ইখতিলাফের আখলাক

আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব চিন্তা ও দর্শন

ইখতিলাফ কী?

ইখতিলাফ হলো যখন কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে কুরআন বা সুন্নতের মধ্যে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকে না এবং একাধিক ব্যাখ্যার সুযোগ থাকে, তখন মুজতাহিদ আলেমগণ তাঁদের গবেষণা থেকে ভিন্ন ভিন্ন মত বা ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

ইখতিলাফের আখলাক

সাধারণত, ধর্মীয় যেসব বিষয়ে একাধিক ব্যাখ্যা সম্ভব হয় সেসব ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমগণের মত ভিন্ন হবে। কারণ দ্বীনের প্রকৃতি, নসের প্রকৃতি এবং মানুষের প্রকৃতি পরস্পর ভিন্ন। এসব ভিন্নতার কারণেই সমাজ ও সভ্যতায় বৈচিত্রতা বিদ্যমান। নাহয় সমাজ ও সভ্যতা একটি নির্দিষ্ট সীমায় আটকে থাকতো। নতুন নতুন চিন্তা ও পন্থার উদ্ভাবন হতো না। এ কারণেই ইখতিলাফ কে রহমত হিসেবে অবহিত করা হয়েছে। চিন্তা ও দর্শনের ক্ষেত্রে ভিন্নতা নতুন নতুন হাকীকতের দ্বার উন্মোচিত করে দেয়।

বর্তমানে সভ্যতার পতন লগ্নে ধর্মীয় নানা বিষয় নিয়ে অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন অনর্থক বিতর্কের চর্চা রয়েছে। এসব বিতর্ক নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে প্রচার প্রচারণা চলমান রয়েছে। একপক্ষ অপর কে নানা অপবাদ, কুৎসা, মিথ্যাচার এমনকি তাকফির পর্যন্ত করে ফেলে। দ্বীনের শাখা প্রশাখা নিয়ে এমন সব বিতর্ক সমাজে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করছে। অথচ সূরা আনআমের ১৫৯ নং আয়াতে দ্বীনকে খন্ড বিখন্ড করে বিভিন্ন দল উপদলে ভাগ হওয়াকে নিষেধ এবং সতর্ক করা হয়েছে।

আখলাক ও আদালতবিহীন স্থানে বিদ্যমান এসব বিতর্ক ইসলাম এবং মুসলিমদেরকে আরো কোণঠাসা এবং অপ্রাসঙ্গিক করে দিচ্ছে। মুসলিম উম্মাহর সামনে হাজারো সমস্যা রয়েছে যেগুলোর সমাধান আবশ্যক। কিন্তু সেই সকল সমস্যা কে উপেক্ষা করে দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর এসব বিতর্কের ফলে মূল সমস্যার দিকে দৃষ্টিপাত করা হচ্ছে না। সমস্যাগুলো গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।

এসব বিতর্ক মানুষ কে রহমত থেকে বঞ্চিত করছে। মানুষ হাকীকত থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে দ্বীনের প্রতি মানুষ কে অনাগ্রহী করে ফেলছে। আমাদের ঈমান, ইলম এবং হিকমত কে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমাদেরকে আখলাক, আদালত এবং মারহামাত থেকে দূরে ঢেলে দিচ্ছে।

বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে ইখতিলাফি বিতর্ক গুলো আরো প্রসারিত হয়েছে। ধর্মীয় জ্ঞানের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু দ্বীন সামগ্রিকতা হারিয়ে খন্ড বিখন্ড হয়ে পড়েছে। জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা, ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অরাজকতা এবং ফতোয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধার সৃষ্টি করছে। উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধকারী দ্বীনি বৈশিষ্ট্য কে দূর্বল করে দ্বীনি পবিত্রতা এবং পরিবেশ নষ্ট করছে। দ্বীন কলহের বিষয়বস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

দৈনন্দিন জীবনে ফাসাদ এবং বেহুদা বিষয় নিয়ে বিতর্ক, গালাগাল নিষেধ করা হয়েছে আর দ্বীন নিয়ে এসব বিতর্ক কখনোই বৈধ হতে পারে না।

এসব বিতর্ক থেকে বেঁচে থাকতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সরাসরি সতর্ক করেছেন। কোরআনের ভাষায়-

مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوْا دِيْنَهُمْ وَ كَانُوا شِيَعًا ۖ كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُوْنَ

অর্থ: “যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে (তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না)। প্রত্যেক দলই নিজদের যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত।” (সূরা রূম: ৩২)

অপর একটি আয়াতে বলা হয়েছে-وَ لَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوْا وَ تَذْهَبَ رِيحُكُمْ

অর্থ: “পরস্পরে ঝগড়া বিবাদ করো না, তা করলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে, তোমাদের শক্তি-ক্ষমতা বিলুপ্ত হবে।” ( সূরা আনফাল: ৪৬)

রাসূলে আকরাম (স.) অর্থহীন, উপকারহীন ও দ্বীন নিয়ে করা বেহুদা বিতর্ককে “মিরা” (المراء( নামে অভিহিত করেছেন। “মিরা” (المراء)  হলো দ্বীনকে শত্রুতা ও হিংসার উপাদানে রূপান্তরিত করা। কাউকে ছোট করার জন্য ধর্মীয় বিষয়ে দোষ খোঁজা। ইবনে মাজাহতে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে-

لا تَعَلَّمُوا الْعِلْمَ لِتُبَاهُوا بِهِ الْعُلَمَاءَ وَلَا لِتُمَارُوا بِهِ السُّفَهَاءَ وَلَا تَخَيَّرُوا بِهِ الْمَجَالِسَ فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَالنَّارُ النَّارُ

অর্থ : “তোমরা আলেমদের উপর বাহাদুরি প্রকাশের জন্য, নির্বোধদের সাথে ঝগড়া করার জন্য এবং জনসভার উপর বড়ত্ব প্রকাশ করার জন্য ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা করো না। যে ব্যক্তি এরূপ করবে, তার জন্য রয়েছে আগুন আর আগুন।”

অপর একটি হাদীসে এসেছে-

لَا يَسْتَكْمِلُ عَبْدٌ حَقِيقَةَ الْإِيمَانِ حَتَّى يَدَعَ الْمِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقًا

অর্থ : “একজন মানুষ সঠিক হওয়ার পরেও যদি অনর্থক বিতর্ক থেকে দূরে না থাকে তাহলে সে ঈমানের হাকীকতকে পূর্ণ করতে পারবে না।”

ইসলামী সভ্যতায় ইখতিলাফকেও রহমতে রূপান্তরকারী উসূল এবং আখলাক রয়েছে যার ফলে দ্বীনে সামগ্রিকতা বজায় থাকে যা হাকিকতের দ্বার উন্মোচিত করে। মুসলিমদের ইখতিলাফের এই আখলাক মানা আবশ্যক। কোনো ব্যক্তি, আলেম বা দলই এর বাইরে নয়। ধর্ম নিয়ে বিতর্ক করতে গিয়ে ‘আখলাকে হামিদা’র লঙ্ঘন নিন্দনীয়।

দ্বীন চিরস্থায়ী এবং অকাট্য বিষয়। কোনো অস্থায়ী ব্যক্তি, দল, সংগঠন এর উপর দ্বীনের স্থায়ী হাকিকতকে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। কেবল উত্তম আখলাকের মাধ্যমেই এটি সম্ভব। চৌদ্দশত বছরের সভ্যতা কে কোনো একক ব্যক্তি বা সাহিত্য দিয়ে বিবেচনা করা যাবে না।

ইখতিলাফের এই ধারা সাহাবায়ে কেরামদের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে ইখতিলাফ হলে পরস্পর বিতর্কে জড়াতেন না। পয়গম্বর (সাঃ) এর স্বরণাপন্ন হতেন এবং তাঁর দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিতেন। তাঁদের ইখতিলাফে কোনো প্রকার জিদ, হঠকারিতা বা গোঁড়ামির স্থান ছিল না। ইচ্ছাকৃত বা জিদের বশবর্তী হয়ে তাঁরা কখনো বিতর্ক করতেন না। তাঁদের ইখতিলাফের পেছনে একান্ত উদ্দেশ্য ছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। উম্মতের মধ্যে বিশৃঙ্খলা বা অনৈক্য সৃষ্টি করা নয়। তাঁদের পারষ্পরিক সম্পর্ক ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। পরমত সহিষ্ণুতা ছিল তাঁদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বিশিষ্ট ফকিহ তাবিঈ আল কাসিম ইবনে মুহাম্মদ (রঃ) বলেন- “পয়গম্বর (সাঃ) এর সাহাবীগণের মতপার্থক্য আল্লাহর কল্যাণকর বিষয়সমূহের মধ্যে অন্যতম।”

