান, আর আপনার এই চলা-ফেরা পর্যন্ত নির্ধারিত হয় পরিবহনব্যবস্থা, যানবাহন, রাস্তা, ও নগর-পরিকল্পনার দ্বারা।
তাই মালাকূত অনুধাবনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে—যখন আপনি হাঁটছেন দৈনন্দিন জীবনের পথে—যদি না আপনি মানব-সম্বন্ধে (আল-ইনসান) আপনার নিজস্ব উপলব্ধি অনুযায়ী এই পরিসর তৈরি করে থাকেন।
আমার মনে হয়, ইসলামী সভ্যতা-সচেতনতা পুনর্জাগরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো—কেবল পশ্চিম সমালোচনা নয়, বরং জটিলতাকে উন্মোচিত করা, এবং শ্রেণিবদ্ধ চিন্তা থেকে বহুবিধি চিন্তায় অগ্রসর হওয়া।
এটি ভিন্ন মাত্রার চিন্তা: স্বীকার করা যে মহাবিশ্বে নানা ধরনের ব্যবস্থা আছে। কিছু আমাদের শিক্ষা দেয়, তবে সেগুলো মানবজীবনে প্রয়োগ করতে হয় যথাযথভাবে।
আপনি যদি কসমিক সূত্র—সৃষ্টির ব্যবস্থাসমূহ দিকে তাকান, এগুলো আমাদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ, কিন্তু মানবজীবন স্বতন্ত্র। আমাদের এসব শিক্ষার রূপান্তর ঘটাতে হয়।
এখন একটি ধারণা আছে—বায়োমিমিক্রি—যার মাধ্যমে বলা হয় যে মানুষের প্রত্যেক আবিষ্কার প্রকৃতিতে আল্লাহ সৃষ্ট কোনো কিছুর অনুকরণ। বিমান পাখির মতো; আর্দ্রতা, জল, বর্জ্য, জৈব উপাদান ব্যবস্থাপনা—এসবেরই প্রকৃতিতে সমান্তরাল আছে। আমরা প্রকৃতি থেকে শিখি এবং তা জীবনে প্রয়োগ করি।
সুতরাং—
আমরা পৃথিবীকে কীভাবে ভাবি?
মহাবিশ্বকে কীভাবে ভাবি?
এর ভেতরে আমরা নিজেদের অবস্থান কীভাবে নির্ধারণ করি?
এর জন্য সময় জুড়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন, এবং জটিলতাকে আমাদের ধারণাগত কাঠামোয় আনতে সক্ষমতা জরুরি।
এই সমগ্র আলোচনা প্রায় একশো বছরের ইসলামী চিন্তার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে—যা আমরা হারিয়েছি তা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসেবে।
১৯২০-এর দশকে উসমানীয় খিলাফতের পতনের পর মুসলমানরা খেলাফতকে রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু একশো বছরের মধ্যে অগণিত পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে। ভবিষ্যতের ইসলামী নাগরিকতা ও সভ্যতা নিয়ে ভাবতে হলে এসব পরিবর্তনকে গুরুত্বসহকারে নিতে হবে।
সময় অল্প, তাই শুধুমাত্র কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের কথা বলব—যা আমাদের বিশ্ব-অনুধাবন পুনর্গঠনে অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, দীর্ঘদিন আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা—ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিভাজন নিয়ে আলোচনা করেছি। এর প্রাসঙ্গিকতা এখনও আছে, কিন্তু বড় পরিবর্তন এসেছে। আমরা এখন ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে পৌত্তলিকতার দিকে অগ্রসর হতে দেখছি।
পৌত্তলিকতার উত্থান ঘটছে, এটি একটি আকর্ষণীয় চ্যালেঞ্জ। কারণ আপনি আর খ্রিস্টধর্মের মুখোমুখি নন, যারা মুসলমানদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করে। সেটিও আছে—বরং এখন আরও শক্তিশালী। কারণ বিভিন্ন চার্চ তাদের অভ্যন্তরীণ সংকট মিটিয়ে একধরনের রাজনৈতিক খ্রিস্টীয় জোট তৈরি করেছে, বিশেষত আমেরিকার ক্ষেত্রে।
উদাহরণস্বরূপ, পপুলিজম অনেকটাই পৌত্তলিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ, পপুলিজম নিজের দেশের ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলে: আমরা মহৎ জার্মান, আমরা মহৎ ফরাসি; মিসরে বলা হয়, আমরা সাত হাজার বছরের প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার উত্তরাধিকারী। এটি সবচেয়ে বিশাল সভ্যতা, সবচেয়ে গৌরবময়; আমরা মিসরীয় হতে গর্ববোধ করি।
কিন্তু এতে প্রাচীন ধারণার পুনরাবির্ভাব ঘটে: সূর্য-প্রতীক, প্রাচীন মন্দিরে নির্দিষ্ট দিনে আলো পড়ার দৃশ্য, পুরনো ফারাওদের মুখে সূর্যালোকের স্পর্শ। আপনি আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের চিহ্ন দেখেন, মহাগম্ভীর মন্দিরে যে শান্তি অনুভব করেন, হায়ারোগ্লিফের অপূর্ব নান্দনিকতা—এ সবই আপনাকে টেনে নিয়ে যায়।
এটি ধর্মনিরপেক্ষতার মতো নয়, যা আপনার ধর্ম ছিনিয়ে নিতে চায়; বরং এগুলো আপনার শেকড়, আর মানুষ তার ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একই সঙ্গে পশ্চিমের প্রতি মুগ্ধতাও কাজ করে। কারণ বলা হয়, পরাজিতরা বিজয়ীদের অনুকরণে মগ্ন হয়ে পড়ে। আত্মমর্যাদা-হীনতা কাজ করে: তারা জিতেছে, কারণ তাদের কাছে এমন কিছু আছে যা আমাদের নেই। তাহলে আমরা কেন তাদের অনুকরণ করব না? হয়তো আমরাও শক্তি পাব।
তাই আমার মনে হয় আমরা যে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—এবং এজন্য আমাদের তত্ত্বগুলো পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন– ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলাম, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্ম। মানুষের নতুন বা পুরনো পরিচয়কে পৌত্তলিকতার চিহ্নের সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে। কখনো চিহ্নগুলো সূক্ষ্ম, কখনো স্পষ্ট। আপনি পড়তে পারেন, অনুসন্ধান করতে পারেন। এখন নব্য-পৌত্তলিকতা নামে একটি গবেষণাক্ষেত্র রয়েছে। এটি ফিরে আসছে।
ধর্মগুলোও ফিরে আসছে। মানুষ ফিরে এসে দল গঠন করছে। এবং একজন মিসরীয় হিসেবে আমি জানি, কিছু পর্যটক কেবল ভ্রমণের জন্য আসে না; নির্দিষ্ট তারিখে আসে। কারণ, সেই তারিখগুলো প্রাচীন মিসরীয় ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তারা কিছু আচার পালন করে। কিন্তু পর্যটন আমাদের আয়, তাই আমরা চোখ বন্ধ করে থাকি। সংখ্যা বেশি নয়, তাই চলতে দিই।
আবারও, পৌত্তলিকতা ফিরে আসছে—এবং এটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এটি অত্যন্ত বস্তুতান্ত্রিক। এটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা, প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। প্রকৃতির ঊর্ধ্বে উঠে তার দায়িত্ব গ্রহণের পরিবর্তে। আর এটি নতুন যুগের পৌত্তলিকতা–পুরোনো রূপ নয়, তাই অত্যন্ত জটিল।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ইসলামী সভ্যতা ও উম্মাহকে নিয়ে ভাবতে গেলে আমরা দীর্ঘদিন শান্তি, সংলাপ—এসব নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি। আমাদের ব্যস্ত রেখেছে নিজেকে ব্যাখ্যা করা, ইসলামকে রক্ষা করা—শক্তির প্রশ্ন ভাবার বদলে।
গত কয়েক বছরে আমি যুদ্ধে ও যুদ্ধতত্ত্বে আগ্রহী হয়েছি। অস্ত্র ধরার জন্য নয়, সহিংসতার জন্য নয়; বরং উপলব্ধি করেছি—যুদ্ধ মানব-ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে উপস্থিত একটি মানবীয় ঘটনা। আর যদি আপনি জানেন না গণহত্যা থেকে নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবেন, তবে আপনার চিন্তায় একটি মারাত্মক সমস্যা রয়েছে।
আমার মতে উম্মাহর এজেন্ডায় থাকা উচিত: মুসলিম উম্মাহকে কীভাবে রক্ষা করা হবে, এবং কীভাবে শান্তি ও যুদ্ধে শক্তিশালী হওয়া যায়। এবং আজ আমরা পুরোনো যুদ্ধের মুখোমুখি নই—নতুন যুদ্ধরূপের মুখোমুখি। গাজা প্রসঙ্গে এটির উল্লেখ হয়েছে।
আমরা, মুসলিমরা কোনো ধারণাই রাখি না, কোনো প্রশিক্ষণ নেই—যদি আগামীকাল যুদ্ধ শুরু হয়, কীভাবে টিকে থাকতে হবে।
আমি একবার শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম: “তোমাদের মধ্যে কয়জন অস্ত্র চালাতে জানো? কয়জন কৌশলগত যুদ্ধতত্ত্ব জানো? যুদ্ধ হলে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবে? কীভাবে একটি নগর দ্রুত নিজেকে পুনর্গঠিত করবে—ভূমি ও সম্পদ বণ্টনের সক্ষমতা গড়ে তুলবে?”
এটি এমন এক দক্ষতা, যা দৈনন্দিন জীবনে থাকা উচিত। মানুষকে শেখানো উচিত—কীভাবে শান্তিপূর্ণ ও সভ্য থাকা যায়, তবে একই সঙ্গে কীভাবে বেঁচে থাকা যায়।
ইতিহাসজুড়ে বহু দার্শনিক বলেছেন—দর্শন কেবল তত্ত্ব নয়। দর্শন হলো অনুশীলন–সঠিক-ভুল, ন্যায়, সমতা, সৌন্দর্য; প্রতিদিনের আচরণে কীভাবে রূপ পায়, এবং বিশ্বে সক্রিয় থেকে তা কীভাবে গড়ে ওঠে।
অতএব এটি কেবল তত্ত্বের প্রশ্ন নয়; বরং প্রশ্ন—আমি কী করব? কী পড়া উচিত? কী শেখা উচিত? কীভাবে চিন্তা করা উচিত?
আমরা সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্নতার দিকে অগ্রসর হচ্ছি—কেবল প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগের কারণে নয়; বরং যে নগর-ভাগাভাগি আমরা দেখছি তার কারণেও। বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। মানুষ তাদের নিজস্ব খোলের ভেতর বাস করছে।
আমি একবার এক ইস্তাম্বুলের মহিলার সঙ্গে দেখা করি যাকে আমাকে ইউরোপীয় অংশ থেকে এশীয় অংশে নিয়ে যেতে হয়েছিল। আমি উস্কুদারে থাকি। নৌকায় তিনি আমাকে বললেন: “আমার জীবনে এই প্রথম আমি বসফরাস পার হলাম।” তার বয়স ছিল ৪৪।
তিনি ইউরোপীয় অংশের এক মহল্লায় বাস করতেন; তার পুরো পরিবার সেখানে—এক ধরনের ক্ষুদ্র গোত্রের মতো। তার সন্তানরা একই স্কুলে পড়ত; বাজারও পাশে। তারা ধনী ছিলেন না, তাই তুরস্ক ঘুরেও দেখেননি।
কায়রোর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ কায়রোর বিভিন্ন মহল্লা পর্যন্ত চেনে না। আমি জিজ্ঞেস করি: “ওই জায়গায় গেছ?” তারা বলে, “কোনো ধারণা নেই।” অথচ স্থানটি ক্যাম্পাস থেকে সাত মিনিটের হাঁটা পথ।
সুতরাং বিশ্বজনীন নগরেও আমরা খণ্ডিত। সম্প্রদায়গুলো নাগরিকত্ব বা জাতি বা জাতীয়তা ভাগ করলেও তারা আসলে বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্নতা মানবিক জীবনযাপনের জন্য অতিরিক্ত প্রচেষ্টা দাবি করে। বন্ধুত্ব রক্ষা করতে সময় ব্যয় করতে হয়। আমরা বন্ধুকে হারাই—কারণ কেউ জাপানে চলে যায়, কেউ দক্ষিণ আফ্রিকায় চাকরি পায়, কেউ শহরের এপারে-ওপারে থাকে—দুই ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় নেই। আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আছি, কিন্তু ছয় বছরেও মুখোমুখি দেখা হয়নি।
বন্ধুত্ব বজায় রাখতে আপনাকে পথ থেকে সরে গিয়ে একটি পূর্ণ দিন উৎসর্গ করতে হয়—এবং তা সার্থক।
সবশেষে প্রযুক্তি। বহু দশক, সম্ভবত শতাব্দী পর্যন্ত বিজ্ঞান ছিল মানবিক চিন্তার উপকরণ, জীবনের মানোন্নয়নের সহায়ক। এরপরে এলো ধর্মনিরপেক্ষতা–বিজ্ঞান আছে, ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই। সেটা আলাদা প্রসঙ্গ। কিন্তু বিজ্ঞান তখনও নিয়ন্ত্রিত ছিল। আমরা পড়তাম গবেষণা-নৈতিকতা, বৈজ্ঞানিক প্র্যাকটিসের নৈতিকতা ইত্যাদি।
কিন্তু এখন নতুন প্রযুক্তি মানবমস্তিষ্ককে হটিয়ে দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সামনে আনছে। জীববিজ্ঞান, রসায়নসহ নানা ক্ষেত্রে এমন প্রযুক্তি এসেছে, যার কোনো সীমানা নেই। যা-ই সম্ভব, তা-ই এখন অনুমতিযোগ্য—এটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
আমরা পঁচিশ বছর ধরে পোস্টহিউম্যানিজম নিয়ে আলোচনা করছি; অনেক কিছুই বদলেছে। সবাই এআই-এর ওপর নির্ভরশীল। আমার খুব ধার্মিক বন্ধুরা চ্যাটজিপিটিকে থেরাপিস্ট হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা চ্যাটজিপিটিকে নিজেদের সমস্যা খুলে বলেন। এটি মিসরীয় আরবিতে উত্তর দেয়; তাদের মানসিক কাঠামো বোঝে।
সৌদি আরবে আমার এক বান্ধবী বললেন, চ্যাটজিপিটি তাকে তার নিজের ভাষাশৈলীতে উত্তর দিয়েছে। তিনি ইসলামী তাফসির নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। চ্যাটজিপিটি উত্তর দিয়েছিল—এর প্রকৃতি ও নির্মাণরীতি তার প্রশ্নিত বিষয় থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন; এসব রূপান্তরধর্মী ধারণার জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা প্রয়োজন। এটি নিজের সীমাবদ্ধতা চিনতে পেরেছিল এবং অন্য প্রযুক্তির পরামর্শ দিয়েছিল। এটিও বিস্ময়কর।
এটাই আধুনিক সভ্যতার একটি রূপান্তর। আমরা এ নিয়ে কী করব? নিজেদের এবং সন্তানদের শিক্ষা দেব কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়, কিন্তু অপব্যবহার না করতে—এবং প্রযুক্তিকে আমাদের অপব্যবহার করতে না দিতে। কারণ একবার আপনি যন্ত্র দ্বারা পরিচালিত হলে—উম্মাহ, মূল্যবোধ, দ্বীন—সব আলোচনাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আজ সাত বছরের শিশুকে ইসলামী ধারণা দেওয়া কতটা কঠিন—যে কেউ বলতে পারবেন।
এই বাস্তবতায়, আমার মনে হয় আধুনিক ইসলামী সভ্যতার কোনো একক তত্ত্ব একজন মানুষের পক্ষে রচনা করা সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন বিজ্ঞানী। আমাদের অনেকেই ইসলামি স্টাডিজ, সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভাষা, ভাষাবিজ্ঞান থেকে এসেছি—কিন্তু আমাদের বিজ্ঞানী কম।
আমাদের প্রকল্পের কসমিক দৃষ্টিভঙ্গি পুনরুদ্ধার করতে হলে আমাদের আরও বিজ্ঞানীর প্রয়োজন—যারা পরস্পরের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা করবে, চ্যালেঞ্জগুলো বুঝবে, এবং নির্ধারণ করবে—প্রযুক্তি ও আধুনিক আবিষ্কার কীভাবে ব্যবহার করা হবে, যাতে ইসলামী মূল্যবোধ পুরোপুরি এতে আত্মসাৎ না হয়, এবং যাতে মীযান, ন্যায় ও সাম্য বজায় থাকে।
অনুবাদ: সাবিহা শুচি