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত- খন্দক যুদ্ধের দিন পয়গম্বর (সাঃ) সাহাবীদের বললেন “তোমাদের কেউ যেন বনু কুরাইযায় পৌঁছার পূর্বে সালাত আদায় না করে।” পথে আসর নামাজের সময় শেষ হওয়ার উপক্রম বা শেষ হয়ে এলেও একদল নামাজ আদায়  করা থেকে বিরত থাকলেন, অপর দল সাহাবী সময় মতো নামাজ আদায় করলেন। তাঁদের মতামত হলো- পয়গম্বর সাঃ নামাজ কাযা করা উদ্দেশ্যে একথা বলেননি বরং চলার গতি দ্রুত করতে তাগাদা দিয়েছেন যাতে আসরের সময়ের আগেই বনু কুরায়যায় পৌঁছানো যায়। ঘটনা শুনে রাসূল সাঃ কাউকেই তিরস্কার করেননি।

সাহাবায়ে কেরাম এবং মুজতাহিদ ইমামগণ ইখতিলাফের ক্ষেত্রে আখলাক মেনে চলতেন। তাঁরা নিজের মতকেই একমাত্র সঠিক মনে করতেন না। অপর পক্ষও সঠিক হতে পারে এটি বিশ্বাস করতেন।

ইমাম আবুল বারাকাত আন নাসাফী আল হানাফী বলেন আমাদের ও আমাদের প্রতিপক্ষের ফিকহী মাযহাব সম্পর্কে আমাদের জিজ্ঞাসা করা হলে আমরা অবশ্যম্ভাবী রূপে বলবো, আমাদের মাযহাবই সঠিক, তবে ভুল হবারও সম্ভাবনা রয়েছে।

কোনো আলেম কিংবা দায়ী বা কোনো তরিকত নিজেদের পন্থাকে সঠিক এবং অপর মত কে ভ্রান্ত আক্ষা দিতে পারে না৷ নিজেদের মতকেই একমাত্র নাযিলকৃত পন্থা হিসেবে উপস্থাপন এবং অপর মত কে বিকৃত বলে ঘোষনা দিতে পারেন না। এসকল বিষয় আহলে সুন্নতের পরিপন্থী এবং গর্হিত কাজ।

এক মুসলমান অপর মুসলমানকে তাকফির করার অধিকার নেই। আহলে সুন্নতের মূলনীতি হলো “আহলে কিবলাকে তাকফির করা যাবে না।”

ইমাম আবু হানীফার, “যে অবতীর্ণ আয়াতের প্রতি ঈমান এনেছে, ব্যাখ্যার কারণে তাকে তাকফীর করা যাবে না”-এই মূলনীতিটিকেও আমাদের সামনে রাখতে হবে। তাকফিরি আলোচনা কলহকে উস্কে দেয়।

প্রতিটি কথাই আমানত স্বরূপ। সুতরাং ইখতিলাফের আখলাককে মেনে চলতে হবে এবং দ্বীনকে বুঝা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উসূল মেনে চলতে হবে। ইখতিলাফ কে ফেতনার কারণ থেকে বিরত রেখে রহমতে রূপান্তর করতে হবে। কোনো বিষয় দলীল প্রমাণ ছাড়া জনপ্রিয় হওয়ার নেশায় ডিজিটাল প্লাটফর্মে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

এই দোয়ার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে চাইতে পারি –

اللهم لا تجعل مصيبتنا في ديننا

অর্থ : “হে রব আমাদের দ্বীন যেন আমাদের জন্য মুসিবতে পরিণত না হয়। তুমি আমাদের দ্বীনকে আমাদের জন্য মুসিবত বানিয়ে দিও না। দ্বীনের ব্যাপারে আমাদেরকে মুসিবতের মুখোমুখি করো না।”

গ্রন্থ সহায়িকা – বিশ্বায়নের যুগে যুবজিজ্ঞাসা

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *